বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/আর-একটি নববর্ষের দিন
১২০
আর-একটি নববর্ষের দিন
আজ নববর্ষ। সূর্যের চতুর্দিক ঘিরে পৃথিবীর আর একটি চক্কর দেওয়া সম্পূর্ণ হল। পৃথিবীর কোনো পর্বদিন নেই, নেই কোনো ছুটি; অবিরাম গতিতে সে শূন্যপথে ছুটে চলেছে। তার বুকের উপরে অসংখ্য ক্ষুদ্র প্রাণী ঘুর্ঘুর্ করে বেড়াচ্ছে, পরস্পরের সঙ্গে ঝগড়া মারামারি করছে বহিীন সর্পের ভরে নিজেদের মনে করছে সৃষ্টির সারবস্তু, বিশ্বের নিয়ন্তা—তাদের তা কী হল না হল সে নিয়ে পৃথিবীর কিছুমাত্র চিন্তা নেই। পৃথিবী তার সন্তানদের কথা ভাবে না; কিন্তু আমরা নিজেদের কথা না ভেবে পারি না তো। নববর্ষের দিনে অনেকেই আমরা জীবনের যাত্রাপথে একটা ক্ষণ থেমে বিশ্রাম নিই, একবার পিছন ফিরে তাকাই, অতীতের হিসেবনিকেশ করি; আবার সামনে মুখ ফেরাই, ভবিষ্যতের জন্যে আশা-সঞ্চয়ের চেষ্টা করি। আমিও তাই আজ অতীতের কথা ভাবছি। কারাগারে এই আমার পর পর তৃতীয়বার নববর্ষের দিন এল; মাঝখানে একবার অবশ্য বেশ কয়েকটা মাস বাইরের মুক্ত পৃথিবীতে যেতে পেরেছিলাম। আরও বেশি আগের কথা যদি বলি, দেখা যাচ্ছে গেল এগারো বছরের মধ্যে আমার পাঁচটি নববর্ষের দিনই কেটেছে কারাগারে। আরও কত দিন, আরও কত নববর্ষের দিন এমনি করে কারাগারে আমার কাটাতে হবে, বসে বসে তাই ভাবছি।
কিন্তু জেলখানার ভাষায় আমি এখন একজন ‘দাগি’ হয়ে গেছি, তাও বহু বারের দাগি, জেলখানায় থাকা আমার বেশ অভ্যাসও হয়ে গেছে এতদিনে। আমার বাইরের জীবনের সঙ্গে এর আশ্চর্য তফাত। বাইরে আমার দিন কাটে কাজকর্ম, বড়ো বড়ো সভা-সমিতি, বক্তৃতা আর এখানে-ওখানে ছুটোছুটি নিয়ে। এখানে তার কিছু নেই; সমস্ত শান্ত, নড়াচড়ারও বালাই নেই আমার; দীর্ঘ কাল ধরে আমি চেয়ারে বসে বসে কাটাই, অনেক সময় চুপ করেই বসে থাকি। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস আসে আর চলে যায়, একটা থেকে আর-একটাকে আলাদা করে দেখবার মতো বৈচিত্র্যও কিছু থাকে না তাদের মধ্যে। অতীতটাকে মনে হয় যেন একটা আবছায়া ছবি, তার কোনো কিছুই স্পষ্ট হয়ে চোখে পড়ছে না। গত কাল বলতে মনে পড়ে গ্রেপ্তার হওয়ার দিনটিকে; তার পরে আজ পর্যন্ত মাঝখানের দিনগুলো সমস্তই যেন ফাঁকা, তার কোনো চিহ্নই মনের উপর পড়ে নি। এ যেন একেবারে উদ্ভিদের জীবন, একই জায়গাতে শিকড় গেড়ে দাঁড়িয়ে আছি, বেঁচে আছি; সে অস্তিত্বের কোনো বর্ণনা নেই, যুক্তি নেই, নিঃশব্দ নিশ্চল অস্তিত্ব। অনেকসময় বাইরের জগতের ঘটনাগুলো কারাগারে আবদ্ধ বন্দীর কাছে আশ্চর্য, একটু-বা বিস্ময়কর বলেই মনে হয়; সে যেন কত দূরের কত অবাস্তব ঘটনা, যেন ছায়ামূর্তির অভিনয়। তখন আমাদের মধ্যে দুটো প্রকৃতি গজিয়ে ওঠে, একটা সক্রিয় একটা নিষ্ক্রিয়; আসে দু রকমের জীবনযাত্রা, আলাদা দুটো ব্যক্তিত্ব, ঠিক যেন ডাঃ জেকিল আর মিঃ হাইড। রবার্ট্ লুই স্টিভেন্শনের লেখা এই গল্পটি তুমি পড়েছ নিশ্চয়?
