বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ইংলণ্ডের সাথে আয়ার্ল্যাণ্ডের সাতশো বছরের সংগ্রাম

উইকিসংকলন থেকে

১৩৯

ইংলণ্ডের সাথে আয়ার্ল্যাণ্ডের সাত শো বছরের সংগ্রাম

৪ঠা মার্চ, ১৯৩৩

 এবার চলো আবার আটলাণ্টিক পাড়ি দিয়ে পুরোনো পৃথিবীতে ফিরে যাই। জাহাজে বা এরোপ্লেনে চড়ে যেতে যেতে প্রথম যে দেশটি চোখে পড়ে সে হচ্ছে আয়ার্ল্যাণ্ড; অতএব সেইখানেই প্রথম থামা যাক। ইউরোপের দূর-পশ্চিম প্রান্তে এই সবুজ সুন্দর দ্বীপটি আটলাণ্টিক মহাসাগরে পা ডুবিয়ে বসে রয়েছে। ছোটো একটি দ্বীপ, জগতের ইতিহাসের বড়ো বড়ো ধারা এসে একে স্পর্শ করে না। কিন্তু ছোটো হলেও এর জীবনে রহস্য আর রোমাঞ্চের অভাব নেই; বহু শত বৎসর ধরে এর মানুষেরা জাতীয় স্বাধীনতার জন্য অদম্য সাহস আর আত্মোৎসর্গের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে এসেছে। শক্তিশালী প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়াই করতে অধ্যবসায়ের সে এক অপূর্ব কাহিনী! এই সংগ্রাম শুরু হয়েছিল সাড়ে-সাত শো বছর আগে, আজও তার শেষ হয় নি। ভারতবর্ষে চীনে এবং অন্যান্য দেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রকাশ আমরা দেখেছি। কিন্তু আয়ার্ল্যাণ্ডকে একেবারে সেই প্রথম যুগ থেকেই এর ধাক্কা সইতে হয়েছে। তবু সে কোনোদিন স্বেচ্ছায় এর কাছে মাথা নত করে নি; প্রায় প্রত্যেক পুরুষেই একবার করে তার অধিবাসীরা ইংলণ্ডের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। আয়ার্ল্যাণ্ডের শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা স্বাধীনতার জনো যুদ্ধ করে প্রাণ দিয়েছে অথবা ইংরেজ কর্তৃপক্ষের বিচারে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছে। অসংখ্য আইরিশম্যান তাদের প্রাণের চেয়ে প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে বিদেশে গিয়ে বাস করতে বাধ্য হয়েছে। অনেকে ইংলণ্ডের সঙ্গে যুদ্ধরত অন্য কোনো দেশের সেনাদলে যোগ দিয়েছে; যেন এই ভাবেও তারা তাদের মাতৃভূমিকে শাসন এবং পীড়ন করছে যে দেশ, তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একহাত লড়ে নিতে পারে। আয়ার্ল্যাণ্ডের নির্বাসিত সন্তানরা বহু দূর দূর দেশে ছড়িয়ে পড়েছে; যেখানে গেছে সেইখানেই তারা বুকের মধ্যে আয়ার্ল্যাণ্ডের একটি ছবিকে চিরকাল বহন করে নিয়ে গেছে।

 অসুখী মানষ আর পীড়নক্লান্ত ও সংগ্রামরত দেশ, যারা বর্তমানকে নিয়ে অতৃপ্ত, বর্তমান জীবনে যারা কোনো সান্ত্বনা বা শান্তি খুঁজে পাচ্ছে না, তাদের একটা অভ্যাস আছে, তারা অতীতের দিকে ফিরে ফিরে তাকায়, তার মধ্যেই সান্ত্বনা খোঁজে। এই অতীতকে তারা কল্পনায় খুব বড়ো করে দেখে, অতীত দিনের ঐশ্বর্যের কথা স্মরণ করে মনে শান্তি পায়। বর্তমান যেখানে কেবল বিষাদ আর হতাশায় আচ্ছন্ন, অতীতই সেখানে হয়ে ওঠে ক্লান্ত মনের আশ্রয়স্থান, তার মধ্যেই সে শান্তি পায়, অনুপ্রেরণা পায়। পুরোনো দিনের আঘাত আর অভিযোগগুলোও তার মনে কেবলই বাজতে থাকে, তাকে সে ভুলতে পারে না। এইভাবে কেবলই পিছনদিকে ফিরে তাকানোটা জাতির পক্ষে স্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়। স্বাস্থ্যবান মানুষ আর স্বাস্থ্যবান জাতি কাজ করে চলে বর্তমানকে নিয়ে, চোখ মেলে তাকায় ভবিষ্যতের পানে। কিন্তু যে মানব বা যে জাতি স্বাধীনতা হারিয়েছে, সুস্থও সে নয়; তাই তার পক্ষে পিছন ফিরে তাকানা, কিছুটা অন্তত সেই অতীতের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।

