বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/আফগানিস্তান এবং এশিয়ার অন্য কয়েকটা দেশ

উইকিসংকলন থেকে

১৭০

আফগানিস্তান এবং এশিয়ার অন্য কয়েকটা দেশ

৮ই জুন, ১৯৩৩

 ইরাকের পূর্বদিকে রয়েছে ইরান বা পারশ্য; পারশ্যের পূর্বে আফগানিস্তান। পারশ্য এবং আফগানিস্তান দুইই ভারতবর্ষের প্রতিবেশী—(বেলুচিস্তানে) কয়েক শো মাইল ধরেই পারশ্যের সীমান্ত ভারতবর্ষকে স্পর্শ করে চলেছে; বেলুচিস্তানের একেবারে পশ্চিম প্রান্ত থেকে শুরু করে উত্তরে হিন্দুকুশ পর্বতমালা পর্যন্ত প্রায় এক হাজার মাইল ধরে আফগানিস্তান আর ভারতবর্ষ পরস্পরের গায়ে ঠেকে রয়েছে। মধ্য-এশিয়ার এই হিন্দুকুশ পর্বতমালার কোলেই ভারতবর্ষ তার তুষার-ধবল মাথাটি রেখে আরামে শুয়ে আছে, শুয়ে শুয়ে সোভিয়েটদের এলাকার দিকে তাকিয়ে দেখছে। এই তিনটি দেশ শুধু প্রতিবেশী নয়, জাতি হিসাবেও এরা পরস্পরের জ্ঞাতি, কারণ এই তিনটি দেশেই প্রাচীন আর্যদের বংশধরদের প্রাধান্য। সংস্কৃতির দিক থেকে সুদূর অতীত কালেও এদের মধ্যে অনেকখানি মিল ছিল, সেকথা তোমাকে আগেই বলেছি। অল্পদিন আগেও পারসীভাষাই ছিল উত্তর ভারতের পণ্ডিতব্যক্তিদের ভাষা; এখনও এদেশে এই ভাষার বহুল প্রচলন আছে, বিশেষ করে মুসলমানদের মধ্যে। আফগানিস্তানের দরবারে এখনও পারসী ভাষাই চলছে; আফগানদের জনসাধারণের ভাষা হচ্ছে পুশ্‌তু।

 পারশ্য সম্বন্ধে তোমাকে আমি আগের চিঠিগুলোতে যা বলেছি, তার বেশি আর এখানে কিছু বলব না। কিন্তু আফগানিস্তানে যে-সব ব্যাপার সম্প্রতি ঘটে গেল তার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া দরকার। আফগানিস্তানের ইতিহাস বস্তুত ভারতবর্ষের ইতিহাসেরই একটা অধ্যায়; বাস্তবিক বহুদিন ধরে আফগানিস্তান ভারতবর্ষেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভারতবর্ষ থেকে আলাদা হয়ে যাবার পর থেকে এবং বিশেষ করে গত একশো বছর বা কিছু বেশিকাল ধরে, আফগানিস্তান হয়েছে রাশিয়া আর ইংলণ্ডের বিরাট দুই সাম্রাজ্যের মাঝে, দুদিকেরই ধাক্কা আটকাবার প্রাচীর রাষ্ট্র। রাশিয়ার সাম্রাজ্য ভেঙে গেছে, তার জায়গাতে এসেছে সোভিয়েট ইউনিয়ন; কিন্তু আফগানিস্তান এখনও তার সেই পুরনো ভূমিকা, প্রাচীরের ভূমিকাই অভিনয় করে চলেছে—ইংরেজরা আর রুশরা এই দেশে এসে নানা ষড়যন্ত্র ফিকির ফন্দী আঁটছে, অন্যকে হটিয়ে দিয়ে দেশটাকে হাতের মুঠোয় পূরবার চেষ্টা করছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এদের এই-সব চক্রান্তের ফলেই ইংলণ্ড আর আফগানিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ বাধল। যুদ্ধে ইংরেজরা বারবার বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েও কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য তাদেরই হল। আফগান রাজবংশের বহু লোক আজও রাজবন্দী হিসাবে উত্তর ভারতের বহুস্থানে আটক হয়ে আছেন, আফগানিস্তানে যে ইংরেজের হস্তক্ষেপ ঘটেছিল এঁরা তারই স্মৃতিচিহ্ন। তারপর সিংহাসন গেল ব্রিটেনের মিত্রস্থানীয় আমীরদের দখলে; আফগানিস্তানের বৈদেশিক নীতি সম্পূর্ণরূপেই ব্রিটিশের নির্দেশ অনুসারে চলতে লাগল। কিন্তু ইংরেজের প্রতি বন্ধুভাব এঁদের যতই থাক তবু এই আমীরদের পুরোপরি বিশ্বাস করা যেত না; অতএব এঁদের প্রসন্ন এবং ব্রিটিশের অনুগত করে রাখবার জন্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ টাকা এঁদের সাহায্য বলে দিতে লাগলেন। এই রকমেরই বৃত্তিভোগী রাজা ছিলেন আমীর আবদুর রহমান, ১৯০১ সালে এঁর দীর্ঘকালব্যাপী রাজত্বের অবসান হয়। তাঁর পরে এলেন আমীর হাবিবুল্লা, ব্রিটিশের সঙ্গে তাঁরও সম্প্রীতি ছিল।

