বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ইউরোপে শহর ও নগরের উৎপত্তি
৬৪
ইউরোপে শহর ও নগরের উৎপত্তি
২১শে জুন, ১৯০২
যে সময়ে ক্রুসেড পরিচালিত হচ্ছিল সেটা ছিল ইউরোপে ধর্মবিশ্বাসের যুগ। এই ধর্মের জোরেই লোকে দৈনদিন দুঃখকষ্ট সহ্য করত। সে যুগে না ছিল বিজ্ঞান, না বিদ্যানুশীলন; আর, ধর্ম বিজ্ঞান এবং শিক্ষা এই তিনের সমন্বয় বড়ো একটা দেখাও যায় না। বিদ্যা আর জ্ঞান মানুষকে ভাবতে শেখায়। ধর্মের সঙ্গে প্রশ্ন এবং সন্দেহের যোগাযোগ সহজে হয় না। বিজ্ঞানের সঙ্গে পরীক্ষা আর অনুসন্ধিৎসার অঙ্গাঙ্গী সম্বন্ধ, কিন্তু ধর্মের পথ আলাদা। কী করে এই ধর্মের মধ্যে দুর্বলতা ঢাকল এবং লোকের মনে সন্দেহ জাগল তা পরে আমরা দেখতে পাব।
আপাতত দেখতে পাচ্ছি, ধর্মের খুব জাঁকালো অবস্থা। রোমান চার্চ বা ধর্মসম্প্রদায় ছিল ধর্মনেতা, এবং অনেক ক্ষেত্রে শোষক। হাজার হাজার ধর্মবিশ্বাসীকে পাঠিয়েছিল প্যালেস্টাইনে ধর্মযুদ্ধে, কিন্তু তারা আর ফেরে নি। ইউরোপে অনেক খৃষ্টান কিংবা খৃষ্টান সংঘ সব ক্ষেত্রে পোপকে মানত না; তাই তিনিও তাদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করতে শুরু করলেন। কেবল তাই নয়, পোপ এবং ঊর্ধ্বতন ধর্মসম্প্রদায় মনে করতেন ধর্মের উপরে তাঁদেরই একচেটিয়া অধিকার; সেই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়েই চার্চের কতক বিধি অমান্য করবার অনুমতি দিয়ে পোপ এক বিধান বা ‘ডিস্পেন্সেশনস্’ জারি করেছিলেন। তবেই দেখো, যে চার্চ আইন জারি করত, অবস্থাবিশেষে তা অমান্য করবার ব্যবস্থাও সেই দিত। সুতরাং কতকাল আর ঐ সমস্ত বিধির প্রতি লোকের শ্রদ্ধা থাকবে? পাশাপাশি আর-একটা ব্যবস্থাও পোপ করেছিলেন, সেটা হল ক্ষমা বা ‘ইন্ডাল্জেন্স্’। রোমান ধর্ম সম্প্রদায়ের মতে, মৃত্যুর পরে মানুষের আত্মা চলে যায় স্বর্গ আর নরকের মধ্যবর্তী একটা জায়গায়; পৃথিবীতে অনুষ্ঠিত পাপকার্যের জন্যে দণ্ড ভোগ করতে হয় সেখানে। পরে এক সময়ে সেখান থেকে আত্মা যায় স্বর্গে। পোপ কী করলেন, জানো? তিনি ব্যবস্থা দিলেন, পাপক্ষালনের স্থানে না গিয়ে মানবাত্মা সরাসরি স্বর্গে যেতে পারবে। কিন্তু এই ব্যবস্থা তিনি বিনামূল্যে দিলেন না; অর্থের বিনিময়ে লোককে এই ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হত। জনসাধারণের ধর্মবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে চার্চ এভাবে শোষণ করত তাদের। এটা ক্রুসেডের পরেকার কথা। এ নিয়ে শেষ পর্যন্ত একটা কেলেঙ্কারি হল, অনেকেই রোমান চার্চের বিরুদ্ধাচরণ করতে লাগল।
