বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ইউরোপে বিভিন্ন রাষ্ট্রের উৎপত্তি
৫২
ইউরোপে বিভিন্ন রাষ্ট্রের উৎপত্তি
চলো এবারে ইউরোপ ঘুরে আসি। আগের বার যখন ইউরোপের কথা লিখেছি তখন সেখানে বড়ো গোলযোগ। রোমের পতনের ফলে পশ্চিম-ইউরোপে সভ্যতা লোপ পেয়ে গেল। পূর্ব-ইউরোপে, কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্-সাম্রাজ্য ছাড়া বাদবাকি অংশে অবস্থা ছিল আরও খারাপ। হুনবংশীয় এত্তিলা মহাদেশ জুড়ে ধ্বংসের আগুনে জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। শুধু ক্ষয়িষ্ণু পূর্ব-রোমক সাম্রাজ্য টিঁকে আছে, মাঝে মাঝে আবার বিক্রমও দেখাচ্ছে।
রোমের পতনের পরে পশ্চিম-ইউরোপে একটা ভীষণ আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল; এটা যখন থিতিয়ে এল, শুরু হল নূতন ব্যবস্থা, নূতন সংস্থাপনা। সময় লাগল অনেক। খৃষ্টধর্মের প্রচার হতে লাগল, কখনও ধর্মানুরাগীদের প্রচেষ্টায়, কখনও-বা সৈনিক রাজাদের তলোয়ারের জোরে। গড়ে উঠল নূতন রাজ্য। ফ্রান্স, বেলজিয়ম, আর জর্মানির একাংশে ফ্রাঙ্ক্রা এক রাজ্য স্থাপন করল; রাজার নাম ছিল ক্লোভিস এবং এর শাসনকাল ৪৮১ থেকে ৫১১ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত। এই ফ্রাঙ্ক্ আর ফরাসিরা এক নয় কিন্তু। ক্লোভিসের পিতামহের নামে এই রাজবংশের নামকরণ হয়েছিল মেরোভিঙ্গিয়ান-বংশ। কিন্তু এই বংশের রাজাদের কোনো ক্ষমতা ছিল না, রাজোর জনৈক প্রধান কর্মচারীর হাতে ছিল প্রকৃত ক্ষমতা; এই কর্মচারীকে বলা হত, ‘মেয়র অব দি প্যালেস’। ক্রমে মেয়রের পদও বংশানুক্রমিক হয়ে গেল এবং তারাই প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী হল। মেয়রই ছিল প্রকৃত শাসনকর্তা, রাজারা ছিল তাদের হাতের পুতুল।
এই মেয়রদেরই একজনের নাম ছিল চার্ল্স্ মর্টেল; ৭৩২ খৃষ্টাব্দে ফ্রান্সের অন্তর্গত টুর্স-নামক স্থানে এক যুদ্ধে ইনি আরব দিগকে পরাস্ত করেন। এই পরাজয়ের ফলে সারাসেনজাতির অগ্রগতি রুদ্ধ হয় এবং খৃস্টানদের মতে ইউরোপ রক্ষা পায়। মর্টেল প্রচুর খ্যাতি ও সম্মান লাভ করলেন; লোকে মনে করল, তিনি শত্রুর হাত থেকে খৃষ্টীয় সমাজকে রক্ষা করেছেন। কন্স্টাণ্টিনোপ্লের সম্রাটের সঙ্গে রোমের পোপদের বনিবনাও ছিল না; সুতরাং তাঁরা চার্ল্স্ মর্টেলের সাহায্যপ্রার্থী হলেন। তখন মর্টেলের পুত্র পেপিন স্থির করলেন, সাক্ষিগোপাল রাজাকে সরিয়ে নিজেই রাজা হবেন; পোপও এ প্রস্তাবে রাজি হলেন।
পেপিনের পরে এলেন তাঁর পুত্র শার্লামেন। পোপ আবার ফ্যাসাদে পড়ে শার্লামেনের দ্বারস্থ হলেন। চার্ল্স্ পোপের শত্রুদিগকে তাড়িয়ে দিলেন। তার পর ৮০০ খৃস্টাব্দে ক্যাথিড্রালে বিরাট এক উৎসবের অনুষ্ঠান করে পোপ শার্লামেনকে রোমের সম্রাট-পদে অভিষিক্ত করলেন। সেদিন পবিত্র রোমান-সাম্রাজ্যের পত্তন হল। এর কথা আমি আগে একবার তোমাকে লিখেছি।
