বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ইরাক: বিমান থেকে বোমাবর্ষণের মাহাত্ম্য

উইকিসংকলন থেকে

১৬৯

ইরাক: বিমান থেকে বোমাবর্ষণের মাহাত্ম্য

৭ই জুন, ১৯৩৩

 আরব অঞ্চলের আরএকটি দেশের কথা বলতে বাকি আছে। এই দেশটি হচ্ছে ইরাক বা মেসোপটেমিয়া। অতি উর্বর এবং ধনেজনে সমৃদ্ধ দেশ এটা—এর এক পাশে টাইগ্রিস অন্য পাশে ইউফ্রেটিস নদী একে ঘিরে রেখেছে। শুধু তাই নয়, এ হচ্চে প্রাচীন রূপকথার দেশ; বাগদাদের হারুন-অল-রশিদের, আরব্য উপন্যাসের দেশ। এর একদিকে পারশ্য আরেকদিকে আরবের মরুভূমি; দক্ষিণে রয়েছে এর প্রধান বন্দর বসরা, পারশ্য উপসাগর থেকে নদী বয়ে খানিক দূর উঠে এসে সে বন্দরে পৌঁছতে হয়; উত্তরে এর সীমা তুরস্কের গায়ে গিয়ে ঠেকেছে। ইরাক আর তুরস্কের সীমান্ত মিশেছে যেখানে তার নাম কুর্দিস্তান, কুর্দ জাতি বাস করে সেখানে। এখন এই কুর্দদের বেশির ভাগই বাস করছে তুরস্কের এলাকার মধ্যে; তুর্কিদের বিরুদ্ধে এরা যে স্বাধীনতা-সংগ্রাম চালাচ্ছে তার কথা তোমাকে বলেছি। কিন্তু ইরাকের মধ্যেও বহু কুর্দ আছে, সেখানে এরা একটি বেশ বড়ো সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বলে গণ্য। মোসুল নিয়ে তুরস্কের আর ইংলণ্ডের মধ্যে বহুকাল ধরে ঝগড়া চলেছে; এখন সে মোসুল রয়েছে ইরাকের এই উত্তর-কুর্দি অঞ্চলের অন্তর্গত হয়ে। তার মানে সেটা এখন ব্রিটেনের অধীন। আসিরীয়দের প্রাচীন নগরী ছিল নিনেভে, মোসুলের কাছেই তার ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়।

 লীগ অব নেশন্‌সের হাত থেকে ইংলণ্ড যে দেশ-কটির উপরে খবরদারি করবার ম্যান্‌ডেট্‌ পেয়েছিল, ইরাক তাদের মধ্যে একটি। লীগের ভাষায় ধর্মজ্ঞানের অভাব নেই; সে ভাষার ‘ম্যান্‌ডেট্’ কথাটার অর্থ হচ্ছে, লীগের তরফ থেকে ন্যস্ত একটা সভ্যতা প্রচারের পবিত্র কর্তব্য-ভার। কথাটার মধ্যেকার ইঙ্গিত হচ্ছে এই: যে অঞ্চলটির উপরে ম্যান্‌ডেট জারি করা হল তার অধিবাসীরা তেমন সভ্য বা উন্নত নয়, নিজেদের ভালো-মন্দ বুঝে চলবার যোগাতাও তাদের নেই; অতএব বড়ো শক্তিদের কারও উপরে ভার দেওয়া হচ্ছে তাঁরা একে হাতে ধরে সেইভাবে চলতে সাহায্য করবেন। এ যেন বাঘের উপরে ভার দেওয়া হল, গরু বা হরিণের এই পালটি, এর রক্ষণাবেক্ষণ তুমিই করো। এই ম্যান্‌ডেট জারি করা হচ্ছে উক্ত অ-সভ্য দেশের প্রজাদেরই প্রার্থনাক্রমে; এইরূপ একটা কথাও ধরে নেওয়া হত। মহাযুদ্ধের ফলে পশ্চিম এশিয়ার যে দেশগুলো তুর্কির আসন থেকে মুক্তি পেয়েছিল, তাদের ম্যান্‌ডেট্ গিয়ে জুটল ব্রিটেন আর ফ্রান্সের কপালে। এঁরা দুপক্ষই ঘোষণা করলেন, এঁদের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে “জনগণের পূর্ণ ও সুনিশ্চিত মুক্তি এবং দেশীয় প্রজাবৃন্দের স্বাধীন ইচ্ছা ও সমর্থন হইতে প্রাপ্ত শক্তির ভিত্তিতে গঠিত শাসনতন্ত্র ও সরকার প্রতিষ্ঠা।” এই মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের কী কী ব্যবস্থা গত বারো বছরে করা হয়েছে, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, এবং ট্রান্স-জর্ডনে তার কিছু কিছু নমুনা আমরা দেখেছি। বার বার বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে সেখানে, প্রজারা অসহযোগ করেছে, বয়কট করেছে। তখন প্রজাদের ‘স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্মপ্রেরণাকে’ উৎসাহ দেবার উদ্দেশ্যেই তাদের উপর বেপরোয়া গুলি চালানো হয়েছে, তাদের নেতাদের বন্দী এবং নির্বাসিত করা হয়েছে, তাদের অসংখ্য শহর এবং গ্রাম ভেঙে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে, অনেক সময়ে সামরিক আইনও জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে অবশ্য আশ্চর্য হবার কিছুই নেই। ইতিহাসের একেবারে প্রথম যুগ থেকেই সাম্রাজ্যবাদীরা উৎপীড়ন ধ্বংস এবং ত্রাসসৃষ্টির লীলা দেখিয়ে আসছে। আধুনিক কালে যে নূতন ধরনের সাম্রাজ্যবাদ দেখা দিয়েছে তার অভিনবত্ব শুধু একটি ব্যাপারে; ত্রাসসৃষ্টি এবং শোষণ সে ঠিকই করে, কিন্তু সে কাজটাকে আবৃত করে রাখতে চায় বড়ো বড়ো কথার আড়াল দিয়ে, ‘ন্যস্ত কর্তব্যভার’, ‘জনসাধারণের কল্যাণ সাধন’, ‘অনুন্নত জাতির মানুষদের স্বায়ত্তশাসনের বিদ্যায় শিক্ষিত করে তোলা’ ইত্যাদি গালভরা বুলি আউড়ে। তারা গুলি চালায়, মানুষ মারে, ধ্বংস করে, তবে সেটা শুদ্ধ যে-লোকদের গুলি করে মারা হচ্ছে তাদেরই ভালোর জন্য। কে জানে, হয়তো এই ভণ্ডামি সভ্যতার প্রগতিরই একটা লক্ষণ, কারণ ভণ্ডামিও মহত্ত্বের অর্চনা; এর দ্বারা প্রমাণ হয়, সত্য কথাটা অপ্রিয়, তাই তাকে এইসব সান্ত্বনাবাক্য এবং মন-ভোলানো কথা দিয়ে আবৃত করে দেওয়া হচ্ছে, যাতে এর স্বরূপটা প্রকাশ না পায়। কিন্তু তবুও কেমন যেন মনে হয়, এই ধর্মধ্বজী ভণ্ডামি, এর চেয়ে নির্মম সত্যকথাও শতগুণে ভালো ছিল।

