বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ইরানের প্রাচীন রীতিনীতি

উইকিসংকলন থেকে

১২৪

ইরানের প্রাচীন রীতিনীতি

২০শে জানুয়ারি, ১৯৩৩

 এবার আমরা পারশ্যদেশকে দেখতে যাব, এর আত্মা ভারতবর্ষে এসেছিল এবং তাজের মধ্যে সার্থক বিকাশ লাভ করেছিল। পারশ্যের শিল্পকলার উল্লেখযোগ্য একটি প্রাচীন রীতি আছে। দু হাজার বছরেরও বেশি কাল ধরে, একেবারে সেই আসিরীয়দের যুগ থেকেই, তা সেখানে চলে এসেছে। শাসনতন্ত্রের বহু পরিবর্তন হয়েছে ইতিমধ্যে বহু রাজবংশ, বহু ধর্ম এসেছে আর চলে গেছে, দেশে কখনও-বা বিদেশীরা রাজত্ব করেছে, কখনও-বা করেছে তার নিজেরই রাজারা; তার পর ইসলামধর্ম এসে তার মধ্যে অনেকখানি পরিবর্তন ঘটিয়েছে, তবু কিন্তু এই রীতিটি আগাগোড়া বরাবরই টিঁকে রয়েছে। বদল অবশ্য এরও হয়েছে, যুগে যুগে নূতনতর পরিণতিও এর লাভ হয়েছে। তবুও যে এটা এইভাবে টিঁকে আছে, অনেকে বলেন, তার কারণ হচ্ছে, পারশ্যে তার দেশের মাটি এবং নৈসর্গিক দৃশ্যের সঙ্গে শিল্পকলার সম্বন্ধ অতি ঘনিষ্ঠ।

 তোমাকে আমি নিনেভের আসিরীয় সাম্রাজ্যের কথা বলেছি, পারশ্যও এই সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। খৃস্টজন্মের পাঁচ-ছ শো বছর আগে ইরানিরা—এরা জাতিতে আর্য—নিনেভে দখল করে, আসিরীয় সাম্রাজ্যটাও শেষ হয়ে যায়। তার পর এই পারশ্যবাসী আর্যরা নিজেদের একটি বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে তোলে; এই সাম্রাজ্য সিন্ধু নদের তীর থেকে একেবারে মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তখনকার সেই প্রাচীন জগতে এরাই প্রবল হয়ে উঠল, গ্রীকদের পুঁথিপত্রে বহু স্থানে এদের রাজাদের উল্লেখ করা হয়েছে ‘বড়ো রাজা’ বলে। এই ‘বড়ো রাজা’দের মধ্যে কয়েকজন হচ্ছেন কাইরাস, দারিয়ুস, জেরিক্সিস ইত্যাদি। এঁদের নাম হয়তো তোমার মনে আছে, দারিয়ুস এবং জেরিক্সিস গ্রীস জয় করার চেষ্টা করেছিলেন এবং পরাজিত হয়েছিলেন। এই রাজবংশের নাম ছিল একিমেনিড বংশ। ২২০ বছর ধরে এই বংশের রাজারা একটি বিশাল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে ছিলেন; তার পর মাসিডনের বীর আলেকজাণ্ডার এই সাম্রাজ্য ধ্বংস করেন।

 আসিরীয় এবং বাবিলনীয়দের পরে পারশ্য-রাজাদের পেয়ে দেশের প্রজারা নিশ্চয়ই একটু স্বস্তিলাভ করেছিল। প্রভু হিসাবে এঁরা ছিলেন সভ্য এবং সহিষ্ণু, বিভিন্ন ধর্ম এবং সংস্কৃতিকে এঁরা অবাধে বাড়তে দিয়েছিলেন। এঁদের এই বিশাল সাম্রাজ্যটির শাসনব্যবস্থা বেশ ভালো ছিল; এর সমস্ত স্থানের মধ্যে যানবাহনের সুব্যবস্থা আনবার জন্যে রাজারা এর সর্বত্রই অনেক ভালো ভালো রাস্তা তৈরি করিয়েছিলেন। পারশ্যবাসীরা জাতিতে আর্য, ভারতে যাঁরা এসেছিলেন সেই ভারতীয় আর্যদের সঙ্গে এদের অতি নিকট সম্বন্ধ ছিল, এঁদের ধর্ম ছিল জোরোআস্টার বা জরথুস্ট্রের ধর্ম, বেদের প্রাচীন ধর্মের সঙ্গেও তার খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। পরিষ্কার বোঝা যায়, এই দুটি জাতিরই উৎপত্তি হয়েছিল এক জায়গাতে, আর্যদের আদি বাসস্থানে, সে স্থানটি যেখানেই হয়ে থাক্।

