বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ইউরেশীয় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

উইকিসংকলন থেকে

৫৮

ইউরেশীয় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

১২ই জুন, ১৯৩২

 সারা পৃথিবীটাকে আমাদের সংক্ষেপে দেখা হয়ে গেছে—খৃষ্টের হাজার বছর পরেকার এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার কিছুটা আমরা দেখেছি। তবু আর একবার দেখা যাক।

 এশিয়া। ভারতবর্ষ এবং চীনদেশের পুরোনো সভ্যতা তখনও নিরবচ্ছিন্ন সমৃদ্ধির পথে। মালয়েশিয়া এবং কম্বোডিয়াতে ভারতীয় সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে সেখানে প্রচুর ফল ফলিয়েছে। চীনদেশের সভ্যতা বিস্তৃত হয়েছে কোরিয়া, জাপান এবং আংশিকভাবে মালয়েশিয়াতে। এশিয়ার পশ্চিমভাগে আরব, প্যালেস্টাইন, সিরিয়া এবং মেসোপটেমিয়াতে আরবীয় সভ্যতার আধিপত্য; পারশ্যদেশে পুরেনো পারশিক সভ্যতার সঙ্গে নবতর আরবীয় সভাতার মিলন ঘটেছে। মধ্য-এশিয়ার কতকগুলি দেশ এই মিশ্রিত আরব্য পারশিক সভ্যতাকে গ্রহণ করে লালন করছে, তার উপর পড়েছে ভারতবর্ষ এবং চীনদেশেরও কিছু প্রভাব। এই সবগুলি দেশেরই সভ্যতা বেশ উচ্চস্তরের, তাদের বাণিজ্য, শিল্পও উন্নত হয়ে উঠছিল। চার দিকে বড়ো বড়ো শহর, বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে দূরদূরান্তর থেকে শিক্ষার্থীরা আসত পড়তে। মঙ্গোলিয়া, মধ্য-এশিয়ার কোনো কোনো অংশ আর সাইবেরিয়াতে শুধু বিরাজ করছিল নিম্নস্তরের সভ্যতা।

 এবার ইউরোপ। এশিয়ার উন্নতিশীল দেশগুলির তুলনায় ইউরোপ তখন অনুন্নত এবং অর্ধসভ্য। পুরোনো গ্রীক-রোমক সভ্যতা শুধু সুদূর অতীতের স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার শিক্ষার মূল্য গেছে কমে, শিল্পের নিদর্শনও তেমন কিছু নেই, বাণিজ্যে সে এশিয়ার বহু পিছনে পড়ে আছে। দুটি জায়গায় মাত্র দেখা যাচ্ছিল আলোর রেখা। আরবদের অধীনে স্পেন আরবসভ্যতার গৌরবের দিনগুলির উত্তরাধিকার বহন করছিল; আর, এশিয়া ও ইউরোপের সীমারেখায় দাঁড়িয়ে ছিল কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্। তারও গৌরব ক্রমে ক্রমে নিঃশেষ হয়ে আসছিল, কিন্তু তবু তখনও সে বৃহৎ এবং জনবহুল নগরীর মর্যাদা হারায় নি। ইউরোপের অধিকাংশ জায়গা জুড়ে অব্যবস্থা চলেছে, প্রচলিত সামন্ততন্ত্রের ফলে নাইট এবং গার্ডরা যেন নিজেদের অধিকারের মধ্যে এক-একজন ছোটোখাটো রাজা। প্রাচীন সাম্রাজ্যের রাজধানী রোম এক সময়ে একটি গ্রামের মতোই ছোটো হয়ে পড়েছিল, পুরোনো কলোসিয়া হয়ে উঠেছিল বন্যজন্তুদের বাসস্থান। এখন অবিশ্যি আবার তার শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছিল।

 কাজেই খৃষ্টের হাজার বছর পরে এশিয়া এবং ইউরোপ দুটি মহাদেশের তুলনা করলে দেখতে, এশিয়াই অনেক এগিয়ে আছে।

