বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/আরবজাতির দিগ্বিজয়
৪৯
আরবজাতির দিগ্বিজয়
অন্যান্য ধর্ম প্রবর্তকগণের ন্যায় মহম্মদও প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতির বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন। নিকটবর্তী দেশসমূহের অধিবাসীরা বহু কাল যাবৎ স্বেচ্ছাচারী শাসক আর ধর্মগুরুদের অত্যাচারে উৎপীড়িত হয়ে উঠেছিল। ইসলামধর্মের সহজ ও সরল পন্থা, সাম্য ও গণতন্ত্রের আদর্শ তাদের মনে সাড়া জাগিয়ে তুলল। তারা একটা পরিবর্তনের জন্যে একান্ত উদ্গ্রীব হয়ে ছিল। ইসলামধর্মের মধ্যেই তারা ঐ পরিবর্তন খুঁজে পেল। তাদের অবস্থার অনেক উন্নতি হল, লোপ পেল বহু অনাচার। কিন্তু ইসলামধর্ম সমাজব্যবস্থায় বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারে নি; পারলে ভালো হত, জনগণের শোষণ অনেকটা বন্ধ হত। তবে মুসলমানদের পক্ষে ফল ভালো হয়েছিল; তাদের শোষণ বন্ধ হয়ে গেল, একভ্রাতৃত্ববোধ দৃঢ় হল।
আরবজাতি দেশ-জয়ে বের হল। অনেক সময়ে বিনা যুদ্ধেই তারা জয়লাভ করেছে। পয়গম্বরের মৃত্যুর পচিশ বৎসরের মধ্যে আরবগণ পারশ্য, সিরিয়া, মিশর, আরমেনিয়া এবং মধ্য-এশিয়া আর উত্তর-আফ্রিকার কতকাংশ জয় করল। মিশর অতি সহজে পরাজিত হয়েছিল, তার কারণ, রোম সাম্রাজ্যের শোষণ এবং বিভিন্ন খৃষ্টীয় সম্প্রদায়গুলোর বিরোধের ফলে মিশর একেবারে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। কথিত আছে আরবগণই আলেকজান্দ্রিয়া নগরীর প্রসিদ্ধ লাইব্রেরি পুড়িয়ে ফেলেছিল; কিন্তু সেটা মিথ্যা বলেই লোকের ধারণা। কেননা, বইপুস্তকের কদর তারাও ভালো জানত, সুতরাং ঐরূপ বর্বরোচিত কাজ নিশ্চয়ই তারা করে নি। সম্ভবত কন্স্টাণ্টিনোপ্লের সম্রাট থিওডসিয়স্ এই ধ্বংসকার্যের জন্যে দায়ী। অবশ্য লাইব্রেরির এক অংশ অনেক আগে জুলিয়স সিজারের আমলে নষ্ট করা হয়েছিল। থিওডসিয়সের কথা ইতিপূর্বে তোমাকে বলেছি। ইনি ছিলেন একজন ধর্মনিষ্ঠ খৃষ্টান। গ্রীক পুরাণ, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ক গ্রন্থাদি তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না; কথিত আছে, তিনি ঐসমস্ত পুস্তক পুড়িয়ে স্নানের জল গরম করতেন।
আরবজাতি পূর্ব এবং পশ্চিম উভয়দিকে এগিয়ে চলল। পূর্বদিকে হিরাট, কাবুল জয় করে তারা সিন্ধুদেশের উপকূলে এসে উপস্থিত হল, কিন্তু অগ্রসর হয়ে ভারতের অভ্যন্তরে আর প্রবেশ করল না। ওদিকে পাশ্চাত্যে তাদের জয়যাত্রা ক্ষান্ত হল না। উত্তর-আফ্রিকা অতিক্রম করে একেবারে আটলাণ্টিক মহাসাগরের উপকূলে এসে থামল; এখন ঐ স্থানের নাম হয়েছে মরক্কো। আরব সেনাপতি ওক্বা সম্মুখে অন্তহীন মহাসাগর দেখে মনঃক্ষুণ্ণ হলেন; ঘোড়ায় চড়েই মহাসাগর পার হবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু অগ্রসর হওয়া সম্ভবপর না হওয়াতে ঈশ্বরের কাছে দুঃখ প্রকাশ করলেন যে, আল্লার নামে জয় করবার মতো দেশ আর ওদিকে নেই!