আশ্চর্য যে, লোকে এসব অন্যায় সহ্য করে থাকে। তাই তো অনেক দেশেই ধর্ম একটা মস্ত ব্যবসাতে দাঁড়িয়ে গেছে। মন্দিরে মন্দিরে পুরোহিতদের কাণ্ডটা দেখো-না কেন; যারা পুজো দিতে আসে তাদেরকে শোষণ করতে এরা খুব মজবুত। গঙ্গার তীরে যাও, দেখবে, আগেভাগে পাওনাটা আদায় না করে পাণ্ডাঠাকুর কারও কাজ করতে রাজি নয়। বাড়িতে জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, যাই ঘটুক-না কেন, পুরোহিত আসবে, এবং তোমার কিছু অর্থদণ্ডও হবে।
হিন্দু খৃষ্টান ইসলাম প্রভৃতি সব ধর্মেই ইত্যাকার ব্যবস্থা। প্রত্যেক ধর্মেরই আবার টাকা আদায়ের একটা নিজস্ব ফন্দি আছে। হিন্দু ধর্মে অর্থোপার্জনের ব্যবস্থার অস্পষ্টতা নেই কোনো। ইসলামধর্মে পুরোহিতের বালাই নেই, এবং সেইহেতু অতীতে মুসলমানগণ শোষণের হাত থেকে কতকটা রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু কালে কালে সমাজে হরেক রকমের লোক আর শ্রেণীর উদ্ভব হল, কত মোল্লা, মৌলবি, পীর, ধর্মোপদেশক, আরও কত কী। তারা জনসাধারণকে প্রতারণা করে শোষণ শুরু করল। যেখানে নাকি মুখে লম্বা দাড়ি, মাথায় টিকি, কপালে ফোঁটা-তিলক, পরনে আলখাল্লা কিংবা গেরুয়া বসন থাকলেই পরম সাধু মহাপুরুষ বলে গণ্য হওয়া যায় সেখানে লোককে প্রতারণা করা তো কঠিন ব্যাপার নয়।
আমেরিকা তো সবচেয়ে উন্নত দেশ। সেখানেও ধর্ম একটা ব্যবসাতে পরিণত হয়েছে, জনগণকে শোষণ করাই তার কাজ।
এই দেখো, কোথা থেকে কোথায় এসে পড়েছি, মধ্যযুগ থেকে ধর্মের যুগ। মধ্যয্যুগের কথাই আরও বলবার আছে। দেখতে পাচ্ছি, ধর্ম আর ধরাছোঁয়ার বাইরে নেই। একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে পশ্চিম-ইউরোপ-ময় গির্জা বা ধর্মমন্দির নির্মিত হয় এবং এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ নূতন ধরনের স্থপতিবিদ্যার পরিচয় পাওয়া যায়। বিরাট এক-একটি গির্জা, কিন্তু কী-এক কৌশলে যেন এই বিরাট ইমারতের ছাদের ভার রাখা হল বাইরের দিকে দেয়ালের উপর। অভ্যন্তরভাগে যে সরু সরু স্তম্ভ আছে, মনে হবে, বুঝি-বা ওর উপরেই সমস্ত ভার ন্যস্ত; কিন্তু আদতে তা নয়। আর ঐ-যে খিলান, সেটার গড়ন ছিল আরবি স্থাপত্যের অনুকরণে। চূড়াটা উপরের দিকে ক্রমশ সূক্ষ্ম হয়ে আকাশে গিয়ে ঠেকেছে। এইভাবে এই গড়নরীতির উদ্ভব হয়েছিল ইউরোপে, একে বলা হত গথিক স্টাইল। ভারি সুন্দর! ধর্মের উচ্চ আদর্শের সঙ্গে খাপ খেয়ে গেছে যেন। গির্জার এই গঠনরীতি ধর্মের যুগের খাঁটি নিদর্শন। যেসকল স্থপতি আর কারিগর তাদের শিল্পে একান্তভাবে মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছে একমাত্র তাদের দ্বারাই এই ধরনের ইমারত নির্মাণ সম্ভব।
