বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ইংলণ্ড থেকে আমেরিকার বিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

৯৯

ইংলণ্ড থেকে আমেরিকার বিচ্ছেদ

২রা অক্টোবর, ১৯৩২

 এইবার আমরা অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় প্রধান বিপ্লবের বিষয়ে আলোচনা করব—ইংলণ্ডের বিরুদ্ধে আমেরিকান উপনিবেশসমূহের বিদ্রোহ। এটা শুধু রাজনৈতিক বিপ্লব, শিল্পবিপ্লবের মতো অতখানি গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর পরবর্তী বিপ্লব, যা ইউরোপের সমস্ত সামাজিক ভিত্তির পরিবর্তন ঘটিয়েছিল, সেই ফরাসি বিপ্লবের তুলনাতেও এর গুরুত্ব অল্প। কিন্তু আমেরিকার এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। যে আমেরিকান উপনিবেশগুলি সেদিন স্বাধীন হয়েছিল তারাই আজ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিমান, সবচেয়ে ধনী এবং যন্ত্রশিল্পে পৃথিবীর সবচেয়ে অগ্রণী দেশ।

 তোমার ‘মেফ্লাওয়ার’ জাহাজের কথা মনে আছে? এই জাহাজেই একদল প্রোটেস্টাণ্ট ১৬২০ সালে ইংলণ্ড থেকে আমেরিকায় চলে আসেন। প্রথম জেমসের স্বৈরাচার এবং ধর্ম তাঁদের পছন্দ হয় নি। কাজেই পরবর্তী কালে ‘পিল্‌গ্রিম ফাদার্‌স্’ বলে পরিচিত এই ব্যক্তিরা চিরদিনের জন্যে ইংলণ্ড ত্যাগ করে আটলাণ্টিক মহাসাগরের পরপারে নূতন অজ্ঞাত দেশে উপনিবেশ স্থাপন করতে চলল, অধিকতর স্বাধীনতার প্রত্যাশায়। তারা উত্তরে এক জায়গায় পৌঁছে তার নাম দিল নিউ প্লিমথ। তাদের আগেও ঔপনিবেশিকরা উত্তর-আমেরিকার তটরেখার স্থানে স্থানে গিয়েছিল, পরেও অনেকে যায়, ফলে উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত আমেরিকার পূর্বতটরেখায় অনেক ছোটো ছেটো উপনিবেশ গড়ে উঠল। এইসব উপনিবেশের মধ্যে ক্যাথলিক উপনিবেশ ছিল, ইংলণ্ডের ক্যাভালিয়ার অভিজাতদের সৃষ্ট উপনিবেশ ছিল, আর ছিল কোয়েকার-উপনিবেশ। পেন্‌সিল্‌ভানিয়ার নামকরণ হয়েছিল ‘কোয়েকার পেন’এর নাম থেকে। আরও ছিল ওলন্দাজ জর্মন ডেন এবং কিছু ফরাসি। এই সংমিশ্রণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ইংরেজ ঔপনিবেশিক। ওলন্দাজরা একটি নগর নির্মাণ করে তার নাম দিল নিউ অ্যাম্‌স্‌টার্‌ডম। পরে এই নগর ইংরেজদের হস্তগত হলে এর নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় নিউ ইয়র্ক, বর্তমান যুগের বিখ্যাত নগর।

 ইংরেজ ঔপনিবেশিকরা ব্রিটিশ রাজা এবং পার্লামেণ্টের বশ্যতা স্বীকার করত। এদের অনেকেই দেশ ছেড়েছিল সেখানে তাদের অবস্থায় অসন্তুষ্ট হয়ে, এবং রাজ্য অথবা পার্লামেণ্টের খুব পক্ষপাতী ছিল না। কিন্তু দেশের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের বাসনাও তাদের ছিল না। দক্ষিণাংশের উপনিবেশসমূহের অধিবাসী ছিল ক্যাভালিয়ার এবং রাজার পক্ষাবলম্বী লোকেরা, এবং তারা স্বতই দেশের প্রতি অনেক বেশি পরিমাণে আকৃষ্ট ছিল। এইসব উপনিবেশ প্রায় সব দিক দিয়েই স্বতন্ত্র ছিল, এবং পরস্পরের সঙ্গে কোনো মিলও তাদের ছিল না। অষ্টাদশ শতাব্দীতে আমেরিকার পূর্ব- তটে তেরোটা উপনিবেশ ছিল, সবই ব্রিটিশ শাসন-ভুক্ত। উত্তরে ছিল কানাডা, দক্ষিণে স্পেনঅধিকৃত দেশসমূহ। এই তেরোটি ব্রিটিশ উপনিবেশের মধ্যে ওলন্দাজ, দিনেমার ও অন্যান্য জাতির যেসব বসতি ছিল সেগুলো সবই ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত হয়ে তাদের অধীনেই ছিল। কিন্তু এইসব উপনিবেশের অস্তিত্ব ছিল শুধু তটরেখায় এবং অল্প কিছুদূর ভিতর পর্যন্ত। তারও পরে পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বিশাল দেশ, এই তেরোটা উপনিবেশের প্রায় দশগুণ বড়ো। এইসব অঞ্চল ছিল নানা রেড-ইণ্ডিয়ান উপজাতি কর্তৃক অধ্যুষিত। এইসব উপজাতির মধ্যে প্রধান ছিল ইরোকী জাতি।

