বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ইংলণ্ডে রাজার প্রাণদণ্ড

উইকিসংকলন থেকে

৮৭

ইংলণ্ডে রাজার প্রাণদণ্ড

২৯শে আগস্ট, ১৯৩২

 এবারে ইংলণ্ডের ইতিহাস কিছুকাল ধরে আলোচনা করা থাক। এতক্ষণ পর্যন্ত ইংলণ্ডকে অনেকাংশে বাদ দিয়ে এসেছি, কারণ মধ্যযুগে সেখানে জানার মতো বিশেষ কিছু ছিল না। এ দেশ ফ্রান্স বা ইতালির চেরে অনগ্রসর ছিল। তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচীন কাল থেকেই বিদ্যার একটি প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তার কিছু পরে কেমব্রিজের উদয় হয়। এই অক্সফোর্ড থেকেই ওয়াইক্লিফের উদ্ভব, যাঁর সম্বন্ধে তোমাকে আগেই বলেছি। প্রাচীন কাল

 ইংলণ্ডের প্রাচীন ইতিহাসের প্রধান আকর্ষণ হল পার্লামেণ্টের অভ্যুদয়। প্রাচীন কাল থেকেই রাজার ক্ষমতা সংক্ষেপ করার জন্যে অভিজাত সম্প্রদায়ের চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। ১২১৫ সালে হল ম্যাগ্‌না কার্টা। অল্প পরে পার্লামেণ্টের অস্তিত্বের কিছু কিছু আরম্ভ হয়। আরম্ভ অবশ্য হয় একটু অদ্ভূতভাবে। বড়ো বড়ো লর্ড এবং বিশপরা সম্মিলিত হয়ে হাউজ অব লর্ড্‌স’এ পরিণত হয়। কিন্তু তার চেয়ে কালক্রমে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয় একটি নির্বাচিত সভা, যার সভ্য ছিল নাইটরা এবং ছোটোখাটো ভূম্যধিকারীরা এবং নগরসমূহের জনকতক প্রতিনিধি। এই নির্বাচিত সভাই পরে হাউজ অব্ কমন্‌স্’এ পরিণত হয়। দুটি সভাই ছিল ভূম্যধিকারী এবং ধনী ব্যক্তিদের দ্বারা গঠিত। হাউজ অব্ কমন্‌স্’এ পর্যন্ত সভ্যরা ছিল অল্পসংখ্যক ভূম্যধিকারী ও বণিক।

 হাউজ অব্ কমন্‌সের বিশেষ কোনো ক্ষমতা ছিল না। তারা রাজার কাছে তাদের নালিশ জানাত, এবং ধীরে ধীরে কর বসানোর ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে আরম্ভ করল। তাদের অনুমোদন ব্যতীত নূতন কর ধার্য করা অথবা আদায় করা কঠিন হওয়ায় রাজা এইসব কর ধার্য করার আগে তাদের অনুমোদন চাওয়ার রীতি প্রবর্তিত করলেন। টাকার ক্ষমতা যার হাতে থাকে সেই সবচেয়ে শক্তিমান। ফলে পার্লামেণ্ট, বিশেষ করে কমন্‌স্-সভার সম্মান এবং প্রতাপ, এই ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গেই বদ্ধি পেল। রাজা এবং কমন্‌স্ সভার মধ্যে প্রায়ই গোলমাল বাধত। তবু পার্লামেণ্ট ছিল দুর্বল জিনিষ, এবং টিউডর-শাসকরা প্রায় সর্বেসর্বা রাজা ছিলেন। কিন্তু টিউডরদের বুদ্ধি ছিল, তাই পার্লামেণ্টের সঙ্গে কলহ এড়িয়ে চলেছিলেন।

