বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ
১৩৭
আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ
২৭শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৩
প্রাচীন জগতের অসংখ্য যুদ্ধবিগ্রহ আর কূটকৌশল, রাজস্ব আর বিপ্লব, দ্বেষ-কলহ আর জাতীয়-সংগ্রাম, ইত্যাদি নিয়ে আমরা অনেক সময় ব্যয় করেছি। এবার চলো, আটলাণ্টিক মহাসাগর পার হয়ে চলে যাই নূতন জগৎ আমেরিকায়; দেখি, ইউরোপের বিশ্বগ্রাসী কবল থেকে মুক্তিলাভ করবার পরে তার দশাটা কী দাঁড়াল। বিশেষ করে আমরা মনোযোগ দিয়ে দেখব যুক্তরাষ্ট্রের কাহিনীকে। অতি ক্ষুদ্র আকারে তার আরম্ভ হয়েছিল; সেই থেকে ক্রমাগত বড়ো হয়ে উঠতে উঠতে আজ সে পৃথিবীর মধ্যেই প্রায় সেরা দেশ হয়ে উঠেছে। জগতের শ্রেষ্ঠ জাতির গৌরব ইংলণ্ডের হস্তচ্যুত হয়েছে; এখন আর সে পৃথিবীকে টাকা ধার দেয় না—ইউরোপের অন্যান্য সমস্ত দেশের মতো সেও এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে খাতক; ‘দয়া করে একটু আমার কথাটা বিবেচনা করো’, বলে আমেরিকার কাছে কাকুতিমিনতি করতে হচ্ছে তাকে। জগতের মহাজনের আসনে এখন বসেছে আমেরিকা। পৃথিবীর সর্বত্র থেকে জলস্রোতের মতো ধনস্রোত এসে তার ঘরে উঠছে; এত অগুন্তি লক্ষপতি আর কোটিপতি সে দেশে নিত্য গজিয়ে উঠছে, সে এক আশ্চর্য ব্যাপার। কিন্তু প্রাচীন কালের সেই রাজা মিডাসের গল্প জান তো, তাঁরই মতো আমেরিকাও দেবতার বর পেয়েছে, যা সে ছোঁয় তাই সোনা হয়ে যায়; কিন্তু মিডাসের মতোই সে বর পেয়ে তার শান্তি বাড়ে নি, এত অসংখ্য লক্ষপতি থাকা সত্ত্বেও তার সাধারণ লোকেরা অভাবে আর দারিদ্র্যে জর্জরিত হয়ে রয়েছে।
১৭৭৫ সনে সমদ্রতীরবর্তী তেরোটি রাজ্য ইংলণ্ডের অধীনতা থেকে স্বাধীন হয়ে যায়। তখন তাদের মোট লোকসংখ্যা ছিল চল্লিশ লক্ষেরও অনেক কম। আজকের দিনে এক নিউইয়র্কশহরেরই লোকসংখ্যা প্রায় আশি লক্ষ; সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রের লোকসংখ্যা হচ্ছে সাড়ে-বারো কোটি। এখন আরও অনেক নূতন রাজা এই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এসে যোগ দিয়েছে; সমস্ত মহাদেশটা পার হয়ে একেবারে প্রশান্ত মহাসাগরের তীর পর্যন্ত গিয়ে এর এলাকা পৌঁচেছে। এই বিরাট দেশটি, এর এই শ্রীবৃদ্ধি ঘটল ঊনবিংশ শতাব্দীতে—কেবল আয়তনে আর লোকসংখ্যায় নয়, আধুনিক কলকারখানা, বাণিজ্য, ধনসম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, সমস্ত দিক দিয়েই সে শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে। এই রাজ্যগুলোকে অনেক বাধা, অনেক বিপত্তি অতিক্রম করতে হয়েছে; ইউরোপের সঙ্গেও অনেক যুদ্ধ, অনেক মন-কষাকষি এদের হয়েছে; কিন্তু সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষা যেটি এদের উত্তীর্ণ হতে হয়েছিল সে হচ্ছে নিজেদের মধ্যেই একটা অত্যন্ত হিংস্র এবং সর্বনাশা গৃহযদ্ধ; এর এক দিকে ছিল উত্তর অঞ্চলের রাজ্যগুলি, আর-এক দিকে ছিল দক্ষিণ অঞ্চলের রাজ্যগুলি।
আমেরিকা স্বাধীন হয়ে যাবার অল্প কয়েক বছর পরেই হল ফ্রান্সের বিপ্লব, তার পর এল নেপোলিয়নের যুদ্ধ। নেপোলিয়ন এবং ইংলণ্ড, দুজনেই পরস্পরের বাণিজ্যকে নষ্ট করতে চেষ্টা করলেন, এবং তাই করতে গিয়ে দুজনেরই আমেরিকার সঙ্গে ঠোকাঠুকি লাগল। সমুদ্রের পরপারে আমেরিকার যে বাণিজ্য ছিল তা একেবারে বন্ধ হয়ে গেল; অতএব ১৮১২ সনে ইংলণ্ডের সঙ্গে আবার তার যুদ্ধ বাধল। দু বছর ধরে যুদ্ধ চলল, কিন্তু ফল প্রায় কিছুই হল না। এই যুদ্ধ চলতে চলতেই নেপোলিয়ন এল্বায় নির্বাসিত হলেন, ইংলণ্ডের একটু ফুরসৎ মিলল। তখন তারা আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন-শহর দখল করল, করে তার সমস্ত বড়ো বড়ো সরকারি ইমারত আগুনে পুড়িয়ে নষ্ট করে দিল; ক্যাপিটাল নামে যে বাড়িটিতে কংগ্রেসের অধিবেশন হয়, এবং হোয়াইট হাউজ বলে যে বাড়িটিতে প্রেসিডেণ্টরা বাস করেন, এগুলিও এই ধ্বংসলীলার হাত এড়াল না। শেষ পর্যন্ত কিন্তু ব্রিটিশরাই যুদ্ধে হেরে গেল।