 তোমার মনে থাকতে পারে, অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইংলণ্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে পৃথিবীব্যাপী বিবাদ চলেছিল, এরই নাম হল সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ (১৭৫৬-১৭৬৩)। এ যুদ্ধ শুধু ইউরোপে সীমাবদ্ধ ছিল না, পরন্তু ভারত ও কানাডাতেও এসে পৌঁচেছিল। জয় ঘটল ইংলণ্ডের, ফলে কানাডা ফ্রান্সের হস্তচ্যুত হয়ে ইংলণ্ডের অধিকারভুক্ত হল। আমেরিকা থেকে ফ্রান্সের অন্তর্ধান ঘটল এবং উত্তর আমেরিকার সমস্ত উপনিবেশই ইংলণ্ডের শাসনাধীনে এল। একমাত্র কানাডার কিউবেক প্রদেশে কিছু ফরাসি জনসংখ্যা ছিল। তা ছাড়া উপনিবেশগুলির মধ্যে সর্বত্রই ইংরেজজাতির প্রাধান্য ঘটল। অদ্ভুত শোনালেও সত্যি যে, অ্যাংলো-স্যাক্সন অধিবাসীবেষ্টিত হলেও কিউবেক এখনও ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতির দ্বীপবিশেষ। যতদূর জানি, কিউবেক-প্রদেশের বৃহত্তম নগর মণ্ট্রিলে (কথাটা এসেছে Mont Royal থেকে) যত ফরাসিভাষী লোক আছে, প্যারিসের বাইরে আর কোনো শহরে তত নেই।

 আফ্রিকা থেকে আমেরিকার নিগ্রো-মজুর আনার জন্যে ইউরোপের কোনো কোনো দেশে যে দাস-ব্যবসায় প্রচলিত ছিল তার সম্বন্ধে আমি আগের এক চিঠিতে বলেছি। এই ভয়াবহ ঘৃর্ণিত বাণিজ্য ছিল মোটামুটি স্প্যানিয়ার্ড, পর্তুগীজ ও ইংরেজদের হাতে। আমেরিকায়, বিশেষ করে দক্ষিণরাষ্ট্রগুলিতে শ্রমজীবীর প্রয়োজন অনুভূত হয়েছিল বড়ো বড়ো তামাকের খেতে কাজ করার জন্যে। দেশের আদিম অধিবাসী, অর্থাৎ তথাকথিত রেড ইণ্ডিয়ানরা ছিল যাযাবর, এবং একস্থানে স্থিতিবিধি তাদের রুচিকর ছিল না। তা ছাড়া দাসরূপে কাজ করতে তাদের বিলক্ষণ আপত্তি ছিল। মচকানোর চাইতে ভাঙতে তারা প্রস্তুত ছিল, এবং কালক্রমে সত্যিই তাদের ভাঙতে হল। রেডইণ্ডিয়ানদের প্রায় শেষ করে আনা হল; যারা বাকি থাকল, নূতন ধরনের অবস্থার মধ্যে পড়ে তারাও অনেকে মরল। যারা একদিন একটা গোটা মহাদেশ অধ্যুষিত করে ছিল, আজ তাদের মধ্যে হবে অল্প কয়জনই টিঁকে আছে।