 ভারতবর্ষের ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আফগানিস্তান এত অনুগত কেন, তার একটা কারণ হচ্ছে সে দেশটির অদ্ভুত অবস্থিতি। মানচিত্রে দেখবে, সমুদ্রের সঙ্গে আফগানিস্তানের যোগ নেই, তার আর সমুদ্রের মাঝখানে রয়েছে বেলুচিস্তান, অতএব এটার অবস্থা হচ্ছে একটা বন্ধ বাড়ির মতো, যার অন্য কারও জমির উপর দিয়ে ছাড়া বড়ো রাস্তায় বেরোবার পথ নেই। সেটা একটা মুশকিলের অবস্থা। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখবার এর সবচেয়ে সোজা পথটাই ছিল ভারতবর্ষের মধ্য দিয়ে। আফগানিস্তানের উত্তরদিকে রাশিয়ার যে অঞ্চলটি, আগের দিনে সেখানে যানবাহনের কোনো ভালো ব্যবস্থাই ছিল না। আজকাল বোধ হয় সোভিয়েট সরকার সেখানে যানবাহনের ব্যবস্থা করেছেন, রেলওয়ে তৈরি করেছেন এবং বিমান ও মোটর চলাচলের সহায়তা করছেন। ভারতবর্ষই হল আফগানিস্তানের পক্ষে বাইরের হাওয়া পাবার জানালা; অতএব ব্রিটিশ সরকার সেই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে নিতে পারতেন, নানা দিক থেকেই আফগানিস্তানের উপরে জুলুম চালাতেন। আফগানিস্তানের পক্ষে সমুদ্রে বেরোনো মুশকিল, এইটাই এখনও এই দেশটির পক্ষে একটা বড়ো সমস্যা হয়ে রয়েছে।

 আফগান দরবারের ভিতরে সারাক্ষণই চক্রান্ত আর রেষারেষি লেগে ছিল; ১৯১৯ সনের প্রথম দিকে সেটা বাইরে ফুটে বেরুল, খুব অল্পদিনের মধ্যে পরপর দুটো প্রাসাদ-বিপ্লব ঘটে গেল। বাইরে যেটকু প্রকাশ পেয়েছে তার নেপথ্যে কী ছিল, বা এই-সব পরিবর্তনের মূলে কার হাত ছিল, সেটা আমার ঠিক জানা নেই। প্রথমে আমীর হবিবুল্লাকে কে একজন খুন করল। তাঁর ভাই নসরুল্লা তখন আমীর হয়ে বসলেন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই আবার নসরুল্লাকেও সরিয়ে দেওয়া হল। এবারে আমীর হলেন আমানুল্লা, হাবিবুল্লার কনিষ্ঠ পুত্রদের মধ্যে একজন। এর ঠিক পরেই, ১৯১৯ সনের মে মাসে তিনি ভারতবর্ষের উপর একটি ছোটো খাটো আক্রমণ চালালেন। সে আক্রমণ করবার আপাত কারণ কী ঘটেছিল, বা তার প্রথম উদ্যোক্তা কে ছিলেন, তাও আমি জানিনে। খুব সম্ভবত, ব্রিটিশের প্রতি কোনো প্রকার আনুগত্য স্বীকার করে থাকাটাই আমানুল্লা পছন্দ করতেন না, তাই তিনি তাঁর দেশের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এটাও সম্ভবত আশা করেছিলেন তখনকার পারিপার্শ্বিক অবস্থাটা তাঁরই অনকূল হবে। মনে রেখো, এটা হচ্ছে ঠিক সেই সময়ের কথা, যখন পাঞ্জাবে সামরিক আইনের শাসন চলেছে, ভারতের সর্বত্র ব্রিটিশের বিরুদ্ধে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, এবং খিলাফত সমস্যা নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য জেগে উঠছে। যাই হোক, কারণ এবং লোভ এর গোড়ায় যাই থাক, এই আক্রমণের ফলে ব্রিটিশদের সঙ্গে আফগানদের যুদ্ধ বাধল। এই যুদ্ধ কিন্তু চলল আশ্চর্যরকম অল্পদিন, আর লড়াই বলতে বিশেষ কিছু হলই না এতে। সমরনীতির দিক থেকে অবশ্য বলতে হবে, ভারতের ব্রিটিশ সরকারের শক্তি আমানুল্লার চেয়ে অনেক বেশি ছিল। কিন্তু যুদ্ধ করবার মতো প্রবৃত্তি তখন তাঁদের নেই, অতএব দুটো-চারটে খুচরো মারামারি হবার পরেই তাঁরা আফগানদের সঙ্গে সন্ধি করতে এগিয়ে গেলেন। ফলে আফগানিস্তানকে তাঁরা স্বাধীন দেশ বলে স্বীকার করে নিলেন, অন্যান্য দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পূর্ণ ক্ষমতাও তাঁর নিজের হাতেই থাকবে। আমানুল্লা যা চেয়েছিলেন তা পেয়ে গেলেন, ইউরোপ এবং এশিয়ার সর্বত্র তাঁর মানমর্যাদাও অনেক বেড়ে গেল। স্বভাবতই ব্রিটিশরা আর তাঁর উপরে প্রসন্ন রইল না।

