বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ইউরোপের নতুন মানচিত্র
১৫৫
ইউরোপের নূতন মানচিত্র
২১শে এপ্রিল, ১৯৩৩
যুদ্ধের গতি সংক্ষেপে আলোচনা করবার পর আমরা রাশিয়ার বিপ্লবের কথা দেখেছি, তার পর আবার দেখেছি যুদ্ধের সময় ভারতবর্ষের অবস্থা কী ছিল। এবার আবার ফিরে যেতে হবে যুদ্ধবিরতিতে; দেখতে হবে যুদ্ধ শেষ হবার পরে বিজেতা পক্ষ কি প্রকার আচরণ করলেন। জর্মনির অবস্থা তখন শোচনীয়। কাইজার পালিয়ে গেছেন, দেশে প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হয়েছে। তবুও জর্মন সেনার যাতে আর কিছুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট না থাকে সেজন্য যুদ্ধবিরতির
সন্ধিপত্রে অনেকগুলো অত্যন্ত কঠিন শর্ত দিয়ে দেওয়া হল। বলা হল, জর্মন সেনা এগিয়ে এসে যত জায়গা দখল করেছিল শুধু সেগুলো নয়, আলসেস্-লোরেন এবং রাইন নদী পর্যন্ত জর্মনির অন্তর্গত এলাকা তাদের ছেড়ে দিয়ে সরে যেতে হবে। রাইনল্যাণ্ড্ মানে কলোনের আশেপাশের অঞ্চলটি মিত্রপক্ষের দখলে থাকবে। এছাড়া জর্মনির যুদ্ধজাহাজ, সমস্ত ইউ বোট্—(জর্মন সাবমেরিনদের এই নামে অভিহিত করা হত), এবং হাজার হাজার ভারী কামান এরোপ্লেন রেলওয়ে ইঞ্জিন মোটরলরী এবং আরও বহু জিনিসপত্র মিত্রপক্ষের হাতে সমর্পণ করতে হবে।
ফ্রান্সের উত্তর-অঞ্চলে কোঁপিয়ে’ (Compiègne)-এর অরণ্যে যে স্থানটিতে বসে যুদ্ধবিরতি পত্র স্বাক্ষর করা হয়েছিল, সেখানে এখন একটি স্মৃতিস্তম্ভ আছে, তার উপরে এই কথাটি লেখা:
“এইখানে, ১৯১৮ সনের ১১ই নভেম্বর তারিখে জর্মন সাম্রাজ্যের অন্যায় অহংকার ধূলিসাৎ হয়েছিল; যাদের সে দাসত্ব শৃংখলে আবদ্ধ করতে চেয়েছিল সেই স্বাধীন জাতিগুলোর হাতেই তার পরাজয় ঘটেছে।”
জর্মন সাম্রাজ্য অবশ্য আর নেই, অন্তত বাইরে থেকে যেটুকু দেখা যায়। প্রাশিয়ার সামরিক ঔদ্ধত্যও খর্ব হয়েছে। এরও আগে রুশ সাম্রাজ্যের অবসান হয়েছিল, রোমানফ রাজবংশ রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন—সে রঙ্গমঞ্চে তাঁরা অতি দীর্ঘকাল নানা অসৎ লীলা দেখিয়েছেন। যুদ্ধের ফলে আরও একটি সাম্রাজ্য, আরও একটি প্রাচীন রাজবংশের পতন ঘটল, সে হচ্ছে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরিতে হাপ্স্বুর্গ বংশের সাম্রাজ্য। কিন্তু তখনও বহু সাম্রাজ্য টিঁকে রইল—সেগুলি হচ্ছে বিজেতাদের সাম্রাজ্য। যুদ্ধে জিতেছেন বলে তাদের অহংকার কিছুমাত্র কমল না। অন্যান্য যে-সব জাতিকে তারা দাসে পরিণত করে রেখেছে, তাদের ন্যায্য অধিকার সম্বন্ধে তারা একটুও বেশি সচেতন হয়ে উঠল না।
১৯১৯ সনে প্যারিস শহরে বিজয়ী মিত্রপক্ষ তাদের শান্তি-সম্মেলন বসালেন। প্যারিসে বসেই তাঁরা সমগ্র জগতের ভবিষ্যৎ রূপ রচনা করবেন; অনেক মাস ধরে এই প্রসিদ্ধ নগরীটির দিকে পৃথিবীসুদ্ধ মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে রইল। পৃথিবীর সর্বত্র সকল দেশ থেকে নানাবিধ লোক সেখানে গিয়ে উপস্থিত হল। রাষ্ট্রনীতিবিদ আর রাজনৈতিক পাণ্ডারা তো থাকবেনই, তাঁরা তখন নিজেদের এক-একটা কেষ্টুবিষ্টু মনে করছেন। আরও গেল যত কূটনীতি-বিশারদ, বিশেষজ্ঞ সমর-বিশারদ, মহাজন, এবং লাভান্বেষীর দল; এদের সকলেরই সঙ্গে অসংখ্য সহকারী, টাইপিষ্ট এবং কেরাণী। তারপর, সংবাদপত্রসেবীদের একটা বিরাট দল থাকবে সেখানে, সে তো জানা কথাই। এল স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছে যে-সব জাতি, তাদের প্রতিনিধিরা—আইরিশ, মিশরীয়, আরব এবং আরও কত দেশ তাদের সকলের নামও এর আগে কেউ কোনোদিন শোনে নি; এল পূর্ব-ইউরোপের লোকেরা, অস্ট্রিয়া এবং তুরষ্কের বিধ্বস্ত সাম্রাজ্য থেকে এরা নিজেদের কতকগুলো পৃথক রাষ্ট্র কেটে বার করে নিতে চায়। এ ছাড়া দুঃসাহসী ভাগ্যান্বেষীও গেল কম নয়। গোটা পৃথিবীটাকেই কেটেকুটে নূতন করে ভাগ করা হচ্ছে এখানে; সে ভোজের সুযোগ ছেড়ে শকুনরা দূরে বসে থাকবে কেন!