 এইজনাই আয়ার্ল্যাণ্ড আজও তার অতীতকে আঁকড়ে ধরে রয়েছে; প্রাচীন কালে একা যখন সে স্বাধীন ছিল সেই যুগের স্মৃতি আজও আয়ার্ল্যাণ্ডের অধিবাসীদের অতি গর্বের ধন; স্বাধীনতার জন্য যত অসংখ্য সংগ্রাম সে করেছে এবং বিজেতার হাতে যত উৎপীড়ন তাকে সইতে হয়েছে তার প্রতিটি কাহিনী তাদের মনে জীবন্ত হয়ে আছে। পিছন ফিরে তারা তাকায়, চোদ্দ শো বছর আগে, খৃষ্টাব্দ ষষ্ঠ শতাব্দীর দিকে—সেই যুগে আয়ার্ল্যাণ্ড ছিল পশ্চিম-ইউরোপে বিদ্যাচর্চার বড়ো কেন্দ্র, বহু দূর দেশ থেকে ছাত্ররা সেখানে পড়তে আসত। রোমের সাম্রাজ্য তখন ভেঙে পড়েছে; বর্বর ভ্যাণ্ডাল আর হুনের আক্রমণে রোমান সভ্যতা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। শোনা যায়, সেই দুর্দিনে সংস্কৃতি আর সভ্যতার শিখাকে যে কটি দেশ সন্তর্পণে বাঁচিয়ে রেখেছিল, আবার ইউরোপে সংস্কৃতির পুনরজ্জীবন না হওয়া পর্যন্ত তাকে নিবতে দেয় নি, আয়ার্ল্যাণ্ড তাদের মধ্যে একটি। বহু কাল আগেই আয়ার্ল্যাণ্ড খৃস্টানধর্ম গ্রহণ করেছিল। অনেকে বলেন, আয়ার্ল্যাণ্ডের প্রাচীন ঋষি সেণ্ট প্যাট্রিক এই ধর্ম সে দেশে প্রচার করেন। আয়ার্ল্যাণ্ড থেকেই এই ধর্ম উত্তর-ইংলণ্ডে বিস্তৃত হয়। আয়ার্ল্যাণ্ডে বহু মঠ স্থাপিত হয়; ভারতের প্রাচীন আশ্রম বা বৌদ্ধমঠের মতো এগুলোও বিদ্যাচর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল; এখানেও অনেক সময়ে খোলা মাঠে বসেই শিক্ষাদান করা হত। এইসব মঠ থেকে প্রচারকরা যেতেন উত্তর এবং পশ্চিম-ইউরোপের দেশগুলোতে, সেখানকার পৌত্তলিকদের মধ্যে খৃষ্টের নূতন ধর্মের কথা প্রচার করতে। আয়ার্ল্যাণ্ডের এইসব মঠের কয়েকজন সাধুর হাতের লেখা চমৎকার পুঁথি আছে, আর সেগুলো তাঁরা চিত্রিতও করেছিলেন। ডাবলিনে আজকাল এইরকম একটি চমৎকার হস্তলিখিত পুঁথি আছে, এর নাম The Book of Kells (বুক অব্ কেল্‌স্); এটি সম্ভবত লেখা হয়েছিল প্রায় বারো শো বছর আগে।

 ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে শুরু করে এই দুই বা তিন শো বছর-কালকে অনেক আইরিশম্যান আয়ার্ল্যাণ্ডের স্বর্ণযুগ বলে মনে করেন; এই সময়েই গেলিক সংস্কৃতির চরম সমৃদ্ধি ঘটেছিল। হয়তো এতখানি সময়ের ব্যবধান আছে বলেই এইসব প্রাচীন দিনের কাহিনীগুলো আরও বেশি রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে, আসলে যা ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি মহৎ বলে মনে হয়। আয়ার্ল্যাণ্ডে সে যুগে বহু বিভিন্ন জাতির বাস ছিল, এরা সারাক্ষণই পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহ করত। ভারতবর্ষের মতোই আয়ার্ল্যাণ্ডেরও দুর্বলতার হেতু ছিল তার এই আভ্যন্তরীণ কলহ। তার পর এল ডেন আর নর্সম্যান্‌রা; ইংলণ্ড আর ফ্রান্সের মতো এখানেও তারা আইরিশম্যানদের বিধস্ত করে দিল, দেশের প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড অঞ্চল দখল করে বসল। একাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ব্রায়ান বোরুমা বলে আয়ার্ল্যাণ্ডের একজন রাজা ডেনদের পরাজিত করলেন এবং কিছুকালের মতো সমস্ত আয়ার্ল্যাণ্ডকে একত্র সংবদ্ধ করলেন। আয়ার্ল্যাণ্ডের ইতিহাসে তাঁর নাম প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরে দেশটি আবার ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

 একদশ শতাব্দীতে নর্ম্যানবাহিনী ইংলণ্ড জয় করে, তাদের অধিনায়ক ছিলেন বিজয়ী উইলিয়ম। এর এক শো বছর পরে অ্যাংলো-নর্ম্যানরা আয়ার্ল্যাণ্ড আক্রমণ করল; দেশের যে অংশটি তারা জয় করে নিল তার নাম দিল ‘পেল’। ইংরেজি ভাষায় একটি চল্‌তি কথা আছে—beyond the pale বা পেলের ও ধারে। এর মানে হচ্ছে, কোনো-একটি বিশেষ দল বা সামাজিক শ্রেণীর বহির্ভূত, বা জাতে ঠেলা; কথাটা সম্ভবত এই ‘পেল্’ নাম থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। অ্যাংলো-নর্মানদের এই অভিযান হয় ১৯৬৯ সনে। এর ফলে প্রাচীন গেলিক সভাতা অত্যন্ত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল। আইরিশ উপজাতিদের সঙ্গে যুদ্ধও সেই থেকেই শুরু হল, সে যুদ্ধ প্রায় অবিশ্রাম গতিতে দীর্ঘকাল চলে এসেছে। প্রায় এক শো বছর ধরে যুদ্ধ চলল; বর্বরতা আর নিষ্ঠুরতার একেবারে চরম দেখা গেল এই যুদ্ধে। ইংরেজরা (আংলো-নর্ম্যানদের তখন এই নামেই ডাকা চলত) চিরকালই আইরিশদের একটা অর্ধ-সভ্য জাতি বলে জানত। দুয়ের মধ্যে জাতির তফাত ছিল; ইংরেজরা বংশে অ্যাংলো-স্যাক্‌সন, আইরিশরা কেল্ট্। তার পর এল ধর্মেরও তফাত—ইংরেজ এবং স্কচরা প্রোটেস্ট্যাণ্ট হয়ে গেল, আইরিশরা তখনও রোমান ক্যাথলিক ধর্মকেই নিষ্ঠার সঙ্গে ধরে রইল। অতএব ইংলণ্ড আর আয়ার্ল্যাণ্ডের মধ্যে এই যেসব যুদ্ধ চলল, এর মধ্যে জাতিগত এবং ধর্মগত যুদ্ধের সমস্তখানি রূঢ়তা আর বিদ্বেষ প্রকাশ পাচ্ছিল। ইংরেজরা বেশ ইচ্ছা করেই এই দুই জাতির মধ্যে মিলনের পথে বাধা সৃষ্টি করতে লাগল। এমনকি, ইংরেজ এবং আইরিশের মধ্যে বিয়ে নিষিদ্ধ করেও তারা একটি আইন জারি করল (কিল্‌কেনির একটি স্ট্যাটিউট্‌)