 ইউরোপে যে ধর্মসংক্রান্ত তীব্র বিবাদের সৃষ্টি হয়, সেটা থেকে ইংলণ্ড খুব বেঁচে গিয়েছিল। অবশ্য এখানেও অনেক কলহ, অনেক গোঁড়ামি দেখা গিয়েছিল, এবং ডাইনি অপবাদে অসংখ্য স্ত্রীলোককে পুড়িয়ে মারা হয়। কিন্তু ইউরোপ মহাদেশের সঙ্গে তুলনায় ইংলণ্ড ছিল শান্তিপূর্ণ। অষ্টম হেনরির সঙ্গে দেশ প্রোটেস্ট্যাণ্ট মতবাদ গ্রহণ করল। কিন্তু দেশীয় ক্যাথলিক বহু ছিল, এবং চরমপন্থী প্রোটেস্টাণ্টেরও অভাব ছিল না। ইংলণ্ডের নূতন চার্চ হল এই দুয়ের মধ্যে একটি—নামে প্রোটেস্ট্যাণ্ট, কিন্তু সম্ভবত ক্যাথলিকগন্ধী। প্রকৃতপক্ষে এটা হল শাসনবিভাগের একটি দপ্তর, যার কর্তা হলেন রাজা স্বয়ং। রোম এবং পোপের সঙ্গে বিচ্ছেদ কিন্তু সম্পূর্ণ হল। এবং পোপবিরোধী অনেক দাঙ্গাহাঙ্গামা ঘটল। রাজ্ঞী এলিজাবেথের সময়ে (তিনি ছিলেন অষ্টম হেন্‌রির মেয়ে) প্রাচ্যদেশ এবং আমেরিকার নূতন জলপথ আবিষ্কৃত হওয়ার ফলে বাণিজ্যের যে নূতন সুযোগ হয়েছিল তা অনেককে প্রলুব্ধ করল। স্প্যানিশ এবং পর্তুগীজ নাবিকদের সাফল্য দেখে এবং ধনরত্নলাভের প্রত্যাশায় ইংলণ্ড সমুদ্রযাত্রা আরম্ভ করল। স্যার ফ্রান্সিস্ ড্রেক এবং ঐরকম কেউ কেউ জলদস্যুতে পরিণত হলেন, এবং তাঁদের কাজ হল আমেরিকা-প্রত্যাগত স্প্যানিশ জাহাজ লুট করা। তার পরে ড্রেক এক বিরাট কার্যভার গ্রহণ করলেন—পৃথিবীর প্রদক্ষিণ। সার ওয়াল্টার র‍্যালে আটলাণ্টিক অতিক্রম করে, বর্তমানে যে দেশের নাম ইউনাইটেড্ স্টেট্‌স্‌, তার পূর্ব উপকূলে বসতিস্থাপনের প্রয়াস পেলেন। ভার্জিন অর্থাৎ কুমারী রানী এলিজাবেথের সম্মানে এই দেশের নাম দেওয়া হল ভার্জিনিয়া। র‍্যালেই প্রথম আমেরিকা থেকে ইংলণ্ডে ধূমপানের অভ্যাস আমদানি করেন। তার পরে এল ‘স্প্যানিশ আর্মাডা’ এবং এই দর্পিত অভিযানের সম্পূর্ণ ব্যর্থতা ইংলণ্ডকে অনেকখানি উৎসাহিত করল। এসব জিনিষের সঙ্গে রাজা ও পার্লামেণ্টের বিরোধের কোনো সম্পর্ক নেই, কেবল এইটুকু ছাড়া যে, এসব ব্যাপার লোকের মনকে অন্যমনস্ক রাখল এবং বৈদেশিক ঘটনাবলীর উপর নিবদ্ধ করল। কিন্তু টিউডরদের যুগেও অসন্তোষ দেশের অন্তরে অন্তরে প্রধূমিত হচ্ছি।