শান্তি সম্মেলনে কী হবে, সে সম্বন্ধে অনেকের মনে অনেকরকম আশা জাগল। লোকে ভাবল, যুদ্ধের এত বড়ো একটা ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরে এবার নিশ্চয়ই একটা ন্যায়সংগত এবং দীর্ঘস্থায়ী সন্ধির ব্যবস্থা করা হবে। নিদারুণ কষ্টের বোঝা তখনও জনসাধারণের ঘাড়ে চেপে রয়েছে; শ্রমিকদের মনে বিরাট অসন্তোষ জমে উঠেছে। দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অত্যন্ত বেড়ে গেছে, তার ফলে লোকের কষ্ট আরও বেড়েছে। সমাজ-বিপ্লব ঘটতে আর দেরি নেই, ১৯১৯ সনে ইউরোপে এমন বহু আভাসই পাওয়া যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল রাশিয়ার দৃষ্টান্ত অনেকের মনকেই বিচলিত করে তুলছে।
এমনিতর পশ্চাৎপটের মধ্যে শান্তি-সম্মেলনের বৈঠক বসল, ভার্সাই শহরের ঠিক সেই ঘরটিতে, যেখানে আটচল্লিশ বছর আগে জর্মন সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করা হয়েছিল। বিরাট জনসংঘের পক্ষে দিনের পর দিন অধিবেশন করা সহজ নয়; অতএব তাকে ভেঙে অনেকগুলো কমিটি তৈরি করা হল; এই কমিটিগুলো গোপনে বৈঠক বসাতে লাগলেন, এঁদের মধ্যেকার সমস্ত কূটকচাল আর কলহ-বিবাদকে বুদ্ধিমানের মতো অবগুণ্ঠনে ঢেকে রাখলেন। সমস্ত সম্মেলনটিকে নিয়ন্ত্রিত করছিল একটি ‘দশজনের সভা’—মিত্রপক্ষের দেশগুলো নিয়ে গড়া। পরে এর সভ্যসংখ্যা কমে গিয়ে হল পাঁচ; এদের নাম হল ‘পঞ্চ মহারথী’—যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি আর জাপান। তারপর জাপানও এর মধ্য থেকে খসে পড়ল; বাকি রইল একটা ‘চারজনের সভা’। শেষপর্যন্ত ‘ত্রিমূর্তি’—আমেরিকা, ব্রিটেন আর ফ্রান্স। এই তিন দেশের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন প্রেসিডেণ্ট উইলসন, লয়েড্ জর্জ এবং ক্লেমেঁশো; সমস্ত পৃথিবীকে নূতন করে ঢেলে সাজবার, তার দেহের ভয়ংকর ক্ষতগুলোকে নিরাময় করবার গুরুদায়িত্ব পড়ল এই তিনজনেরই উপরে। এ দায়িত্ব বইবার যোগ্যতা আছে অতিমানব বা অর্ধ-দেবতার, এঁরা কেউই তার ধারেকাছের জীবও নন। রাজা রাষ্ট্রনীতিবিদ সেনাপতি ইত্যাদি যে-সব ব্যক্তিরা কর্তার আসনে বসে থাকেন, সংবাদপত্রে এবং অন্যান্য উপায়ে তাঁদের নাম এতই বিজ্ঞাপিত করা হয় এবং এমনই আড়ম্বরে ঘোষণা করা হয় যে, দেখেশুনে সাধারণ লোকের অনেক সময়েই ধারণা হয় এঁরা চিন্তা এবং কার্যের রাজ্যে এক একটা মহামানব বিশেষ। একটা স্বর্গীয় পদ্ধতি যেন এঁদের ঘিরে প্রকাশ পেতে থাকে; অজ্ঞ আমরা, মনে মনে এমন সব গুণই এঁদের মধ্যে কল্পনা করে নিই যা বস্তুত এঁদের মোটেই নেই। কিন্তু একটু কাছে গিয়ে নিরীক্ষণ করে দেখ, দেখা যাবে এঁরা অতি সাধারণ মানষের বেশি কিছুই নন। অস্ট্রিয়ার একজন বিখ্যাত রাষ্ট্রনীতিবিদ একবার বলেছিলেন, পৃথিবীর লোক বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে যেত, যদি তারা জানত কতখানি কম-বুদ্ধির দ্বারা তাদের শাসন করা হয়। এই তিনজন, এই ‘বড়ো তিন জন’—এঁদের খুব বড়ো বড়ো ব্যক্তি বলেই মনে হত, এঁদেরও দৃষ্টি ছিল অদ্ভূত রকম সংকীর্ণ, আন্তর্জাতিক কাণ্ডকারখানা সম্বন্ধেও এঁরা ছিলেন সম্পূর্ণ অজ্ঞ, পৃথিবীর ভূগোলটা পর্যন্ত এঁরা ভালো করে জানতেন না!
প্রেসিডেণ্ট উড্রো উইলসন এলেন, তাঁর বিরাট খ্যাতি, জনসাধারণ তাঁর নামে মুগ্ধ। বক্তৃতায় এবং চিঠিপত্রে তিনি এতসব সুন্দর এবং আদর্শমূলক বাক্য ব্যবহার করেছিলেন যে লোকের বিশ্বাস হয়েছিল তিনি একটা পয়গম্বর-বিশেষ, পৃথিবীতে যে নূতন স্বাধীনতার আবির্ভাব হবে তিনি তারই বার্তা বহন করে এনেছেন। লয়েড জর্জ গ্রেট ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী; ভালো ভালো বুলি কপচাতে ইনিও ওস্তাদ; তবে এঁর আবার সুবিধাবাদী বলেও একটু খ্যাতি ছিল। ক্লেমেঁশোর নামই ছিল ‘বাঘ’, আদর্শ বা আধ্যাত্মিক বচনের তিনি ধার ধারতেন না। তাঁর কথা ছিল ফ্রান্সের পুরোনো শত্রু জর্মানিকে তিনি বিচূর্ণ করবেন; সকল দিক থেকেই তাকে এমনভাবে বিধ্বস্ত, ধূলিসাৎ করে দেবেন যেন আর কোনোদিন সে মাথা খাড়া করতে না পারে।
অতএব এই তিনজনে মিলে পরস্পরের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে লাগলেন, যে যার নিজের কোলে ঝোল টেনে নেবার চেষ্টা করতে লাগলেন, প্রত্যেকেই আবার সম্মেলনের ভিতরে এবং বাইরে অন্য বহু লোকের হাতে টান এবং ধাক্কা খেতে লাগলেন। আর এদের সকলেরই পিছনে বিভীষিকা বিস্তার করে রইল সোভিয়েট রাশিয়ার করাল ছায়া। সম্মেলনে রাশিয়াকে ডাকা হয় নি, জর্মনিকেও না। কিন্তু প্যারিসের সম্মেলনে যে ধনিকতন্ত্রী জাতিগুলো এসে একত্র হয়েছিল, রাশিয়ার অস্তিত্বটাই যেন সারাক্ষণ তাদের জীবন বিপন্ন করে রাখছিল।