বিচিত্র এই সাম্রাজ্য; এর পরবর্তীকালের ইতিহাস আরও অদ্ভুত; ক্রমে ক্রমে সাম্রাজ্য লোপ পেয়ে গেল, চিহ্নমাত্র রইল না—এলিসের গল্পের বেড়ালটার মতো। কিন্তু তার তখনও ঢের দেরি; ভবিষ্যতের ঘটনা সম্পর্কে ঔৎসুক্য প্রকাশ না করাই ভালো।
পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য কিন্তু পাশ্চাত্যের সেই প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের পরিপূরক নয়। কিছুটা পার্থক্য ছিল। ওটাই যেন একমাত্র সাম্রাজ্য এবং সম্রাট একমাত্র পোপ ছাড়া পৃথিবীর আর সবাইকার প্রভু। পোপ আর সম্রাটের মধ্যে কে বড়ো এই নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী চলেছে কত দ্বন্দ্ব, কত বিরোধ। কিন্তু এটাও অনেক পরেকার ঘটনা। তবে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার এই যে, নূতন সাম্রাজাকে প্রাচীন রোমক সাম্রাজ্যেরই পুনরুত্থান বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। তবে কিনা এর একটা নূতনত্ব ছিল, খৃষ্টধর্ম ও খৃষ্টীয় সমাজের ধারণা। তাই তো এই সাম্রাজ্যকে বলা হত ‘হোলি’ বা ‘পবিত্র’। সম্রাট এবং পোপকে মনে করা হত ঈশ্বরের প্রতিনিধি। রাজনৈতিক ব্যাপারাদি দেখাশোনা করতেন সম্রাট, আর পারমার্থিক দিকটা ছিল পোপের হাতে। অন্তত ধারণাটা তাই ছিল এবং তার থেকেই ইউরোপে রাজার ধর্মগত অধিকারের কথা উঠেছে, এইরূপ আমার আন্দাজ। সম্রাট ছিলেন ধর্মের রক্ষক। ইংলণ্ডের রাজাকে আজও ‘ডিফেণ্ডার অব্ দি ফেথ্’ বা ধর্মের রক্ষাকর্তা বলা হয়।
খলিফার সঙ্গে এদের তুলনা করা যায়; খলিফাকে বলা হত ধর্মবিশ্বাসীদের নেতা বা ‘কমাণ্ডার অব্ দি ফেথ্ফুল’। প্রথমাবস্থায় খলিফা একাধারে সম্রাট আর পোপ দুই-ই ছিলেন; পরবর্তীকালে তিনি নামেমাত্র কর্তা থাকেন।
এদিকে পূর্ব-রোম সাম্রাজ্যের সম্রাটরা পাশ্চাত্যের এই নূতন হোলি রোমান এম্পায়ারকে মোটেই স্বীকার করল না। শার্লামেনকে যখন এখানে সম্রাট করা হয় তখন কন্স্টাণ্টিনোপ্লের সিংহাসনে বসেছেন এক নারী, নাম আইরিন। এই স্ত্রীলোকটিই সম্রাজ্ঞী হবার জন্যে নিজের ছেলেকে হত্যা করেছিলেন; এঁর শাসনব্যবস্থায় ছিল নানা গলদ আর বিশৃঙ্খলা। এই কারণে পোপ কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্-সাম্রাজ্য থেকে আলাদা হয়ে গিয়ে শার্লামেনকে সম্রাট করলেন।
শার্লামেন পাশ্চাত্য খৃষ্টীয় সমাজের কর্তা হয়ে বসলেন; শুধু তাই নয়, মর্তে ঈশ্বরের প্রতিনিধি, আর পবিত্র সাম্রাজ্যের সম্রাট। কী গালভরা কথা। এই ধরনের কথা দিয়ে সহজেই
