বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ঊনবিংশ শতাব্দীর অনুপূর্ব

উইকিসংকলন থেকে

১০৮

ঊনবিংশ শতাব্দীর অনুপূর্ব

২৪শে নভেম্বর, ১৯৩২

 আগের চিঠিখানিতে, ঊনবিংশ শতাব্দীর উল্লেখযোগ্য ঘটনা ও বিরাট যন্ত্রগুলির আবির্ভাবের পরে পশ্চিম-ইউরোপ জুড়ে নিল যে শ্রমশিল্পঘটিত ধনতন্ত্রবাদ, তারই পরিণামের কথা বলেছি। পশ্চিম-ইউরোপের এই শ্রেষ্ঠতার অন্যতম কারণ, তার অধিকারে ছিল প্রচুর কয়লা ও লোহা; আর প্রকাণ্ড যন্ত্রগুলি চালাতে কয়লা ও লোহার প্রভূত প্রয়োজন।

 এই ধনতন্ত্রবাদের পরিণাম হল সাম্রাজ্যবাদ ও জাতীয়তাবাদ। এ জাতীয়তাবাদ নূতন কিছু নয়, আগেও এর অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু এখন এ প্রগাঢ়তর ও সংকীর্ণতর হয়ে উঠল। একই সময়ে এ সৃষ্টি করছিল নৈকট্যের ও দূরত্বের। একই জাতীয়তার গণ্ডীর মধ্যে বাস করত যারা তারা ক্রমশ সংহত হয়ে আসতে লাগল, কিন্তু তেমনি দূরে পড়ে যেতে লাগল তারা অন্য জাতির কাছ থেকে। প্রত্যেক দেশে যেমন দেশপ্রেম জাগতে লাগল, তারই সঙ্গে এল বিদেশীর প্রতি বিদ্বেষ। ইউরোপে শিল্প-বাণিজ্যে সমুন্নত দেশগুলি পরস্পরের প্রতি চোখ রাঙিয়ে রইল হিংস্র পশুর মতো। লুটের মাল ইংলণ্ডই পেল সর্বাধিক, তাকেই আঁকড়ে রইল সে। কিন্তু জর্মনি প্রভৃতি অন্যান্য দেশের পক্ষে ইংলণ্ডের এই ক্ষমতা হয়ে উঠল অসহ্য। কাজেই সংঘাত বাড়ল, শুরু হল প্রকাশ্য সংগ্রাম। শ্রমশিল্পগত ধনতন্ত্রবাদ ও তার প্রশাখা সাম্রাজ্যবাদ, এরা শুধু নিয়ে যায় সংঘাত ও সংগ্রামের দিকে। এদের মধ্যে নিহিত আছে প্রতিযোগিতা ও দেশ-জয়ের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত সংগতিহীন বিরোধ। ভাই প্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদের সন্তান জাতীয়তাবাদ হল তার কঠিন শত্রু।

 এইসব বিরোধ সত্ত্বেও ধনতান্ত্রিক সভ্যতা বহু আবশ্যক শিক্ষা দান করেছিল। শৃঙ্খলা শিখিয়েছিল সে, কারণ বিরাট যন্ত্রপাতি ও বিপুল শ্রমশিল্প চালাতে প্রভুত শৃঙ্খলা-রক্ষা প্রয়োজন। সুবৃহৎ কর্মাদিতে সহযোগিতা-শিক্ষাও হল তার কল্যাণের, নৈপুণ্য ও সময়ানুবর্তনও এল তার থেকে। এসব গুণাবলী ছাড়া বড়ো বড়ো কারখানা বা রেলপথ চালানো সম্ভব নয়। কখনও কখনও বলা হয়, এগুলি পুরো পাশ্চাত্য গুণ, প্রাচ্যদেশে এ গুণ দেখা যায় না। অন্যান্য বহু প্রশ্নের মতো এতেও প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের কথাই ওঠে না। বাণিজ্যশিল্পের ফলেই এই গুণগুলির বিকাশ, আর সে শিল্পে পাশ্চাত্যদেশ উন্নত বলেই সে এই গুণসম্পন্ন। প্রাচ্যদেশ এখনও কৃষিপ্রধান বাণিজ্য প্রধান নয়; এবং সেইজন্যেই এই গুণ-রহিত।