 এবারে দেখা যাক, দেশবাসীদের কামনাকে কতখানি পূরণ করা হয়েছে ইরাকে, ব্রিটিশের ম্যান্‌ডেটে থেকে এই দেশটি স্বাধীনতার পথে কত পা এগিয়ে গেল। বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ইংরেজরা ইরাকে—তখন তারা একে বলত মেসোপটেমিয়া—ঘাঁটি স্থাপন করেছিল, এইখান থেকেই তারা তুর্কির সঙ্গে যুদ্ধ চালাত। ব্রিটিশ এবং ভারতীয় সৈন্য দিয়ে দেশটাকে প্লাবিত করে ফেলল তারা। ১৯১৬ সনের এপ্রিল মাসে তারা একটা বড়ো রকমের মার খেল; কুত-আল-আমারাতে বৃহৎ একটি ব্রিটিশ বাহিনী তুর্কিদের হাতে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হল, এই বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন জেনারেল টাউনসেণ্ড। এই মেসোপটেমিয়ার অভিযানে আগাগোড়াই ভয়ংকর অপচয় এবং অব্যবস্থা দেখা গেল। এর মূলে প্রধানত ছিল ভারত সরকারের ত্রুটি; সুতরাং অক্ষমতা এবং মূর্খতার জন্য অনেক কটূক্তিই তাঁদের সইতে হল। কিন্তু সে যাই হোক, ব্রিটেনের হাতে ছিল অফুরন্ত যুদ্ধসম্ভার, শেষ পর্যন্ত তারই জিত হল। তুর্কিদের তারা উত্তরে হটিয়ে দিল, বাগদাদ দখল করল, শেষপর্যন্ত প্রায় মসুল পর্যন্তই গিয়ে পৌঁছল। যুদ্ধ যখন শেষ হল তখন ইরাকের গোটা দেশটাই ব্রিটিশ সেনার দখলে এসে গেছে।

 ইরাকের উপরে খবরদারি করবার জন্য ব্রিটেনকে ম্যান্‌ডেট্ দেওয়া হল; ১৯২০ সনের গোড়ার দিকেই এর প্রথম ফল দেখা দিল। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দেশে তীব্র প্রতিবাদ উঠল; প্রতিবাদ থেকে অবিলম্বেই শুরু হল দাঙ্গা-হাঙ্গামা, দাঙ্গা-হাঙ্গামা আবার পরিণত হল বিদ্রোহে—সে বিদ্রোহ সমস্ত দেশময় ছড়িয়ে পড়ল। ১৯২০ সনের এই প্রথম ভাগটাতে মিশর তুরস্ক সিরিয়া, প্যালেস্টাইন ইরাক এবং পারশ্য সর্বত্রই একসঙ্গে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিল, এটা কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার। ভারতবর্ষেও ঠিক এই সময়টাতেই অসহযোগ আন্দোলনের আয়োজন চলছিল। ইরাকের বিদ্রোহকে শেষ পর্যন্ত দমন করা হল, প্রধানত ভারতবর্ষ থেকে সৈন্য নিয়ে তাদেরই দ্বারা। বহুকাল থেকেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাজ হয়ে রয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের প্রয়োজনে যেখানে যেটকু নোংরা কাজ আছে তাই করে করে বেড়ানো। এই জন্যই মধ্য-প্রাচ্য এবং অন্যান্য দেশে আমাদের দেশটির প্রতি অশ্রদ্ধার অন্ত নেই।