শেষপর্যন্ত ক্লেমেঁশোই জয়লাভ করলেন, লয়েড জর্জের সাহায্যে। উইলসন একটি জিনিস নিয়ে খুব লড়াই করেছিলেন, একটা জাতিসংঘ। সেটা তিনি পেয়ে গেলেন। এবং তাঁর এই প্রস্তাবটি অন্যেরা মেনে নেবার ফলে অন্য প্রায় কোনো বিষয় নিয়েই তিনি বিশেষ জেদ দেখালেন না, এঁদের মতেই মত দিলেন। মাসের পর মাস ধরে তর্কবিতর্ক আর আলোচনা চালিয়ে অবশেষে শান্তি-সম্মেলনে উপস্থিত মিত্রপক্ষ একটা সন্ধিপত্রের খসড়া খাড়া করলেন; এবং নিজেদের মধ্যে একমত হয়ে নিয়ে তারপর তাঁরা জর্মনির প্রতিনিধিদের ডেকে পাঠালেন, তাঁদের আদেশগুলি শুনে যেতে। ৪৪০টি ধারা-সমন্বিত সেই বিরাট সন্ধিপত্রটি এই জর্মনদের
সামনে ফেলে দিয়ে এঁরা হুকুম করলেন, সই কর। আর কোনো আলোচনাই তাঁদের সঙ্গে হল না, নূতন কোনো প্রস্তাব বা পরিবর্তনের কথা মুখে আনবার অবসর পর্যন্ত তাঁরা পেলেন না। এ সন্ধি মানে হল এঁদের হুকুম-মাফিক সন্ধি; জর্মানিকে হয় এটি যেমন আছে তেমনইভাবে স্বীকার করে নিতে হবে, অথবা অস্বীকার করবার ফল ভোগ করতে হবে। জর্মনির নূতন প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিরা এতে আপত্তি করলেন; অবশেষে মনস্থির করবার জন্যে তাঁদের যে সময়টা দেওয়া হয়েছিল তার একেবারে শেষ দিনটিতে তাঁরা এই ভার্সাই সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করলেন।
অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি বুলগেরিয়া এবং তুরষ্কের সঙ্গে মিত্রপক্ষ আলাদা আলাদা সন্ধিপত্র রচনা এবং স্বাক্ষর করলেন। তুরষ্কের সঙ্গে যে সন্ধি করা হল তুরষ্কের সুলতান সেটা মেনে নিতে রাজি ছিলেন, কিন্তু কামাল পাশা আর তাঁর বীর সঙ্গীদের প্রচণ্ড বাধা দেবার ফলে সে সন্ধি হতে পারল না। সে গল্প আমি তোমাকে আলাদা করে বলব।
এই-সব সন্ধির ফলে কী কী পরিবর্তন হল? ভূমি-বিভাগের পরিবর্তন যা হল, তার বেশির ভাগই হল পূর্ব-ইউরোপ, পশ্চিম-এশিয়া আর আফ্রিকায়। আফ্রিকাতে জর্মনদের যে-সব উপনিবেশ ছিল, মিত্রপক্ষ সেগুলোকে যুদ্ধের লুঠের মাল বলে হস্তগত করে নিলেন; সবচেয়ে ভাল জায়গাগুলো ফেলা হল ইংলণ্ডের ভাগে, টাঙ্গানাইকা এবং পূর্ব-আফ্রিকার আরও কতকগুলো অঞ্চল হস্তগত হবার ফলে ইংলণ্ডের দীর্ঘদিনের একটা স্বপ্ন সফল হল, উত্তরে মিশর থেকে শুরু করে দক্ষিণে উত্তমাশা অন্তরীপ পর্যন্ত আফ্রিকার একেবারে এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত বিস্তৃত একটানা একটি সাম্রাজ্য সে প্রতিষ্ঠা করল।
ইউরোপে পরিবর্তন হল অনেক; ইউরোপের মানচিত্রে একসঙ্গে বহু সংখ্যক নূতন রাজ্যের আবির্ভাব হল। ইউরোপের একটা পুরোনো আর একটা নূতন মানচিত্র পাশাপাশি মিলিয়ে দেখ; কতখানি পরিবর্তন তার হয়েছে সেটা একনজরেই বুঝতে পারবে। এর কিছু কিছ পরিবর্তন হয়েছিল রুশ বিপ্লবের ফলে; রাশিয়ার ঠিক সীমান্তদেশে অনেকগুলো জাতির বাস ছিল যারা নিজেরা রাশিয়ান নয়, তারা সোভিয়েটের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে নিজেদের স্বাধীন বলে ঘোষণা করল। সোভিয়েট সরকারও এদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকার করে নিল, এদের উপরে হস্তক্ষেপ করল না। ইউরোপের নূতন মানচিত্রটার দিকে তাকিয়ে দেখো। একটা বড়ো রাজ্য ছিল অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি; সেটা একেবারেই অন্তর্হিত হয়ে গেছে, তার জায়গাতে দেখা যাচ্ছে অনেকগুলো ছোটো ছোটো রাজ্য, এদের অনেক সময় বলা হয় অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকারী রাজ্যসমূহ। এই রাজ্যগুলোর পরিচয়: অস্ট্রিয়া, আগে সে মস্ত বড়ো রাজ্য ছিল এখন তারই একটি ক্ষুদ্র টুক্রোতে পরিণত হয়েছে, পৃথিবীর অন্যতম অতি বৃহৎ শহর ভিয়েনা তার রাজধানী; হাঙ্গেরি, এরও আকার অনেক ছোটো হয়ে গেছে; চেকোস্লোভাকিয়া, আগের দিনের বোহেমিয়া রাজ্য এখন এর অন্তর্গত হয়েছে; আমাদের পূর্ব-পরিচিত কুখ্যাত রাজ্য, যুগোস্লোভিয়ার খানিক অংশ, সার্বিয়া, কিন্তু তার চেহারা এত স্ফীত হয়েছে যে দেখে চেনাই যায় না; এবং বাকি খানিক অংশ গিয়ে যুক্ত হয়েছে রুমানিয়া, পোল্যাণ্ড আর ইতালির সঙ্গে। অতি সম্পূর্ণ একটা শব-ব্যবচ্ছেদ!