অতঃপর স্পেন আর ইউরোপ। আরব-সেনাপতি প্রথমে জিব্রাল্টারে অবতরণ করেন। জিব্রাল্টার-নামের সঙ্গে ঐ আরব-সেনাপতির স্মৃতি জড়িত আছে। ওঁর নাম ছিল টারিক্, আর জিব্রাল্টারের আসল নাম জবল-উৎ-টারিক্।
স্পেন জয় করতে বিশেষ বেগ পেতে হল না। আরবগণ ফ্রান্সের দক্ষিণ অঞ্চলে প্রবেশ করল। দেখা যাচ্ছে, মহম্মদের মৃত্যুর এক শো বছরের মধ্যে আরব-সাম্রাজ্য দক্ষিণ-ফ্রান্স, স্পেন হয়ে বরাবর উত্তর-আফ্রিকা থেকে সুয়েজ পর্যন্ত এবং বরাবর আরব পারশ্য আর মধ্য-এশিয়া থেকে মঙ্গোলিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। ভারতবর্ষের কেবলমাত্র সিন্ধুদেশ তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। আরবগণ দু দিক থেকে ইউরোপ আক্রমণ করেছিল, সরাসরি কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্ থেকে, আর আফ্রিকার মধ্য দিয়ে ফ্রান্সে। দক্ষিণ ফ্রান্সে আরবগণ সংখ্যায় ছিল অল্প; অনেক দূরে চলে যাওয়াতে নিজেদের দেশ থেকে সাহায্যও বড়ো-একটা পায় নি। বিশেষত আরবদেশ তখন মধ্য-এশিয়া জয় করতে ব্যস্ত। কিন্তু তথাপি ফ্রান্সের ঐ আরবদের ভয়ে পশ্চিম-ইউরোপ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঠল এবং কয়েকটি দেশ সম্মিলিত হয়ে আরবদের বিরুদ্ধে একটা জোট পাকাল। এই সম্মিলিত দলের নেতা হলেন চার্ল্স্ মর্টেল; ৭৩২ খৃষ্টাব্দে ফ্রান্সের অন্তর্গত টুর্স্-নামক স্থানে এক যুদ্ধে তিনি আরবদিগকে পরাজিত করেন। ইউরোপ রক্ষা পেল। জনৈক ঐতিহাসিকের কথায়, পৃথিবীজোড়া সাম্রাজ্য যখন প্রায় করায়ত্ত হয়ে এসেছে তখনই আরবদের এই পরাজয় ঘটল। বাস্তবিক, ঐ যুদ্ধে আরবগণ জয়লাভ করলে ইউরোপের ইতিহাস অন্যরূপ হত। কোথায় থাকত খৃষ্টধর্ম? ইউরোপের ধর্ম হত ইসলাম। আরও কত কী পরিবর্তনই না ঘটত! যাক, ওসব কল্পনামাত্র। আসল কথা, আরবদের অগ্রগতি ব্যাহত হল ফ্রান্সে। কিন্তু স্পেনে তাদের আধিপত্য বজায় ছিল কয়েক শো বছর।
একটা যাযাবর মরুজাতি কিনা স্পেন থেকে মঙ্গোলিয়া পর্যন্ত এক বিরাট সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হল। এদের বলা হত সারাসেন জাতি, অর্থাৎ মরুভূমির অধিবাসী। কিন্তু আশ্চর্য, এই মরুজাতি শীঘ্রই নাগরিক জীবন আর বিলাসবৈভবে অভ্যস্ত হয়ে উঠল; নগরে নগরে গড়ে উঠল বিরাট অট্টালিকা। কিন্তু যতই দেশ জয় করে থাকুক না কেন, ওদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়াবিবাদের অভ্যাসটা দূর হয় নি। এই সময়ে আবার বিরোধের একটা বিশেষ কারণও ছিল। কে নেতৃত্ব পাবে, খলিফা হবে, এই নিয়ে হামেশাই বিরোধ বাধত। কেননা, আরবদেশের নেতা হওয়া মানে একটা বিরাট সাম্রাজ্যের পরিচালন-ক্ষমতা হাতে পাওয়া। সামান্য ঝগড়াবিবাদ, পারিবারিক কলহ থেকে একেবারে গৃহযুদ্ধ বেধে যেত। এই ধরনের বিরোধের ফলে ইসলামধর্মের মধ্যে একটা বিভেদ সৃষ্টি হল, গড়ে উঠল দুটি পৃথক সম্প্রদায়—সিয়া আর সুন্নি। এই দুই সম্প্রদায় এখনও আছে।
আবুবকর আর ওমর এই দুই মহান খলিফার শাসনকালের পরেই নানা উপদ্রবের সৃষ্টি হতে লাগল। বিরোধ লেগেই ছিল। মহম্মদের কন্যা ফতিমার স্বামী আলি অল্পকালের জন্যে খলিফা হয়েছিলেন; তাঁকে হত্যা করা হয়। কিছুকাল পরে তাঁর পুত্র হুসেনকে সপরিবারে কারবালার মাঠে হত্যা করা হয়। এই শোচনীয় ঘটনাকে স্মরণ করেই মুসলমানেরা, বিশেষত সিয়া সম্প্রদায়, প্রতিবৎসর মহরমের মাসে শোকোৎসব করে থাকে।