এই যুদ্ধের আগেই দক্ষিণ অঞ্চলের বেশ বড়ো একটি এলাকা যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত হয়ে গিয়েছিল। এটা হচ্ছে ফ্রান্সের পুরোনো উপনিবেশ লুইসিয়ানা; ব্রিটিশ নৌবহরের আক্রমণ থেকে একে রক্ষা করতে পারছিলেন না বলে নেপোলিয়ন এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বেচে দেন। এর কয়েক বছর পরে, ১৮২২ সনে, যুক্তরাষ্ট্র ফ্লোরিডা-রাজ্যটি স্পেনের কাছ থেকে কিনে নিল। ১৮৪৮ সনে মেক্সিকোর সঙ্গে তার যুদ্ধ হল; সেই যুদ্ধ জয়ের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে ক্যালিফোর্নিয়া প্রভৃতি কয়েকটি রাজ্য তার অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। দক্ষিণ-পশ্চিম-অঞ্চলের অনেকগুলি শহরের স্প্যানিশ নাম আজ পর্যন্ত বজায় রয়েছে; একদা স্পেনবাসীরা বা স্প্যানিশ-ভাষী মেক্সিকানরা সেখানে রাজত্ব করত, তারই এটা স্মৃতিচিহ্ন। সিনেমা-শিল্পের জন্য বিখ্যাত বিরাট নগরী লস এঞ্জেল্স্, সানফ্রান্সিস্কো—এসব নাম কে না শুনেছে।
ইউরোপে যখন বারবার করে বিদ্রোহ আর বিদ্রোহ দমনের চেষ্টা চলেছে, যুক্তরাষ্ট্র তখন ক্রমাগত পশ্চিমের দিকে বিস্তৃত হয়ে চলছিল। ইউরোপে পীড়ননীতির ফলে বহু লোক সেখান থেকে পালিয়ে আসতে লাগল; আমেরিকায় অফুরন্ত জমি আর প্রচুর বেতন মেলে, এই গল্প শুনেও ইউরোপের সমস্ত দেশ থেকে বহু লোক আমেরিকায় এসে হাজির হল। পশ্চিম-অঞ্চলের দিকে লোকসংখ্যা বিস্তৃত হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই নূতন নূতন রাজ্য গড়ে উঠল, এরাও যুক্তরাষ্ট্রেরই শামিল হয়ে রইল।
উত্তর আর দক্ষিণ অঞ্চলের রাজ্যগুলোর মধ্যে প্রথম থেকেই অনেকগুলি তফাত ছিল। উত্তর-অঞ্চলটা ছিল শিল্পপ্রধান, সেখানে নূতন যুগের কলকারখানা দ্রুতবেগে বেড়ে উঠল; দক্ষিণ-অঞ্চলে ছিল বড়ো বড়ো কৃষি আর বাগান, সেখানে ক্রীতদাস খাটিয়ে কাজ হত। দেশের আইনে তখন ক্রীতদাস-প্রথা অন্যায় নয়; কিন্তু উত্তর-অঞ্চলের লোকেরা প্রথাটা পছন্দ করত না, এর চলনও সেখানে বিশেষ ছিল না। দক্ষিণ অঞ্চলের কাজ-কারবার সমস্তই চলত ক্রীতদাস দিয়ে। ক্রীতদাসরা ছিল অবশ্য আফ্রিকা থেকে আনা নিগ্রো। শাদা চামড়ার লোক কেউ ক্রীতদাস ছিল না। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল—‘সমস্ত মানুষই এক সমান হয়ে জন্মায়’—কিন্তু এ কথাটা প্রযোজ্য ছিল শ্বেতকায়দের সম্বন্ধে; কৃষ্ণকায়দের সম্বন্ধে নয়।
আফ্রিকা থেকে এই ক্রীতদাসদের যেভাবে ধরে আনা হত সে অতি করুণ কাহিনী। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম থেকেই দাস-ব্যবসায় শুরু হয়; ১৮৬৩ সন পর্যন্ত আমেরিকায় নিয়মিতভাবে ক্রীতদাসের চালান আসত। প্রথম দিকে দাস আসত মাল-টানা জাহাজে করে; আফ্রিকার পশ্চিম-উপকূল ধরে যেসব জাহাজ মাল নিয়ে চলাচল করত, সুযোগ পেলেই তারা আফ্রিকার লোক ধরে আনত, এনে তাদের আমেরিকায় নিয়ে বিক্রি করত। এই উপকূলটির খানিকটা অংশকে এখনও ক্রীতদাসের উপকূল বলা হয়। আফ্রিকানদের নিজেদের মধ্যে দাসত্বের চলন বিশেষ ছিল না; যুদ্ধে যারা বন্দী হয়েছে বা মহাজনের