 মানুষের দৃষ্টি এর চেয়েও বেশি আকর্ষণ করলেন আমানুল্লা আরেকটি কাজের জন্য—দেশে তিনি একটি নূতন নীতির প্রবর্তন করলেন। এই নীতিটি হচ্ছে পাশ্চাত্ত্য দেশের অনুকরণে দেশের দ্রুত সংস্কার সাধন—একে নাম দেওয়া হয়েছে আফগানিস্তানের ‘পাশ্চাত্ত্যীকরণ’। আমানুল্লার স্ত্রী রাণী সৌরিয়া এই কাজে তাঁকে প্রচুর সাহায্য করেছিলেন। সৌরিয়ার খানিকটা শিক্ষা হয়েছিল ইউরোপে, অবগুণ্ঠন এবং বোরখার আড়ালে মেয়েদের যেভাবে আবদ্ধ করে রাখা হত তার উপরে তিনি নিদারুণ চটা ছিলেন। অতএব শুরু হল একটা অদ্ভূত অভিযান; অত্যন্ত সেকেলে একটা দেশকে অতি অল্প দিনের মধ্যে আগাগোড়া বদলে ফেলার অভিযান, প্রাচীন রীতির যে নেমিরেখা ধরে চলতে আফগানরা এতদিন অভ্যস্ত ছিল, তার মোহ কাটিয়ে নূতন পথে তাকে চলতে শেখানোর অভিযান। মুস্তাফা কামাল পাশাকেই তাঁর আদর্শ বলে আমানুল্লা মেনে নিয়েছিলেন সেটা বেশ বোঝা যায়; অনেক ব্যাপারেই তিনি কামালকে অনুসরণ করতে চেষ্টা করলেন—আফগানদের তিনি কোট প্যাণ্টলুন এবং সাহেবী টুপি পরালেন, দাড়ি কামাতে পর্যন্ত বাধ্য করলেন তাদের। কিন্তু মুস্তাফা কামালের বিশেষত্ব যে দৃঢ়তা বা কর্মক্ষমতা, আমানুল্লার সেটা ছিল না। কামাল পাশা দেশময় সংস্কারের ঝড় বইয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু সে চেষ্টা শুরু করবার আগে তিনি দেশের মধ্যে এবং দেশের বাইরে উভয়ত্রই তাঁর নিজের আসন সম্পূর্ণ দৃঢ় করে নিয়েছিলেন। তাছাড়া তাঁর পিছনে ছিল একটি সুদক্ষ এবং অভিজ্ঞ সেনাবাহিনী; দেশের সমস্ত লোকের মনেও তাঁর প্রতি একটা প্রচণ্ড শ্রদ্ধা ছিল। আমানুল্লা এ-সব কোনো ব্যবস্থাই করলেন না, সোজা এগিয়ে চললেন। কামালের তুলনায় তাঁর কাজও ছিল অনেক বেশি কঠিন, কারণ তুর্কিদের তুলনায় আফগানরা ছিল অনেক বেশি সেকেলে।