পশ্চিম-ইউরোপে এই গথিক স্টাইলের উদ্ভব সত্যিই অত্যাশ্চর্য ব্যাপার। সেই অরাজকতা, অজ্ঞতা আর অসহিষ্ণুতার দিনেই গড়ে উঠেছিল এই সুন্দর শিল্পাদর্শ। ফ্রান্স, উত্তর-ইতালি, জর্মনি আর ইংলণ্ডে একই সময়ে ঐ গথিক স্টাইলে গির্জা তৈরি হয়েছিল। কখন কী অবস্থায় এদের নির্মাণ শুরু হয় বলা বড়ো শক্ত; কারিগরদের নামও কেউ জানে না। আর একটা নূতন জিনিষ হল, গির্জার জানলায় রঙিন কাঁচের ব্যবহার; তাতে আবার নানা রঙে সুদৃশ্য ছবি আঁকা থাকত, এবং ঐ জানলার ভিতর দিয়ে যে আলো প্রবেশ করত তা গির্জার গুরুগম্ভীর ভাবকে যেন আরও বাড়িয়ে তুলত।
ইতিপূর্বে এক চিঠিতে আমি এশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের তুলনা করেছিলাম। তখনকার দিনে এশিয়া শিক্ষাদীক্ষা সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে ইউরোপের চেয়ে ঢের বেশি উন্নত ছিল। কিন্তু ভারতবর্ষ তখনও নূতন কিছু সৃষ্টি করতে পারে নি।—আমার মতে সৃষ্টিই জীবন। অর্ধসভ্য ইউরোপ গথিক স্থাপত্যশিল্পের উদ্ভাবন করেছিল, সুতরাং সেখানে যে জীবনীশক্তি প্রবল ছিল তা স্বীকার করতে হবে। নানা গোলযোগ, আর সভ্যতা ও সংস্কৃতির অভাব সত্ত্বেও জীবনের গতি রুদ্ধ হয় নি সেখানে; গথিক ধরনের ইমারতগুলো তার সাক্ষ্য দেয়। পরবর্তীকালে এই জীবনীশক্তি স্ফূর্ত হয়েছে চিত্রবিদ্যা, ভাস্কর্য, আর নানা দুঃসাহসিক কার্যে।
গথিক ধরনের গির্জা তুমিও দেখেছ, কিন্তু হযতো মনে নেই। সেই-যে জর্মনির কলোননগরের সুদৃশ্যে ক্যাথিড্রাল। আর ইতালির মিলানে, ফ্রান্সের সাত্রাস্ নগরে? কিন্তু কত আর নাম করব? জর্মন ফ্রান্স ইংলণ্ড আর উত্তর-ইতালির যেখানে-সেখানে এই ধরনের ক্যাথিড্রাল দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু আশ্চর্য, রোমে এই জিনিষটি নেই।
ঐ একাদশ আর দ্বাদশ শতাব্দীতে গথিক ধরনের ছাড়া অন্য ধরনের গির্জাও নির্মিত হয়েছিল, যেমন প্যারির নোতরদাম্ এবং ভেনিস নগরের সেণ্ট্ মার্ক্ গির্জা। এগুলো গ্রীক স্থাপত্যের নিদর্শন।
কিন্তু ক্রমশ ধর্মের যুগে ভাটা এল, গির্জা ক্যাথিড্রাল ইত্যাদি নির্মাণের ঝোঁকও কমল। লোকের মন তখন অন্য দিকে—ব্যবসাবাণিজ্যে আর নাগরিক জীবনযাত্রায়। ক্যাথিড্রালের পরিবর্তে গড়ে উঠল টাউন হল। পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকেই দেখা গেল, উত্তর আর পশ্চিম-ইউরোপের সর্বত্র সুদৃশ্য গথিক স্টাইলের টাউন-হল্ কিংবা নাগরিক-সমাজগৃহের ছড়াছড়ি। লণ্ডনে পার্লামেণ্ট-ভবন গথিক ধরনে নির্মিত। কবেকার তৈরি আমার জানা নেই, তবে আমার ধারণা, আদত গথিক ইমারতটি কোনো-এক সময়ে আগুনে নষ্ট হয়ে যায় এবং পরে ঐ ধরনের আর-একটি গৃহ নির্মিত হয়।
