বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ইংলণ্ড সমস্ত পৃথিবীর মহাজন হয়ে বসল
১৩৬
ইংলণ্ড সমস্ত পৃথিবীর মহাজন হয়ে বসল
২৩শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৩
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংলাণ্ডের যে সমৃদ্ধি দেখা গেল তার মূলে ছিল তার কলকারখানা, আর তার উপনিবেশ এবং অধীন দেশগুলোকে শোষণ করে পাওয়া টাকা। বিশেষ করে চারটি শিল্পকে আশ্রয় করেই তার ধনসম্পত্তি বেড়ে উঠছিল। এই শিল্পগুলোকে তার ‘প্রধান’ শিল্প বলা যায়—এরা হচ্ছে তার কাপড় কয়লা লোহা আর জাহাজ তৈরির শিল্প। এগুলো ছাড়াও এদেরই আশেপাশে আরও হাজারো রকমের ছোটো-বড়ো শিল্প গড়ে উঠল। বড়ো বড়ো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, বড়ো বড়ো ব্যাঙ্ক তৈরি হল। ব্রিটেনের বাণিজ্য জাহাজ পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই দেখা যেতে লাগল, তারা শুধু ব্রিটেনের তৈরি মাল বহন করে নেয় না, অন্যান্য শিল্পপ্রধান দেশেরও সমস্ত ভালো ভালো পণ্যদ্রব্য নিয়ে যায়। পৃথিবীতে পণ্যদ্রব্যের এরাই হয়ে উঠল প্রধান বাহক। লণ্ডনের বড়ো বীমা কোম্পানি ছিল লয়েড্স্; সেটা সমস্ত পৃথিবীর সামুদ্রিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠল। এইসব শিল্প এবং বাণিজ্যের কর্তারাই পার্লামেণ্টেও প্রভুত্ব করতে লাগলেন।
বাইরে থেকে জলস্রোতের মতো ধনরত্ন আসতে লাগল; উচ্চ এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীদের ধনসম্পদ ক্রমেই আরও বেড়ে চলল; এই সম্পদের কিছুটা শ্রমিকশ্রেণীর হাতেও গিয়ে পৌঁছল এবং তাদের জীবনযাত্রার মান কিছুটা উন্নত করে তুলল। প্রশ্ন উঠল, এই-যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ধনীদের হাতে আসছে, একে দিয়ে কী করা যায়। একে ব্যবহার না করে ফেলে রাখা মূর্খতা; সবাই বলল, ব্যবসাবাণিজ্য আরও বাড়াও, আরও বেশি পণ্য উৎপাদন করো, আরও বেশি লাভ হোক। এই ধনের অনেকখানি দিয়ে ইংলণ্ডে এবং স্কটল্যাণ্ডে নূতন নূতন কারখানা রেলওয়ে ইত্যাদি গড়ে তোলা হল। কিছু দিনের মধ্যেই অনেক কারখানা তৈরি হয়ে গেল, দেশটা সম্পর্ণরূপে শিল্পপ্রবণ হয়ে উঠল; এবং তৎসঙ্গে স্বভাবতই লাভেরও হার বেড়ে চলল; কারণ তখন আর প্রতিদন্দ্বিতার ভয় নেই। যে ধনিকদের হাতে তখনও টাকা জমে রয়েছে তাদের তখন দৃষ্টি পড়ল বিদেশের দিকে—বিদেশে কোথাও টাকা লাগিয়ে আরও বেশি লাভ তুলে নেবার মতো জায়গা পাওয়া যায় কি না। সুযাগেরও অভাব হল না। পৃথিবীর সমস্ত দেশেই তখন রেলওয়ে তৈরি হচ্ছে, টেলিগ্রাফের তার আর কেব্ল্ এবং কারখানা বসানো হচ্ছে। ব্রিটেনের উদ্বৃত্ত টাকাটা এই রকমের অনেক কাজে নিযুক্ত করা হল, ইউরোপ আমেরিকা ও আফ্রিকায় ব্রিটেনের সমস্ত অধীন দেশের সর্বত্র। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব নেই; তার জোরেই সে তখন উন্নতির পথে দ্রুত এগিয়ে চলেছে; রেলওয়ে প্রভৃতি তৈরি করবার জন্যে ব্রিটেনের অনেকখানি মূলধন সে নিয়ে নিল। দক্ষিণ-আমেরিকাতে, বিশেষ করে আর্জেণ্টিনাতে, খুব বড়ো বড়ো সব বাগান ব্রিটেন করল। কানাডা আর অস্ট্রেলিয়া দেশকে তো গড়েই তোলা হল আগাগোড়া ব্রিটিশ মূলধন দিয়ে। চীনে ব্যবসাবাণিজ্যের অধিকার নিয়ে যে সংগ্রাম হল তার কথা তোমাকে আগেই বলেছি। ভারতবর্ষে অবশ্য ব্রিটিশরাই ছিল প্রভু; রেলওয়ে এবং অন্যান্য কাজের জন্যে তারা টাকা ধার দিল এখানে; সে ধারের শর্তও তারা নিজেদেরই ইচ্ছামতো খুব উঁচু হারে স্থির করে দিল।