 ইরাকের বিদ্রোহ ব্রিটিশরা শান্ত করল, কিছুটা বলপ্রয়োগ করে, কিছুটা বা ভবিষ্যতে স্বাধীনতা দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। এবার তারা কয়েকজন আরব মন্ত্রী নিয়ে একটা অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠা করল। কিন্তু প্রত্যেক মন্ত্রীরই পিছনে রইল একজন করে ব্রিটিশ উপদেষ্টা; প্রকৃত ক্ষমতা কাজেই থাকল এদেরই হাতে। কিন্তু এই পোষমানা মনোনীত মন্ত্রীরাও আবার এমন উগ্র ও অবাধ্য হয়ে উঠলেন যে এদেরও ব্রিটিশ কর্তারা সইতে পারলেন না। ব্রিটিশদের মতলব ছিল, ইরাক সম্পূর্ণরূপেই তাদের আজ্ঞাবহ হবে। মন্ত্রীরা কেউ কেউ এই চক্রান্তের সহায়তা করতে অস্বীকার করলেন। অতএব ১৯২১ সনের এপ্রিল মাসে ব্রিটিশরা মন্ত্রীদের মধ্যে প্রধান ব্যক্তিটিকে গ্রেপ্তার করে নির্বাসনে পাঠাল। এঁর নাম সৈয়দ তালিব শাহ্, মন্ত্রীদের মধ্যে ইনিই ছিলেন সর্বাপেক্ষা কর্মক্ষম ব্যক্তি। স্বাধীনতার জন্য দেশটিকে প্রস্তুত করবার পথে ব্রিটেন এইভাবে আরেক পা এগিয়ে গেল। ১৯২১ সনের গ্রীষ্মকালে তারা হেজাজের রাজা হুসেনের ছেলে ফয়জলকে ইরাকে এনে হাজির করল; ইরাকবাসীদের জানিয়ে দিল, একে চিনে নাও, ইনিই ভবিষ্যতে তোমাদের রাজা হবেন। তোমার হয়তো মনে আছে, ফয়জল সিরিয়াতে রাজা হতে গিয়েছিলেন, কিন্তু ফরাসিদের আক্রমণে সে রাজত্বের ইতি হয়ে গেল। অতএব তিনি তখন বেকার বসে আছেন। ব্রিটিশের তিনি বিশ্বাসী বন্ধু; বিশ্ব-যুদ্ধের সময়ে তুরস্কের বিরুদ্ধে আরবে যে বিদ্রোহ হয় তাতেও তাঁর অনেকখানি হাত ছিল। অতএব ইরাকী মন্ত্রীদের এ পর্যন্ত যা ভাবগতিক দেখা গেছে, তাদের তুলনায় এঁকে দিয়েই ব্রিটিশের মতলব সহজে হাসিল হবে, এইরকম একটা আশা ব্রিটেন স্বভাবতই করছিল। দেশের ‘গণ্যমান্য ব্যক্তিরা’, মানে ধনী মধ্যবিত্ত শ্রেণী এবং অন্যান্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা, ফয়জলকে রাজা বলে মেনে নিতে রাজি হলেন; কিন্তু একটি শর্তে—দেশের শাসন-ব্যবস্থাটা হবে নিয়মতান্ত্রিক, তার মধ্যে একটি গণতন্ত্রী পার্লামেণ্ট থাকতে হবে। মেনে না নিয়ে অবশ্য গত্যন্তরও তাঁদের ছিল না। তাঁদের ইচ্ছা ছিল একটি সত্যকার পার্লামেণ্ট তৈরি হোক; যখন দেখলেন তাঁরা চান বা না চান, ফয়জল এবারে রাজা হচ্ছেনই, তখন অগত্যা এই পার্লামেণ্ট প্রতিষ্ঠার শর্তটা তাঁরা আদায় করে নিলেন—দেশের জনসাধারণের মতামত বিশেষ যাচাই করা হল না। এই ভাবে, ১৯২১ সনের আগস্ট মাসে, ফয়জল ইরাকের রাজা হয়ে বসলেন।

 কিন্তু আসল সমস্যার এতে মোটেই সমাধান হল না। ইরাকের প্রজারা ছিল ব্রিটিশ ম্যান্‌ডেটের অত্যন্ত বিরোধী; তারা চাইছিল সম্পূর্ণ স্বাধীনতা, তার পর তারা আরব অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে একত্র হয়ে যাবে এই তাদের ইচ্ছা। আন্দোলন এবং বিক্ষোভ প্রকাশ চলতে লাগল; এর ঠিক এক বছর পরে, ১৯২২ সনের আগস্ট মাসে, অবস্থা একেবারে চরমে উঠল। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তখন ইরাকিদের আরও একটুখানি স্বাধীনতার পড়া শিখিয়ে দিলেন। ইরাকে ব্রিটিশ হাই কমিশনার ছিলেন সার্ পার্সি কক্স্‌। তিনি রাজার (রাজা তখন,অসুস্থ), মন্ত্রিসভার এবং ইরাককে একটা কাউন্সিল গোছের ব্যাপার বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার হাত থেকে সমস্ত ক্ষমতা সরিয়ে নিয়ে শাসন-ব্যাপারের সমস্ত কর্তৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিলেন। বস্তুত তিনিই তখন হলেন ইরাকের একচ্ছত্র ডিক্‌টেটর। নিজের ইচ্ছামতো দেশ শাসন করতে লাগলেন তিনি; ব্রিটিশ সেনার, বিশেষ করে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর সাহায্যে সমস্ত বিদ্রোহ বিশৃঙ্খলা দমন করলেন। ভারতবর্ষ, মিশর, সিরিয়া ইত্যাদি সর্বত্র একই পুরোনো কাহিনী আমরা বিভিন্নরূপে অনুষ্ঠিত হতে দেখেছি, এখানেও তারই পুনরাবৃত্তি হল। জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্রগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হল, রাজনৈতিক দলগুলোকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হল, নেতাদের নির্বাসনে পাঠানো হল, ব্রিটিশ এরোপ্লেনগুলি বোমা বর্ষণ করে দেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মহিমা প্রতিষ্ঠিত করল।