 এলিজাবেথীয় যুগ ইংলণ্ডের উজ্জলতম কালসমূহের অন্যতম। এলিজাবেথ ছিলেন মহিমময়ী রানী, এবং তাঁর যুগে ইংলণ্ডে অনেক কর্মবীরের অভ্যুত্থান হয়েছিল। কিন্তু রাজ্ঞী এবং তার ভাগ্যান্বেষী বীরপুরুষদের চেয়ে বড়ো ছিলেন সে যুগের কবি এবং নাট্যকাররা, এবং তাঁদের সবার উপরে ছিলেন অমর কবি উইলিয়ম শেক্সপীয়র। তাঁর নাটকাবলী পৃথিবীর সর্বত্র পরিচিত, যদিও ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সম্বন্ধে আমরা কমই জানি। ইংরেজি ভাষাকে যাঁরা নানা বহুমূল্য মানিক দিয়ে সমৃদ্ধ করে আমাদের আনন্দদান করেন, তিনি সেই অত্যুজ্জ্বল সাহিত্যনায়কদের অন্যতম। এলিজাবেথের যুগের ছোটো ছোটো গীতিকবিতারও এমন একটা আশ্চর্য মিষ্টতা আছে যা অন্যত্র পাওয়া যায় না। সরলতম, মধুরতম ভাষায় তারা খুশিমনে এগিয়ে চলে, এবং নিতান্ত দৈনন্দিন ঘটনার কথা তাদের নিজস্ব ভঙ্গিতে শুনিয়ে দেয়। লিটন্ স্ট্রেচি-নামক একজন ইংরেজ সমালোচক এদের সম্বন্ধে বলেছেন, “এলিজাবেথীয় যুগের সেই মহাপুরুষের দল, যাঁদের সবল সষ্ঠু প্রাণ এক-পুরুষেই যাদুমন্ত্রের মতো ইংলণ্ডকে সারা পৃথিবীর মধ্যে নাটকীয় সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্য দান করেছে।”

 আকবরের মৃত্যুর ৭ বছর আগে ১৬০০ সালে এলিজাবেথের মৃত্যু হল। উত্তরাধিকারসূত্রে তৎকালীন স্কটল্যাণ্ডের রাজা তাঁর পরে সিংহাসনে আরোহণ করলেন। তিনি হলেন প্রথম জেম্‌স্ এবং এইরূপে ইংলণ্ড ও স্কটল্যাণ্ড মিলিত হয়ে এক রাজ্যে পরিণত হল। বলপ্রয়োগে ইংলণ্ড যা করতে পারে নি তা শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হল। প্রথম জেম্‌স্ রাজাদের ভগবদ্দত্ত অধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন, এবং পার্লামেণ্টকে ঘৃণা করতেন। তিনি এলিজাবেথের মতো তীক্ষ্ণবুদ্ধি ছিলেন না, এবং অতি শীঘ্রই তাঁর সঙ্গে পার্লামেণ্টের বিরোধ বাধল। তাঁরই রাজত্বকালে অনেক অদম্য প্রোটেস্ট্যাণ্ট চিরকালের জন্য স্বদেশ ইংলণ্ড ত্যাগ করে ১৬২০ সালে মেফ্লাওয়ার জাহাজে করে আমেরিকার বসতি করতে চলে গেল। তারা প্রথম জেম্‌সের স্বেচ্ছাচারের বিরোধী ছিল, নূতন ‘চার্চ অব ইংলণ্ড’এর প্রতি তাদের প্রীতি ছিল না, কারণ তাদের মতে এ চার্চ যথেষ্ট পরিমাণে প্রোটেস্ট্যাণ্ট নয়। তাই তারা ঘরবাড়ি দেশ ছেড়ে আটলাণ্টিক মহাসাগরের পরপারে অজানা নূতন দেশের উদ্দেশে যাত্রা করল। উত্তর-উপকূলে একটি স্থানে তারা অবতরণ করল, তার নাম দেওয়া হল নিউ প্লিমথ্। তাদের পরে আরও অনেক ঔপনিবেশিক এল, এবং ক্রমে বসতি বেড়ে বেড়ে পূর্ব-উপকূল ভরে তেরটা ঔপনিবেশের প্রতিষ্ঠা হল। এইসব উপনিবেশই কালক্রমে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে পরিণত হয়। কিন্তু সে গল্পের এখনও দেরি আছে।