 ব্যবসায়িক ধনতন্ত্রবাদ আরও একটা বড়ো কাজ করেছিল। শক্তির সাহায্যে অর্থলাভের পথ দেখিয়ে দিয়েছিল সে। শক্তি অর্থাৎ, বড়ো বড়ো যন্ত্রপাতি, কয়লা, বাষ্প ইত্যাদি। পৃথিবীতে সবাইকার ভোগ করার মতো জিনিষ বোধ হয় নেই, ফলে বহু লোক সর্বদাই দারিদ্র্যপীড়িত হয়ে থাকবে—এই যে একটা আশংকা অনেকদিন থেকেই ছিল এর মূলভিত্তি নষ্ট হয়ে গেল। বিজ্ঞান ও যজ্ঞশিল্পের সাহায্যে প্রচুর আহার্য, বস্ত্র ও অন্যান্য আবশ্যক জিনিষ পৃথিবীর জনসংখ্যার জন্যে উৎপন্ন করা সম্ভব। উৎপাদন-সমস্যার এভাবে সমাধান হল, অন্তত কল্পনায়। অথচ ঐখানেই ঘটল তার অবসান। অর্থ অবশ্য নিঃসংশয়েই প্রচুর উৎপন্ন হল, কিন্তু গরিবেরা সেই গরিবই রইল, দারিদ্র্য আরও বেশি করে পীড়া দিতে লাগল তাদের। ইউরোপ-অধিকৃত পূর্বাঞ্চলে ও আফ্রিকাদেশে অবশ্যই অত্যাচার তার নির্লজ্জ নগ্নমূর্তি নিয়ে দেখা দিল। সে দেশের হতভাগ্য অধিবাসীদের জন্যে মাথা ঘামানোর কেউ ছিল না। কিন্তু পশ্চিম-ইউরোপেও দারিদ্র্য ঘুচল না, বরং প্রকাশ পেল স্পষ্টতররূপে। কিছুদিন পৃথিবীর অবশিষ্টাংশ সেঁচে তার ধন এসেছিল পশ্চিম-ইউরোপে। তবে তার অধিকাংশই রইল শীর্ষস্থানীয় ধনী সম্প্রদায়ের ঝুলিতে, কেবল সামান্য একটু ফুটো দিয়ে ঝরে পড়ল দরিদ্রদের হাতে, তাদের জীবনযাত্রার মান একটু উন্নত হল। লোকসংখ্যাও হূ হূ করে গেল বেড়ে।

 কিন্তু এই অর্থবৃদ্ধি, এই জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, এর অধিকাংশই হতে লাগল শিল্পে বাণিজ্যে অনগ্রসর এশিয়া, আফ্রিকা প্রভৃতি বিজিত দেশবাসীর ব্যয়ে। ধনতন্ত্রবাদের বিরুদ্ধে সমালোচনা কিছুদিন চেপে রাখল এই জয়লাভ, এই অর্থের প্রবাহ। তবু, ধনী-দরিদ্রের মধ্যে যে বিভেদ ও দূরত্ব তা শুধু বেড়েই চলল। তারা ছিল যেন দুটি বিভিন্ন দলীয় লোক, দুটি পৃথক জাতি। বেঞ্জামিন ডিস্‌রেলি ঊনবিংশ শতাব্দীর যশস্বী ইংরেজ রাজনীতিবিদ্। তিনি এই দুটি দলকে বর্ণনা করে গেছেন:

 “দুটি জাতি; তাদের মধ্যে কোনো সহানভূতি, কোনো সম্পর্ক নেই; একে অন্যের অভ্যাস, অন্যের চিন্তাধারা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, যেন তারা ভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসী, যেন ভিন্ন গ্রহে তাদের বাস। ভিন্ন অবস্থায় তাদের জন্ম, ভিন্নরকম তাদের আহার, ভিন্নরকম তাদের আচরণ, ভিন্নরকম তাদের নিয়মকানুন—এক ধনী, আর এক দরিদ্র।”