 কিন্তু এবারেও সমস্যা মিটল না। মাস কয়েক পরে সার্ পার্সি কক্স্ আবার রাজা এবং মন্ত্রিসভাকে তাঁদের কাজকর্ম করে যাবার অনুমতি দিলেন, অন্তত বাইরের দৃষ্টিতে। তার পর এঁদের উপরে চাপ দিয়ে ব্রিটেনের সঙ্গে একটা সন্ধিতে সম্মতি দিতে এঁদের বাধ্য করলেন। আবার আশ্বাস দেওয়া হল, ইংলণ্ড ইরাককে স্বাধীনতা দিয়ে দেবে, এমনকি তাকে লীগ অব নেশন্‌সের সভ্য পর্যন্ত বানিয়ে দেবে। এইসব সুন্দর এবং সান্ত্বনাদায়ক আশ্বাসবাণীর পিছনে জেগে রইল একটি কঠিন সত্য কথা: ইরাক সরকার চাপে পড়ে স্বীকার করেছিলেন, ব্রিটিশ কর্মচারী বা ব্রিটেন কর্তৃক অনুমোদিত কর্মচারীদের সাহায্যেই তাঁরা দেশ শাসন করবেন। ১৯২২ সনের অক্টোবর মাসের এই সন্ধিটি করা হয়েছিল প্রজাদের কিছুমাত্র না জানিয়ে; প্রজারা একে স্বীকার করল না। স্পষ্টই বলল, ইরাক সরকার বলে যেটাকে বসানো হয়েছে সে তো একটা ভুয়া সরকার; আসল ক্ষমতা এখনও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের হাতেই রয়ে গেছে। দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র রচনা করবার জন্য একটা জাতীয় ব্যবস্থাপক পরিষৎ তৈরি করার আয়োজন করা হল; নেতারা স্থির করলেন তার নির্বাচনে কেউ অংশ গ্রহণ করবেন না। এঁদের এই অসহযোগ সফল হল, পরিষৎ তৈরি করাই গেল না। দেশের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা হতে লাগল, কর আদায় করাও কঠিন হয়ে উঠল।

 এক বছরেরও বেশি কাল ধরে, ১৯২৩ সনের একেবারে শেষ পর্যন্তই, এই-সব হাঙ্গামা চলতে লাগল। অবশেষে সন্ধিটার খানিকটা সংশোধন করা হল, ইরাকের তাতে কিছু সুবিধা হল। আন্দোলনকারীদের নেতা যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কয়েকজনকে নির্বাসনেও পাঠানো হল। আন্দোলনের তীব্রতা কিছু তখন কমে এল; ১৯২৪ সনের প্রথমদিকে ব্যবস্থা পরিষৎ তৈরি করবার জন্য নির্বাচন করাও সম্ভব হল। কিন্তু নির্বাচনের ফলে যে পরিষৎ তৈরি হল, সেও ব্রিটিশের সেই সন্ধিটির বিরুদ্ধেই মত প্রকাশ করল। সন্ধিকে মেনে নেবার জন্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ পরিষদের উপরে দারুণ চাপ দিতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত পরিষদের মোট সভ্য সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি লোক মিলে সন্ধিটাকে মঞ্জুর করে দিলেন; প্রতিনিধিদের মধ্যে অনেকেই সে অধিবেশনে উপস্থিত পর্যন্ত থাকলেন না।

 ব্যবস্থাপক পরিষৎ ইরাকের জন্য একটা নূতন শাসনতন্ত্রের খসড়া তৈরি করলেন। কাগজপত্রে দেখে মনে হল এটি বেশ ভালো জিনিসই হয়েছে; এতে বলা হল ইরাক একটি সার্বভৌম স্বাধীন স্বতন্ত্র রাষ্ট্র বলে গণ্য হবে, সেখানে পুরুষানুক্রমিক এবং প্রজাধীন রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত থাকবে, পার্লামেণ্টী রীতিতে দেশ শাসন করা হবে। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। পার্লামেণ্টের দুটি বিভাগ, তার একটির, সিনেটের সভ্যদের মনোনীত করবেন রাজা স্বয়ং। অতএব রাজার হাতে অনেকখানিই ক্ষমতা থেকে গেল, এবং রাজার পিছনে দাঁড়িয়ে রইলেন ব্রিটিশ কর্মচারীরা, দেশের সমস্ত প্রধান ব্যাপারের চাবিকাঠি তাঁদের হাতে। ১৯২৫ সনের মার্চমাসে এই শাসনতন্ত্র চালু করা হল। নূতন পার্লামেণ্ট কয়েক বছর ধরে কাজ করে গেল; কিন্তু ম্যান্‌ডেট্ সম্বন্ধে যে আপত্তি ছিল সেটাও চলতে লাগল। মসুল নিয়ে তখন ইংলণ্ডের সঙ্গে তুরস্কের বিবাদ চলেছে; তার দিকে এদের অনেকখানি মনোযোগ নিবিষ্ট হয়ে রইল, কারণ এই অঞ্চলটির উপরে ইরাকও একজন দাবিদার। শেষপর্যন্ত ১৯২৬ সনের জুনমাসে ইংলণ্ড, ইরাক এবং তুরস্কের মধ্যে একটি মিলিত সন্ধি হয়ে এই বিবাদের শেষ মীমাংসা হয়ে গেল। মসুল ইরাকের হাতে চলে এল; ইরাক নিজেই বাস করছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ছায়া আশ্রয় করে, অতএব ব্রিটেনের স্বার্থেরও কোনো হানি ঘটল না।