 কাজ ঘটে যাবার পর অবশ্য বিজ্ঞের মতো উপদেশ সবাই দিতে পারে। আমানুল্লার অভিযানের সেই প্রথম কটি বছর মনে হল যেন তিনি যা দিয়ে যা করবেন তাইই হয়ে যাবে। বহু আফগান ছেলে ও মেয়েকে তিনি লেখাপড়া শিখতে ইউরোপে পাঠিয়ে দিলেন। শাসনব্যাপারেও বহু সংস্কার তিনি ঘটাতে আরম্ভ করলেন। প্রতিবেশী রাজাদের সঙ্গে এবং তুরস্কের সন্ধে সন্ধিস্থাপন করে তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে তাঁর আসন দৃঢ় করে নিলেন। সোভিয়েট রাশিয়া ভেবেচিন্তেই চীন থেকে তুরস্ক পর্যন্ত প্রাচ্য জগতের সমস্ত দেশের প্রতি— একটা খুব উদার এবং বন্ধুত্বের নীতি অবলম্বন করেছিল; তুরস্ক এবং পারশ্য বিদেশীর কবল থেকে মুক্তি অর্জন করল, তার মধ্যেও সোভিয়েটের এই বন্ধুত্ব এবং সাহায্যের হাত ছিল অনেকখানি। ১৯১৯ সনে ইংলণ্ডের সঙ্গে অল্পদিনমাত্র যুদ্ধ করেই আমানুল্লা অতি সহজে তাঁর উদ্দেশ্য সিদ্ধ করে নিয়েছিলেন, তারও মূলে নিশ্চয়ই একটা বড়ো কারণ ছিল এই সোভিয়েটের বন্ধত্ব। এর পরবর্তী কয়েকটি বছরের মধ্যে সোভিয়েট রাশিয়া, তুরস্ক, পারশ্য আর আফগানিস্তান, এই চারটি দেশের মধ্যে পরপর অনেকগুলো সন্ধি এবং মৈত্রী স্থাপিত হল। এদের চারজনের মধ্যে একত্র, বা কোনো তিনজনকে নিয়ে একত্র কোন সন্ধি হয় নি। প্রত্যেকেই অন্য তিনজনের সঙ্গে আলাদা আলাদা সন্ধি করেছে, সন্ধির শর্ত যদিও মোটামুটি প্রায় সকলের বেলাই এক। এইভাবে মধ্য-প্রাচ্যে একটা সন্ধির জাল তৈরি হয়ে গেল, তার ফলে এর প্রত্যেকটি দেশেরই শক্তি বেড়ে গেল। এই সন্ধিগুলোর এবং কোন সন্ধি কবে হয়েছিল, তার তারিখের একটা তালিকা আমি তোমাকে দিচ্ছি:


তুর্কি-আফগান
সোভিয়েট-তুর্কি
তুর্কি-পারশ্য
সোভিয়েট-আফগান
সোভিয়েট-পারশ্য
পারশ্য-আফগান

সন্ধি
"
"
"
"
"
















১৯শে ফেব্রুয়ারি,
১৭ই ডিসেম্বর,
২২শে এপ্রিল,
৩১শে আগস্ট,
১লা অক্টোবর,
২৮শে নভেম্বর,

১৯২১
১৯২৫
১৯২৬
১৯২৬
১৯২৭
১৯২৭


 এই সন্ধিগুলো হল আসলে সোভিয়েটের কূটনীতিরই ফলে; তার পক্ষে এটা একটা প্রকাণ্ড জয়লাভ। মধ্য-প্রাচ্যে ব্রিটিশের প্রতিপত্তিও এর ফলে প্রচণ্ড একটা আঘাত খেল। বলাই বাহুল্য, ব্রিটিশ সরকার এই-সব সন্ধি সম্বন্ধে ঘোরতর আপত্তি প্রকাশ করলেন; সোভিয়েট রাশিয়ার প্রতি আমানুল্লার প্রীতি এবং আকর্ষণ তাঁরা বিশেষভাবেই অপছন্দ করলেন।

 ১৯২৮ সনের গোড়ার দিকে আমানুল্লা এবং রাণী সৌরিয়া আফগানিস্তান ছেড়ে ইউরোপ-ভ্রমণে বার হলেন। ইউরোপের অনেক দেশের রাজধানীতেই গেলেন তাঁরা—রোম, প্যারিস, লণ্ডন, বার্লিন, মস্কো। প্রত্যেক জায়গাতেই তাঁরা বিপুল অভ্যর্থনা লাভ করলেন। দেখা গেল প্রত্যেক দেশই আমানুল্লার সঙ্গে সদ্ভাব-স্থাপন করতে ব্যগ্র, নিজের বাণিজ্যের এবং রাজনৈতিক প্রয়োজনের গরজে। বহু মূল্যবান উপহারও এঁদের কাছে তিনি পেলেন। কিন্তু আমানুল্লা কূটনীতিজ্ঞ ব্যক্তির মতোই চুপ করে রইলেন, কারও কোনো কথায় ধরা-ছোঁওয়া দিলেন না। দেশে ফিরবার পথে তিনি তুরস্ক আর পারশ্য দেশ বেড়িয়ে এলেন।

