বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/একজন ইংরেজ রাজার কাছে এক চীন সম্রাটের চিঠি

উইকিসংকলন থেকে

৯৪

একজন ইংরেজ রাজার কাছে এক চীন-সম্রাটের চিঠি

১৬ই সেপ্টেম্বর, ১৯৩২

 মাঞ্চু-সম্রাটরা অসাধারণ দীর্ঘজীবন লাভ করেছিলেন মনে হয়। কাঙ্‌হির পৌত্র ছিলেন চতুর্থ সম্রাট, চিয়েন্ লুঙ। তিনিও দীর্ঘ ষাট বৎসর ধরে রাজত্ব করেছিলেন, ১৭৩৬ থেকে ১৭৯৬ পর্যন্ত। অন্যানা বিষয়েও পিতামহের সঙ্গে তাঁর মিল ছিল। তাঁর দুটি জিনিষে উৎসাহ ছিল—সাহিত্যচর্চা ও সাম্রাজ্যবিস্তার। সংগ্রহের উপযুক্ত সব সাহিত্য তিনি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলেন। সংগ্রহের পরে বিবিধতথ্যসংবলিত তালিকা প্রস্তুত করা হয়। তালিকা বললে অবশ্য ব্যাপারটা ঠিক বোঝানো যায় না, কারণ প্রতি বইয়ের সম্বন্ধে সমস্ত জ্ঞাত তথ্য লিপিবদ্ধ করে সমালোচনা-সংযুক্ত করা হয়েছিল। এই বিরাট বিবরণ-সংবলিত তালিকার চারটি ভাগ ছিল—পৌরাণিক অর্থাৎ কন্‌ফুসিবাদ, ইতিহাস, দর্শন এবং অপরাপর সাহিত্য। শোনা যায়, এর সমতুল্য কোনো বই আর কোথাও নেই।

 এই কালেই চীনা উপন্যাস, ছোটো গল্প এবং নাট্যসাহিত্যের উন্নতি হয় এবং অতি উচ্চস্তরের হয়। এ ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে যে, ইংলণ্ডেও এই সময়ে উপন্যাস-সাহিত্যের প্রগতি হচ্ছিল। চীনা পোর্সলিনের বাসন এবং ললিতকলার অন্যসব নিদর্শন এই সময়ে ইউরোপে সাগ্রহে গৃহীত হচ্ছিল এবং এদের ধারাবাহিক বাণিজ্য চলছিল। তার চেয়ে কৌতূহলপ্রদ হচ্ছে চায়ের ব্যবসা। এর শুরু হয়েছিল প্রথম মাঞ্চু-সম্রাটের আমলে। চা প্রথম সম্ভবত দ্বিতীয় চার্ল্‌সের রাজত্বকালে ইংলণ্ডে যায়। বিখ্যাত ইংরেজ রোজনাম্‌চা-লেখক স্যামুয়েল পেপিসের খাতায় ১৬৬০ সালে প্রথম চা-পানের উল্লেখ আছে ‘Tee—a china drink’। চায়ের ব্যবসায়ের প্রচণ্ড প্রসার হয়, এবং দু শো বছর পরে ১৮৬০ সালে ফুচাও নামে একটা চীনা বন্দর থেকেই এক মরশুমে চা রপ্তানি হয়েছিল দশ কোটি পাউণ্ড, অর্থাৎ বারো লক্ষ মোনের উপর। পরবর্তীকালে চায়ের চাষ অন্য জায়গাতেও আরম্ভ হয়, এবং ভারতে ও সিংহলে চায়ের বহুল উৎপাদন হয়।

 চিয়েন লুঙ মধ্য-এশিয়ার তুর্কিস্থান এবং তিব্বত অধিকার করে তাঁর সাম্রাজ্যের প্রসার করেছিলেন। কয়েক বছর পরে ১৭৯০ সালে নেপালের গুর্খারা তিব্বত আক্রমণ করে। চিয়েন্ লুঙ তখন যে শুধু গুর্খাদের তিব্বত থেকে তাড়িয়ে দেন তাই নয়, উপরন্তু হিমালয়ের পরপারে নেপাল পর্যন্ত তাদের অনুসরণ করে নেপালকে চীন-সাম্রাজ্যের সামন্তরাজ্যে পরিণত করেন। নেপাল-বিজয় বিস্ময়কর ঘটনা। চীনা সৈন্যের পক্ষে তিব্বত ও হিমালয় অতিক্রম করে গুর্খাদের মতো দুর্ধর্ষ সামরিক জাতিকে তাদের নিজের দেশে পরাজিত করা অতীব বিস্ময়কর ব্যাপার। ভারতে ব্রিটিশ মাত্র বাইশ বছর পরে ১৮১৪ সালে নেপালের সঙ্গে গোলযোগ বাধিয়েছিল। তারা নেপালে এক সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দেয়, কিন্তু তারা বিশেষ সুবিধে করতে পারে নি। তবু তো তাদের হিমালয় অতিক্রম করতে হয় নি।

