বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ইতিহাসের শিক্ষা

উইকিসংকলন থেকে

ইতিহাসের শিক্ষা

৫ই জানুয়ারি, ১৯৩১

 তোমার কাছে চিঠি লিখতে বসে কেবলই ভাবছি, কীভাবে শুরু করব। অতীতের কথা ভাবতে গেলেই যেন অনেকগুলো ছবি একসঙ্গে চোখের উপর এলোমেলো হয়ে ভেসে ওঠে। কোনোটা আবছায়া অস্পষ্ট ছবির মতো দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায়। যে ঘটনাগুলোর উপর আমার পক্ষপাত আছে, সেগুলো অধিকতর স্পষ্ট ছবির মতো প্রতিভাত হয়। পুরাতন দিনের ঘটনাবলীর সঙ্গে আমি আজকালকার দিনের তুলনা করি; চেষ্টা করি ইতিহাসের শিক্ষা পেয়ে বর্তমানের পথে যাতে ঠিকমতো চলতে-ফিরতে পারি। কিন্তু দেশে, এলোমেলো মন একেবারে কাটা-ছেঁড়া অসম্পূর্ণ নানাবিধ জটিল চিন্তায় ঠাসা; সে যেন এক চিত্রপ্রদর্শনী, যেখানে ছবিগুলো এবড়োখেবড়ো বিশৃঙ্খলায় সাজানো। দোষটা সব সময় যে মনের তা নয়, কারণ মন বহুবিধ ঘটনাসমবায়ের মধ্যেও তো অনেক সময় সামঞ্জস্য আর সমন্বয় খুঁজে বার করে। আসল কথা হচ্ছে, ঘটনাগুলোই অধিকাংশ সময় এত অদ্ভূত ও বিচিত্র যে তাদের পারম্পর্যের নিয়মে সুনিয়ন্ত্রিত করে দেখা খুব কঠিন।

 লিখেছি তোমায় যে, ইতিহাসের ধারা অনুধাবন করলে আমরা দেখি, পৃথিবী ধীরে ধীরে নিশ্চিত উন্নতির পথে জয়যাত্রা করেছে; প্রাণী-সমবায়ের ক্রমবিবর্তনের ফলে কেমন করে সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মানুষ এসে স্বীয় বুদ্ধিবলে অপরদের উপর প্রভুত্ব বিস্তার করল, সে কথাও তোমাকে বলেছি। বর্বরতা অতিক্রম করে সভ্যতায় পরিণতি—এই হচ্ছে ইতিহাসের বিষয়বস্তু। এই সভ্যতার পিছনে রয়েছে কর্মের ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে সৌভ্রাত্র্য—তাই সমবেত শক্তির প্রচেষ্টাই হল আমাদের সভ্যতার ভিতরকার কথা, আমাদের চরম আদর্শ। মাঝে মাঝে মানুষ যখন এই আদর্শের কথা বিস্মৃত হয়েছে তখন তার অগ্রসরণে এসেছে অনেক বাধাবিপত্তি—ইতিহাসে এইসব ব্যর্থতার কাহিনীগুলো যেন মরুভূমির মতো ঊষর! আজকালকার পৃথিবীতে সমবেত কর্মপ্রচেষ্টার একান্ত অভাব, স্বার্থপরতা এবং হৃদয়হীনতা যেন চারদিক ছেয়ে ফেলেছে। আমরা যদি আমাদের জ্ঞানহীনতা এবং মূঢ়তা-বশত মানবসভ্যতার জয়যাত্রার পথ রুদ্ধ করি তবে সেটা কি ভালো হবে? প্রাচীনযুগের সভ্যতার উৎকর্ষ বিচার করতে গিয়ে মাঝে মাঝে আমাদের সন্দেহ হয় যে, আমরা হয়তো পিছু হটছি। আমাদের নিজেদের দেশেরই গৌরবময় অতীতের সঙ্গে বর্তমানের অকিৎিকরতার তুলনা করলেই বুঝতে পারবে আমি ঠিক বলছি কি না। কেবল আমাদের দেশেই নয়, মিশর, চীন এবং গ্রীস দেশের প্রাচীন ঐতিহ্যও বর্তমানের তুলনায় বিশেষ গৌরবময় ছিল। কিন্তু তাই বলে আমাদের হতাশ হয়ে পড়লে চলবে না; মনে রাখতে হবে যে, বিপুলা পৃথ্বীর কাছে একটা কোনো জাতি বা দেশের উত্থানপতনে এমন কিছু আসে যায় না।

