বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ইসলামধর্মের আবির্ভাব
৪৮
ইসলামধর্মের আবির্ভাব
২১শে মে, ১৯৩২
কত কত দেশের ইতিহাস, কত কত রাজ্য ও সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের কাহিনী আমরা আলোচনা করেছি; কিন্তু এযাবৎ আরবদেশের ইতিহাস আলোচনা করি নি। মানচিত্রের দিকে তাকাও। পশ্চিমে মিশর, উত্তরে সিরিয়া এবং ইরাক, পূর্ব দিক ঘেঁষে পারশ্য অথবা ইরান; আর একটু উত্তর-পশ্চিমে দেখো এশিয়া মাইনর আর কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্। অদূরে গ্রীস, আর সমুদ্রের ঠিক পরপারেই ভারতবর্ষ। চীন আর সুদূর প্রাচ্যের কথা বাদ দিলে, প্রাচীন সভ্যতার দিক থেকে আরবদেশ একেবারে কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। কত সমৃদ্ধিশালী নগর গড়ে উঠেছিল চার দিকে—ইরাকে টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিস নদীর তীরে; মিশরে আলেকজান্দ্রিয়া নগর, সিরিয়ায় দামাস্কাস্, এশিয়া মাইনরে এণ্টিওক্। আরবগণ ছিল ব্যবসায়ী এবং ব্যবসার খাতিরে দেশবিদেশে ঘুরে বেড়াত। ঐসমস্ত শহরে তারা নিশ্চয়ই বহুবার যাতায়াত করেছে। কিন্তু তথাপি ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা আরবদেশে ঘটে নি; আশেপাশের দেশগুলোর মতো উঁচুস্তরের সভ্যতাও কোনোকালে সে দেশে ছিল না। অন্য দেশ জয় করবার চেষ্টা আরবগণ করে নি; আবার অন্যের পক্ষেও আরবদেশ জয় করা সহজ ছিল না।
মরুভূমির দেশ এই আরব। মরুভূমি আর পার্বত্য দেশের অধিবাসীরা সাধারণত কঠোর প্রকৃতির লোক, স্বাধীনতাপ্রিয়; সহজে বশ্যতা স্বীকার করে না। আরব ঐশ্বর্যশালী দেশ ছিল না, কাজেকাজেই কোনো বিদেশী আক্রমণকারী কিংবা সাম্রাজ্যবাদীর কুদৃষ্টি পড়ে নি। সে দেশে থাকবার মধ্যে ছিল ছোটো দুটি শহর, মক্কা আর এদ্রিব। বাদবাকি সব মরুভূমি এবং সেখানেই লোকে ঘরবাড়ি করে বাস করত। তাদের বলা হত বেদুইন, অর্থাৎ মরুভূমির অধিবাসী। ওদের চিরসঙ্গী ছিল উট আর ঘোড়া। গাধাও তাদের খুব বিশ্বস্ত বন্ধু ছিল, অদ্ভূত সহনশক্তি কিনা ঐ জীবের! গাধার সহিত তুলনা করলে আরববাসীরা নিন্দার কথা বলে মনে করত না।
মরুভূমির দেশের এই লোকেরা স্বভাবতই ছিল গর্বিত আর ঝগড়াটে; অল্পেতেই রেগে উঠত। পরস্পরের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি লেগেই থাকত; বৎসরে একবার ঝগড়া মিটমাট করে সবাই মিলে একসঙ্গে যেত তীর্থস্থানে, মক্কায়। অনেক দেবতার মূর্তি ছিল সেখানে। বিশেষ করে, তারা এক বিরাট কালো প্রস্তরখণ্ডের পূজা করত, ওটা কাবা নামে পরিচিত।
আরবগণ ছিল যাযাবর জাতি; অবশ্য পরে তারা নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত হয়েছে। কত সময়ে কত সাম্রাজ্য আরবদেশকে অধিকারভুক্ত করতে চেয়েছে; কিন্তু যাযাবর মরুজাতিকে অধীনস্থ করা কি সহজ ব্যাপার?
