বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/আমেরিকার মায়া-সভ্যতা
৫৯
আমেরিকার মায়া-সভ্যতা
১৩ই জুন, ১৯৩২
এই চিঠিগুলিতে আমি পৃথিবীর ইতিহাসের ধারাটি অনুসরণ করছি। কিন্তু এটা হয়ে উঠেছে যেন এশিয়া, ইউরোপ আর উত্তর-আফ্রিকার ইতিহাস। আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়া সম্বন্ধে অতি সামান্যই বলেছি, কিছু বলি নি বললেই চলে। এই প্রাচীন যুগে আমেরিকায় যে একটি সভ্যতা ছিল এ কথা অবশ্য তোমাকে বলা হয়েছে। এর সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই জানা যায় নি, এর সম্বন্ধে আমার জ্ঞানও খুবই অল্প। তবু এখানে কিছু বলবার লোভ সামলাতে পারছি না, কারণ তা না হলে তুমি একটি সাধারণ ভুল করে বসবে; হয়তো ভাববে, কলম্বস এবং অন্যানা ইউরোপীয়রা যাবার আগে আমেরিকা বর্বর দেশের শামিল ছিল।
প্রাচীনকালে, সম্ভবত প্রস্তরযুগে, যখন মানুষ কোথাও বসতি স্থাপন করে নি, শুধু যাযাবরবৃত্তি আর শিকারই যখন তাদের একমাত্র কাজ, তখন এশিয়া আর উত্তর-আমেরিকার মধ্যে একটি স্থলপথের সংযোগ ছিল। আলাস্কার উপর দিয়ে বিভিন্ন দল বা গোষ্ঠী নিশ্চয়ই এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে গিয়েছে। পরে এই সংযোগ যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, আমেরিকার লোকেরা তখন নিজেদের সভ্যতা নিজেরাই ধীরে ধীরে গড়ে তুলল। মনে রেখো, আমরা যতদূর, জানি, সে সভাতার সঙ্গে এশিয়া অথবা ইউরোপের যোগসূত্র পাওয়া যায় নি। পঞ্চম শতাব্দীর এক চীনদেশীয় সন্ন্যাসীর কাহিনী তোমাকে বলেছি। তিনি বলেছিলেন, চীনের অনেক পূর্বে একটি দেশ তিনি দেখে এসেছেন। এটা হয়তো মেক্সিকো। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীতে তথাকথিত নূতন পৃথিবী আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত এ ছাড়া আর কোনো কার্যকরী সংযোগের বিবরণ পাওয়া যায় নি। আমেরিকার এই জগৎটি যেন একটি সুদূর এবং ভিন্ন জগৎ, ইউরোপ এবং এশিয়ার কোনো ঘটনাই এর উপর প্রভাব ফেলতে পারে নি। মনে হয়, মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা এবং পেরুতে এই সভ্যতার তিনটি কেন্দ্র ছিল। কখন এর পত্তন হয়েছিল সে সম্বন্ধে আমাদের স্পষ্ট ধারণা নেই তবে মেক্সিকোর বছর গোনা আরম্ভ হয়েছে ৬১৩ খৃষ্টপূর্বাব্দের কোনো সময় থেকে। খৃস্টীয় যুগের সূচনা থেকে দ্বিতীয় শতাব্দীতে এবং তার পরে অনেকগুলি শহর উঠছে দেখতে পাই। পাথরের কাজ, মৃৎশিল্প, বয়ন এবং সূক্ষ্ম রঙের কাজের পরিচয় পাওয়া যায়। তামা এবং সোনার ব্যবহার ছিল প্রচুর, কিন্তু ছিল না লোহা। এদের স্থাপত্য উন্নতধরনের ছিল, নগরগুলি নির্মাণচাতুর্য নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করত। একটা জটিলধরনের বিশেষ লিপিও তাদের ছিল। চিত্রশিল্প, বিশেষ করে ভাস্কর্যের নিদর্শন প্রচুর, তাদের সৌন্দর্যও নেহাত কম ছিল না।