 একিমেনিড রাজারা বাড়িঘর তৈরি করার খুব ভক্ত ছিলেন, এঁদের রাজধানী পার্সিপোলিস শহরে এঁরা প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড প্রাসাদ—মন্দির এঁরা তৈরি করতেন না—তৈরি করালেন, তাতে মস্ত বড়ো বড়ো সব হলঘর, তার অসংখ্য স্তম্ভ। এখনও এর কিছু কিছু ধ্বংসাবশেষ রয়েছে, তা দেখে এগুলো কী প্রকাণ্ড বস্তু ছিল তার খানিকটা ধারণা করা যায়। দেখে মনে হয়, একিমেনিডদের এই শিল্পের সঙ্গে মৌর্যযুগের (অশোক প্রভৃতি) ভারতীয় শিল্পের যোগ ছিল, তার উপরে এর প্রভাবও অনেক পড়েছিল।

 আলেকজাণ্ডার ‘বড়ো রাজা’ দারিয়ুসকে পরাজিত করলেন, একিমেনিড-রাজবংশের শেষ হয়ে গেল। এর পর অল্প কিছুদিন এখানে গ্রীকরা রাজত্ব করল, এদের রাজা ছিলেন সেলিউকস। ইনি আলেকজাণ্ডারের সেনাপতি ছিলেন) এবং তাঁর উত্তরাধিকারীরা। তার পর আরও কিছু দীর্ঘতর কাল ধরে কয়েকজন অর্ধ-বিদেশী রাজা এখানে রাজত্ব করলেন, এঁদের সময়েও হেলেনিক সংস্কৃতির প্রভাব এখানে টিঁকে রইল। এঁদেরই সমসাময়িক ছিলেন ভারতের সীমান্ত-প্রদেশে অবস্থিত কুশান রাজারা; দক্ষিণে বারাণসী এবং উত্তরে মধ্য-এশিয়া পর্যন্ত তাঁদের রাজ্য বিস্তৃত ছিল। তাঁদের উপরেও হেলেনিক সংস্কৃতির প্রভাব ছিল প্রচুর। কাজেই দেখা যাচ্ছে, আলেকজাণ্ডারের পরে পাঁচ শো বছরেরও বেশি কাল, খৃষ্টজন্মের পরবর্তী একেবারে তৃতীয় শতাব্দী পর্যন্ত, ভারতের পশ্চিমে সমগ্র এশিয়া মহাদেশই ছিল গ্রীক সংস্কৃতির প্রভাবাচ্ছন্ন। এই প্রভাব বেশি করে দেখা যেত শিল্পকলায়। পারশ্যের ধর্মমতের কোনো ব্যাঘাত এর দ্বারা হয় নি, ধর্মে পারশ্য জরথুস্ট্রের মতাবলম্বীই থেকে গেল।

 খৃষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে পারশ্যে একটা জাতীয় জাগরণ এল, নূতন একটি রাজবংশ সিংহাসন অধিকার করল। এর নাম সসানিদ বংশ, এর রাজারা ছিলেন উগ্র জাতীয়তাবাদী; এঁরা বলতেন, এঁরা প্রাচীন কালের একিমেনিড-রাজাদের বংশধর। উগ্র জাতীয়তাবাদের যা দোষ স্বভাবতই দেখা যায়, এঁদের মতামত বড়ো সংকীর্ণ এবং অসহিষ্ণু ছিল। না হয়ে উপায়ও ছিল না তার; পশ্চিমে রোমান সাম্রাজ্য এবং কনস্টাণ্টিনোপ্‌লের বাইজানটিনা সাম্রাজ্য আর পূর্ব দিকে তুর্কি উপজাতিদের অগ্রগতি, এই দুয়ের চাপে পড়ে তার তখন কাহিল অবস্থা। তবুও সে চার শো বছরেরও বেশি কাল, একেবারে ইসলামের আবির্ভাবের সময় পর্যন্ত, কোনোক্রমে টিঁকে রইল। সসানিদ-রাজাদের আমলে পুরোহিতদের প্রতিপত্তি অত্যন্ত বেশি হয়ে উঠেছিল; তাদেরই ইঙ্গিতে রাষ্ট্র চলত; কোনোরকম বিরোধিতাই সহ্য করবার মতো উদারতা তাদের ছিল না। এই সময়েই তাদের ধর্মপুস্তক আবেস্তা’র শেষ সংস্করণ রচিত হয়েছিল বলে শোনা যায়।

 ভারতবর্ষে এই সময়ে গুপ্ত-সাম্রাজ্য রয়েছে, সেটাও ছিল কুশান এবং বৌদ্ধ যুগের পরে একটা জাতীয় জাগরণের প্রতীক। শিল্পকলা এবং সাহিত্যের এই সময়ে একটা পুনরুজ্জীবন হয়েছিল; এই সময়েই কালিদাস প্রভৃতি সংস্কৃতভাষার কয়েকজন শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সাসানিদ রাজাদের অধীন পারশ্য আর গুপ্ত-রাজাদের শাসিত ভারতবর্ষের শিল্পকলার মধ্যে একটা সংযোগ ছিল, এবং এর অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। সসানিদ-যুগের ছবি বা প্রস্তরমূর্তি আজ পর্যন্ত অতি অল্পই টিঁকে আছে; কিন্তু যে দু-চারটে পাওয়া গেছে তাতে জীবনীশক্তি এবং গতির প্রাচুর্য রয়েছে, অজন্তার প্রাচীরচিত্রের সঙ্গে এর পশুর মূর্তিগুলোর একেবারে আশ্চর্য মিল। সসানিদ-যুগের শিল্পকলার প্রভাব একেবারে চাঁন এবং গোবি মরুভূমি পর্বত বিস্তৃত হয়েছিল বলে মনে হয়।

