বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/আমেরিকার অদৃশ্য সাম্রাজ্য
১৩৮
আমেরিকার অদৃশ্য সাম্রাজ্য
২৮শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৩
গৃহযুদ্ধে আমেরিকার অসংখ্য যুবক প্রাণ হারাল, দেশের উপরে বিরাট একটা ঋণের বোঝা চেপে পড়ল। কিন্তু সে নূতন দেশ, সতেজ তার প্রাণশক্তি, তাই এতেও তার অগ্রগতি ব্যাহত হল না। আমেরিকার ছিল প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ; বিশেষ করে খনিজ সম্পদের তার সীমা ছিল না। আধুনিক বস্ত্রশিল্প এবং সভ্যতার মূলে রয়েছে তিনটি বস্তু—কয়লা, লোহা আর পেট্রোলিয়াম। এই তিনটি তার প্রচুর ছিল। তা ছাড়া তার আছে বহু স্রোতস্বতী নদী, তার থেকে বিদ্যুৎশক্তি তৈরি করে নেওয়া যায়; এর একটি উদাহরণ তোমার সহজেই মনে পড়বে, সেটি হচ্ছে নায়াগ্রা জলপ্রপাত। প্রকাণ্ড দেশ আমেরিকা, লোকসংখ্যাও অল্প, কাজেই প্রত্যেকটি লোকের পক্ষেই প্রচুর সুযোগ-সুবিধা সেখানে বর্তমান। অতএব দেখা যাচ্ছে, শিল্প এবং কারখানার দিক দিয়ে বড়ো হয়ে উঠতে একটা দেশের যা যা দরকার তার সমস্ত সুযোগই তার হাতে ছিল। বেড়েও সে উঠল একেবারে তড়িৎগতিতে। ১৮৮০ সনের মধ্যেই দেখা গেল, বিদেশের বাজারে আমেরিকার যন্ত্রশিল্প ব্রিটিশ শিল্পের সঙ্গে সমান পাল্লা দিয়ে চলেছে। এক শো বছর ধরে ব্রিটেন বৈদেশিক বাণিজ্যে অতি অনায়াসেই শীর্ষস্থান অধিকার করে বসে ছিল; এবার আমেরিকা আর জর্মনির প্রতিবন্দ্বিতায় তার সে গৌরব ভেঙে পড়ল।
দেশদেশান্তর থেকে অজস্র লোক আমেরিকায় আসতে লাগল। ইউরোপ থেকে সকল জাতের সকল রকমের লোক এল—জর্মন, স্ক্যাণ্ডিনেভিয়ান, আইরিশ, ইতালিয়ান, ইহুদি, পোল। এদের অনেকে এল নিজের দেশে রাজনৈতিক পীড়ন থেকে পালিয়ে, অনেকে এল একটু ভালো জীবনযাত্রার লোভে। ইউরোপে তখন জনবাহুল্য ঘটেছে, তার বাড়তি লোকসংখ্যা আমেরিকার দিকে চলে আসতে লাগল। নানাপ্রকার বংশ জাতি ভাষা আর ধর্মের সে এক অপূর্ব মিশ্রণ। ইউরোপে এরা সকলে আলাদা হয়ে বাস করত, যে যার নিজের ক্ষুদ্র জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পরস্পরের দিকে ঘৃণা এবং দ্বেষের দৃষ্টিতে তাকিয়ে। এখানে এসে নূতন একটা পরিবেশের মধ্যে পড়ে একত্র একটা নূতন পরিচয় এরা অর্জন করল, পুরোনো দিনের সে ঘৃণা আর দ্বেষবুদ্ধির এখানে যেন কোনো জায়গাই নেই! এ দেশের সর্বত্র একটা বাঁধা-ধরনের আবশ্যিক শিক্ষানীতি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে; সে শিক্ষার ফলে অল্পদিনের মধ্যেই এদের সকলের নিজস্ব জাতিগত কোণ আর খোঁচগুলো ঘসে পালিশ হয়ে গেল; তার পর সেই সর্বজাতির সমন্বয় থেকে জন্মলাভ করল নূতন এক আমেরিকান জাতি। প্রাচীন দিনের অ্যাংলো-স্যাক্সন-বংশীয় যারা ছিল তারা তখনও নিজেদের মনে করছে দেশের অভিজাতসম্প্রদায়; সামাজিক জীবনে তাদেরই প্রাধান্য। ঠিক এদের পরে এবং মর্যাদায় এদেরই কাছাকাছি এল উত্তর-ইউরোপ থেকে আগত জাতিগুলো। দক্ষিণ-ইউরোপ থেকে, বিশেষ করে ইতালি থেকে যারা এসেছিল, এই উত্তর-ইউরোপীয়রা তাদের একটা নীচু স্তরের লোক বলে মনে করত; অবজ্ঞা করে এরা তাদের নাম দিয়েছিল ‘ডাগো’। নিগ্রোদের কথা অবশ্য একেবারেই আলাদা, তারা ছিল একেবারেই শেষ স্তরের লোক; এইসব শাদা জাতের কারও সঙ্গেই তাদের মেলামেশা ছিল না। পশ্চিম উপকূলে ছিল কিছু-পরিমাণ চীনা, জাপানি এবং ভারতীয়; সে অঞ্চলে যখন মজুরের চাহিদা খুব বেশি ছিল সেই সময়ে এরা এ দেশে আসে। এই এশিয়াবাসী জাতিরাও অন্যান্য সকলের থেকে দূরে সরে রইল।
রেলওয়ে এবং টেলিগ্রাফের জাল দেশের সর্বত্র জড়ে বিস্তৃত হল, তার ফলে এই বৃহৎ দেশের সমস্ত অঞ্চল পরস্পরের সঙ্গে গাঁথা হয়ে গেল। প্রাচীন যুগে, যখন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছতে লোকের বহু সপ্তাহ বহু মাস লেগে যেত, তখন এ ব্যাপার সম্ভব ছিল না। আমরা দেখেছি, অতীত কালে এশিয়াতে এবং ইউরোপে বহুবার বহু বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে। কিন্তু এইসব সাম্রাজ্যের সমস্ত অংশের মধ্যে নিবিড় সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয় নি, কারণ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সংবাদ পাঠানো বা যাতায়াত ছিল অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। সুতরাং সে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশ বস্তুত স্বাধীন হয়েই থাকত, যে যার নিজস্ব ধরনের পৃথক জীবনযাত্রা নির্বাহ করত; তফাতের মধ্যে শুধু সকলেই তারা সেই এক সম্রাটের প্রভুত্ব স্বীকার করত এবং তাঁকে কর দিত। এই সাম্রাজ্যগুলো ছিল শুধু একই রাজার অধীনস্থ বিভিন্ন দেশের একটা অদৃঢ় সমন্বয়। সকলে মিলে এক লক্ষ্য, এক জীবন নিয়ে চলার কোনো ব্যাপার এর মধ্যে ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের কিন্তু রেলওয়ে ছিল, যানবাহন আর বার্তা প্রেরণের আরও নানারকম ব্যবস্থা ছিল, আর ছিল দেশের সর্বত্র একটা একই রীতির শিক্ষাপ্রণালী; তাই সেখানে বিভিন্ন জাতি এবং দলের মধ্যে সেই এক লক্ষ্য এবং এক জীবনযাত্রা গড়ে উঠল। তার মধ্যকার নানা জাতি ক্রমে ক্রমে একত্র মিশে গিয়ে একটা বৃহত্তর জাতিতে পরিণত হল। এই মিলন অবশ্য এখনও সম্পূর্ণ হয় নি, আজও এর কাজ চলছে। এত বিভিন্ন প্রকার এবং এত বিরাট পরিমাণ মানুষের এতবড়ো একটা মিলনের দৃষ্টান্ত ইতিহাসে আর নেই।
ইউরোপের রাজনীতি এবং ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর কূটকৌশলের হাত থেকে যুক্তরাষ্ট্র দূরে সরেই থাকতে চেষ্টা করল। ইউরোপকেও সে আমেরিকা থেকে—উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকা, দুই মহাদেশ থেকেই—দূরে ঠেলে রাখতে চাইল। মন্রোর নীতির কথা আমি তোমাকে আগেই বলেছি। দক্ষিণ আমেরিকাতে স্পেনের সাম্রাজ্য টিঁকিয়ে রাখবার জন্যে ‘হোলি, অ্যালায়েন্স’ নামে পরিচিত