বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ইউরোপে অন্তর্বিপ্লব

উইকিসংকলন থেকে

৮২

ইউরোপে অন্তর্বিপ্লব

৪ঠা আগস্ট, ১৯৩২

 বেশ কয়েক দিন তোমার কাছে এই চিঠির ধারা বজায় রাখতে পারি নি। শেষ বোধ হয় লিখেছি প্রায় সপ্তাহ আগে। বাইরের পৃথিবীর মতো কারাকক্ষেও মানুষের মনোভাবের পরিবর্তন হয়, এবং কিছুদিন ধরে চিঠি লেখার কোনো উৎসাহ পাচ্ছি না, আমি ছাড়া কেউ তো আর এ চিঠি দেখে না। একসঙ্গে জড়ো করে চিঠির রাশ গুছিয়ে রেখে দি, কত কাল পরে, কত মাস কত বছর পরে তুমি পড়বে, এই আশায়। কত মাস কত বছর পরে! আবার যখন আমাদের দেখা হবে, তোমাকে দেখে অবাক হব, তুমি কত বড়ো হয়েছ, কত বদলে গেছ! আমাদের কথা বলার এত জিনিষ থাকবে যে, তুমি এসব চিঠি পড়ার সময়ই পাবে না। ততদিনে চিঠির পাহাড় জমে যাবে, তার মধ্যে রুদ্ধ থাকবে আমার জীবনের কতশত ঘণ্টার কারাজীবন!

 তবু লিখব, এবং চিঠির স্তূপ বেড়েই যাবে। হয়তো তুমি পড়ে খুশি হবে। অন্তত আমি লিখে আনন্দ পাই।

 এশিয়ার ইতিহাস নিয়ে বেশ কিছুদিন কাটিয়েছি; ভারত, মালয়েশিয়া, চীন ও জাপানের গল্প করেছি। ঠিক যে সময়ে ইউরোপ জেগে উঠছিল এবং পরিস্থিতি কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে উঠছিল, সেই সময়েই আমরা ইউরোপ ছেড়েছি। রেনেসাঁস অথবা পুনর্জন্ম শুরু হয়েছিল। নবজন্ম বলাই হয়তো ঠিক, কারণ যে ইউরোপ ষোড়শ শতাব্দীতে জাগছিল তা কোনো প্রাচীন যুগের অনুকরণ নয়। এটা সম্পূর্ণ নূতন জিনিয, কিংবা পুরোনো জিনিষও যদি হয় তবে তার উপরের আবরণ সম্পূর্ণ নূতন।

 ইউরোপের সর্বত্র গোলযোগ ও অশান্তি, এবং রুদ্ধ স্থান ভেঙে বের হওয়ার আকাক্ষা। বহু শত বৎসর ধরে এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিধান সামন্তপ্রথানুসারে গড়ে উঠেছিল, এবং সমগ্র ইউরোপকে অধিকার করে রেখেছিল। কিছুকাল ধরে এই বহিরাবরণের ফলে উন্নতি ব্যাহত হয়েছিল। কিন্তু বহু স্থানে এই আবরণ ভেঙে পড়ছিল। কলম্বস ও ভাস্কো-ডা-গামা, এবং জলপথের আদি-আবিষ্কর্তারা এই আবরণ ভেঙে বাইরে এসেছিলেন, এবং স্পেন ও পর্তুগালের আমেরিকা ও প্রাচ্য থেকে সংগৃহীত আকস্মিক বিস্ময়কর ঐশ্বর্য ইউরোপের চোখ ঝলসে দিল এবং তাতে পরিবর্তন সহজ হয়ে এল। ইউরোপ তার সংকীর্ণ জলরেখার বাইরে তাকাতে আরম্ভ করল এবং পৃথিবীর কথা ভাবতে শিখল। বিশ্ববাণিজ্য ও পৃথিবীব্যাপী সাম্রাজ্যের সম্ভাবনার পথ হল। মধ্যশ্রেণীর লোকেদের শক্তিবৃদ্ধি হল এবং পশ্চিম-ইউরোপে সামন্তপ্রথা ক্রমাগত বাধার সৃষ্টি করল।