 আয়ার্ল্যাণ্ডের প্রজারা বার বার বিদ্রোহ করল, প্রত্যেক বারই অত্যন্ত নিষ্ঠুর পীড়ন চালিয়ে সে বিদ্রোহ দমন করা হল। আইরিশ প্রজারা স্বভাবতই তাদের এই বিদেশী শাসক আর পীড়কদের দ্বেষের চোখে দেখত; সুযোগ পেলেই তারা বিদ্রোহ করে বসত, অনেক সময় ভালো সুযোগ ছাড়াই করত। এদের একটি পুরোনো প্রবচন আছে—"ইংলণ্ডের দুর্দিন মানেই আয়ার্ল্যাণ্ডের সুদিন"। রাজনৈতিক এবং ধর্মনৈতিক দুইরকম বিরোধেই আয়ার্ল্যাণ্ড বহুবার ইংলণ্ডের শত্রু ফ্রান্স স্পেন প্রভৃতি দেশের পক্ষ অবলম্বন করল। ইংরেজরা এতে অত্যন্ত চটে গেল। মনে করল, আয়ার্ল্যাণ্ডও তাদের পিছন থেকে এসে ছুরি মেরেছে, বিশ্বাসঘাতকতা করেছে; সুতরাং তারাও যতদূর সম্ভব নৃশংস আচরণ করে আয়ার্ল্যাণ্ডের উপর তার শোধ তুলল।

 রানী এলিজাবেথের রাজত্বকালে (ষোড়শ শতাব্দীতে) স্থির হল, আয়ার্ল্যাণ্ডের বিদ্রোহী প্রজাদের দমন করবার জন্যে সেখানে কতকগুলো ইংরেজ জমিদার বসিয়ে দেওয়া হবে, এরাই তাদের শায়েস্তা করে দেবে। অতএব আইরিশদের বহু জমি বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হল, আয়ার্ল্যাণ্ডের প্রাচীন ভূস্বামীশ্রেণীকে উৎসন্ন করে দিবে সেখানে বিদেশী ভূস্বামীদের এনে বসানো হল। অতএব আয়ার্ল্যাণ্ড হয়ে পড়ল বস্তুত একটা চাষি-প্রজার দেশ, তার ভূস্বামীরা সকলেই বিদেশী। শত শত বৎসর চলে যাবার পরেও এই ভূস্বামীরা আইরিশ প্রজার কাছে সেই বিদেশীই হয়ে রইলেন, তাদের সঙ্গে মিশলেন না।

 এলিজাবেথের পরে রাজা হলেন প্রথম জেম্‌স্। আইরিশদের শায়েস্তা করবার ব্যাপারে তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন। তিনি স্থির করলেন, আয়ার্ল্যাণ্ডে বিদেশীদের একটা রীতিমতো উপনিবেশ বসিয়ে দিতে হবে। এর জন্য উত্তর আয়ার্ল্যাণ্ডে আল্‌স্টার অঞ্চলের ছ’টি কাউণ্টির প্রায় সমস্ত জমিই রাজা স্বয়ং বাজেয়াপ্ত করে নিলেন। বিনা পয়সায় জমি পাওয়া যাচ্ছে, ইংলণ্ড আর স্কট্‌ল্যাণ্ড থেকে একেবারে ঝাঁকে ঝাঁকে ভাগ্যান্বেষী আয়ার্ল্যাণ্ডে গিয়ে হাজির হল। এই ইংরেজ এবং স্কচদের অনেকেই জমি নিয়ে চাষ-আবাদ করতে বসে গেল। এই উপনিবেশ-প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সাহায্য করতে লণ্ডন-শহরকেও অনুরোধ জানানো হল; “আল্‌স্টারে প্রজাবসতি নির্মাণের” এই নূতন কাজ সম্পন্ন করবার জন্যে লণ্ডনে একটি বিশেষ সমিতি গড়া হল। এই জন্যই উত্তর-আয়ার্ল্যাণ্ডের ডেরি-শহরটির নাম হয়ে গেল লণ্ডনডেরি।

 এইভাবে আল্‌স্টার হয়ে উঠল আয়ার্ল্যাণ্ডের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটেনের একটি অংশবিশেষ; আইরিশরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হল, এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। আল্‌স্টারের এই নবীন অধিবাসীরাও আবার আইরিশদের দ্বেষ এবং অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখত। আয়ার্ল্যাণ্ডকে ভেঙে দুটি বিরোধী অংশে পরিণত করবার জন্যে ইংলণ্ডের কী চমৎকার একটা সাম্রাজ্যবাদী শয়তানি চাল। তার পর তিন শো বছর চলে গেছে, আল্‌স্টারকে নিয়ে এই সমস্যার আজও সমাধান হয় নি।