 শ্রমশিল্পের এই নূতন অবস্থায় বিরাট কারখানাগুলিতে কাজ করতে এল অসংখ্য মজুর, ফলে আর-একটা নূতন শ্রেণী জেগে উঠল—শ্রমিকশ্রেণী। চাষিদের থেকে এরা নানারকমে ভিন্ন ছিল। ঋতুভেদে ও বৃষ্টিপাতের উপর বহুলাংশে নির্ভর করে থাকে কৃষকেরা। এ দুটি জিনিষ তাদের আয়ত্ত নয়, তাই তাদের মনে হয় দুঃখদারিদ্র্যের মূলে অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তি। কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয় সে, আর্থিক কারণগুলিকে অগ্রাহ্য করে এক নৈরাশ্যময় জীবন-যাপন করে অমোঘ নিষ্ঠুর এক শক্তির উপর সব ছেড়ে দিয়ে। কিন্তু শ্রমিকের কাজ মানুষেরই গড়া যন্ত্র নিয়ে। ঋতুভেদ, বৃষ্টিপাত তার মাল-উৎপাদনে বাধ সাধতে পারে না। অর্থ উৎপন্ন করে সে, কিন্তু দেখতে পায় যে তার অধিকাংশই চলে যায় অন্যের হাতে, সে গরিবই রয়ে যায়। সে কতকটা দেখে, কেমন করে অর্থনৈতিক বিধান তার কাজ করে যায়। তাই সে অপার্থিব কোনো শক্তির কথা ভাবে না, কৃষিজীবীর মতো তার মন অন্ধ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন নয়। তার দারিদ্র্যের জন্যে সে দেবতাদের দোষ দেয় না। দোষ দেয় সমাজকে, সামাজিক নিয়মকে, বিশেষ করে যে পুঁজিবাদী মালিক তার লাভের অংশে ভাগ বসিয়ে নিজের অর্থবৃদ্ধি করে, তাকে। সে হয় শ্রেণী-সচেতন; দেখে যে, তার উপর ওৎ পেতে বসে রয়েছে অন্যান্য উচ্চতর শ্রেণী। আর এর ফলে সৃষ্টি হয় অশান্তির, সৃষ্টি হয় বিদ্রোহের। সে ক্ষোভের প্রথম সূচনা হয় অস্ফুট অর্থহীন ধ্বনির মধ্য দিয়ে, প্রথম বিদ্রোহ হয় অন্ধ চিন্তাহীন দুর্বল; অনায়াসে শাসকেরা তাকে দমন করে ফেলে, কারণ বর্তমানের শাসক-সম্প্রদায়-গঠিত এই নূতন মধ্যবিত্তশ্রেণী, বড়ো বড়ো কারখানা যারা চালায়, তাদের নিয়ে। কিন্তু বুভুক্ষাকে তো দমন করা যায় না, হতভাগ্য শ্রমিক নূতন শক্তির সন্ধান পায় তার সঙ্গীদের সঙ্গে দৃঢ়তর ঐক্যের মধ্যে, আবার জেগে ওঠে সে। তাই মজুরদের রক্ষা করবার জন্যে, তার অধিকারের পক্ষ নিয়ে লড়াই করবার জনো প্রতিষ্ঠা হয় শ্রমিক সংঘের। প্রথমে তাদের কর্মধারা চলে গোপনে; কারণ সরকার দেবে না তাদের সংঘবদ্ধ হতে। ক্রমেই স্পষ্টতর হয়ে ওঠে এই সত্য যে, শাসক-সম্প্রদায় শ্রেণীবিশেষের প্রতিনিধিমাত্র, এবং সেই শ্রেণীকে রক্ষা করতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বিধিবিধান সেও শ্রেণীবিশেষের জন্যে। ধীরে ধীরে শ্রমিকেরা শক্তিসঞ্চয় করে, তাদের সংঘ হয়ে ওঠে শক্তিমান, সুসমঞ্জস। নানারকম শ্রমিকেরা সবাই দেখতে পায়, তাদের উদ্দেশ্য এক—অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। অতএব, বিভিন্ন সংঘগুলি একত্র হয়ে সারা দেশের কারখানার মজুরেরা ঐক্যবদ্ধ একটি দলে পরিণত হয়। এর পরের কার্যভার হল অন্যান্য দেশের মজুরদেরও নিজেদের সঙ্গে একত্রিত করা, কারণ তারাও বোঝে যে তাদের একই উদ্দেশ্য, একই শত্রু। রব ওঠে, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’, আন্তর্জাতিক শ্রমিকসংঘ গঠিত হয়। এদিকে ধনতান্ত্রিক শিল্পবাণিজাও প্রসারলাভ করে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায় সেও। এবার শ্রমিকের দল ধনতন্ত্রকে রুখে দাঁড়ায় সর্ব জায়গায় যেখানেই প্রসারিত হয়েছে ধনতন্ত্র।

 আমি বড়োই দ্রুততালে এগিয়ে গিয়েছি, এবারে একটু পিছিয়ে আসতে হবে। কিন্তু এই ঊনবিংশ শতাব্দীর পৃথিবী বিভিন্ন (মধ্যে মধ্যে পরস্পরবিরোধী) মতবাদের এমনই এক জটিল মিশ্রণ যে, তাদের সবগুলিকে দৃষ্টির সামনে রাখা কঠিন। ভাবতেই পারছি না, এই জাতীয়তা, আন্তর্জাতিকতা, সাম্রাজ্যবাদ, অর্থ ও দারিদ্র্যের অপূর্ব সংমিশ্রণ থেকে তুমি কী করবে। কিন্তু জীবনটাই তো তাই। অতএব, যেমন আছে তেমনি অবস্থাতেই তাকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে, বোঝবার চেষ্টা করতে হবে; তার পর তাকে উন্নত করে তুলতে হবে।

