বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ইতালি: মুসোলিনি ও ফ্যাসিজম

উইকিসংকলন থেকে

১৭৫

ইতালি: মুসোলিনি ও ফ্যাসিজ্‌ম্

২১শে জুন, ১৯৩৩

 ইউরোপ সম্বন্ধে আমার গল্প ১৯২৯ সন অর্থাৎ ইতালিতে মুসোলিনি ও ফ্যাসিজ্‌ম্ পর্যন্ত এসে পৌঁচেছে। কিন্তু এর একটি বড়ো অধ্যায় এখন পর্যন্ত একেবারেই বলতে বাকি রয়ে গেছে; সেটা বলবার জন্য তোমাকে খানিকটা আগের দিনে চলে যেতে হবে। যুদ্ধের পরে ইতালিতে যে-সব ব্যাপার ঘটেছে এ হচ্ছে তারই গল্প। ব্যাপারগুলো আমাদের জানা দরকার, কিন্তু শুধু ইতালিতে কী হয়েছে তার কাহিনী হিসাবেই নয়—জানা দরকার তার কারণ, এগুলো একটু নূতন রকমের ব্যাপার, পৃথিবীর সর্বত্র একটা অভিনব ধরনের কাণ্ডকারখানা এবং সংগ্রাম দেখা দিচ্ছে, তারই আভাস এর মধ্যে মিলবে। এই জন্যই এই গল্পগুলো শুধু একটি বিশেষ জাতির গল্প নয়; এবং এই জন্যই আমি এগুলো সম্বন্ধে এতদিন কথা বলি নি, এর আলোচনা আলাদা একখানা চিঠিতে করব বলে তুলে রেখেছি। এই চিঠিতে আমি তোমাকে বলব মুসোলিনির কথা—এখনকার জগতে যে ক’টি মানুষ পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে সম্মান পাচ্ছেন তিনি তাঁদেরই একজন। আর বলব ইতালিতে ফ্যাসিজমের অভ্যুত্থানের কথা।

 বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবারও আগে থেকেই ইতালিতে নিদারুণ আর্থিক দুর্গতি চলছিল। ১৯১১-১২ সনে তুরস্কের সঙ্গে তার যুদ্ধ হল, সে যুদ্ধে তারই জয় হল। উত্তর আফ্রিকার ত্রিপোলি অঞ্চল তার দখলে চলে এল; ইতালির সাম্রাজ্যবাদী নেতাদের উল্লাসের অবধি রইল না। কিন্তু এই ক্ষুদ্র যুদ্ধটির ফল ইতালির আভ্যন্তরীণ অবস্থার পক্ষে বিশেষ কল্যাণকর হয় নি; তার আর্থিক অবস্থারও কোনো উন্নতি এতে হয় নি। অবস্থা ক্রমেই খারাপ হয়ে উঠল, ১৯১৪ সনে, অর্থাৎ বিশ্বযুদ্ধ ঠিক শুরু হবার মুখে, ইতালিতে বিপ্লব একেবারে আসন্ন হয়ে উঠেছে বলে মনে হল। বহু কারখানাতে বড়ো বড়ো ধর্মঘট হল; শ্রমিকদের সামলে রাখা গেল, শুধু নরমপন্থী সমাজতন্ত্রী শ্রমিকনেতারা ছিলেন বলে—এঁরা কোনোক্রমে সে ধর্মঘট বন্ধ করে দিলেন। তার পরেই এল যুদ্ধ। ইতালির মিত্র ছিল জর্মনি, কিন্তু ইতালি তার পক্ষে যোগ দিতে অসম্মত প্রকাশ করল; নিরপেক্ষ থেকে, সেই সুযোগে দুই পক্ষকেই মোচড় দিয়ে খানিকটা সুবিধা আদায় করে নিতে চেষ্টা করল। যে বেশি দর হাঁকবে তারই পক্ষ হয়ে লড়তে যাব—এই মনোভাবটা খুব ভালো নয়। কিন্তু রাজনীতির ক্ষেত্রে দেশদের ধর্মজ্ঞান বলে বিশেষ কিছুই নেই, অনেক সময়েই তারা এমন সব আচরণ করে থাকেন যা করতে যে কোনো সাধারণ মানুষ লজ্জার মরে যাবে। নগদ টাকাই বল আর যুদ্ধের পরে জমি দেবার প্রতিশ্রুতিই বল, জর্মনির তুলনায় মিত্রপক্ষের, মানে ইংলণ্ড আর ফ্রান্সের ঘুষ কচলাবার শক্তি ছিল অনেক বেশি। অতএব ১৯১৫ সনের মে মাসে ইতালি মিত্রপক্ষের দিকে হয়ে যুদ্ধে যোগ দিল। স্মার্না এবং এশিয়া-মাইনরের খানিকটা অংশ ইতালিকে দিয়ে দেওয়া হবে বলে একটা গোপন সন্ধি এর কিছুদিন পরে করা হয়েছিল তার কথা বোধ হয় তোমাকে আমি বলেছি। এই সন্ধিটি অনুমোদিত হবার আগেই রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব ঘটে গেল; তার ফলে কূটচালের এই খেলাটিও ভেস্তে গেল। এইটাই হল ইতালির মনস্তাপের একটা কারণ। প্যারিসে যে সন্ধিপত্র রচিত হল তাতেও ইতালি অসন্তুষ্ট হল, তার ধারণা হল ইতালির ন্যায্য অধিকারগুলো এতে স্বীকার করা হয় নি। এবার কিছু নূতন উপনিবেশ দখল এবং শোষণ করবার সুযোগ পাওয়া যাবে, দেশের যে অর্থকষ্ট চলছে তার খানিকটা সুরাহা করে নেওয়া যাবে, এই আশাতেই ইতালির সাম্রাজ্যবাদীরা আর বুর্জোয়ারা বুক বেঁধে বসে ছিলেন।