ইউরোপময় একটা পরিবর্তন শুরু হল, দেখা দিল একটা নূতন জীবনের স্পন্দন। চার দিকে নূতন নূতন শহর আর নগর গড়ে উঠতে লাগল, লোকের ঝোঁক এল নাগরিক জীবনযাত্রার প্রতি। অবশ্য, একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীর গথিক ক্যাথিড্রালগুলিও গড়ে উঠেছিল শহরে আর নগরে। সেই রোমান সাম্রাজ্যের যুগেও ভূমধ্যসাগরের তীরে তীরে বড়ো বড়ো নগরাদির অভাব ছিল না। কিন্তু রোম সাম্রাজ্য আর গ্রীক-রোমান সভ্যতার পতনের সঙ্গে সঙ্গে সেসব লোপ পেয়ে যায়; বলতে গেলে কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্ ছাড়া বড়ো নগর ইউরোপে আর ছিল না। অথচ তখন এশিয়ার নানা দেশে—ভারতবর্ষ চীন এবং আরব প্রভৃতিতে বড়ো বড়ো নগরের অভাব ছিল না। শহর সভ্যতা ও সংস্কৃতি পাশাপাশি গড়ে ওঠে; রোমের পতনের পরে ইউরোপে এ তিনের কোনোটাই ছিল না।
কিন্তু এখন আবার নাগরিক জীবন নূতন করে গড়ে উঠতে লাগল, বিশেষত ইতালিতে। এই নগরগুলি পবিত্র রোমান সম্রাটদের পথে কণ্টকস্বরূপ ছিল, কেননা এদের যেসব নির্দিষ্ট নাগরিক অধিকার ছিল সেসবের সংকোচে এরা রাজি হত না। এখন ইতালির এই সমস্ত নগরে এবং অন্যত্রও ব্যবসায়ী আর মধ্যবিত্ত বা বুর্জোয়া (bourgeoisie) শ্রেণীর উন্নতির পরিচয় পাওয়া গেল।
ভেনিস ছিল স্বাধীন সাধারণতান্ত্রিক রাজ্য; আদ্রিয়াতিক-সমুদ্রে তার আধিপত্য। কী সুন্দর দেখায় এই ভেনিস নগরীকে, আঁকাবাঁকা জলপথে ঘেরা। লোকে বলে, এ স্থানটা আগে ছিল জলাভূমি। হুন-নেতা এত্তিলা যখন একুইলিয়া আক্রমণ করেন তখন কতক লোক পালিয়ে ভেনিসের জলাভূমিতে আশ্রয় নেয়; পরে তারাই ভেনিস শহর গড়ে তোলে। পূর্ব এবং পশ্চিম রোমান-সাম্রাজ্যের মাঝখানে অবস্থিত ছিল বলে ওটা স্বাধীন থেকে যায়। ভারতবর্ষ এবং প্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে ভেনিস ব্যবসাবাণিজ্যের যোগাযোগ স্থাপন করেছিল, তাতে করে তার বিস্তর অর্থসমাগম হয়; ক্রমে শক্তিশালী নৌবিভাগ গড়ে তোলে। এখানে প্রজাতন্ত্রশাসন প্রচলিত ছিল, প্রেসিডেণ্টকে বলা হত ‘দোগা’। ১৭৯৭ খৃষ্টাব্দে নেপোলিয়ন এই প্রজাতন্ত্র রাজ্য অধিকার করেন। তখন দোগা ছিল একজন খুন্খুনে বৃদ্ধ। কথিত আছে, নেপোলিয়ন যেদিন বিজয়ীর বেশে ভেনিসে প্রবেশ করেন সেদিনই বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। সেই ভেনিসের শেষ দোগা।