দেনা যারা শোধ করতে পারে নি, শুধু সেইরকম লোককেই সেখানে দাসত্ব করতে হত। কিন্তু দেখা গেল, এইভাবে আফ্রিকানদের ধরে ধরে আমেরিকায় নিয়ে গিয়ে দাস বলে বিক্রি করাটা খুবই লাভের ব্যবসা। দাস-ব্যবসায় কাজেই বেড়ে চলল; প্রধানত ব্রিটিশ, স্প্যানিশ এবং পর্তুগিজরাই এটাকে ব্যবসায় বলে গ্রহণ করেছিল। এর জন্যে বিশেষ রকমের জাহাজ তৈরি হত, তার নাম ছিল দাস বাণিজ্যের জাহাজ। এই জাহাজে থাকত একের পর এক করে অনেক প্রস্থ ঘনঘন পাটাতন; প্রতি দুই প্রস্থের ফাঁকে ফাঁকে বড়ো বড়ো গ্যালারি। এই গ্যালারির মধ্যে বন্দী নিগ্রোদের পাশাপাশি শুইয়ে রাখা হত, তাদের সকলেই শিকলে বাঁধা, আবার পাশাপাশি প্রতি দুজন পায়ে বেড়ি দিয়ে আটকানো। আটলাণ্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় পৌঁছতে জাহাজের অনেক সপ্তাহ, কখনও-বা অনেক মাস লেগে যেত। এই দীর্ঘ কাল ধরে সে নিগ্রোরা এইসব সংকীর্ণ গ্যালারির মধ্যে শুয়েই থাকত, সকলের হাত-পা এক শিকলে বাঁধা; প্রত্যেকের জন্যে মোট যে জাযগার বরাদ্দ ছিল সে হচ্ছে সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা আর ষোলো ইঞ্চি চওড়া!
এই দাস-ব্যবসার জোরেই লিভারপুল একটা বড়ো শহর হয়ে উঠেছিল। অনেক দিন আগের কথা, ১৭৯৩ সনে ইংলণ্ডের সঙ্গে স্পেনের সন্ধি হয়, এর নাম ইউট্রেক্টের সন্ধি। এর দ্বারা ইংলণ্ড স্পেনের কাছ থেকে এই শর্ত আদায় করে নিল, আমেরিকাতে স্পেনের যেসমস্ত উপনিবেশ আছে, আফ্রিকা থেকে সেখানে দাস নিয়ে যাবার অধিকার একমাত্র ব্রিটেনেরই থাকবে। আমেরিকার ইংরেজ
শাসিত অঞ্চলগুলোতে ইংলণ্ড তারও আগে থেকেই দাসের যোগান দিচ্ছিল। এইভাবে অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইংলণ্ড চেষ্টা করল, যেন আমেরিকাতে দাস চালান দেবার ব্যবসাটা সে-ই একচেটিয়া করে নিতে পারে। ১৭৩০ সনে লিভারপুল-বন্দরের ১৫টি জাহাজ এই ব্যবসা চালাত। জাহাজের সংখ্যা বাড়তে লাগল; ১৭৯২ সনে দেখা গেল, লিভারপুলের ১৩২টি জাহাজ দাস-ব্যবসায়ে খাটছে। শিল্পবিপ্লবের যখন প্রথম পত্তন হল তখন ইংলণ্ডের ল্যাংকাশায়ারে সুতো-কাটার কারখানা খুব বেড়ে উঠল। অতএব তখন যুক্তরাষ্ট্রে আরও বেশি ক্রীতদাসের প্রয়োজন হল; কারণ ল্যাংকাশায়ারের কারখানাগুলোতে যে সুতো কাটা হত তার তুলো আসত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অঞ্চলের বড়ো বড়ো বাগানগুলো থেকে। এইসব তুলোর বাগান হু হু করে বেড়ে চলল; আফ্রিকা থেকে ক্রমেই আরও বেশি করে ক্রীতদাস আনা হতে লাগল; গরু-ঘোড়ার মতো নিগ্রো জন্মাবার জন্যেও নানাবিধ চেষ্টা শুরু হল। ১৭৯০ সনে যুক্তরাষ্ট্রে ক্রীতদাসের সংখ্যা ছিল ৬ লক্ষ ৯৭ হাজার; ১৮৬১ সনে এদের সংখ্যা দাঁড়াল ৪০ লক্ষ।
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ব্রিটিশ পার্লামেণ্ট দাস-প্রথা নিষিদ্ধ করে কতকগুলি খুব কঠোর আইন তৈরি করল। ইউরোপ এবং আমেরিকার অন্যান্য দেশও এর দেখাদেখি আইন করল। কিন্তু দাস-ব্যবসায় এইভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যাবার পরও আফ্রিকা থেকে আমেরিকাতে নিগ্রো দাস নিয়ে যাওয়া হতে লাগল। তফাতের মধ্যে শুধু তাদের পথের দুর্দশা আরও বহু গুণ বেড়ে গেল। এখন আর তাদের প্রকাশ্যভাবে নিয়ে যাওয়া চলবে না; সুতরাং তাদের নেওয়া হতে লাগল গোপনে, মানুষের চোখে না পড়ে এমন করে একের পর এক করে আলগো তক্তার পাটাতন সাজিয়ে, তারই ফাঁকে ফাঁকে। একজন আমেরিকান লেখক বলেছেন, “অনেক সময়ে একজন আর একজনের কোলের মধ্যে ঠাসাঠাসি হয়ে থাকত, এর পা ওর পায়ের উপরে গিয়ে পড়ত, ঠিক যেন সবাই মিলে গাদাগাদি হয়ে ঠেলাগাড়িতে চড়েছে।” এর ভীষণতা কতখানি ছিল তা পুরোপুরি আন্দাজ করার শক্ত। এত নোংরা হয়ে এদের থাকতে হত যে চার-পাঁচবার খেপ দেবার পরই জাহাজটাকে অব্যবহার্য বলে ফেলে দিতে হত। কিন্তু তবু এই ব্যবসায়ে লাভ ছিল দারুণ। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগেই এই ব্যবসায় সবচেয়ে জোর চলেছিল; এই সময়টাতে আফ্রিকার দাস-উপকূল থেকে প্রতি বছর অন্যান্য এক লক্ষ করে দাস ধরে নিয়ে আসা হত। আরও একটি কথা মনে রেখো, এই দাসদের ধরে আনা হত গ্রাম লুঠ করে; সুতরাং যে পরিমাণ দাস ধরে আনা হত, তাদের ধরবার জন্যে তাদের চেয়ে আরও অনেক বেশি সংখ্যক লোককে হত্যা করতে হত।
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বা তারই কাছাকাছি সময়ের মধ্যে পৃথিবীর সমস্ত বড়ো বড়ো দেশেই দাস-ব্যবসায়কে বেআইনি বলে ঘোষণা করা হল, যুক্তরাষ্ট্রেও। কিন্তু দাস-ব্যবসায় নিষিদ্ধ হলেও দাস-প্রথা তখনও আমেরিকায় বৈধ বলে প্রচলিত রইল; মানে পুরোনো দাস যারা ছিল তারা তখনও দাসই রইল। এবং দাস-প্রথা বৈধ বলেই, আইনের বারণ সত্ত্বেও দাস-ব্যবসায়ও ঠিক চলতে লাগল। তার পর ব্রিটেনে দাস-প্রথাটাকেই নিষিদ্ধ করে দেওয়া হল। সুতরাং তখন নিউইয়র্কাই হয়ে উঠল দাস ব্যবসায়ীদের মাল খালাস দেবার প্রধান বন্দর।
বহু বৎসর ধরে নিউইয়র্কের বন্দরে এই বাণিজ্য চলতে লাগল—ঊনবিংশ শতাব্দীর একেবারে মাঝামাঝি পর্যন্ত। উত্তর-অঞ্চলের দেশগুলি তখন দাস-প্রথার বিরোধী। দক্ষিণ অঞ্চলের দেশরা কিন্তু তখনও এই দাসদের কিনে নিচ্ছে, তাদের বাগানের জন্যে। অতএব দেখা গেল, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই কতকগুলো রাজ্য দাস-প্রথা বর্জন করেছে, কতকগুলো একে টিঁকিয়ে রেখেছে। অনেক সময় আবার নিগ্রো দাসেরা দাসপ্রথাওয়ালা অঞ্চল থেকে পালিয়ে দাসপ্রথারহিত অঞ্চলে গিয়ে আশ্রয় নিত; তখন আবার তাই নিয়ে লাগত এদের মধ্যে ঝগড়া।
উত্তর এবং দক্ষিণ-অঞ্চলের অর্থনৈতিক জীবন এবং স্বার্থ এক নয়; ১৮৩০ সনেই বাণিজ্যশুল্ক প্রভৃতি নিয়ে দুয়ের মধ্যে ঝগড়া শুরু হল। যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে বাইরে চলে যাবে বলে হুমকি দেখাতে লাগল। রাজ্যগুলো নিজের নিজের অধিকার রক্ষা করতে ব্যস্ত; যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাদের উপর বেশি হস্তক্ষেপ করে এটা তাদের পছন্দ নয়। দেশের মধ্যে দুটো দল দাঁড়িয়ে গেল; এক দল রাজোর সার্বভৌম ক্ষমতার পক্ষপাতী; অন্য হল চায় শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের শাসন। এইসমস্ত ব্যাপারের ফলে উত্তর এবং দক্ষিণ-অঞ্চলের মধ্যে বিরোধ ক্রমেই বেড়ে চলল; নূতন কোনো রাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এসে যোগ দিতে গেলেই প্রশ্ন উঠতে লাগল, সে রাজ্য এদের কোন্ পক্ষে যাবে। দেশের জনাধিক্যই বা কোন দিকে? ইউরোপ থেকে ক্রমাগত লোক আমদানির ফলে উত্তর-অঞ্চলের লোকসংখ্যা দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছে; দক্ষিণ-অঞ্চলের লোকদের ভয় হল, লোকসংখ্যায় উত্তর-অঞ্চল অল্পদিনের মধ্যেই তাদের ছাড়িয়ে চলে যাবে; তার পর আর কোনো ব্যাপারেই তারা ভোটে জিততে পারবে না। এমনি করে উত্তর আর দক্ষিণের মধ্যে শত্রুতার ভাব ক্রমশ বেড়ে চলল।