 তার কারণও ছিল। যুদ্ধের পর ইতালির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে পড়েছিল; যুদ্ধে ইতালি যতটা অবসন্ন হয়েছিল মিত্রপক্ষের আর কোনো দেশই তা হয় নি। দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়বার উপক্রমে দাঁড়িয়েছে; লোকেরা ক্রমেই বেশি করে সমাজতন্ত্রবাদ আর কমিউনিজ্‌মের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। রাশিয়াতে বলশেভিকরা যে কাণ্ড ঘটিয়েছে, তার দৃষ্টান্ত স্বভাবতই তাদের উৎসাহিত করে তুলছিল। দেশের মধ্যে একদিকে আছে কারখানার শ্রমিকরা: অর্থনৈতিক অবস্থার চাপে তাদের দুর্দশা একেবারে চরমে উঠেছে; অন্যদিকে রয়েছে বহু সংখ্যক সৈনিক, এদের বাহিনী ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়েছে, এদের অধিকাংশই তখন বেকার। বিশৃঙ্খলা ক্রমেই বেড়ে চলল। শ্রমিকদের শক্তি দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে; তাদের বাধা দেবার জন্য মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নেতারা এই সৈন্যদের সংঘবদ্ধ করে তুলতে চেষ্টা করতে লাগলেন। ১৯২০ সনের গ্রীষ্মকালে একটি সংকট-মুহূর্ত এসে উপস্থিত হল। ধাতুর কারখানার শ্রমিকদের ইউনিয়ন বৃহৎ প্রতিষ্ঠান, পাঁচ লক্ষ লোক তার মধ্যে। এই ইউনিয়ন দাবি তুলল, শ্রমিকদের বেতন বাড়িয়ে দিতে হবে। দাবি নামঞ্জুর হল; অতএব এই শ্রমিকরা স্থির করল, তারা একটি অভিনব পন্থায় ধর্মঘট করবে—এই পন্থাটির নাম দেওয়া হল ‘কাজে বসে ধর্মঘট করা’। তার মানে শ্রমিকরা যে যার কারখানায় ঠিক চলে যাবে, কিন্তু কাজ কিছুই না করে স্রেফ বসে থাকবে, এমনকি কাজে ব্যাঘাত পর্যন্ত ঘটাবে। এটা হচ্ছে সিণ্ডিক্যালিস্টদের রচিত কর্মপন্থা—বহুকাল আগে ফ্রান্সের শ্রমিকরা এর নীতি প্রচার করেছিল। কারখানার মালিকরা এই বাধাসৃষ্টিকারী ধর্মঘটের জবাব দিল ‘তালা-বন্ধ’ নীতি দিয়ে—মানে কারখানা বন্ধ করে দিয়ে। শ্রমিকরা তখন নিজেরাই কারখানাগুলো দখল করে নিল, নিজে সমাজতন্ত্রী রীতিতে সে কারখানা চালাবার চেষ্টা করল।

 শ্রমিকদের এই কাজটা বিপ্লবগন্ধী তাতে সন্দেহ নেই; স্থির থেকে চালিয়ে গেলে এর ফলে অবশ্যই সমাজ-বিপ্লব ঘটে যেত, আর না হয় চেষ্টাটাই ব্যর্থ হয়ে যেত। এর মাঝামাঝি কোনো অবস্থা বেশিদিন চলা সম্ভব ছিল না। ইতালিতে তখন সমাজতন্ত্রী দল খুবই প্রবল। ট্রেড ইউনিয়নগুলো তো এর ইঙ্গিতে চলতই; তাছাড়া দেশের তিন হাজার মিউনিসিপ্যালিটি ছিল এদেরই হাতে; পার্লামেণ্টেও এদের তরফের সভ্য ছিল ১৫০ জন, মানে মোট সভ্যসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। যে রাজনৈতিক দল শক্তি এবং স্থির প্রতিষ্ঠা অর্জন করে, প্রচুর সম্পত্তি এবং রাষ্ট্র-শাসনের বহু উচ্চপদ অধিকার করে বসে, সে প্রায়ই আর বিপ্লবপন্থী থাকে না। তবু কিন্তু এই দলটি, এর নরমপন্থী সভ্যরা পর্যন্ত, শ্রমিকদের সমর্থন করল; বলল কারখানা দখল করে নিয়েছে তারা, ঠিকই করেছে। কিন্তু সমর্থন করা পর্যন্তই, তার বেশি আর কিছুই করল না এরা। পিছিয়ে যাবার ইচ্ছা এদের ছিল না; কিন্তু এগিয়ে চলবার সাহসও ছিল না; যেখানে বাধাবিঘ্ন সবচেয়ে কম সইতে হয় সেই মধ্যপন্থাটিই আঁকড়ে ধরে রইল। যারা সংশয়ী, যারা কার্যকালে ইতস্তত করে, ঠিক সময়টিতে মন স্থির করে উঠতে পারে না, তাদের অবস্থা সর্বত্র যা হয়ে থাকে এদেরও ঠিক তাইই হল। শুভ মুহূর্তটিকে এরা বেশ চলে যেতে দিল, তার সঙ্গে পা মিলিয়ে চলতে পারল না—অতএব সেই কালচক্রের রথের চাকায় নিজেরাই চাপা পড়ে গুঁড়িয়ে গেল। শ্রমিকরা কারখানাগুলো দখল করে নিয়েছিল; শ্রমিক নেতারা এবং প্রগতিপন্থী দলগুলো মন স্থির করতে পারল না বলে তাদের সে চেষ্টাটিও ব্যর্থ হল।