 রেড-ইণ্ডিয়ানরা খেতে কাজ করতে রাজি হল না, অথচ শ্রমজীবীর বিশেষ দরকার। ফলে মানুষ শিকারীরা ধরতে লাগল আফ্রিকার হতভাগ্য অধিবাসীদের, এবং অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতার সঙ্গে তাদের সমুদ্রপারে পাঠাতে আরম্ভ করল। এইসব নিগ্রোদের দক্ষিণ-রাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হল, ভার্জিনিয়া ক্যারোলিনা জর্জিয়া এইসব স্থানে, এবং দলে দলে তামাক ও অন্যান্য ফসলের খেতে কাজে লাগিয়ে দেওয়া হল।

 উত্তর-রাষ্ট্রসমূহে অবস্থা একটু অনারকম ছিল। মেফ্লাওয়ার জাহাজে পিলগ্রিম-ফাদারেরা যে পিউরিটান আদর্শ নিয়ে এসেছিলেন তা সেখানে ছিল। ক্ষেত ছিল ছোটো ছোটো, দক্ষিণের মতো অত বিশাল নয়। অগণিত শ্রমিক অথবা দাসের প্রয়োজন এসব ক্ষেতে ছিল না। জমির কোনো অভাব ছিল না, সকলেই নিজস্ব কৃষিক্ষেত্র অবলম্বন করে নিজেই নিজের প্রভু হতে চেয়েছিল। ফলে এই ঔপনিবেশিকদের মধ্যে একটা সাম্যের ভাব গড়ে উঠল

 ইংলণ্ডের রাজা এবং অনেক ধনী ভূম্যধিকারীর এইসব উপনিবেশে, বিশেষ করে দক্ষিণে, বেশ একটা স্বার্থ ছিল। তাঁরা এইসব উপনিবেশকে যতদূর শোষণ করা যায় তার চেষ্টা করতেন। সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের পরে আমেরিকান উপনিবেশগুলি থেকে টাকা তোলার বিশেষ চেষ্টা হয়েছিল। পার্লামেণ্ট ছিল ভূম্যধিকারীদের করতলগত, কাজেই তাঁরা উপনিবেশগুলিকে দোহন করতে সহজেই প্রস্তুত ছিলেন, এবং রাজার নীতি সমর্থন করতে লাগলেন। নূতন নূতন কর ধার্য হল, এবং বাণিজ্য-ব্যাপারে আরোপ করা হল অনেক বাধানিষেধ। তোমার মনে থাকতে পারে, এই সময়ে
মানচিত্রে সংখ্যাদ্বারা নির্দেশিত আমেরিকার তেরোটি বিদ্রোহী উপনিবেশের নাম:—
১—ম্যাসাচুসেট্‌স্‌, ২—নিউ হ্যাম্‌প্‌সায়ার, ৩—নিউইয়র্ক, ৪—কনেক্টিকাট, ৫—রোডদ্বীপ, ৬—পেন্‌সিল্‌ভ্যানিয়া, ৭—নিউজার্সি, ৮—মেরিল্যাণ্ড, ৯—ডেলাওয়ার, ১০—ভার্জিনিয়া, ১১—উত্তর-ক্যারোলিনা, ১২—দক্ষিণ-ক্যারোলিনা, ১৩—জর্জিয়া।
ভারতবর্ষেও ইংরেজদের দ্বারা বাঙলাদেশে দোহনকার্য আরম্ভ হয়েছিল এবং ভারতীয় বাণিজ্যের পথে অনেক অন্তরায় সৃষ্টি করা হয়েছিল।

 ঔপনিবেশিকরা এইসব অন্তরায় ও নূতন কর-নীতির প্রতিবাদ করল, কিন্তু সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধে জয়লাভের পরে ইংরেজ সরকারের আত্মশক্তির উপরে বিশ্বাস এসেছিল, কাজেই এসব প্রতিবাদে তাঁরা কর্ণপাত করলেন না। কিন্তু সপ্তবর্ষব্যাপী সংগ্রামে ঔপনিবেশিকরাও অনেক জিনিষ শিখেছিল। বিভিন্ন উপনিবেশ অথবা রাষ্ট্রের অধিবাসীরা পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়ে পরিচয় ঘনিষ্ঠ করে নিয়েছিল। স্থায়ী ইংরেজ সৈনাবাহিনীর সঙ্গে একসঙ্গে ফরাসি সৈনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তারা যুদ্ধের ভীষণতার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল। অতএব তারাও অন্যায় ও অবিচার মুখ বুজে মেনে নিতে মোটেই প্রস্তুত ছিল না।