 আমানুল্লার দীর্ঘ দেশভ্রমণ অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। আমানুল্লার সম্মান-প্রতিপত্তি এতে অনেক বাড়ল। কিন্তু আফগানিস্তানের মধ্যে অবস্থা বিশেষ ভালো যাচ্ছিল না। দেশে অতি বৃহৎ রকমের সব পরিবর্তন ঘটানো হচ্ছে, লোকের জীবনযাত্রার প্রাচীন পদ্ধতিটাই তার ফলে ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে—এমন একটা সংকট-মুহূর্তে দেশ ছেড়ে বাইরে গিয়ে আমানুল্লা প্রকাণ্ড একটা অন্যায় দুঃসাহসের কাজ করেছিলেন। এই ঝুঁকি মুস্তাফা কামাল কখনও নেন নি। দীর্ঘকাল আমানুল্লা দেশের বাইরে গিয়ে রইলেন; দেশের মধ্যে যেখানে যত প্রগতি-বিরোধী লোক ছিল, তাঁর যত বিরুদ্ধ পক্ষ ছিল, তাঁর সেই অনুপস্থিতির সুযোগে তারা সবাই ধীরে ধীরে মাথা উঁচু করে জেগে উঠল। দেশে নানা রকমের চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্র শুরু হল; আমানুল্লাকে অশ্রদ্ধেয় প্রমাণ করবার জন্য নানারকমের গুজব রটানো হতে লাগল। বেশ বোঝা গেল, আমানুল্লার বিরুদ্ধে এই প্রচারকার্য চালাবার জন্য রাশি রাশি টাকা জলস্রোতের মতো এসে হাজির হচ্ছে; কিন্তু কোথা থেকে সে টাকা আসছে তা কেউ জানে না। বহু মোল্লা বা পুরোহিত এই কাজের জন্য রীতিমতো টাকা পেতে লাগল, দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এরা প্রচার করতে লাগল, আমানুল্লা কাফের, ধর্মদ্রোহী। গ্রামে গ্রামে রাণী সৌরিয়ার অদ্ভুত সব ছবি হাজারে হাজারে বিলানো হতে লাগল—তার কোনটাতে তিনি ইউরোপীয় সান্ধ্য—পরিচ্ছদ প’রে রয়েছেন, কোনোটাতে বা শুধু একটা ঢিলে অন্তর্বাস মাত্র তাঁর পরনে—এই ছবি দিয়ে লোককে বোঝানো হতে লাগল, কী রকম অশোভন শালীনত্ব-হীন পোশাক প’রে তিনি বাইরে বেড়াচ্ছেন। এই বহুল ব্যাপক এবং বহু বায়সাধ্য প্রচারকার্য চালাচ্ছিল কে? আফগানদের এ চালাবার মতো টাকাও ছিল না, শিক্ষাও ছিল না—তারা শুধু হয়েছিল এই বস্তু গলাধঃকরণ করবার যোগ্য পাত্র। মধ্য-প্রাচ্যের এবং ইউরোপের অনেক লোকই তখন বিশ্বাস করত এবং বলত, এই প্রচারকার্যের পিছনে রয়েছে ব্রিটিশ গুপ্তচর বিভাগ। এ-সব ব্যাপার অবশ্য কোনোদিনই প্রমাণ করা যায় না; এই কাজের সঙ্গে ব্রিটিশদের সংশ্রব প্রমাণ করা যেতে পারে এমন কোনো নিশ্চিত অভিজ্ঞানও তখন পাওয়া যায় নি। কিন্তু শোনা যায় নাকি আফগান বিদ্রোহীরা সজ্জিত ছিল ব্রিটিশ রাইফেল দিয়েই। সে যাই হোক, আফগানিস্তানে আমানুল্লার প্রতিষ্ঠা নষ্ট করে ফেলাতে ইংলণ্ডের স্বার্থ আছে, একথাটা তখন স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল।

 আফগানিস্তানে যখন তাঁর পায়ের তলায় মাটি এমনি করে ধ্বসিয়ে ফেলা হচ্ছে, আমানুল্লা তখন ইউরোপের রাজধানীতে রাজধানীতে বিরাট রকমের অভ্যর্থনা নিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। তাঁর সংকল্পিত সংস্কার সাধনের জন্য নূতন উদ্যমে ভরপুর হয়ে তিনি দেশে ফিরে এলেন, নূতন নূতন কল্পনায় তাঁর মন ভরা; আঙ্গোরাতে কামাল পাশার সঙ্গে এবার তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে, তাঁর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে এসেই তিনি সেই সব নূতন সংস্কার প্রবর্তনের আয়োজনে লেগে গেলেন। উচ্চবংশীর সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের যে-সব পুরুষানুক্রমিক পদবী ছিল সেগুলো তুলে দিলেন; মোল্লা-মৌলবী ইত্যাদি ধর্মগুরুদের ক্ষমতা কমিয়ে দিতে চেষ্টা করলেন। শাসনকার্যের জন্য প্রজার কাছে দায়ী একটা মন্ত্রিপরিষৎ বা ক্যাবিনেট পর্যন্ত গড়তে চাইলেন, যদিও তা করার মানেই ছিল তাঁর নিজের স্বৈরতন্ত্রী ক্ষমতাকে অনেকখানি খর্ব করা। নারীদের মুক্তির ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে বাড়িয়ে তুলতে লাগলেন।

 আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিল, অকস্মাৎ একদিন সে আগুন একেবারে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল—১৯২৮ সনের শেষদিকে দেশে বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেল। বিদ্রোহ ক্রমে দেশময় ছড়িয়ে পড়ল, বাচ্চা-ই-সাকো নামক একজন সাধারণ ভিস্তিওয়ালা তার নেতা। ১৯২৯ সনে বিদ্রোহীরা জয়লাভ করল। আমানুল্লা এবং রাণী সৌরিয়া দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেন; ভিত্তিওয়ালা বাচ্চা-ই-সাকো এবার আমীর হয়ে বসল। পাঁচ মাস ধরে বাচ্চা-ই-সাকো কাবুলে রাজত্ব করল; তার পর তাঁকে আবার সরিয়ে দিলেন নাদির খাঁ—আমানুল্লার তিনি ছিলেন একজন সেনাপতি এবং মন্ত্রী। নাদির খাঁ নিজের তরফ থেকেই লড়ছিলেন; জয়লাভ করবার পরে তিনি নিজেই দেশের রাজার আসনে উঠে বসলেন, তাঁর নাম হ’ল নাদির শা। দেশে পুনঃ পুনঃ গোলযোগ ও বিশৃঙ্খল ঘটনা ঘটতে লাগল, কিন্তু নাদির শার রাজত্বও চলতে লাগল, যেহেতু তিনি ইংলণ্ডের মিত্র ছিলেন এবং তার কাছ থেকে সাহায্য পেলেন। ব্রিটিশ গভর্নমেণ্ট তাঁকে অনেক টাকা বিনাসুদে ধার দিল এবং রাইফেল ও গোলাবারুদ সরবরাহ করেও সাহায্য করল। আফগানিস্তানের বিশৃঙ্খল অবস্থার জন্যে দায়ী অনেকটা তার ভৌগোলিক অবস্থান—দুটি প্রবল প্রতিবাদী সাম্রাজ্যের মাঝখানে প্রাচীরের মতো সে দাঁড়িয়ে আছে।[]

 আফগানিস্তান, পশ্চিম এশিয়া এবং দক্ষিণ-এশিয়ার কথা আমার বলা শেষ হল। এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে সম্প্রতি কতকগুলো ব্যাপার ঘটেছে, এবার আমি তার কথা সংক্ষেপে বলে এই চিঠিটা শেষ করে দেব।

 ব্রহ্মদেশের পূবদিকে আছে শ্যাম—পৃথিবীর এই অঞ্চলে একমাত্র এই দেশটিই, আজ পর্যন্ত তার স্বাধীনতা বজায় রাখতে পেরেছে। দেশটি রয়েছে ব্রিটিশ ব্রহ্মদেশ আর ফরাসি-ইন্দোচীনের মাঝখানে চাপ খেয়ে। প্রাচীন ভারতীয় রীতির স্মৃতিতে দেশটি পরিপূর্ণ; এর প্রাচীন রীতিনীতি সংস্কৃতি এবং উৎসব অনুষ্ঠানে আজও প্রাচীন ভারতের ছাপ স্পষ্ট। অল্পদিন আগেও শ্যামে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল, সামাজিক ব্যবস্থায় সামন্তনীতির অনেকখানিই সাক্ষাৎ মিলত, ছোটো একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণীও ক্রমে গড়ে উঠছিল। এর রাজাদের নাম বোধ হয় প্রায়ই হত ‘রাম’ দিয়ে; এই নামটা দেখেও ভারতবর্ষের কথা মনে পড়ে যায়। প্রথম রাম, দ্বিতীয় রাম, ইত্যাদি নামের রাজারা এখানে রাজত্ব করে গেছেন। বিশ্বযুদ্ধের সময়ে যখন দেখা গেল মিত্রপক্ষের জয় প্রায় নিশ্চিত হয়েই উঠেছে, তখন শ্যাম গিয়ে মিত্রপক্ষের সঙ্গে যোগ দিল; পরে সে জাতি-সঙ্ঘের সভ্য হয়ে গেল।

