বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/আরব দেশ—মধ্যযুগ হতে বর্তমান যুগে উত্তরণ

উইকিসংকলন থেকে

১৬৮

আরব দেশ—মধ্যযুগ হতে বর্তমান যুগে উত্তরণ

৩রা জুন, ১৯৩৩

 আরব অঞ্চলের অন্যান্য দেশের কথা তোমাকে বলেছি, কিন্তু খাস আরব দেশটির সম্বন্ধে এখন পর্যন্ত কিছু বলি নি। আরবি ভাষা, আরবি সংস্কৃতি এবং ইসলামধর্মের জন্মস্থান হচ্ছে এই দেশটি। আরবি সংস্কৃতি এইখানেই জন্মলাভ করে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল, অথচ দেশটি নিজে রয়ে গেল অত্যন্ত সেকেলে এবং মধ্যযুগীয় হয়ে; আমাদের আধুনিক সভ্যতার হিসাবে মিশর, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, ইরাক প্রভৃতি আরব-অঞ্চলের এর প্রতিবেশী দেশগুলি সকলেই একে বহুদূর পিছনে ফেলে এগিয়ে চলে গেল। আরব অতি বিশাল দেশ, এর আকার এবং আয়তন প্রায় ভারতবর্ষের দুই-তৃতীয়াংশের সমান। অথচ এই সমস্ত দেশটির মোট লোকসংখ্যা মাত্র চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ লক্ষের মতো; তার মানে ভারতবর্ষের মোট লোকসংখ্যার প্রায় সত্তর বা আশি ভাগের এক ভাগ। এই থেকেই বোঝা যায় এদেশের জনবসতি মোটেই ঘন নয়; বস্তুত এর বেশির ভাগ জায়গাই হচ্ছে মরুভূমি। এই জন্যই ধনলোভী দিগ্বিজয়ীরা কোনোদিন এদেশে পদার্পণ করে নি; সমস্ত পৃথিবী যখন আধুনিক সভ্যতার আবর্তে পড়ে দিনের পর দিন বদলে গেছে, তারই মাঝখানে দাঁড়িয়ে এই দেশটি চিরদিন সেই মধ্যযুগেরই একটি স্মৃতিচিহ্ন হয়ে বেঁচে রয়েছে, এখানে রেলওয়ে টেলিগ্রাফ টেলিফোন প্রভৃতি কিছুই নেই। এর অধিবাসীদের বেশির ভাগই ছিল গৃহহীন যাযাবর জাতির লোক, তাদের নাম বেদুইন। বালুকাচ্ছন্ন মরুভূমির বুকের উপর দিয়ে এরা ইতস্তত ঘুরে ঘুরে বেড়াত, এদের বাহন ‘মরুসাগরের জাহাজ’ দ্রুতগামী উট, আর ছিল এদের চমৎকার সুন্দর আরবি ঘোড়া—সৌন্দর্য আর গতির জন্য তার পৃথিবীতে বিখ্যাত। এদের সমাজ ছিল পিতৃ-পুরুষ প্রধান; হাজার বছর ধরে সে সমাজের জীবনযাত্রা ঠিক একই ভাবে চলে এসেছে। তার পর এল বিশ্বযুদ্ধ, পৃথিবীর আরও নানা বস্তুর মতো সে জীবনযাত্রাকেও একেবারেই বদলে দিয়ে গেল।