 আল্‌স্টারে এই প্রজাবসতি স্থাপন করার অল্পদিন পরেই ইংলণ্ডে প্রথম চার্ল্‌স্ আর পার্লামেণ্টের মধ্যে গৃহযুদ্ধ বাধল। পার্লামেণ্টের পক্ষে ছিল পিউরিটান আর প্রোটেস্ট্যাণ্টরা। আয়ার্ল্যাণ্ড ক্যাথলিক ধর্মে বিশ্বাসী, সে স্বভাবতই রাজার পক্ষ গ্রহণ করল। আল্‌স্টার গেল পার্লামেণ্টের দিকে। আইরিশদের ভয় হল, পিউরিটানরা ক্যাথলিক মতকে বিধ্বস্ত করে দেবে—এ ভয় করার সঙ্গত কারণও ছিল। অতএব তারা ১৬৪১ সনে একটি প্রকাণ্ড বিদ্রোহ করে বসল। এই বিদ্রোহ এবং এর দমন-ব্যাপারে, দুই পক্ষই এমন অমানুষিক হিংস্রতা আর বর্বরতার পরিচয় দিল, আগের কোনো বিদ্রোহেই তা হয় নি। আইরিশ ক্যাথলিকরা প্রোটেস্ট্যাণ্টদের একেবারে নির্মমভাবে হত্যা করল। ক্রম্‌ওয়েল তার যে প্রতিশোধ নিলেন সেও অত্যন্ত ভয়ানক। বহু স্থানে আইরিশদের এবং বিশেষ করে ক্যাথলিক ধর্মযাজকদের নিঃশেষে কচুকাটা করা হল। আয়ার্ল্যাণ্ডের লোকেরা আজও ক্রম্‌ওয়েলের নামে উত্তেজিত হয়ে ওঠে।

 এতখানি বিভীষিকা এবং নৃশংসতার আঘাতেও কিন্তু আয়ার্ল্যাণ্ড দমল না; ঠিক এক পুরুষ পরেই আবার বিদ্রোহ এবং গৃহযুদ্ধ শুরু হল। এই যুদ্ধের দুটি ঘটনা বিখ্যাত হয়ে আছে, লণ্ডনডেরি আর লিমেরিক শহরের অবরোধ। আল্‌স্টার অঞ্চলের লণ্ডনডেরি শহরে প্রোটেস্ট্যাণ্টদের বাস; ১৬৮৮ সনে ক্যাথলিকধর্মী আইরিশরা এই শহর অবরোধ করল। শহরের লোকদের সমস্ত খাদ্য ফুরিয়ে গেল, তবু অনাহারে থেকেও তারা অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে শহর রক্ষা করতে লাগল। অবশেষে, চার মাস ধরে অবরোধ আর দুর্দশা চলবার পরে খাদ্য আর সাহায্য নিয়ে ইংলণ্ড থেকে জাহাজ এসে পৌঁছল। লিমেরিক-শহরে ১৬৯০ সনে অবস্থা হল এর বিপরীত; ইংরেজরা সেখানে ক্যাথলিকধর্মী আইরিশদের অবরোধ করে বসল। এই অবরোধে সবচেয়ে বেশি বীরত্ব দেখালেন প্যাট্রিক সার্স্‌ফীল্ড্‌; নিদারণ দুর্যোগ আর বিপর্যয়ের মধ্যেও তিনি অত্যন্ত দৃঢ়হস্তে শহর রক্ষা করতে লাগলেন। আইরিশ মেয়েরা পর্যন্ত এই শহর রক্ষার জন্য যুদ্ধ করেছিল; সার্স্‌ফীল্ড্‌ আর তাঁর বীর সৈনিকদের কাহিনী নিয়ে গেলিক ভাষায় বহু গান রচিত হয়েছিল; সে গান আজও আয়ার্ল্যাণ্ডের গ্রাম অঞ্চলে শোনা যায়। শেষ পর্যন্ত সার্স্‌ফীল্ড্‌ লিমেরিক শহর ব্রিটিশদের হাতে সমর্পণ করলেন, কিন্তু সেও তাদের সঙ্গে একটি মর্যাদাপূর্ণ শর্তে সন্ধি করে নিয়ে, তার আগে নয়। লিমেরিকের এই সন্ধির একটি শর্ত ছিল, আইরিশ ক্যাথলিকদের সমাজ এবং ধর্ম-সংক্রান্ত ব্যাপারে সম্পূর্ণ অধিকার দিতে হবে।

 লিমেরিকের এই সন্ধি কিন্তু টিঁকল না। ইংরেজরা, বা ঠিক করে বলতে গেলে আয়ার্ল্যাণ্ডে যে ইংরেজ ভূস্বামী পরিবারদের প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল তারা, এই সন্ধি ভেঙে ফেলল। এই পরিবারগুলো প্রোটেস্ট্যাণ্ট; ডাব্‌লিনে যে ব্রিটিশ পার্লামেণ্টের অধীনস্থ একটি ক্ষুদ্র পার্লামেণ্ট ছিল, সেখানে এরাই কর্তৃত্ব করত। লিমেরিকের সন্ধিতে ইংরেজরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা সত্ত্বেও, এরা কিছুতেই সমাজ এবং ধর্ম সংক্রান্ত ব্যাপারে ক্যাথলিকদের অধিকার দিতে রাজি হল না। তার বদলে তারা আরও ক্যাথলিকদের শাস্তিবিধান করবার বিশেষ আইন তৈরি করল; এবং জেনেশুনে ইচ্ছা করে এদের পশমের ব্যবসাটি নষ্ট করে দিল। প্রজাদের উপরে নির্মম পীড়ন চালিয়ে এরা জমি থেকে তাদের উৎখাত করে দিল। মনে রেখো, এটা করছিল মুষ্টিমেয় ক’জন বিদেশী প্রোটেস্ট্যাণ্ট ভূস্বামী; আর এর ফল ভুগতে হচ্ছিল যাদের তারাই হচ্ছে দেশের প্রজার অধিকাংশ; এরা ক্যাথলিক, এবং এদের মধ্যে অনেকেই সেই ভূস্বামীদের প্রজা। কিন্তু এই ইংরেজ ভূস্বামীদের হাতেই সমস্ত ক্ষমতা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই ভূস্বামীরাও আবার নিজের মহালে কেউ বাস করতেন না, থাকতেন দূরে; প্রজাদের সমর্পণ করে যেতেন তাঁদের নৃশংস অর্থলোভী কর্মচারী আর তহশীলদারদের হাতে।