 ১৭৭৩ সালে যখন ব্রিটিশ সরকার জোর করে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির চা তাদের উপরে চাপানোর চেষ্টা করলেন তখনই গোলমাল ঘনিয়ে এল। ইংলণ্ডের অনেক ধনীই ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির অংশীদার ছিলেন, ফলে কোম্পানির ভালোমন্দ তাঁদের নিজেদের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত ছিল। শাসনবিভাগে তাঁদের যথেষ্ট প্রতিপত্তি ছিল, এবং সম্ভবত কর্তৃপক্ষেরও অনেকে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ফলে, তারা যাতে অবাধে আমেরিকার বাজারে চা নিয়ে বিক্রয় করতে পারে তার জন্যে সরকার কোম্পানিকে উৎসাহিত করতে লাগলেন। কিন্তু এর ফলে স্থানীয় ঔপনিবেশিকদের চায়ের ব্যবসায়ে ক্ষতি হল এবং অসন্তোষের সৃষ্টি হল। অতএব তারা বিদেশী চা বর্জন করার সিদ্ধান্ত করল। ১৭৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির চা বোস্টন-বন্দরে জাহাজ থেকে নামানোর চেষ্টায় বাধা পড়ল। কয়েকজন ঔপনিবেশিক রেড-ইণ্ডিয়ানদের ছদ্মবেশে মালজাহাজে উঠে চা সমুদ্রে ফেলে দিল। বেশ খোলাখুলিভাবে সহানুভূতিশীল জনতার সামনেই ব্যাপারটা ঘটল। যেন ঔপনিবেশিকরা ইংলণ্ডকে যুদ্ধে আহ্বান করল, এবং এর থেকেই বিদ্রোহী উপনিবেশ ও ইংলণ্ডের মধ্যে যুদ্ধ ঘনিয়ে এল।

 ইতিহাসের নিখুঁত পুনরাবৃত্তি কখনও ঘটে না, কিন্তু আশ্চর্য এই যে, সময়ে সময়ে এক-একটা ঘটনা ঘটে যাকে প্রায় পুনরাবৃত্তিই বলা চলে। ১৭৭৩ সালে বোস্টন-বন্দরে সমুদ্রে চা নিক্ষেপের ইতিহাস বিখ্যাত। একে বলা হয় ‘বোস্টন টি-পার্টি’। আড়াই বছর আগে বাপু যখন তাঁর ভাষণসত্যাগ্রহ, এবং ডাণ্ডির লবণ-অভিযান আরম্ভ করলেন, ব্যাপারটা আমেরিকায় অনেককে ‘বোস্টন টি-পার্টি’র কথা মনে করিয়ে দিল। অনেকে এই নূতন সল্‌ট্-পার্টির সঙ্গে তার তুলনা করেছিল। অবশ্য দুটো ঘটনার মধ্যে অনেক তফাত আছে।

 দেড় বছর পরে ১৭৭৫ সালে ইংলণ্ড এবং তার আমেরিকান উপনিবেশগুলির মধ্যে যুদ্ধ বাধল। উপনিবেশগুলি লড়ছিল কী জন্যে? স্বাধীনতার জন্যে অথবা ইংলণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হবার জন্যে নয়। এমনকি যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পরেও, যখন উভয় পক্ষে প্রচুর রক্তপাত ঘটেছে তখনও, ঔপনিবেশিকদের নেতৃস্থানীয় বাকিরা ইংলণ্ডের রাজা তৃতীয় জর্জকে ‘মহানুভব নপতি মহোদয়’ বলে পত্রাদিতে সম্বোধন করতেন, এবং নিজেদের তাঁর পরম অনুগত প্রজা বলে মনে করতেন। এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটেছে এবং সেইজন্যেই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হল্যাণ্ডে যখন স্পেনের বিরুদ্ধে তুমুল সংগ্রাম চলছে তখনও স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপকে তার অধীশ্বর বলে স্বীকার করা হত। অনেক বছর যুদ্ধ করার পরে তবে হল্যাণ্ড নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। ভারতে বহু বর্ষব্যাপী সন্দেহ ও ইতস্তত করার পর, এবং ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন ও অনুরূপ কতকগুলি জিনিষ নিয়ে নাড়াচাড়া করার অবসানে ১৯৩০ সালের ১লা জানুয়ারি আমাদের জাতীয় কংগ্রেস পূর্ণ-স্বাধীনতার পক্ষে মত ঘোষণা করলেন। এখনও এমন অনেকে আছেন যাঁরা পূর্ণ-স্বাধীনতার নামে ভয় পান, এবং ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন-পদ্ধতি প্রবর্তনের কথা বলেন। কিন্তু হল্যাণ্ড ও আমেরিকার উদাহরণ এবং ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, এরকম সংগ্রামের সমাপ্তি হতে পারে শুধু পূর্ণ স্বাধীনতায়।