ইতিমধ্যে উত্তর-অঞ্চলে একটি আন্দোলন শুরু হল, দাস-প্রথাকে একেবারেই তুলে দেওয়া হোক। এর পক্ষে যাঁরা ছিলেন তাঁদের বলা হত ‘বর্জনপন্থী’; এঁদের প্রধান নেতার নাম ছিল উইলিয়াম লয়েড গ্যারিসন। ১৮৩১ সনে গ্যারিসন ‘লিবারেটর’ নামে একটি পত্রিকা বার করলেন, এর লক্ষ্য ছিল তাঁর দাসত্ব-বর্জন আন্দোলনকে সমর্থন করা। পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতেই গ্যারিসন স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন, এই ব্যাপার নিয়ে কোনোরকম আপোষ-মীমাংসা করতে তিনি রাজি নন, এর সম্বন্ধে কোনো কারণেই তিনি নরম পন্থাও স্বীকার করবেন না। পত্রিকার এই সংখ্যাটিতে তাঁর যে প্রবন্ধটি ছিল তার কতকগুলো কথা সর্বত্র বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল; আমি সে কথা ক’টি এখানে উদ্ধৃত করছি:
“আমি সত্যের মতোই কঠোর, ন্যায়বিচারের মতোই নিষ্করুণ হব। এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তায় কথায় বা লেখায় আমি কিছু মাত্র নরমপন্থী হবার ইচ্ছা রাখি না। না! না। যার ঘরে আগুন লেগেছে তাকে বলো খুব আস্তে আস্তে সে লোকজন ডাকুক; বলো তাকে, ধর্ষণকারীর আক্রমণ থেকে তার স্ত্রীকে সে ভদ্রভাবে উদ্ধার করতে যাক: জননীকে বলো, তাঁর শিশু আগুনে পড়ে গিয়েছে, তাকে ধীরে ধীরে একটু একটু করে টেনে তুলন—তবু বর্তমান এই সমস্যাটির মতো একটা কাজে রয়ে-সয়ে অগ্রসর হবার যুক্তি আমাকে দিতে এসো না। এ আমার সমগ্র প্রাণের সাধনা—আমি দ্ব্যর্থক কথা বলব না, কোনো ওজর-আপত্তি তুলব না, এক তিলও পিছনে হটব না—আমার বক্তব্য আমি জগৎকে শোনাবই।”
এঁর মতো এই বীরোচিত নিষ্ঠা কিন্তু অতি অল্প লোকের মধ্যেই ছিল। দাসত্বের বিরোধী যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে অধিকাংশেরই মত ছিল, যেখানে দাস-প্রথা বস্তুত টিঁকে রয়েছে সেখানে তাকে ঘাঁটাতে গিয়ে কাজ নেই। কিন্তু তবুও উত্তর এবং দক্ষিণের মধ্যে বিরোধ বেড়ে চলল; কারণ, সে বিরোধের মূলে ছিল দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরোধ। প্রধানত বাণিজ্যশুল্কের সমস্যাটা নিয়েই এঁদের সে বিরোধ তীব্র হয়ে উঠেছিল।
১৮৬০ মনে আব্রাহাম লিংকন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেণ্ট নির্বাচিত হলেন। সঙ্গে সঙ্গেই দক্ষিণ-অঞ্চল বিদ্রোহ ঘোষণা করল। লিংকন দাসত্বের বিরোধী ছিলেন, কিন্তু এ কথাও তিনি স্পষ্টই বলেছিলেন যে, যেখানে দাস-প্রথা বর্তমান রয়েছে সেখানে এর উপরে হস্তক্ষেপ তিনি করবেন না; তবে নূতন কোনো অঞ্চলে একে বিস্তৃত হতে দিতে, বা আইন করে একে বৈধ বলে স্বীকার করতে তিনি রাজি নন। তাঁর এই আশ্বাসবাক্যে দক্ষিণ-অঞ্চল তৃপ্ত হল না; একটির পর একটি রাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে লাগল। যুক্তরাষ্ট্র ভেঙে পড়বার উপক্রম হল। নূতন প্রেসিডেণ্টের সামনে এই বিষম সমস্যা এসে উপস্থিত হন। দক্ষিণ-অঞ্চলকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিরস্ত করবার, এই ভাঙাচোরাটাকে বন্ধ করবার জন্যে তিনি তখনও আবার চেষ্টা করলেন; দাস-প্রথাকে চলতে দেবেন বলে সব রকমের প্রতিশ্রুতি এঁদের দিলেন। এ পর্যন্ত বললেন, (যেখানে এই প্রথা প্রচলিত রয়েছে সেখানে) একে তিনি রাজ্যের শাসনবিধিবই অন্তর্গত করে দিতে প্রস্তুত আছেন, তা হলেই এটা একেবারে চিরস্থায়ী বস্তু হয়ে যাবে। বস্তুত শান্তিস্থাপনের জন্যে তিনি প্রায় সমস্ত কিছুই করতে প্রস্তুত ছিলেন; কিন্তু একটি বস্তু তিনি কিছুতেই মেনে নিতে রাজি হলেন না, সে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রটাকে ভেঙে খান্ খান্ করে দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাইরে চলে যাবার অধিকার কোনো রাজ্যের আছে, এ কথাটা তিনি কিছুতেই স্বীকার করলেন না।