 লিমেরিকের সন্ধি এরা ভাঙল, সে তো পুরোনো ব্যাপার। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ফলে দেশের লোকের মনে যে বিদ্বেষ এবং ক্রোধ জেগে উঠল সে আজও সম্পূর্ণ মিলিয়ে যায় নি; আয়ার্ল্যাণ্ডে ইংরেজরা যত হীন আচরণ করেছে তার কাহিনী হিসাবে আইরিশ জাতীয়তাবাদীদের মনে লিমেরিকের এই ব্যাপারটিই আজও সর্বাপেক্ষা কুৎসিত বলে বেঁচে রয়েছে। সে সময়ে এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, ধর্মমত নিয়ে পীড়ন ও অত্যাচার, এবং ভূস্বামীদের নিষ্ঠুর আচরণের জন্যে আয়ার্ল্যাণ্ডের বহু প্রজা দেশ ছেড়ে অন্যান্য দেশে চলে গিয়েছিল। আয়ার্ল্যাণ্ডের যুবকদের মধ্যে যারা সেরা তারাই সব বিদেশে চলে গেল, এবং যেখানে যে দেশ ইংলণ্ডের সঙ্গে যুদ্ধ করছে তারই সৈন্য হয়ে যুদ্ধ করতে অনুমতি চাইল। ইংলণ্ডের সঙ্গে যেখানেই যার যুদ্ধ হোক, এই আইরিশম্যানদের সেইখানেই ঠিক দেখতে পাওয়া যেত।

 ‘গালিভার্‌স্ ট্রাভ্‌ল্‌স্’ বইয়ের লেখক জোনাথান সুইফ্‌ট্‌ এই সময়ে বেঁচে ছিলেন (১৬৬৭ থেকে ১৭৪৫ সন পর্যন্ত তাঁর জীবনকাল)। ইংরেজদের উপরে তিনি কতখানি চটা ছিলেন তার কিছু পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর একটি উক্তি থেকে; তাঁর আইরিশ দেশবাসীদের উপদেশ দিয়ে তিনি বলেছিলেন, “ইংরেজদের যা পাও তাই পুড়িয়ে দেবে তোমরা, কেবল তাদের কয়লা ছাড়া।” ডাব্‌লিন শহরে সেণ্ট্‌ প্যাট্রিক্‌স্ ক্যাথিড্রালে তাঁর সমাধি রয়েছে; সমাধিস্তম্ভের উপরে যে স্মৃতিফলকটি আছে তার ভাষা আরও বেশি তীব্র। সম্ভবত এই স্মৃতিলিপি তিনি নিজেই রচনা করে গিয়েছিলেন:

এইখানে সমাহিত হয়েছে জোনাথান সুইফ্‌টের দেহ; ত্রিশ বছর ধরে তিনি ছিলেন এই ক্যাথিড্রালের ডীন। হিংস্র ঘৃণা এখন আর তাঁর হৃদরকে পীড়িত করছে না। যাও, পথিক, যদি পার, তাঁর অনুকরণ কোরো, যিনি স্বাধীনতা রক্ষা করবার জন্যে পুরুষের মতো লড়াই করে গেছেন।

 ১৭৭৪ সনে আমেরিকার স্বাধীনতা-সমর শুরু হল। কাজেই আটলাণ্টিকের ও পারে ব্রিটিশ সেনা পাঠাতে হল। আয়ার্ল্যাণ্ডে তখন বস্তুত ব্রিটিশ সৈন্য বলে কিছুই নেই। ও দিকে আবার শোনা যাচ্ছে, ফ্রান্স এসে আয়ার্ল্যাণ্ড আক্রমণ করবে; কারণ ফ্রান্সও ইতিমধ্যে ইংলণ্ডের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। অতএব আয়ার্ল্যাণ্ডের ক্যাথলিক আর প্রোটেস্ট্যাণ্ট, দুই পক্ষই দেশরক্ষার জন্যে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তুলল। কিছু দিনের মতো তারা পুরোনো শত্রুতা ভুলে গিয়ে একত্র মিলে কাজ করল, এবং তাই করতে গিয়েই নিজেদের শক্তির সন্ধান পেয়ে গেল। ইংলণ্ডকে আবারও বিদ্রোহের শাসানি দেওয়া হল। ইংলণ্ড দেখল, আমেরিকা তো হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, আবার বুঝি আয়ার্ল্যাণ্ডও যায়। ভয়ে ভয়ে সে আয়ার্ল্যাণ্ডকে একটি নিজস্ব স্বাধীন পার্লামেণ্ট গঠন করবার মঞ্জুরি দিয়ে দিল। কাজেই নামে অন্তত আয়ার্ল্যাণ্ড আর ইংলণ্ডের অধীন থাকল না, যদিও এরা উভয়ে তখনও একই রাজার অধীন হয়ে রইল। কিন্তু আয়ার্ল্যাণ্ডের পার্লামেণ্ট তখনও সেই পুরোনোকালের মতোই ক্ষুদ্র, সেখানে তখনও আগের মতোই ভূস্বামীদের আধিপত্য বজার রয়েছে, এবং তার সমস্ত আসনই রয়েছে প্রোটেস্টাণ্টদের দখলে। অতীত কালে এরাই ক্যাথলিকদের উপরে দারুণ অত্যাচার করেছে। তখনও নানা রকমে ক্যাথলিকদের উপরে অত্যাচার চলেছে। তফাতের মধ্যে হল শুধু এই প্রোটেস্ট্যাণ্ট আর ক্যাথলিকদের মধ্যে মনে হল যেন একটু সম্প্রীতির ভাব স্থাপিত হয়েছে। এই পার্লামেণ্টের নেতা ছিলেন হেন্‌রি গ্র্যাটান। তিনি নিজে প্রোটেস্ট্যাণ্ট। ক্যাথলিকরা বহু অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল, তাদের সেসমস্ত বাধাবিঘ্ন দূর করে দিতে ইনি অনেক চেষ্টা করলেন। সে চেষ্টা অবশ্য প্রায় সমস্তটাই বিফল হল।