 মানচিত্রের দিকে তাকালেই আরবের বিরাট উপদ্বীপটিকে দেখতে পাবে, তার একদিকে লোহিতসাগর, অন্যদিকে পারশ্য-উপসাগর। এর দক্ষিণে আরব সাগর, উত্তরে প্যালেস্টাইন ট্রান্স-জর্ডন এবং সিরিয়ার মরুভূমি, এর উত্তর-পূর্ব কোণে ইরাকের তৃণশ্যামল উর্বর উপত্যকাভূমি। পশ্চিম-সমুদ্রতীরে, লোহিত সাগরের ঠিক গায়েই হচ্ছে হেজাজ প্রদেশ, ইসলাম ধর্মের আদি জন্মভূমি। এরই মধ্যে রয়েছে পবিত্র নগরী মক্কা এবং মদিনা, রয়েছে জেড্ডা বন্দর—মক্কায় যাবার পথে হাজার হাজার তীর্থযাত্রী প্রতিবৎসর এই বন্দরে এসে নামে। আরবদেশের মাঝখান এবং পূর্বদিকে একেবারে পারশ্য সাগর পর্যন্ত স্থান জুড়ে আছে নেজ্‌দ্। হেজাজ আর নেজ্‌দ্‌ই হচ্ছে আরবের প্রধান দুটি বিভাগ। দক্ষিণ-পশ্চিমে রয়েছে ইয়েমেন, প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের কালে এর নাম দেওয়া হয়েছিল আরেবিয়া ফেলিক্স—মানে সৌভাগ্যশালী আরব বা সুখী আরব। আরবের বেশির ভাগ জায়গাই ঊষর মরুভূমি, শুধু এই অঞ্চলটাই উর্বর এবং শস্যপ্রসূ—তাই এই নাম। এই অঞ্চলটাতে লোকের বসতিও ঘন, তা অনুমান করাই যায়। প্রায় দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তভাগে হচ্ছে এডেন। এটা আছে ব্রিটিশদের দখলে; প্রাচ্য আর পাশ্চাত্ত্য জগতের মধ্যে যত জাহাজ চলাচল করে সকলেই তারা এই বন্দরে একবার থেমে যায়।

 বিশ্বযুদ্ধের আগে প্রায় গোটা দেশটাই তুর্কির অধীন ছিল, অন্তত তুর্কিকে তার উপরস্থ প্রভু বলে স্বীকার করত। কিন্তু নেজ্‌দ্‌-অঞ্চলে আমির ইব্‌নে সৌদ তখন স্বাধীন রাজা বলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে নিচ্ছিলেন, একটু একটু করে দেশ জয় করে পারশ্য-উপসাগরের দিকে ক্রমশ এগিয়ে চলছিলেন। ইব্‌নে সৌদ ছিলেন মুসলমানদের একটি বিশেষ দল বা সম্প্রদায়ের নেতা। এই সম্প্রদায়টির নাম ওয়াহাবি সম্প্রদায়, অষ্টাদশ শতাব্দীতে আবদুল ওয়াহাব এর প্রতিষ্ঠা করেন। বস্তুত ইসলাম ধর্মের সংস্কার সাধনের জন্যই এদের আন্দোলন, কতকটা খৃস্টান ধর্মে পিউরিটানদের মতো। মুসলমান জনসাধারণের মধ্যে অনেকগুলো উৎসব-অনুষ্ঠান এবং পয়গম্বর-পূজা খুব বেশি ছড়িয়ে পড়েছিল, তারা বিশিষ্ট পীর পয়গম্বরদের কবর এবং দেহাবশেষকে পূজা করত। ওয়াহাবিরা ছিল এর বিরোধী, তারা একে বলত পৌত্তলিকতা। ইউরোপেও রোমান ক্যাথলিকরা সেণ্টদের মূর্তি এবং দেহাবশেষ পূজো করত বলে পিউরিটানরা তাদের পৌত্তলিক নাম দিয়েছিল। অতএব দেখা যাচ্ছে, আরবের অন্যান্য মুসলমানদের সঙ্গে ওয়াহাবিদের যে সংগ্রাম তার মূলে শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নয়, ধর্মগত বিরোধও তার মধ্যে ছিল।

 বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আরবে ব্রিটিশরা বিষম চক্রান্ত শুরু করল; আরবের সমস্ত সর্দার আর নেতাদের সাহায্য এবং ঘুষ দিয়ে হাত করবার জন্য ব্রিটেনের এবং ভারতের টাকা সেখানে জলের মতো ঢালা হতে লাগল। এই সর্দারদের যত রকম সম্ভব আশ্বাস এবং প্রতিশ্রুতি দিল ব্রিটেন, এবং তুরস্কের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে এদের উস্‌কে তুলল। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেল দুজন সর্দার আছে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী, পরস্পরের সঙ্গে তারা লড়াই করছে, এবং দু-জনেই লড়াই করছে ব্রিটেনের গোপন অর্থসাহায্যের জোরে! শেষপর্যন্ত ব্রিটেনের উস্‌কানির জোরে মক্কার শরীফ হুসেন আরব-বিদ্রোহের ধ্বজা উড়িয়ে দিলেন। হুসেন স্বয়ং হজরত মহম্মদের বংশধর, অতএব আরবদেশে তাঁর প্রচুর সম্মান-সম্ভ্রম; এই জন্যই ব্রিটেন তাঁকে যোগ্যব্যক্তি বলে ধরে নিয়েছিল। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সমগ্র আরবদেশকে একত্র সংহত করে তাঁকেই সেই রাজ্যের রাজা করে দেওয়া হবে।

 ইব্‌নে সউদ ছিলেন অনেক বেশি চতুর লোক। তাঁর চাপে পড়ে ব্রিটেন তাঁকে স্বাধীন নরপতি বলে স্বীকার করল। ব্রিটেনের কাছ থেকে যৎসামান্য একটা অর্থসাহায্যও তিনি দয়া করে গ্রহণ করতে রাজি হলেন, তার পরিমাণ প্রতি মাসে ৫,০০০ পাউণ্ড, অর্থাৎ মাসে প্রায় ৭০,০০০ টাকা। এর বদলে ব্রিটেনকে তিনি আশ্বাস দিলেন, যুদ্ধে তিনি নিরপেক্ষ থাকবেন, কোনোপক্ষেই যোগ দেবেন না। অতএব অন্যরা যুদ্ধ করতে লাগল, আর সেই অবসরে তিনি নিজের প্রতিপত্তিটাকে কায়েমী করে নিলেন, শক্তি বাড়িয়ে নিলেন—অবশ্য কাজটা সম্পন্ন হয় অনেকটা ব্রিটেনের টাকা দিয়েই। তুরস্কের সুলতান তখনও খলিফা বলে স্বীকৃত; তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন বলে মুসলমান দেশগুলি ইতিমধ্যে শরীফ হুসেনের উপর চটে গেছেন, ভারতবর্ষও সেই দলে। ইব্‌নে সউদ্ শুধু নিরপেক্ষ হয়ে চুপচাপ বসে রইলেন; পৃথিবীর অবস্থার যে পরিবর্তন হচ্ছিল সেটাকে বেশ ভালো করেই কাজে লাগিয়ে নিলেন তিনি। ধীরে ধীরে নিজের একটা প্রচণ্ড সুনাম গড়ে তুললেন, সবাই জানল তিনিই হচ্ছেন মুসলমানধর্মের রুস্তম, একমাত্র ভরসার স্থল।

 দক্ষিণে ছিল ইয়েমেন। ইয়েমেনের রাজা বা ইমাম যুদ্ধের প্রথম থেকেই একেবারে শেষদিন পর্যন্ত তুরস্কের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা দেখালেন, কিছুতেই সুলতানের পক্ষ ত্যাগ করলেন না। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র হতে তিনি ছিলেন বহু দূরে, বেশি কিছু করবার সাধ্য তাঁর ছিল না। তুরস্কের পরাজয়ের পর তিনি স্বতঃই স্বাধীন হয়ে গেলেন। ইয়েমেন এখনও স্বাধীন রাষ্ট্র।