খৃষ্টীয় তৃতীয় শতকে সিরিয়ার অন্তর্গত পাল্মিরাতে একটি ছোটো রাষ্ট্র কিছুকাল আধিপত্য বিস্তার করেছিল; কিন্তু সেটা ছিল আরবদেশের সীমানার বাইরে। বেদুইনরা তাই বংশপরম্পরায় মরুভূমিতেই বাস করত, আর আরবরা জাহাজে করে দেশবিদেশে যেত ব্যবসা করতে। দেশের কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় নি। কতক লোক খৃষ্টান হল, আবার কতক হল ইহুদি; কিন্তু অধিকাংশই ছিল মক্কার সেই কাবা এবং অন্যান্য ৩৬০টি মূর্তির উপাসক।
আরবজাতি বহুযুগ ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল; বাইরের জগতে কী ঘটছে না ঘটছে তার খবরাখবর রাখত না কিছু। কিন্তু হঠাৎ এক সময়ে তার ঘুম ভেঙে গেল, আয়ত্ত করল বিপুল ক্ষমতা, সারা পৃথিবীর চমক লেগে গেল। আরবজাতির এই কাহিনী, কী করে তারা এশিয়া ইউরোপ আর আফ্রিকার ছড়িয়ে পড়ল, গড়ে তুলল উচ্চাঙ্গের সভ্যতা ও সংস্কৃতি, সেটা ইতিহাসে একটা বিস্ময়কর ব্যাপার।
আরবজাতির এই নব চেতনা ও শক্তির মূলে ইসলামধর্ম। এই ধর্মের প্রবর্তক মহম্মদ ৫৭০ খৃষ্টাব্দে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। ইনি খুব শান্ত-সমাহিত জীবন যাপন করতেন; লোকে তাঁকে খুব বিশ্বাস করত। কিন্তু যখন তিনি ধর্মপ্রচার শুরু করলেন, বিশেষ করে মক্কায় মূর্তিপুজোর বিরদ্ধে অভিমত প্রকাশ করলেন তখন চার দিক থেকে লোকে প্রতিবাদ করতে লাগল এবং শেষপর্যন্ত তারা মহম্মদকে মক্কা থেকে তাড়িয়ে দিলে; অল্পের জন্যে তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেন।
মহম্মদ প্রচার করলেন, ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয় এবং তিনিই (মহম্মদ) ঈশ্বর-প্রেরিত মহাপুরুষ বা পয়গম্বর।
মক্কা থেকে বিতাড়িত হয়ে মহম্মদ তাঁর কয়েকজন শিষ্যসহ এদ্রিবে আশ্রয় নিলেন। এই ঘটনা ৬২২ খৃষ্টাব্দে ঘটেছিল। মক্কা থেকে এই পলায়নকেই আরবি ভাষায় “হিজরী” বলা হয় এবং এই তারিখ থেকেই মুসলমানেরা সাল গণনা করে থাকেন। ওঁদের মাস গণনা করা হয় চন্দ্রের গতি অনুযায়ী আর আমাদের সূর্যের গতি অনুসারে। সৌর বৎসর গণনায় পাঁচ কি ছয় দিন বেশি হয়। “হিজরী সালে মাসগুলো ঋতু অনুযায়ী স্থির থাকে না, নড়চড় হয়; এ বৎসর শীতকালে যে মাস পড়ল, কয়েক বছর বাদে সেটা সরে যাবে গ্রীষ্মকালে।
৬২২ খৃষ্টাব্দে মহম্মদের পলায়নের তারিখ বা হিজরীর আরম্ভ থেকে ইসলামধর্মের অভ্যুদয় ধরা হয়; তবে বলতে গেলে কিছু আগে থেকেই তার সূচনা হয়েছিল। এদ্রিব নগর মহম্মদকে সাদরে গ্রহণ করল এবং তাঁর সম্মানার্থে ঐ নগরের নাম দেওয়া হল মদিনাৎ-উন্-নবী, অর্থাৎ পয়গম্বরের শহর। বর্তমানে এই শহর মদিনা নামে পরিচিত।