 ১৬২৫ সালে প্রথম জেমসের পুত্র প্রথম চার্লস্ রাজা হওয়ার অল্পকাল পরেই পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে দাঁড়াল। ১৬২৮ সালে পার্লামেণ্ট ‘পিটিশন অব্ রাইট’ নামে এক আবেদন তাঁকে দিল, যা হল ইংলণ্ডের ইতিহাসের এক প্রসিদ্ধ দলিল। এই আবেদনে রাজাকে জানানো হয় যে, তিনি সর্বময়কর্তা নন, এবং অনেক কাজই তাঁর করার অধিকার নেই। তিনি বেআইনিভাবে কর ধার্য করতে অথবা লোককে কারারুদ্ধ করতে পারেন না। ভারতবর্ষের ইংরেজ ভাইস্‌রয় বিংশ শতাব্দীতে যা করেন—অর্থাৎ অর্ডিন্যান্স জারি এবং বিনা বিচারে লোককে কারারুদ্ধ করা—তা ইংলণ্ডের রাজা সপ্তদশ শতাব্দীতেও করতে পারতেন না।

 কী করতে পারেন না পারেন এইসব কথায় বিরক্ত হয়ে চার্ল্‌স্‌ পার্লামেণ্টের অধিবেশন ভেঙে দিয়ে পার্লামেণ্ট ছাড়াই রাজ্যশাসন আরম্ভ করলেন। কিন্তু কয়েক বছর পরে তাঁর আর্থিক অবস্থা এত খারাপ হল যে, আবার তাঁকে পার্লামেণ্ট আহ্বান করতে হল। বিনা পার্লামেণ্টে চার্ল্‌স্ যা করেছিলেন তাতে মহা অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল, এবং পার্লামেণ্ট তাঁর সঙ্গে বোঝাপড়া করার জন্য উৎসুক হয়ে ছিল। ১৬৪২ সালে, দু বছরের মধ্যে, গৃহযুদ্ধ আরম্ভ হল। এক দিকে রাজা, তাঁর সহায় হল অভিজাত সম্প্রদায় এবং সৈন্যবাহিনীর অধিকাংশ; অন্য দিকে পার্লামেণ্ট, তার সমর্থক হল ধনী বণিকরা এবং লণ্ডন-নগরের অধিবাসীরা। এই যুদ্ধ চলল অনেক বছর ধরে, অবশেষে পার্লামেণ্টের পক্ষে অলিভার ক্রম্‌ওয়েল নামে এক শক্তিশালী নেতার অভ্যুদয় হল। সংগঠনকার্যে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়, নিয়মানুবর্তিতার দিকে তাঁর ছিল প্রখর দৃষ্টি, এবং যে কারণ নিয়ে যুদ্ধতার সম্বন্ধে তাঁর উৎসাহের অন্ত ছিল না। কার্লাইল ক্রম্‌ওয়েল সম্বন্ধে লিখেছেন, “যুদ্ধের ঘনঘটা বিপদের মধ্যে যখন আর কারও মনে আশার লেশও অবশিষ্ট ছিল না তখনও তাঁর মধ্যে আশার আলো জ্বলছিল আগুনের স্তম্ভের মতো।” ক্রম্‌ওয়েল নূতন সেনাবাহিনী গঠন করলেন, তার নাম দিলেন ‘আয়রন্‌সাইড্‌স’ এবং নিজের উৎসাহে তাদের উৎসাহিত করলেন। পার্লামেণ্ট-সেনাবাহিনীর ‘পিউরিটান্‌রা’ চার্ল্‌সের ‘ক্যাভালিয়ার’দের সম্মুখীন হল। অবশেষে ক্রম্‌ওয়েলের জয় হল, এবং রাজা চার্ল্‌স, পার্লামেণ্টের হাতে বন্দী হলেন।

