বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ইংলণ্ডে শিল্পবিপ্লবের আরম্ভ
৯৮
ইংলণ্ডে শিল্পবিপ্লবের আরম্ভ
২৭শে সেপ্টেম্বর, ১৯৩২
যেসব যন্ত্রের উদ্ভাবনের ফলে উৎপাদনের উপায়ের তুমুল পরিবর্তন ঘটে, এবার তাদের সম্বন্ধে কিছু বলা প্রয়োজন। এখন যখন আমরা কোনো কারখানায় সেসব দেখি, খুবই সরল বলে মনে হয়। কিন্তু সর্বপ্রথম তাদের ভেবে বের করা এবং তাদের আবিষ্কার খুবই কঠিন ব্যাপার। এইজাতীয় আবিষ্কারের প্রথমটি হয়েছিল ১৭৩৮ সালে, কে-নামক একজনের হাতে। তাঁত বোনার ফ্লাইং শাট্ল্ অথবা মাকু ইনিই উদ্ভাবন করেন। এই আবিষ্কারের আগে মাকুর সুতো টানার সুতোর মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে নিয়ে যেতে হত। ফ্লাইং শাট্লে এই কাজটা দ্রুত হতে লাগল এবং তাঁতির উৎপাদন দ্বিগুণ বেড়ে গেল। ফলে তাঁতির পক্ষে ঢের বেশি সুতোর প্রয়োজন হয়ে পড়ল। যারা সুতো কাটত, এই অতিরিক্ত পরিমাণে সুতো সরবরাহ করা কঠিন হওয়ায় তারা সুতোর উৎপাদন বাড়ানোর উপায় খুঁজতে লাগল। এই সমস্যার আংশিক সমাধান হল ১৭৬৪ খৃষ্টাব্দে, হারগ্রিভ্স্ যখন স্পিনিং-জেনি নামক যন্ত্র তৈরি করলেন। তার পরে এল রিচার্ড আর্করাইট এবং অন্য অনেকের আবিষ্কার। প্রথমে জলশক্তি এবং তার পরে বাষ্পশক্তি ব্যবহৃত হতে লাগল। এইসব আবিষ্কারের প্রথম প্রয়োগ হল কার্পাস-শিল্পে, ফলে কারখানা অথবা কাপড়ের কল গড়ে উঠল। তার পরে পশম শিল্প এই নূতন উৎপাদন-রীতি গ্রহণ করল।
ইতিমধ্যে ১৭৬৫ সালে জেম্স্ ওয়াট্ তাঁর স্টীম-এঞ্জিন তৈরি করলেন। এই বিরাট আবিষ্কারের থেকে কারখানায় বাষ্পের ব্যবহার গৃহীত হল। নূতন নূতন কারখানার জন্যে কয়লার প্রয়োজন ঘটল, ফলে কয়লার উৎপাদন বেড়ে গেল। কয়লার ব্যবহারের ফলে খনিজ পদার্থ থেকে বিশুদ্ধ লোহা নিষ্কাশনের নূতন পদ্ধতি বের হল। ফলে লৌহশিল্প দ্রুত উন্নত হতে লাগল। কয়লার খনির কাছে নূতন কারখানা তৈরি হতে লাগল, কারণ কয়লা সেখানে শস্তা।
এইরূপে ইংলণ্ডে তিনটি বৃহৎ ব্যবহারিক শিল্প গড়ে উঠল—বয়ন, লৌহ এবং কয়লা। কয়লা খনি এলাকায় এবং অন্যান্য উপযোগী জায়গায় নূতন নূতন কারখানা গড়ে উঠল। ইংলণ্ডের চেহারা বদলে গেল। সবুজ নয়নানন্দকর পল্লীভূমি পরিবর্তিত হয়ে অনেক জায়গার এইসব নূতন কারখানা নির্মিত হল, তাদের দীর্ঘ চিমনির ধোঁয়ায় আশেপাশের পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেল। এসব কারখানার কোনো সৌন্দর্য ছিল না, তাদের চার দিকে থাকত কয়লা আর আবর্জনার পাহাড়। যেসব নূতন উৎপাদন-নগরী এইসব কারখানার কাছে গড়ে উঠল, তাদেরও সৌন্দর্য বলে কোনো পদার্থ ছিল না। মালিকদের উদ্দেশ্য ছিল শুধু টাকা উপার্জন করা, ফলে শহরগুলো যেমন-তেমন করে গড়া হয়েছিল। এইসব শহর ছিল নোংরা, প্রকাণ্ড এবং কুৎসিত। কারখানার ব্যবস্থা ছিল চূড়ান্তভাবে অস্বাস্থ্যকর, কিন্তু ক্ষুধার্ত শ্রমিকদের এ অবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া উপায় ছিল না।