 এই রাশিকৃত অসামঞ্জস্য ইউরোপ ও আমেরিকার বহু লোককে ভাবিরে তুলেছিল। এ শতাব্দীর সচনায় যখন নেপোলিয়নের পতন হল, কোনো ইউরোপীয় দেশই তখন বিশেষ স্বাধীন ছিল না। কোনো কোনো দেশে চলছিল রাজার অত্যাচার, আবার ইংলণ্ডের মতো কয়েকটিতে ক্ষুদ্র এক ধনীসম্প্রদারই ছিল শক্তির আসনে। আগেই বলেছি, সর্বত্রই উদারপন্থীদের দমন করে রাখা হত। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমেরিকা ও ফ্রান্সের বিপ্লবের ফলে গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিষয় উদারপন্থী চিন্তাশীল ব্যক্তিদের নজরে পড়েছিল, এবং সে সম্বন্ধে যথার্থ ধারণাও জন্মেছিল। বাস্তবিক, সাধারণত জিনিষটা রাষ্ট্র ও জনসাধারণের সর্ববিধ রোগের মহৌষধ বলে বিবেচিত হত। সাধারণতন্ত্রের আদর্শ ছিল এই যে, বিশেষ অধিকার বলে কিছু থাকা উচিত নয়; রাষ্ট্রের ভোগে সবারই সামাজিক এবং রাজনৈতিক মূল্য সমান থাকবে। অবশ্য নানা দিক দিয়ে একের সঙ্গে অন্যের যথেষ্ট প্রভেদ থাকে; কেউ-বা অন্যের চেয়ে সবল, কেউ বেশি জ্ঞানী, কেউ-বা অধিকতর নিঃস্বার্থ। কিন্তু সাধারণতন্ত্রে বিশ্বাসীদের মতে লোকের মধ্যে এমনি প্রভেদ যতই থাক-না কেন, সকলেরই রাজনৈতিক অধিকার সমান হতে হবে। এবং এই অবস্থার আগমন হবে সকলকে নির্বাচনের অধিকার দিয়ে। প্রগতিপন্থী এবং উদারমতাবলম্বীরা সাধারণতন্ত্রে প্রগাঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, এবং এর জন্যে প্রচুর পরিশ্রম করেছিলেন। রক্ষণশীল এবং প্রতিক্রিয়াশীল দল তাঁদের বাধা দিল, এবং এর ফলে বিপুল কলহের সৃষ্টি হল। কোনো কোনো দেশে বিপ্লব হল। ইংলণ্ড প্রায় বিপ্লবের মুখে এসে পড়েছিল, এমন সময় নির্বাচনাধিকার বৃদ্ধি করা হল, অর্থাৎ অধিকসংখ্যক লোককে পার্লামেণ্টে সভ্য-নির্বাচনের অধিকার দেওয়া হল। ক্রমে কিন্তু গণতন্ত্রের জয় হল অধিকাংশ স্থলেই, এবং পশ্চিম-ইউরোপ ও আমেরিকাতে এই শতাব্দীর শেষ ভাগে অধিকাংশ লোকেরই অন্তত নির্বাচনাধিকার জন্মাল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্রই ছিল মহান আদর্শ, এবং সেই সূত্রে একে ‘গণতন্ত্র-শতাব্দী’ আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। পরিণামে গণতন্ত্রের জয় হল, কিন্তু এই পরিণাম যখন এল তখন লোকে গণতন্ত্রে আস্থা হারাতে আরম্ভ করেছে। তারা দেখল, গণতন্ত্রের ফলে দারিদ্র্য এবং দুর্দশা দূর হয় নি, ধনতান্ত্রিক রীতির অনেক বৈপরীত্য যেমন তেমনিই রয়ে গেছে। ক্ষুধার্ত লোকের কাছে নির্বাচনাধিকারের মূল্য কী? একবার আহারের পরিবর্তে যার নির্বাচনাধিকার অথবা আনুগত্য ক্রয় করা যায় তার স্বাধীনতার অর্থ কী? ফলে গণতন্ত্রের দুর্নাম ঘটল, অথবা রাজনৈতিক গণতন্ত্রের উপর থেকে লোকের বিশ্বাস চলে গেল। কিন্তু সে ইতিহাস ঊনবিংশ শতাব্দীর বাইরে।

 গণতন্ত্রের বিবেচ্য বিষয় ছিল, স্বাধীনতার রাজনৈতিক রূপ। এ ছিল একতন্ত্র এবং অনুরূপ যথেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া। যেসব যন্ত্রশিল্প-সংক্রান্ত সমস্যার উদ্ভব হচ্ছিল সে সম্বন্ধে অথবা দারিদ্র্য সম্বন্ধে অথবা শ্রেণীবিরোধ সম্বন্ধে গণতন্ত্র কোনো সমাধান দিতে পারে নি। এর বিশেষ জোর ছিল ব্যক্তির নিজের নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করবার পুঁথিগত স্বাধীনতার দিকে, এই আশায় যে, সে নিজের স্বার্থের দিক দিয়ে নিজের অবস্থার উন্নতি করার চেষ্টা করবে, এবং তার ফলে সমাজের প্রগতি ঘটবে। একেই বলে Lanser-faire নীতি; এর সম্বন্ধে আগে একটা চিঠিতে তোমাকে লিখেছি। কিন্তু ব্যষ্টি-স্বাধীনতার মতবাদ ব্যর্থ হল, কারণ যে মানুষের মজুরির বিনিময়ে কাজ করা ছাড়া উপায় নেই তাকে স্বাধীন বলা চলে না।