 বিত্তশালী শ্রেণীদের এতে সাহসও অত্যন্ত বেড়ে গেল। শ্রমিকদের এবং তাদের নেতাদের শক্তি তারা যাচাই করে দেখে নিয়েছে; বুঝেছে, যতটা শক্তি তাদের আছে বলে ভেবেছিল আসলে শক্তি আছে তার চেয়ে অনেক কম। এবার এরা স্থির করল, একটা প্রতিশোধ নিতে হবে, শ্রমিক আন্দোলন এবং সমাজতন্ত্রী দলকে ভেঙে চূর্ণ করে দিতে হবে। এই কাজের সহায় বলে এরা বিশেষ করে বরণ করল কতকগুলো স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে—১৯১৯ সনে কর্মচ্যুত সৈনিকদের নিয়ে বেনিটো মুসোলিনি এই বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। এদের নাম ছিল “ফ্যাসি ডি কম্‌ব্যাটিমেণ্টি” অর্থাৎ লড়ুয়ে দল; এদের কাজ ছিল ফাঁক পেলেই সমাজতন্ত্রী এবং প্রগতিপন্থীদের আর তাদের পরিচালিত সব প্রতিষ্ঠানের উপরে আক্রমণ চালানো। যেমন, সমাজতন্ত্রবাদীরা খবরের কাগজ বার করলে তারা সে কাগজ ছাপবার ছাপাখানাটিকে নষ্ট করে দেবে; কোনো মিউনিসিপ্যালিটিতে বা সমবায় প্রতিষ্ঠানে সমাজতন্ত্রী বা প্রগতিপন্থীদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেখলে তাকে ভেঙে দেবার চেষ্টা করবে। শ্রমিক এবং সমাজতন্ত্রীদের বিরুদ্ধে এই ‘লড়ুয়ে দলরা’ লড়াই চালাচ্ছে; বড়ো বড়ো শিল্পপতিরা এবং উচ্চতর বুর্জোয়া শ্রেণীর লোকেরা প্রায় সকলেই এদের উৎসাহ দিতে এবং টাকাকড়ি দিয়ে সাহায্য করতে শুরু করলেন। শাসনকর্তৃপক্ষ পর্যন্ত এদের প্রতি অন্যায় অনুগ্রহ দেখাতে লাগলেন, কারণ সমাজতন্ত্রী দলের শক্তি ভেঙে দেওয়াই তাঁদেরও কাম্য।

 এই লড়ুয়ে দল বা ‘ফ্যাসি ডি কম্‌ব্যাটিমেণ্টি’, সংক্ষেপে ফ্যাসিস্ট বাহিনী, একে যিনি গড়ে তুললেন, কে সেই বেনিটো মুসোলিনি? তখন তাঁর অল্প বয়স (এখন তাঁর বয়স ঠিক পঞ্চাশ বছর; ১৮৮০ সনে তাঁর জন্ম হয়)। নানারকম বিচিত্র এবং উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনাতে তাঁর জীবনকাহিনী পরিপূর্ণ। তাঁর বাবা ছিলেন কর্মকার এবং একজন সমাজতন্ত্রবাদী; অতএব মুসোলিনিও সমাজতন্ত্রবাদের পরিবেশের মধ্যেই মানুষ হয়েছিলেন। প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন একেবারে আগুনমার্কা আন্দোলনপন্থী; বিপ্লবের বাণী প্রচার করার অভিযোগে সুইজার্ল্যাণ্ডের একাধিক ক্যাণ্টন থেকে তাঁকে বহিষ্কৃত হতে হয়েছিল। নরমপন্থী সমাজতন্ত্রী নেতাদের তিনি তীব্র ভাষায় সমালোচনা করতেন, তাঁরা নরমপন্থী এই জন্যই। বোমা ফেলে এবং অনুরূপ উপায়ে রাষ্ট্রের বিরদ্ধে ত্রাসসৃষ্টির চেষ্টাকে তিনি খোলাখুলিই সমর্থন করতেন। তুরস্কের সঙ্গে যখন ইতালির যুদ্ধ হয় তখন সমাজতন্ত্রী নেতাদের মধ্যে প্রায় সকলেই সে যুদ্ধকে সমর্থন করেছিলেন। মুসোলিনি কিন্তু করলেন না, তিনি সে যুদ্ধের বিরোধিতাই করতে লাগলেন; কতকগুলো হিংসামূলক কার্যকলাপের অপরাধে তাঁকে কয়েকমাসের জন্য কারাদণ্ডও ভোগ করতে হল। নরমপন্থী সমাজতন্ত্রী নেতারা যুদ্ধকে সমর্থন করছিলেন বলে তিনি অতি তীব্র ভাষায় এঁদের আক্রমণ করলেন; তাঁরই চেষ্টার ফলে এঁরা সমাজতন্ত্রী দল থেকে বিতাড়িত হলেন। সমাজতন্ত্রীদের দৈনিক পত্রিকা ছিল মিলান শহর থেকে প্রকাশিত ‘আভাণ্টি’; তিনি এই পত্রিকার সম্পাদক হয়ে বসলেন; দিনের পর দিন ধরে শ্রমিকদের উপদেশ দিতে লাগলেন, হিংসার জবাব হিংসা দিয়েই দাও। এদের এইভাবে তিনি হিংসাবত্তি অবলম্বন করতে প্ররোচনা দিচ্ছেন; নরমপন্থী মার্ক্‌স্‌বাদী নেতারা এতে অত্যন্ত আপত্তি প্রকাশ করলেন।

 তার পর এল বিশ্বযুদ্ধ। কয়েকমাস পর্যন্ত মুসোলিনি যুদ্ধের বিরোধী হয়ে রইলেন, বলতে লাগলেন, নিরপেক্ষ হয়ে থাকাই ইতালির উচিত। তার পর একদিন, একটু হঠাতই বলতে হবে, তিনি মতামত পরিবর্তন করলেন, অন্তত সে মত প্রকাশ করবার ভাষাটা পালটে ফেললেন; ঘোষণা করলেন, ইতালির মিত্রপক্ষের দিকে যোগ দেওয়াই উচিত। সমাজতন্ত্র পত্রিকাটির সংশ্রব ছেড়ে দিয়ে তিনি নূতন একটি কাগজের সম্পাদনা শুরু করলেন; সে কাগজে এই নূতন নীতির কথাই প্রচার করা হত। সমাজতন্ত্রী দল থেকে তাঁর নাম কেটে দেওয়া হল। এর কিছুদিন পরে তিনি স্বেচ্ছায় একজন সাধারণ সৈনিক বলে নাম লেখালেন; ইতালির রণক্ষেত্রে যুদ্ধ করলেন, যুদ্ধে আহতও হলেন।