লোক ভুলানো যায়। ঈশ্বর এবং ধর্মের দোহাই পেড়ে শাসনকর্তৃপক্ষ অনেক সময়েই অন্যের চোখে ধুলো দিয়ে নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করেছে। কিন্তু, নিত্যনৈমিত্তিক জীবনে এইসমস্ত রাজামহারাজা আর ধর্মাধ্যক্ষদের সঙ্গে সাধারণ লোকের কোনো সম্পর্ক ছিল না, ওরা ছিল জনসাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে, প্রায় দেবতার মতো। এবং এই কারণেই জনসাধারণ ভয় করত ওদের। রাজসভার রীতিনীতি আদব-কায়দা আর আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে মন্দির অথবা গির্জার আচার-অনুষ্ঠানাদির তুলনা করে দেখো; দুই স্থানেই নতজানু হয়ে অভিবাদন, সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত ইত্যাদি প্রচলিত। ছেলেবেলা থেকেই আমরা নানারকম কর্তৃপক্ষকে পুজো করতে শিখি; কিন্তু প্রীতি বা অনুরাগের বশে নয়, করি ভয়ে।
শার্লামেন ছিলেন বোগদাদের হারুন-অল-রশিদের সমসাময়িক। ওঁদের দুজনের মধ্যে পত্রালাপ ছিল। এমনকি, যাতে পূর্ব-রোম সাম্রাজ্য এবং স্পেনে সারাসেনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যায় সেজন্যে উভয়ের মধ্যে একটা সন্ধির প্রস্তাবও হয়েছিল। অবশ্য সে প্রস্তাব কার্যকরী হয় নি, কিন্তু তথাপি এ থেকে শাসক এবং রাজনৈতিকদের মনের গতি বোঝা যায়। খৃষ্টীয় সমাজের কর্তা অর্থাৎ সম্রাট কিনা বাগদাদের খলিফার সঙ্গে একযোগে যুদ্ধ ঘোষণা করবে অপর এক খৃষ্টান সাম্রাজ্য আর এক আরবশক্তির বিরুদ্ধে! ব্যাপারটা কল্পনা করো তো? তোমার হয়তো-বা মনে আছে, স্পেনের সারাসেনরা বোগদাদের আব্বাসি খলিফাকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিল। ওরা ছিল স্বাধীন, তাই বোগদাদের গাত্রদাহ। কিন্তু সারাসেনরা থাকত অনেক দূরদেশে, তাই কোনো বিরোধ বাধে নি। এদিকে কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্ আর শার্লামেনের মধ্যেও তেমন বনিবনা ছিল না; এখানেও দূরত্বের জন্যেই কোনো সংঘর্ষ বাধতে পারে নি। কিন্তু তথাপি দেখো, প্রস্তাব করা হয়েছিল, খৃষ্টান আর আরব এই দুই জাতি মিলে অপর এক খৃষ্টান এবং আরব-শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হোক। আসলে রাজাদের মনের উদ্দেশ্য ছিল অন্যরকম—কর্তৃত্ব, ক্ষমতা আর ধনসম্পত্তি দখল করা; তাই ওটাকে একটা ধর্মের খোলস দেওয়া হয়েছিল। সর্বত্রই এই ব্যাপার। ভারতবর্ষে কী হল? মাহ্মুদ ধর্মের দোহাই দিয়ে এ দেশে এসে বিপুল ধনসম্পত্তি লুণ্ঠন করলেন। ধর্মের নামে প্রায়ই লোকে অনেক কিছু করে নিয়েছে।