 যন্ত্রশিল্পগত ধনতন্ত্রের ফলে যে অচল অবস্থার উদ্ভব হল তা হল এই—যারা খেটে জনসাধারণের সেবা করছিল তাদের আয় ছিল অল্প, কিন্তু পুরস্কার জুটত তাদের ভাগ্যে যারা কাজ করত না। ফলে পুরস্কারের সঙ্গে কাজের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এর ফল এক দিক দিয়ে হল শ্রমিকদের দুরবস্থা এবং দারিদ্র্য অন্য দিক দিয়ে এমন একটি শ্রেণীর উৎপত্তি হল যা যন্ত্রশিল্পের সুযোগ নিয়ে অর্থোপার্জন করতে লাগল, কিন্তু বিনা পরিশ্রমে। এ হল অনেকটা জমিদার-কৃষাণ সম্প্রদায়ের মতো—এক দল খেতে কাজ করে, অন্য দল নিজেরা কাজ না করে অপরের আয়াসলব্ধ ফসল নিজে ভোগ করে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, পরিশ্রমের ফলের বিভাগ ন্যায়সংগতভাবে হয় নি। তা ছাড়া, শ্রমজীবীরা কৃষাণ-সম্প্রদায়ের মতো মুখ বুজে সহ্য করে নি, অবিচার অনুভব করে তার প্রতিবাদ করেছে। যতই দিন গেল, অবস্থার উত্তরোত্তর অবনতি হতে লাগল। পশ্চিমের সংগঠিতশিল্প দেশগুলিতে এই বৈপরীত্য অধিকতর প্রকট হয়ে উঠল, এবং চিন্তাশীল ব্যক্তিরা এই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা দেখতে লাগলেন। এর ফলে যে আদর্শ সমূহের উৎপত্তি হল তাই হল সমাজতন্ত্রবাদ, যার জন্ম হল ধনতন্ত্রের থেকে, এবং যার উদ্দেশ্য হল ধনতন্ত্রের শত্রুতাসাধন, এবং সম্ভবত কালে ধনতন্ত্রের স্থান-গ্রহণ। ইংলণ্ডে এই সমাজতন্ত্রবাদ অপেক্ষাকৃত নরম রূপ নিল, ফ্রান্স এবং জর্মনিতে এর রূপ হল বৈপ্লবিক। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে, বিরাট দেশে অপেক্ষাকৃত অল্প জনসংখ্যার ফলে উন্নতির যথেষ্ট সুযোগ ছিল, তাই ধনতন্ত্রের ফলে পশ্চিম-ইউরোপে যে অবিচার-দুর্দশার আগমন হয়েছিল তার ততটা উপলব্ধি আমেরিকায় বহুকাল পর্যন্ত হয় নি।

 ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্য ভাগে জর্মনিতে একজন মহাপরুষের অভ্যুদয় হল, যিনি সমাজতন্ত্রবাদের গুরু এবং যে সমাজতন্ত্রবাদ এখন কমিউনিজ্‌ম্ বা সাম্যবাদ বলে পরিচিত তার জন্মদাতা। তাঁর নাম কার্ল মার্ক্‌স্। তিনি একজন অস্পষ্ট দার্শনিক মতবাদে আস্থাবান অথবা পুঁথিগত মতামতের আলোচনাকারী অধ্যাপকমাত্র ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাস্তববাদী দার্শনিক, এবং তাঁর পদ্ধতি ছিল বিজ্ঞানের শৈলী দিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা অনুধাবন করা এবং এইরূপে পৃথিবীর দুর্দশার প্রতিকার করা। দর্শনশাস্ত্র তাঁর মতে এতদিন শুধু পৃথিবীর ব্যাখ্যা করতেই ব্যস্ত ছিল। সাম্যবাদী দর্শন পৃথিবীর দুঃখমোচন করতে আগ্রহান্বিত হবে। এঙ্গেল্‌স্ নামে আর-একজনের সঙ্গে তিনি ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ প্রকাশ করলেন, যাতে তাঁর দর্শনের মূলসূত্রগুলি থাকল। তার পরে তিনি জর্মন ভাষায় একখানি বিরাট বই বের করলেন, এর নাম ‘ডাস্ ক্যাপিটাল’, যাতে তিনি বিজ্ঞানসম্মতভাবে পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলেন এবং দেখালেন, সমাজ কোন দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং কী করে সেই অগ্রগতি দ্রুততর করা যায়। এখানে মার্ক্‌সীয় দর্শনের ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব না। কিন্তু মনে রেখো যে, মার্ক্‌সের এই বই সমাজতন্ত্রবাদের পরিস্ফুরণের উপর প্রচণ্ড প্রভাব বিস্তার করেছিল, এবং ইহাই বর্তমানে সাম্যবাদী রাশিয়ার বাইবেল।