বড়ো বড়ো ভূম্যধিকারীরা কী করে ছোটোখাটো চাষিদের সরিয়ে দিয়েছিল এবং সেইজন্যে বেকার-অবস্থা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইংলণ্ডে যে দাঙ্গা ও অরাজকতার সৃষ্টি হয়েছিল, সে বিষয়ে আগেই বলেছি। নূতন ব্যবহারিক শিল্পের অভ্যুত্থানের আরম্ভেই ফল আরও খারাপ হল। কৃষির ক্ষতি হল, বেকার অবস্থা বৃদ্ধি পেল। নূতন নূতন আবিষ্কারের সঙ্গে হাতের কাজ লোপ পেয়ে যন্ত্র এসে চেপে বসল। তার ফলে শ্রমিকদের কাজ গেল এবং তাদের মধ্যে বিশেষ অসন্তোষের সৃষ্টি হল। তাদের অনেকেই এইসব নূতন কলকে বিদ্বেষের চোখে দেখতে আরম্ভ করল, এমনকি কখনও কখনও ভেঙে ফেলারও চেষ্টা করতে লাগল। এদের বলত মেশিন-রেকার্স্ অথবা যন্ত্রধ্বংসকারী।
ইউরোপের যন্ত্রধ্বংসের ইতিহাস বেশ পুরোনো, ষোড়শ শতাব্দীতে জর্মনিতে একটি সহজ কলের তাঁতের আবিষ্কার থেকে তার আরম্ভ। ১৫৭৯ সালে একজন ইতালীয় পাদ্রীর লেখা একটা পুরোনো বইতে এই তাঁতের সম্বন্ধে বিবরণ আছে “ডান্জিগের নাগরিক-সভায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল যে, এই যন্ত্রের উদ্ভাবনের ফলে অনেক কারিগরের চাকরি যাবে, তাই তাঁরা যন্ত্রটিকে নষ্ট করেন, এবং আবিষ্কর্তাকে গোপনে হয় গলা টিপে অথবা জলে ডুবিয়ে মেরে ফেলা হয়! আবিষ্কর্তার এই সরাসরি সমাপ্তি সত্ত্বেও সপ্তদশ শতাব্দীতে যন্ত্রটির পুনরাবির্ভাব ঘটল, এবং ইউরোপ জুড়ে দাঙ্গা বাধল। অনেক দেশে যন্ত্রের বিরুদ্ধে আইন তৈরি হল এবং কোথাও কোথাও প্রকাশ্য জনতার সামনে যন্ত্র পুড়িয়ে ফেলা হল। যখন প্রথম এই যন্ত্রের আবিষ্কার হয় তখনই এর ব্যবহার আরম্ভ হলে সঙ্গে সঙ্গে অন্য অনেক আবিষ্কার ঘটত এবং যন্ত্রযুগের আগমন সম্ভবত অনেক আগেই ঘটত। কিন্তু তা না হওয়ায় বোঝা যায় যে, দেশের অবস্থা তখনও যন্ত্রযুগের অনুকূল হয় নি। সময় যখন এল তখন অসংখ্য দাঙ্গাহাঙ্গামা সত্ত্বেও যন্ত্র তার নিজের স্থান অধিকার করে বসল। শ্রমিকদের পক্ষে যন্ত্রের প্রতি বিদ্বেষের ভাব স্বাভাবিক। ক্রমে তারা বুঝতে শিখল যে, যন্ত্রের কোনো দোষ নেই, দোষ হচ্ছে সেই রীতির যা অল্প জনকয়েকের লাভের জন্যে এর ব্যবহার করে। কিন্তু তার আগে ইংলণ্ডে কলকারখানার উন্নতি সম্বন্ধে কিছু বলে নেওয়া যাক।