 এসো, আর-একবার তাকিয়ে জিনিষটাকে তলিয়ে দেখি। দেখতে পাবে, আপাতদৃষ্টিতে এশিয়াকে যতটা ভালো মনে হচ্ছে ততটা ভালো সে নেই। প্রাচীন সভ্যতার দুই ধারী ভারতবর্ষ ও চীনদেশ বিপদগ্রস্ত। শুধু বাইরের শত্রুর আক্রমণই তাদের বিপদের কারণ নয়, এ বিপদ আরও বাস্তব। এটা তাদের জীবনীশক্তি এবং বীর্য শুষে নিচ্ছিল। পশ্চিমে আরবদের গৌরবের দিনও শেষ হয়ে এসেছে। সেলজুকরা ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছিল সত্য, কিন্তু তাদের এই উন্নতি কেবলমাত্র যুদ্ধোদ্যমেরই ফল। ভারতবর্ষ, চীন, পারশ্য অথবা আরবের মতো তারা এশিয়ার সংস্কৃতির প্রতিনিধি নয়, তারা যেন এশিয়ার সমরপ্রতিভা। এশিয়ার সব জায়গায় প্রাচীন সভ্য জাতিদের উদাম যেন মিইয়ে আসছে। তারা নিজেদের প্রতি আস্থা হারিয়ে শুধু আত্মরক্ষায় ব্যস্ত। নূতন উদ্যম নিয়ে যে নূতন শক্তিশালী জাতিদের অভ্যুত্থান হচ্ছিল, তারা এশিয়ার এই প্রাচীন জাতিদের জয় করেছে, ইউরোপও তাদের আক্রমণের আশঙ্কায় ভীত। কিন্তু তাদের নেই সভ্যতার কোনো নূতন উপাদান বা সংস্কৃতির কোনো নূতন প্রেরণা। পুরোনো জাতিগুলি এই বিজয়ীদের সুসভ্য করে ধীরে ধীরে তাদের আত্মসাৎ করে নিল।

 কাজেই এশিয়ার বিরাট পরিবর্তনের সূচনা দেখতে পাচ্ছি। প্রাচীন সভ্যতার গতি তখনও একেবারে শেষ হয় নি। সুকুমার-কলার উন্নতি হচ্ছে, বিলাসিতার মধ্যে তখনও সূক্ষ্ম রুচিবোধ বর্তমান, কিন্তু সব সভ্যতারই নাড়ি যেন দুর্বল হয়ে এসেছে, তাদের প্রাণস্পন্দন ধীরে ধীরে আসছে থেমে। তারা বেঁচে থাকবে অনেকদিন। মঙ্গোলদের আগমনের ফলে শুধু আরবে এবং মধ্য-এশিয়ায় ছাড়া আর কোথাও সভ্যতার গতিতে সত্যিকার ছেদ পড়ে নি, বা কোথাও তার অস্তিত্ব লুপ্ত হয়ে যায় নি। চীন এবং ভারতবর্ষে এই সভ্যতা ধীরে ধীরে বিবর্ণ হয়ে শেষে প্রাণহীন ছবির মতো শুধু দূর থেকেই চোখকে টানছিল; কাছে এলে দেখতে পাবে, তাতে উই ধরেছে।

 সাম্রাজ্যের মতোই সভ্যতারও পতনের কারণ বাইরের শত্রুর আক্রমণ ততটা নয়, যতটা তার নিজের দুর্বলতা এবং আভ্যন্তরীণ অবনতি। বর্বরদের আক্রমণে রোমের পতন হয়েছিল, এ কথা বলা চলে না। সে মরেই ছিল, তারা উৎখাত করেছিল শুধু সেই মৃতদেহটিকে। রোমের প্রাণস্পন্দন তার অঙ্গচ্ছেদের আগেই থেমে গিয়েছিল। ভারতবর্ষ, চীনদেশ এবং আরবের বেলায়ও আমরা এই রীতিরই পুনরাবৃত্তি দেখতে পাই। আরবসভ্যতা যে হঠাৎ গড়ে উঠেছিল, তেমনি হঠাৎই আবার ভেঙে পড়ল। ভারতবর্ষ এবং চীনে এই পতনের ঠিক ঠিক সময় নির্দেশ করা কঠিন, এ পতন ঘটেছে অনেকদিন ধরে।