ইতালির আর-এক দিকে ছিল জেনোয়া-নগরী, ব্যবসাবাণিজ্য আর নৌশক্তির দিক থেকে ভেনিসেরই সমকক্ষ। মাঝখানে বলোনা পিসা ভেরোনা আর ফ্লোরেন্স; কত শ্রেষ্ঠ শিল্পীর জন্ম হরেছিল এই ফ্লোরেন্স নগরে। মেদিসি-বংশের শাসনকালে ফ্লোরেন্স খুব সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। উত্তর-ইতালির মিলান শহর ছিল কলকারখানার কেন্দ্র। আর দক্ষিণে নেপ্ল্স্ শহরের তখন উঠন্ত অবস্থা।
ফ্রান্সের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গেই প্যারি-নগরীর প্রতিপত্তি বেড়েছে। ফ্রান্সের ক্ষমতা ও সমৃদ্ধির কেন্দ্র এই প্যারি-নগরী। কত দেশের কত রাজধানীই তো ছিল; কিন্তু প্যারি যেমন নাকি ফ্রান্সের উপর আধিপত্য করেছে তেমন কি আর-কোনো রাজধানী পেরেছে? অন্তত গত হাজার বছরের মধ্যে এমনটি দেখা যায় নি। ফ্রান্সের অন্যান্য শহরগুলোর মধ্যে লিওঁ, মার্সাই, আর্লেয়াঁ, বর্দো আর বলোন প্রসিদ্ধ।
ইতালির ন্যায় জর্মানিতেও নানা শহর গড়ে উঠছিল, বিশেষ করে ত্রয়োদশ আর চতুর্দশ শতকে। তাদের লোকসংখ্যা বাড়ল; সম্পদ ও ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে তাদের সাহসও বাড়ল। তখন ব্যবসার স্বার্থে কয়েকটি শহর একজোট হয়ে এক-এক দল পাকাল, কখনও-বা দলগুলো পরস্পর হানাহানি শুরু করল। এ বিষয়ে সম্রাটের কাছ থেকেই তারা উৎসাহ পেত। ঐসকল শহরের মধ্যে হাম্বুর্গ্, রিমেন, কলোন, ফ্রাঙ্কফুর্ট্, মিউনিক, ডান্জিগ নুরেম্বার্গ, ব্রেস্লো প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য।
নেদারল্যাণ্ডে (আধুনিক হল্যাণ্ড ও বেলজিয়াম) ছিল আন্তোয়ার্প্ আর ঘেণ্ট্ বাণিজ্যপ্রধান শহর। ইংলণ্ডে অবশ্য তখন লণ্ডন শহর ছিল, কিন্তু কোনো দিক দিয়েই তা ইউরোপের প্রধান প্রধান শহরগুলোর সমকক্ষ ছিল না—না আকারে, না অর্থসম্পদে, না ব্যবসাবাণিজ্যে। শিক্ষার কেন্দ্র হিসাবে অক্স্ফোর্ড, আর কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ছিল। ইউরোপের পূর্বাংশে ছিল সুপ্রাচীন ভিয়েনা-নগরী, আর রুশিয়ায় ছিল মস্কো, কিয়েভ ও নভোগরোদ।