 ইতিমধ্যে ফ্রান্সে বিপ্লব ঘটে গেল। তাই দেখে আয়ার্ল্যাণ্ডেও লোকের মনে বড়ো বড়ো আশা জেগে উঠল। আশ্চর্যের ব্যাপার, এই বিপ্লবের বার্তাকে ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যাণ্ট উভয়েই সমান আগ্রহে গ্রহণ করল। এই দুই পক্ষ ক্রমশ‍ই পরস্পরের মিত্র হয়ে উঠছিল। এদের দুই দলকে একত্র মিলিয়ে দেবার জন্যে এবং ক্যাথলিকদের মুক্তি দেবার জন্যে একটি সংঘ স্থাপিত হল, তার নাম ‘ইউনাইটেড আইরিশ মেন’ বা ‘মিলনসংঘ’। সরকার এই সংঘটিকে অনুমোদন করল না, ভেঙে দিল। অতএব আয়ার্ল্যাণ্ডের প্রচলিত অভ্যাস হিসাবে ১৭৯৮ সনে আবার বিদ্রোহ হল। আগের কালে যেসব বিদ্রোহ হয়েছে তার মধ্যে কতকগুলো ছিল আল্‌স্টার আর দেশের বাকি অংশের মধ্যে ধর্মমত নিয়ে যুদ্ধ। এবারের বিদ্রোহটা সে রকমের নয়; এটা হল জাতীয়তাবাদীদের বিদ্রোহ, প্রোটেস্ট্যাণ্ট এবং ক্যাথলিক উভয়েই এতে খানিক পরিমাণ যোগ দিল। এই বিদ্রোহও ইংরেজরা দমন করল; এর আইরিশ নেতা উল্‌ফ্‌ টোনকে তারা বিশ্বাসঘাতক বলে প্রাণদণ্ড দিল।

 অতএব দেখা গেল, আয়ার্ল্যাণ্ডকে স্বাধীন পার্লামেণ্ট দেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু তাতে আইরিশদের অবস্থার বিশেষ কোনো পরিবর্তনই হয় নি। এই সময়ে ইংলণ্ডের নিজের যে পার্লামেণ্ট ছিল, সেও অতি সংকীর্ণ দোষদুষ্ট এবং তার সভ্যরা ‘পকেট ব্যুরো’ ইত্যাদি ব্যবস্থায় মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হচ্ছে, পার্লামেণ্টে প্রভুত্ব করছে ক্ষুদ্র একটি ভূস্বামীশ্রেণী তার অল্প দু-চার জন অতি ধনি বণিক। আইরিশ পার্লামেণ্টেও এই দোষগুলি সবই বর্তমান; তার উপর আবার সে পার্লামেণ্টের কর্তৃত্ব রয়েছে মুষ্টিমেয় ক’জন প্রোটেস্ট্যাণ্টের হাতে, অথচ দেশের সমস্ত লোকই ক্যাথলিক। তা সত্ত্বেও বিটিশ সরকার স্থির করলেন, এই আইরিশ পার্লামেণ্টকে তুলে দেওয়া হবে, এবং আয়ার্ল্যাণ্ডকে একেবারেই রিটেনের শামিল করে নেওয়া হবে। আয়ার্ল্যাণ্ডের লোক এর তীব্র প্রতিবাদ করল; কিন্তু ডাব্‌লিন পার্লামেণ্টের সভ্যরা প্রচুর পরিমাণ ঘুষ খেয়ে তাদের নিজের পার্লামেণ্টেরই অস্তিত্ব-লোপ মঞ্জুর করে দিল। ১৮০০ সনে অ্যাক্ট অব ইউনিয়ন প্রণয়ন করা হল। এইভাবে গ্র্যাটানের স্বল্পজীবী পার্লামেণ্টটির অবসান হল; তার বদলে আয়ার্ল্যাণ্ড থেকে কয়েকজন সভ্যকে লণ্ডনে ব্রিটিশ পার্লামেণ্টে পাঠানো হল।