এমনি করে ব্রিটেন সমস্ত পৃথিবীর মহাজন হয়ে বসল; লণ্ডন হল পৃথিবীর টাকার বাজার। কিন্তু টাকা ধার দিচ্ছে বলে মস্ত মস্ত বস্তায় পুরে সোনা রূপো বা নগদ টাকা ইংলণ্ড থেকে অন্যান্য দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছিল এমন কিন্তু মনে কোরো না। আধুনিক যুগের ব্যবসা এরকমভাবে চলে না; সে চালাতে গেলে যত সোনা রূপো লাগে অত নগদ সোনা-রূপোর সম্বলই নেই পৃথিবীতে। অজ্ঞ লোকেরা সোনা বা রূপোকেই একটা পরম প্রয়োজনীয় বস্তু বলে মনে করে; কিন্তু আসলে এগুলো হচ্ছে পণ্য-বিনিময়ের এবং জিনিষপত্র কেনা-বেচার সহায়ক উপকরণ মাত্র। সোনারূপো মানুষ খেতে পারে না, পরতে পারে না, বা অন্য-কোনো ভাবে ব্যবহার করতে পারে না—এক, গয়না করে অবশ্য পরতে পারে; কিন্তু তাতে মানুষের উপকার বিশেষ কিছুই নেই। প্রকৃতপক্ষে সম্পদ বলতে বোঝায় এমন জিনিষ থাকা যা ব্যবহারের কাজে লাগে। কাজেই ইংলণ্ড অর্থাৎ ব্রিটিশ ধনিকরা যে ক্ষেত্রে অন্যকে টাকা ধার দিল, তার মানে দাঁড়াল, তারা বিদেশের কোনো শিল্পে বা রেলওয়েতে টাকা ন্যস্ত করছে, এবং তার জন্যে নগদ টাকা পাঠাচ্ছে না, পাঠাচ্ছে বিলাতি মাল। এইভাবে ব্রিটেন থেকে কলকব্জা বা রেলওয়ে তৈরি করবার মালপত্র অন্যান্য দেশে পাঠানো হতে লাগল। এর ফলে এক দিকে ব্রিটেনের ব্যবসাবাণিজ্যের উন্নতি হল, অন্য দিকে ব্রিটেনে যাদের হাতে মূলধন জমে ছিল তারাও সে বাড়তি টাকাটা বেশ লাভজনক শর্তেই খাটিয়ে নেবার সুযোগ পেয়ে গেল।
টাকা লগ্নী করাটা খুব লাভের ব্যবসা; এই ব্যবসা ব্রিটেন যত বেশি করে গ্রহণ করল, তার ধনসম্পদও ততই বেড়ে চলল। এর ফলে সৃষ্টি হল প্রকাণ্ড একটা অবসরী-শ্রেণীর; উৎপাদনের কোনো কাজই এদের করতে হয় না, এরা খালি বসে বসে থাকে আর এই লগ্নী-ব্যবসার লাভ আর ডিভিডেণ্ড ভোগ করে। রেলওয়ে কোম্পানি বা চা-বাগান বা ঐরকম অন্যসব প্রতিষ্ঠানের এরা অংশীদার হয়ে বসল; ডিভিডেণ্ডও নিয়মিতভাবেই পেতে লাগল। ফ্রান্সের অন্তর্গত রিভিয়েরা, ইতালি সুইজারল্যাণ্ড প্রভৃতি বহু চমৎকার জায়গাতে অবসরী-শ্রেণীয় ইংরেজদের বহু উপনিবেশ গড়ে উঠল, এই অবসরী লোকেরা তার মালিক—এরা নিজেরা অবশ্য প্রায় সকলেই ইংলণ্ডেই বসে থাকত।
ইংলণ্ডের কাছ থেকে যেসব দেশ এইভাবে টাকা ধার করল সে টাকার দরুন সুদ বা ডিভিডেণ্ড তারা ইংলণ্ডকে পৌছে দিত কীরকম করে? তারাও কিন্তু সোনারুপো পাঠাতে পারত না; বছরের পর বছর ধ’রে দিয়ে যাবার মতো এত সোনারুপো তো তাদের ছিল না। তারাও কাজেই দিত মালপত্র, কারখানার তৈরি মাল নয়, কারখানার রাজা তো ইংলণ্ড নিজেই হয়ে আছে। এরা তাকে দিত খাদ্যদ্রব্য আর কাঁচা মাল। এদের কাছ থেকে ইংলণ্ডে আসত গম চা কফি মাংস ফল মদ তুলো পশম ইত্যাদি। সে আসার আর বিরাম ছিল না।
দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্য চলার মানে হচ্ছে এদের উভয়ের জিনিষপত্র বদলাবদলি করে নেওয়া। একটি দেশ কেবল কিনেই যাবে আর অন্যটি খালি বেচতেই থাকবে, এ কখনও সম্ভব নয়। সে চেষ্টা করতে গেলে সমস্ত দামই সোনা বা রূপো দিয়ে দিতে হবে; দু দিন পরেই দেখা যাবে, আর দেবার মতো সোনার রুপো অবশিষ্ট নেই, সুতরাং এই একপেশে বাণিজ্য নিজে থেকেই থেমে যাবে। দুই দেশে পরস্পর বাণিজ্য যখন চলে তখন দু পক্ষের মধ্যে পণা-বিনিময় হয়, তার সামঞ্জস্যও সে নিজেই খাড়া করে নেয়—কখনও সে বাণিজ্যের লাভের পাল্লা এ দেশের দিকে বেশি ঝুঁকে যায়, কখনও-বা ও দেশের দিকে