 যুদ্ধ যখন শেষ হল তখন দেখা গেল আরবে ইংরেজরাই প্রভুত্ব করছে, হুসেন এবং ইব্‌নে সউদ্ দুজনকেই তাদের কার্যসিদ্ধির যন্ত্র বলে ব্যবহার করতে চেষ্টা করছে। ইব্‌নে সউদ্ বুদ্ধিমান লোক, ব্রিটেনের হাতের পুতুল হবার কোনো মতলবই তাঁর ছিল না। শরীফ হুসেনের পরিবারটি কিন্তু অকস্মাৎ একেবারে রাজকীয় মহিমায় মণ্ডিত হয়ে উঠল—তার পিছনে অবশ্য ছিল ব্রিটেনের শক্তির ঠেলা। হুসেন নিজে হেজাজের রাজা হলেন; এক ছেলে ফয়জল হলেন সিরিয়ার রাজা; আরেক ছেলে আবদুল্লাকে ব্রিটিশরা ট্রান্স-জর্ডন বলে যে নূতন একটি ছোটো রাজ্য তৈরি হয়েছে তার রাজা বানিয়ে দিল। এদের এই মহিমা অবশ্য বেশিদিন টিঁকল না। ফরাসিরা ফয়জলকে সিরিয়া থেকে তাড়িয়ে দিল; ইব্‌নে সউদের ওয়াহাবি সেনার অভিযানের মুখে হুসেনের রাজাগিরি হাওয়া হয়ে উবে গেল। ফয়জল আবার বেকার হয়ে পড়েছেন দেখে ব্রিটিশরা আবার তাঁর একটা হিল্লে করে দিল, ইরাকের রাজার চাকরিটা দিয়ে। ফয়জল এখনও ইরাকের রাজা, ব্রিটিশের অনুগ্রহেই অবশ্য আজও তিনি সেখানে রাজত্ব করছেন।

 হুসেন অল্পদিন মাত্র হেজাজে রাজত্ব করেছিলেন। তারই মাঝখানে, ১৯২৪ সনে, আঙ্গোরাতে তুর্কি পার্লামেণ্ট খলিফার পদ উচ্ছেদ করে দিল। খলিফা বলে তখন আর কেউ নেই। হুসেনের দুঃসাহসের অভাব ছিল না, তিনি লাফ দিয়ে সেই শূন্য সিংহাসনে গিয়ে বসে পড়লেন, ঘোষণা করলেন তিনিই ইসলাম ধর্মের খলিফা। ইব্‌নে সউদ্ দেখলেন এতদিনে তাঁর সুযোগ এসেছে। জাতীয়তাবাদী আরব এবং আন্তর্জাতিক মুসলমান সম্প্রদায়, সকলকেই তিনি হুসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে তাতিয়ে তুললেন। হুসেন দুঃসাহসী অনধিকারী, জোর করে খলিফার আসনে বসেছেন অথচ সে আসন ন্যায়ত তাঁর নয়—হুসেনের বিরুদ্ধে তিনিই হয়ে উঠলেন ইসলামের রক্ষাকারী বীর। অতি সযত্নে প্রচারকার্য চালিয়ে অন্যান্য সকল দেশের মুসলমানদেরও সমর্থন তিনি আয়ত্ত করে নিলেন। ভারতবর্ষ থেকেও খিলাফৎ কমিটি তাঁকেই তাঁদের শউভকামনা জ্ঞাপন করলেন। বাতাস কোন্‌দিকে বইছে ব্রিটিশদের সেটা চোখ এড়াল না, তারা বুঝল এতদিন যাকে তারা পিছন থেকে উৎসাহ দিয়ে এসেছে তার জয়ের আর আশা নেই। দেখেশুনে তারা হুসেনের পাশ থেকে নিঃশব্দে সরে দাঁড়াল। হুসেনকে যে অর্থ সাহায্য তারা করছিল তাও বন্ধ হয়ে গেল। বেচারি হুসেনকে এতদিন বহু আশ্বাস বহু প্রতিশ্রুতিই তারা দিয়ে এসেছে; হঠাৎ তিনি অবাক হয়ে দেখলেন তাঁর সঙ্গী বা সম্বল বলে কিছুই আর নেই, এদিকে প্রবল একজন শত্রু তাঁকে আক্রমণ করতে ছুটে আসছে।