 আধুনিক সভ্যতা এবং আধুনিক বিজ্ঞান নিয়ে অনেকে অর্থহীন গর্ব অনুভব করেন। প্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিকেরা অত্যদ্ভূত অনেক কিছু সম্ভব করেছেন এবং সেজন্যে তাঁরা আমাদের সম্মানের পাত্র—তবে বড়াই করতে যাবার আগে এ কথাটাও একবার ভেবে দেখা ভালো যে, অনেক ক্ষেত্রে মানষের সভ্যতা পশুদের চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে আছে। অনেকের কাছে হয়তো আমার এই কথাটা নির্বোধের উক্তি মনে হবে, কিন্তু তারা জানে না। তুমি মেটারলিঙ্কের লেখা মৌমাছি, উইপোকা ইত্যাদির সমাজসংগঠনের কথা পড়ে নিশ্চয় বিস্মিত হয়েছিলে, নয় কি? প্রাণীজগতে আমরা এদের তুচ্ছ এবং নগণ্য মনে করি, তবু এদের একতা, এবং ব্যষ্টিকে সমষ্টির কাছে উৎসর্গ করা দেখে মানুষের সমাজ অনেক কিছু শিখতে পারে। বহুর জন্যে উইপোকার আত্মাহুতির কথা যেদিন শুনেছি সেদিন থেকে তাকে যেন ভালোবেসে ফেলেছি। সমাজের জন্যে ত্যাগস্বীকার এবং সমবেত প্রচেষ্টা যদি সভ্যতার নিদর্শন হয় তবে পিঁপড়েদের সভ্যতা আমাদের চেয়ে অনেক গুণে ভালো—কী বলো?

 আমাদের একখানি প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থে একটি শ্লোক আছে যার অনুবাদের সারমর্ম এরূপ: ‘পরিবারের জন্য ব্যক্তিকে, সমাজের জন্য পরিবারকে, দেশের জন্য সমাজকে এবং আত্মার জন্য সমগ্র জগৎকে বর্জন করবে।’ আত্মা যে কী বস্তু তা আমাদের মধ্যে অল্প লোকেই জানে বা বলতে পারে এবং আমাদের প্রত্যেকেই একে ভিন্ন ভিন্ন রূপে ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু এই সংস্কৃত শ্লোক থেকে আমরা পরস্পর সহযোগিতা ও বৃহত্তর কল্যাণের জন্য আত্মত্যাগের শিক্ষাই লাভ করছি। আমরা ভারতবাসীরা অনেকদিন আগেই প্রকৃত মহত্ত্বের এই প্রকৃষ্ট পন্থার কথা ভুলে গিয়েছিলাম, তাই আমাদের পতন হয়েছে। কিন্তু পুনরায় যেন এর কিছুটা দৃষ্টিগোচরে আসছে এবং সারা দেশে চঞ্চলতার সাড়া জেগে উঠছে। স্ত্রী-পুরুষ, বালক-বালিকার দল নিজ নিজ দুঃখকষ্টের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে স্মিতহাস্যে দেশের কাজে অগ্রসর হচ্ছে। কী চমৎকার দৃশ্য! তাদের স্মিতহাস্য ও আনন্দের একটা সংগত কারণ আছে, যেহেতু একটা মহৎ কার্যে যোগদান করার আনন্দের তারা অধিকারী; এবং যারা ভাগ্যবান তারাই শুধু আত্মত্যাগের আনন্দ লাভ করতে সক্ষম। আজ আমরা ভারতকে স্বাধীন করতে চেষ্টা করছি; এটাও একটা বড়ো কাজ। কিন্তু সার্বভৌম মানবতার আদর্শ এর চেয়েও বড়ো। এবং যেহেতু আমরা উপলব্ধি করি যে আমাদের সংগ্রাম হল দুঃখ-দারিদ্রের অবসানের জন্য বিশ্বমানবের বিরাট সংগ্রামের অংশবিশেষ মাত্র, তাই আমরা এই ভেবে আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারি যে, দুনিয়ার অগ্রগতিতে আমরাও কিঞ্চিৎ সাহায্য করছি।

 ইতিমধ্যে তুমি থাকবে আনন্দভবনে, এবং তোমার মা থাকবে মালাক্কা বন্দীনিবাসে, আর আমি এই নাইনি জেলে; এবং কেউ কারও দর্শন পাব না—নয় কি? কিন্তু একবার ভাবো তো সে দিনটির কথা, যেদিন আমাদের তিনজনের আবার মিলন হবে। আমি সেই দিনটির প্রতীক্ষা করে থাকব, এবং এই কল্পনাই আমার মনকে হাল্কা আর উৎফুল্ল করে তুলবে।