 আয়ার্ল্যাণ্ডের এই পার্লামেণ্টের দোষের অভাব ছিল না, একে লুপ্ত করার পর বেশি ক্ষতি সম্ভবত হয় নি; তবে বলা যায় কী, হয়তো একদিন এইটেই অনেক ভালো কিছু একটা হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু এই অ্যাক্ট অব ইউনিয়ন-এর একটা খুব বড়ো কুফল হল; সেই অনিষ্টটি ঘটাবার জন্যেই এই আইন করা হয়েছিল। উত্তর এবং দক্ষিণ আয়ার্ল্যাণ্ডে প্রোটেস্ট্যাণ্ট আর ক্যাথলিকরা একত্র মিলনের পথে এগিয়ে চলেছিল, এই আইনে সে আশার অবসান হয়ে গেল। আল্‌স্টারের প্রোটেস্ট্যাণ্টরা আবার আয়ার্ল্যাণ্ডের বাকি অংশের উপর বিমুখ হয়ে উঠল; দেশের দুটি অংশের মধ্যে ভেদবুদ্ধি আবার বেড়ে চলল। ইতিমধ্যে এদের দুয়ের মধ্যে আরও একটা তফাত এসে গিয়েছিল। ইংলণ্ডের মতো আল্‌স্টারও আধুনিক যন্ত্রশিল্পের প্রবর্তন করেছিল। আয়ার্ল্যাণ্ডের বাকি অংশ তখনও কৃষিপ্রধান; দেশের ভূমি-প্রথা আর দেশ থেকে প্রজাদের ক্রমাগত বিদেশে চলে যাবার দরুন সে কৃষিরও অবস্থা মোটেই ভালো নয়। কাজেই উত্তর-আয়ার্ল্যাণ্ড শিল্পপ্রধান হয়ে উঠল; দক্ষিণ, পূর্ব, এবং বিশেষ করে পশ্চিম অঞ্চলগুলি শিল্পপ্রগতির পথে পিছিয়ে পড়ে রইল, তার অবস্থা তখনও মধ্যযুগের মতো।

 অ্যাক্ট অব ইউনিয়ন প্রণীত হবার সঙ্গে সঙ্গেই তার প্রতিবাদে আবার বিদ্রোহ হল। এই ব্যর্থ বিদ্রোহের নেতা ছিলেন রবার্ট্ এমেট নামে একজন প্রতিভাশালী যুবক; পূর্বগামী তাঁর বহু দেশবাসীর মতো ইনিও বধ্যমঞ্চে প্রাণ দিলেন।

 ব্রিটেনের হাউজ অব কমন্‌সে আয়ার্ল্যাণ্ডের সভ্য পাঠানো হল; কিন্তু ক্যাথলিকদের নয়। ইংলণ্ডে বা আয়ার্ল্যাণ্ডে ক্যাথলিকদের পার্লামেণ্টে যাবার অধিকার ছিল না। ১৮২৯ সনে এই নিষেধ তুলে দেওয়া হল; ক্যাথলিকরা ব্রিটিশ পার্লামেণ্টে প্রবেশের অধিকার পেলেন। এই নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল আইরিশ নেতা ড্যানিয়েল ও’ কোনেল’-এর চেষ্টার ফলে; তাঁকে তাই আইরিশরা নাম দিল ‘মুক্তিদাতা’। আরও একটি পরিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটল; ভোট দেবার অধিকারটাকে বিস্তৃত করে ক্রমেই বেশি লোককে সে অধিকার দেওয়া হল। আয়ার্ল্যাণ্ড এখন ব্রিটেনের সঙ্গে একত্র হয়ে গেছে, একই আইন এই দুই দেশে সমানভাবে বলবৎ হবে। কাজেই ১৮৩২ সনের বিখ্যাত রিফর্ম-বিল ব্রিটেনের মতো আয়ার্ল্যাণ্ডেও প্রযোজ্য হয়ে গেল। তার পরে যখন ফ্রান্‌চাইজ-বিল প্রণীত হল, সেটিরও সেই দশা ঘটল। এমনি করে ব্রিটেনের হাউজ অব কমন্‌সে যে আইরিশ সভ্যরা যেতেন তাদের প্রকার বদলে যেতে লাগল। আগে এঁরা ছিলেন শুধু ভূস্বামীদের প্রতিনিধি, এখন এঁরা ক্রমে হয়ে উঠলেন ক্যাথলিক চাষি আর জাতীয়তাবাদী আইরিশম্যানদের মুখপাত্র।

 ভূস্বামীর শাসন আর হাড়ভাঙা করের চাপে সর্বস্বান্ত আইরিশ চাষিরা গোল আলুকেই তাদের প্রধান খাদ্য বানিয়ে নিয়েছিল। বস্তুত গোল আলু খেয়েই তারা জীবন ধারণ করত: আজকালকার ভারতীয় কৃষকেরই মতো তাদেরও সঞ্চিত সম্বল বলতে এমন কিছু ছিল না, দুর্যোগের সময় যার সাহায্যে তারা বেঁচে যেতে পারে। কোনোক্রমে প্রাণধারণ করে তারা শুধু টিঁকেই থাকত; বিপদে আত্মরক্ষা করবার কোনো ব্যবস্থাই তাদের ছিল না। ১৮৪৬ সনে গোল আলুর খন্দ নষ্ট হয়ে গেল; এবং তার ফলে হল একটা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। দুর্ভিক্ষের সময়েও কিন্তু ভূস্বামীরা তাদের প্রজাদের বাকি খাজনার দায়ে জমি থেকে উৎখাত করে দিতে লাগল। অসংখ্য আইরিশম্যান দেশ ছেড়ে আমেরিকায় এবং অন্যান্য দেশে চলে গেল, আয়ার্ল্যাণ্ড প্রায় জনহীন দেশ হয়ে পড়ল। তার বহু জমিতে চাষ-আবাদই বন্ধ হয়ে গেল, সেগুলোে পশুচারণের ভূমিতে পরিণত হল।