সভ্যতার এই কেন্দ্রগুলির প্রত্যেকটির কয়েকটি করে রাষ্ট্র ছিল। কতকগুলি ভাষা এবং প্রচুর সাহিত্যও তাদের ছিল। শাসনব্যবস্থা ছিল সুনিয়মিত এবং শক্তিশালী, শহরগুলিতে সংস্কৃতিসম্পন্ন বুদ্ধিজীবীরা বাস করতেন। এই রাষ্ট্রগুলির আইন এবং রাজস্বব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নতধরনের ছিল। ৯৬০ অব্দের কাছাকাছি সময়ে উক্সমল শহরের পত্তন হয়; শোনা যায়, অল্পদিনের মধ্যেই এটি মহানগরীতে পরিণত হয়েছিল। তখনকার এশিয়ার বড়ো বড়ো শহরের সঙ্গে তার তুলনা চলতে পারত। এ ছাড়া লাবুয়া, মায়াপান, চাওমুলতান প্রভৃতি আরও বড়ো বড়ো শহরও ছিল।
মধ্য-আমেরিকার তিনটি প্রধান রাষ্ট্র মিলে একটি সম্মিলিত রাষ্ট্র গঠন করেছিল, তাকে এখন ‘মায়াপানের লীগ’ বলা হয়। এটা হবে খৃষ্টজন্মের ঠিক এক হাজার বছর পরে। এশিয়া ও ইউরোপের বেলায়ও আমরা এ যুগে এসে উপস্থিত হয়েছি। সুতরাং খৃষ্টের এক হাজার বছর পরে মধ্য-আমেরিকাতে সভ্য এবং শক্তিশালী একটি সংযুক্ত রাষ্ট্র ছিল। কিন্তু এসকল রাষ্ট্র, এমনকি মায়া সভ্যতাটাই, পুরোহিত-প্রধান ছিল। সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান ব’লে সম্মান পেত জ্যোতির্বিদ্যা। পুরোহিতরা এই বিজ্ঞান জানত, তাই সাধারণ লোকের অজ্ঞতার সুযোগ নিতে পারত। ভারতবর্ষেও ঠিক এমনি করেই হাজার হাজার লোককে চন্দ্র এবং সূর্য গ্রহণের সময় স্নান করতে প্রবৃত্ত করা হয়।
মায়াপানের লীগ এক শো বছরেরও বেশি কাল স্থায়ী হয়েছিল। তার পর হয়তো ওখানে একটি সামাজিক বিপ্লব ঘটে, সেই সুযোগে প্রত্যন্ত প্রদেশের বিদেশী শক্তি এসে ঢুকে পড়ল। ১১৯০ খৃষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে মায়াপানের লীগ ধ্বংস হয়ে গেল। অন্যান্য বড়ো বড়ো শহরগুলি অবশ্য তখনও ছিল। আরও এক শো বছরের মধ্যে আর-একটি জাতির আবির্ভাব হল, তারা মেক্সিকোর আজ্টেক। চতুর্দশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে তারা মায়াদেশ জয় করে নেয়, আর প্রায় ১৩২৫ খৃষ্টাব্দে টেনক্টিটলান শহরের পত্তন করে। অল্পদিনের মধ্যে অগণিত লোক এসে এখানে জমা হল, এটা হয়ে দাঁড়াল মেক্সিকান জগতের রাজধানী আর আজ্টেক-সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থল।
আজ্টেকরা ছিল সামরিক জাতি। তাদের সামরিক উপনিবেশ ও দুর্গরক্ষী সৈন্যদল ছিল আর সৈনা-চলাচলের জন্য রাস্তা তৈরি করে তারা দেশটাকে ছেয়ে ফেলেছিল। ধূর্তও তারা কম ছিল না, অধীন রাষ্ট্রগুলির পরস্পরের মধ্যে নাকি তারা ঝগড়া বাধিয়ে দিত। সকল সাম্রাজ্যেরই