এর অনেকখানি উত্তরে আরেকটা নূতন রাজ্যের সৃষ্টি হয়েছে, বা বলা যায় একটা পুরোনো রাজ্যের পুনরাবির্ভাব হয়েছে—পোল্যাণ্ড। এটাকে তৈরি করা হল প্রাশিয়া, রাশিয়া আর অস্ট্রিয়ার খানিক করে অংশ ছেঁটে নিয়ে। পোল্যাণ্ডকে সমুদ্রে পৌঁছবার একটা পথ করে দেবার জন্য একটা অদ্ভুত কাণ্ড করা হল; জর্মনি বা প্রাশিয়াকে কেটে দুই টুক্রো করে, তাদের মাঝখানে বারান্দার মতো সরু লম্বা এক ফালি জমি পোল্যাণ্ডকে দিয়ে দেওয়া হল, সেই পথে সে সমুদ্রে পৌঁছতে পারবে। অতএব এখন পশ্চিম-প্রাশিয়া থেকে পূর্ব-প্রাশিয়াতে কেউ যেতে চাইলে তাকে পোল্যাণ্ডের অধীন এই সংকীর্ণ স্থানটি পার হয়ে যেতে হয়। এই স্থানটির উত্তর পাশেই বিখ্যাত ডানজিগ্ শহর অবস্থিত। এটিকে একটি স্বাধীন নগরীতে পরিণত করা হয়েছে; মানে এটা এখন জর্মনিরও অন্তর্গত নয়, পোল-রাজ্যেরও সম্পত্তি নয়; এ নিজেই এখন একটা রাজ্যবিশেষ, সোজাসুজিই জাতি-সঙ্ঘের অধীনে।
পোল্যাণ্ডের উত্তরে আছে বল্টিক অঞ্চলের রাজাগুলি, লিয়োনিয়া, ল্যাটভিয়া, এস্তোনিয়া এবং ফিন্ল্যাণ্ড; এরা সকলেই জারের প্রাচীন সাম্রাজ্যের ভগ্নাবশেষ নিয়ে তৈরি। ছোটো ছোটো রাজ্য, কিন্তু এদের প্রত্যেকেরই বিশেষ একটি নিজস্ব সংস্কৃতি আছে, নিজস্ব পৃথক ভাষা আছে। একটা জানবার মতো খবর তোমাকে দিতে পারি, লিথুয়ানিয়ানরা জাতে আর্য (ইউরোপের আরও অনেক জাতির মতো); এদের ভাষারও সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে খুব নিকট-সম্পর্ক। ব্যাপারটা লক্ষ্য করবার মতো, যদিও খুব সম্ভব ভারতের অনেক লোকই এর সন্ধান রাখে না। বহু দূরবর্তী জাতিগুলোর মধ্যেও যে একটা সম্পর্কের যোগসূত্র থাকতে পারে, এর থেকে তার কিছুটা আভাস আমরা পাই।
ইউরোপের ভূভাগে আর একটিমাত্র বড়ো পরিবর্তন সাধিত হয়েছে; সে হচ্ছে আলসেস এবং লোরেন প্রদেশ দু’টিকে ফ্রান্সের অন্তর্ভূক্ত করে দেওয়া। এ ছাড়া আরও কয়েকটা পরিবর্তন করা হয়েছিল কিন্তু তার বিবরণ দিয়ে তোমাকে আর বিব্রত করব না। এটা দেখলে, এই সব পরিবর্তনের ফলে অনেকগুলো নূতন রাজ্যের সৃষ্টি হয়েছে, তাদের প্রায় সবগুলোই অত্যন্ত ছোটো ছোটো রাজ্য। পূর্ব ইউরোপের চেহারা এখন প্রায় বল্কান অঞ্চলের মতোই হয়ে গেছে; অনেক সময়ে তাই বলা হয়, সন্ধিপত্রগুলো ইউরোপ মহাদেশটাকে বল্কান বানিয়ে দিয়েছে। আবার তুলনায় এখন দেশে দেশে সীমান্তরেখার পরিমাণ অনেক বেশি, এই ক্ষুদ্র রাজাগুলোর মধ্যে খিটিমিটির ঠোকাঠুকিও লেগেই রয়েছে। পরস্পরের প্রতি এদের যা তীব্র বিদ্বেষ বিশেষ করে দানিয়ুব নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে, সে এক আশ্চর্য ব্যাপার। এর অপরাধ অনেকখানিই হচ্ছে মিত্রপক্ষের; ইউরোপকে সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক কতকগুলো খণ্ডে তাঁরা বিভক্ত করেছেন, এবং তাই করে অসংখ্য নূতনতর সমস্যার সৃষ্টি করেছেন। ছোটো ছোটো অনেকগুলো জাতিগত সম্প্রদায়কে বিদেশী শাসনের অধীন করে দেওয়া হয়েছে, তারা এদের উপর অত্যাচার করছে। পোল্যাণ্ডকে একটা মস্ত বড়ো অঞ্চল দিয়ে দেওয়া হয়েছে যেটা আসলে ইউক্রেনের অংশ; সেখানকার নিরীহ ইউক্রেনিয়ানদের জোর করে পোল বানিয়ে তুলবার উদ্দেশ্যে তাদের উপরে নানা রকমের উৎপীড়ন করা হচ্ছে। যুগোস্লাভিয়া, রুমানিয়া, ইতালি, প্রত্যেকেই এই ভাবে কিছু কিছু সংখ্যালঘু বিদেশী সম্প্রদায়কে হাতে পেয়েছে, তাদের উপরে এদের দুর্ব্যবহারের অন্ত নেই। এদিকে আবার অস্ট্রিয়া আর হাঙ্গেরির গায়ের একেবারে সবখানি মাংস চেঁছে নিয়ে হাড়টুকু মাত্র বাকি রাখা হয়েছে; তাদের নিজের লোকদের অধিকাংশকেই তাদের হাত থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিদেশী শাসনের অধীনস্থ এই সমস্ত স্থানে স্বভাবতই জাতীয় আন্দোলনের সৃষ্টি হয়। তার ফলে চলে সারাক্ষণ মারামারি-হানাহানি।
মানচিত্রটার দিকে আবার তাকাও। দেখবে পশ্চিম-ইউরোপ থেকে রাশিয়া সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, এদের মাঝখানে রয়েছে পর পর এক সার রাজ্য,—ফিনল্যাণ্ড, এস্তোনিয়া ল্যাট্ভিয়া, লিথুয়ানিয়া, পোল্যাণ্ড এবং রুমানিয়া। তোমাকে বলেছি, এই রাজ্যগুলোর অধিকাংশই জন্মলাভ করেছিল, ভার্সাই সন্ধি থেকে নয়—সোভিয়েট বিপ্লবের ফলে। কিন্তু তাহলেও এদের উদ্ভব দেখে মিত্রপক্ষ খুবই খুশী হল; কারণ এরা রাশিয়া আর অ-বলশেভিক ইউরোপের মাঝখানে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এরা যেন একটা ‘স্বাস্থ্য রক্ষার সীমারেখা’ (যা দিয়ে সংক্রামক রোগাক্রান্ত স্থানকে অন্য স্থান থেকে আলাদা করে রাখা হয়); বলশেভিক-সংক্রমণকে এরা ইউরোপ থেকে দূরে ঠেকিয়ে রাখবে। বল্টিক-অঞ্চলের এই রাজাগুলি সকলেই অ-বলশেভিক তা নইলে এরা অবশ্যই গিয়ে সোভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দিত।