 ১৯৩০ সনের জুন মাসে ব্রিটেন এবং ইরাকের মধ্যে নূতন করে একটা মৈত্রী-সূচক সন্ধি হল। এবারেও দেশের আভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক সমস্ত ব্যাপারেই ইরাকের পূর্ণ স্বাধীনতা ব্রিটেন স্বীকার করে নিল। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গেই আবার এমন কতকগুলো রক্ষাকবচ আর ব্যতিক্রমের ব্যবস্থা করা হল যে সে স্বাধীনতা কার্যত পরিণত হল একটি ঘোমটা-ঢাকা রক্ষণাধীন রাষ্ট্রে। ইরাকের মধ্য দিয়ে গেছে ভারতে আসবার পথ; সন্ধিপত্রের ভাষায় এটা ব্রিটেনের ‘অত্যাবশ্যক যানবাহন ব্যবস্থা।’ এই পথকে নিরাপদ রাখতে হবে, অতএব ইরাক ব্রিটেনকে বিমানঘাঁটি তৈরি করবার জন্য কতকগুলো জায়গা দিয়ে দিচ্ছে। মসুল এবং অন্যান্য স্থানে ব্রিটেন তার সেনাও বসিয়ে রেখেছে। সৈন্যদের সামরিক শিক্ষা দেবার জন্য ইরাক ব্রিটিশ শিক্ষক রাখতে পারবে; ইরাকের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সঙ্গে পরামর্শদাতা হিসাবে থাকবেন ব্রিটিশ সেনানীরা। অস্ত্রশস্ত্র গোলাগুলি এরোপ্লেন ইত্যাদি যা দরকার ইরাককে ব্রিটেনের কাছ থেকেই কিনতে হবে। যুদ্ধ বাধলে তখন দেশের মধ্যে ব্রিটেনকে সমস্ত রকমের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দিতে হবে, যেন শত্রুর বিরুদ্ধে ব্রিটেনের যুদ্ধের আয়োজন অবাধে চলতে পারে। এর ফলে, মসুলের চারপাশে যে সামরিক ঘাঁটি আছে সেখান থেকে ব্রিটেন সহজেই তুরস্ক পারশ্য বা আজারবাইজানে অবস্থিত সোভিয়েট এলাকাগুলোর উপর আঘাত হানতে পারবে।

 এই সন্ধির পরে, ১৯৩১ সনে ব্রিটেন আর ইরাকের মধ্যে আবার একটা বিচার-সম্পর্কীয় চুক্তি হল। এই চুক্তিপত্রে ইরাক প্রতিশ্রুতি দিল, সে একজন ব্রিটিশ জুডিসিয়াল অ্যাডভাইজার নিয়োগ করবে, তার আপীল আদালতে একজন ব্রিটিশকে প্রেসিডেণ্ট করে বসাবে, বাগ্‌দাদ, বসরা, মসুল এবং আরও কয়েকটা জায়গাতে প্রেসিডেণ্টের আসনে ব্রিটিশ কর্মচারী নিযুক্ত করবে।

 এই-সব ব্যবস্থা তো আছেই; এ ছাড়াও দেশের বহু উচ্চ পদ ব্রিটিশ কর্মচারীরা দখল করে বসে আছে বলে দেখা যায়। অতএব এই ‘স্বাধীন’ দেশটি কার্যত পরিণত হয়েছে ইংলণ্ডের একটি রক্ষাধীন অঞ্চলে। এই বাবস্থা পাকা করে নেওয়া হয়েছে ১৯৩০ সনের মৈত্রীসূচক সন্ধিতে, মেয়াদ পুরো পঁচিশটি বছর ধরে চলবে।