কিন্তু এত চেষ্টা করেও লিংকন গৃহযুদ্ধকে ঠেকাতে পারলেন না। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভেঙে বেরিয়ে যাবে বলে দক্ষিণ-অঞ্চল দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছে; এগারোটি রাজ্য সত্যিই বেরিয়ে গেল; সীমান্তঅঞ্চলের আরও কয়েকটি রাজ্য এদের প্রতি সহানভূতি দেখাতে লাগল। যে রাজ্যগুলি বেরিয়ে গেল তারা নিজেদের নাম নিল ‘রাজ্য সংঘ’ (Confederate States)। নিজেদের একজন প্রেসিডেণ্টও তারা নির্বাচন করল, তাঁর নাম জেফার্সন ডেভিস। ১৮৬১ সনের এপ্রিল মাসে গৃহযুদ্ধ শুরু হল। দীর্ঘ চারটি বছর ধরে এই যুদ্ধ চলল; কত ভাই নিজের ভাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যুদ্ধে করল, কত বন্ধু নিজের বন্ধুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করল, তার হিসাব নেই। যুদ্ধ চলবার সঙ্গে সঙ্গেই দুই পক্ষে বড়ো বড়ো সেনাবাহিনী গড়ে উঠল। উত্তর-অঞ্চলের অনেকগুলো সুবিধা ছিল; তার লোকসংখ্যা অনেক বেশি, ধনসম্পদও বেশি। সে হচ্ছে কলকারখানা এবং শিল্পের দেশ, তার সহায়সম্পদ অনেক বেশি, রেললাইনও অনেক বেশি। ও দিকে দক্ষিণ-অঞ্চলের সেনা আর সেনাপতিরা ছিল অনেক ভালো; বিশেষ করে জেনারেল লী খুবই বড়ো সেনাপতি ছিলেন। প্রথম দিকের সমস্ত যুদ্ধেই দক্ষিণ অঞ্চলের জয় হল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ অঞ্চল লড়াই চালাতে পারল না। ইউরোপের বাজারের সঙ্গে দক্ষিণ-অঞ্চলের সমস্ত যোগাযোগ উত্তর-অঞ্চলের নৌবহরের বিক্রমে ছিন্ন হয়ে গেল; তার তুলো তার তামাক রপ্তানি করবার আর কোনো পথই রইল না। এর ফলে দক্ষিণ-অঞ্চল একেবারেই দুর্বল হয়ে পড়ল। আবার এরই ফলে কিন্তু ল্যাংকাশায়ারেরও অত্যন্ত দুর্দশা হল, তুলোর অভাবে সেখানে বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। ল্যাংকাশায়ারে অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ল, তাদের কষ্টের আর সীমা রইল না।
এই যুদ্ধে ইংলণ্ডের সহানভূতি মোটের উপর ছিল দক্ষিণ অঞ্চলের দিকে; অন্তত ইংলণ্ডের ধনীশ্রেণীগুলো দক্ষিণ অঞ্চলের পক্ষই সমর্থন করছিলেন। প্রগতিবাদীরা ছিলেন উত্তর-অঞ্চলের সমর্থক।
এই গৃহযুদ্ধের প্রধান কারণ দাস-প্রথা নয়। তোমাকে বলেছি, লিংকন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশ্বাস দিচ্ছিলেন, যেসব জায়গাতে দাস-প্রথা বর্তমান আছে তার সর্বত্রই তিনি একে স্বীকার করে নেবেন। আসলে হাঙ্গামা বাধল উত্তর এবং দক্ষিণ-অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক স্বার্থের বিভিন্নতা থেকে; কোনো কোনো ক্ষেত্রে সে স্বার্থ পরস্পরের বিরোধীও ছিল। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রকে অক্ষুণ্ণ রাখবার জন্যে লিংকনকেই যুদ্ধ করতে হল। যুদ্ধ বাধবার পরেও কিন্তু লিংকন দাস-প্রথা সম্বন্ধে কোনো স্পষ্ট উক্তি করছিলেন না; তাঁর ভয় ছিল, উত্তর অঞ্চলে যারা এই প্রথার পক্ষপাতী তারা এবং সীমান্ত অঞ্চলের রাজাগুলোও পাছে বেঁকে দাঁড়ায়। যুদ্ধ চলবার সঙ্গে সঙ্গে তিনিও ক্রমেই স্পষ্ট কথা বলতে শুরু করলেন। প্রথমে তিনি প্রস্তাব করলেন, সমস্ত দাসকে কংগ্রেস মুক্ত করে দেবে, তার আগে এদের দরুন ন্যায্য ক্ষতিপূরণ মালিকদের মিটিয়ে দেবে। তার পরে তিনি ক্ষতিপূরণের কথাটা বাতিল করে দিলেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৬২ সনে তিনি তাঁর ‘দাস-মুক্তির ঘোষণাপত্র’ প্রচার করলেন; এতে বলা হল, সরকারের বিরুদ্ধে যেসব রাজা বিদ্রোহ করেছে, তাদের মধ্যে যেখানে যত দাস আছে সকলকেই ১৮৬৩ সনের পয়লা জানুয়ারি থেকে মুক্ত বলে গণ্য করা হবে। এই ঘোষণাবাক্যটি প্রচার করবার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বোধ হয় দক্ষিণ অঞ্চলের সামরিক শক্তি কমিয়ে আনা। এর ফলে চল্লিশ লক্ষ দাস মুক্ত হয়ে গেল; লিংকনের নিশ্চয়ই আশা ছিল এরা রাজ্য-সংঘের মধ্যেই গোলমাল সৃষ্টি করবে।