 যুদ্ধের পরে মুসোলিনি নিজেকে সমাজতন্ত্রী বলে পরিচয় দেওয়া বন্ধ করলেন। তাঁর তখন একটু বিপন্ন অবস্থা: তাঁর পুরোনো দল আর তাঁর উপরে প্রসন্ন নয়, শ্রমিক শ্রেণীদের উপরেও তাঁর কোনো প্রতিপত্তি নেই। শান্তিকামীদের এবং সমাজতন্ত্রবাদকে তিনি নিন্দা করতে লাগলেন, ওদিকে আবার তার সঙ্গে সঙ্গেই বুর্জোয়া রাষ্ট্রকেও গালাগাল দিতে লাগলেন। সকল প্রকার রাষ্ট্রকেই তিনি খারাপ বলে ঘোষণা করলেন, নিজেকে ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী’ বলে পরিচয় দিয়ে ‘অরাজকতন্ত্রের’ প্রশংসা করতে লাগলেন। এই হচ্ছে তিনি যা লিখতেন তার কথা। কাজে তিনি যা করলেন সে হচ্ছে: ১৯১৯ সনের মার্চ মাসে তিনি ফ্যাসিজ্‌মো বা ফ্যাসিজ্‌মের প্রতিষ্ঠা করলেন এবং বেকার সৈনিকদের তাঁর যোদ্ধা-দলে ভর্তি করে নিলেন। এই দলগুলির নীতি ছিল হিংসা ও বলপ্রয়োগ; সরকার এদের উপরে বড়ো একটা হস্তক্ষেপ করতেন না, অতএব এদের সাহস এবং অত্যাচার ক্রমেই বেড়ে চলল। অনেক সময়ে শহর অঞ্চলে শ্রমিকরা এদের সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করত এবং শহর থেকে এদের তাড়িয়ে দিত। কিন্তু সমাজতন্ত্রী নেতারা শ্রমিকদের এই লড়াই-করবার বুদ্ধিটাকে অনুচিত বলে প্রচার করলেন, তাদের যুক্তি দিলেন, ফ্যাসিস্ট্‌রা যে ত্রাসসৃষ্টি করছে, তোমরা শান্তভাবে এবং নিষ্ক্রিয় ধৈর্য সহকারে তাকে সহ্য করে যাও। এদের আশা ছিল, এই ভাবে চললেই ফ্যাসিস্ট্‌রা ক্রমে ক্লান্ত, অবসন্ন হয়ে পড়বে। কিন্তু তা মোটেই হল না; এবং ফ্যাসিস্টদেরই শক্তি দিন দিন বাড়তে লাগল, কারণ তারা দুইদিক থেকেই সাহায্য পাচ্ছিল—একদিকে দেশের ধনী ব্যক্তিরা তাদের টাকা যোগাচ্ছেন, অন্যদিকে সরকার তাদের কার্যকলাপে বাধা দিতে রাজি নন। ওদিকে জনসাধারণের মধ্যে এদের রুখবার বুদ্ধি যেটুকু বা ছিল তাও ক্রমে ক্রমে নষ্ট হয়ে গেল। শ্রমিকদের যা অস্ত্র, সেই ধর্মঘট দিয়েও ফ্যাসিস্ট্‌দের অত্যাচারের জবাব দেবার একটা চেষ্টা পর্যন্ত করা হল না।

 মুসোলিনির নেতৃত্বে পরিচালিত এই ফ্যাসিস্ট বাহিনী একই সঙ্গে দুটি পরস্পরবিরোধী বুলি আয়ত্ত করে নিল। সর্বপ্রথম কথা, এরা হল সমাজতন্ত্রবাদ আর কমিউনিজ্‌মের শত্রু; অতএব বিত্তশালী শ্রেণীরা এদের সমর্থন করতে লাগল। কিন্তু মুসোলিনি এককালে সমাজতন্ত্রী আন্দোলনকারী এবং বিপ্লবপন্থী ছিলেন; ধনিকতন্ত্র-বিরোধী বহু জনপ্রিয় বুলি তাঁর কণ্ঠস্থ—দরিদ্রতম শ্রেণীর লোকেরা অনেকেই সে বুলিগুলো শুনলে তৎক্ষণাৎ মুগ্ধ হয়ে যায়। আন্দোলন চালাবার বিদ্যায় খুব বড়ো ওস্তাদ হচ্ছে কমিউনিস্টরা, তাদের কাছ থেকে সে-বিদ্যার কারিকুরিও তিনি অনেকখানিই শিখে নিয়েছিলেন। অতএব ফ্যাসিজ্‌ম হয়ে উঠল নানাবিধ মতামতের একটা বিচিত্র সমন্বয়, তার অনেকরকম ব্যাখ্যা খাড়া করা চলে। মূলত এটা একটা ধনিকতন্ত্রী আন্দোলন; অথচ এমন বহু ধ্বনি এরা উচ্চারণ করত যা ধনিকতন্ত্রের পক্ষে একেবারে মারাত্মক। এমনি করে এর মধ্যে নানাবিধ লোক এসে একত্র হল। এর মেরুদণ্ড ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণীগুলো—বিশেষ করে বেকার নিম্নতর মধ্যবিত্ত শ্রেণী। বেকার এবং অপটু শ্রমিকের দল, যারা সংঘবদ্ধ নয়, শ্রমিক ইউনিয়ন-ভুক্ত নয়, ফ্যাসিজ্‌মের শক্তি বাড়াবার সঙ্গে সঙ্গে তারাও একে একে এসে এর মধ্যে ভিড়ে গেল। এর কারণ বোঝা শক্ত নয়—সাফল্য দেখিয়ে মানুষকে যত সহজে দলে টানা যায় এমন আর কিছুতেই হয় না। ফ্যাসিস্টরা জবরদস্তি করেই দোকানদারদের জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে রাখতে বাধ্য করল, ফলে দরিদ্র লোকদেরও প্রীতি তারা অর্জন করল। বহু ভাগ্যান্বেষীও প্রভাবতই ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে এসে জুটল। কিন্তু এত সব কাণ্ড সত্ত্বেও ফ্যাসিজ্‌ম্ একটা অল্পসংখ্যক লোকের আন্দোলনই হয়ে রইল।