 দীর্ঘ কাল রাজত্ব করে শেষ দিকে সসানিদ রাজারা দুর্বল হয়ে পড়লেন, পারশ্যেরও অবস্থা খারাপ হয়ে উঠল। অনেকদিন ধরে বাইজানটিনা-সাম্রাজ্যের সঙ্গে তার যুদ্ধ চলল, ফলে দুই পক্ষই একেবারে অবসন্ন হয়ে পড়ল। তখন এল আরব-বাহিনী, তাদের নূতন ধর্মের উৎসাহে তাদের মন ভরপুর, পারশ্য জয় করতে তাদের কিছু মাত্র বেগ পেতে হল না। সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি, হজরত মহম্মদের মৃত্যুর পর দশ বছরের মধ্যে, পারশ্যদেশ খলিফার অধীন হয়ে গেল। আরব-বাহিনী ক্রমে মধ্য-এশিয়া এবং উত্তর-আফ্রিকা পর্যন্ত এগিয়ে গেল, সঙ্গে বহন করে নিয়ে গেল কেবল তাদের নূতন ধর্মকে নয়, একটি নবীন এবং প্রাণবান সংস্কৃতিকে। সিরিয়া মেসোপটেমিয়া মিশর, আরব সভ্যতা সকলকেই আচ্ছন্ন করে ফেলল। আরবের ভাষা হয়ে গেল এদের ভাষা; জাতিহিসেবেও এরা আরবদের মধ্যে মিলিয়ে গেল। আরব-সংস্কৃতির বড়ো বড়ো কেন্দ্র হল বাগদাদ, দামাস্কাস, কায়রো; এই নবীন সভ্যতার উৎসাহে এইসব জায়গাতে চমৎকার সব প্রাসাদ গড়ে উঠল। আজ পর্যন্ত এইসমস্ত দেশ আরব দেশ হয়েই রয়েছে; পরস্পর থেকে এরা পৃথক, কিন্তু সকলে একত্র হয়ে যাওয়াই হচ্ছে এদের মনের স্বপ্ন।

 পারশ্যকেও আরবরা এদের মতোই জয় করে নিয়েছিল, কিন্তু সিরিয়া বা মিশরের লোকেরা যেমন আরবদের মধ্যে অবলুপ্ত বা বিলীন হয়ে গিয়েছিল, পারশ্যে তা হল না। ইরানিরা জাতিতে ছিল প্রাচীন আর্য বংশীয়; আরবরা সেমিটিক জাতি; দুয়ের মধ্যে তফাত ছিল অনেক বেশি। তাদের ভাষাও ছিল আর্য ভাষা। কাজেই জাতিহিসেবে ইরানিরা পৃথক হয়েই রইল, তাদের ভাষাও বেশ টিঁকে থাকল। ইসলামধর্ম অবশ্য খুব দ্রুত বিস্তৃত হয়ে পড়ল, জরথুস্ট্রের ধর্মকে একেবারেই হটিয়ে দিল, তাকে শেষ পর্যন্ত এসে আশ্রয় নিতে হল ভারতবর্ষে। কিন্তু ইসলামকেও পারশ্যবাসীরা গ্রহণ করল তাদের নিজম্ব পদ্ধতিতে। ইসলামধর্ম গ্রহণ করেও পারশ্যবাসীরা তাদের নিজস্ব ধারা বজায় রাখল। এর ফলে একটা মতভেদ হল, দুটো দলের সৃষ্টি হল, মুসলমানরা শিয়া আর সুন্নি, এই দুই সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে গেল। পারশ্য হল প্রধানত শিয়া-দেশ। এখনও সে তাই রয়েছে। অন্যান্য দেশের মুসলমান প্রায় সকলেই সুন্নি।