 ১৯২৫ সনে নূতন শাসনতন্ত্র চালু করা হল, তারপর থেকেই নূতন পার্লামেণ্ট কাজ শুরু করল। কিন্তু প্রজারা তখনও মোটেই সন্তুষ্ট নয়; বাইরের দিকের অঞ্চলগুলোতে মাঝেমাঝেই বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে লাগল। বিশেষ করে এটা ঘটল কুর্দদের এলাকায়। সেখানে তারা বরাবর বিদ্রোহ করছিল। ব্রিটিশ বিমানবাহিনী সে বিদ্রোহ দমন করল অতি সুষ্ঠু উপায়ে, বোমা ফেলে এবং গ্রামের পর গ্রাম আস্ত উড়িয়ে দিয়ে। ১৯৩০ সনের সন্ধির পরে কথা উঠল, এবার তো ব্রিটিশের আশ্রয়ে ইরাককে লীগ অব নেশন্‌সের সভ্য করে নিতে হয়। কিন্তু দেশে তখন শান্তি নেই, দাঙ্গা-হাঙ্গামা বিশৃঙ্খলা চলেছে। সেটা কারও পক্ষেই প্রশংসার কথা নয়—না ম্যান্‌ডেটের ক্ষমতা যার হাতে দেওয়া হয়েছে সেই ব্রিটেনের পক্ষে; না দেশে তখন রাজা ফয়জলের যে সরকার প্রতিষ্ঠিত রয়েছে তার পক্ষে। দেশে এইসব বিদ্রোহ চলেছে, এর থেকেই তো স্পষ্ট প্রমাণ হয়, দেশের লোকেদের ঘাড়ে ব্রিটিশরা যে সরকারটিকে বসিয়ে দিয়েছে তার কাজকর্মে প্রজারা সন্তুষ্ট নয়। এখন এইসব কথা যদি আবার লীগ অব নেশন্‌সের কানে গিয়ে ওঠে, সে তো ভয়ানক অন্যায় ব্যাপার হবে। অতএব তখন বলপ্রয়োগ আর ত্রাসসৃষ্টি করে এইসব বিশৃঙ্খলা থামিয়ে দেবার একটা খুব বিশেষ রকমের চেষ্টা করা হল। ব্রিটিশ বিমানবাহিনীকে এই কাজের জন্য নিয়োগ করা হল; শান্তি এবং শৃংখলা স্থাপনের যে চেষ্টা এরা করল, তার স্বরূপ খানিকটা জানা যায় বড়ো একজন ব্রিটিশ কর্মচারীর প্রদত্ত বর্ণনা থেকে। ১৯৩২ সনের ৮ই জুন তারিখে লণ্ডন শহরে রয়াল এসিয়ান সোসাইটির বার্ষিক উৎসব হল, সেখানে বক্তৃতা দিতে উঠে লেফটেনাণ্ট কর্নেল সার্ আর্নল্ড উইলসন বললেন:

 “কী দৃঢ় সংকল্পসহকারে (জেনেভাতে অবশ্য একথা কোনোদিনই স্বীকার করা হয় নি) রাজকীয় বিমানবাহিনী গত দশ বৎসর যাবৎ এবং বিশেষ করে গত ছয় মাস ধরে কুর্দ প্রজাদের উপরে বোমাবর্ষণ চালিয়ে এসেছে। ‘টাইমস’ পত্রিকার বিশেষ সংবাদদাতা একে বলেছেন সর্বত্র একটি সমান ধরনের সভ্যতার বিস্তার—অসংখ্য বিধ্বস্ত গ্রাম, নিহত পশুপাল, অঙ্গহীন নারী ও শিশু সে সভ্যতা বিস্তারের দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।”

 দেখা গেল, গ্রামের লোকগুলো একেবারেই গ্রাম্য; এরোপ্লেন আসছে দেখলেই তারা দৌড়ে পালিয়ে যায়, লুকিয়ে পড়ে, বোমাগুলো এত কষ্ট করে তাদের মারতে আসছে অথচ তাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকবে এতটুকু ভদ্রতাজ্ঞান পর্যন্ত তাদের নেই। দেখেশুনে তখন এক নূতন ধরনের বোমা ফেলা হতে লাগল, তার নাম কাল-বিলম্বী বোমা। এই বোমা মাটিতে পড়েই ফেটে যায় না। এতে দম দেওয়া থাকে, পরে যে-কোনো একটা সময়ে ফাটে। গ্রামবাসীদের ঠকানোর জন্য এই শয়তানি ফন্দি খাটানো হল; এরোপ্লেন চলে গেল দেখে তারা নিশ্চিত হয়ে ঘরে ফিরে আসে, তার পর হঠাৎ একসময়ে বোমা ফেটে তাদের ঘায়েল করে। যারা এতে মরল তাদেরই বরং ভাগ্য ভালো বলতে হবে। যারা অঙ্গহীন হয়ে বেঁচে রইল, যাদের হাত-পা একটা বোমার ঘায়ে উড়ে গেল বা অন্য কোনো রকমের নিদারুণ আঘাত লাগল, তাদের ভাগ্য অনেক বেশি খারাপ, কারণ দূর মফঃস্বলের সেই গ্রাম্য অঞ্চলে চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থাই তাদের ছিল না।

 এমনি করে দেশে শান্তি এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করা হল; তার পর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের আশীর্বাণী শিরে ধারণ করে ইরাক সরকার লীগ অব নেশন্‌সের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল, লীগের সভ্য বলে তাকে গণ্য করে নেওয়া হল। ব্যাপারটাকে ব্যঙ্গ করে একজন বলেছিলেন, ইরাক সুদ্ধ ‘বোমার ঘায়েই’ লীগের মধ্যে গিয়ে ঢুকে পড়েছে। অতি সত্য কথা।