এই-যে নূতন নূতন শহরগুলো গড়ে উঠল, এর উপলক্ষ্য ছিল ব্যবসাবাণিজ্য, কোনো রাজা কিংবা সম্রাটের আনুকূল্যে এগুলোর সৃষ্টি হয় নি। সুতরাং পুরোনো সাম্রাজ্যিক শহরগুলোর সঙ্গে এদের পার্থক্য ছিল। এদের ক্ষমতা ছিল ব্যবসায়ী-শ্রেণীর হাতে, অভিজাত সম্প্রদায়ের হাতে নয়। এক কথায়, এগুলো ছিল ব্যবসাবাণিজ্যের শহর। সুতরাং এদের উন্নতির অর্থ ছিল, মধ্যবিত্তশ্রেণীর উন্নতি। পরবর্তীকালে আবার এই মধ্যবিত্ত-শ্রেণীই ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং রাজা কিংবা সামন্ততান্ত্রিকদের কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু সে অনেককাল পরের কথা।
দেখা গেছে, যেখানে শহর সেখানেই সভ্যতার বিকাশ। শহর গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষারও হয় প্রচার প্রসার, আর জাগে স্বাধীনতার স্পৃহা। গ্রামাঞ্চলে লোক বাস করে বিচ্ছিন্নভাবে, আর তারা প্রায়ই কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে থাকে। তাদের খাটুনি বেজায়, বিশ্রাম নেই বললেই হয়; হুকুম অমান্য করবার সাহসও নেই। ওদিকে শহরে জীবনযাত্রা প্রণালী আলাদা। লোকে বাস করে দলবদ্ধভাবে; শিক্ষায়, চিন্তায়, আলাপ-আলোচনার ভদ্রজীবন-যাপনের সুযোগ মেলে শহরে।
আর সেই স্বাধীনতার স্পৃহা। সামন্ততান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, এবং ধর্মের ব্যাপারে চার্চের কর্তৃত্ব—এই উভয়প্রকার নাগপাশ থেকেই লোকে মুক্তি খোঁজে। বিশ্বাসের যুগ যায়, শুরু হয় সন্দেহ। পোপ আর চার্চের কর্তৃত্ব লোকে আর অন্ধভাবে মেনে নেয় না। পোপের প্রতি সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের ব্যবহার তো আমরা জানি। সেই অগ্রাহ্যের ভাবটা ক্রমশ বেড়ে চলল।
দ্বাদশ শতাব্দী থেকে শিক্ষার দিকটাও যেন পুনরায় সঞ্জীবিত হয়ে উঠল। ইউরোপে তখন লাতিনভাষাই ছিল শিক্ষার বাহন। জ্ঞানলাভের আশায় ইতালির লোকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে বেড়াত। ইতালির বিখ্যাত কবি দান্তে এলিঘিরির জন্ম হয় ১২৬৫ খৃষ্টাব্দে, আর কবি পেট্রার্ক্ জন্মগ্রহণ করেন ১৩০৪ সনে। এর অব্যবহিত পরেই ইংলণ্ডে বিখ্যাত কবি চসারের আবির্ভাব।
আরও একটা ব্যাপার লক্ষ্য করা গেল। এই সময়েই প্রথম বিজ্ঞানচর্চার দিকে লোকের ঝোঁক এসেছিল। আরবদের বৈজ্ঞানিক-স্পৃহা ছিল, এ কথা পূর্বে বলেছি; খানিকটা চর্চা তারা করেওছিল। কিন্তু তখন তো ইউরোপে মধ্যযুগে। বিজ্ঞানচর্চায় যে অনসন্ধিৎসা আর একাগ্র সাধনার প্রয়োজন, তা এই গোঁড়ামির যুগে সহজসাধ্য ছিল না। ধর্মসম্প্রদায়ই ছিল এর বিরোধী। কিন্তু তথাপি একটু-আধটু বিজ্ঞানচর্চা শুরু হল। ইউরোপের এই যুগে প্রথম বিজ্ঞানী হিসাবে একজন ইংরেজের নাম করা যেতে পারে; ইনি অক্সফোর্ডের অধিবাসী রোজার বেকন্; ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এঁর জন্ম হয়েছিল।