 পার্লামেণ্টের অনেক সভ্যই তখনও রাজার সঙ্গে মিটমাট করে ফেলতে রাজি ছিলেন, কিন্তু ক্রম্‌ওয়েলের নবগঠিত সেনাবাহিনী সে কথায় কানও দিল না। এই বাহিনীর একজন সেনানী, কর্নেল প্রাইড, সরাসরি পার্লামেণ্ট-গৃহে ঢুকে এই ধরনের সভ্যদের বার করে দিলেন। এর নাম হল Pride’s Purge অথবা প্রাইড কর্তৃক গৃহমার্জন। সমাধানটা একটু রূঢ় প্রকৃতির হল, এবং পার্লামেণ্টের পক্ষে প্রশংসনীয় হল না। পার্লামেণ্ট রাজার স্বেচ্ছাচারের বিরোধী ছিল, কিন্তু এখন এল তাদের নিজেদের সৈনাবাহিনীর স্বেচ্ছাচার, যা পার্লামেণ্টের আইনসম্মত কচ্‌কচির দিকে কোনো দৃষ্টি দিল না। বিপ্লবের পন্থাই এই।

 হাউজ অব্ কমন্সের (যার নাম এখন হল রাম্প পার্লামেণ্ট) অবশিষ্ট সভ্যরা হাউজ অব্ লর্ড্‌সের আপত্তি অগ্রাহ্য করে রাজার বিচার করা স্থির করল, এবং তাঁকে অত্যাচারী, বিশ্বাসঘাতক, খুনী, এবং দেশের শত্রু, রূপে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হল। এবং ১৬৪১ সালে, যে লোকটি তাদের রাজা ছিল, এবং ভগবদ্দত্ত রাজশক্তির কথা বলত, লণ্ডনের হোয়াইট-হলে তার শিরশ্ছেদ করা হল।

 রাজারা মরে অন্য লোকের মতোই। এমনকি ইতিহাসে তাদের অনেকেই হত্যাকারীর হাতে মরেছে। স্বেচ্ছাতন্ত্র এবং রাজতন্ত্র হত্যাকাণ্ডকে উদ্বুদ্ধ করে, এবং অতীতে অনেক ইংরেজ রাজাই এমনিভাবে মরেছে। কিন্তু এই ব্যাপারটার নূতনত্ব এবং বিস্ময় হল এই যে, একটা নির্বাচিত সভা বিচারসভা গ্রথিত করে রাজার বিচার করে তাকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করল। আশ্চর্য এই যে, ইংরেজজাতি চিরদিনই রক্ষণশীল, এবং আকস্মিক পরিবর্তনের বিরোধী, তারাই কিনা শেষ পর্যন্ত অত্যাচারী এবং বিশ্বাসঘাতক রাজার প্রতি কী আচরণ করতে হয় তাই দেখিয়ে দিল। কিন্তু এ কাজটা ঠিক ইংরেজ জনসাধারণের নয়, এটা হল ক্রম্‌ওয়েলের অধীনে নূতন ‘আয়রনসাইড্‌স্’ সেনাবাহিনীর কীর্তি।

 ইউরোপের যাবতীয় সিজার এবং প্রিন্স এবং ক্ষুদে রাজারা বিষম আঘাত পেলেন। সাধারণ প্রজারা যদি এইরকম মাথা গরম হয়ে ইংলণ্ডের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে আরম্ভ করে, তা হলে? তাঁদের অনেকেই ইংলণ্ড আক্রমণ করে তাকে ধ্বংস করতে প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু ইংলণ্ডের ভাগ্যনিয়ন্তা তখন আর কোনো অকর্মণ্য রাজা নয়। ইতিহাসে ইংলণ্ড এখন প্রথম সাধারণতন্ত্র, এবং ক্রম্‌ওয়েল ও তাঁর সৈন্যবাহিনী তার রক্ষক। ক্রম্‌ওয়েল ছিলেন মোটামুটি ডিক্টেটর, অর্থাৎ রাজ্যের সর্বেসর্বা। তাঁকে বলা হত ‘লর্ড প্রোটেক্টর’—মহারক্ষক। তাঁর কঠোর শাসনে ইংলণ্ডের শক্তি বৃদ্ধি পেল, এবং তার নৌবাহিনী ওলন্দাজ, ফরাসি এবং স্প্যানিশ নৌবাহিনীকে বিতাড়িত করল। এই প্রথম ইংলণ্ড ইউরোপের প্রধান নৌশক্তির স্থান পেল।