 কিন্তু আরব-সংস্কৃতি পারশ্যকে গ্রাস করতে না পারলেও আরব সভ্যতার প্রভাব তার উপরে প্রচুর পরিমাণেই পড়ল। ভারতবর্ষের মতো এখানেও ইসলামধর্ম শিল্পকলার চর্চায় নূতন প্রাণের সঞ্চার করল। আরবদের শিল্পকলা এবং সংস্কৃতিতেও আবার পারশ্যের প্রভাব সমানভাবেই দেখা দিল। আরবরা মরুভূমির সন্তান, সহজ সরল ছিল তাদের জীবনযাত্রা। পারশ্যের বিলাসবুদ্ধি তাদের সেই সকল গার্হস্থ্য জীবনকেও প্লাবিত করে দিল; আরব খলিফার রাজসভা অন্য যে-কোনো সাম্রাজ্যের রাজসভার মতোই ঐশ্বর্য আর জাঁকজমকে ভরে উঠল। সাম্রাজ্যের রাজধানী বাগদাদ হল তখনকার দিনের সর্বশ্রেষ্ঠ নগরী। বাগদাদের উত্তরে টাইগ্রিস-তীরে সামারা নগরে খলিফারা নিজেদের জন্যে বিরাট এক মসজিদ আর প্রাসাদ তৈরি করালেন, এর ধ্বংসাবশেষ আজও আছে। মসজিদটিতে অতি প্রকাণ্ড সব হল-ঘর ছিল, বড়ো বড়ো চত্বর ছিল, সেখানে ফোয়ারা বসানো। প্রাসাদটি ছিল চতুষ্কোণ, তার একটা দিকেরই দৈর্ঘ্য ছিল এক কিলোমিটারেরও (প্রায় /মাইল) বেশি।

 নবম শতাব্দীতে বাগদাদের সাম্রাজ্য ভেঙে গেল, এর এক-একটা টুকরো নিয়ে অনেকগুলো রাজ্য গড়ে উঠল। পারশ্য স্বাধীন হয়ে গেল। পূর্ব-অঞ্চলের তুর্কি-উপজাতিরা অনেকগুলো রাজ্য স্থাপন করল, শেষ পর্যন্ত এরা পারশ্যকেই জয় করে বসল, বাগদাদের নামমাত্র খলিফা যিনি ছিলেন তিনিও এদের হুকুমে চলতে লাগলেন। একাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আবির্ভূত হলেন গজনির মাহ্‌মুদ। তিনি ভারত জয় করলেন, খলিফাকেও সন্ত্রস্ত করে তুললেন। মাহ্‌মুদ একটি সাম্রাজ্যও স্থাপন করলেন; সে সাম্রাজ্য কিন্তু বেশি দিন বাঁচল না, তাকে ভেঙে ফেলল আর একটি তুর্কি-উপজাতি; এদের নাম সেলজুক। সেলজুকরা দীর্ঘকাল ধরে খৃষ্টান ধর্মযোদ্ধাদের সঙ্গে সমানে যুদ্ধ চালাল, যুদ্ধে জয়ও তাদেরই হল। তাদের সাম্রাজ্য টিঁকে ছিল দেড় শো বছর। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে আবার আর একটি তুর্কি-উপজাতি এসে সেলজুকদের পারশ্য থেকে তাড়িয়ে দিল, দিয়ে প্রতিষ্ঠা করল খোয়ারিশম বা খিভা রাজ্যের। এই রাজ্যটিরও আয়ু ছিল অতি অল্প। খোয়ারিশমের শাহ্ চেঙ্গিস খাঁর দূতকে অপমান করেছিলেন; সেই রাগে চেঙ্গিস খাঁ তাঁর মোগলসেনা নিয়ে একে আক্রমণ করলেন এবং দেশটিকে ও উহার লোকদিগকে একেবারেই বিধ্বস্ত করে দিয়ে গেলেন।

 সংক্ষিপ্ত কটি কথার মধ্যে অনেক পরিবর্তন অনেকগুলো সাম্রাজ্যের কাহিনী বলে গেলাম, নিশ্চয়ই তুমি যথেষ্ট পরিমাণ ধাঁধায় পড়ে গেছ। নানা রাজবংশ ও নানা জাতির উত্থান-পতনের এই গল্প বললাম অবশ্য তোমার মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলবার জন্যে নয়; আমি তোমাকে দেখাতে চাইছি, এত সমস্ত কাণ্ডের মধ্যেও পারশ্য তার প্রাচীন শিল্পকলার রীতি এবং জীবনের ধারাকে কীরকম করে বাঁচিয়ে রেখেছিল। পূর্বদেশ থেকে একটার পর একটা তুর্কি-উপজাতি এসেছে, এসে তারা আরব ও পারশ্যের মিশ্রিত সভ্যভার মধ্যে অবলুপ্ত হয়ে গেছে— সে সভ্যতা তখন বোখারা থেকে ইরাক পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ছিল। পারশ্য থেকে দূরে এশিয়া মাইনরে গিয়ে পৌঁচেছিল যে তুর্কিরা তারা কিন্তু নিজেদের পুরোনো রীতিনীতিকেই বজায় রেখেছিল, আরব-সংস্কৃতিকে মেনে নিতে তারা রাজি হয় নি। এশিয়া মাইনরকে তারা প্রায় তাদের নিজের দেশ তুর্কিস্থানেরই মতো করে তুলেছিল। কিন্তু পারশ্যে এবং তার আশেপাশে প্রাচীন ইরানি সংস্কৃতির জোর এতই বেশি ছিল যে, এই তুর্কিরাও তাকে মেনে নিল, তার ধরনে নিজেদেরও নূতন করে গড়ে নিল। বহু তুর্কি-রাজবংশ পারশ্যে রাজত্ব করে গেছে, কিছু পারশ্যের শিল্পকলা আর সাহিত্য তার আগাগোড়াই নিজের সমৃদ্ধি বজায় রেখে চলেছে। পারশ্যের কবি ফিরদৌসির কথা বোধ হয় তোমাকে বলেছি; গজনির সুলতান মাহ্‌মুদের সময়ে এঁর আবির্ভাব হয়েছিল। মাহ্‌মুদের অনুরোধে ইনি পারশ্যের বিরাট একটি জাতীয় মহাকাব্য রচনা করেন, তার নাম শাহ্‌নামা। এই কাব্যে বর্ণিত ঘটনাগুলির কাল প্রাগ্-ইসলামীয় যুগ, এর প্রধান বীর হচ্ছেন রুস্তম। এর থেকেই বোঝা যায়, দেশের প্রাচীন জাতীয় ইতিহাস আর কিংবদন্তীর সঙ্গে পারশ্যের শিল্পকলা এবং সাহিত্যের কতখানি নিবিড় যোগ ছিল। পারশ্যে যেসব ছবি আর প্রতিমূর্তি রচিত হত তারও অধিকাংশেরই বিষয়বস্তু বেছে নেওয়া হত শাহ্‌নামার কোনো গল্প থেকে।