পশ্চিম-এশিয়াতে যে প্রাচীন তুর্কি সাম্রাজ্য ছিল, তার কোনো কোনো অংশের উপর পাশ্চাত্য জাতিগুলোর লোভ পড়ল। যুদ্ধের সময় ব্রিটেন আরবদের উৎসাহ দিয়ে তুরষ্কের বিরদ্ধে বিদ্রোহ করিয়েছিল; তাদের ভরসা দিয়েছিল, আরবদেশ প্যালেস্টাইন আর সিরিয়া ব্যাপী একটা সংযুক্ত আরব-রাজ্য তারা গড়ে দেবে। অথচ আরবদের যখন তারা এই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল, ঠিক সেই সময়েই আবার ফ্রান্সের সঙ্গেও ব্রিটেন একটা গোপন সন্ধি সম্পন্ন করছিল, তাতেও ঠিক এই জায়গাগুলোই ফ্রান্সের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেবার ব্যবস্থা করে। খুব ভদ্রোচিত কাজ এটা নয়; ব্রিটেনের একজন প্রধান মন্ত্রী র্যাপে ম্যাকডোনাল্ড একে অভিহিত করেছিলেন একটা ‘অভদ্র দুমুখো-পনার’ কাহিনী বলে। কিন্তু সে দশ বছর আগের কথা। তখন তিনি মন্ত্রী হন নি, কাজেই এক আধ সময়ে সত্যি কথা বললেও বলতে পারতেন।
কিন্তু এর চেয়েও অদ্ভূত অবস্থা দাঁড়াল, যখন ব্রিটিশ সরকারের মাথার খেলল, কেবল আরবদের যে প্রতিশ্রতি দেওয়া হয়েছে সেইটাই ভাঙা নয়, ফ্রান্সের সঙ্গে যে গোপন সন্ধিটা হল সেটাকেও ভাঙতে হবে। তাঁদের সামনে তখন বিরাট একটা স্বপ্ন জেগে উঠেছে: মধ্য-প্রাচ্যে একটা প্রকাণ্ড সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন, ভারতবর্ষ থেকে মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে তার সীমানা, ভারতীয় সাম্রাজ্যের সঙ্গে আফ্রিকাতে তাদের অধীনে যে বিপুল ভূভাগ রয়েছে তাকে একত্র জুড়ে নিয়ে সে এক বিপুল ব্যাপার। প্রকাণ্ড স্বপ্ন এ, এর লোভ সংবরণ করা সহজ নয়। অথচ তখন একে বাস্তবে পরিণত করাও খুব কঠিন মনে হচ্ছিল না। সে সময়ে, ১৯১৯ সনে, এই বিশাল ভূখণ্ডের সর্বত্রই ব্রিটিশ সেনা জুড়ে বসে রয়েছে—পারশ্য, ইরাক, প্যালেস্টাইন, আরবের কতক অংশ, মিশর, সবই তাদের দখলে। সিরিয়া থেকে ফরাসিদের বাইরে ঠেকিয়ে রাখতেও তারা চেষ্টা করছিল। খোদ কনস্টাণ্টিনোপ্ল্ শহরটা পর্যন্ত তখন ব্রিটিশদের দখলে। কিন্তু ১৯২০, ১৯২১, ১৯২২ সনে অনেক অপূর্ব ঘটনার আবির্ভাব হল; ব্রিটেনের সে স্বপ্নও হাওয়ায় মিশে গেল। পিছনে সোভিয়েট আর সামনে কামাল পাশা, দুয়ের চাপে পড়ে ব্রিটিশ মন্ত্রীদের এত সাধের কল্পনা একেবারেই বৃথা হয়ে গেল।
কিন্তু তখনও ব্রিটেন পশ্চিম-এশিয়ার অনেকখানি জায়গা—ইরাক এবং প্যালেস্টাইন জুড়ে বসে রয়েছে। আরবেও তারা ঘুষ দিয়ে এবং অন্যান্য উপায়ে ঘটনাচক্রকে তাদের ইচ্ছামতো চালাবার চেষ্টা করছে। সিরিয়া পড়ল ফরাসিদের ভাগে। আরব দেশগুলিতে যে নবীন জাতীয়তার উদ্ভব হচ্ছিল তার কথা এবং স্বাধীনতার জন্য এদের সংগ্রামের কাহিনী আমি তোমাকে অন্য এক সময়ে বলব।
এখন আমাদের আবার ভার্সাই সন্ধির কাছে ফিরে যেতে হচ্ছে। এই সন্ধিপত্রে বলা হল, জর্মনিই অপরাধী, সেই যুদ্ধ বাধিয়েছে। অতএব জর্মনদের জোর করে সেই সন্ধিপত্রে সই করিয়ে তাদের নিজেদের সে যুদ্ধ বাধাবার অপরাধ স্বীকার করানো হল। এরকমের জবরদস্তি স্বীকারোক্তির মূল্য কিছুই নেই, এতে শুধু মনোমালিন্যই বাড়ে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
জর্মনির উপরে আরও একটি হুকুম জারি হল; তাকে অস্ত্রশস্ত্র পরিত্যাগ করতে হবে। ছোটো একটি সেনাদল মাত্র সে রাখতে পারবে, মোটামুটি দেশের মধ্যের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখবার জন্য। তার সমস্ত নৌবহরটিকেও মিত্রপক্ষের হাতে সমর্পণ করতে হবে। এই আত্মসমর্পণের জন্য যখন জর্মনির নৌবহরকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, সেই সময়ে তার কর্মচারী এবং নাবিকরা স্থির করলেন, ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেওয়ার চেয়ে বরং সে বহরকে তাঁরা নিজেরাই সমুদ্রে ডুবিয়ে দেবেন, এর দরুন যা কিছু দায়িত্ব সেও তাঁরা নিজেরাই স্বীকার করে নিচ্ছেন। অতএব ১৯১৯ সনের জুন মাসে স্কাপা ফ্লো নামক স্থানে সময় জর্মন নৌবহরটিকে তার নিজের নাবিকরাই তলা ফুটো করে ডুবিয়ে দিলেন—ব্রিটিশ সেনার একেবারে চোখের সামনে, তারা তখন সে বহরের হিসাব বুঝে নিতে প্রস্তুত হচ্ছে!