ইসলামধর্মের বিস্তার এবং আরবজাতির ক্ষমতালাভের কথা বলার আগে একবার চার দিকের অবস্থাটা পর্যবেক্ষণ করা যাক। রোম নগরীর পতন হয়েছে। গ্রীক-রোমান সভ্যতার চিহ্নমাত্র নেই। উত্তর ইউরোপের উপজাতিসমূহ ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছে এবং একটা নূতন ধরনের সভ্যতা গড়ে তোলবার চেষ্টা করছে। এদিকে প্রাচীন সভ্যতা সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছে, নূতন সভ্যতারও বিকাশ হয় নি, সুতরাং ইউরোপে তখন অন্ধকারের যুগে। ইউরোপের পূর্বপ্রান্তে অবশ্য পূর্ব রোমসাম্রাজ্য তখনও টিঁকে ছিল; কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্ নগর তখন খুব সমৃদ্ধিশালী, ইউরোপের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নগর। জাঁকজমকের অন্ত ছিল না। কিন্তু তথাপি সাম্রাজ্য ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছিল। পারশ্যের সঙ্গে যুদ্ধ লেগেই ছিল। পারশ্যের দ্বিতীয় খস্রু কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্-সাম্রাজ্যের কিয়দংশ জয় করে নিয়েছিল এবং এমনকি আরবদেশের উপরেও অধিকারের দাবি করেছিল। খস্রু মিশর জয় করে কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্ পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল, কিন্তু সেখানে গ্রীক সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট পরাজিত হয়।
সুতরাং দেখতে পাচ্ছ, পাশ্চাত্যে ইউরোপ এবং প্রাচ্যে পারশ্যের অবস্থা তখন রীতিমতো মন্দ। তার ওপরে আবার বিভিন্ন খৃষ্টীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ছিল বিরোধ। পাশ্চাত্যে এবং আফ্রিকায় খৃষ্টধর্মের রূপ বিকৃত; পারশ্যেও রাষ্ট্রধর্ম ছিল জরথুস্ট্রের ধর্ম এবং তাই অধিবাসীদের ওপরে জোর করে চাপানো হয়েছিল। কাজেকাজেই ইউরোপ, আফ্রিকা কিংবা পারশ্যের জনসাধারণ প্রচলিত ধর্মে অবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল। ঠিক এই সময়েই, অর্থাৎ সপ্তম শতাব্দীর প্রথম ভাগে, ইউরোপে ভীষণ মহামারী দেখা দেয় এবং তাতে লক্ষ লক্ষ লোক মৃত্যুমুখে পতিত হয়।
ভারতবর্ষে তখন হর্ষবর্ধনের রাজত্ব; পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এ দেশে এসেছেন। ভারতসাম্রাজ্য খুব শক্তিশালী। কিন্তু অনতিকাল পরে উত্তর-ভারত ছিন্নবিচ্ছিন্ন আর দুর্বল হয়ে পড়ল। সুদূর প্রাচ্যে চীনদেশে তাঙ-বংশের রাজত্ব সবেমাত্র শুরু হয়েছে। ৬২৭ খৃষ্টাব্দে চীনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট তাই সুঙ সিংহাসনে আরোহণ করেন; চীন-সাম্রাজ্য পশ্চিমে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত বিস্তারলাভ করল। মধ্য-এশিয়ার অধিকাংশ দেশ তাঁর বশ্যতা স্বীকার করল। তবে সম্ভবত এই বিরাট সাম্রাজ্যে কোনো কেন্দ্রীয় গভর্মেণ্ট ছিল না।
চীন খুব শক্তিশালী সাম্রাজ্য, কিন্তু অনেক দূরে; ভারতবর্ষও অন্তত কিছুকাল বেশ শক্তিশালী ছিল এবং কোনো বিরোধ ছিল না; ইউরোপ ও আফ্রিকার অবস্থা ক্লান্ত আর দুর্বল। এশিয়া আর ইউরোপখণ্ডের যখন ইত্যাকার অবস্থা, তখন ইসলামধর্মের অভ্যুদয় হয়। তিনি তখন