কিন্তু যুগে যুগে লোকের মনোভাবের পরিবর্তন হয়ে থাকে; সুতরাং প্রাচীনকালের লোকদের কার্যকলাপের বিচার করা আমাদের পক্ষে দুরূহ ব্যাপার। যে ব্যাপার আজ আমাদের নিকট অতি সাধারণ বলে মনে হচ্ছে সেটা হয়তো ওদের মনে হত অদ্ভুত; আবার সেকালের আচার-বিচারও আমাদের মনঃপূত না হতে পারে। পবিত্র সাম্রাজ্য, ঈশ্বরের প্রতিনিধি, খৃষ্টের প্রতিনিধি পোপ, ইত্যাকার বড়ো বড়ো কথা লোকে অনেক বলেছে, কিন্তু পাশ্চাত্যের অবস্থা নিতান্ত শোচনীয় ছিল। শার্লামেনের রাজত্বের অব্যবহিত পরে ইতালিতে আর রোমে যাচ্ছেতাই ব্যাপার ঘটেছিল। রোমের একদল লোক কেবল তাদের খুশিমতো এক-একজনকে ধরে এনে পোপের আসনে বসিয়ে দিত।
রোমের পতনের পরে পশ্চিম-ইউরোপে যে অব্যবস্থা আর গোলযোগের সৃষ্টি হল তাতে অনেকের ধারণা হয়েছিল যে, সাম্রাজ্যটাকে পুনরায় গড়ে তুলতে পারলে অবস্থার উন্নতি হবে। একজন সম্রাট না থাকাও অনেকের নিকট মর্যাদাহানিকর বলে মনে হয়েছিল। সেকালের অনেক লেখকের অভিমত এই যে, খৃষ্টানদের একজন সম্রাট না থাকলে পাছে-বা বিধর্মীরা তাদের অপমান করে, এজন্যে চার্ল্স্কে সম্রাট-পদে অভিষিক্ত করা হয়।
ফ্রান্স, বেলজিয়ম, হল্যাণ্ড, সুইজারল্যাণ্ড, এবং জর্মানি আর ইতালির অর্ধেকটা শার্লামেনের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সাম্রাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিমে ছিল স্পেন, আরবদের অধীনে; উত্তর-পূর্বে স্লাভ এবং অন্যান্য জাতি; উত্তরদিকে দিনেমারজাতি, আর দক্ষিণ-পূর্বদিকে বুলগেরিয়া ও সার্বিয়া; তার পরে কন্স্টাণ্টিনোপ্লের পূর্ব-সাম্রাজ্য।
৮১৪ খৃষ্টাব্দে শার্লামেনের মৃত্যু হয়, এবং তার পরেই শুরু হয় গোলযোগ; সাম্রাজ্য ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাঁর বংশধরগণ ছিল অকর্মণ্য; ওদের কারও কারও উপাধি থেকেই তা বোঝা যায়—দি ফ্যাট্, দি বল্ড, দি পায়াস বা ‘মোটা’, ‘টেকো’ ইত্যাদি। যাই হোক, এই গোলযোগের ফলে দেখা গেল, জর্মান আর ফ্রান্স আলাদাভাবে গড়ে উঠছে। জাতিহিসাবে জর্মানির শুরু সম্ভবত ৮৪০ অব্দে; তবে সম্রাট অটো দি গ্রেট নাকি জর্মনদিগকে এক জাতিতে পরিণত করেন; ওঁর রাজত্বকাল ৯৬২ থেকে ৯৭৩ খৃষ্টাব্দ। ফ্রান্স অটোর সাম্রাজ্যের অধীন ছিল না। ১৯৮৭ সনে হিউ ক্যাপেট-নামক এক ব্যক্তি শার্লামেনের বংশধরদের তাড়িয়ে দিয়ে ফ্রান্স অধিকার করেন। ফ্রান্স তখন নানা অংশে বিভক্ত, এক-এক অংশে এক-এক জন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির প্রাধান্য। পরস্পরের মধ্যে বিরোধ লেগেই থাকত। হিউ ক্যাপেট ফ্রান্সকে এক জাতিতে পরিণত করেন। তখন থেকেই ফ্রান্স আর জর্মনির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়, এবং আজও পর্যন্ত, এই হাজার বছর-কাল সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা, চলে এসেছে। প্রতিবেশী দুটি দেশ, আর অধিবাসীরা শিক্ষাদীক্ষায় কত উন্নত; অথচ আশ্চর্য যে, সেই পুরোনো বিরোধটাকে বংশপরম্পরায় এরা আজও জিইয়ে রেখেছে। তবে সম্ভবত এর দোষটা রীতিনীতি এবং শাসনব্যবস্থার, অধিবাসীদের নয়।