 আর-একটি বিখ্যাত বই ইংলণ্ডে এই শতাব্দীর মধ্য ভাগে প্রকাশিত হয়ে যথেষ্ট আলোড়ন তুলেছিল, তার নাম ‘ওরিজিন অব স্পেসিজ’, ডারুইনের লেখা। ডারুইন ছিলেন প্রকৃতিবিদ্, অর্থাৎ তিনি প্রকৃতিকে, বিশেষ করে উদ্ভিদ ও প্রাণীকে, পর্যবেক্ষণ করতেন। বহু উদাহরণ-সহ তিনি দেখালেন, কীরূপে প্রকৃতিতে উদ্ভিদ ও প্রাণীর সৃষ্টি হয়েছিল, কেমন করে একটি জাতি প্রাকৃতিক নির্বাচন অনুসারে আর-এক জাতিতে পরিণত হয়েছিল, কেমন করে সরল প্রাণীদেহ কালক্রমে জটিল হয়ে দাঁড়ায়। এই ধরনের বৈজ্ঞানিক মতবাদ ছিল ধর্মশিক্ষা অনুসারে উদ্ভিদ, প্রাণী এবং পৃথিবীর সৃষ্টি-তত্ত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত। তখন আরম্ভ হল বৈজ্ঞানিক ও ধর্মমতে বিশ্বাসীদের মধ্যে প্রচণ্ড তর্ক। বিরোধের প্রকৃত কারণ তথ্য নিয়ে ততটা নয়, যতটা জীবন সম্বন্ধে সাধারণ ধারণা নিয়ে। ধর্মমতের সংকীর্ণ বিশ্বাসের মূলে ছিল কুসংস্কার এবং ইন্দ্রজালের ভীতি। বিচার জিনিষটাকে মোটেই উৎসাহিত করা হত না, এবং সাধারণকে যা বলা যায় তাই বিশ্বাস করতে বলা হত, কারণ তর্ক করে লাভ নেই। কতকগুলি বিষয় ছিল পবিত্রতার বহুসাময় আবরণে আবৃত, তাদের ছোঁয়া বা নিরাবরণ করা নিষিদ্ধ। বিজ্ঞানের পদ্ধতি ছিল এ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ, বিজ্ঞানের কাজ সব বিষয়ে অনুসন্ধিৎসা দেখানো। সে কিছুই মেনে নেবে না অথবা কোনো বিষয়ের কাল্পনিক পবিত্রতা দেখে ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসবে না। সব জিনিষের মধ্যেই সে কারণ অনুসন্ধান করত, এবং শুধু তাইতেই বিশ্বাস করত যা পরীক্ষা অথবা বিচারের ফলে যথার্থ বলে নির্ণীত হয়েছে।

 এই প্রাচীন প্রাণহীন ধর্মমূলক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে বিচারে বৈজ্ঞানিক চেতনাই জয়ী হল। যেসব লোক এইসব ব্যাপার সম্বন্ধে আগে চিন্তা করেছিল, এমনকি অষ্টাদশ শতাব্দীতেও, তাদের অধিকাংশই যুক্তিবাদী হয়ে পড়েছিল। বিপ্লবের আগে ফ্রান্সে যে দার্শনিক চিন্তার তরঙ্গ এসেছিল সে কথা তোমার মনে থাকবে। কিন্তু এখন পরিবর্তন সমাজের অভ্যন্তরে গভীরতরভাবে প্রবেশ করল। সাধারণ শিক্ষিত ব্যক্তি বিজ্ঞানের অগ্রগতির দ্বারা প্রভাবান্বিত হতে আরম্ভ করল। খুব সম্ভবত সে বিষয়টি সম্বন্ধে খুব গভীরভাবে চিন্তা করে নি, বিজ্ঞান সম্বন্ধেও হয়তো বেশি কিছু জানত না। কিন্তু তার চোখের সামনে উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সে দেখতে লাগল তাতে তার মনে বেশ খানিকটা সম্ভ্রমের উদয় হল। রেলওয়ে, বিদ্যুৎ, টেলিগ্রাফ, টেলিফোন, ফোনোগ্রাফ, এবং আরও কতশত জিনিষ একটির পর একটি এল, এবং এ সবেরই উৎপত্তি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি থেকে। বিজ্ঞানের জয়চিহ্ন বলে এদের সাদরে গ্রহণ করা হল। দেখা গেল, বিজ্ঞান যে শুধু মানষের জ্ঞানভাণ্ডারের বৃদ্ধি করে তা নয়, প্রকৃতির উপরে তার অধিকারও বাড়িয়ে দেয়। আশ্চর্য হবার কিছু নেই যে, বিজ্ঞানের জয় হল এবং লোকে তাকে সর্বশক্তিমান নূতন দেবতা বলে তার সামনে মাথা নত করল। এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানীরা নিজেদের সম্বন্ধে অতিরিক্তমাত্রার বিশ্বাসী হয়ে পড়লেন, তাঁদের মতবাদ বড়ো বেশি নিশ্চিত হয়ে পড়ল। অর্ধশতাব্দী পূর্বের সে যুগ থেকে বিজ্ঞান বহু দূর অগ্রসর হয়েছে, কিন্তু বর্তমানের মনোভাব ঊনবিংশ শতাব্দীর নিশ্চিতজ্ঞানের মনোভাব থেকে অনেক ভিন্ন। আজকের দিনে প্রকৃত বিজ্ঞানী অনুভব করেন যে, জ্ঞানমহার্ণব বিশাল এবং অপার; এবং যদিও তিনি এতে পাড়ি দেবার চেষ্টা করেন, তাঁর পূর্ববর্তীদের থেকে তিনি অনেক বেশি নম্র ও বিনয়ী।