 সামন্তপ্রথা আগেই বাতিল হয়ে গিয়েছিল। এই রীতির বিশেষত্ব ছিল, কৃষিজীবীদের নির্লজ্জ শোষণ। বলপ্রয়োগে কাজ করানো, বিনা পারিশ্রমিকে খাটানো, এবং জমির মালিককে দেয় বহু প্রকার কর, এসব তো ছিলই, তার উপর বিচারক ছিলেন মালিক নিজে। আগেই জেনেছ যে, কৃষকদের দুর্দশা এত বেড়ে গিয়েছিল যে ঘন ঘন কৃষক-বিদ্রোহ চলছিল। এই কৃষক-সংগ্রাম চার দিকে ছড়িয়ে পড়ল এবং আরও ঘন ঘন হতে আরম্ভ করল; ইউরোপের বহু স্থানে যে অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটল, তা প্রাচীন সামন্তপ্রথার পরিবর্তে মধ্যশ্রেণীয় অথবা বুর্জোয়া রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটাল; এর আগমনের জন্যে প্রধানত দায়ী কৃষক-বিদ্রোহ এবং জ্যাকোয়ারি (Jacqueries)।

 কিন্তু মনেও কোরো না যে, এই পরিবর্তন খুব দ্রুত ঘটেছিল। এর জন্যে অনেক সময় লেগেছিল, এবং বহু বৎসর ধরে ইউরোপে গৃহবিরোধ চলেছিল। ইউরোপের অনেকখানি অংশ এই গহযুদ্ধের ফলে ধ্বংসীভূত হয়েছিল। শধু যে কৃষকযুদ্ধ তা নয়; তাদের মধ্যে ছিল প্রোটেস্ট্যাণ্ট ও ক্যাথলিকদের মধ্যে ধর্মযুদ্ধ, স্বাধীনতা-অর্জনের জন্য জাতীয় যুদ্ধ (যেমন নেদারল্যাণ্ড্‌সে হয়েছিল), এবং রাজার অবিসংবাদী কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে মধ্যশ্রেণীর বিদ্রোহ। ভীষণ গোলমেলে, না? সত্যিই তাই। কিন্তু যদি উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী ও আন্দোলন অনুধাবন করি তা হলে খানিকটা বোঝা যাবে।

 প্রথমে মনে রাখতে হবে যে, কৃষকদের মধ্যে দুর্দশা ছিল বহুলপরিমাণে, যার ফলে হল কৃষকসংগ্রাম। দ্বিতীয় কথা হল মধ্যশ্রেণীর অভ্যুদয় এবং উৎপাদন শক্তির বৃদ্ধি। উৎপাদনের জন্যে বেশি করে শ্রমিক নিযুক্ত হচ্ছিল, এবং বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল। তৃতীয়ত, চার্চ ছিল সবচেয়ে বড়ো জমিদারশ্রেণী। এটা ছিল তাদের প্রচণ্ড স্বার্থ, এবং তার ফলে সামন্ত প্রথার স্থায়িত্বের জন্যে তাদের ছিল গভীর চেষ্টা। এমন কোনো অর্থনৈতিক পরিবর্তন তাদের রুচিকর নয়, যার ফলে তাদের ধনসম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হতে হয়। ফলে, যখন রোমের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে ধর্ম বিদ্রোহ আরম্ভ হল, তখন অর্থনৈতিক বিপ্লবের সঙ্গে তা বেশ খাপ খেল।

 এই বিরাট অর্থনৈতিক বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে সব দিকেই পরিবর্তন ঘটেছিল— সামাজিক, ধর্মসংক্রান্ত এবং রাজনৈতিক। যদি তুমি ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে সুদূরপ্রসারী ব্যাপক দৃষ্টি দাও বুঝতে পারবে, কেমন করে এইসব আন্দোলন এবং পরিবর্তন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সাধারণত এই সময়ের তিনটি বড়ো আন্দোলনের উপরে জোর দেওয়া হয়—রেনেসাঁস বা নবজাগরণ, রিফর্মেশন বা পরিমার্জন, এবং বিপ্লব। কিন্তু এসবের পিছনেই ছিল অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং গোলযোগ, যার ফলে অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটেছিল, এবং যা সব পরিবর্তনের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য।