নূতন কলকারখানা অনেক কুটিরশিল্প এবং স্বাধীন কারুশিল্পকে গ্রাস করল। এসব কুটিরশিল্পের পক্ষে যন্ত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব ছিল না। ফলে এই কারিগরদের তাদের পুরোনো পেশা ছেড়ে আসতে হল দিনমজুর হয়ে সেখানেই যে কলকারখানাকে তারা এত ঘৃণা করত। না করলে ফল হত কর্মহীনতা। উটজশিল্পের পতন সহসা ঘটে নি, কিন্তু মোটামুটি বেশ দ্রুতই ঘটেছিল। এই শতাব্দীর শেষে, অর্থাৎ প্রায় ১৮০০ সালে, অনেক বড়ো বড়ো কারখানা দেখা গেল। প্রায় ত্রিশ বছর পরে স্টিফেন্সনের বিখ্যাত এঞ্জিন ‘রকেট’এর আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে ইংলণ্ডে রেলওয়ের সূত্রপাত হল। এইভাবে যন্ত্রের প্রসার বেড়ে চলল, ব্যবহারিক শিল্প এবং জীবনের প্রায় সব স্থানেই এর প্রভাব বিস্তৃত হল।
যেসব আবিষ্কর্তার নাম করেছি তাঁরা, এবং আরও অনেকে, জন্মেছিলেন কায়িক শ্রমজীবীর ঘরে। এই শ্রেণী থেকেই প্রথম যুগের শিল্পপতিদের অনেকের উদ্ভব হয়। কিন্তু তাঁদের উদ্ভাবনা এবং কারখানা-পদ্ধতির ফলে মালিক ও শ্রমিকের ব্যবধান বেড়েই চলল। কারখানার শ্রমিক যন্ত্রের একটি ক্ষুদ্রতম অংশে পরিণত হল; যে বিশাল অর্থনৈতিক শক্তিকে সে নিয়ন্ত্রণ করা দূরে থাক, বুঝতেও পারত না, তার হাতে অসহায় অবস্থায় পড়ল। কারিগর ও মিস্ত্রিদের সন্দেহদৃষ্টি এ দিকে প্রথম পড়ল, যখন তারা দেখল যে, নব-আবিষ্কৃত কারখানা তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে জিনিষের উৎপাদনের খরচ এবং দাম এত সস্তা করে ফেলেছে যে, তাদের পুরোনো ধরনের হাতিয়ার দিয়ে তার কিছুই করা সম্ভব নয়। বিনা দোষে তাদের নিজেদের ছোটো ছোটো দোকান বন্ধ করতে হল। নিজেদের চিরাচরিত শিল্পেই যখন তাদের এই অবস্থা, তখন নূতন কোনো শিল্পে হাত দিয়ে সফল হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ফলে বেকার ক্ষুধার্তদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল, এই মাত্র। একটা কথা আছে, “ক্ষুধা কারখানার মালিকের আড়কাঠি”; সেই ক্ষুধা তাদের শেষটায় এইসব নূতন কারখানায় তাড়িত করে নিয়ে গেল কাজের চেষ্টায়। মালিকরা কিন্তু তাদের খুব করুণা-প্রদর্শন করল না। কাজ তারা পেল বটে, কিন্তু অতি অল্প মজুরিতে, আর সেইটুকুর জন্যেই হতভাগ্য মজুরদের প্রাণপাত পরিশ্রম করতে হতে লাগল। মেয়েরা, এমনকি শিশুরা পর্যন্ত, অস্বাস্থ্যকর স্থানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করত, অনেকে শ্রান্তিতে অবসন্ন হয়ে মূর্চ্ছাপন্ন হত। পুরুষরা কাজ করত সমস্ত দিন কয়লা খনির গভীর খাদের মধ্যে, এবং অনেকে মাসের পর মাস সূর্যালোকের মুখে দেখতে পেত না।