 ঊনবিংশ শতাব্দীর আর একটি লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হল, পাশ্চাত্যদেশে সাধারণের শিক্ষার অগ্রগতি। শাসক সম্প্রদায়ের অনেকে বিপুল উদ্যমে এর বিপক্ষতা করেন, কারণ তাঁদের মতে এর ফলে জনসাধারণ অসন্তুষ্ট, রাজদ্রোহী, অবাধ্য এবং অখৃষ্টান হয়ে পড়বে। এই বিচারে খৃষ্টধর্ম হচ্ছে—অজ্ঞতা, এবং ধনী ও শক্তিশালী ব্যক্তিদের বিনা আপত্তিতে দাসত্ব করা। কিন্তু এই বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রচলিত হল এবং শিক্ষার প্রসার ঘটল। ঊনবিংশ শতাব্দীর অনেক জিনিষের মতো এটা ছিল নূতন ব্যবহারিক শিল্পের প্রচলনের ফল। কারণ, বড়ো কারখানা ও বড়ো যন্ত্রে শিল্পবিষয়ে দক্ষতা প্রয়োজন, এবং তা পাওয়া যায় শুধু শিক্ষা থেকে। এই যুগের সমাজে সর্বপ্রকার দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল অত্যধিক। সাধারণের শিক্ষাপ্রসারণে সে অভাব ঘুচল।

 এই বহুলপ্রচলিত প্রাথমিক শিক্ষার ফলে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন লোকের সংখ্যা খুবই বেড়ে গেল। তাদের ঠিক শিক্ষিত বলা চলে না, কিন্তু তারা লিখতে-পড়তে পারত এবং সংবাদপত্র পাঠের অভ্যাস প্রসারিত হল। শস্তা সংবাদপত্র বের হতে লাগল, আর তাদের প্রচার সংখ্যা হল বিপুল। লোকের মনের উপরে তারা বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে আরম্ভ করল। মধ্যে মধ্যে অবশ্য তারা লোককে ভুল পথে চালিত করত এবং প্রতিবেশী দেশের উপরে উষ্মা জাগিয়ে পরিণামে যুদ্ধের সৃষ্টি করত। সে যাই হোক, ‘প্রেস’ বা সংবাদপত্রসমূহ সত্যই খুব একটা ক্ষমতাশালী জিনিষ হয়ে দাঁড়াল।

 এই চিঠিতে যা লিখেছি তা প্রধানত ইউরোপের উপর, বিশেষ করে পশ্চিম-ইউরোপের উপর প্রযোজ্য। উত্তর আমেরিকার সম্বন্ধেও এ কথা খানিকটা খাটে। জাপান বাদে অবশিষ্ট এশিয়া এবং আফ্রিকা ছিল নিষ্ক্রিয় এবং ইউরোপের শাসনরীতির তলে নির্যাতিত। ইউরোপই যেন সব; পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে ইউরোপ প্রধান স্থান অধিকার করেছিল। অতীতে সময়ে সময়ে দীর্ঘকাল ধরে এশিয়া ইউরোপে প্রভুত্ব করেছে। এমন যুগ ছিল যখন সভ্যতা ও অগ্রগতির কেন্দ্র ছিল মিশর, বা ইরাক, বা ভারত, বা চীন, বা গ্রীস, বা রোম, বা আরব। কিন্তু এসব প্রাচীন সভ্যতার আয়ু শেষ হয়ে তার জীবনপ্রবাহ স্তব্ধ কঠিন প্রস্তরীভূত হয়ে গিয়েছিল। পরিবর্তন ও প্রগতির প্রাণশক্তি তাদের ত্যাগ করেছিল, এবং সে প্রাণ অন্য দেশে চলে গিয়েছিল। এবার ইউরোপের পালা, এবং ইউরোপ আরও বেশি প্রভুত্বপরায়ণ হল, কারণ যাতায়াতের উপায়ের উন্নতির ফলে পৃথিবীর সব অংশই নিকট এবং সুগম হয়েছিল।

 ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় সভ্যতা, যাকে এখন বলা হয় বুর্জোয়া-সভ্যতা, তার প্রস্ফুটন হল। একে বুর্জোয়া-সভ্যতা বলার কারণ, যে মধ্যশ্রেণী ব্যবহারিক শিল্পের ধনবাদের থেকে উদ্ভূত হয়েছিল এতে তাদের আধিপত্য ছিল। আমি তোমাকে এই সভ্যতার পরস্পরবিরোধী ভাব এবং আপত্তিকর বিষয়সমূহের কথা বলেছি। আমাদের ভারতবর্ষে এবং প্রাচ্যে আমরা এই আপত্তিকর বিষয়গুলি দেখেছি এবং তার দুর্ভোগ ভুগেছি। কিন্তু কোনো দেশই বড়ো হতে পারে না, যদি সেই বড়ো হওয়ার মতো উপকরণ তার মধ্যে না থাকে, এবং পশ্চিম-ইউরোপে এই উপকরণের অভাব ছিল না। ইউরোপের মানের কারণ তার সামরিক শক্তি ততটা নয়, যতটা তার এই বড়ো হওয়ার গুণগুলির অস্তিত্ব। সর্বত্র কর্মতৎপরতা ও জীবনীশক্তির প্রাচুর্য ছিল। শ্রেষ্ঠ কবি, লেখক, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, সংগীতকার, স্থপতি এবং সত্যকার কাজের লোকের উদ্ভব হয়েছিল অজস্র পরিমাণে। এবং জনসাধারণের অবস্থা পূর্বের যে-কোনো সময়ের চেয়ে এই যুগে যে উন্নততর হয়েছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিরাট রাজধানীগুলি, যথা—লণ্ডন প্যারিস বার্লিন নিউইয়র্ক, এরা আরও বড়ো হতে লাগল, তাদের প্রাসাদসমূহের শীর্ষদেশ উচ্চতর হল, বিলাসিতা বাড়ল, বিজ্ঞানের সাহায্যে কায়িক শ্রমের পরিমাণ কমল, জীবনের উপভোগের উপায় বাড়ল। সচ্ছলশ্রেণীর মধে জীবন হল সংস্কৃত ও মৃদুভাবাপন্ন, এবং তাদের মধ্যে কিছু পরিমাণে আত্মসন্তোষ ও পরিতৃপ্তির ভাব এল। মনে হয় যেন, সভ্যতার আরামদায়ক অপরাহ্ণ অথবা সন্ধ্যা।

 এইরূপে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ইউরোপের রূপ ছিল প্রীতিকর ও সুসমৃদ্ধ, এবং অন্তত উপরে উপরে মনে হল, এ সভ্যতা টিঁকবে এবং ক্রমশ উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে। কিন্তু বহিরাবরণের নীচে উঁকি মারলে দেখা যেত অনেক অপ্রীতিকর দৃশ্য এবং তুমুল আলোড়ন। কারণ, এই সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ভোগ করছিল বেশির ভাগ ইউরোপের উচ্চশ্রেণীর লোকেরা, এবং এর ভিত্তি ছিল বহু জাতি ও বহু দেশের শোষণের উপরে। আমি যেসব পরস্পরবিরোধী ভাবের কথা বলেছি তা যদি দেখতে পেতে; তাহলে দেখতে জাতিগত ঘৃণা এবং সাম্রাজ্যবাদের ক্রূর মুখশ্রী। তখন আর তুমি ঊনবিংশ শতাব্দীর সভ্যতার স্থায়িত্ব অথবা মধুরতা সম্বন্ধে অত নিশ্চিত থাকতে পারতে না। বাইরে দেহ ছিল সুশ্রী, কিন্তু হৃদয়ে ছিল দুষ্টক্ষত। স্বাস্থ্য ও প্রগতি সম্বন্ধে বড়ো বড়ো কথা বলা হত, কিন্তু বুর্জোয়া-সভ্যতার প্রাণশক্তি ক্রমে ক্ষয়ে যাচ্ছিল।

 ১৯১৪ সালে দুর্যোগ এল। সওয়া চার বছর যুদ্ধের পরে ইউরোপ বেঁচে রইল বটে, কিন্তু তার সে গভীর ক্ষত এখনও শুকোয় নি। সে সম্বন্ধে পরে বলব।