 ফিরদৌসি বেঁচে ছিলেন দুটি শতাব্দী তথা সহস্রাব্দীর মিলনক্ষণে— ৯০২ সন থেকে ১০২১ সন পর্যন্ত। তাঁর অল্পদিন পরেই এলেন পারশ্যের অন্তর্গত নিশাপুরের অধিবাসী জ্যোতিষী করি ওমর খৈয়াম—ফার্সি এবং ইংরেজি দুই ভাষাতেই এঁর নাম বিখ্যাত হয়ে আছে। ওমরের পরে এলেন শিরাজের কবি শেখ সাদি। পারশ্যের শ্রেষ্ঠ কবিদের ইনি অন্যতম, অনেক পুরুষ ধরে ভারতবর্ষের সমস্ত মক্তবে ছাত্ররা এঁর কাব্য গুলিস্তান আর বুস্তান মুখস্থ করে আসছে।

 অনেক বড়ো বড়ো নামের মধ্যে অল্প কয়েকটা মাত্র বললাম। প্রকাণ্ড লম্বা একটা নামের তালিকা তোমাকে দেবার কোনো সার্থকতা নেই। আমি চাই তুমি এইটে শুধু লক্ষ্য করে দেখো, এই এতগুলো দীর্ঘ শতাব্দী ধরে পারশ্য থেকে মধ্য-এশিয়ার ট্রান্স-অক্সিয়ানা পর্যন্ত দেশ জুড়ে পারশ্যের শিল্প আর সংস্কৃতির শিখা কী উজ্জ্বল আলো বিকিরণ করে গেছে। শিল্পকলা এবং সাহিত্যচর্চার দিক থেকে পারশ্যের নগরগুলির বড়ো বড়ো প্রতিদ্বন্দ্বী নগরীরও অভাব ছিল না, যেমন বোখারা এবং ট্রান্স-অক্সিয়ানার শহর বল্‌খ্। বোখারাতে দশম শতাব্দীর শেষ দিকে ইব্‌নে সিনা বা আবিসেন্না জন্মগ্রহণ করেন, আরব দার্শনিকদের মধ্যে ইনিই সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। এর দু শো বছর পরে বল্‌খ্-শহরে জন্মগ্রহণ করেন পারশ্যের আর-একজন বিখ্যাত কবি, জালালুদ্দিন রুমি। রুমিকে খুব বড়ো একজন রহস্যময় অধ্যাত্মতত্ত্ব-বাদী বলা হয়; তিনিই নৃত্য-পর দরবেশ-সম্প্রদায়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

 এইভাবে এক দিকে যুদ্ধবিগ্রহ ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটতে লাগল, অথচ তা সত্ত্বেও অন্য দিকে আরব-পারশ্যের শিল্পকলা ও সংস্কৃতি সম্পূর্ণ প্রাণশতি নিয়ে বেঁচে রইল, সাহিত্যে চিত্রে ভাস্কর্যে অপূর্ব সব বস্তু সৃষ্টি করে চলল। তার পর এল সর্বনাশা ধ্বংস। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে (১২২০ সনের কাছাকাছি সময়ে) চেঙ্গিস খাঁ খোয়ারিশম এবং ইরাণ আক্রমণ ও ধ্বংস করলেন। এর অল্প কয়েক বছর পরেই হুলাগ্ বাগদাদ ধ্বংস করলেন। বহু দীর্ঘ শতাব্দী-ব্যাপী উচ্চস্তরের সংস্কৃতির ফলে যে রত্নভাণ্ডার সঞ্চিত হয়েছিল তা সেই বন্যাপ্লাবনে ধুয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। মোগলরা মধ্য-এশিয়াকে প্রায় মরুপ্রান্তরে পরিণত করল; এর বড়ো বড়ো শহরগুলো, সমস্ত লোক পালিয়ে যাওয়াতে, যেন একেবারেই জনহীন হয়ে পড়ল—এর আগের কোনো একটি চিঠিতে আমি তোমাকে এর কথা বলেছি।