তার পর আবার, যুদ্ধের দরুন জর্মনকে একটা জরিমানা দিতে হবে; যুদ্ধে মিত্রপক্ষের যে-সব ক্ষতি এবং লোকসান সইতে হয়েছে তারও ক্ষতিপূরণ করতে হবে। এর নাম দেওয়া হল ‘ক্ষতিপূরণ’ বা Reparations। বহু বৎসর পর্যন্ত এই কথাটা ইউরোপের আকাশ আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কত হবে তার কোনও নির্দিষ্ট অঙ্ক সন্ধিপত্রে বলা হল না, তবে তার পরিমাণ নির্ধারণ করবার ব্যবস্থা খাড়া করা হল। যুদ্ধের দরুণ মিত্রপক্ষের যত ক্ষতি হয়েছে সমস্ত পূরণ করবার এই প্রতিশ্রুতি—এ একটা বিরাট বোঝা। জর্মনি পরাজিত, বিধ্বস্ত দেশ; তখন তার পক্ষে ঘর সামলাবার নানাবিধ সমস্যাই প্রকাণ্ড হয়ে উঠেছে। এর উপরে আবার যদি মিত্রপক্ষের দরুন বোঝাও তার ঘাড়ে এসে চাপে, তবে তার পক্ষে সামাল দেওয়াই অসম্ভব; সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা তার সাধ্যের বাইরে। কিন্তু মিত্রপক্ষ তখন বিদ্বেষে আর প্রতিহিংসার প্রবৃত্তিতে মাতাল হয়ে উঠেছে; তারা শুধু তাদের “এক পাউণ্ড মাংস” কেটে নিয়েই ক্ষান্ত হবে না, জর্মনির ভূলুণ্ঠিত দেহটাকে নিংড়ে শেষ রক্তবিন্দুটি পর্যন্ত আদায় করে তবে ছাড়বে। ইংলণ্ডে তখন লয়েড্ জর্জ একটি নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন, শুধু ‘কাইজারকে ফাঁসি দাও’ এই ধ্বনির জোরে। ফ্রান্সে লোকের দ্বেষবুদ্ধি তখন এর চেয়েও প্রবল।
সন্ধিপত্রের এত সব শর্তের মোট উদ্দেশ্যটা ছিল, যতদিক দিয়ে সম্ভব জর্মনিকে নাগপাশে বেঁধে একেবারে পঙ্গু করে রাখা, যেন আর কোনোদিন সে শক্তি সঞ্চয় করতে না পারে। পুরুষানুক্রমে তারা শুধু মিত্রপক্ষের অর্থনৈতিক দাস হয়ে থাকবে, কর হিসাবে প্রচুর পরিমাণ টাকা বছর বছর তাদের গুণে দেবে। একটা বড়ো জাতিকে এরকম ভাবে দীর্ঘকাল হাত পা বেঁধে রাখা সম্ভব নয়, ইতিহাসে একথা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু সে সোজা কথাটা এই অতিবিজ্ঞ মহা-রাষ্ট্রনীতিধুরন্ধরদের মগজে প্রবেশ করল না; ভার্সাইতে তাঁরা এই প্রতিহিংসাধর্মী সন্ধির ভিত্তি স্থাপন করলেন। আজ তাঁরা সেজন্য অনুতাপ করছেন।
সকলের শেষে তোমাকে আরেকটি বস্তুর কথা বলতে হবে; সে হচ্ছে প্রেসিডেণ্ট উইলসনের সৃষ্ট, লীগ্ অব নেশন্স্, ভার্সাই সন্ধির ফলেই জগতে তার আবির্ভাব হয়েছে। কথা ছিল, এটা হবে একটা স্বাধীন এবং স্ব-শাসিত রাষ্ট্রদের মিলনক্ষেত্র; এর লক্ষ্য হবে, “ন্যায় বিচার এবং উপযুক্ত মর্যাদা অনুসারে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে মৈত্রী স্থাপন করে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে রোধ করা, এবং জগতের সমস্ত জাতির মধ্যে বাস্তব এবং মানসিক সহযোগিতার প্রতিষ্ঠা করা।” অতি প্রশংসনীয় সংকল্প! লীগের অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রগুলো প্রত্যেকেই প্রতিশ্রুতি দিলেন, শান্তিপূর্ণ উপায়ে আপোষ নিষ্পত্তির সমস্তরকম সম্ভাবনা একেবারে শেষ হয়ে যাবার আগে তাঁরা কিছুতেই কেউ অন্য কোনো সহযোগী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন না, এবং সে ক্ষেত্রেও যুদ্ধ ঘোষণা করবেন নয়মাস কাল অপেক্ষা করে তার পরে। লীগের অন্তর্ভুক্ত কোনো রাষ্ট্র যদি এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তবে অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো সেই রাষ্ট্রের সঙ্গে সমস্ত প্রকার টাকাকড়ি লেনদেন এবং ব্যবসায়-বাণিজ্য ইত্যাদি সংক্রান্ত আর্থিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বন্ধ করে দেবেন, এ প্রতিজ্ঞাও তাঁরা করলেন। কাগজেকলমে কথাগুলো শুনতে ভারি চমৎকার; কার্যত যা দাঁড়িয়েছে সে একেবারেই ভিন্ন বস্তু। এটা কিন্তু লক্ষ্য করবার মতো; লীগ যুদ্ধের সম্ভাবনাকে একেবারে শেষ করে দেবার চেষ্টা করে নি; শুধু যুদ্ধ বাধাবার পথে কিছু বাধাবিঘ্ন সৃষ্টি করতেই চেয়েছে; যেন এই ভাবে কিছু সময় কেটে যাবার ফলে এবং ইতিমধো আপোষ-মীমাংসার চেষ্টার ফলে মানুষের মনে যুদ্ধ বাধাবার উত্তেজনাটা নিজে থেকে কমে আসতে পারে। যে-সব কারণে যুদ্ধ বাধে, সেগুলোকে দূর করবার চেষ্টাও এতে করা হয় নি।
স্থির হল এই লীগের মধ্যে একটি অ্যাসেম্বলি এবং একটি কাউন্সিল থাকবে। অ্যাসেম্বলি তৈরি হবে এর অন্তর্ভুক্ত দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে আর কাউন্সিলে বড়ো জাতি ক’টির প্রতিনিধিদের জন্য স্থায়ী আসন থাকবে; এ ছাড়া অন্য কয়েকজন সভ্যও থাকবেন, অ্যাসেম্বলি তাঁদের নির্বাচন করে দেবে। আর থাকবে একটি সরকারি দপ্তরখানা বা সেক্রেটারিয়েট, তুমি জান তার প্রধান কার্যালয় হচ্ছে জেনেভাতে। এছাড়া আরও কতকগুলি কাজের জন্য এক-একটা বিভাগ থাকবে; একটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক অফিস, এরা শ্রমিকদের সংক্রান্ত সমস্ত সমস্যার মীমাংসা করবেন; আন্তর্জাতিক বিচারের জন্য একটি স্থায়ী আদালত, এটি হেগে অবস্থিত; বিভিন্ন দেশের মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আদান-প্রদান ও সহযোগিতার জন্য একটি কমিটি। এর সমস্ত কাজ লীগ গোড়া থেকে শুরু করে নি। কতকগুলো কাজ পরে যোগ করা হয়েছে।