 কিন্তু ইংলণ্ডে সাধারণতন্ত্র হল স্বল্পকালস্থায়ী, প্রথম চার্ল্‌সের মৃত্যুর পর মাত্র এগারো বছর। ১৬৫৮ সালে ক্রম্‌ওয়েলের মৃত্যু হল; এবং দুই বৎসর পরে সাধারণতন্ত্রের পতন ঘটল। প্রথম চার্লসের ছেলে, যিনি বিদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন, ইংলণ্ডে ফিরে এসে সাদরে গৃহীত হলেন, এবং দ্বিতীর চার্ল্‌স্ রূপে সিংহাসন গ্রহণ করলেন। এই দ্বিতীয় চার্ল্‌স ছিলেন নীচ এবং দুশ্চরিত্র ব্যক্তি এবং তাঁর ধারণা ছিল রাজা হওয়ার অর্থ বিলাসব্যসনে কালযাপন করা। কিন্তু তাঁর এটুকু বুদ্ধি ছিল যে, পার্লামেণ্টের বেশি বিরুদ্ধাচরণ না করাই ভালো। আসলে তিনি ফরাসি-রাজের বেতনভোগী ছিলেন। ক্রম্‌ওয়েলের সময়ে ইংলণ্ড যে প্রধান স্থান অধিকার করেছিল তার বিচ্যুতি ঘটল। এমনকি ওলন্দাজরা টেম্‌স্ নদীতে এসে ইংলণ্ডের নৌবাহিনী পুড়িয়ে দিয়ে গেল।

 চার্লসের পরে তাঁর ভাই দ্বিতীয় জেম্‌স্ রাজা হলেন, এবং সঙ্গে সঙ্গে পার্লামেণ্টের সঙ্গে তাঁর বিবাদ বাধল। জেম্‌স নিষ্ঠাবান ক্যাথলিক ছিলেন, এবং তিনি ইংলণ্ডে পোপের প্রাধান্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে উৎসুক ছিলেন। কিন্তু ইংরেজ জাতির ধর্ম সম্বন্ধে যে ধারণাই থাক্-মা কেন, আর সে ধারণা যতই অস্পষ্ট হোক-না কেন, একটা বিষয়ে তারা স্থিরনিশ্চর ছিল—পোপ এবং পোপবিধির প্রতি বিদ্বেষভাব। এই বিদ্বেষভাবের বিরুদ্ধে জেম্‌সের কিছু করার ক্ষমতা ছিল না, এবং পার্লামেণ্টকে চটানোর ফলে তাঁকে বাধ্য হয়ে পালিয়ে ফ্রান্সে আশ্রয় নিতে হল।

 আবার রাজার সঙ্গে বিরোধে পার্লামেণ্টের জয় ঘটল, এবং এবার বিনা গৃহযুদ্ধে, বিনা রক্তপাতে। কিন্তু ইংলণ্ড আর সাধারণতন্ত্রে পরিণত হল না। লোকে বলে ইংরেজজাতি মনিব ভালোবাসে, এবং তার চেয়েও বেশি ভালোবাসে রাজকীর সমারোহ। অতএব পার্লামেণ্ট নূতন রাজার খোঁজ করতে লাগল, এবং অরেঞ্জ-রাজবংশে একজনের সাক্ষাৎ পেল। শতবর্ষ আগে স্পেনের বিরুদ্ধে নেদারল্যাণ্ডসের যুদ্ধে এই পরিবার থেকেই সে সংগ্রামের নেতা William the Silent, অথবা মৌন উইলিয়মের উদ্ভব হয়েছিল। অরেঞ্জের প্রিন্স আর-এক উইলিয়মকে পাওয়া গেল, যাঁর সঙ্গে ইংরেজ-রাজবংশের মেরির বিবাহ হয়েছিল। এইরূপে উইলিয়ন ও মেরি যুক্তভাবে ১৬৮৮ সালে রাজ্যভার গ্রহণ করলেন। পার্লামেণ্টের প্রাধান্য এইবার অবিসংবাদী হল, এবং এই বিপ্লবের ফলে পার্লামেণ্টের প্রতিনিধি নির্বাচকদের হাতে ক্ষমতার আগমন সম্পূর্ণ হল। সেদিন থেকে আর কোনো ব্রিটিশ রাজা অথবা রানী পার্লামেণ্টের কর্তৃত্বের প্রতিবাদ করতে সাহস পান নি। অবশ্য সোজাসুজি বিরোধ না বাধিয়েও ষড়যন্ত্রের নানাবিধ উপার আছে, এবং অনেক ব্রিটিশ রাজাই সে পন্থা অবলম্বন করেছিলেন।