 এই দুর্দৈবের আঘাত মধ্য-এশিয়া আর কোনোদিনই পুরোপরি সামলে উঠতে পারে নি। তবু যে পর্যন্ত সামলে নিয়েছিল তাই আশ্চর্য। তোমার মনে আছে, চেঙ্গিস খাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য অনেক ভাগ হয়ে গেল। পারশ্য এবং তার আশপাশের অঞ্চলটি পড়ল হুলাগুর ভাগে। তিনিও প্রথমটা প্রাণ ভরে ধ্বংসলীলা চালালেন; তার পর কিন্তু বেশ শান্তিপ্রিয় এবং সহিষ্ণু রাজা হয়েই বসলেন; তাঁকে দিয়ে ইল্‌খান রাজবংশটির আরম্ভ হয়। এই ইল্‌খান-রাজারা কিছুদিন পর্যন্ত মোগলদের প্রাচীন ‘শূন্য’-ধর্ম অনুসরণ করলেন, তার পর মুসলমান হয়ে গেলেন। কিন্তু মুসলমান হবার আগে ও পরেও, এঁরা বরাবরই অন্যের ধর্মমতকে সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা দেখিয়ে এসেছেন। চীনে এঁদের জ্ঞাতিরা—‘বড়ো খাঁ’ এবং তাঁর পরিজনবর্গ ছিলেন বৌদ্ধ; তাঁদের সঙ্গে এদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এমনকি অত দূরবর্তী চীনদেশ হতেও এঁরা বিয়ের জন্য মেয়ে আনতেন। মোগলদের পারশ্য এবং চীনের অধিবাসী এই দুটি শাখার মধ্যে, এইরকম সম্পর্ক থাকার ফল শিল্পকলার উপরেও প্রচুর দেখা দিল। চীনা শিল্পের প্রভাব ক্রমে পারশ্যে এসে পড়ল, তখনকার চিত্রকলায় আরব পারশ্য ও চীন, তিন দেশেরই প্রভাবের অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখতে পাই। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও, নানারকম বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও, পারশ্যেরই কলার প্রতিপত্তি বড়ো হয়ে উঠল। চতুর্দশ শতাব্দীতে পারশ্যে আর-একজন বড়ো কবির আবির্ভাব হল। এঁর নাম হাফিজ; এঁর রচনা ভারতবর্ষে আজও জনপ্রিয়।

 মোগল ইল্‌খানদের রাজত্ব বেশি দিন চলে নি। এঁদের শেষ যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তাও বিধস্ত করে দিলেন আর-একজন বড়ো যোদ্ধা; ইনি ট্রান্স্-অক্সিয়ানার অন্তর্গত সমরকন্দের রাজা—তাইমুর। এঁর কথা আমি তোমাকে বলেছি। এই বর্বর যোদ্ধা যেমন ছিলেন ভয়ানক, তেমনি ছিলেন নিষ্ঠুরতায় অতুলনীয়। অথচ ইনিই আবার শিল্পকলারও পরম অনুরাগী ছিলেন; বেশ একজন পণ্ডিতলোক বলেও এঁর খ্যাতি ছিল! এঁর শিল্পানুরাগের বোধ হয় প্রধান প্রমাণ ছিল এই, দিল্লি শিরাজ বাগদাদ দামাস্কাস ইত্যাদি বহু বড়ো বড়ো শহর ইনি লুণ্ঠন করলেন, এবং সমস্ত লুণ্ঠিত জিনিষপত্র নিয়ে গিয়ে নিজের রাজধানী সমরকন্দকে সজ্জিত করে তুললেন। সমরকন্দের সবচেয়ে আশ্চর্য এবং মনোহর অট্টালিকা হচ্ছে তাইমুরের সমাধি—গুর আমির। তাইমুরেরই উপযুক্ত সমাধিস্তম্ভ এটি; এর বিশাল আয়তনের প্রতিটি রেখায় তাইমুরের বিরাট ব্যক্তিত্ব শক্তি আর উগ্রতার প্রতিবিম্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