 কয়েক মাসের মধ্যেই, ১৯২৪ সনের অক্টোবর মাসে, ওয়াহাবিরা মক্কা শহরে এসে প্রবেশ করল; তাদের গোঁড়া ধর্মমতের প্রমাণস্বরূপ গোটাকতক কবর তারা নষ্ট করে ফেলল। এই অনাচারের সংবাদে মুসলমান দেশগুলিতে বিষম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হল; ভারতবর্ষেও প্রচণ্ড বিক্ষোভ দেখা দিল। এর পরের বছর ইব্‌নে সউদ্ মদিনা এবং জেড্ডা দখল করলেন, হুসেন এবং তাঁর পরিবারবর্গেকে হেজাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হল। ১৯২৬ সনের গোড়াতে ইব্‌নে সউদ্ নিজেকে হেজাজের রাজা বলে ঘোষণা করলেন। তাঁর এই নূতন পদটিকে সুপ্রতিষ্ঠ করবার এবং বিদেশস্থ মুসলমানদের সমর্থন লাভ করবার উদ্দেশ্যে তিনি একটি নিখিল-বিশ্ব মুসলমান কংগ্রেসের আয়োজন করলেন। ১৯২৬ সনের জুন মাসে মক্কা শহরে এই কংগ্রেসের অধিবেশন হল। এই কংগ্রেসে তিনি অন্যান্য সমস্ত দেশ থেকেও মুসলমান প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ করেছিলেন। নিজে খলিফা হয়ে বসবার কোনো অভিপ্রায় তাঁর ছিল বলে মনে হয় না; তা ছাড়া তিনি নিজে ওয়াহাবি, হতে চাইলেও বহু মুসলমানই তাঁকে খলিফা বলে স্বীকার করতে রাজি হতেন না। মিশরের রাজা ফুয়াদের জাতীয়তা-বিরোধী এবং স্বৈরতন্ত্রী শাসনের কাহিনী আমরা আগেই দেখেছি; তাঁর অবশ্য খলিফা হবার জন্য খুবই আগ্রহ ছিল। কিন্তু তাঁকে খলিফা বলে মানতে কেউই রাজি নয়, এমনকি মিশরের তাঁর নিজের প্রজারা পর্যন্ত নয়। হুসেন খলিফার আসনে উঠে বসেছিলেন; যুদ্ধে হারবার পর সে আসন তিনি ছেড়ে দিলেন।

 মক্কার সে ইসলামী কংগ্রেসে বিশেষ কোনো জরুরি সিদ্ধান্ত স্থির হল না। সেরকম কিছু করবার জন্যও সম্ভবত তা ডাকা হয় নি। ওটা ছিল শুধু ইব্‌নে সউদের একটা চাল, নিজের প্রতিষ্ঠাটাকে দৃঢ়তর করে নেবার একটা ফিকির, বিশেষ করে বিদেশী শক্তিদের সামনে। ভারতবর্ষ থেকে খিলাফৎ কমিটির প্রতিনিধি হয়ে যাঁরা গিয়েছিলেন, তাঁরা নিরাশ হয়ে এবং ইব্‌নে সউদের উপরে চটে-মটে ফিরে এলেন; আমার যতদূর মনে পড়ছে মওলানা মহম্মদ আলিও এঁদের মধ্যে ছিলেন। কিন্তু ইব্‌নে সউদের তাতে ক্ষতিবৃদ্ধি কিছু হল না। ভারতীয় খিলাফৎ কমিটির সাহায্য যখন তাঁর প্রয়োজন ছিল তখন তিনি তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে নিয়েছেন; এখন আর সে তাঁর উপরে প্রসন্ন না থাকলেও তাঁর যায় আসে না।