কয়েকটি ইউরোপীয় রাষ্ট্র একত্র হয়ে দক্ষিণ আমেরিকার উপরে হস্তক্ষেপ করতে আসে; সেই সময়ে মন্রো এই নীতির উদ্বোধন করেন। মন্রো ঘোষণা করলেন, ইউরোপের কোনো শক্তি সমগ্র আমেরিকার কোথাও কোনো ব্যাপারে যদি সশস্ত্র হস্তক্ষেপ করতে আসে তবে তার সে অনধিকার চর্চা যুক্তরাষ্ট্র কিছুতেই সহ্য করবে না, এই ঘোষণার ফলে দক্ষিণ-আমেরিকার নবজাত প্রজাতন্ত্রগুলো ইউরোপের গ্রাস থেকে রক্ষা পেয়ে গেল। এর ফলে ইংলণ্ডের সঙ্গে যুদ্ধ বাধবারও উপক্রম একবার হয়েছিল। কিন্তু এক শো বছরেরও বেশি কাল ধরে আমেরিকা এই নীতি সমানে অনুসরণ করে এসেছে।
উত্তর আমেরিকার সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকার অনেক তফাত ছিল; এক শো বছরেও সে তফাত কিছুমাত্র কমে নি। উত্তরে কানাডা দিন দিন ঠিক যুক্তরাষ্ট্রেরই মতো হয়ে উঠছে; কিন্তু দক্ষিণের প্রজাতন্ত্রদের সম্বন্ধে সে কথা বলা চলবে না। তোমাকে আমি আগেও একবার বলেছি, দক্ষিণ-আমেরিকার এই প্রজাতন্ত্রগুলো হচ্ছে লাতিন-বংশজাতদের দেশ; মেক্সিকোর অবস্থান উত্তর-আমেরিকাতে, কিন্তু জাতে সেও এদেরই সগোত্র। যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোর মধ্যে যে সীমান্তরেখাটি, তার দুই ধারে দুইটি সম্পূর্ণ বিভিন্ন জাতি আর সংস্কৃতির বাস। এর দক্ষিণে, মধ্য-আমেরিকার সরু ফালিটির ওপারে এবং দক্ষিণ আমেরিকার বিরাট মহাদেশটির সর্বত্র জুড়েই লোকেদের ভাষা হচ্ছে স্প্যানিশ আর পর্তুগিজ। বস্তুত স্প্যানিশ ভাষাটাই চলিত বেশি; আমি যতদূর জানি, পর্তুগিজ ভাষাটা একমাত্র ব্রাজিলের লোকরাই বলে। দক্ষিণ-আমেরিকার দৌলতেই স্প্যানিশ ভাষা পৃথিবীতে বড়ো বড়ো ভাষাগুলোর মধ্যে একটি হয়ে উঠেছে। লাতিন আমেরিকা আজও তার সংস্কৃতির অনুপ্রেরণা সংগ্রহ করে স্পেন থেকে। যুক্তরাষ্ট্রে এবং কানাডাতে জাতিগত তফাতকে যত বড়ো করে দেখা হয়, এখানে তা হয় না। স্প্যানিশ বংশীয়দের সঙ্গে এখানে আদিম অধিবাসী রেড-ইণ্ডিয়ানদের বিয়ে হয়। কিছু পরিমাণে নিগ্রোদেরও হয়। এর ফলে এ দেশে একটা মিশ্র জাতির সৃষ্টি হয়েছে।
এক শো বছর ধরে এরা স্বাধীনতা ভোগ করে আসছে, তবু কিন্তু দক্ষিণ-দেশের এই লাতিন প্রজাতন্ত্রগুলো একটা ধীর স্থির জীবন নিয়ে গুছিয়ে বসতে রাজি নয়। থেকে থেকেই এখানে বিদ্রোহ বিপ্লব আর সেনাবাহিনীর একচ্ছত্র শাসন দেখা দেয়; এদের রাজনীতি আর শাসনব্যবস্থার এই নিত্যপরিবর্তনশীল রূপ, এর গতিধারার হদিশ পাওয়াই কঠিন। দক্ষিণ-আমেরিকার প্রধান তিনটি দেশ হচ্ছে আর্জেণ্টিনা, ব্রাজিল আর চিলি—নামের প্রথম অক্ষর অনুসারে এদের বলা হয় এ বি সি দেশ-ত্রয়। উত্তর-আমেরিকার মেক্সিকোও প্রধান লাতিন-আমেরিকান দেশদের মধ্যে অন্যতম।