 সমাজতন্ত্রী নেতারা সংশয় আর দ্বিধা নিয়ে রইলেন, নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি করতে লাগলেন, তাঁদের দলের মধ্যে ভাঙাভাঙি আর ভাগাভাগি চলতে লাগল; ওদিকে ফ্যাসিস্টদের শক্তি বেড়ে চলল। সরকারি সেনাবাহিনী যেটা ছিল তার ফ্যাসিজ্‌মের প্রতি খুব সদ্‌ভাব ছিল, বাহিনীর সেনাপতিদেরও মুসোলিনি নিজের দলে টেনে নিয়েছিলেন। এত রকমের সব বিভিন্ন প্রকৃতির এবং পরস্পরবিরোধী মানুষকে মুসোলিনি তার পক্ষে টেনে নিলেন এবং একত্র ধরে রাখলেন; তাঁর সে বাহিনীর মধ্যে যত দল ছিল প্রত্যেককেই বুঝিয়ে দিলেন বিশেষ করে তার ভালোর জনাই ফ্যাসিজ্‌মের সৃষ্টি হয়েছে—এটা তার পক্ষে একটা প্রকাণ্ড কৃতিত্বের নিদর্শন। ধনী ফ্যাসিস্ট জানত, মুসোলিনি হচ্ছেন তারই সম্পত্তির রক্ষাকর্তা; তিনি যে-সব ধনিকতন্ত্রবিরোধী বক্তৃতা দিয়ে এবং ধ্বনি উচ্চারণ করে বেড়াচ্ছেন সেগুলো শুধুই শূন্যগর্ভ কথা, জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করবার জন্য বলा। দরিদ্র ফ্যাসিস্ট বিশ্বাস করত, সেই ধনিকতন্ত্র-বিরোধী কথাগুলোই হচ্ছে ফ্যাসিজ্‌মের আসল তত্ত্ব; বাকিটা শুধু বাইরের ভড়ং, ধনীদের বোকা ভুলিয়ে রাখবার ব্যবস্থা। এই ভাবেই মুসোলিনি এদলকে ওদলের বিরুদ্ধে উস্‌কে দিতে চেষ্টা করলেন; একদিন তিনি ধনীদের পক্ষ টেনে কথা বলেন, পরদিন আবার বলেন দরিদ্রের পক্ষ টেনে। কিন্তু মূলত তিনি ছিলেন বিত্তশালী শ্রেণীদেরই প্রতিনিধি এবং রক্ষাকর্তা—এরাই তাঁকে টাকা যোগাচ্ছিল। এদের উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের এবং সমাজতন্ত্রবাদীদের সকল শক্তি চূর্ণ করে দেওয়া—দীর্ঘকাল ধরে তারা এই ধনীদের উচ্ছেদ করবে বলে ভয় দেখিয়ে এসেছে।

 অবশেষে ১৯২২ সনের অক্টোবর মাসে ফ্যাসিস্ট বাহিনী রোম শহরের দিকে অভিযান করল; তাদের চালিয়ে নিয়ে গেলেন সরকারি সেনাবাহিনীর সেনাপতিরা। প্রধানমন্ত্রী এতদিন ফ্যাসিসেট্‌দের কার্যকলাপ সহ্য করে এসেছেন, এবার তিনি সামরিক আইন জারি করে দিলেন। কিন্তু তখন আর তার সময় নেই; রাজা নিজেই তখন মুসোলিনির পক্ষে। তিনি (রাজা) সামরিক আইন জারির সে আদেশ নাচক করে দিলেন, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ পত্র গ্রহণ করলেন, এবং মুসোলিনিকেই প্রধানমন্ত্রী হবার এবং মন্ত্রিসভা গঠন করবার আমন্ত্রণ জানালেন। ১৯২২ সনের ৩০শে অক্টোবর তারিখে ফ্যাসিস্ট বাহিনী রোমে এসে পৌঁছল, সেই দিনই মিলান থেকে ট্রেনে করে মুসোলিনিও এসে পৌঁছলেন—প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসবার জন্য।

 ফ্যাসিজ্‌মের জয় হল, দেশে মুসোলিনির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হল। কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য কী ছিল, কীই বা ছিল তাঁর কর্মসূচী এবং নীতি? বড়ো বড়ো আন্দোলনগুলো প্রায় সর্বত্রই গড়ে ওঠে কোনো একটা স্পষ্ট এবং প্রত্যক্ষ আদর্শবাদকে আশ্রয় করে, সে আদর্শবাদের মূলে থাকে কতকগুলো স্থির নীতি; কতকগুলো নিশ্চিত উদ্দেশ্য এবং কর্মসূচীও তার থাকে। ফ্যাসিজ্‌মের ছিল একটা অদ্ভূত বিশেষত্ব—তার কোনো নির্দিষ্ট নীতি নেই, আদর্শবাদ নেই, তার পিছনে কোনো ন্যায়সঙ্গত যুক্তি বা চিন্তাধারা নেই—এক যদি সমাজতন্ত্রবাদ কমিউনিজম্ উদারপন্থা প্রভৃতির বিরোধিতা করাটাকেই একটা ভাবদর্শন বলে ধরা হয়, সে কথা স্বতন্ত্র। ১৯২০ সনে, মানে ফ্যাসিস্ট দলগুলি যখন প্রথম গড়া হল তার একবছর পরে, মুসোলিনি ফ্যাসিস্টদের সম্বন্ধে বলেছিলেন:

 “কোনো নির্দিষ্ট নীতির সঙ্গে এরা বাঁধা নেই; তাই এরা অবিশ্রাম গতিতে একটিমাত্র লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলতে পারে; যে লক্ষ্যটি হচ্ছে ইতালির প্রজাদের ভবিষ্যৎ কল্যাণ।”

 সেটাকে অবশ্যই বিশেষ একটা কোনো নীতি বলা চলে না; নিজের জাতের কল্যাণ সাধনের চেষ্টা তো প্রত্যেক ব্যক্তিই করতে রাজি থাকে। ১৯২২ সনে, রোম অভিযানের ঠিক এক মাস আগে মুসোলিনি বলেছিলেন, “আমাদের কর্মসূচী অতি সহজ: আমরা ইতালিকে শাসন করতে চাই”।