 এর সূচনা হয়েছিল গজনির মাহ্‌মুদ ভারতবর্ষে আসারও অনেক আগে। লক্ষ্য করে দেখলেই ভারতবাসীর মানসিক পরিবর্তন ধরা পড়ে। নূতন ভাব এবং বিষয় সৃষ্টি না করে তারা পুরোনোর পুনরাবৃত্তি এবং অনুকরণেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তাদের মন তখনও তীক্ষ্ণ বিচারবুদ্ধির অধিকারী, তবু বহু দিন পূর্বে যেসব কথা বলা বা লেখা হয়ে গেছে তার টীকা এবং ব্যাখ্যা-রচনায়ই তারা মত্ত হয়ে ছিল। তখনও তারা অপূর্ব ভাস্কর্য এবং খোদাইয়ের কাজ করতে পারে, কিন্তু তাদের কাজ পুঙ্খানুপুঙ্খতা ও অলংকরণে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে, এবং তার মধ্যে প্রায়ই অস্বাভাবিকতার স্পর্শ দেখা দিচ্ছে। তার মধ্যে মৌলিকতা নেই, আর নেই সফল এবং উন্নত পরিকল্পনা। মার্জিতরুচি লালিত্য, শিল্প এবং বিলাসিতা ধনী এবং সংগতিপন্নদের মধ্যে তখনও প্রচলিত রয়েছে, কিন্তু সমগ্রভাবে দেশবাসীর দুঃখদারিদ্র্য লাঘব বা উৎপন্ন দ্রব্যের পরিমাণ বাড়াবার কোনো চেষ্টাই নেই।

 এ সমস্তই অস্তগামী সভ্যতার নির্দশন। এগুলি দেখা দিলে নিশ্চিত বুঝতে হবে সভ্যতার প্রাণশক্তি হারিয়ে যাচ্ছে, কারণ, অনুবত্তি বা অনুকরণে প্রাণের লক্ষণ নেই, আছে নূতন সৃষ্টিতে।

 এরকম ধরনের প্রক্রিয়াগুলি তখন ভারতবর্ষ এবং চীনদেশে দেখা দিয়েছিল। কিন্তু ভুল বুঝো না। এর জন্য চীনদেশ বা ভারতবর্ষের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল অথবা তারা আবার অসভ্য হয়ে উঠেছিল, এ কথা আমি বলছি না। আমি শুধু বলতে চাই, চীনদেশ এবং ভারতবর্ষ অতীতে যে সৃষ্টির প্রেরণা অনুভব করেছে তার শক্তি ক্ষয় হয়ে আসছিল, কিন্তু তার মধ্যে নূতন প্রাণের সঞ্চার হচ্ছিল না। পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে এই শক্তি খাপ খাওয়াতে পারছিল না, শুধু নিজের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে চলছিল। প্রত্যেক দেশ এবং প্রত্যেক সভ্যতার জীবনেই এরকম ঘটনা ঘটে। কখনও আসে সৃষ্টির বিরাট প্রেরণা আর বিকাশ, কখনও আবার দেখা দেয় শ্রান্তি ও অবসাদের মুহূর্ত। চীনদেশ এবং ভারতবর্ষের বেলায় এই শ্রান্তিজনিত অবসাদ অনেক দেরিতে এসেছিল এটাই অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়, আর তবু পরিপূর্ণ অবসাদ এদের কোনোদিনই আসে নি।