 চিয়েন্ লুঙের রাজত্বকালের শেষ ভাগে ১৭৯৬ সালে মাঞ্চুরিয়া, মঙ্গোলিয়া, তিব্বত এবং তুর্কিস্থান তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। যেসব সামন্তরাজা তাঁর বশ্যতা স্বীকার করত তারা ছিল—কোরিয়া, আনাম, শ্যামদেশ এবং ব্রহ্মদেশ। কিন্তু রাজ্যজয় এবং সামরিক অভিযানের খ্যাতি অর্জন ব্যয়সাধ্য ব্যাপার। তার ফল হচ্ছে প্রচণ্ড ব্যয়, ফলে করভার বেড়েই চলে। সর্বকালে এই করভার গরিবের উপরেই পড়ে। অর্থনৈতিক অবস্থারও পরিবর্তন হচ্ছিল, তাতে অসন্তোষ বৃদ্ধি পেল। দেশের সর্বত্র গুপ্ত সমিতি গজিয়ে উঠল। ইতালির মতো চীনেরও গুপ্ত সমিতির আধিক্যের খ্যাতি আছে। এদের কোনো-কোনোটার নাম বেশ কৌতূহলপ্রদ: শ্বেত লিলি সমিতি, স্বর্গীয় বিচার সমিতি, শ্বেতপালক সমিতি, স্বর্গ ও মর্ত সমিতি।

 ইতিমধ্যে বহু অন্তরায় সত্ত্বেও বৈদেশিক বাণিজ্য বেড়ে চলছিল। এইসব অন্তরায় বিদেশী বণিকদের অসন্তোষের উদ্রেক করেছিল। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির প্রসার ক্যাণ্টন পর্যন্ত ঘটেছিল, এবং ব্যবসায়ের বৃহত্তম অংশ তাদের হওয়ার দরুন প্রতিবন্ধকের অসুবিধা তাদেরই বেশি হচ্ছিল। এইসব সময়েই তথাকথিত শিল্পবিপ্লবের আরম্ভ হচ্ছিল এবং তা ঘটছিল ইংলণ্ডের নেতৃত্বে। এ সম্বন্ধে পরে বলব। স্টীম-এঞ্জিন তৈরি হয়েছিল, এবং যন্ত্রের ব্যবহার ও অন্যান্য নূতন পন্থা অবলম্বনের ফলে কাজ সোজা এবং উৎপাদন বেশি হচ্ছিল, বিশেষ করে কার্পাসবস্ত্রের। এসব অতিরিক্ত মালের কাট্‌তির জন্যে বাজারের দরকার। ঠিক এই সময়েই ভারত ইংলণ্ডের হাতে থাকায় ইংলণ্ডের খুব সুবিধে হয়েছিল, কারণ জোর করে ভারতের বাজারে মাল চালানোর শক্তি তার ছিল এবং সে শক্তির প্রয়োগও হয়েছিল। কিন্তু চীনের বাজারের প্রতিও তার লোলুপ দৃষ্টি ছিল।

 অতএব ১৭৯২ সালে ব্রিটিশ সরকার লর্ড ম্যাকার্টনির নেতৃত্বে পিকিঙে এক রাজদূত-সংঘ পাঠালেন। তখন তৃতীয় জর্জ ছিলেন ইংলণ্ডের রাজা। চিয়েন্ লুঙ তাদের দর্শন দিয়ে তাদের সঙ্গে উপহার-বিনিময় করলেন। কিন্তু সম্রাট বাণিজ্যের প্রচলিত প্রতিবন্ধকের কোনো পরিবর্তনে অবীকার করলেন। চিয়েন্ লুঙ তৃতীয় জর্জকে যে উত্তর পাঠিয়েছিলেন তা অতীব কৌতূহলপ্রদ। আমি তার থেকে বেশ খানিকটা তুলে দিচ্ছি:

 “হে রাজন্, তোমার বাস বহু সমুদ্রের পরপারে, কিন্তু আমাদের সভ্যতার সংস্পর্শে উপকৃত হওয়ার বিনীত বাসনার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে আমার নিকটে দূতসংঘ প্রেরণ করেছ। তারা সসম্মানে তোমার লিপি নিয়ে এসেছে।......আমার প্রতি শ্রদ্ধা-নিবেদন করবার নিমিত্ত তুমি তোমার দেশজাত দ্রবাদি অর্ঘ্যরূপে প্রেরণ করেছ। আমি তোমার লিপি পাঠ করেছি। যেরূপ পরম আগ্রহ সহকারে এটা রচিত হয়েছে তাতে তোমার যে সশ্রদ্ধ বিনীত ভাব অনুভূত হয় তা অতীব প্রশংসনীয়। ....