লাতিন-আমেরিকার উপরে যখন ইউরোপ হস্তক্ষেপ করতে এল তখন মন্রো-নীতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রই তাকে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু নিজের ধনসম্পদ বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে তার নিজেরও এবার খোঁজ পড়ল, বাইরে কোথায় নিজের প্রতিপত্তি বিস্তৃত করবার মতো নূতন জায়গা পাওয়া যায়। স্বভাবতই তার দৃষ্টি সর্বপ্রথমে পড়ল গিয়ে লাতিন-আমেরিকার দিকে। সাম্রাজ্য গঠনের প্রাচীন রীতি হচ্ছে, জোর করে অন্য দেশকে দখল করা; যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু সেরকম করে এর কোনো দেশকে দখল করতে চেষ্টা করল না। সে শুধু এই সব দেশে তার মাল পাঠিয়ে পাঠিয়ে এদের বাজার দখল করে ফেলল। দক্ষিণ-দেশের রেলওয়ে, খনি এবং অন্যান্য বহু ব্যাপারেও সে তার মূলধন ন্যস্ত করল; এদের সব শাসনকর্তৃপক্ষকে, এবং কখনও বা বিপ্লবের সময়ে যুদ্ধরত পক্ষদের, টাকা ধার দিল। ‘সে’ বা আমেরিকা বলতে আমি বোঝাচ্ছি আমেরিকার ধনিক এবং ব্যাঙ্কারদের; কিন্তু তাদের পিছনে থেকে তাদের এই কাজে উৎসাহ দিচ্ছিল আমেরিকার সরকার। যে টাকা এইভাবে ধার দেওয়া হল বা লগ্নি করা হল তার জোরেই ক্রমে ক্রমে এই ব্যাঙ্কাররা দক্ষিণ এবং মধ্য আমেরিকার বহু ছোটো ছোটো রাজ্যের সরকারকে একেবারে নিজেদের তাঁবেদার করে ফেলল। এমনকি একটি দলকে টাকা বা অস্ত্রশস্ত্র ধার দিয়ে, অন্যটিকে না দিয়ে এইসব দেশে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলবার শক্তি পর্যন্ত এরা রাখত। বিরাট দেশ উত্তর-আমেরিকা, তার সরকার স্বয়ং রয়েছে এইসব ব্যাংকার আর ধনিকদের পিছনে; দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো সবই ছোটো আর দুর্বল, তাদের এ ক্ষেত্রে কীই-বা করবার সাধ্য আছে! অনেক সময় যুক্তরাষ্ট্রের সরকার একেবারে সৈন্য পাঠিয়েই এইসব দেশের মধ্যে একটি দলকে সাহায্য করত; মুখে বলত, শান্তি আর শৃঙ্খলা রক্ষার জন্যে করছি।
এমনি করে আমেরিকার ধনিকরা দক্ষিণ অঞ্চলের এই ছোটো ছোটো দেশগুলোকে একেবারে হাতের মুঠোয় পুরে ফেলল; এদের ব্যাঙ্ক রেলওয়ে খনি চলতে লাগল তাদেরই ইঙ্গিতে, তাদেরই স্বার্থ এবং প্রয়োজন অনুসারে। লাতিন আমেরিকার বড়ো বড়ো দেশগুলোতেও এদের বিরাট প্রতিপত্তি, কারণ সেখানেও এরা টাকা খাটাচ্ছে, তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তার মানে হচ্ছে, এইসমস্ত দেশের ধনসম্পদ বা অন্তত তার একটা বৃহৎ অংশ, যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব করে নিয়েছে। এটা একটা লক্ষ্য করবার মতো বস্তু; কারণ এ হচ্ছে এক নূতন ধরনের সাম্রাজ্য, আধুনিক ধরনের সাম্রাজ্য। এটা হচ্ছে একটা অদৃশ্য সাম্রাজ্য, অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য; এতে শোষণ আছে, কর্তৃত্ব আছে, অথচ বাইরে থেকে দেখলে একে সাম্রাজ্য বলে চেনাই যায় না। রাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের চোখে দক্ষিণ আমেরিকার প্রজাতন্ত্রগুলি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র। মানচিত্রে দেখা যায় এরা খুব বড়ো বড়ো দেশ; কোথাও কোনো দিক থেকে এদের স্বাধীনতার ত্রুটি আছে এমন প্রমাণ কোথাও মিলবে না। অথচ এদের প্রায় সকলেই সম্পূর্ণরূপে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের অধীনস্থ হয়ে রয়েছে।