 ইরাক এখন লীগ অব নেশন্‌সের সভ্য। অতএব তার উপরে ব্রিটেন যে ম্যান্‌ডেট্ পেয়েছিল তারও মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তার জায়গাতে তৈরি হয়েছে ১৯৩০ সনের সন্ধিপত্র। ব্রিটিশরা যাতে রাজ্যটাকে ঠিকমতো হাতের মুঠোয় ধরে রাখতে পারে, তার সব ব্যবস্থাই এতে করা হয়েছে। এর ফলে প্রজার অসন্তোষও সমানই টিঁকে রয়েছে; ইরাকের প্রজাদের কাম্য হচ্ছে স্বাধীনতা এবং আরব অঞ্চলের সমস্ত জাতিগুলোর একত্র মিলন। ইরাক লীগ অব নেশন্‌সের সভ্য হয়েছে, কিন্তু তা নিয়ে তাদের বিশেষ উৎসাহ নেই। প্রাচ্য-দেশের প্রায় সমস্ত পদানত জাতিরই মনে লীগ অব নেশন্‌স সম্বন্ধে যে ধারণা, ইরাকীদেরও ধারণা ঠিক তাই—তারা জানে লীগ হচ্ছে শধু ইউরোপের বড়ো বড়ো জাতিগুলোর হাতের একটা যন্ত্র, একে দিয়ে তারা নিজেদের উপনিবেশ এবং অন্যান্য ব্যাপার-সংক্রান্ত প্রয়োজন সিদ্ধ করে নিচ্ছে।[]

 আরব অঞ্চলের জাতিগুলোর কথা বলা আমাদের শেষ হল। এটা তুমি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছ, মহাযজ্ঞের পরে ভারতবর্ষ এবং প্রাচ্য-জগতের আরও অনেক দেশের মতো, এই দেশগুলিও জাতীয়তাবাদের প্রবল বন্যায় কীরকম উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল। সে যেন একটা বিদ্যুতের প্রবাহ, একই সঙ্গে তাদের সকলেরই মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়েছিল। আরেকটি লক্ষ্য করবার বস্তু হচ্ছে, প্রত্যেকেই এরা আন্দোলন চালাবার যে-সব রীতি ও নীতি গ্রহণ করেছিল তার মধ্যে পরস্পর সাদৃশ্য ছিল। এর অনেক দেশেই সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছে, বিপ্লব হয়েছে, রক্তপাত হয়েছে। কিন্তু তারপর ক্রমশ এরা সকলেই বেশি করে নির্ভর করেছে অসহযোগ এবং বয়কট নীতির উপরে। একথা নিঃসন্দেহ, প্রতিরোধের এই নূতন পন্থাটির প্রবর্তন করেছিল ভারতবর্ষ, ১৯২০ সনে যখন কংগ্রেস গান্ধীজির নেতৃত্ব মেনে নিল তখন থেকে। অসহযোগ এবং আইন-পরিষৎ বর্জনের বুদ্ধিটা ভারতবর্ষ থেকেই প্রাচ্য-জগতের অন্যান্য দেশে সংক্রামিত হয়েছে। এখন এটি জাতীর স্বাধীনতা-সংগ্রামের একটি প্রকৃষ্ট রীতি বলে গণ্য, এর প্রয়োগও প্রায়ই দেখা যাচ্ছে।

 সাম্রাজ্যবাদী প্রভু হিসাবে অধীন দেশকে করায়ত্ত রাখবার জন্য যে নীতি ইংলণ্ড খাটায় এবং যে নীতি ফ্রান্স খাটায়, এদের মধ্যে একটা চমৎকার প্রভেদ আছে। ইংলণ্ডের যেখানে যে উপনিবেশ আছে তার প্রত্যেক জায়গাতেই সে চেষ্টা করে, সামন্তপন্থী, ভূস্বামী এবং প্রজাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রক্ষণপন্থী এবং অনগ্রসর শ্রেণীগুলোর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করতে। ভারতবর্ষে, মিশরে এবং আরও বহু দেশে তার এই খেলাই আমরা দেখেছি। অধীন দেশে সে একটা করে অত্যন্ত নড়বড়ে সিংহাসন খাড়া করে, অত্যন্ত প্রগতিবিরোধী একটা লোককে এনে সেই সিংহাসনে বসিয়ে দেয়, বেশ জানে সে লোকটা প্রাণের দায়েই তার পক্ষ টেনে চলবে। এই জনাই সে মিশরের সিংহাসনে ফুয়াদকে বসিয়ে রেখেছে; ইরাকে বসিয়েছে ফয়জলকে, ট্রান্স-জর্ডনে আবদুল্লাকে; এই জন্যই হেজাজে সে হুসেনকে রাজা করতে চেয়েছিল। ফ্রান্সের নীতি আলাদা। ফ্রান্স হচ্ছে খাঁটি বুর্জোয়ার দেশ; তাই সে চেষ্টা করে অধীন দেশের বুর্জোয়া শ্রেণীর একটা অংশকে, নবজাগ্রত মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে, হাত করে নিতে। সিরিয়াতে সে খৃষ্টান মধ্যবিত্ত শ্রেণীগুলোর সমর্থন লাভ করবার চেষ্টা করেছিল। ইংলণ্ড এবং ফ্রান্সের অধীনে যত দেশ এবং উপনিবেশ আছে, তার সর্বত্র এরা দুজনে একটি নীতিই প্রধানত অনুসরণ করছে; সে হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে যে জাতীয়তাবাদ মাথা তুলে উঠছে তাকে দুর্বল করে ফেলার জন্য তারা সে দেশের মধ্যে দলাদলি ভাগাভাগির সৃষ্টি করে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, জাতি, ধর্ম ইত্যাদি নিয়ে নানা রকমের জটিল সমস্যা তৈরি করে দেয়। কিন্তু প্রাচ্য-জগতের সর্বত্রই আজ জাতীয়তাবাদের চেতনা এই সব ভাগাভাগির বুদ্ধিকে ক্রমশ ডিঙিয়ে বড়ো হয়ে উঠছে। মধ্য-প্রাচ্যের এই আরব দেশগুলিতে এই জয়ের লক্ষণ যতখানি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এমন বোধ হয় আর কোথাও হয় নি—সেখানে এক জাতিত্বের আদর্শের সামনে পড়ে ধর্মগত সম্প্রদায়-বুদ্ধি দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসছে।