 অল্পদিনের মধ্যে ইব্‌নে সউদ্ প্রায় সমস্ত দেশটাই দখল করে নিলেন। বাকি রইল শুধু ইয়েমেন, সেটা তার প্রাচীন ইমামের স্বাধীন রাজ্যই হয়ে রইল। দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের এই স্থানটি বাদে সমগ্র দেশটাতেই ইব্‌নে সউদ্ রাজা হয়ে বসলেন। তারপর তিনি নিজেকে নেজ্‌দের রাজা বলে ঘোষণা করলেন; অতএব এবার তিনি হলেন ডবল রাজা—হেজাজের রাজা এবং নেজ্‌দের রাজা। বিদেশী শক্তিগুলোও তাঁকে স্বাধীন রাজা বলে স্বীকার করে নিল। মিশরে এখনও বিদেশীরা নানারকমের বিশেষ অধিকার ভোগ করছে, তাঁর রাজ্যে কিন্তু বিদেশীদের সেরকম কোনো অধিকারই তিনি দিলেন না। এমনকি সে রাজ্যের এলাকায় বসে মদ বা অন্য রকমের উত্তেজক পানীয় খাবার পর্যন্ত ক্ষমতা তাদের ছিল না।

 সৈনিক এবং যোদ্ধা হিসাবে ইব্‌নে সউদ্ নিজের কৃতিত্ব সপ্রমাণ করেছেন; এবার তিনি আরও কঠিনতর একটা কাজে ব্রতী হলেন, তাঁর রাজ্যে আধুনিক যুগের অবস্থা এবং ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠান করতে লেগে গেলেন। আরবদেশ পিতৃ-পুরুষপ্রধান সমাজের সেই প্রাচীন যুগে বাস করছিল, সেখান থেকে এক লাফে তাকে আধনিক যুগে উত্তীর্ণ করে নিয়ে আসা—কাজ বড়ো সহজ নয়। কিন্তু দেখেশুনে মনে হচ্ছে এ কাজটিতেও ইব্‌নে সউদ্ প্রচুর সাফল্য লাভ করেছেন; পৃথিবীসুদ্ধ লোক অবাক হয়ে দেখছে, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ হিসাবেও তিনি বড়ো কম যান না।

 প্রথমেই যে কাজটি তিনি সম্পন্ন করলেন সে হচ্ছে দেশের মধ্যকার বিশৃঙ্খলা নিবারণ। বণিক এবং তীর্থযাত্রীদের চলাচলের যে বড়ো বড়ো পথগুলো ছিল, অতি অল্পদিনের মধ্যেই সে পথে চলাফেরা তিনি সম্পূর্ণ নিরাপদ করে তুললেন। এটা তাঁর একটা প্রকাণ্ড কীর্তি। অসংখ্য তীর্থযাত্রী সর্বদাই এই সব পথে চলাচল করে, এতদিন এরা পথের সর্বত্রই দস্যুর হাতে লাঞ্চিত হয়ে পথ চলত—তারা এখন তাঁর উপরে স্বভাবতই আশীর্বাদ বর্ষণ করছে।