ইতিহাসের এই পর্যালোচনা করতে গিয়ে আমরা বিভিন্ন যুগে সম্রাজ্যবাদের নানা বিভিন্ন রূপ দেখেছি। একেবারে প্রথম যুগে এক দেশের উপরে অন্য এক দেশের যুদ্ধে জয়লাভের অর্থ ছিল, বিজিত দেশের জমি আর মানুষদের নিয়ে বিজেতারা যা খুশি তাই করতে পারে। এর জমি আর প্রজা উভয়কেই তারা নিজেদের অধীন করে নিত, অর্থাৎ বিজিত জাতির লোকেরা বিজেতাদের দাসে পরিণত হত। এইটেই ছিল সাধারণত প্রচলিত রীতি। বাইবেলে দেখা যায়, ইহুদিরা বাবিলনীয়দের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে গেছে, বাবিলনীয়রা তাদের বন্দী করে নিয়ে যাচ্ছে। এই রকমের দৃষ্টান্ত বাইবেলে আরও অনেক আছে। কালক্রমে এর বদলে আর-এক রকমের সাম্রাজ্যবাদ দেখা দিল; সেখানে শুধু জমিটাকেই আয়ত্ত করে নেওয়া হচ্ছে, প্রজাদের দাসে পরিণত করা হচ্ছে না। মালিকরা বুঝে ফেলেছিল, মানুষকে দাস করে রাখার চেয়ে তাদের কর বসিয়ে এবং অন্যান্য উপায়ে শোষণ করে অনেক বেশি লাভ আদায় করা যায়। আমাদের অনেকেই এখনও সাম্রাজ্য বলতে একেই বোঝেন, ব্রিটিশরা যেমন ভারতবর্ষে এসে বসেছে; আমরা ভাবি, ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় শাসনভারটা যদি একবার ব্রিটেনের হাত থেকে খসে পড়ে তা হলেই ‘ভারতবর্ষ’ স্বাধীন হয়ে যাবে, কিন্তু এই ধরনের সাম্রাজ্য এরই মধ্যে অন্তর্হিত হতে শুরু করেছে; এর জায়গাতে এসে বসছে আরও উন্নত এবং পূর্ণাঙ্গ একটি ধরন। এই অতি-নূতন ধরনের সাম্রাজ্যে জমিও দখল করা হয় না, এতে শুধু দেশের ধনসম্পদ বা ধনসম্পদ উৎপাদন করবার উপকরণগুলোকে আয়ত্ত করে নেওয়া হয়। এর ফলে সে দেশটিকে বেশ পরিপাটিরূপে শোষণ করে নিজের লাভ গুছিয়ে নেওয়া চলে, তাকে মোটের উপর নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রিত করা যায়, অথচ তার দরুন সে দেশকে শাসন করবার বা পীড়ন করবার কোনো দায়িত্বই স্বীকার করতে হয় না। বাস্তবিক পক্ষে এতে অতি সামান্য আয়াসে সে দেশের জমি এবং বাসিন্দাদের উপরে প্রভুত্ব এবং কর্তৃত্ব করা যায়।
এইরূপে কালে কালে সাম্রাজ্যবাদ নিজেকে সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ করে তুলেছে; আধুনিক কালের সাম্রাজ্য হচ্ছে অদৃশ্য অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য। দাস প্রথা যখন উঠে গেল, তার পরে আবার সামন্তযুগের ভূমিদাস-প্রথাও যখন উঠে গেল, সবাই মনে করল, এতদিনে বুঝি মানুষের মুক্তি মিলবে। কিন্তু দু দিন না যেতেই দেখা গেল, মানুষকে তখনও শোষণ করা হচ্ছে; টাকার জোর যাদের হাতে তারাই অন্য সকলের উপরে শোষণ আর কর্তৃত্ব চালাচ্ছে। ক্রীতদাস বা ভূমিদাস হবার পরিবর্তে মানুষ এবার হল ‘বেতনের দাস’; মুক্তি তাদের