 তাইমুর একটা বহু বিস্তৃত ভূখণ্ড জয় করেছিলেন; তাঁর মৃত্যুর পরে সেটা আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। কিন্তু অল্প খানিকটা রাজ্য তাঁর বংশধরদের হাতে থেকে গেল, এর মধ্যে পড়ল ট্রান্সঅক্সিয়ানা আর পারশ্য। পুরো এক শো’টি বছর, সম্পূর্ণ পঞ্চাশ শতাব্দীটি ধরে, এই ‘তাইমুরিদ’ রাজারা ইরান বোখারা এবং হিরাটে রাজত্ব করলেন। এটা কিন্তু আশ্চর্যের কথা, সেই নির্মম যোদ্ধার বংশধর এই রাজারা বিখ্যাত ছিলেন তাঁদের দানশীলতা, করুণা এবং শিল্পানুরাগের জন্যে। এঁদের মধ্যে আবার সবচেয়ে বড়ো ছিলেন তাইমুরেরই পুত্র- শাহ্ রুখ। তাঁর রাজধানী হিরাট-শহরে তিনি চমৎকার একটি পুস্তকাগার তৈরি করেন; অসংখ্য পণ্ডিত ও সাহিত্যানুরাগী ব্যক্তি এখানে এসে জড়ো হয়েছিলেন।

 তাইমুরিদ-রাজারা এক শো বছর রাজত্ব করেন, এই সময়টাতে শিল্পকলা আর সাহিত্যের এতদূর উন্নতি হয়েছিল যে, এর নামই হয়ে গেল ‘তাইমুরিদ-আমলের পুনরুজ্জীবন’। পারশ্যের সাহিত্য অনেকখানি সমৃদ্ধ হয়ে উঠল এই সময়ে; সুন্দর সুন্দর ছবিও অনেকই আঁকা হল। চিত্রকলার একটি বিশেষ ধরনের প্রবর্তন করলেন তখনকার বিখ্যাত চিত্রকর বিহ্‌জাদ। এটা লক্ষ্য করবার বস্তু, তাইমুরিদ-রাজাদের সাহিত্য-চক্রের হাতে পারশ্য-সাহিত্যের যেমন উন্নতি হল, ঠিক তার পাশাপাশিই উন্নতি ঘটল তুর্কি-সাহিত্যেরও। মনে রেখো, ঠিক এই সময়টাই ছিল ইতালিতেও পুনরুজ্জীবনের যুগ।

 তাইমুরিদরা জাতিতে তুর্কি; পারশ্যের সংস্কৃতি তাঁদের অনেকখানি অভিভূত করে ফেলছিল। তুর্কি এবং মোগলদের অধীনে থেকেও ইরান সেই বিক্রেতাদের জয় করে নিল তার সংস্কৃতি দিয়ে। তারই সঙ্গে সঙ্গে এদের রাজনৈতিক অধীনতা থেকে মুক্তি পাবার জন্যে পারশ্য চেষ্টা করতে লাগল; তাইমুরিদ-রাজারা ক্রমেই আরও বেশি পূর্ব দিকে হটে যেতে বাধ্য হলেন, তাঁদের রাজ্যও ক্রমে ছোটো হয়ে গেল, মাত্র ট্রান্স-অক্সিয়ানার চার পাশ নিয়ে থাকল তার অস্তিত্ব। ষোড়শ শতাব্দীতে ইরানিদের জাতীয়তাবাদেরই জয় হল; তাইমুরিদ-রাজারা পারশ্য থেকে চিরদিনের মতোই চলে গেলেন। এবার পারশ্যের সিংহাসনে বসল তার দেশেরই একটি রাজবংশ, এর নাম সাফাভি বা সাফাভিদ্-বংশ। এই বংশের দ্বিতীয় রাজা ছিলেন প্রথম তাহ্‌মাস্প্; শেরশাহের হাতে পরাজিত হয়ে হুমায়ুন যখন ভারতবর্ষ থেকে পালিয়ে যান তখন ইনিই তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

 ১৫০২ থেকে ১৭২২ সন পর্যন্ত দু শো কুড়ি বছর ধরে সাফাভি-রাজারা রাজত্ব করেছিলেন। এই সময়টাকে বলা হয় পারশ্যের শিল্পকলার স্বর্ণযুগ। রাজধানী ইস্পাহান-শহর অপূর্ব সুন্দর অট্টালিকায় ভরে উঠল; শিল্পকলা, বিশেষ করে চিত্রকলারও বিখ্যাত কেন্দ্র হয়ে উঠল সে। এই বংশের সবচেয়ে বড়ো রাজা ছিলেন শাহ্ আব্বাস; পারশ্যদেশের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ রাজাদের মধ্যে এঁকে একজন বলে ধরা হয়। ইনি ১৫৮৭ থেকে ১৬২৯ সন পর্যন্ত রাজত্ব করেন। এঁর সময়ে এক দিক থেকে উজবেগরা এবং অন্য দিক থেকে অটোমান তুর্কিরা পারশ্যকে চেপে ধরছিল। তিনি এদের দুই পক্ষকেই পরাজিত করে দূরে তাড়িয়ে দিলেন, নিজের একটি পরাক্রান্ত রাজ্য গড়ে তুললেন, পশ্চিমে এবং অন্যান্য দিকেও দূরস্থিত রাজ্যগুলির সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করলেন, তার পর নিজের রাজধানীটিকে শোভন ও সুন্দর করে তোলবার দিকে মন দিলেন। ইস্পাহানে শাহ্ আব্বাস যে নগর-পরিকল্পনা করেছিলেন তাকে বলা হয়েছে ‘প্রাচীন শুচিতা ও সুরুচির চরম নিদর্শন’। তিনি যে অট্টালিকাগুলি তৈরি করেছিলেন সেগুলি যে শুধু নিজেরা সুন্দর এবং সুসজ্জিত ছিল তাই নয়, সাজানোর কায়দার জন্যও তাদের সৌন্দর্য বহুগুণে বেড়ে গিয়েছিল। সে সময়ে যেসব ইউরোপীয় পর্যটক পারশ্যে গিয়েছিলেন তাঁরা সকলেই অতি উচ্ছ্বসিত ভাষায় এর রূপ-বর্ণনা করেছেন।