ঝোঁকে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংলণ্ড যে বাণিজ্য করত তার হিসাব মিলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, মোটের উপর সে যত মাল রপ্তানি করত তার চেয়ে আমদানি করত বেশি। অর্থাৎ খুব বিরাট পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করেও, বস্তুত সে আমদানি করত তার চেয়ে অনেক বেশি টাকার জিনিষ। তফাতের মধ্যে ছিল শুধু—এই রপ্তানি সে করত কলের তৈরি জিনিষ, আমদানি করত প্রধানত খাদাদ্রব্য আর কাঁচা মাল। কাজেই বাইরে থেকে দেখলে মনে হত, ইংলণ্ড যত মাল বেচছে তার চেয়ে কিনছে বেশি; ব্যবসা চালাবার দিক থেকে সেটাকে খুব ভালো ব্যবস্থা বলে মনে হয় না। বাস্তবিক পক্ষে কিন্তু এই-যে বাড়তি পরিমাণ আমদানিটা তার হত এটা ছিল, যে টাকা সে বিদেশে ধার দিয়েছে তার দরুন লাভের বাবদে পাওনা। ঋণী দেশরা এবং ভারতবর্ষ প্রভৃতি অধীন দেশরা এইভাবেই তাকে তার প্রাপ্য নজরানা মিটিয়ে দিত।
টাকা খাটিয়ে যত লাভ হত তার সবখানিই ইংলণ্ডে চলে আসত না; অনেকখানিই থেকে যেত সেই ঋণী দেশে, ব্রিটিশ ধনিকরা সেটাকে সেইখানেই আবার নূতন করে লগ্নী করত। এর ফলে ইংলণ্ড থেকে আবার নূতন টাকা বা মালপত্র বাইরে না পাঠিয়েও বিদেশে ব্রিটেনের লগ্নি-মূলধনের মোট পরিমাণ ক্রমাগত বেড়ে বেড়ে চলল। ভারতবর্ষে আমাদের প্রায়ই স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, এখানকার রেলওয়ে, খাল এবং অন্যান্য নানা ব্যাপারে ইংলণ্ডের কী বিপুল পরিমাণ টাকা নিহিত রয়েছে; শোনা যায়, এদের দরুন ইংলণ্ডের কাছে ভারতবর্ষের যে ‘ঋণ’ রয়েছে তার পরিমাণ নাকি অতি বৃহৎ। আমরা অবশ্য অনেক দিক থেকেই এই কথাটাতে আপত্তি প্রকাশ করছি; কিন্তু এখানে সে আলোচনা আমাদের দরকার নেই। তবে এটা লক্ষ করবার মতো; এই-যে বিরাট পরিমাণ লগ্নি টাকা, এটা ইংলণ্ড থেকে নূতন মূলধন এ দেশে আসবার ফলে গড়ে ওঠে নি; ভারতবর্ষে যে লাভ তাদের হয়েছে সেইটেকেই শুধু এ দেশে আবার লগ্নি করা হয়েছে। পলাশির যুদ্ধ এবং ক্লাইভের শাসনের আমলে বরং ভারতবর্ষ থেকেই বহু সোনা আর ধনরত্ন ইংলণ্ডে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সে কথা তোমাকে আগেই বলেছি। তার পরবর্তী যুগে ভারতবর্ষকে শোষণের ব্যাপারটা কিছু অন্য এবং অস্পষ্ট রূপ নিয়েছে; সে শোষণের ফলে যে লাভ হচ্ছিল তারও খানিকটা এই দেশেই আবার লগ্নি করা হয়েছে।
ইংলণ্ডে দেখল, সমস্ত পৃথিবী জুড়ে এই তেজারতির কারবার চালাতে হলে একটিমাত্র উপায় তার আছে, টাকার সুদের বিনিময়ে মালপত্র নিতে রাজি থাকা। সোনা দিয়েই দাম দিতে হবে এমন আবদার করলে চলবে না, সে কথা আগেই বলেছি। এর দুটি বড়ো ফল হল। ইংলণ্ডের প্রজার জন্যে বাইরে থেকে খাদ্যদ্রব্যের চালান আনা হতে লাগল, সুতরাং ইংলণ্ডের নিজ দেশে কৃষিকার্যের অবনতি ঘটল। ইংলণ্ড এতে আপত্তি করল না। শিল্প-কারখানার সাহায্যে বাইরের বাজারে বেচবার মতো মাল তৈরি করবার দিকেই সে তার সমস্ত মনোযোগ নিবিষ্ট করল; দেশের চাষিদের যে দুর্দশা হচ্ছিল তার দিকে তাকিয়েও দেখল না। বাইরে থেকে যদি শস্তায় খাদ্য পাওয়া যায় তবে হাঙ্গামা সয়ে নিজের তা উৎপাদন করতে যাবার দরকার? আর শিল্প থেকে যখন অনেক বেশি লাভ পাওয়া যাচ্ছে, কৃষি নিয়ে অযথা মাথা ঘামাতেই বা সে যায় কেন? অতএব ইংলণ্ড একটি পুরোপুরি শিল্পাশ্রয়ী দেশ হয়ে উঠল; খাদ্যসামগ্রীর জন্যে থাকল অন্য দেশের উপর নির্ভর করে।
দ্বিতীয় ফলটি হচ্ছে, ইংলণ্ড অবাধ-বাণিজ্যের নীতি গ্রহণ করল; অর্থাৎ বাইরে থেকে যেসব মালপত্র ইংলণ্ডের বন্দরে এসে নামছে তার উপরে কোনো কর সে বসাল না, বা বসালেও অতি সামান্য পরিমাণেই বসাল। শিল্পাশ্রয়ী দেশদের মধ্যে সেই তখন সকলের অগ্রণী; বাইরে থেকে শিল্পজাত পণ্য তার বাজারে এসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করবে, সে ভয় তার তখনও অনেক কাল না করলে চলবে। তার পক্ষে বিদেশী জিনিসের উপরে কর বসানো মানেই হচ্ছে বাইরে থেকে যে খাদ্যদ্রব্য আর কাঁচা মাল তার জন্যে আসছে তার উপরে কর বসানো। তার ফলে তার নিজের প্রজারই খাদ্যের দাম বাড়বে, আর বাড়বে তার তৈরি পণ্যের দাম। আর খুব বেশি কর বসিয়ে যদি সে বাইরে থেকে জিনিষপত্র আসাই বন্ধ করে দেয় তবে বাইরের যে দেশরা তার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছে তারা ইংলণ্ডকে তাদের দেয় নজরানা পাঠিয়ে দেবে কী করে? তারা তা দিতে পারে এক মালপত্র দিয়েই। এইজন্যেই ইংলণ্ড অবাধ-বাণিজ্যের নীতি গ্রহণ করল; যদিও তখন অন্যান্য সমস্ত শিল্পাশ্রয়ী দেশই রক্ষণ-শুল্কের নীতি গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ বাইরে থেকে যত পণ্য দেশে আসছে তার উপরে কর বসিয়ে নিজেদের নূতন নূতন শিল্পব্যবসাগুলোকে রক্ষা করছে। যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্স জর্মনি, সকলেই তখন রক্ষণ-শুল্ক-পন্থী।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংলণ্ডের নীতি ছিল এই: কৃষির দিকে সে লক্ষ্য দেয় নি, সমস্তখানি মনোযোগ দিছে শিল্পের দিকে, বাইরে থেকে সামগ্রী কিনে এবং বিদেশ থেকে পাওয়া আয়ের জোরে সুখে স্বচ্ছন্দে বাস করেছে। নীতি হিসাবে এটা বেশ লাভের আর আরামের বস্তু ছিল। কিন্তু এর বিপদও ছিল, সে বিপদ এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই নীতিটি প্রতিষ্ঠিত ছিল শিল্পব্যবসায়ে ব্রিটেনের প্রাধান্য আর তার বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক বাণিজ্যের উপর। কিন্তু সে প্রাধান্য যদি চলে যায়, এবং তার সঙ্গে সঙ্গে তার বৈদেশিক বাণিজ্যেও যদি ভাঙন ধরে, তখন? তখন সে খাদ্যের দাম দেবে কী দিয়ে? আর দাম দেবার সঙ্গতি যদিই-বা থাকে, বিদেশ থেকে সে খাদ্য দেশে আনবে কী করে, যদি কোনো বলশালী শত্রু রাস্তা জুড়ে দাঁড়ায়? গেল-বিশ্বযুদ্ধেই তো তার খাদ্য পাবার পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, ফলে তার সমস্ত প্রজা অনাহারে মারা যাবার উপক্রম! এর চেয়েও বড়ো বিপদের কথা, অন্যান্য দেশের প্রতিবন্দ্বিতার চাপে পড়ে তার বৈদেশিক বাণিজ্যেরও অবস্থা দিন দিনই খারাপ হয়ে পড়ছে। ১৮৮০ সনের পর থেকেই এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রবল হয়ে ওঠে, আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র আর জর্মনি তখন বিদেশে মাল কাটাবার চেষ্টা শুরু করেছে। তার পর ক্রমে অন্যান্য দেশেরও শিল্পব্যবসায় গড়ে উঠল, তারাও বাজারের অন্বেষণে বেরোল। এখন তো পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশই কিছু-না-কিছু পরিমাণে শিল্পাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে। প্রত্যেক দেশই চেষ্টা করছে তার নিজের জন্যে যেসব জিনিষ দরকার তার যতদূর পারে নিজেই তৈরি করে নেবে, বাইরে থেকে বিদেশী জিনিষকে দেশে ঢুকতে দেবে না। ভারতবর্ষ বিদেশী কাপড় কিনতে চায় না। কী করবে তা হলে ল্যাংকাশাযার? কী দশা হবে ব্রিটেনের অন্যান্য সব শিল্পের, বিদেশে ছাড়া যাদের মাল কাটাবার উপায় নেই?