 একদা যেখানে চাষ-আবাদ চলেছে সেই কৃষির জমিকে ভেড়া-চরানোর মাঠে পরিণত করবার এই ব্যাপারটা এক শো বছরেরও বেশি কাল ধরে ক্রমাগত চলতে লাগল; আমাদের এই আমলেও এর রেশ এসে পৌঁচেছে। এর প্রধান কারণ, ইংলণ্ডে পশমী কাপড় তৈরির কারখানা বেড়ে যাচ্ছিল। সে কারখানায় যত বেশি কলকব্জার আমদানি হল ততই বেশি কাপড় তৈরি হতে লাগল। পশমেরও প্রয়োজন ততই বাড়ল। আয়ার্ল্যাণ্ডের ভূস্বামীরা দেখলেন, চাষের জমিতে মানুষ কাজ করাতে তাঁদের যা লাভ থাকে, তার চেয়ে ঢের বেশি লাভ হয় সে জমিগুলোকে ভেড়া চরাবার মাঠে পরিণত করলে। চারণভূমির জন্যে বেশি মজুরের প্রয়োজন নেই, শুধু ভেড়াগুলোর খবরদারি করতে পারে এমন দু-চার জন লোক থাকলেই যথেষ্ট। অতএব কৃষক-মজুরদের অস্তিত্বটাই অনাবশ্যক হয়ে উঠল; ভূস্বামীরা তাদের জমি থেকে তাড়িয়ে দিলেন। আয়ার্ল্যাণ্ডে বস্তুত লোকসংখ্যা অল্প ছিল, এই কারণেই সেখানে মজুরের খুব ‘বাহুল্য’ ছিল; দেশের জনসংখ্যা এভাবে কমতে লাগল। আয়ার্ল্যাণ্ড শুধু হয়ে রইল ‘শিল্প-জীবী’ ইংলণ্ডকে কাঁচা মাল যোগান দেবার মতো একটি জায়গা। চাষের জমিকে পশুচারণ-ভূমিতে পরিণত করবার এই প্রাচীন রীতি এখন উল্‌টে গেছে; এখন আবার সেই লাঙল তার নিজের জায়গা এসে দখল করছে। আশ্চর্যের ব্যাপার এই, এ বস্তুটা সম্ভব হয়েছে আয়ার্ল্যাণ্ড আর ইংলণ্ডের মধ্যে একটা বাণিজ্যিক সংগ্রামের ফলে; ১৯৩২ সন থেকে এই সংগ্রাম শুরু হয়েছে।

 জমির সমস্যা, অনুপস্থিত ভূস্বামীর অধীনে অসহায় প্রজার দুর্দশা, ঊনবিংশ শতাব্দীর অধিকাংশ সময় ধরে এইটাই ছিল আয়ার্ল্যাণ্ডের প্রধান সমস্যা। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার স্থির করলেন এই ভূস্বামীদের সম্পূর্ণরূপে উচ্ছেদ করে ফেলবেন, আবশ্যিক রীতি করে এদের সমস্ত জমি কিনে নিয়ে সে জমি এঁদের প্রজাদের মধ্যে বিলি করে দেবেন। ভূস্বামীদের অবশা এতে কোনোই ক্ষতি হল না। সরকারের কাছ থেকে তাঁরা জমির সম্পূর্ণ মূল্যই বুঝে পেলেন। প্রজারা জমি পেল, কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে সে জমির দাম মিটিয়ে দেবার দায়িত্বও তাদের উপরে এসে পড়ল। এই দাম তাদের একবারে চুকিয়ে দিতে হল না, দিতে হল ছোটো ছোটো বার্ষিক কিস্তিতে।

 ১৭৯৮ সনের জাতীয় বিদ্রোহের পরে প্রায় এক শো বছরের মধ্যে আর আয়ার্ল্যাণ্ডে কোনো বড়-গোছের বিদ্রোহ হয় নি। এর আগে বহু শতাব্দী যাবৎ মাঝে মাঝে এইরকমের কাণ্ড করাই ছিল আয়ার্ল্যাণ্ডের অভ্যস্ত রীতি; ঊনবিংশ শতাব্দীতে সে রীতির বাতিক্রম দেখা গেল। এর কারণ কিন্তু কোনোরকম সন্তুষ্টির বোধ নয়। শেষবারের বিদ্রোহের ফলে আয়ার্ল্যাণ্ড অবসন্ন হয়ে পড়েছিল, তার উপরে আবার এসেছিল দুর্ভিক্ষের আঘাত আর লোক হ্রাস। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে মানুষের মনও কিছুটা ব্রিটিশ পার্লামেণ্টের দিকে ঝুঁকেছিল; তাদের আশা ছিল পার্লামেণ্টে আয়ার্ল্যাণ্ডের যে প্রতিনিধিরা রয়েছেন তাঁরাই হয়তো কিছু করে কর্মে উঠতে পারবেন। তবুও কিন্তু মাঝে মাঝে একটা বিদ্রোহ ঘটাবার অভ্যাসটাকে কয়েকজন লোক টিঁকিয়ে রাখতে চাইলেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, একমাত্র এই উপায়েই আয়ার্ল্যাণ্ডের মন এবং প্রাণশক্তি চিরদিন সতেজ ও অকলঙ্কিত থাকতে পারবে। আয়ার্ল্যাণ্ড থেকে যাঁরা আমেরিকায় গিয়ে বাস করছিলেন তাঁরা আয়ার্ল্যাণ্ডের মুক্তির জন্য সেখানে একটি সমিতি স্থাপন করলেন। এঁদের নাম ছিল ‘ফেনিয়ান’। এঁরা আয়ার্ল্যাণ্ডে ছোটো ছোটো কয়েকটি বিদ্রোহের ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু এঁদের আন্দোলন দেশের জনসাধারণকে স্পর্শ করল না; অল্পদিনের মধ্যেই ‘ফেনিয়ান’-দলটি ভেঙে গেল।

 চিঠিটা অত্যন্ত বেশি লম্বা হয়ে গেল, এবার আমি এটাকে শেষ করব। আয়ার্ল্যাণ্ডের গল্প কিন্তু আমার এখনও বলা শেষ হয় নি।