 ১৭৭৪ সালে, উপনিবেশসমূহ এবং ইংলণ্ডের মধ্যে যুদ্ধ বাধার অল্প দিন আগে, ওয়াশিংটন বলেছিলেন যে, সমস্ত উত্তর আমেরিকার মধ্যে কোনো বুদ্ধিমান লোকই স্বাধীনতা চায় না। অথচ এই ওয়াশিংটনই কালে আমেরিকান সাধারণতন্ত্রের প্রথম সভাপতি হয়েছিলেন। ১৭৭৪ সালে যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পরে, ঔপনিবেশিক কংগ্রেসের ছেচল্লিশ জন প্রধান সভ্য বিনীত প্রজা রূপে রাজা তৃতীয় জর্জকে সম্বোধন করে পত্র লিখলেন, এবং শান্তি ও ‘রক্তবন্যা’র বিরতির জন্যে প্রার্থনা জানালেন। তাঁদের একান্ত ইচ্ছা ছিল ইংলণ্ড ও তার আমেরিকান উপনিবেশগুলির মধ্যে শান্তি ও সদ্ভাবের পুনঃস্থাপন হয়। তাঁরা বেশি কিছু প্রার্থনা করেন নি, চেয়েছিলেন শুধু ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন, এবং বলেছিলেন (ওয়াশিংটনের ভাষায়) যে, কোনো প্রকৃতিস্থ ব্যক্তিই স্বাধীনতা চায় নি। এই আবেদনের নাম হল ‘অলিভ ব্র্যাঞ্চ পিটিশন’[]

 কিন্তু দু বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই এই আবেদনের স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে পঁচিশ জন আর-একটি দলিলে স্বাক্ষর করলেন, সে দলিল হল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র।

 দেখা যাচ্ছে, উপনিবেশসমূহ স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে যুদ্ধ আরম্ভ করে নি। তাদের অসন্তোষের কারণ ছিল করভার এবং অবাধ বাণিজ্যের অন্তরায়। ব্রিটিশ পার্লামেণ্টের তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কর দিতে বাধ্য করার অধিকার তারা অস্বীকার করেছিল। তাদের বিখ্যাত ধ্বনি ছিল ‘প্রতিনিধিত্ব বিনা কর দেব না’, কারণ ব্রিটিশ পার্লামেণ্টে তাদের একজনও প্রতিনিধি ছিল না।

 ঔপনিবেশিকদের সৈন্যবাহিনী ছিল না, কিন্তু প্রয়োজন হলে পিছিয়ে গিয়ে নির্ভর করে থাকবার মতো বিশাল ভূখণ্ড ছিল। ক্রমে তারা সৈন্যদল গড়ে তুলল। অবশেষে ওয়াশিংটন তাদের সর্বাধিনায়ক হলেন। দু-একটি খণ্ডযুদ্ধে তারা সাফল্যলাভ করবার পর ফ্রান্স বোধ হয় ভাবল, এই হল পুরোনো শত্রুকে জব্দ করার উপযুক্ত সময়, এবং ফলে উপনিবেশদলের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিল। স্পেনও ইংলণ্ডের বিরদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। ইংলণ্ডের অবস্থাবৈগুণ্য দেখা দিল, কিন্তু চলল বহুকাল ধরে। ১৭৭৬ সালে এল ঔপনিবেশিকদের বিখ্যাত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’। ১৭৮২ সালে যুদ্ধ শেষ হল, এবং যুদ্ধরত দেশসমূহের মধ্যে সন্ধিপত্র (প্যারিসের শান্তিচুক্তি) স্বাক্ষরিত হল ১৭৮৩ সালে।