এইসব প্রশ্নের মীমাংসা করা ব্রিটেনের পক্ষে শক্ত হয়ে উঠেছে, ভবিষ্যতে তার অনেকখানি দুঃখ সঞ্চিত রয়েছে বলে মনে হয়। হাত-পা গুটিয়ে যে নিজের খোলার মধ্যেই ঢুকে বসবে, একটা স্ব-সম্পূর্ণ জীবন যাপন করবে, নিজের খাদ্য আর দরকারি জিনিষপত্র নিজেই তৈরি করে নেবে—তারও তো আর জো নেই! আধুনিক পৃথিবীর বড়ো জটিল ব্যাপার, সেখানে ও চলে না। আর যদিই বা সে পারত নিজেকে তেমনি করে বিচ্ছিন্ন করে নিতে, তার পরও তার যে বিপুল লোকসংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে তার প্রয়োজন মেটাবার মতো যথেষ্ট খাদ্যদ্রব্য নিজে উৎপন্ন করে নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হত কি না তাতেও সন্দেহ আছে। অবশ্য এসব সমস্যা হচ্ছে এখনকার দিনের; ঊনবিংশ শতাব্দীতে এগুলো তেমন গুরতর হয়ে ওঠে নি। অতএব ইংলণ্ড তখন নিজের ভবিষ্যতকে নিয়ে জুয়ো খেলেই চলল; তার ভরসা ছিল, তার সে প্রাধান্য চিরকালই টিঁকে থাকবে। অতি বিরাট খেলা সে, তার দানও ছিল প্রকাণ্ড; হয় সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি হয়ে উঠবে, আর না হয় তো একেবারেই ভেঙে ভূমিসাৎ হয়ে যাবে; এর মাঝামাঝি কোনো গতি তার ছিল না। কিন্তু ভিক্টোরিয়ার যুগের মধ্যবিত্তশ্রেণীর ইংরেজ, আত্মপ্রত্যয় বা দম্ভের তাদের অভাব ছিল না। দীর্ঘ কাল ধরে তারা সাফল্য আর সমৃদ্ধির মধ্যে কাটিয়েছে, শিল্পে-বাণিজ্যে জগতে প্রধান হয়ে উঠেছে। তারা স্থির জানত, সমস্ত মানবজাতির মধ্যে তারাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ। সমস্ত বিদেশীকেই তারা অবজ্ঞার চোখে দেখত। এশিয়া আর আফ্রিকার লোকগুলো তো একেবারেই অসভ্য বর্বর; মানুষের মধ্যে যত অনুন্নত জাতি আছে তাদের শাসন করবার, তাদের উন্নত সভ্য করে তোলবার প্রতিভা ইংরেজদের স্বভাবজাত, অনুন্নত জাতগুলোর সৃষ্টিই হয়েছে ইংরেজকে সেই প্রতিভার খেলা দেখাবার সুযোগ দেবার জন্যে। এমনকি ইউরোপেরও অন্যান্য দেশের লোকগুলো হচ্ছে অজ্ঞ এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিদেশী। নেহাত এক আধজন ছাড়া তারা কেউ ইংরেজি ভাষাটা পর্যন্ত জানে না! ইংরেজরাই হচ্ছে ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র; সভ্য জগতের একেবারে চূড়ায় উঠে তারা বসে আছে; ইউরোপের অগ্রগতিতে তাদেরই জায়গা সকলের আগে আগে; ইউরোপের স্থান হচ্ছে আবার বাকি পৃথিবীটার একেবারে পুরোভাগে। ব্রিটিশ সাম্রাজাটাকে স্বয়ং বিধাতার সৃষ্টিও বলা যায়; ইংরেজরা যে সমস্ত জাতির মধ্যে বড়ো, তার তো এই কথাই চরম প্রমাণ! ত্রিশ বছর আগে ভারতবর্ষের বড়োলাট ছিলেন লর্ড কার্জন; তাঁর সময়কার ইংরেজদের মধ্যে তিনি একজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তাঁর রচিত একটি বই তিনি উৎসর্গ করেছিলেন “তাঁদের হাতে, যাঁরা বিশ্বাস করেন, ঈশ্বরের দয়ায় ব্রিটিশ সাম্রাজই হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড়ো মঙ্গলবিধাতা, পৃথিবীতে এমনটি আর কেউ কখনও দেখে নি।”