কিন্তু ভেবো না যে, এই সবই মালিকদের নিষ্ঠুরতার জন্যে। জ্ঞাতসারে হদয়হীন তারা বড়ো একটা হত না। আসল দোষ ছিল এই পদ্ধতির। তাদের আপ্রাণ চেষ্টা ছিল, উৎপাদনের বৃদ্ধি করা এবং দূর দেশের বাজারে মাল চালানো; আর এই কাজের জন্যে তারা সবকিছু করতে প্রস্তুত ছিল। নূতন কারখানা তৈরি করতে আর যন্ত্রপাতি কিনতে অনেক টাকা লাগে। আর সে টাকার ফল ভোগ করা যায় তখনই যখন উৎপাদন আরম্ভ হয়ে মাল বাজারে বিক্রি হতে থাকে। কাজেই কারখানার মালিকদের কারখানা-তৈরির জন্যে ব্যয়সংক্ষেপ করতে হত, এবং মালবিক্রির পয়সা ঘরে এলে তারা আবার নূতন নূতন কারখানা তৈরি করত। ব্যবহারিক উৎপাদন-পদ্ধতির উপায় আগে পাওয়ার জন্যে অন্যান্য দেশের চেয়ে তারা বেশিদূর এগিয়েছিল, আর তারা চাইত তার লাভটা ভোগ করতে। লাভ তারা সত্যিই ভোগ করত। ফলে ব্যবসাদারি এবং অর্থোপার্জনের উন্মত্ত আকাঙ্ক্ষায় তারা তাদেরই পিষে মারত যাদের কায়িক শ্রম ছিল তাদের ঐশ্বর্যের মূলে।
কাজেই এই নব উৎপাদন-পদ্ধতি সবলকর্তৃক দুর্বলের শোষণের বিশেষভাবে উপযোগী ছিল। ইতিহাসে চিরকাল এই ঘটনাই দেখা যায়। কারখানা-রীতি ব্যাপারটাকে আরও সোজা করে তুলল। আইনমতে ক্রীতদাসপ্রথার অস্তিত্ব ছিল না, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই ক্ষুধার্ত শ্রমিক, কারখানার দিনমজুরের অবস্থা পুরোনো যুগের ক্রীতদাসের চেয়ে একটুও ভালো ছিল না। আইন ছিল মালিকের অনুকূলে। এমনকি ধর্মও ছিল তারই সুবিধের, কারণ ধর্ম বলত, গরিবরা যেন ইহলোকে তাদের দুর্দশা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে, ক্ষতিপূরণ মিলবে পরলোকে। শাসক সম্প্রদায় বেশ সুবিধাজনক এক দার্শনিক মত তৈরি করে ফেললেন যে, সমাজের হিতার্থে গরিবের প্রয়োজন, অতএব তাদের অল্প মজুরি দেওয়া সম্পূর্ণ ধর্মানুগত। বেশি মজুরি দেওয়া হলেই নাকি গরিবরা বিলাসিতা শিখবে এবং যথেষ্ট পরিমাণে পরিশ্রম করবে না। এরকম চিন্তাপদ্ধতির এই সুবিধে ছিল যে, এই ধারণা কারখানার মালিক এবং অন্যান্য ধনীব্যক্তিদের বস্তুতান্ত্রিক বিধির সঙ্গে বেশ খাপ খেত।
এই সময়ের ইতিহাস বেশ কৌতূহলজনক ও শিক্ষাপ্রদ। এ থেকে অনেক কিছু শেখা যায়। দেখতে পাই, উৎপাদনের যান্ত্রিক পদ্ধতি অর্থনীতি ও সমাজের উপর কী তুমুল প্রভাব বিস্তার করে! সামাজিক রীতির আমূল পরিবর্তন হয়। নূতন নূতন শ্রেণী পুরোবর্তী হয়ে ক্ষমতালাভ করে। শিল্পীশ্রেণী কারখানার মজুরশ্রেণীতে পরিণত হয়। এ ছাড়া নূতন অর্থনীতি মানুষের ধর্ম ও নীতি সংক্রান্ত বিশ্বাস নূতন ছাঁচে গড়ে তোলে। অধিকাংশ লোকের মতবাদ নিজেদের স্বার্থ ও শ্রেণীচেতনার উপর নির্ভর করে, ফলে ক্ষমতা পেলে তারা নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্যে নূতন নূতন আইন প্রণয়ন করে। অবশ্য আপাতদৃষ্টিতে যাতে মানবহিতৈষণা এবং ধার্মিকতার থেকেই আইনের উৎপত্তি বলে মনে হয় সেইরকম চেষ্টা হয়ে থাকে। আমরা ভারতের ইংরেজ রাজপ্রতিনিধি এবং অন্যান্য সরকারি কর্তাদের কাছ থেকে অনেক মিষ্টি কথা শুনেছি। অহরহ আমরা শুনে আসছি, আমাদের মঙ্গলের জন্যে তাঁরা কী ভীষণ পরিশ্রম করছেন! সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা শাসনবিধি চালান অর্ডিন্যান্স ও বেয়নেটের সাহায্যে, এবং জনসাধারণের পেষণকার্য সমানে চলতে থাকে। আমাদের জমিদারেরা বলেন, তাঁরা প্রজাদের কী ভীষণ ভালোবাসেন, কিন্তু সেজন্যে তাদের করভারে পীড়িত করে শোষণ করতে তাঁদের বাধে না, পীড়নের ফলে হতভাগাদের উপবাসী দেহ ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। আমাদের পূঁজিবাদীরা এবং বড়ো বড়ো কারখানার মালিকরা শ্রমিক-মঙ্গলের প্রতি তাঁদের প্রখর দৃষ্টির কথা উচ্চৈঃম্বরে ঘোষণা করেন, কিন্তু এই শুভেচ্ছার থেকে মজুরিবৃদ্ধি অথবা শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতির কোনো আভাস পাওয়া যায় না। লাভ যা হয় সবই মালিকদের নূতন নূতন প্রাসাদ গড়তে ব্যয় হয়ে যায়, শ্রমিকদের মাটির ঘরের উন্নতির জন্যে কিছু বাকি থাকে না।
ভাবতে অবাক লাগে, লোকে স্বার্থসিদ্ধির খাতিরে নিজেদের মনকে এবং অপরকে কীরকম চোখ ঠারে। এইরকমে অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংরেজ মালিকরা শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতিতে সবরকমে বাধা দিত। কারখানাসংক্রান্ত এবং বাসস্থান-সংস্কারের আইনে তাদের আপত্তি ছিল, এবং সমাজের যে লোকের দুর্গতির অপসারণে কোনো দায়িত্ব আছে, এ কথা তারা সম্পূর্ণ অস্বীকার করত। তারা নিজেদের সান্ত্বনা দিত এই চিন্তা করে যে, শুধু অলস লোকরাই ভোগে। তা ছাড়া, শ্রমিকরা যে তাদের মতো রক্তমাংসের মানুষ এ কথা তারা মানতেই চাইত না। একটা নূতন নীতির উদ্ভব তারা করেছিল, যাকে বলে Laissez-faire, অর্থাৎ সরকার থেকে কোনোরকম বাধা স্বীকার না করে ব্যবসায়ে তারা যা খুশি করতে চাইত। অন্য দেশের আগে কারখানা শুরু করে তারা অগ্রগামী হয়েছিল, কাজেই তারা অর্থোপার্জন-ব্যাপারে স্বাধীনতা চাইত। Laissez-faire প্রায় অর্ধ-ঐশ্বরিক মতবাদ হয়ে দাঁড়াল, এবং তার অর্থ হল সকলের পক্ষেই সমান সুযোগ, শুধু যদি তারা সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারে। প্রতিটি নরনারী বাকি পৃথিবীর বিরুদ্ধে অগ্রগমনের জন্যে লড়াই করে; সে সংগ্রামে যদি অনেকের পতন ঘটে, কী এসে যায় তাতে?