তবু সময়ে সবই অভ্যাস হয়ে যায়, জেলখানার কর্মসূচী আর একঘেয়েমি পর্যন্ত। তা ছাড়া বিশ্রামও দেহের পক্ষে প্রয়োজন, শান্তি প্রয়োজন মনের পক্ষে—এর ফলে আমরা ভাবতে শিখি।
এবার হয়তো তুমি বুঝবে, তোমাকে এই চিঠিগুলো আমি লিখেছি কেন। তোমার হয়তো এগুলো পড়তে ভালো লাগে না; মনে হয়, কী বিরক্তিকর আর কী লম্বা! কিন্তু এই চিঠিগুলোই আমার কারাজীবনের দিনগুলোকে ভরে তুলেছে, একটা করবার মতো কাজ দিয়েছে আমাকে, সে কাজে প্রচুর আনন্দ। আজ থেকে ঠিক দু বছর আগে, এমনি একটি নববর্ষের দিনে নাইনি জেলে বসে আমি এই চিঠি লেখা শুরু করেছিলাম। আবার জেলে ফিরে এসেও সেই চিঠি লেখাই আমি চালিয়ে যাচ্ছি। কখনও-বা আমি একটানা অনেক সপ্তাহ ধরে মোটেই চিঠি লিখি নি, আবার কখনও-বা প্রত্যেক দিনই লিখেছি। লেখার ঝোঁক যখন চেপেছে, কাগজ-কলম নিয়ে বসে গেছি, তখন যেন বিচরণ করেছি অন্য একটি জগতে, সেখানে তুমি আছ আমার প্রিয়সঙ্গিনী, জেলখানা আর তার কাণ্ড-কারখানাকে একেবারেই ভুলে গেছি। কাজেই এই চিঠিগুলো আমার কাছে ছিল যেন জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রতীক।
এই-যে চিঠিটা এখন লিখছি এটার ক্রমিক-সংখ্যা হচ্ছে ১২০। মাত্র নয় মাস হল বেরিলি জেলে বসে এই সংখ্যার প্রথম চিঠিটা ছিল। এর মধ্যেই এতখানি লিখে ফেলেছি, ভাবতে আশ্চর্য লাগে। এই পর্বতপ্রমাণ চিঠি যখন একেবারে একসঙ্গে গিয়ে তোমার ঘাড়ে অবতীর্ণ হবে তখন তুমি কী ভাববে আর বলবে, সেটা ভেবেও ভয় পাচ্ছি। কিন্তু জেলখানাকে একটুখানি ফাঁকি দিলাম, একটুখানি বাইরে বেড়িয়ে এলাম, এতে তুমি নিশ্চয়ই রাগ করবে না। মানিক আমার, তোমার সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছে সাত মাসেরও বেশি হল। কী দীর্ঘ এই সময়টা!
আমার চিঠিতে যে গল্প বলেছি সে শ্রুতিমধুর নয়। ইতিহাস বস্তুটাই অমধুর। অসীম প্রগতি হয়েছে মানুষের, তার দরুণ তার গর্বেরও অবধি নেই; কিন্তু আজও সে একটা অত্যন্ত অকরুণ স্বার্থপর জানোয়ারই হয়ে আছে। তবুও হয়তো মানুষের সেই স্বার্থপরতা কলহপ্রিয়তা আর অকরুণার দীর্ঘ এবং কালিমাচ্ছন্ন ইতিহাস ভেদ করে প্রগতির অরুণ আলোর দেখা মেলে। আমি লোকটা একটু আশাবাদী, একটু ভরসার দৃষ্টি নিয়েই সব-কিছুকে দেখতে চাই আমি। কিন্তু আশাবাদী হয়েও এ কথা আমাদের ভুললে চলবে না যে, আমাদের চার পাশে পাপের আর অন্ধকারের অভাব নেই; ভুললে চলবে না যে, না ভেবেচিন্তে আশা করতে গেলে সেই আশাই অস্থানে গিয়ে ন্যস্ত হবার ভয়। আমাদের এই জগৎটা চিরকাল যা ছিল এবং এখনও যা আছে, তা দেখে এখনও আশা করবার মতো জোর বিশেষ খুঁজে পাই নে। আদর্শবাদীর পক্ষে, এবং যা শোনে তাই নির্বিচারে বিশ্বাস করে নিতে যার দ্বিধা আছে তার পক্ষে, বড়ো কঠিন স্থান এটা। নানান রকমের প্রশ্ন জেগে ওঠে যার কোনো সহজ উত্তর নেই; নানান রকমের সংশয় জেগে ওঠে যার সহজ মীমাংসা নেই। এতখানি মূঢ়তা, এতখানি দুঃখ জগতে থাকবে কেন? অতি পুরোনো প্রশ্ন; আমাদেরই এই দেশে আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে রাজপুত্র সিদ্ধার্থকে এই প্রশ্নটিই ব্যাকুল করে তুলেছিল। গল্প শোনা যায়, এই প্রশ্ন তিনি বার বার নিজেকে করেছিলেন; তার পরে, তবেই এল তাঁর সত্যের উপলব্ধি, তিনি বুদ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি নাকি নিজেকে নিজে প্রশ্ন করেছিলেন:
“এ কী করে হয় যে, ব্রহ্ম জগৎকে সৃষ্টি করেছেন অথচ তাকে দুঃখে রেখেছেন ডুবিয়ে? কারণ, সর্বশক্তিমান হয়েও যদি তিনি একে দুঃখেই রেখে থাকেন তবে তিনি মঙ্গলময় নন। আর শক্তিমানই যদি না হন তিনি তবে ঈশ্বর হবেন কী করে?”