ভিক্টোরিয়ার যুগের ইংরেজদের সম্বন্ধে এই যেসব কথা লিখছি, এগুলোকে একটু মনগড়া বা অদ্ভুত কথা বলে মনে হয়: তুমি হয়তো ভাববে আমি তাদের নিয়ে তামাশা করছি। কোনো বুদ্ধিওয়ালা মানুষ এই রকমের আচরণ করতে পারে, এই রকম বিস্ময়কর গর্বিত এবং আত্মাভিমানী হয়ে উঠতে পারে, এইটেই আশ্চর্য লাগে। কিন্তু জাতির নামে যে দলের পরিচয়, তারা যে-কোনো জিনিষ বিশ্বাস করতে রাজি, যদি তাতে তাদের জাতীয় গর্বের কিছু ইন্ধন জোটে বা সেটা বিশ্বাস করায় তাদের কোনো লাভের ভরসা থাকে। ব্যক্তি হিসাবে কোনো মানুষই প্রতিবেশীর প্রতি এই ধরনের অমার্জিত এবং অভদ্র আচরণ করবার কথা ভাবতেও পারে না; কিন্তু ‘জাতি’রা এতে সেরকম কোনো গ্লানি বোধ করে না। দুর্ভাগ্যবশত এ দোষটি আমাদের সকলেরই আছে, নিজেদের জাতের গুণের বড়াই করে আমরা খুব বুক ফুলিয়ে বেড়াই। ভিক্টোরিয়ার যুগের ইংরেজরা যা ছিল, সে জাতের মানুষ প্রায় সর্বত্রই পাওয়া যায়, চেহারায় হয়তো সামান্য অদলবদল থাকে এই যা। ইউরোপের প্রত্যেক জাতির মধ্যেই এর অনুরূপ নমুনা পাওয়া যাবে; জর্মনিতে কুড়ি বছর আগে এদের দল খুবই উগ্র হয়ে উঠেছিল। আমেরিকাতে এশিয়াতেও এর অভাব নেই।
ইংলণ্ড আর পশ্চিম-ইউরোপের দেশগুলোর সমৃদ্ধির মনে ছিল শিল্পাশ্রয়ী ধনিকতন্ত্রের আবির্ভাব। সে ধনিকতন্ত্র লাভের অন্বেষণে অবিশ্রান্ত গতিতে এগিয়ে চলল। মানুষের পূজার দেবতা হল মাত্র দুজন, সাফল্য আর লাভ; ধর্ম বা নীতির সঙ্গে ধনিকতন্ত্রের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এ হচ্ছে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধর্ম—মানুষরা আর জাতিরা যে যার পার গলা কাটো, পিছিয়ে যে পড়ে থাকল তারই সর্বনাশ! ভিক্টোরিয়ার যুগের এরা বড়াই করে বলত, এরা পরের ধর্মকে দ্বেষ করে না। তারা বিশ্বাস করত প্রগতি আর বিজ্ঞানকে; ব্যবসায়ে আর সাম্রাজ্যস্থাপনে তারা সাফল্য অর্জন করেছে, এইতেই তো প্রমাণ হয়, তারাই মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জাতি, জীবনসংগ্রামে তারাই শেষ পর্যন্ত টিঁকে রয়েছে। ডার্উইন তাই বলে যান নি? ধর্মের ব্যাপারে দ্বেষাভাব যাকে তারা বলত, সেটা আসলে ছিল ঔদাসীন্য, ধর্ম নিয়ে তারা মাথাই ঘামাত না। আর. এইচ. টনি নামক একজন ইংরেজ লেখক এই অবস্থাটার চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। বলেছেন, ঈশ্বরকে এরা তাঁর নিজের জায়গাতে বসিয়ে রেখেছিল, পৃথিবীর কাণ্ডকারখানা থেকে অনেক দূরে সরিয়ে। “পৃথিবীতে যেমন নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র রয়েছে, স্বর্গেও ঠিক তাই।” এই ছিল সমৃদ্ধিশালী বুর্জোয়াদের মত। সাধারণ লোকের পক্ষে কিন্তু উপাসনা করা, ধর্মচর্চা করা প্রভৃতিকে উচিত কাজ বলা হত; ভরসা, যদি তার ফলে তারা বিপ্লবের বুদ্ধি থেকে বিরত হয়ে থাকে। ধর্মের ব্যাপারে দ্বেষাভাব বলতে এ বোঝাত না যে, অন্যান্য ব্যাপারেও তারা দ্বেষ প্রকাশ করবে না। অধিকাংশ লোক যেসব ব্যাপারকে গুরুতর বলে মনে করল, সেখানে মোটেই সহিষ্ণুতা দেখানো হত না; আর স্বার্থে টান পড়লে তখন সমস্ত সহিষ্ণুতাই হাওয়া হয়ে উড়ে যায়। ভারতবর্ষের ব্রিটিশ সরকার ধর্মমত সম্বন্ধে অত্যন্ত রকম সহিষ্ণু; সে নিয়ে ঢাকঢোলও অনেক পেটা হয়। আসল কথা হচ্ছে, ধর্মের কী হল না হল তা নিয়ে