 এইভাবে তেরোটি আমেরিকান উপনিবেশ স্বাধীন সাধারণতন্ত্রে পরিণত হল, যার নাম হল আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বহু দিন যাবৎ এই রাষ্ট্রগুলির মধ্যে ঈর্ষার ভাব বর্তমান ছিল, এবং প্রত্যেকেই মোটামুটি নিজেকে স্বতন্ত্র বিবেচনা করত। যুক্ত জাতীয়তার ভাব এল ধীরে ধীরে। দেশ ছিল বিশাল, আর তার বৃদ্ধি ছিল ক্রমাগত পশ্চিম দিকে। এই হল বর্তমান জগতের প্রথম মহাসাধারণতন্ত্র—ক্ষুদ্রকায় সুইজারল্যাণ্ড ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও প্রকৃত সাধারণতন্ত্র প্রচলিত ছিল না। হল্যাণ্ডে সাধারণতন্ত্র হলেও সেখানে অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রভুত্ব ছিল। ইংলণ্ডে যে শুধু রাজতন্ত্র প্রচলিত ছিল তাই না, এর পার্লামেণ্টও ছিল অল্পসংখ্যক ধনী ভূম্যধিকারীর হাতে। অতএব যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণতন্ত্র হল একটা নূতন ধরনের দেশ। এশিয়া ও ইউরোপের সব দেশের মতো এর অতীত বলে কিছু ছিল না। সামন্তপ্রথার কোনো চিহ্ন ছিল না, অবশ্য দক্ষিণ-রাষ্ট্রসমূহে দাসবৃত্তি ছাড়া। ফলে বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বৃদ্ধির পথে বিশেষ কোনো অন্তরায় ছিল না, এবং বৃদ্ধি ঘটলও খুব দ্রুত। স্বাধীনতা-সংগ্রামের সময় লোকসংখ্যা ছিল চল্লিশ লক্ষের নীচে। দু বছর আগে, অর্থাৎ ১৯৩০ সালে, লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে বারো কোটি বিশ লক্ষ।

 জর্জ ওয়াশিংটন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম অধিনায়ক নির্বাচিত হলেন। তিনি ছিলেন ভার্জিনিয়া স্টেটের একজন ধনী ভূম্যধিকারী। এই কালের আর যেসব খ্যাতনামা ব্যক্তিদের সাধারণতন্ত্রের স্থাপয়িতা বলা হয়, তাঁরা হলেন টমাস পেন, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্ক্‌লিন, প্যাট্রিক হেন্‌রি, টমাস জেফার্‌সন, অ্যাডাম্‌স্‌ এবং জেম্‌স্‌ ম্যাডিসন। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্ক্‌লিনের খাতি ছিল অসামান্য, এবং তিনি একজন বড়ো বৈজ্ঞানিকও ছিলেন। ছেলেদের ঘুড়ি উড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, মেঘে যে বিদ্যুৎ চমকায় তা পৃথিবীর বিদ্যুৎ থেকে অভিন্ন।

 ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতার ঘোষণায় ছিল ‘জন্মকালে সব মানুষই সমান’। এ তথ্য পুরো সত্য নয়; কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, কেউ জন্মায় দুর্বল হয়ে, কেউ-বা সবল, কেউ অন্যের চেয়ে বুদ্ধিমান এবং কার্যক্ষম। কিন্তু এই ঘোষণার ভিতরের আদর্শ স্পষ্ট এবং প্রশংসনীয়। ঔপনিবেশিকরা চেয়েছিলেন ইউরোপের সামন্ত প্রথার অসাম্য দূর করতে। শুধু যদি এইটেই ধরা যায়, তবু তাঁদের প্রচেষ্টা কম অগ্রগামী নয়। সম্ভবত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের অনেক লেখকই ভল্‌টেয়ার, রুশো, এবং তৎপরবর্তী অষ্টাদশ শতাব্দীর অন্যান্য ফরাসি দার্শনিকদের দ্বারা প্রভাবাম্বিত হয়েছিলেন।

 জন্মকালে সব মানুষই সমান—কিন্তু তবু হতভাগ্য নিগ্রো ছিল অধিকারবর্জিত দাস মাত্র! এই নিগ্রো-দাসত্ব নব-নির্মিত শাসনবিধির সঙ্গে খাপ খেল কী করে? খাপ খেল না এবং এখনও খাপ খায় নি। বহুবর্ষ পরে উত্তরের এবং দক্ষিণের রাষ্ট্রগুলির মধ্যে এক তুমল গৃহযুদ্ধ বাধল। ফলে দাসত্ব-প্রথা বর্জিত হল। কিন্তু নিগ্রো-সমস্যা আমেরিকায় এখনও চলছে।

  1. অলিভ অর্থাৎ জলপাইয়ের শাখা—শান্তির প্রতীক।