 ইরাকে ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনী যে বিষম বীরত্ব দেখিয়েছে তার কথা তোমাকে বলেছি। গেল বছর বারো যাবৎ ব্রিটিশ সরকারের নীতিই হয়ে উঠেছে, তাদের অধীনে যে-সব আধা-উপনিবেশশ্রেণীর দেশ আছে, সেখানে ‘পুলিশের কাজ’ করতে এইভাবে বিমানবাহিনীকে ব্যবহার করা। এটা আবার বিশেষ করে করা হচ্ছে সেই সব জায়গাতে, যেখানে খানিকটা স্বায়ত্ত্ব-শাসনের অধিকার দিয়ে দেওয়া হয়েছে, অতএব যেখানে দেশ-শাসনের ভার আছে প্রধানত সেই দেশবাসীদেরই হাতে। এখন আর ব্রিটেন এইসব দেশে দখলকারী সেনাবাহিনী বসিয়ে রাখছে না; বা রাখলেও তাদের সংখ্যা অত্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে। এর অনেকগুলি সুবিধা। এতে তাদের প্রচুর পরিমাণ টাকা বেঁচে যায়; দেশটাকে যে সৈন্য দিয়ে দখল করে রাখা হয়েছে তারও প্রমাণ আর তেমন চোখে পড়ে না। অথচ এরোপ্লেন আর বোমার জোরে দেশটাতে তাদের প্রভুত্ব এবং নিয়ন্ত্রণক্ষমতা সম্পূর্ণরূপেই অক্ষুণ্ণ থেকে যায়। এইভাবে এরোপ্লেন থেকে বোমা বর্ষণের ব্যবস্থা আছে বলেই ব্রিটেন এখন আরও বহু স্থানকে ‘স্বাধীনতা’ দিয়ে দিতে পেরেছে; বোমা বর্ষণের নীতিটা ব্রিটেনই বোধ হয় সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছে, অন্য কোনো দেশ এতটা করে না। ইরাকের কথা তোমাকে আমি বলেছি। ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত সম্বন্ধেও ঠিক এই গল্পই বলা চলে, সেখানে এই রকম বোমাবর্ষণ একটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে উঠেছে।

 আগের দিনে বিদ্রোহী প্রজাকে শায়েস্তা করতে সেনাবাহিনী পাঠানো হত। বোমা বর্ষণ করাতে হয়তো তার চেয়ে খরচ কম, হয়তো ফলও বেশি দ্রুত হয়। কিন্তু এটা অত্যন্ত নিষ্ঠুর পন্থা, অমানুষিক পন্থা। বোমা ফেলে, বিশেষত, কাল-বিলম্বী বোমা ফেলে, আস্ত এক একটা গ্রামকে ধংস করা, দোষী-নির্দোষ-নির্বিচারে সমস্ত লোককে হত্যা করা, এর চেয়ে অধিকতর ভয়াবহ এবং অধিকতর বর্বরোচিত আচরণ কল্পনা করাও সত্যই কঠিন। তা ছাড়া এই উপায়ে অন্য দেশের উপরে আক্রমণ করাও অত্যন্ত সহজ। অতএব এখন এর বিরুদ্ধে জোর প্রতিবাদ শুরু হয়েছে; বিমান দিয়ে অসামরিক জনতার উপরে আক্রমণ চালানোকে বর্বরোচিত ব্যাপার বলে নিন্দা করে জেনেভাতে লীগ অব নেশন্‌সের সভাগৃহে খুব মস্ত মস্ত বক্তৃতা দেওয়া হচ্ছে। অন্য সমস্ত দেশের প্রতিনিধিই বিমান থেকে বোমাবর্ষণ একেবারেই নিষিদ্ধ করা হোক বলে জোর দাবি জানিয়েছেন, আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রও এই মতই প্রকাশ করছেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তাতে রাজি হচ্ছেন না; তাঁদের দাবি, উপনিবেশগুলিতে ‘পুলিশী ব্যবস্থা’র জন্য বিমান-ব্যবহারের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখা হোক। এই দাবির দরুনই লীগের সভাতে এবং ১৯৩৩ সালের নিরস্ত্রীকরণ বৈঠকে মতৈক্য হতে পারে নি।

  1. ১৯৩৩ সনের সেপ্টেম্বরে রাজা ফয়জল পরলোকগমন করেন এবং তাঁর পুত্র প্রথম গাজী সিংহাসন লাভ করেন। তিনি আবার ১৯৩৯ সনে এক দুর্ঘটনার ফলে মারা যান এবং তাঁর শিশপুত্র তাঁর স্থলে রাজা হন।