 ইসলাম মানবজাতির পক্ষে এক নূতন উন্নতির প্রেরণা নিয়ে ভারতবর্ষে এল। এর ফল হল যেন পুষ্টিকারক ওষুধের মতো। ভারতবর্ষের মধ্যে একটা স্পন্দন জেগে উঠল। কিন্তু এই ফল যত ভালো হতে পারত তত ভালো হয় নি দুটি কারণে। এটা এসেছিল ভুল পথ ধরে, আর এসেছিল অনেক দেরিতে। কারণ, গজনির মাহ্‌মুদের আক্রমণের শত শত বৎসর আগে থেকেই মুসলমান-ধর্ম প্রচারকের দল ভারতবর্ষে ঘুরে বেড়িয়েছেন, অভিনন্দনও পেয়েছেন। তাঁরা শান্তির পথে এসেছিলেন বলে কিছু পরিমাণে সফলতাও অর্জন করেছিলেন। ইসলামধর্মের বিরুদ্ধে কোনো বিদ্বেষ ছিল না বললেই হয়। তার পর মাহ্‌মুদ এলেন আগুন এবং তরবারি নিয়ে বিজেতা এবং লুণ্ঠনকারী ঘাতকের রূপে। এতে ভারতবর্ষে ইসলামের সুনাম যেরকম ক্ষুণ্ণ হল, আর কিছুতেই তা হতে পারত না। তিনি অবশ্য অন্যান্য বড়ো অভিযানকারীদের মতো হত্যা এবং লুণ্ঠন করতেই এসেছিলেন, ধর্মের জন্য তাঁর কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু বহুদিন ধরে তাঁর অভিযানগুলি ভারতবর্ষে ইসলামধর্মকেও ছাপিয়ে উঠেছিল। তাই অন্য সময়ের মতো নিরপেক্ষভাবে এই ধর্মকে বিচার করা ভারতবাসীর পক্ষে সম্ভব হয় নি।

 এটা একটা কারণ। এর অন্য কারণ, এটা যথাসময়ে আসতে পারে নি। এ ধর্ম যখন এখানে এল তখন তার সূচনার পর প্রায় চার শো বছর কেটে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তার কিছু শক্তিক্ষয় হয়েছে, তার সৃষ্টির ক্ষমতাও গেছে অনেক কমে। ইসলামধর্মের প্রথম যুগে যদি আরবরা একে নিয়ে ভারতবর্ষে আসতেন তা হলে উদীয়মান আরব সংস্কৃতির সঙ্গে ভারতবর্ষের সভ্যতার মিলনে এবং পরস্পরের উপর প্রতিক্রিয়ায় এক বিরাট ফললাভের সম্ভাবনা ছিল। দুটি সুসভ্য জাতি তা হলে একত্র মিলিত হতে পারত, কারণ ধর্মসম্বন্ধে সহিষ্ণু এবং যুক্তিবাদী বলে আরবদের খ্যাতি ছিল। সত্যি সত্যি এক সময়ে খলিফার পৃষ্ঠপোষকতায় বোগদাদে একটি সভারও সৃষ্টি হয়েছিল, সেখানে সকল ধর্মের লোক, ধর্মে যাদের আস্থা নেই তাদের সঙ্গে মিলে যুক্তিবাদের দিক থেকে সকল বিষয় সম্বন্ধে আলোচনা এবং বিতর্ক করতেন।

 কিন্তু আরবরা কখনও খাস ভারতবর্ষে আসে নি। তারা সিন্ধু পর্যন্ত এসেই থেমে গিয়েছিল, ভারতবর্ষের উপর তাদের কোনো প্রভাব পড়ে নি। ইসলাম ভারতবর্ষে এল তুর্কি এবং অন্য অনেকের মধ্যস্থতায়, আরবদের মতো তাদের পরধর্মসহিষ্ণুতা বা সংস্কৃতি কিছুই ছিল না, তারা ছিল শুধু যোদ্ধা।

 তবুও ইসলামের সঙ্গে উন্নতি এবং সৃষ্টির একটা প্রেরণা ভারতবর্ষে এসেছিল। এ প্রেরণা কী করে ভারতবর্ষে নূতন প্রাণের সঞ্চার করল, আর তার পরিণতিই বা কী হল, সেটা আমরা পরে বিচার করব।

 ভারতীয় সভ্যতার যে শক্তি কমে আসছিল তার আর-একটা প্রমাণ এবারে পাওয়া গেল। যখন বহিঃশত্রুর আক্রমণ হল তখন ভারতবর্ষ এই জোয়ারের মুখে আত্মরক্ষার জন্য নিজের চার দিকে একটি খোলস তৈরি করে প্রায় বন্দীদশা মেনে নিল। এটাও দুর্বলতা এবং ভয়ের লক্ষণ; উপশমের চেষ্টা করতে গিয়ে এ রোগ বেড়েই চলল। গতিহীন শ্লথ অবস্থাই এ রোগের কারণ, বিদেশীর আক্রমণ নয়। স্বতন্ত্র হয়ে থাকার জন্যই এই গতিহীনতা আরও বাড়ল এবং বিকাশের সব পথই বন্ধ হয়ে গেল। পরে দেখতে পাবে, চীনদেশ এমনকি জাপানও নিজের নিয়মে এই একই পথে চলেছিল। খোলসের মতো বদ্ধ সমাজে বাস করলে বিপদের সম্ভাবনা প্রচুর; আড়ষ্ট ভাব আমাদের ঘিরে ধরে; মুক্ত হাওয়া এবং সজীব ভাবধারাতে আমরা অনভ্যস্ত হয়ে পড়ি। ব্যক্তিগত জীবনে যেমন সমাজ-জীবনেও তেমনি, মুক্ত হাওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে।