প্রায় এই সময়েই রাশিয়াও দেখা দিল ইতিহাসের পাতায়। ৮৫০ সনের কথা; উত্তর-অঞ্চল থেকে এসে রুরিক নামে এক ব্যক্তি রুশ-রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেন। ওদিকে ইউরোপের দক্ষিণ-পূর্বে বলগেরিয়া ও সার্বিয়া স্বতন্ত্র রাজ্যে পরিণত হল; রুশিয়া এবং 'পবিত্র রোমানসাম্রাজ্যে’র মাঝখানে গড়ে উঠতে লাগল হাঙ্গেরি আর পোল্যাণ্ড।
ইতিমধ্যে আবার ইউরোপের উত্তর-অঞ্চল থেকে একদল লোক জাহাজে করে পশ্চিম ও দক্ষিণ-অঞ্চলের দেশগুলোতে যায়; শুরু করে লুঠপাট, লোকজনকে হত্যা করে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। দিনেমারজাতি এবং অন্যান্য উত্তরাঞ্চলের অধিবাসী অর্থাৎ নরম্যানদের কথা তুমি পড়েছ; ওরা ইংলণ্ডে গিয়েছিল লুঠপাট করতে। এই নরম্যানরা নিজেদের জাহাজে করে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত যায়; যেখানে গিয়েছে সেখানেই অবাধে লুণ্ঠন আর হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। ইতালিতে অরাজকতা; রোমের অবস্থাও তথৈবচ—নিতান্ত শোচনীয়। ওরা রোম লুঠ করল, এবং এমনকি কন্স্টাণ্টিনোপ্লকেও ভয় দেখাল। এই দস্যু আর লুণ্ঠনকারীর দল দখল করল ফ্রান্সের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল—বর্তমান নরম্যাণ্ডি; তা ছাড়া দক্ষিণ-ইতালি আর সিসিলি। ঐসব স্থানে তারা আস্তানা গেড়ে বসল এবং কালক্রমে বিশেষ প্রতিপত্তিশালী হয়ে উঠল, দস্যুর দল পরিণত হল ধনীসম্প্রদায় আর জমিদারশ্রেণীতে। ফ্রান্সের এই নরম্যাণ্ডি থেকেই বিজয়ী উইলিয়মের অধীনে নরম্যানরা ইংলাণ্ডে যায় এবং সে দেশ দখল করে; সে ১০৬৬ খৃষ্টাব্দের কথা। সুতরাং দেখতে পাচ্ছ, ইংলণ্ডও গড়ে উঠছে।
আমরা এতক্ষণে ইউরোপে খৃষ্টীয় যুগের প্রথম এক হাজার বৎসরের শেষের দিকে এসে পৌঁচেছি। এই সময়েই ভারতে গজনির মাহ্মুদের লুণ্ঠনকার্য চলছে, এবং বোগদাদে আব্বাসি খলিফাদের আধিপত্য লোপ পাচ্ছে; আর, তুর্কিরা পশ্চিম-এশিয়ায় ইসলামধর্ম প্রচার করছে। স্পেন তখনও অবশ্য আরবদের অধীনেই ছিল; কিন্তু এই আরবরা তাদের স্বদেশ আরবদেশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, এমনকি বোগদাদের খলিফাদের সঙ্গে এদের বনিবনাও ছিল না। উত্তর-আফ্রিকা তো বলতে গেলে স্বাধীন ছিল, বোগদাদের আধিপত্য মানত না। মিশরে তো ছিল স্বাধীন গভর্মেণ্ট; কেবল তাই নয়, স্বতন্ত্র একজন খলিফাও। কিছুকাল আবার উত্তর-আফ্রিকাও এই মিশরীয় খলিফার শাসনাধীনে ছিল।