 সম্প্রতি ইতালির একটি এন্‌সাইক্লোপিডিয়াতে মুসোলিনি ফ্যাসিজ্‌মের উৎপত্তি সম্বন্ধে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন, তাতে কথাটাকে তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেছেন। বলেছেন, রোমের অভিযান যখন শুরু করেন তখন ভবিষ্যতে কী করবেন সে সম্বন্ধে কোনো নিশ্চিত পরিকল্পনাই তাঁর ছিল না। একদা তিনি সমাজতন্ত্রবাদের শিক্ষা পেয়েছিলেন, তার ফলে সেই রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে একটা কিছু করবার প্রেরণা তাঁর মনকে অভিভূত করে ফেলেছিল—তারই তাগিদে পড়ে তিনি সেই দুঃসাহসিক অভিযানে ব্রতী হয়েছিলেন।

 ফ্যাসিজ্‌ম্ এবং কমিউনিজ্‌ম্ পরস্পরের অত্যন্ত বিরোধী; তবু এদের কতকগুলো কার্যকলাপ ঠিক একই প্রকার, অথচ নীতি এবং আদর্শবাদের কথা যদি বল, সে দিক দিয়ে এরা পরস্পরের একেবারে বিপরীত। ফ্যাসিজ্‌মের মূলে কোনো নীতি নেই আমরা দেখেছি, একেবারে শূন্য থেকেই অন্যদিকে কমিউনিজ্‌ম্ বা মার্ক্‌স্‌বাদ হচ্ছে জটিল অর্থনীতিশাস্ত্রসমস্ত মতবাদ, এবং ইতিহাসের একটা ভাষাবিশেষ; তাকে আয়ত্ত করতে হলে আগে মনকে অত্যন্ত কঠোর শিক্ষায় শিক্ষিত করে নিতে হবে।

 ফ্যাসিজ্‌মের কোনো নীতি বা আদর্শ ছিল না, কিন্তু অত্যাচার এবং সন্ত্রাসবাদ চালাবার একটা বিশেষ কায়দা এর ছিল। আর ছিল অতীত সম্বন্ধে একটা বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি—তার থেকেই এর স্বরূপ খানিকটা বোঝা যায়। এর প্রতীক ছিল প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের একটা প্রতীক, রোমের সম্রাট এবং শাসনকর্তারা যখন পথে বার হতেন, তাঁদের আগে আগে এই প্রতীকটাকে বহন করে নিয়ে যাওয়া হত। জিনিসটা হচ্ছে এক আঁটি কাঠি, (এর নাম ছিল ফ্যাসেস্, তাই থেকেই ফ্যাসিজ্‌মো কথাটার উৎপত্তি), তার মাঝখানে একটা কুড়ুল গোঁজা। ফ্যাসিস্ট্‌দের সংগঠনটিও সেই প্রাচীন রোমের আদর্শে গড়া; এরা যে নামগুলো ব্যবহার করে তা পর্যন্ত সেই পুরোনো রোম থেকে নেওয়া হয়েছে। ফ্যাসিস্ট্‌দের নমস্কার-বিধির নাম ফ্যাসিস্টা; প্রাচীন রোমেও এই ভাবেই নমস্কার করা হত, হাতটাকে তুলে সামনে বাড়িয়ে দিয়ে। কাজেই দেখছ, ফ্যাসিস্টরা প্রেরণা সংগ্রহ করেছিল রোমের সাম্রাজ্য থেকে—এদের মনোভাবই ছিল সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব। এদের নীতিবাক্য ছিল: তর্ক কোরো না—শুধু আদেশ মেনে চলো। সে নীতি সেনাবাহিনীর পক্ষে হয়তো ভালো, কিন্তু গণতন্ত্রের সঙ্গে সেটা নিশ্চয়ই খাপ খায় না। এদের নেতা মুসোলিনির পদবী ছিল ইল্ ডুচে—বা ডিক্‌টেটর। এদের উর্দি ছিল একটা কালো শার্ট; তাই এদের নামই হয়ে গিয়েছিল কালো-শার্টের দল।

 ফ্যাসিস্ট্‌দের একমাত্র নির্দিষ্ট কর্মনীতি ছিল শক্তি অর্জন করা; মুসোলিনি প্রধানমন্ত্রী হবার ফলে সে উদ্দেশ্য তাদের সিদ্ধ হয়ে গেল। মুসোলিনি এবার তাঁর নিজের আসন দৃঢ় করে নেবার কাজে লেগে গেলেন—তাঁর বিরুদ্ধ দলদের বিচূর্ণ করে। দেশে অত্যাচার এবং ত্রাসসৃষ্টির একটা অদ্ভুত তাণ্ডব শুরু হল। অত্যাচার উৎপীড়নের কাহিনী ইতিহাসে অনেক পাওয়া যায়, কিন্তু সাধারণত লোকে একে একটা অপ্রিয় কর্তব্য বলেই জানে, অনুষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গেই এর ব্যাখ্যা বা সাফাইও দিতে চেষ্টা করে। ফ্যাসিস্ট্‌রা কিন্তু উৎপীড়ন সম্বন্ধে এরকম কোনো সংকোচ বা সাফাইয়ের প্রয়োজন বোধ করত না। তারা একে নীতি বলেই স্বীকার করে নিল, খোলাখুলি এর প্রশস্তি গাইতে লাগল; কেউ কোথাও তাদের বাধা দিচ্ছিল না তবুও উৎপীড়ন চালাতে লাগল। পার্লামেণ্টের যে-সব সভ্য এদের বিপক্ষে ছিলেন স্রেফ লাঠিপেটা করেই তাঁদের ঠাণ্ডা করে রাখা হল; গায়ের জোরেই এমন একটা নূতন আইন তৈরি করে নেওয়া হল যার ফলে দেশের শাসনতন্ত্রটাই বদলে গেল। এইভাবে খুব বেশির ভাগ ভোট মুসোলিনির পক্ষে নিয়ে আসবার ব্যবস্থা হল।