 পার্লামেণ্ট এখন হল সর্বময় কর্তা। কিন্তু মনেও কোরো না যে, এ পার্লামেণ্ট প্রকৃতই ইংলণ্ডের জনসাধারণের প্রতিনিধিত্ব করত। জনসাধারণের প্রতিনিধি ছিল এর অতি সামান্য এক অংশ। হাউজ অব্ লর্ডসের নাম থেকেই বোঝা যায় যে, এরা ছিল বড়ো বড়ো ভূম্যধিকারী এবং বিশপ। এমনকি হাউজ অব্ কমন্সও ছিল ধনীর সংঘ। হয় জমির মালিক, না-হয় বড়ো বড়ো সদাগর। খুব কম লোকেরই ভোটের অধিকার ছিল। এক শো বছর আগে পর্যন্ত তথাকথিত ‘পকেট বরো’র সংখ্যা ছিল অগণ্য, অর্থাৎ যেসব ‘বরো’ থেকে নির্বাচন কারও না কারও পকেট বা অর্থ-প্রতিপত্তির উপর নির্ভর করছে। এমনও হতে পারে যে, এইরকম একটা নির্বাচনস্থলে ভোটার সংখ্যা ছিল এক কিংবা দুই। ১৭৯০ সালে নাকি ১৬০ জন লোক হাউজ অব্ কমন্সে ৩০৬ জন সভ্য নির্বাচিত করেছিল। ওল্‌ড্ সেরাম্ নামক এক পল্লীগ্রাম থেকে পার্লামেণ্টে দুজন সভ্য নির্বাচিত হয়। ফলে দেখতে পাচ্ছ যে, অধিকাংশ লোকেরই ভোট ছিল না এবং পার্লামেণ্টে তাদের কোনো প্রতিনিধিও যেত না। হাউস অব্ কমন্সকে মোটেই জননির্বাচিত-সভা বলা চলত না। শহরে শহরে যে নূতন মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠছিল, এ সভা তাদের পর্যন্ত প্রতিনিধিমূলক ছিল না। পার্লামেণ্টের আসন কেনাবেচা চলত, এবং ঘুষ চলত অবাধে। ১৮৩২ সাল অর্থাৎ এক শো বছর আগে পর্যন্ত এইরকম চলল, তার পরে তুমল আন্দোলনের পরে ‘রিফর্ম বিল’ পাশ হল, যার ফলে অধিকসংখ্যক লোকের হাতে ভোটাধিকার এল।

 অতএব দেখছ, রাজার উপর পার্লামেণ্টের জয়ের অর্থ মুষ্টিমেয় জনকতক ধনী ব্যক্তির জয়। ইংলেণ্ডের শাসনভার ছিল প্রকৃতপক্ষে মুষ্টিমেয় জনকয়েক ভূম্যধিকারী এবং বণিকের ছিটেফোঁটার হাতে। অন্যসমস্ত শ্রেণীর, অর্থাৎ প্রায় সম্পূর্ণ জাতির, এ বিষয়ে কোনো অধিকার ছিলনা।

 তোমার মনে পড়তে পারে, স্পেনের সঙ্গে সংগ্রামের পর যে ওলন্দাজ সাধারণতন্ত্রের উদ্ভব হয়, তাও ছিল ধনীর সাধারণতন্ত্র।