লীগের সংগঠন-পদ্ধতির মূল সূত্রটি ভার্সাই সন্ধির মধ্যেই ছিল। এর নাম হচ্ছে “লীগ অব নেশন্স্ সংক্রান্ত চুক্তিপত্র” (Covenant of the League of Nations)। এই চুক্তিপত্রেই একথাও বলা হয়েছিল, সমস্ত দেশেরই রণসজ্জা কমিয়ে দিতে হবে, নেহাৎ নিজের নিজের নিরাপত্তা বজায় রাখবার জন্য যেটুকু নইলে নয় তার বেশি রণসজ্জা কেউ রাখতে পারবে না। জর্মনিকে নিরস্ত্রীকরণের (সেটা অবশ্য বাধ্যতামূলক ছিল) ব্যাপারটাকে এরই প্রথম ধাপ বলে বর্ণনা করা হল; অন্যান্য দেশও ক্রমে এর অনুসরণ করবে। আরও বলা হল, কোনো রাষ্ট্র যদি অন্যকে আক্রমণ করে তবে তার শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু আক্রমণ বলতে কী বোঝায়, সে কথা স্পষ্ট করে বলা হল না। দুটি দেশ বা দুটি জাতির মধ্যে যখন যুদ্ধ বাধে, দুজনই অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপায়, বলে ও-ই এসে আমাকে আক্রমণ করেছে।
বড়ো বড়ো জরুরি ব্যাপারে লীগ তার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে পারত, শুধু সকল সভ্য একমত হলে। কাজেই একটিমাত্র রাষ্ট্রও কোনো একটা প্রস্তাবের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করলে সে প্রস্তাব বাতিল হয়ে যেত। এর অর্থ ছিল, কেবল ভোটের সংখ্যাধিক্যের জোরে কাউকে জুলুম করে বাধ্য করা হবে না। তাছাড়া, এর ফলে প্রত্যেকটি জাতীয় রাষ্ট্র ঠিক আগের মতোই স্বাধীন এবং প্রায় আগের মতোই দায়িত্বশূন্য থেকে গেল, লীগ সকলের উপরে একটা উপরওয়ালা কর্তা গোছের ব্যাপার হয়ে উঠতে পারল না। এই ব্যবস্থাটির দরুনই লীগের শক্তি খুবই কমে গেল, সেটা বস্তুত দাঁড়িয়ে গেল শুধু একটা উপদেশ-দাতা প্রতিষ্ঠানে।
যে-কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রেরই লীগে যোগ দেবার অধিকার ছিল। কিন্তু চারটি দেশকে একেবারে নাম করে এর বাইরে ঠেলে রাখা হল—এরা হচ্ছে পরাজিত তিনটি দেশ, জর্মনি, অস্ট্রিয়া, তুরষ্ক, আর বলশেভিক দেশ রাশিয়া। একথা অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই বলা হল, পরে এরাও বিশেষ কতকগুলি শর্তাধীনে লীগে যোগ দিতে পারবে। আশ্চর্য ব্যাপার এই, ভারতবর্ষ একেবারে গোড়া থেকেই লীগের একজন সভ্য হয়ে আছে; কেবলমাত্র স্বাধীন দেশরাই এর সভ্য হতে পারবে এই নীতিটিকে সোজাসুজি অগ্রাহ্য করে। ‘ভারতবর্ষ’ বলতে অবশ্য বোঝানো হয়েছিল ভারতের ব্রিটিশ সরকারকে; এই চাতুরিটি খেলে ব্রিটিশ সরকার লীগে তাঁদের একজন বাড়তি লোক ঢুকিয়ে নিলেন। ওদিকে আবার, আমেরিকাকে এক হিসাবে বলা যায় লীগের জন্মদাতা; অথচ সেই এতে যোগ দিতে অস্বীকার করে বসল। প্রেসিডেণ্ট উইলসনের কার্যকলাপ এবং ইউরোপের দেশগুলোর কূটকচাল আর জটিল প্যাঁচ দেখে দেখে আমেরিকার লোকেরা বিরক্ত হয়ে উঠেছিল; তারা স্থির করল এর ধারে কাছেও আসবে না।
লীগের দিকে অনেকেই খুব উৎসাহভরে চেয়ে রইল, আশা করল এখনকার দিনে জগতে আমাদের মধ্যে যত বৈষম্য যত বিবাদ-বিসংবাদ, লীগ তার অবসান করবে, অন্তত অনেকখানি হ্রাসের ব্যবস্থা করবে; পৃথিবীতে শান্তি এবং সমৃদ্ধির একটা স্বর্গ এনে দেবে। লীগের নাম লোকের কাছে তুলে ধরবার উদ্দেশ্যে এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টি নিয়ে সমস্ত বস্তুকে দেখবার অভ্যাস লোকের মধ্যে জন্মিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে, বহু দেশে বহু লীগ অব নেশন্স্ সমিতি স্থাপিত হল। অন্যদিকে আবার অনেক লোকে বলতে লাগল, লীগটা একটা প্রকাণ্ড ভণ্ডামির ব্যাপার, শুধু বড়া বড়ো জাতি ক’টার মতলব হাসিল করবার উদ্দেশ্যেই এর সৃষ্টি করা হয়েছে। এখন আমরা লীগের সম্বন্ধে কিছুটা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি; এর কার্যকারিতা কতখানি সেটা বিচার করা হয়তো এখন আমাদের পক্ষে সহজ হয়েছে। ১৯২০ সনের নববর্ষের দিনে লীগের কার্যারম্ভ হয়েছিল; এর বয়স এখন পর্যন্ত খুব বেশি হয় নি বটে, কিন্তু এই নাতিদীর্ঘ কালের মধ্যেই লীগ নিজেকে অকেজো ও অসার বলে প্রমাণিত করে ফেলেছে। আধুনিক জীবনের বহুবিধ ক্ষুদ্র ব্যাপারে লীগ বেশ ভালো কাজই দেখিয়েছে সন্দেহ নেই; আন্তর্জাতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করবার জন্য বিভিন্ন জাতি বা তাদের সরকারসমূহকে সে টেনে এনে একত্র বসিয়েছে, শুধু এই বস্তুটাই প্রাচীন জগতের রীতির তুলনায় অনেকখানি অগ্রগতির পরিচয়। কিন্তু এর আসল উদ্দেশ্য ছিল জগতে শান্তি রক্ষা করা, অন্তত যুদ্ধের সম্ভাবনাকে কমিয়ে আনা; সে কাজ করতে সে একেবারেই অক্ষম হয়েছে।