 ফ্যাসিস্টরাই তখন দেশ শাসন করছে, পুলিশ, রাষ্ট্র সমস্তই তাদের হাতে; তখনও যদি তারা লোকের উপরে বেআইনি মামলা চালাতে চায়, সেটা একটা আশ্চর্য ব্যাপার। অথচ ঠিক সেইটেই করল তারা; সামনে বাধাও তদের কিছুই ছিল না, কারণ সরকারি পুলিশ তাদের উপরে হস্তক্ষেপ করবে না। নরহত্যা, নির্যাতন, প্রহার, সম্পত্তি-নষ্ট করা সমানে চলতে লাগল। বিশেষ করে নির্যাতনের একটা নূতন কায়দা ফ্যাসিস্ট্‌রা খুব বেশি প্রয়োগ করত—তাদের বিপক্ষে যে কথা বলতে সাহস করত তাকেই ধরে একেবারে অনেকখানি ক্যাস্টর অয়েল খাইয়ে দিত।

 ১৯২৪ সনে গিয়াকোমো মাত্তেওতি নিহত হলেন; তাঁর হত্যার সংবাদে ইউরোপ স্তম্ভিত হয়ে গেল। মাত্তেওতি ছিলেন সমাজতন্ত্রীদলের একজন নেতৃস্থানীয় লোক, পার্লামেণ্টেরও সভ্য ছিলেন তিনি। দেশে অল্পদিন আগেই একটা নির্বাচন হয়ে গেছে; নির্বাচনের ব্যাপারে ফ্যাসিস্ট্‌রা যে-সব কায়দা খাটিয়েছিল, পার্লামেণ্টে বক্তৃতা দিতে গিয়ে মাত্তেওতি তার সমালোচনা করেছিলেন। এর কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁকে খুন করা হল। লোক-দেখানো ঠাট বজায় রাখবার খাতিরে হত্যাকারীদের একটা বিচারেরও ভড়ং করা হল, বিচারে তারা বস্তুত একেবারে বিনা সাজাতেই খালাস পেয়ে গেল। উদারপন্থী দলের একজন নরমপন্থী নেতা ছিলেন আমেণ্ডোলা; তাঁকে ফ্যাসিস্টরা এমন ঠ্যাঙানি দিল যে তিনি মরেই গেলেন। নিত্তি ছিলেন উদারপন্থী এবং দেশের একজন ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী; তিনি কোনোক্রমে ইতালি থেকে পালিয়ে বাঁচলেন, কিন্তু তাঁর বাড়িটি এরা ধ্বংস করে দিল। এই রকমের অত্যাচার দেশের সর্বত্র সারাক্ষণই চলছিল; যা বললাম এ হচ্ছে তার দু’চারটি নমুনামাত্র—সেই নমুনা দেখেই সমস্ত জগৎসুদ্ধ লোক চঞ্চল হয়ে উঠল। আর আইনের বলে যেখানে যাকে দমন করা সম্ভব তার ত্রুটি তো হচ্ছিলই না; এই উৎপীড়নটা ছিল তার বাইরে, ফাউ-স্বরূপ। অথচ এটা শুধু একটা উত্তেজিত জনতার বিশৃঙ্খল অত্যাচার নয়; এ রীতিমতো সুসংহত পদ্ধতিতে চালানো অত্যাচার, বেশ ভেবেচিন্তেই সমস্ত বিরুদ্ধ পক্ষের প্রতি এর প্রয়োগ করা হচ্ছিল—সে বিরুদ্ধপক্ষ মানেও শুধু সমাজতন্ত্রবাদী বা কমিউনিস্ট নয়, শান্তিপ্রিয় এবং অত্যন্ত নরমপন্থী উদারপন্থীরাও এর হাত থেকে রেহাই পেল না। মুসোলিনির আদেশই ছিল, যারা তাঁর বিরোধী তাদের পক্ষে বেচে থাকাটাকেই কঠিন বা ‘অসম্ভব’ করে তুলতে হবে। সে আদেশ ফ্যাসিস্টরা পরম নিষ্ঠা সহকারে পালন করল। অন্য কোনো দল, অনা কোনো সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান দেশে বেঁচে থাকতে পারবে না। সব কিছুই হবে ফ্যাসিস্ট্‌পন্থী। আর সরকারি চাকরিও সমস্তই যাবে ফ্যাসিস্টদের হাতে।

 মুসোলিনি হলেন ইতালির সর্বশক্তিমান ডিক্‌টেটর। কেবল প্রধানমন্ত্রীই হলেন না তিনি—তিনিই বৈদেশিক ব্যাপারের মন্ত্রী, আভ্যন্তরীণ শাসন, উপনিবেশ, যুদ্ধ, বাণিজ্য, বিমান এবং শ্রমিক মন্ত্রী। কার্যত তিনিই তখন সমগ্র মন্ত্রীসভা হয়ে বসলেন। রাজা বেচারী কোন্ পিছনে অন্তরালে পড়ে রইলেন, তাঁর নামও আর লোকের কানে পৌঁছয় না। পার্লামেণ্টও ক্রমে ঠেলা খেয়ে একপাশে সরে গেল; নিজের একটা ম্লান ছায়ামাত্রে পরিণত হল। ইতালির রঙ্গমঞ্চে তখন ফ্যাসিস্ট্ গ্র্যাণ্ড কাউন্সিলই সবখানি জায়গা জুড়ে বসেছে; আর সেই ফ্যাসিস্ট গ্র্যাণ্ড কাউন্সিল চলছে মুসোলিনির ইঙ্গিতে।

 বৈদেশিক ব্যাপার সম্বন্ধে মুসোলিনি প্রথম দিকেই যে-সব বক্তৃতা দিতে লাগলেন, তা শুনে ইউরোপে প্রচণ্ড বিস্ময় এবং আতঙ্কের সৃষ্টি হল। আশ্চর্য বক্তৃতা সে—আস্ফালনে, শাসানিতে পরিপূর্ণ; রাষ্ট্রনীতিবিদ্‌রা যেরকম বিচক্ষণ উক্তি সাধারণত করে থাকেন তার সঙ্গে এর কোনোই মিল নেই। শুনে মনে হল তিনি সারাক্ষণই একটা যুদ্ধ বাধাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে রয়েছেন। ইতালির ভাগ্যে আছে সে একদিন সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হবে, তারই কথা তিনি বলতে লাগলেন; বলতে লাগলেন, ইতালির এত এরোপ্লেন হবে যে তাদের ছায়ায় আকাশ অন্ধকার হয়ে যাবে। প্রতিবেশী রাজ্য ফ্রান্সকে তো তিনি কয়েকবার খোলাখুলিই শাসানি শুনিয়ে দিলেন। ফ্রান্সের শক্তি অবশ্যই ইতালির চেয়ে অনেক বেশি ছিল। কিন্তু তখন কেউ যুদ্ধ করতে চাইছিল না। অতএব মুসোলিনি যত গরম গরম কথা বললেন অন্যরা সেগুলো সহ্য করেই চললেন। ইতালি লীগ অব নেশন্‌সের সভ্য, অথচ বিশেষ করে সেই লীগকেই লক্ষ্য করে মুসোলিনি তাঁর ব্যঙ্গ এবং অবজ্ঞার বাণ বর্ষণ করতে লাগলেন, একবার তো অত্যন্ত উগ্র ভাষাতেই তার কথা অগ্রাহ্য করে বসলেন। তখনও লীগ এবং অন্যান্য দেশরা চুপ করে রইল।