 এশিয়া সম্বন্ধে এটকুই। ইউরোপ এ সময় অনুন্নত এবং বিবাদে রত ছিল দেখেছি। কিন্তু এই অব্যবস্থা এবং অসংগতির পিছনে অন্তত বীর্য এবং জীবনীশক্তির সন্ধান পাওয়া যাবে। বহুদিন প্রবল থাকার পর এশিয়ার অবনতি ঘটছিল, ইউরোপ প্রাণপণ চেষ্টা করছিল উন্নত হয়ে ওঠবার জন্য। কিন্তু এশিয়ার কাছাকাছি আসতেও তখন তার অনেক বাকি।

 আজকের ইউরোপই প্রবল, আর এশিয়া স্বাধীনতালাভের জন্য দুঃখময় সাধনা করছে। কিন্তু তবু আর একবার গভীরভাবে তাকালে দেখতে পাবে, এশিয়াতে নূতন শক্তি, নূতন সৃষ্টির প্রেরণা এবং নূতন জীবনের সঞ্চার হয়েছে। এশিয়া নিঃসন্দেহে আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। আর ইউরোপে, প্রকৃতপক্ষে পশ্চিম-ইউরোপে, সমস্ত মহিমা সত্ত্বেও অধোগতির লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে। ইউরোপকে ধ্বংস করে দেবার শক্তি রাখে এমন কোনো বর্বর জাতি আজকে নেই। কিন্তু সময় সময় সুসভ্য জাতিরাও বর্বরের মতো ব্যবহার করে, আর তাতে করে একটা সভ্যতা ধ্বংসও হয়ে যেতে পারে।

 ভৌগোলিক পরিভাষায় আমি এশিয়া ইউরোপ ইত্যাদি বলছি, কিন্তু আমাদের সামনে যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলি কেবল এশিয়া অথবা ইউরোপের নয়, সেগুলি সারা জগতের এবং সর্ব মানবের সমস্যা; আর সারা জগতের কল্যাণের জন্য আমরা যদি এগুলির সমাধান না করি তা হলে বিপদ থামবে না। সর্বত্র দুঃখদারিদ্রোর অবসান ঘটাতে পারলেই শুধু এ সমস্যার সমাধান হবে। অনেক সময় হয়তো লাগবে, তবু এটাই আমাদের লক্ষ্য, এর চেয়ে কম কিছুতে আমরা সন্তুষ্ট হব না, এটা যখন ঘটবে তখনই আমরা সাম্যের ভিত্তিতে প্রকৃত সংস্কৃতি এবং সভ্যতার অধিকারী হব। সে সভ্যতায় কোনো দেশ বা সম্প্রদায়ের শোষণনীতি থাকবে না, সে সমাজ হবে গঠনমূলক এবং বর্ধিষ্ণু, পারিপার্শ্বিকের পরিবর্তনের সঙ্গে সে মানিয়ে চলবে, তার নির্ভর হবে প্রত্যেক সভ্যের সহযোগিতার উপর। শেষ পর্যন্ত এ ছড়িয়ে পড়বে সারা পৃথিবীতে। প্রাচীন সভ্যতার মতো এ সভ্যতার ধ্বংস হবার বা ক্ষয় পাবার কোনো আশঙ্কা থাকবে না।

 কাজেই ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করার সময় মনে রাখতে হবে, নিজের এবং অন্যান্য জাতির স্বাধীনতা নিয়ে সর্বমানবের স্বাধীনতাই হল আমাদের মহান লক্ষ্য।