 ১৯৩২ সনের জুনমাসে শ্যামের রাজধানী ব্যাংকক শহরে একটা প্রাসাদ-বিপ্লব ঘটল, যার ফলে স্বেচ্ছাচারমূলক শাসনতন্ত্রের অবসান হল এবং শ্যাম পিপলস্ পার্টির (বা শ্যাম-প্রজা-সমিতির) কর্তৃত্বাধীনে প্রজাতান্ত্রিক শাসন শুরু হল। লুয়াঙ্ প্রাদিত নামে জনৈক আইনব্যবসায়ীর নেতৃত্বে শ্যামের একদল তরুণ সেনানী ও অপর কয়েকজন মিলে রাজা, রাজপরিবার এবং রাজ্যের মুখ্য মন্ত্রীদের বন্দী করে ফেলল এবং রাজ-প্রজাধিপককে একটি শাসনতন্ত্র গ্রহণ করতে বাধ্য করল। এর ফলে রাজার ক্ষমতা হ্রাসপ্রাপ্ত হল এবং জনগণের নির্বাচিত ব্যবস্থাপরিষদের সৃষ্টি হল। এই পরিবর্তনের পশ্চাতে জনগণের সমর্থন ছিল বটে, কিন্তু এটা গণবিপ্লবের ফলে ঘটেনি। তরুণ-তুর্কিদল যেভাবে সুলতান আবদুল হামিদের স্বেচ্ছাচার দূর করেছিল, শ্যামের এই ব্যাপারটাও অনেকটা তার মতোই। রাজা খুব চটপট করে এদের দাবি স্বীকার করে নিলেন বলেই সংকটের অবসান হয়ে গেল বটে, কিন্তু রাজা যে অত তাড়াতাড়ি পরিবর্তনটা মেনে নিলেন তার মধ্যে তাঁর আন্তরিকতা ছিল না। ১৯৩৩ সনের এপ্রিল মাসে রাজা হঠাৎ প্রজা-পরিষৎ ভেঙ্গে দিলেন ও লুয়াঙ্ প্রাদিতকে নির্বাসিত করলেন। দুমাস বাদে আরেকটি আকস্মিক বিপ্লব ঘটল এবং প্রজা পরিষৎ আবার মাথা জাগিয়ে উঠল। শ্যামের এই নূতন সরকার ইংলণ্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করে নি, বরং জাপানের প্রতি তারা বেশী আকৃষ্ট।[]

 শ্যামের পূর্বদিকে ফরাসি ইন্দো-চীন, সেখানেও জাতীয়তাবাদ বিস্তার লাভ করছে, দিন দিন তার শক্তি বাড়ছে। ফরাসি সরকার এই জাতীয়তাবাদকে পিষে মারতে চেষ্টা করছেন, বহু ষড়যন্ত্র মামলা খাড়া করেছেন, অসংখ্য লোককে দীর্ঘকাল কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। ১৯৩৩ মনের মার্চ মাসে জেনেভাতে নিরস্ত্রীকরণ-সম্মেলনের একটি বৈঠক হয়; এই সভাতে ফরাসি প্রতিনিধি যে উক্তি করেন তাই থেকেই এর চমৎকার প্রমাণ পাওয়া যায়। এই প্রতিনিধিটির নাম মঁসিয়ে সারাউ, ইনি নিজেই এককালে ফরাসি ইন্দো-চীনের গভর্নর ছিলেন। বক্তৃতাপ্রসঙ্গে তিনি বললেন, “অধীনস্থ উপনিবেশগুলিতে জাতীয়তাবাদ ক্রমেই বেড়ে উঠছে, এই-সব দেশ শাসন করা দিন দিন অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠছে।” প্রমাণ স্বরূপ তিনি ফরাসি ইন্দো-চীনের দৃষ্টান্ত দেখান—সেখানে এখন শান্তিরক্ষার জন্য ১০,০০০ সৈন্য মোতায়েন রাখতে হচ্ছে; তিনি যখন সেখানে গভর্নর ছিলেন তখন সৈন্য রাখা হত মাত্র ১,৫০০।