 ইতালির বাইরের রূপে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে; দেশের সর্বত্র এমন একটা শৃঙ্খলা এবং সময়ানুবর্তিতার ভাব বিরাজ করছে যে সে দেখে বিদেশী ভ্রমণকারীর মনে ইতালি সম্বন্ধে খুবই ভালো ধারণা জন্মে যায়। রোম একদা সাম্রাজ্যের অধীশ্বরী ছিল, তাকে আবার সুন্দর করে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে; দেশের উন্নতি সাধনের বহু দূরপ্রসারী পরিকল্পনা কার্যে পরিণত করা হচ্ছে। আবার নূতন করে একটি রোমান সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্নই যেন মুসোলিনির চোখে লেগেছে বলে মনে হয়।

 পোপের সঙ্গে ইতালি সরকারের দীর্ঘকাল ধরে কলহ চলে আসছিল; ১৯২৯ সনে মুসোলিনি এবং পোপের প্রতিনিধির মধ্যে একটি চুক্তি হয়ে সে কলহের অবসান হয়ে গেছে। ১৮৭১ সনে রোমকে ইতালির রাজধানী বলে ঘোষণা করা হল; সেই থেকেই চিরদিন পোপরা সে ঘোষণা মেনে নিতে বা রোমে তাঁদের যে সার্বভৌম ক্ষমতা আছে তার দাবি ছেড়ে দিতে, অস্বীকার করে এসেছেন। রোমের মধ্যেই ভ্যাটিকানে পোপদের প্রকাণ্ড প্রাসাদ, সেণ্ট পিটার্সও তার অন্তর্গত। অতএব নির্বাচিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই প্রত্যেক পোপ সোজা সেই প্রাসাদে গিয়ে প্রবেশ করতেন, জীবনে আর তার বাইরে আসতেন না, ইতালি রাজ্যের মাটিতে পদার্পণ করতেন না। নিজেদের ইচ্ছাতেই এঁরা এইভাবে বন্দী হয়ে থাকতেন। ১৯২১ সনের চুক্তিতে রোমের এই ক্ষুদ্র ভ্যাটিকান অঞ্চলটিকে একটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাজ্য বলে স্বীকার করা হল। পোপ এই রাষ্ট্রের সর্বশক্তিমান অধীশ্বর; এর প্রজাদের মোট সংখ্যা প্রায় পাঁচশত। এই রাজ্যের নিজস্ব আদালত আছে, মুদ্রা আছে, ডাক-টিকিট আছে, সরকারি কর্মচারী বাহিনী আছে, এবং পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা ব্যয়বহুল এর একটি অতিক্ষুদ্র রেলওয়ে আছে। পোপ এখন আর স্বকৃত বন্দীদশায় কালযাপন করেন না; মাঝেমাঝে ভ্যাটিকান থেকে বাইরেও বেরিয়ে আসেন। পোপের সঙ্গে এই সন্ধিটি করেছেন বলে ক্যাথলিকরা মুসোলিনির প্রতি প্রসন্ন। ফ্যাসিস্টরা যে বেআইনি উৎপীড়ন চালাচ্ছিল বছরখানিক তার প্রচণ্ডতা খুবেই বেশি ছিল; তার পরও প্রায় ১৯২৬ সন পর্যন্ত সেটা কিছু কিছু চলেছে। ১৯২৬ সনে রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বীদের শাসন করবার জন্য কতকগুলো বিশেষ ধরনের আইন তৈরি করা হল, তার ফলে রাষ্ট্রের হাতে একেবারে প্রচণ্ড ক্ষমতা এসে পড়ল—বেআইনি কাণ্ডকারখানা চালাবার আর প্রয়োজন থাকল না। ভারতবর্ষে আমরা অসংখ্য অর্ডিন্যান্স এবং সেই অর্ডিন্যান্সের বলে নির্মিত আইন দেখেছি; এই আইনগুলোও ছিল কতকটা তারই অনুরূপ। এখনও এই-সব ‘বিশেষ ধরনের আইনে’র বলে বহুসংখ্যক লোককে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, জেলে পোরা হচ্ছে, নির্বাসিত করা হচ্ছে। সরকারি বিবরণী থেকে জানা যায়, ১৯২৬ সনের নভেম্বর থেকে ১৯৩২ সনের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত মোট ১০,০৪৪ জন লোককে বিচারের জন্য স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের সামনে হাজির করা হয়েছে। পঞ্জা, ভেণ্টেলিনি এবং ট্রেমিতি বলে তিনটি দ্বীপকে বন্দীনিবাসে পরিণত করা হয়েছে, নির্বাসিত বন্দীদের সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শোনা যায় নাকি এখানে তাদের থাকবার ব্যবস্থাও খুব খারাপ।

 এখনও এত লোককে ক্রমাগত গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, এই থেকেই বেশ বোঝা যায়, এত পীড়ন-উৎপীড়ন সত্ত্বেও দেশে ফ্যাসিস্ট-বিরোধী একটা গোপন এবং বিপ্লবী শক্তি বেঁচে রয়েছে। ব্যয়ের বোঝা দিন দিন বেড়ে চলেছে, দেশের আর্থিক অবস্থাও আবার খুবই খারাপ হয়ে পড়েছে।