পরস্পরের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা সভ্যতার ভিত্তি, এ কথা তোমাকে আগেই বলেছি। কিন্তু Laissez-faire নীতি এবং নূতন ধনতান্ত্রিকবাদ সভ্যতার মধ্যে আরণ্য-নীতি নিয়ে এল। কার্লাইল এর নাম দিয়েছিলেন ‘শূকরদর্শন’। জীবন এবং ব্যবসায়ের এই নূতন রীতি কার সৃষ্টি? শ্রমিকদের নয়, কারণ এ ব্যাপারে তাদের কোনো অধিকার ছিল না। এর সৃষ্টি হল ধনীশ্রেষ্ঠ কারখানার মালিকদের হাতে, যারা অর্থহীন ভাবপ্রবণতার নামে সাফল্যের পথে অন্তরায় চায় নি। স্বাধীনতা এবং সম্পত্তিস্বত্বের নামে তারা বাসস্থানের বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যরক্ষা এবং জিনিষে ভেজাল মেশানোর বিরোধিতার ব্যাপারেও আপত্তি করত।
আমি এখনি ক্যাপিটালিজ্ম্, (ধনতান্ত্রিকবাদ বা পুঁজিবাদ) কথাটা ব্যবহার করেছি। এক ধরনের পুঁজিবাদ সব দেশেই বহুকাল ধরে চলে আসছিল, অর্থাৎ সঞ্চিত ধন থেকে ব্যবসার পরিচালনা। কিন্তু কলকারখানা এবং নূতন ব্যবহারিক শিল্পের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে কারখানার উৎপাদনের জন্যে বহুগণ বেশি টাকার দরকার হয়ে পড়ল। এর নাম হল ইণ্ডাস্ট্রিয়াল ক্যাপিটাল অর্থাৎ শিল্প-ব্যবসায়ের পুঁজি। ক্যাপিটালিজ্ম্ কথাটার এখন ব্যবহার হয় শিল্পবিপ্লবের পরবর্তী অর্থনৈতিক রীতিকে বোঝাতে। এই রীতিতে ক্যাপিটালিস্টরা, অর্থাৎ পুঁজির মালিকরা, কারখানার কাজ নিয়ন্ত্রণ করে লভ্যাংশ গ্রহণ করত। শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাদ পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল, কেবল সোভিয়েট ইউনিয়ন এবং আর দুই-একটি জায়গা ছাড়া। প্রথম থেকেই পুঁজিবাদ ধনীদরিদ্রের প্রভেদটা বড়ো করে দেখিয়েছিল। উৎপাদনের যন্ত্রকৌশলের ফলে উৎপন্ন জিনিষের পরিমাণ বেড়ে গেল এবং বেশি ঐশ্বর্যও উৎপন্ন করল। অতি ধীরে ইংলণ্ডে শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি হল, তার প্রধান কারণ ভারতবর্ষ প্রভৃতি দেশের শোষণ। কিন্তু উৎপাদনের লাভের উপর শ্রমিকদের অংশ ছিল খুবই কম। শিল্পবিপ্লব এবং পুঁজিবাদ উৎপাদনের সমস্যার সমাধান করল, কিন্তু এই নূতন-উৎপাদিত অর্থের বণ্টন-সমস্যার সমাধান হল না। ফলে যাদের আছে এবং যাদের নেই এই দু দলের বিভেদ যে শুধু রয়ে গেল তাই নয়, তীব্রতর হয়ে উঠল।
অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে শিল্পবিপ্লব ঘটল। ঠিক এই সময়েই ব্রিটিশরা ভারত ও কানাডার সঙ্গে যুদ্ধ করছিল। এই সময়েই সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ চলে। এইসব ঘটনার পরস্পরের উপর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বেশ একটু হল। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি এবং তাদের ভৃত্যরা (ক্লাইভের কথা মনে কোরো) পলাশির যুদ্ধের পরে ভারত থেকে যে বিশাল পরিমাণে ধনসম্পত্তি করেছিল তাই দিয়ে নূতন নূতন ব্যবহারিক শিল্পের পত্তনের খুব সবিধে হল। আগেই বলেছি, কলকারখানার প্রবর্তন বায়সাধ্য ব্যাপার। আরম্ভে অনেক টাকা লাগে, কিন্তু সে টাকার ফল অনেকদিন পাওয়া যায় না। ঋণ অথবা অন্য কোনো উপায়ে যথেষ্ট অর্থ সংগ্রহীত না হলে দারিদ্র্য ও দুর্দশার সৃষ্টি হয়, যতদিন না কারখানায় কাজ চলে টাকা আসতে আরম্ভ হয়। ইংলণ্ডের খুবই বরাতজোর যে, যখন তার কলকারখানার উন্নতির জন্যে টাকা প্রয়োজন তখনই ভারতের লুণ্ঠনের ফলে টাকা এসে পৌঁছল।
কারখানা সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে অন্য জিনিষের অভাব অনুভূত হল। তৈরি মালের জন্যে কাঁচা মাল প্রয়োজন। যেমন কাপড় তৈরি করতে তুলো লাগে। তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন ছিল এইসব উৎপাদিত মাল বিক্রয়ের উপযুক্ত স্থান। সকলের আগে নূতন ব্যবহারিক শিল্পের বিধি প্রবর্তন করে ইংলণ্ড অনেকখানি এগিয়ে ছিল অন্যান্য দেশের তুলনায় কিন্তু তা সত্ত্বেও এই মাল বিক্রয়ের বাজারের সমস্যাটা রইল। সমাধানের জন্যে আবার ভারতের প্রবেশ, অত্যন্ত অনিচ্ছার সঙ্গে। নানা উপায়ে ইংরেজরা ভারতের বস্ত্রশিল্পের উচ্ছেদ করে বিলাতি বস্ত্রশিল্প ঢোকাল। এ সম্বন্ধে পরে আরও বলব। আপাতত মনে রাখা দরকার, কী করে ভারতকে হস্তগত করে নিজেদের ইচ্ছে তার ওপর জোর করে চাপিয়ে ইংলণ্ডে শিল্পবিপ্লবের সহায়তা করা হল।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে শিল্পবিপ্লব পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল এবং মোটামুটি ইংলণ্ডেরই অনুরূপ পুঁজিবাদী ব্যবসার আরম্ভ হল। পুঁজিবাদের ফলে স্বতই নূতন সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব, কারণ সর্বত্রই কাঁচা মালের এবং মাল বিক্রি করার মতো বাজারের চাহিদা বেড়ে গেল। এই দুই জিনিষই পাবার সবচেয়ে সোজা উপায় হল, দেশটাকেই অধিকার করা। ফলে শক্তিমান দেশগুলির মধ্যে নূতন রাজ্যবিস্তারের জন্যে হাড়োহুড়ি পড়ে গেল। ইংলণ্ডের নৌশক্তি ছিল এবং ভারতের উপরে আধিপত্য ছিল, ফলে তারই জয় হল। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ এবং তার ফল সম্বন্ধে পরে বলব।
শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজশাসিত দেশগুলিতে ল্যাঙ্কাশায়ারের কাপড়ের কলের মালিকরা, লোহার কারখানার কর্তারা এবং কয়লার খনির মালিকরা ক্রমেই নিজেদের আধিপতা বিস্তার করে চলল।