 রেনেসাঁস ছিল বিদ্যার নবজন্ম—শিল্প-বিজ্ঞান-সাহিত্যের উদ্বোধন, এবং ইউরোপীয় দেশসমূহের ভাষার উন্নতি। রিফর্মেশন ছিল রোমান-ধর্ম কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, চার্চের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসাধারণের বিদ্রোহ; তা ছাড়া, ইউরোপের রাজন্যবর্গ কর্তৃক তাদের উপরে প্রভুত্ব করার পোপের দাবির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। তৃতীয়ত, অভ্যন্তর থেকে চার্চের পরিমার্জনের প্রচেষ্টা। বিপ্লব ছিল মধ্যশ্রেণীর রাজনৈতিক সংগ্রাম, রাজাদের নিয়ন্ত্রিত রাখা এবং তাদের শক্তি সীমাবদ্ধ করার জন্যে।

 এইসব আন্দোলনের পশ্চাতে আর একটা জিনিষ ছিল— ছাপাখানা। তোমার মনে আছে, আরবরা চীনাদের কাছ থেকে কাগজ তৈরি শিখেছিল, এবং ইউরোপ শিখল আরবদের কাছ থেকে। তা হলেও যথেষ্ট পরিমাণে শস্তায় কাগজ তৈরি করতে সময় লাগল। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে ইউরোপের নানা স্থানে—হল্যাণ্ড, ইতালি, ইংলণ্ড, হাঙ্গেরি প্রভৃতি জায়গায়—বই ছাপানো আরম্ভ হল। কাগজ এবং ছাপা আরম্ভ হওয়ার আগে পৃথিবী কেমন ছিল কল্পনা করার চেষ্টা করো। আমরা কাগজ, ছাপানো বই প্রভৃতিতে এতই অভ্যস্ত যে ছাপাখানা ছাড়া পৃথিবীকে কল্পনা করাও শক্ত। বই না ছাপিয়ে জনসাধারণকে শুধু অক্ষরপরিচয় করানোও প্রায় অসম্ভব। বহু পরিশ্রমে বই হাতে করে নকল করতে হত, তাতে অতি সামান্য পরিমাণ লোকই বই সংগ্রহ করতে পারত। শিক্ষা জিনিষটা ছিল বেশির ভাগই মৌখিক, এবং ছাত্রদের সবই মুখস্থ করতে হত। এই জিনিষটা এখনও সেকেলে মক্তব অথবা পাঠশালায় দেখতে পাবে।

 কাগজ এবং মুদ্রাযন্ত্রের আবির্ভাবের পর থেকে এক অতি বিরাট পরিবর্তন ঘটল। স্কুলপাঠ্য প্রভৃতি ছাপানো বই দেখা দিল। অতি শীঘ্রই বহু লোকে লিখতে পড়তে শিখল। লোকে যত পড়ে তত চিন্তা করতে শেখে (অবশ্য এ কথা শুধু সুচিন্তিত বইয়ের বেলাতেই খাটে, আজকাল যেসব বাজে বই বের হয় তাদের বেলায় নয়)। আর লোকে যত বেশি ভাবে ততই বর্তমান পরিস্থিতি পরীক্ষা করে সমালোচনা করতে শেখে। অজ্ঞতা পরিবর্তনকে ভয় করে। অজানা জিনিষের ভীতির ফলে তা গতানুগতিক পথা আঁকড়ে ধরে থাকে, সেখানে যতই দুরবস্থা থাক-না কেন। নিজের অন্ধতায় কোনোরকমে হোঁচট খেয়ে দিন গুজরান করে। কিন্তু পাঠ্য বই পড়লে লোকে খানিকটা জ্ঞানলাভ করে, ফলে খানিকটা চোখ ফোটে।