আমাদের এই দেশে স্বাধীনতার জন্যে সংগ্রাম চলেছে; তবু আমাদেরই বহু দেশবাসী তার দিকে আদৌ মনোযোগ দিচ্ছেন না, নিজেদের মধ্যে তর্কাতর্কি ঝগড়া করে দিন কাটাচ্ছেন, নিজের নিজের দল বা ধর্মগত সম্প্রদায় বা সংকীর্ণ শ্রেণীকে নিয়েই তাঁদের চিন্তা সীমাবদ্ধ; সমগ্র জাতির বৃহত্তর কল্যাণের কথা তাঁরা ভুলে বসে আছেন। আবার অনেকে আছেন, স্বাধীনতার স্বপ্ন তাঁদের চোখে নেই, তাঁরা—
“অত্যাচারীর সঙ্গে মিত্রতা করলেন, তাদের পোষ মানলেন,
তাদের ফেলে-দেওয়া মকুট আর মন্ত্র কুড়িয়ে নিয়ে করলেন পরিধান,
নিজেকে সজ্জিত করলেন ছিন্ন বস্ত্র আর নূতন-রঙ-করা খোলামকুচি দিয়ে।”
আইন আর শৃঙ্খলার ছদ্মবেশে এখানে রাজত্ব চলেছে অত্যাচারের; ধারা তার কাছে মাথা নোয়াতে রাজি নয় তাদেরই ভেঙে চূর্ণ করবার তার চেষ্টা। আশ্চর্য, যে জিনিষটা হবে দুর্বল আর উৎপীড়িতের রক্ষা পাবার আশ্রয়, সেই হয়ে বসেছে উৎপীড়কের হাতের অস্ত্র। এই চিঠিতে আমি ইতিমধ্যেই অন্যদের কয়েকটি কথা উদ্ধৃত করেছি; তবু আরও একটি বচন আমি উদ্ধৃত করব। কথাটি আমার বড়ো ভালো লাগে; আমাদের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে এটি ভারি সুন্দর মিলে যায়। এটি যে বইয়ের কথা সেটি মঁতেস্কুর লেখা; ইনি ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর একজন ফরাসি দার্শনিক, আমার আগের একটি চিঠিতে আমি তোমাকে এঁর নাম বলেছি। কথাটি হচ্ছে:
“আইনের ছায়ার তলায় এবং বিচারের আবরণে যে অত্যাচার সাধিত হয় তার চেয়ে নিষ্ঠুর অত্যাচার আর নেই; কারণ, সেখানে যে নৌকো তাদের জল থেকে টেনে তুলল তারই তলায় হতভাগাদিগকে চেপে ডুবিয়ে মারা হচ্ছে।”
চিঠিটা বড়ো বেশি দুঃখের সুরে লেখা হল; নববর্ষের চিঠির পক্ষে এটা অত্যন্ত অশোভন। বাস্তবিক কিন্তু আমি দঃখিত নই; দুঃখিত হব আমরা কিসের জন্যে? আমরা কাজ করে যাচ্ছি, সংগ্রাম চালাচ্ছি একটা মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে, সেই তো আমাদের আনন্দ! আমাদের আছেন একজন মহান নেতা, একজন প্রিয় বন্ধু, একজন বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শক; তাঁর দৃষ্টি আমাদের মনে শক্তির সঞ্চার করে, তাঁর স্পর্শ এনে দেয় উন্মাদনা; আমরা জানি, আমাদের জন্যে অপেক্ষা করে রয়েছে নিশ্চিত সাফল্য, আজ হোক কাল হোক, তাকে আয়ত্ত আমরা করবই। জীবনের পথে চলতে প্রতি-পদে বাধা ভেঙে চলতে হয়, যুদ্ধ করে জয়লাভ করে করে এগোতে হয়। এই যুদ্ধ, এই বাধা যদি না থাকত তবে জীবনটাই হয়ে যেত নিরানন্দ, বৈচিত্র্যহীন।
আর তুমি, আমার প্রিয় কন্যা, তুমি আছ জীবনের প্রবেশ-দ্বারে দাঁড়িয়ে-দুঃখকে বিষাদকে নিয়ে মাথা ঘামাবার তোমার কোনোই প্রয়োজন নেই। জীবনকে এবং তার সমস্ত দানকে তুমি গ্রহণ করবে আনন্দিত প্রসন্ন মুখে; যেসব বাধাবিঘ্ন তোমার পথে থাকবে তাদেরও অভ্যর্থনা করে নেবে, তাদের জয় করে তুমি যে আনন্দ পাবে তার ভরসায়।
আজ তা হলে বিদায় নিই। পুনদর্শনায় চ’—আশা করা যাক, তার যেন খুব বেশি দেরি না থাকে!