দক্ষিণ অঞ্চল যুদ্ধে সম্পূর্ণরূপে অবসন্ন হয়ে পড়ল। ১৮৮৫ সনে গৃহযুদ্ধের শেষ হল। যুদ্ধ বস্তুটা যে-কোনো অবস্থাতেই ভয়ানক; কিন্তু গৃহযুদ্ধ তার চেয়েও অনেক বেশি মারাত্মক। চারবৎসরব্যাপী এই ভয়াবহ সংগ্রামের বোঝা সবচেয়ে বেশি পড়েছিল প্রেসিডেণ্ট লিংকনেরই উপরে; এর যে ফল দাঁড়াল তারও কৃতিত্ব প্রধানত তাঁরই; অত্যন্ত ধীর শান্ত সংকল্প এবং অধ্যবসায় নিয়ে তিনি সমস্ত নিরাশা, সমস্ত বিপর্যয়ের মধ্যেও অটল হয়ে ছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল কেবল যুদ্ধে জয়লাভ করাই নয়, সে জয় সম্পন্ন করবার পক্ষে দ্বেষবুদ্ধির সৃষ্টিও যথাসম্ভব অল্প করে চলা; যেন যে যুক্তরাষ্ট্রকে অক্ষুণ্ণ রাখবার জন্যে তিনি সংগ্রাম করছেন সেটা কেবল গায়ের জোরে প্রতিষ্ঠিত মিলন না হয়, সত্যকার মনের মিলনই হয়ে উঠতে পারে। কাজেই যুদ্ধে জয় করবার পরে তিনি দক্ষিণ অঞ্চলের প্রতি যথাসম্ভব সদ্ব্যবহার দেখাতে লাগলেন। কিন্তু এর কয়েক দিন মাত্র পরেই একটা মাথা পাগলা লোক তাঁকে গুলি ছুঁড়ে হত্যা করল।
আমেরিকার ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ বীর যাঁরা তাঁদের মধ্যে আব্রাহাম লিংকন একজন। পৃথিবীর মহামানবদের মধ্যেও তাঁর নাম আছে। তাঁর জীবনের আরম্ভ হয়েছিল অতি দীন অবস্থায়; বিদ্যালয়ে যাবার সুযোগ তাঁর প্রায় হয় নি; শিক্ষা যেটুকু তাঁর ছিল সে তাঁর নিজের চেষ্টাতেই অর্জিত। তবুও তিনি অতি বড়ো একজন রাষ্ট্রনীতিক এবং অতি বড়ো একজন বাগ্মী হয়ে উঠেছিলেন; একটি বিরাট বিপর্যয়ের মখোমুখি দাঁড়িয়ে তাঁর দেশকে রক্ষা করেছিলেন।
লিংকন দক্ষিণদেশের শাদা-আদমিদের প্রতি যতটা সদয় ব্যবহার দেখাতে পারতেন, তাঁর মৃত্যুর পরে আমেরিকার কংগ্রেস তা দেখাল না। এই দক্ষিণ অঞ্চলের শ্বেতাঙ্গদের প্রতি নানা রকমে শাস্তির ব্যবস্থা হল; অনেককে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হল, অর্থাৎ, তাদের আর ভোট দেবার ক্ষমতা রইল না। ও দিকে আবার নিগ্রোদের নাগরিক বলে স্বীকার করে নিয়ে সমস্ত রকমের অধিকার দিয়ে দেওয়া হল; এই নীতিটিকে আমেরিকার মূল শাসনতন্ত্রেরই অন্তর্গত করে নেওয়া হল। জাতি, বর্ণ, বা একদা সে দাস ছিল এই কারণ, দেখিয়ে কোনো রাজ্য কোনো মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না, এই মর্মেও আইন তৈরি করা হল।
আইনত নিগ্রোরা এখন স্বাধীন হল; ভোটের অধিকারও তারা পেল। কিন্তু এতে লাভ তাদের প্রায় কিছুই হল না, কারণ তাদের আর্থিক অবস্থা ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে। যত নিগ্রোকে মুক্ত করে দেওয়া হল তাদের কারোই কোনোরকম ধনসম্পত্তি নেই; তাদের নিয়ে কী করা যায় সেইটেই তখন সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। অনেকে বাসস্থান ছেড়ে উত্তর অঞ্চলে চলে গেল। কিন্তু অধিকাংশই যেখানে ছিল সেইখানেই বসে রইল; সেখানে তারা ঠিক আগের মতোই দক্ষিণ-অঞ্চলের শাদা-মনিবদের অনুগ্রহভিখারি হয়ে রইল। আগের দিনের সেই বাগানগুলোতেই তখন তারা দিনমজুর হয়ে খাটছে; মাইনে বলে শাদা-মনিবরা যা দয়া করে দিচ্ছে তাই গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে। দক্ষিণ-অঞ্চলের শ্বেতাঙ্গরাও নিজেদের মধ্যে সংঘবদ্ধ হয়ে উঠল, এই নিগ্রোদের তারা বিভীষিকার দ্বারাই সব দিক দিয়ে জব্দ করে রাখবে। অদ্ভুত ধরনের একটা অর্ধগুপ্ত সমিতি স্থাপিত হল, তার নাম ‘ক্লু ক্লুক্স ক্ল্যান’; এর সভ্যরা মুখোশ পরে ছদ্মবেশে নিগ্রোদের মধ্যে বিভীষিকা সৃষ্টি করে বেড়াত; নির্বাচনে তাদের ভোট দিতে পর্যন্ত দিত না।
গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে নিগ্রোদের অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটেছে। তাদের অনেকে এখন কিছু ভূসম্পত্তিও করেছে; বেশ ভালো কতকগুলো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানও তাদের হয়েছে। কিন্তু তবু এখনও তারা পরাধীন জাত, সেটা বেশ স্পষ্টই বোঝা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে এখন নিগ্রোর সংখ্যা প্রায় এক কোটি কুড়ি লক্ষ, দেশের মোট লোকসংখ্যার ঠিক প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ। যেখানে তাদের সংখ্যা কম সেখানে তাদের একরকম সয়ে নেওয়া হয়, যেমন উত্তর-অঞ্চলের কোনো কোনো অংশে। কিন্তু সংখ্যায় বেড়ে গেলেই অমন শ্বেতকায়রা তাদের উপর উৎপীড়ন শুরু করে বুঝিয়ে দেয় আগের দিনে তারা ক্রীতদাস ছিল, তাদের এখনকার অবস্থাও তার চেয়ে বিশেষ উন্নত কিছু নয়! দেশের প্রত্যেক জায়গাতে প্রত্যেক ব্যাপারে শ্বেতকায়দের থেকে তাদের আলাদা করে রাখা হয়—হোটেলে, রেস্তোরাঁতে, গির্জায়, কলেজে, পার্কে, সমুদ্র তীরের স্নানের ঘাটে, ট্রামে, এমনকি দোকানে পর্যন্ত তাদের আলাদা বন্দোবস্ত! রেলগাড়িতে তাদের বিশেষ একরকমের কামরায় চড়ে যেতে হয়, তার নাম ‘জিম্ ক্রো কার’ (কাকের মতো কালোদের গাড়ি)! শাদা-আদমি এবং নিগ্রোর মধ্যে বিয়ে হতে পারে না, আইনের নিষেধ। বাস্তবিক, এ বিষয়ে আশ্চর্য রকমের সব আইন আছে সে দেশে। এই তো সে দিন, ১৯২৬ সনে, ভার্জিনিয়া রাজ্যে একটি আইন তৈরি করা হয়েছে, শাদা-আদমি আর কালো-আদমিরা একই ঘরের মেঝেতে একত্র বসতে পারবে না!
মাঝে মাঝে আবার শ্বেতাঙ্গ আর নিগ্রোদের মধ্যে ভয়ানক দাঙ্গা বাধে। দক্ষিণ অঞ্চলে একটি ভয়ংকর ব্যাপার প্রায়ই হয়, তার নাম লিঞ্চিং। এর মানে হচ্ছে, কোনো ব্যক্তিবিশেষ একটা অপরাধ করেছে এই সন্দেহে বহু লোক একত্র হয়ে তাকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলে। অল্পদিন আগেও এমন অনেক ঘটনা হয়েছে, নেতাদের ক্ষিপ্ত জনতা নিগ্রোকে ধরে খুঁটিতে বেঁধে পুড়িয়ে মেরেছে।
আমেরিকার সর্বত্র এবং বিশেষ করে দক্ষিণ-অঞ্চলের রাজ্যগুলোতে, নিগ্রোদের ভাগ্য এখনও বড়ো দুঃখময়। অনেক সময় দেখা যায়, শ্রমিকের অভাব ঘটেছে, এই অবস্থাতে দক্ষিণ-অঞ্চলের কোনো কোনো রাজ্যে নিরীহ কতকগুলো নিগ্রোকে সাজানো মামলায় ফেলে জেলে দেওয়া হয়, তার পর সেই ‘কয়েদি’দের আবার বেসরকারি ঠিকাদারদের কাজে খাটবার জন্যে ভাড়া দেওয়া হয়! ব্যাপারটাই অত্যন্ত বিশ্রী; কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে আরও যেসব দুর্দশা এদের সইতে হয় সে অবর্ণনীয়। কাজেই দেখা যাচ্ছে, শুধু আইনের দ্বারা যে স্বাধীনতা মানুষ পায় শেষ পর্যন্ত তার মানে খুব বেশি কিছু নেই।
হ্যারিয়েট বীচার স্টো-র লেখা ‘আঙ্ক্ল্ টম্স্ কেবিন’ বইটি তুমি পড়েছ বা তার নাম শুনেছ? বইটি প্রাচীন কালে দক্ষিণদেশে যে নিগ্রো দাসরা ছিল তাদের নিয়ে লেখা, তাদের করুণ কাহিনীতে ভরা। গৃহযুদ্ধ বাধবার দশ বছর আগে এই বইটি প্রকাশিত হয়; দাস-প্রথার বিরুদ্ধে আমেরিকার জনসাধারণকে অবহিত করে তুলতে বইটি খুবই সাহায্য করেছিল।