 কাগজ এবং মুদ্রাযন্ত্রের সাহায্যে এই চোখ-ফোটার ফলে, যেসব বিরাট আন্দোলনের কথা বলছি, তাদের প্রচণ্ড সহায়তা হয়। সর্বপ্রথম ছাপানো বইগুলির অন্যতম হচ্ছে বাইবেল, এবং যেসব লোকে শুধু বাইবেলের লাতিন ভাষা শুনেছিল অথচ বোঝে নি, তারা এখন নিজেদের ভাষায় পড়তে সমর্থ হল। পড়ার ফলে তারা সমালোচনা করতে শিখল, এবং যাজকসম্প্রদায়ের মুখাপেক্ষী আর তত থাকল না। বিদ্যালয় পাঠ্য বইও প্রচুর পরিমাণে দেখা দিল। এই সময় থেকে আরম্ভ করে ইউরোপের ভাষাসমূহের খুব দ্রুত অগ্রগতি ঘটল। এতদিন পর্যন্ত লাতিনভাষাই ছিল মুখ্য।

 এই সময়ের যশস্বী লোকেদের নামে ইউরোপের ইতিহাস পূর্ণ। তাঁদের কারও কারও বিষয় পরে আলোচনা করব। সর্বদা, যখনই কোনো দেশ তার বহিরাবরণ ভেদ করতে সমর্থ হয়, তার উন্নতি আরম্ভ হয় এবং বহু দিকে অগ্রগতি ঘটে। ইউরোপে এইরকম হয়েছিল, এবং ইউরোপের সমসাময়িক ইতিহাস অতি কৌতূহলোদ্দীপক ও শিক্ষাপ্রদ, কারণ এই সময়েই অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বড়ো পরিবর্তন ঘটেছিল। এর সঙ্গে ভারতের ইতিহাসের তুলনা করে দেখো, অথবা সমসাময়িক চীনের সঙ্গে। আগেই বলেছি, এই দুই দেশই বহুরূপে ইউরোপ থেকে অগ্রসর ছিল। তবু তাদের ইতিহাসে একটা নিস্ক্রিয়তা আছে, যার তুলনায় এই যুগের ইউরোপের ইতিহাস একটা প্রচণ্ড গতিশীলতায় পূর্ণ। ভারতে এবং চীনে বড়ো বড়ো রাজা এবং খ্যাতনামা লোকের অভাব ছিল না, অতি উচ্চ সংস্কৃতিও ছিল, কিন্তু একটা জিনিষ—বিশেষ করে ভারতবর্ষে—জনসাধারণ ছিল নিস্তেজ এবং নিষ্ক্রিয়। শাসকসম্প্রদায়ের পরিবর্তন ঘটত, কিন্তু জনসাধারণ বিশেষ আপত্তি জানাত না। তাদের যেন পুরোপরি পোষ মানিয়ে নেওয়া হয়েছিল, এবং আদেশ পালন করতে তারা এতই অভ্যস্ত ছিল যে, আপত্তির কথাই উঠত না। ফলে, তাদের ইতিহাস মধ্যে মধ্যে কৌতূহলোদ্দীপক হলেও তাতে ছিল নিছক ঘটনাবলী এবং শাসকদের কাহিনী, জনসাধারণের আন্দোলনের কথা নয়। আমি জানি না চীন সবন্ধে এ উক্তি কতদূর প্রযোজ্য। তবে ভারতবর্ষের সম্বন্ধে বহু শতাব্দী ধরে এই উক্তিই সত্য। আর ভারতে যা-কিছু দুর্দশা ঘটেছে এই শত শত বছর ধরে, সবই আমাদের জনসাধারণের অসুখী অবস্থার জন্যে।

 ভারতের আর-একটি স্বভাব, সামনে না তাকিয়ে শুধু পিছন ফিরে অতীতের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা—যে গৌরব আমাদের আগে ছিল তার দিকে, যে গৌরব একদিন আমরা পাব বলে আশা করি তার দিকে নয়। ফলে আমাদের দেশের লোকে শুধু অতীতের কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে, এবং অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে যখন যে যা আদেশ দিয়েছে, মাথা পেতে নিয়েছে। পরিণামে সাম্রাজ্য টিঁকে থাকে তার শক্তির উপর নির্ভর করে নয়, যে জনসাধারণের উপর তারা কর্তৃত্ব করে তাদের দাস-মনোভাবের উপর।