এটা একটা পুরোনো পদ্ধতি। রোমে এই নীতিটিকে বলা হত Divide et impera—অর্থাৎ সাম্রাজ্যরক্ষার জন্য বিভিন্ন দলে বিভেদ সৃষ্টির প্রয়োজন।
অন্যান্য বিষয়ে আজ্টেকদের যতই ধূর্ততা থাক, এরাও ছিল পুরোহিত-প্রধান; এমনকি এরা আরও খারাপই ছিল বলতে হবে। এদের ধর্মে নরবলির প্রচলন ছিল। এরকমভাবে অত্যন্ত বীভৎস উপায়ে প্রত্যেক বছর হাজার হাজার মানুষের প্রাণ হরণ করা হত।
প্রায় দুশো বছর আজ্টেকরা দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজত্ব করেছিল, ভারতবর্ষে ব্রিটিশ-রাজত্বের মতোই, রাজ্যের মধ্যে বাইরের নিরাপত্তা এবং শান্তি ছিল। কিন্তু প্রজাদের নির্দয়ভাবে শোষণ করে তাদের সকলরকমে দরিদ্র করে তোলা হয়েছিল। এরকম গঠিত এবং নিয়ন্ত্রিত কোনো রাষ্ট্রই স্থায়ী হতে পারে না। আর ঘটলও তাই। ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ১৫১৯ অব্দে যখন নাকি মনে হচ্ছিল আজ্টেকরা উন্নতির শীর্ষে তখনই একদল অভিযানকারী দস্যুর আক্রমণে সমস্ত রাজ্যটি হুড়্মুড়্ করে ভেঙে পড়ল। কোনো সাম্রাজ্যপতনের এর চেয়ে বিস্ময়কর নিদর্শন আর বেশি পাবে না। হার্নেন কর্টেস নামে একজন স্পেনদেশীর অল্প-কিছু সৈন্য নিয়ে এ কাজ করেছিলেন। ঘোড়া আর বন্দুক এ দুটো জিনিষ তাঁর সহায় হয়েছিল। অনুমান করা যায়, মেক্সিকোতে তখন ঘোড়া ছিল না, আর বন্দুক তো ছিলই না। কিন্তু আজ্টেক-সাম্রাজ্যের ভিতরে ভিতরে যদি ঘুণ ধরে না যেত তবে কর্টেনের সাহস অথবা ঘোড়া এবং বন্দুক কিছুতেই কিছু হত না। এর ভিতরটা ফাঁপা হয়ে গিয়েছিল, বাইরের চেহারাটাই শুধু টিঁকে ছিল। অল্প আঘাতেই তাই তার পতন সম্ভব হয়েছিল। এ সাম্রাজ্যের ভিত্তি ছিল শোষণনীতির উপর, প্রজারা ছিল এর প্রতি অত্যন্ত বিরূপ। যখন বাইরে থেকে আক্রমণ হল তখন প্রজাসাধারণ সাম্রাজ্যবাদীদের বিপদে আনন্দিতই হয়েছিল। এরকম অবস্থায় সমাজবিপ্লব ঘটা খুবই স্বাভাবিক, এখানেও তাই ঘটেছিল।
প্রথমবার কর্টেসের আক্রমণ রুখে দেওয়া হয়েছিল, তিনি শুধু প্রাণ নিয়ে পালাতে পেরেছিলেন। কিন্তু তিনি আবার ফিরে গিয়ে সেখানকার কয়েকজন অধিবাসীর সাহায্যে রাজ্যটি জয় করে ফেললেন। তাঁর হাতে শুধু আজ্টেক-সাম্রাজ্যের অবসান হয়েছিল এমন নয়। ভাবতে আশ্চর্য লাগে, সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত মেক্সিকান সভ্যতাও ভেঙে পড়েছিল। অল্পদিনের মধ্যে সাম্রাজ্যের প্রধান শহর বিরাট টেনক্টিটলান নগরীরও আর কোনো চিহ্নই রইল না। এর একটি পাথরও আর অবশিষ্ট নেই, যেখানে এ নগরী ছিল সেখানে স্পেনদেশীয়রা একটি গির্জা তৈরি করেছে। মায়ার অন্যান্য বড়ো বড়ো শহরগুলিও টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়েছিল; রুকাটানের বন ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়ে এদের গ্রাস করে নিল। এখন ওগুলোর নাম পর্যন্ত লোকে ভুলে গেছে, কোনো-কোনোটির নাম কাছাকাছি কোনো গ্রামের নামের মধ্যে বেঁচে আছে। এদের সমস্ত সাহিত্যও ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, তিনটি মাত্র বই এখনও রয়েছে এগুলিও আবার এখন পর্যন্ত কেউ পড়তে পারে নি।