 উইলিয়ম ও মেরির পরে মেরির ছোটো বোন অ্যান্ ইংলণ্ডের অধীশ্বরী হলেন। ১৭১৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পরে আবার পরবর্তী রাজা নিয়ে মুশকিল বাধল। অবশেষে রাজা-নির্বাচন নিয়ে পার্লামেণ্টকে জমনি পর্যন্ত ধাওয়া করতে হল। তৎকালীন ইলেক্টর অব হ্যানোভারকে (হ্যানোভার নামক জর্মনির এক ক্ষুদ্র রাজ্যের রাজা) প্রথম জর্জ পদবীতে সিংহাসনে বসানো হল। তাঁর নির্বাচনের কারণ সম্ভবত এই যে, তিনি ছিলেন স্থূলবুদ্ধি এবং চালাকচতুর পার্লামেণ্টের কাজে হস্তক্ষেপকারী রাজার চেয়ে বোকা রাজাই তাঁদের অধিক মনঃপুত হন। প্রথম জর্জ ইংরেজি পর্যন্ত বলতে পারতেন না। এমনকি তাঁর ছেলে দ্বিতীয় জর্জও ইংরেজিতে প্রায় সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন। এইরূপে ইংলণ্ডে হ্যানোভার রাজবংশ স্থাপিত হল, এবং এখনও তার অস্তিত্ব আছে। এ রাজবংশ রাজত্ব করছে বললে ভুল করা হবে, কারণ রাজত্ব করার মালিক পার্লানেট।

 ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে ইংলণ্ড ও আয়ার্ল্যাণ্ডের মধ্যে অনেক বিরোধ চলেছিল। এলিজাবেথ ও প্রথম জেম্‌সের রাজত্বকালে আয়ার্ল্যাণ্ড-জয়ের চেষ্টা, তার ফলে বিদ্রোহ ও হত্যালীলা সংঘটিত হয়। উত্তর-আয়ার্ল্যাণ্ডে আল্‌স্টারে জেম্‌স্ প্রচুর পরিমাণে ভূসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে এইসব স্থানে বসবাস করার জন্যে স্কটল্যাণ্ড থেকে প্রোটেস্ট্যাণ্টদের আমদানি করলেন। সেই সময় থেকে বরাবর প্রোটেস্ট্যাণ্ট ঔপনিবেশিকরা সেইখানেই রয়ে গেছে এবং আয়ার্ল্যাণ্ড দু ভাগে বিভক্ত হয়েছে—দেশীয় আইরিশ এবং স্কট ঔপনিবেশিক, রোমান ক্যাালিক এবং প্রোটেস্ট্যাণ্ট। এই দু পক্ষে প্রচণ্ড বিদ্বেষ বর্তমান, এবং বলা বাহুল্য, ইংলণ্ড এই বিদ্বেষভাব থেকে লাভবান হয়েছে। চিরকালই শাসকরা দু পক্ষে বিরোধ ঘটিয়ে শাসন করা পছন্দ করে এসেছে। এখন পর্যন্ত আয়ার্ল্যাণ্ডের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হল আল্‌স্টার-সমস্যা।

 ইংলণ্ডে গৃহযুদ্ধের সমর আরাগারে ইংরেজদের অনেককে হত্যা করা হয়েছিল। এর নিষ্ঠুর প্রতিশোধ নিলেন রুম্‌ওয়েল; আইরিশদের দলে দলে হত্যা করে; এবং আজ পর্যন্ত এইি ঘটনা আইরিশদের মনে জাগক আছে। তার পরে আরও যুদ্ধ হয়, সহিও হয়, সে সন্ধি ভ করে ইংরেজরা। আরামাণ্ডের দুর্দশার ইতিহাস দীর্ঘ বেদনার কাহিনী।

 গালিভারস্ ট্রাভ্‌ল্‌স, গ্রন্থের লেখক জোনাথান সুইফ্‌ট্ এই সময়ের লোক (১৬৬৭-১৭৪৫)। শিশুপাঠ্য বইয়ের মধ্যে এই বইয়ের স্থান অতি উচ্চে, কিন্তু আসলে, এ হল তৎকালীন ইংলণ্ডের সম্বন্ধে বিদ্রূপাত্মক রচনা। ডানিয়েল ডেফো ‘রবিন্‌সন ক্রুসো’র লেখক, সুইফ্‌টের সমসাময়িক ছিলেন।