পলায়নের সাত বৎসরের মধ্যে মহম্মদ আবার মক্কা নগরীতে ফিরে এলেন। তিনি তখন অপূর্ব ক্ষমতাশালী। ইতিপূর্বে মদিনা থেকেই তিনি পৃথিবীর নানা রাজা আর সম্রাটদের নিকট এই মর্মে আদেশনামা পাঠিয়েছিলেন, যেন সকলেই ঈশ্বরকে একমেবাদ্বিতীয়ম্ এবং তাঁকে পয়গম্বর বলে স্বীকার করে। কন্স্টাণ্টিনোপ্লের সম্রাট হিরাক্লিয়াস এবং পারশ্যের রাজা সেই শমন পেয়েছিলেন; এমনকি চীন-সম্রাট তাই সুঙও নাকি বাদ যান নি। ওঁদের নিশ্চয়ই তাজ্জব লেগেছিল যে, কোথাকার কে জানা নেই, একেবারে হকুম করে বসল? যাই হোক, এ থেকে বোঝা যায়, নিজের ধর্মের ওপরে মহম্মদের খুব আস্থা ছিল। তাঁর এই বিশ্বাসের বলেই তিনি আরবজাতির উপর প্রভাব বিস্তার করলেন, নূতন শক্তির সঞ্চার করলেন মরু জাতির মধ্যে; জয় করলেন অর্ধ পৃথিবী।
নিজের ওপর আস্থা এবং বিশ্বাস একটা বড়ো জিনিষ। ইসলামধর্মের বাণী হল, ইসলামধর্মাবলম্বীরা সবাই এক, ভাই-ভাই। এতে করে লোকে গণতন্ত্রের কতকটা আঁচ পেল। তৎকালে খৃষ্টধর্ম যেরূপ বিকৃত হয়ে পড়েছিল তাতে এই ভ্রাতৃত্বের বাণী কেবল আরবজাতিরই নহে, অন্যান্যদেশের অধিবাসীদের মনেও সাড়া জাগিয়েছিল।
মহম্মদ ৬৩২ খৃষ্টাব্দে পরলোকগমন করেন। তিনি আরবদেশের কতকগুলো যুদ্ধমান উপজাতিকে একতাসূত্রে আবদ্ধ করে একটা নেশন বা জাতি গড়ে তুলেছিলেন এবং তাদের মধ্যে একটা নতুন শক্তির সঞ্চার করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে মুসলিম সমাজের নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন তাঁর পরিবারেরই এক ব্যক্তি, নাম আবুবকর। তিনি খলিফা নামে অভিহিত হলেন। দুই বৎসর পরে আবুবকরের মৃত্যু হয়; এবারে খলিফা হলেন ওমর, এবং তিনি দশ বৎসর কাল খলিফা ছিলেন।
আবুবকর এবং ওমর উভয়েই ধর্মগুরু, আর রাজনীতিজ্ঞ হিসাবে খুব বড়ো এবং ক্ষমতাশালী ছিলেন। এঁদের আমলেই আরবজাতি নুতন আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়। পদের গুরুত্ব ছিল খুব, ক্ষমতাও ছিল যথেষ্ট; কিন্তু আশ্চর্য, এঁদের জীবনযাত্রা ছিল নেহাত সহজ ও সরল; জাঁকজমক, বিলাস একেবারে পছন্দ করতেন না। ইসলামধর্মের গণতন্ত্রের বাণী তাঁরা আঁকড়ে ধরেছিলেন। অথচ তাঁদের কর্মচারী আমীর ওমরাহগণ বেজায় বিলাসী ছিল, সিল্ক ছাড়া কিছু ব্যবহার করত না; আবুবকর আর ওমর নাকি এজন্যে তাদের তিরস্কার করতেন, শাস্তি দিতেন এবং অনেক সময়ে ওদের অমিতাচারের জন্যে নিজেরা চোখের জল ফেলতেন। তাঁরা এ কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, সরল ও কর্মকঠোর জীবনযাত্রা পরিত্যাগ করে পারশ্য কিংবা কন্স্টাণ্টিনোপ্ল্-রাজসভার দেখাদেখি যদি আরবগণ বিলাসী হয়ে ওঠে তবে তাদের পতন অবশ্যম্ভাবী।
যাই হোক, আবুবকর আর ওমরের আমলে এই বারো বছরের মধ্যেই পূর্ব-রোম-সাম্রাজ্য, পারশ্য, ইরাক, সিরিয়া, জেরুজালেম এই নতুন মুসলমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হল।