প্রায় পনেরো শো বছর ধরে যে জাতি বেঁচে ছিল, ইউরোপ থেকে আগত নূতন জাতির সংস্পর্শে সে প্রাচীন জাতি ও তাদের পুরোনো সভ্যতা কী করে লুপ্ত হয়ে গেল তা নির্ণয় করা অত্যন্ত কঠিন। মনে হয়, যেন এই সংস্পর্শটি ব্যাধির মতো অথবা নূতন কোনো মহামারীর মতো তাদের মধ্যে ঢুকে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। কোনো কোনো দিক থেকে তাদের সভ্যতা উন্নতধরনের হলেও, কতকগুলি ব্যাপারে তারা আবার অত্যন্ত পিছিয়ে ছিল। তাদের মধ্যে ইতিহাসের বিভিন্ন যুগের একটি বিচিত্র সংমিশ্রণ ঘটেছিল।
দক্ষিণ আমেরিকার সভ্যতার আর একটি কেন্দ্র ছিল পেরুতে, সেখানে ইন্কার রাজত্ব ছিল। এ রাজার দেবত্বে লোকের বিশ্বাস ছিল। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, পেরু সভ্যতা অন্তত শেষ সময়ে মেক্সিকান সভ্যতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল। তাদের মধ্যে দূরত্ব বেশি ছিল না। তবু তারা পরস্পরের সম্বন্ধে কিছুই জানত না। অনেক বিষয়ে তারা যে অনেক পেছিয়ে ছিল এটাই তার একটা প্রমাণ। মেক্সিকোতে কর্টেসের সাফল্যলাভের কিছুদিন পরেই আর একজন স্পেনদেশীয় লোক পেরুর রাজ্যটিকেও নষ্ট করে দেন। এঁর নাম পিজারো। ইনি ওখানে গিয়েছিলেন ১৫৩০ খৃস্টাব্দে। বিশ্বাসঘাতকতা করে ইনি ইন্কাকে বন্দী করেন। দেবস্বরূপ রাজাকে বন্দী করাতে সমস্ত প্রজারা ভয় পেয়ে গেল। পিজারো কিছুকাল ইন্কার নামে রাজত্ব করতে চেষ্টা করলেন, প্রচুর ধনসম্পত্তিও জবরদস্তি করে আদায় করলেন, কিন্তু শেষকালে ছলনা ধরা পড়ে গেল। স্পেনদেশীয়রা পেরুকে তাদের অধিকারভুক্ত করে নিল।
টেনক্টিটলান শহরের বিরাটত্ব দেখে কর্টেস প্রথমে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন, ইউরোপে এর জুড়ি তিনি কখনও দেখেন নি।
মায়া এবং পেরু সভ্যতার বহু ভগ্নাবশেষ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে; আমেরিকার যাদুঘরগুলিতে, বিশেষ করে মেক্সিকোতে, সেগুলি দেখতে পাওয়া যায়। শিল্পে তাদের একটি সুন্দর ঐতিহ্য রয়েছে। পেরুর সোনার কাজ নাকি অপূর্ব। কতকগুলি ভাস্কর্যের নিদর্শন, বিশেষ করে কতকগুলি পাথরের তৈরি সাপ পাওয়া গেছে, সেগুলির কাজ অত্যন্ত সূক্ষ্ম। কতকগুলি কাজ আবার ভীতিপ্রদ করেই তৈরি বলে মনে হয়, আর সেগুলি দেখলে সত্যি সত্যি ভয় হয়।