তাঁদের মোটেই মাথাব্যথা নেই। কিন্তু তাঁদের রাজনীতির বা তাঁদের কোনো কৃতকর্মের এতটুকুন সমালোচনা কেউ করুক, তখনি তাঁরা কান খাড়া করে লাফিয়ে উঠবেন; দ্বেষবুদ্ধি নেই এমন অপবাদ তখন অতিবড়ো শত্রুতেও তাঁদের দিতে পারবে না! স্বার্থের টান যত বড়ো, লাফের জোরও ততই বেশি; টানটা যদি বেশ জোর হয় তবে তখন আমাদের সরকারবাহাদুর সহিষ্ণুতার সমস্ত ভান পরিত্যাগ করেন; খোলাখুলি এবং নির্লজ্জের মতো একেবারে চরম বিভীষিকার সৃষ্টি করতে লেগে যান। আজকেরই ভারতবর্ষে এই জিনিষ আমরা দেখতে পাচ্ছি। এই তো অল্প ক’দিন মাত্র হল খবরের কাগজে পড়ছিলাম, কুড়ি বছরেরও কম বয়সী একটি বাচ্চা ছেলেকে আট বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে; তার অপরাধ, সে ক’জন ব্রিটিশ কর্মচারীকে শাসিয়ে চিঠি লিখেছিল!
ধনিকতন্ত্র শিল্পব্যবসায় গড়ে ওঠার ফলে অনেক পরিবর্তন হল। ধনিকতন্ত্র ক্রমেই বৃহত্তর আয়তনে কাজ-কারবার চালাতে লাগল; দেখা গেল, ছোটো প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বৃহদাকার প্রতিষ্ঠানদের কাজে যোগ্যতা এবং লাভ অনেক বেশি। কাজেই প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড কম্বাইন এবং ট্রাস্ট গড়ে উঠল, এক-একটা শিল্পের সমস্তখানি আয়োজনই এদের কর্তৃত্বে চলতে লাগল; ছোটো ছোটো স্বাধীন শিল্পী এবং কারখানা যা ছিল তারা এদের মধ্যে তলিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। এক কালে লোকে ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা’র দোহাই দিত। এই ধাকায় সে মত ভেঙে হারিয়ে গেল—দেখা গেল, ব্যক্তিবিশেষের চেষ্টা বা আয়োজনের কোনো স্থান বা ভরসাই এখন আর নেই। দেশের শাসনব্যবস্থা পর্যন্ত বড়ো বড়ো কম্বিনেশন আর কর্পোরেশনের ইঙ্গিতে চলতে লাগল।
ধনিকতন্ত্রের ফলে সাম্রাজ্যবাদও আর একটি উগ্রতর রূপে আত্মপ্রকাশ করল। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে শিল্পতত্রী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়ে গেল, তারা কাজেই বাজার আর কাঁচা মালের সন্ধানে আরও দূর দূর দেশের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। সাম্রাজ্যের জন্যে সমস্ত পৃথিবী জুড়ে একটা হিংস্র কাড়াকাড়ি পড়ে গেল। এশিয়ার সব দেশে—ভারতে, চীনে, বৃহত্তর ভারতে এবং পারশ্যে কী ঘটল তার কিছু কিছু বিবরণ আমি তোমাকে আগেই বলেছি। এবার ইউরোপের জাতিগুলো শকুনির মতো ছোঁ মেরে পড়ল আফ্রিকার উপরে; দেশটাকে তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিয়ে নিল। এখানেও ইংলণ্ডই সবচেয়ে বড়ো ভাগ হাতিয়ে নিল—উত্তরে মিশর, এবং পূর্ব পশ্চিম দক্ষিণ-আফ্রিকাতে অনেকগুলো বড়ো বড়ো অঞ্চল তার ভাগে পড়ল। ফ্রান্সও কম গেল না। ইতালিরও এই লুটের মালে কিছু ভাগ বসাবার ইচ্ছা ছিল; কিন্তু আবিসিনিয়ার কাছে সে একেবারে গো-হারা হেরে এল। জর্মন কিছুটা ভাগ পেল, কিন্তু তাতে সে সন্তুষ্ট হল না। সর্বত্র জুড়ে খালি সাম্রাজ্যবাদ, চিৎকার শাসানি কাড়াকাড়ির বীভৎস তাণ্ডব। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের জনপ্রিয় কবি রুড্ইয়ার্ড কিপ্লিং ‘শাদা মানুষদের কর্তব্যভার’ সম্বন্ধে প্রশস্তি গাইতে লাগলেন। ফরাসিরা ধুয়ো ধরল ‘ফ্রান্সের সভ্যতা প্রচার করবার মহান উদ্দেশ্যে’র। জর্মনদেরও কাজেই তখন তাদের ‘কুল্টুর’ বা সংস্কৃতি প্রচার করতে হয়। অতএব এই সভ্যতা-প্রচারক আর মানব-উন্নতি বিধায়ক আর অন্যান্য-জাতিদের-বোঝা-বহনকারী মহাপুরুষেরা পরের জন্যে পরম আত্মোৎসর্গ করতে লেগে গেলেন, বাদামি আর পীত আর কৃষ্ণকায় মানুষদের কাঁধে খুব ঠেসে বসে রইলেন। কালো মানুষদের বোঝার কথা নিয়ে কিন্তু কোনো কবিই গান রচনা করলেন না।
সাম্রাজ্য নিয়ে এই প্রতিদ্বন্দ্বীরা কাড়াকাড়ি ছেঁড়াছিঁড়ি শুরু করেছে; এদের সকলের খাঁই মেটাবার মতো অত জমি পৃথিবীতে ছিল না। বাজারের খোঁজে ধনিকতন্ত্র উন্মাদ হয়ে উঠেছে, তার ধাক্কায় প্রত্যেকটি দেশই খালি সামনে ছুটে চলেছে, থেকে থেকেই তাদের পরস্পরের মধ্যে ঠোকাঠুকিও লেগে যাচ্ছে। ইংলণ্ড আর ফ্রান্সের মধ্যে তো অনেক বারই যুদ্ধ বাধতে বাধতে শেষে একটার জন্যে বাধল না। কিন্তু সত্যকার স্বার্থের সংঘাত লাগল ব্রিটিশ আর জর্মন-শিল্পের মধ্যে। জর্মনি তখন শিল্প আর বাণিজ্য জাহাজের পাল্লায় ইংলণ্ডের সমান হয়ে উঠেছে, প্রত্যেক দেশের বাজারেও তার মধ্যে পাল্লা দিয়ে চলছে। কিন্তু পৃথিবীর ভালো ভালো জায়গাগুলো ইংলণ্ড তার অনেক আগে থেকেই হাত করে বসে আছে। জর্মনি গর্বিত এবং তেজি মানষের দেশ; অন্যান্য জাতিরা তাকে নিজের ইচ্ছামতো বেড়ে উঠতে দিচ্ছে না দেখে সে রাগে ফুলে উঠল; তাদের সঙ্গে একটা প্রচণ্ড লড়াই করবার জন্যে প্রাণপণে তৈরি হতে লাগল। সমস্ত ইউরোপ যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হল, সেনাবাহিনী আর নৌবাহিনীও বেড়ে উঠল। বিভিন্ন দেশের মধ্যে সন্ধি আর মৈত্রী স্থাপিত হল; শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, দুটিমাত্র সশস্ত্র বাহিনী পরস্পরের সম্মুখীন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এক দিকে জর্মনি অস্ট্রিয়া আর ইতালি এই ত্রিশক্তির সমন্বয়, আর-এক দিকে ফ্রান্স আর রাশিয়া এই দুয়ের মিলিত দল; ইংলণ্ডও গোপনে এদের সঙ্গে সংযুক্ত।
ইতিমধ্যে এই শতাব্দীর একেবারে শেষ দিকে, ইংলণ্ডকে দক্ষিণ আফ্রিকাতে তার নিজস্ব একটি ছোটোখাটো যুদ্ধ করতে হল। ট্রান্সভালে বুয়রদের প্রজাতন্ত্রর সোনার খনি আবিষ্কৃত হবার ফলে ১৮৯১ সনে এই যুদ্ধটি বাধল। ইউরোপের সর্বাপেক্ষা শক্তিমান জাতিটির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বুয়ররা পুরো তিনটি বছর ধরে যুদ্ধ চালাল, যুদ্ধে আশ্চর্য সাহস আর অধ্যবসায় দেখাল তারা। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তারা বিধ্বস্ত হয়ে পরাজয় স্বীকার করল। ব্রিটেন কিন্তু এর অল্পদিন পরেই (তখন মন্ত্রিত্ব ছিল উদারপন্থী দলের হাতে) একটি খুব মহৎ এবং বিজ্ঞোচিত কাজ করল; বুয়ররা অল্পদিন আগেও তার শত্রু ছিল, তাদের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের অধিকার সে নিজে থেকেই দিয়ে দিল। আরও কিছুদিন পরে সমস্ত দক্ষিণ আফ্রিকাটাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটি স্বাধীন ডোমিনিয়ন বলে স্বীকৃত হল!