তখনও অনেক দূর। দেশে-দেশে সম্পর্ক সম্বন্ধেও ঠিক এই কথাই খাটে। লোকে মনে করে, একটা দেশ আর-একটা দেশের উপরে প্রভুত্ব করছে, যত বিপত্তির মূল এইখানেই; এই প্রভুত্ব ঘুচিয়ে দিতে পারলেই স্বাধীনতা আপসে এসে হাজির হয়ে যাবে। কিন্তু সত্যি করে তার লক্ষণ বিশেষ দেখা যাচ্ছে না; দেখতে পাচ্ছি, বহু দেশ রাজনৈতিক স্বাধীনতার অধিকারী হয়েও শুদ্ধ অর্থনৈতিক প্রভুত্বের ফলে অন্য দেশের হাতের মুঠোয় গিয়ে পড়ছে। ভারতবর্ষে ব্রিটেনের সাম্রাজ্যটা বেশ স্পষ্ট হয়েই চোখে পড়ে। ব্রিটেন ভারতের উপরে রাজনৈতিক প্রভুত্বের অধিকারী। এই দৃষ্টিগোচর সাম্রাজ্যের সঙ্গে সঙ্গে এবং এরই একটা আবশ্যক অঙ্গ হিসাবে আবার ভারতবর্ষের উপরে অর্থনৈতিক প্রভুত্বও ব্রিটেন স্থাপন করেছে। ভারতবর্ষে ব্রিটেনের এই দৃষ্টিগ্রাহ্য সাম্রাজ্য হয়তো অল্পদিনের মধ্যেই চলে যাবে, কিন্তু তখনও এ দেশে তার অর্থনৈতিক প্রভুত্ব টিঁকে থাকবে। সেই হবে তার অদৃশ্য সাম্রাজ্য, এমন হওয়া কিছুই অসম্ভব নয়। সে যদি হয় তবে বুঝতে হবে, ব্রিটেন কর্তৃক ভারতবর্ষের শোষণ তখনও সমান ভাবেই চলছে।
প্রভু-দেশের পক্ষে প্রভুত্ব করবার সবচেয়ে কম হাঙ্গামার পথ হচ্ছে এই অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য স্থাপন। রাজনৈতিক প্রভুত্বের মতো অমন তীব্র প্রতিবাদ এতে ওঠে না, কারণ এর স্বরূপ অনেকে টেরই পায় না। কিন্তু এর কামড় যখন গায়ে ফুটে বসে তখন এর কার্যকলাপ সম্বন্ধে লোকে সচেতন হয়ে ওঠে, আপত্তিও প্রকাশ করে। লাতিন-আমেরিকার লোকেরা আজকাল আর রাষ্ট্রকে বিশেষ প্রীতির চোখে দেখছে না; উত্তর-আমেরিকার এই প্রভুত্বকে প্রতিরোধ করবার জন্যে লাতিন-আমেরিকার দেশগুলোকে একত্র করে একটা দল গড়বার চেষ্টাও অনেকবার হয়েছে। কিন্তু বেশি কিছু এরা করে উঠতে পারবে বলে মনে হয় না, যতদিন না এরা এদের ঘন ঘন প্রাসাদ-বিপ্লব ঘটানো আর পরস্পরের সঙ্গে কলহের বদ অভ্যাসটি ত্যাগ না করে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিগ্রাহ্য সাম্রাজ্য রয়েছে ফিলিপাইন-দ্বীপপুঞ্জে। স্পেনের সঙ্গে যুদ্ধ করে এই দ্বীপপুঞ্জটি আমেরিকা কীভাবে দখল করে নিল, সে কাহিনী আগের একটি চিঠিতে বলেছি। ১৮৯৮ সনে আটলাণ্টিক মহাসাগরের কিউবা বলে একটি দ্বীপ নিয়ে এই যুদ্ধ শুরু হয়। এর ফলে কিউবা স্বাধীন হয়ে যায়, কিন্তু যে শুধু নামেই। কিউবা এবং হাইতি, দুই দ্বীপেই আমেরিকা প্রভুত্ব করছে।
বছর বারো হল পানামার খালটি খোলা হয়েছে। এর অবস্থান হচ্ছে, মধ্য-আমেরিকার যেখানে দেশটি অতি সংকীর্ণ হয়ে এসেছে সেইখানে; আটলাণ্টিক আর প্রশান্ত মহাসাগরকে এ সংযুক্ত করে দিয়েছে। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি আগে এই খালের পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল; সুয়েজখাল যাঁর কীর্তি সেই ফার্ডিনাণ্ড ডি লেসেপ্স্ এরও পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু নানা বিপত্তির চাপে পড়ে তিনি একে কার্যে পরিণত করতে পারলেন না; খালটি তৈরি করল এসে আমেরিকানরা। তাদেরও ম্যালেরিয়া আর হল্দে জ্বরের দরুন মুশকিলে পড়তে হয়েছিল; তার পর তারা ও অঞ্চলে এই ব্যাধিগুলোকেই নির্মূল করবে বলে সংকল্প করল সেটাকে কার্যেও পরিণত করল। ম্যালেরিয়াবাহী মশা এবং অন্যান্য রোগবাহী পোকা ইত্যাদি যেখানে জন্মাতে পারে এমন সমস্ত খানা ডোবা ইত্যাদি স্থান তারা নষ্ট করে দিল; খালের কাছাকাছি এলাকাটাকে রীতিমতো স্বাস্থ্যকর স্থানে পরিণত করল। পানামা-অঞ্চলের একটি ক্ষুদ্র প্রজাতন্ত্রের এলাকাতে খালটি অবস্থিত। কিন্তু খালটি তথা সেই ক্ষুদ্র প্রজাতন্ত্রটি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রেরই কর্তৃত্বাধীনে। আমেরিকার পক্ষে এই খালটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়; এই খাল না থাকলে তার জাহাজগুলোকে গোটা দক্ষিণ-আমেরিকাটাকে প্রদক্ষিণ করে চলতে হত। তবুও অবশ্য সুয়েজ খালের গুরুত্ব যতখানি, পানামাখালের ততটা নয়।
এমনি করে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি আর ধনসম্পদ ক্রমাগত বেড়ে চলল; অন্যান্য বহু জিনিষের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে কোটিপতি আর আকাশস্পর্শী ইমারত সে সৃষ্টি করতে লাগল, অনেক ব্যাপারে তারা ইউরোপেরই সমকক্ষ হয়ে উঠল, এমনকি তাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গেল। শিল্পব্যবসায়ের দিক থেকে সে হল জগতের শ্রেষ্ঠ দেশ। অন্যসব দেশের তুলনায় তার শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানও অনেক বেশি উন্নত। এই সমৃদ্ধির জন্যেই সমাজতন্ত্রবাদ বা অন্যানা প্রগতিমূলক মতবাদ এ দেশে তেমন প্রতিষ্ঠা লাভ করে নি, ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংলণ্ডে যেমন হয়েছিল। আমেরিকার শ্রমিকরা অত্যন্তরকম নরমপন্থী আর রক্ষণপন্থী; এর ব্যতিক্রম থাকলেও ক্কচিৎ দু-চার জন। বেশ ভালো মাইনে পাচ্ছে তারা; হয়তো বা অবস্থার আর একটু উন্নতি হবে, এই অনিশ্চিত ভরসায় তারা বর্তমান সুখসোয়াস্তিকে বিপন্ন করবে কেন? এই শ্রমিকদের অধিকাংশই ছিল ইতালিয়ান বা অন্যান্য জাতের ‘ডাগো’—বিদ্রূপ করে এই নামে তাদের ডাকা হত। এরা ছিল দুর্বল, অসংহত; আমেরিকানরা এদের অবজ্ঞার চোখে দেখত। একটু ভালো মাইনে যারা পাচ্ছে সেই ওস্তাদ মজুররা পর্যন্ত নিজেদের ‘ডাগো’দের চেয়ে আলাদা একটি শ্রেণীর লোক বলে মনে করত।
আমেরিকাতে দুটি রাজনৈতিক দল গড়ে উঠল—রিপাব্লিকান (প্রজাতন্ত্রবাদী) আর ডেমোক্র্যাটিক (গণতন্ত্রবাদী)। ইংলণ্ডে যেমন হয়েছিল, বা তার চেয়েও বেশি মাত্রায়, এখানেও এরা দু দলই হল একই ধনীশ্রেণীর লোক নিয়ে গড়া; নীতি বা মতামতের দিক থেকে দুই দলের মধ্যে তফাত প্রায় কিছুই ছিল না।
এই যখন অবস্থা, এমন সময় এল বিশ্বযুদ্ধ; শেষ-পর্যন্ত আমেরিকাকেও তার আবর্তে গিয়ে পড়তে হল।