 এর চেয়েও অনেক বেশি বাহাদুরির কাজ হয়েছে তাঁর, যাযাবর বেদুইনদের গৃহবাসী করে তোলা। হেজাজ জয়েরও আগে থেকে তিনি এদের স্থায়ী বাসস্থানে বসিয়ে দেওয়া শুরু করেছিলেন; এমনি করেই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন তিনি। বেদুইনরা স্বভাবত অস্থির-প্রকৃতি, ভ্রমণবিলাসী এবং স্বাধীনতা-প্রিয়; তাদের একজায়গাতে স্থির করে বসানো সহজ ব্যাপার নয়। তবু এই কাজেও ইব্‌নে সউদ্ অনেকখানিই সাফল্য অর্জন করেছেন। দেশের শাসন-ব্যবস্থার বহুদিকে বহু উন্নতি সাধন করেছেন তিনি। এরোপ্লেন মোটরগাড়ি টেলিফোন ইত্যাদি করে আধুনিক সভ্যতার বহু নিদর্শনেরই আবির্ভাব আরবে হয়েছে। অতি ধীরে ধীরে, তবু অতি নিশ্চিত গতিতে, হেজাজ আধুনিক সজ্জায় সজ্জিত হয়ে উঠছে। মধ্যযুগ থেকে এক লাফে বর্তমান যুগে পার হয়ে চলে আসা সহজ কথা নয়; এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন কাজ হচ্ছে মানুষের মন আর মতামতের পরিবর্তন ঘটানো। দেশে যে নূতনতরো প্রগতি এবং পরিবর্তনের আমদানি করা হচ্ছে, আরবরা অনেকে তা ভালো চোখে দেখে নি; পাশ্চাত্ত্য জগতের সব নূতন ধরনের কল-কারখানা তাদের ইঞ্জিন মোটরগাড়ি এরোপ্লেন দেখে তারা ভড়্‌কে গেছে, বলেছে এগুলো ঠিক শয়তানের সৃষ্টি। এইসব নূতন বস্তু আমদানির বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ জানাল; ১৯২১ সনে একবার ইব্‌নে সউদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ পর্যন্ত করল। ইব্‌নে সউদ্ অত্যন্ত ধীর-স্থিরভাবে, যুক্তিতর্ক দিয়ে, বুদ্ধি খেলিয়ে এদের বুঝিয়ে দলে টানতে চেষ্টা করলেন, অনেককে টানতে পারলেনও। কতক লোক তখনও বিদ্রোহী হয়ে রইল, ইব্‌নে সউদ্ তাদের যুদ্ধে পরাভূত করে দিলেন।

 এর পরে ইব্‌নে সউদ্‌কে আরেকটি নূতন বিপদে পড়তে হল; সে বিপদে অবশ্য তখন পৃথিবীসুদ্ধ মানুষকেই পড়তে হয়েছিল। ১৯৩০ সন থেকে সমস্ত জগৎ জুড়ে ব্যবসায় বাণিজ্যের একটা প্রকাণ্ড মন্দা শুরু হয়ে গেছে। পাশ্চাত্ত্য জগতের বড়ো বড়ো শিল্পাশ্রয়ী দেশগুলোরই এতে ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি—এখনও দিন দিন এই মন্দার জোর বাড়ছে, এখনও এর চাপে দমবন্ধ হয়ে তারা ছট্‌ফট্ করছে। পৃথিবী-জোড়া বাণিজ্যের বাজারের সঙ্গে আরবের বিশেষ সম্পর্ক নেই; কিন্তু এই মন্দার আঘাত তার উপরে গিয়ে পড়েছে আর একটা ভাবে। বছর বছর বহু তীর্থযাত্রী মক্কায় হজ করতে যায়; এদের কাছ থেকে যে আয় হয় সেইটেই হচ্ছে ইব্‌নে সউদের রাজস্বের প্রধান উৎস। সাধারণত প্রতি বৎসর বিদেশ থেকে প্রায় এক লক্ষের মতো তীর্থযাত্রী মক্কায় যেত। ১৯৩০ সনে এদের সংখ্যা হঠাৎ কমে গিয়ে দাঁড়াল চল্লিশ হাজারে; এখনও দিন দিন এদের সংখ্যা কমেই চলেছে। এর ফলে রাজ্যের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা সম্পূর্ণভাবে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে; আরবের বহু স্থানে লোকের চরম দৈন্য দেখা দিয়েছে। টাকার অভাবে ইব্‌নে সউদ্‌কেও নানা দিক থেকেই মুশকিলে পড়তে হয়েছে, সংস্কার সাধনের যে-সব পরিকল্পনা তাঁর ছিল তার অনেকখানিই আর চলতে পারছে না। ইব্‌নে সউদ্ বিদেশীদের তাঁর রাজ্যে কোনো অধিকার বা ইজারা দিতে কিছুতেই রাজি হননি; তিনি ঠিকই বুঝেছিলেন, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ তুলে দেবার সুযোগ বিদেশীদের দিলে সঙ্গে সঙ্গেই দেশে বিদেশীদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বেড়ে যাবে। এবং তার ফলেই আবার বিদেশীরা দেশের প্রত্যেকটি ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে আসবে, রাজ্যেরও স্বাধীনতা খর্ব হয়ে যাবে। তাঁর সে ভয় অমূলকও নয়; উপনিবেশ এবং অধীন দেশগুলি যত দুঃখ আজ পর্যন্ত সয়েছে তার প্রায় সব কিছুরই উৎপত্তি হয়েছে এই বিদেশীদের শোষণ আর প্রতিপত্তি থেকে। ইব্‌নে সউদের কথা ছিল, হোক দারিদ্র্য তবু স্বাধীন থাকাই আমাদের ভালো; স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে তার বদলে কিছুটা প্রগতি আর ধনসম্পদে আমাদের প্রয়োজন নেই।