 সকলের শেষে জাভার কথা বলছি। জাভা হচ্ছে ওলন্দাজ পূর্ব-ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত দেশ। চিনি আর রবারের জন্য প্রসিদ্ধ; আবার এর বাগিচা ও ক্ষেতগুলোতে মজুরদের উপরে যে ভয়ংকর শোষণ চালানো হত, তার জন্যও জায়গাটি প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। ভারতবর্ষের মতো এখানেও জাতীয়তাবাদ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অল্পখানিকটা শাসন-সংস্কার এসেছে, আবার তারই সঙ্গে সঙ্গে এসেছে অনেকখানি দমন-ব্যবস্থা। জাভাবাসীদের অধিকাংশই মুসলমান। বিশ্বযুদ্ধ ও তৎপরবর্তী সময়ে পশ্চিম এশিয়াতে যে-সব ঘটনা ঘটেছে তাতে এরা প্রভাবিত হয়েছিল এবং তারা ভারতের অসহযোগ আন্দোলনের প্রতিও সহানুভূতিশীল ছিল। ১৯১৬ সনে ওলন্দাজ-সরকার জাভাবাসীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা শাসন-সংস্কার করবে এবং বাটাভিয়াতে জন-পরিষৎ স্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু এই পরিষদের সভ্যগণ অধিকাংশই মনোনীত ছিল এবং তাদের হাতে অতি সামান্যই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, তাই ইহার বিরুদ্ধে আন্দোলন চলতে লাগল। ১৯২৫ সনে এক নূতন শাসনতন্ত্র চালু করা হল, কিন্তু তাতেও বিশেষ সুফল পাওয়া গেল না, কারণ জনগণ সন্তুষ্ট হল না। জাভা ও সুমাত্রাতে ধর্মঘট ও ঘরোয়া মারামারি হল। ১৯২৭ সনে ওলন্দাজদের বিরুদ্ধে একটা বড়ো বিদ্রোহ হয়েছিল, সে বিদ্রোহ অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়। সে যা হোক, জাতীয় আন্দোলন এগিয়ে যেতে লাগল। গঠনমূলক কর্মক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদীগণ গড়ে তুললেন বহু জাতীয় বিদ্যালয় এবং ভারতের অনুকরণে, কুটীরশিল্প ও কারিগরিবিদ্যা প্রসারে উৎসাহ দিতে লাগলেন। স্বাধীনতার সংগ্রাম এখনও চলছে। জাভার শর্করা-শিল্পের খুব ক্ষতি হয়েছে, তার কারণ সারা পৃথিবীর অর্থনৈতিক সংকট ও গুরু সংরক্ষণ কর ধার্যের দরুন বহির্বাণিজ্যের ক্ষেত্র-সংকোচন।

 জাভার পূর্বদিকের সমুদ্রে ১৯৩৩ সালের প্রথম ভাগে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে গেছে। ওলন্দাজদের একখানা যুদ্ধ জাহাজের নাবিকদের বেতন কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল; প্রতিবাদ হিসাবে তারা জাহাজখানাকেই দখল করে নিল, জাহাজ খুলে বন্দর থেকে চলে গেল। জাহাজের কোনো ক্ষতি কিন্তু তারা করল না; পরিষ্কার বুঝিয়ে দিল তারা শুধু তাদের মাইনেটা ঠিক করে নেবার জন্যই এ-সব করছে। এ একরকমের উগ্র ধর্মঘট বিশেষ। অতএব তখন ওলন্দাজ এরোপ্লেনরা গিয়ে সে যুদ্ধজাহাজটির উপরে বোমাবর্ষণ করল, নাবিকদের বহু লোককে মেরে ফেলল, এবং এইভাবে জাহাজ আবার দখল করে আনল।

 এশিয়ার সর্বত্রই সেই একই গল্পের চিরন্তন পুনরাবৃত্তি—জাতীয়তাবাদ আর সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে সংগ্রাম। এবার এশিয়া ছেড়ে আমরা ইউরোপে যাব—ইউরোপকে দেখা আমাদের দরকার হয়ে উঠেছে। যুদ্ধোত্তর যুগে ইউরোপের অবস্থা নিয়ে আমরা এখনও আলোচনা করিনি; অথচ এখনও সমস্ত পৃথিবীর অবস্থা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ইউরোপের অবস্থা থেকেই। অতএব এর পরের কয়েকখানা চিঠিতে আমি ইউরোপের কথাই বলব।

 এশিয়ার দুটি অংশের কথা এখনও বলতে বাকি আছে, দুটি বৃহৎ দেশের কথা—চীন দেশ, আর তার উত্তরে সোভিয়েটের দেশ। পরে একসময়ে আমরা এদের সম্বন্ধে আলোচনা করব।

  1. ১৯৩৩ সালের নভেম্বর মাসে নাদির শা আততায়ীর হস্তে নিহত হন এবং তাঁর তরুণ পুত্র উত্তরাধিকারসূত্রে সিংহাসন পেলেন—তাঁর নাম হল রাজা নাহির শা।
  2. ১৯৩৩ সনের অক্টোবর মাসে নরম-পন্থীদের একটা বিদ্রোহ হয়েছিল কিন্তু সেটাকে দমন করা হল এবং লুয়াঙ্ প্রাদিতের নেতৃত্বেই শাসন চলতে লাগল।