খলিফার বিশেষত্ব আর রইল না; সে এখন পূর্ণক্ষমতাবিশিষ্ট রাজা হয়ে বসল। গণতন্ত্রের আদর্শ উধাও হল। নামে ধর্মগুরু থাকলেও প্রকৃতপক্ষে কয়েকজন খলিফা ইসলামধর্মের অবমাননাই করেছিলেন।
প্রায় এক শো বছর-কাল মহম্মদের বংশের এক শাখা থেকে খলিফা নিযুক্ত হয়েছিল। এদের বলা হত ওমায়েদ। এই সময়ে দামাস্কাস নগর ছিল রাজধানী। খুব সন্দর শহর ছিল এই দামাস্কাস। কত গির্জা, প্রাসাদোপম অট্টালিকা, আর ফোয়ারা। দামাস্কাস নগরের জলসরবরাহ-ব্যবস্থা ছিল চমৎকার। এই সময়ে আরবগণ নূতন ধরনের এক স্থাপত্যশিল্প গড়ে তুলেছিল, শাদাসিধে অথচ সুন্দর ও চিত্তাকর্ষক। স্তম্ভ, তোরণ, মসজিদের চূড়া, গম্বুজ ইত্যাদিতে ঐ শিল্পের বিকাশ হয়েছিল। অদ্যাপি স্পেনে এই স্থাপত্যশিল্পের অত্যুৎকৃষ্ট নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। ভারতেও এই শিল্পের আমদানি হয়েছিল, কিন্তু ভারতবর্ষ ওটাকে আলাদাভাবে গ্রহণ না করে নিজস্ব পদ্ধতি ও আদর্শের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলেছে।
সাম্রাজ্য আর ঐশ্বর্য এনেছে বিলাসিতা, এবং বিলাসের সামগ্রী ও খেলাধূলা। ঘোড়দৌড়, শিকার, পোলো এবং দাবাখেলা আরবদের খুব প্রিয় ছিল। গানবাজনার প্রতি তাদের একটা অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল।
ক্রমশ নারীসমাজেও একটা বিশেষ পরিবর্তন ঘটতে লাগল। আরবদেশে স্ত্রীলোকেরা পর্দানশিন ছিল না। অবরোধ প্রথা না থাকায় তারা প্রকাশ্যে চলাফেরা করত, গির্জা কিংবা সভাসমিতিতে যেত, এমনকি বক্তৃতাও দিত। কিন্তু ক্রমে আরবগণ পূর্ব-রোম আর পারশ্য এই দুটি প্রাচীন সাম্রাজ্যের কতকগুলো আচার ব্যবহার ও রীতিনীতির অনুকরণ করতে শুরু করল। অথচ পূর্ব-রোম সাম্রাজ্যকে তারাই পরাজিত করেছিল, ধ্বংস করেছিল পারশ্যকে; আর শেষ পর্যন্ত কিনা এই দুই সাম্রাজ্যের যত-কিছু খারাপ আচারব্যবহার গ্রহণ করল নিজেরা। কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্ আর পারশ্যের প্রভাবেই নাকি আরবদের নারীসমাজে অবরোধ প্রথার সৃষ্টি হয়। ক্রমে ‘হারেম’-ব্যবস্থাও প্রচলিত হল; সামাজিকভাবে স্ত্রী-পুরুষের দেখাসাক্ষাৎ বিরল হয়ে উঠল। দুর্ভাগ্যবশত নারীর এই অবরোধপ্রথা মুসলিম সমাজের একটা বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়াল এবং মুসলমান-আমলে ভারতবর্ষও সেটা গ্রহণ করল। ভাবতে অবাক লাগে, এখনও অনেকে এই বর্বর প্রথা মেনে চলছে। যারা পর্দানশিন তাদের সঙ্গে বহির্জগতের কোনো সংযোগ থাকে না। এদের কথা ভাবলেই আমার জেলখানা কিংবা চিড়িয়াখানার কথা মনে পড়ে। একটা জাতির লোকসংখ্যার অর্ধেকই যদি এক ধরনের কয়েদখানায় অবরুদ্ধ থেকে যায় তবে সে জাতির উন্নতি কি সম্ভব?
সুখের বিষয়, ভারতবর্ষ অতি দ্রুত এই কুপ্রথা পরিত্যাগ করছে। এমনকি মুসলমানসমাজও এই বন্ধন থেকে নিজেকে অনেকটা মুক্ত করে এনেছে। তুরস্কে কামাল পাশা এই প্রথার বিলোপ সাধন করেছেন। আর মিশর থেকেও এটা লোপ পাচ্ছে।
আর-একটা কথা বলে এই চিঠি শেষ করছি। গোড়াতে এই ধর্মের প্রতি আরবদের ভীষণ অনুরাগ থাকলেও পরধর্মসহিষ্ণুতাও তাদের ছিল। জেরুজালেমে খলিফা ওমর এই বিষয়ে বিশেষ অবহিত ছিলেন। স্পেনে খৃষ্টধর্মাবলম্বীদের ধর্মাচরণে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল। ভারতবর্ষে একমাত্র সিন্ধুদেশ ছাড়া আর কোথাও আরবগণ আধিপত্য করে নি বটে, কিন্তু মেলামেশা যথেষ্ট ছিল; অথচ দু জাতির মধ্যে বরাবর মধুর সম্পর্কই বজায় রয়েছে। এই সময়ের ইতিহাসে সবচেয়ে লক্ষ্য করবার বিষয় হল, মুসলমান আরবদের পরমতসহিষ্ণুতা আর ইউরোপে খৃষ্টানদের অসহিষ্ণুতা।