 পারশ্যে শিল্পকলার এই স্বর্ণযুগে এর স্থাপত্য, সাহিত্য, প্রাচীর ও আলেখ্য চিত্র, সুন্দর গালিচা-নির্মাণ, মিনার কাজ, সমস্ত কিছুরই উন্নতি হয়েছিল। এর মধ্যে কতকগুলো প্রাচীরচিত্র এবং আলেখ্যচিত্র ছিল একেবারে অপরূপ সুন্দর। শিল্পকলা কখনও দেশ বা জাতির সীমা নিয়ে গণ্ডিবদ্ধ থাকে না, থাকা উচিতও নয়। ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দীর এই পারশিক শিল্পকে বহু দেশের বহু প্রভাবই নিশ্চয় এসে সমৃদ্ধ করে তুলেছিল। অনেকে বলেন, ইতালির প্রভাব নাকি এর মধ্যে সুস্পষ্ট। কিন্তু এই সব কিছুরই পিছনে রয়েছে ইরানের প্রাচীন শিল্পরীতি। হাজার বছর ধরে সে রীতি ইরানে টিঁকে রয়েছিল। ইরানি সংস্কৃতিরও কর্মক্ষেত্র শুধু পারশ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে নি—পশ্চিমে তুর্কি ও পর্বে ভারতবর্ষ পর্যন্ত অতি বিরাট স্থান নিয়ে সে বিস্তার লাভ করেছিল। ইউরোপে ফরাসি ভাষার মতো, ভারতে মোগল সম্রাটদের দরবারে এবং পশ্চিম এশিয়ারও সর্বত্রই, সংস্কৃতিপ্রাপ্ত সমাজের ভাষা হয়েছিল ফার্সি ভাষা। আগ্রার তাজমহলে পারশিক শিল্পকলার প্রাচীন রীতির পরিচয় আজও অমর হয়ে রয়েছে। ঠিক একই ভাবে এই শিল্পকলা অটোম্যানদের স্থাপতাশিল্পকেও প্রভাবান্বিত করেছিল, পশ্চিমে কনস্টাণ্টিনোপ্‌ল্ পর্যন্ত তার প্রমাণ দেখা যায়; সেখানকার অনেক প্রসিদ্ধ অট্টালিকায় পারশিক প্রভাবের চিহ্ন সুস্পষ্ট।

 পারশ্যের সাফাভি-রাজারা মোটামুটি হিসেবে ভারতের মোগল-সম্রাটদের সমসাময়িক ছিলেন। ভারতের প্রথম মোগল সম্রাট বাবর ছিলেন সমরকন্দের তাইমুরিদ রাজপুত্রদের একজন। পারশিকদের শক্তিবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তারা তাইমুরিদ-রাজবংশকে দূর করে দিয়েছিল; ট্রান্স-অক্সিয়ানা এবং আফগানিস্থানের খানিক অংশমাত্র বিভিন্ন তাইমুরিদ-রাজার অধীন হয়ে ছিল। বারো বছর বয়স থেকেই বাবরকে এইসব ক্ষুদ্র রাজাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেড়াতে হয়েছে। যুদ্ধে এদের হারিয়ে তিনি কাবুলের সিংহাসন অধিকার করলেন; তার পর এলেন ভারতবর্ষে। এই সময়কার তাইমুরিদরাজারা কতখানি সংস্কৃতির অধিকারী হয়েছিলেন বাবরকে দেখেই তা বোঝা যায়। এর আগের একটি চিঠিতে আমি তোমাকে তাঁর আত্মজীবনী থেকে কিছু কিছু কথা উদ্‌ধৃত করে পাঠিয়েছি। সাফাভি-বংশের সবচেয়ে বড়ো রাজা শাহ্ আব্বাস ছিলেন আকবর এবং জাহাঙ্গীরের সমসাময়িক। দুটি দেশের মধ্যে আগাগোড়া খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব নিশ্চয় বজায় ছিল। বহুদিন ধরে এদের সীমান্তরেখাও এক ছিল, কারণ আফগানিস্থান ছিল মোগলদের ভারত সাম্রাজ্যেরই একটি অংশ।