 কিন্তু এবার এই বাণিজ্য-সংকটের চাপে পড়ে সেই ইব্‌নে সউদ্‌ও তাঁর নীতি একটু খানি বদলাতে বাধ্য হয়েছেন, বিদেশীদের খানিকটা সুযোগ-সুবিধা দিতে এখন তিনি প্রস্তুত। কিন্তু তাহলেও তাঁর রাজ্যের স্বাধীনতাকে রক্ষা করবার দিকে তাঁর লক্ষ্যের অভাব নেই; তার দরুন যথোচিত শর্ত এবং ব্যবস্থাও তিনি গোড়া থেকেই করে রাখছেন। এখনকার মতো এইসব ইজারা ইত্যাদি দেওয়া হবে শুধু বিদেশের মুসলমান প্রতিষ্ঠানগুলিকে। যেমন, একেবারে প্রথমেই যে-কটি অধিকার তিনি দিয়ে দিয়েছেন তার মধ্যে একটি পেয়েছে ভারতবর্ষের একটি মুসলমান ধনিকদল—জেড্ডা কদর থেকে মক্কা পর্যন্ত একটি রেলওয়ে তৈরি করবার অনুমতি এঁদের দেওয়া হয়েছে। আরবদেশে এই রেলওয়েটি হবে একটা প্রকাণ্ড ব্যাপার—কারণ এর ফলে বাৎসরিক হজ তীর্থযাত্রার প্রকৃতিটাই একদম বদলে যাবে। শুধু যে তীর্থযাত্রীদেরই এতে উপকার হবে তা নয়, আরববাসীদের দৃষ্টিভঙ্গিটাকেই আধুনিক করে তোলার ব্যাপারে এতে অনেকখানি সাহায্য হবে।

 আরবদেশে বর্তমানে একটিমাত্র রেলওয়ে আছে, এর কথা আমি আগের একটি চিঠিতেই তোমাকে বলেছি। এর নাম হচ্ছে হেজাজ রেলওয়ে। সিরিয়ার মধ্যে আছে বাগদাদ রেলওয়ের স্টেশন আলেপ্পো; এই হেজাজ রেলওয়ের গাড়ি মদিনা থেকে আলেপ্পো পর্যন্ত যায়।

 এই চিঠির গোড়ার দিকে বলেছি, আরবের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের দেশ ইয়েমেনকে ‘আরেবিয়া ফেলিক্স’ বলা হত। বাস্তবিকপক্ষে কিন্তু দক্ষিণ আরবের প্রায় পারশ্য উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটা বিরাট অংশকেই এই নামে অভিহিত করা হত। অথচ সে অঞ্চলটির পক্ষে নামটা একেবারেই মানায় না, কারণ সেটা হচ্ছে একটা অত্যন্ত ঊষর মরুভূমি। সম্ভবত প্রাচীন কালে এর কথা লোকের ভালো করে জানা ছিল না, তাই থেকেই এই ভুলটার উৎপত্তি। অতি অল্পদিন আগে পর্যন্ত এই অঞ্চলটা ছিল একটা অনাবিষ্কৃত, অজ্ঞাত দেশ—পৃথিবীর বুকে যে দু-চারটা স্থানের আজও মানুষ হিসাব পায় নি, মানচিত্র আঁকতে পারে নি, তারই মধ্যে এটাও একটা।