মূলত একে নিয়ে প্রেসিডেণ্ট উইলসনের মনে কী অভিপ্রায় ছিল জানি নে; কিন্তু এসম্বন্ধে কোনোই সন্দেহের অবকাশ নেই যে লীগ এখন হয়ে উঠেছে বড়ো শক্তিদের, বিশেষ করে ইংলণ্ড আর ফ্রান্সের হাতের যন্ত্রমাত্র। এর মূল কথাটাই হচ্ছে বর্তমান অবস্থাকে টিঁকিয়ে ব্যথা। বিভিন্ন জাতির মধ্যে ন্যায়বিচারের এবং পরস্পর-মর্যাদার কথা এ বলে থাকে। কিন্তু বিভিন্ন জাতির মধ্যে যে সম্পর্ক বর্তমানে রয়েছে, সেটা সত্যই ন্যায়বিচার এবং মর্যাদার উপরে প্রতিষ্ঠিত কিনা, সে খোঁজ এ নিতে চায় না। বলে, জাতিগুলোর ‘ঘরোয়া ব্যাপারে’ হস্তক্ষেপ করতে সে যাবে না। সাম্রাজ্যবাদী জাতির অধীনে যে সব জাতি আছে, তাদের কথা তার পক্ষে ঘরোয়া ব্যাপারই বটে। অতএব লীগ বলবে, এই সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের সাম্রাজ্য চিরকাল ধরেই শাসন করতে থাক, এইটাই তারও কাম্য। তার পরে আবার, জর্মনি এবং তুর্কির হাত থেকে বহু নূতন জায়গা কেড়ে নিয়ে মিত্রপক্ষের দেশগুলোকে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এদের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ম্যাণ্ডেট্’—রক্ষাধীন। এই কথাটাই ঠিক লীগ অব নেশন্সের প্রকৃতির যোগ্য কথা; কারণ এর মধ্যেকার ইঙ্গিতটাই হচ্ছে, পুরোনোদিনের সাম্রাজ্যবাদী শোষণ অব্যাহত গতিতেই চলতে থাকবে, অবশ্য একটা মধুরতর নামের আবরণে। বলা হয়, এই অঞ্চলগুলির রক্ষার ভার এদের হাতে দেওয়া হয়েছে, রক্ষণীয় অঞ্চলের প্রজাদেরই অভিপ্রায় অনুসারে। বহ স্থানে সে প্রজারা এই রক্ষকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ পর্যন্ত করেছে, দীর্ঘকাল ধরে সংগ্রাম চালিয়েছে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে, অবশেষে বোমা এবং কামানের গোলা খেযে আবার এদের বশ্যতা স্বীকার করেছে। প্রজাদের অভিপ্রায় যাচাই করবাব পন্থাটা ভালোই ছিল বলতে হবে।
সুন্দর সুন্দর শব্দ আর ভাষা অবশ্য অনেকই বলা হত তখন। সাম্রাজ্যবাদী জাতিগুলো হচ্ছে ‘অভিভাবক’ বা জিম্মাদার, রক্ষাধীন অঞ্চলের প্রজাদের ভার তাদের জিম্মা করে দেওয়া হয়েছে, সে জিম্মার সমস্ত শর্ত যাতে যথাযথ পালিত হল সেটা দেখবাব ভার হচ্ছে লীগের উপর। বস্তুত এতে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে উঠল। সাম্রাজ্যবাদী জাতিগুলো যা ইচ্ছে তাই করতে লাগল, অথচ তাদের বাইরে রইল একটা খুব মহৎ কর্তব্যের ছদ্মবেশ, অজ্ঞ লোকদের বিবেক সেই বেশ দেখেই মুগ্ধ হয়ে বসে বইল। কোনো ক্ষুদ্র রাষ্ট্র যখন কোনো রকম অন্যায় করে, লীগ তখন খুব গম্ভীর ভাব ধারণ করে, তার ক্রোধের হুমকি দেখিয়ে তাকে ঠাণ্ডা করে দেয়। আর বড়ো জাতিগুলোর কেউ যখন অপরাধ করে, লীগ তখন যথাসম্ভব অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে বসে থাকে, বা তার সে অপরাধটাকে যতদূর পারে লঘু বলে প্রমাণ করতে চেষ্টা করে।
এমনি করেই বড়ো জাতিগুলো লীগকে নিজের ইচ্ছেমতো চালাতে লাগল, একে দিয়ে যেখানে তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হচ্ছে সেখানে একে কাজে লাগাল, আর যেখানে একে উপেক্ষা করে চলা তাদের পক্ষে সুবিধাজনক সেখানে একে সবাই উপেক্ষা করেই চলল। তবু হযতো সে অপরাধ লীগের নয়, অপরাধ ছিল আসলে সেই ব্যবস্থাটারই, লীগকে নিজের প্রকৃতিবশেই তার সঙ্গে তাল রেখে চলতে হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের মূল কথাই হচ্ছে বিভিন্ন জাতির মধ্যে অতি তীব্র রেষারেষি এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রত্যেকেই তারা পৃথিবীটাকে যে যতখানি পারে শোষণ করে নিতে চায়। একটা সমাজের প্রত্যেকটি সভ্য যদি সারাক্ষণই পরস্পরের পকেট মারতে চায়, পরস্পরের গলা কাটবে বলে ছুরি শানাতে থাকে তবে তাদের মধ্যে খুব বেশি সহযোগিতা গড়ে উঠবে বা সে সমাজের খুব বেশি উন্নতি হবে এমন আশা করাই ভুল। এই জন্যই খুব ভারিক্কি জাঁকালো মাতব্বর মুরুব্বি আর অভিভাবক গোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও লীগ যে ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে পড়ল, এতে আশ্চর্য হবার কিছুই নেই।
ভার্সাইতে যখন সন্ধির শর্ত ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা চলছে জাপান সরকারের তরফ থেকে তখনই বলা হয়েছিল, সমস্ত জাতিরই মর্যাদা সমান, এই মর্মে একটি ধারা সে সন্ধিপত্রের অন্তর্গত করে দেওয়া হোক। সে প্রস্তাব তখন গৃহীত হল না। জাপানকে অবশ্য শান্ত করে রাখা হল চীনের কিয়াওচাও প্রদেশ তাকে দান করে। চীনের মতো একটি দুর্বল এবং বিনীত মিত্রদেশের ঘাড় ভেঙে ‘বৃহৎ ত্রিশক্তি’ খুব মস্ত একটা দাক্ষিণ্য দেখিয়ে দিলেন। এই ক্ষোভে চীন সন্ধিপত্রে সাক্ষর করল না।
যুদ্ধের অবসান ঘটাবার জন্য অনুষ্ঠিত যুদ্ধটির শেষ হয়েছিল ভার্সাই সন্ধিতে; এই হচ্ছে সে সন্ধির স্বরূপ। ফিলিপ স্নোডেন, পরে তিনি করেছিলেন ভাইকাউণ্ট স্নোডেন। ইনি ব্রিটিশ ক্যাবিনেটেরও একজন মন্ত্রী ছিলেন। এই সন্ধিটির সম্বন্ধে তিনি এই মন্তব্য করেছিলেন।
দস্যু, সাম্রাজ্যবাদী এবং সমর-ব্যবসায়ীদের এই সন্ধিপত্র দেখে সন্তুষ্ট হবার কথা। যারা আশা করেছিল এই যুদ্ধের অবসানে শান্তি আসবে, তাদের সে আশা এতে সমূলে বিনষ্ট হয়েছে। এটা শান্তি স্থাপনের সন্ধিপত্র নয়, আরেকটা যুদ্ধের ঘোষণাপত্র। গণতন্ত্রের প্রতি এবং যুদ্ধে যারা প্রাণ দিয়েছে তাদের প্রতি এতে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। মিত্রপক্ষের প্রকৃত মনোভাবটিই এই সন্ধিপত্রে ফুটে উঠেছে।”
বস্তুত মিত্রপক্ষ সেদিন দ্বেষবুদ্ধি অহংকার আর লোভের খেলায় অত্যধিক বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলেন। পরবর্তী কালে তার জন্যে তাঁরা অনুতপ্ত হয়ে উঠেন, যখন দেখতে পেলেন যে তাঁদের নিজেদের বুদ্ধির ত্রুটিতে নিজেরাই নাজেহাল হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তখন খুবই দেরি হয়ে গেছে।