 “এই বিস্তীর্ণ পৃথিবীর একাধিনায়করূপে আমার মাত্র একটি লক্ষ্য আছে, রাজ্যে নির্দোষ শাসন-রীতি পরিচালিত করে আমার কর্তব্যপালন। অদৃষ্টপূর্ব ও মহার্ঘ সামগ্রীর প্রতি আমার কোনো অনুরাগ নেই। তোমার দেশজাত দ্রব্যেও আমার কোনোরূপ প্রয়োজন নেই। হে রাজন, তোমার কর্তব্য, আমার মনোভাবের সম্মান রক্ষা করা এবং ভবিষ্যতে অধিকতর রাজভর্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা—যাতে আমার সিংহাসনের প্রতি অবিচল বশ্যতার দ্বারা তুমি তোমার দেশে শান্তি ও সমৃদ্ধি লাভ করতে পার। ......

 “কম্পিতকলেবরে আদেশ পালন করো, যেন কোনো ত্রুটি না হয়!”

 এই উত্তর পড়ে তৃতীয় জর্জ ও তাঁর মন্ত্রীরা নিশ্চয় বেশ একটু চমকে গিয়েছিলেন। কিন্তু আসলে এই উত্তরে শ্রেষ্ঠ সভ্যতার উপরে যে পরম বিশ্বাস এবং প্রবল প্রতাপের যে নিদর্শন পাওয়া যায়, তার কোনো স্থায়ী ভিত্তি ছিল না। মাঞ্চু-সরকার চিয়েন্ লুঙের নেতৃত্বে সত্যসত্যই যথেষ্ট ক্ষমতাশালী ছিল। কিন্তু নূতন অর্থনৈতিক বিধির প্রবর্তনে তার ভিত্তি শিথিল হয়ে আসছিল। যেসব গুপ্ত সমিতির কথা আমি উল্লেখ করেছি তারাই হল অসন্তোষের নিদর্শন। কিন্তু আসল গলদ ছিল এই যে, নূতন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা অবলম্বিত হয় নি। এই নববিধানে পশ্চিম ছিল নেতা, এবং দ্রুত অগ্রগতি সহকারে পরম শক্তিমান হয়ে চলল। তৃতীয় জর্জের কাছে চিয়েন্ লুঙের দম্ভপূর্ণ চিঠি প্রেরণের পর সত্তর বছর কাটল না, ইংলণ্ড ও ফ্রান্সের হাতে তার অবমাননা ঘটল, তার গৌরব ধূলিলণ্ঠিত হল।

 কিন্তু এ গল্প বলব আমার চীন সম্বন্ধে পরের চিঠিতে। ১৭৯৬ সালে, চিয়েন্ লুঙের মৃত্যুর সঙ্গেই বলতে গেলে, অষ্টাদশ শতাব্দীর সমাপ্তিতে এসে পড়ি। কিন্তু এ শতাব্দী শেষ হওয়ার আগে আমেরিকা ও ইউরোপে অনেক-কিছু অসাধারণ ঘটনা ঘটেছিল। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে চীনের উপর পশ্চিমের চাপের হ্রাস হয়েছিল ইউরোপের যুদ্ধের ফলে। পরবর্তী চিঠিতে আমরা ইউরোপ সম্বন্ধে আলোচনা করব, এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরু থেকে গল্প ধরব। ভারত এবং চীনের সম্বন্ধেও বলব।

 কিন্তু চিঠি শেষ করার আগে তোমাকে প্রাচ্যে রাশিয়ার অগ্রগতির কথা বলব। ১৬৮৯ সালে রাশিয়া ও চীনের মধ্যে ‘নার্চিন্‌স্কের সন্ধি’র পরে প্রাচ্যে দেড় শতাব্দী ধরে রাশিয়ার প্রভাব বেড়ে চলল। ১৭২৮ সালে রাশিয়ার বেতনভোগী বিটস বেরিং-নামক জনৈক দিনেমার-ক্যাপ্টেন এশিয়া ও আমেরিকার মধ্যবর্তী প্রণালীটি আবিষ্কার করলেন। তুমি জানো, এই প্রণালীটি এখনও তাঁর নামানুসারে বেরিং প্রণালী নামে খ্যাত। বেরিং প্রণালী পার হয়ে আলাস্কা পৌঁছে তাকে রুশ-অধিকার-ভুক্ত বলে ঘোষণা করলেন। আলাস্কা হচ্ছে ফার অর্থাৎ রোমশ-পশু-চর্মের দেশ, এবং চীনে ফারের চাহিদা থাকার দরুন রাশিয়া ও চীনের মধ্যে বেশ-একটা ফারের ব্যবসা গড়ে উঠল। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে চীনে ফারের চাহিদা এত বেড়ে গেল যে, রাশিয়া কানাডার হাড্‌সন্-বে থেকে ইংলণ্ড হয়ে ফার আমদানি করে সাইবেরিয়াতে বৈকাল-হ্রদের কাছে কিয়াটোর বিরাট ফারের বাজারে পাঠাতে লাগল। ভেবে দেখো, কতখানি পথ ঘুরে ফার যথাস্থানে পৌঁছত!

 আমার অন্য সব চিঠির চেয়ে এ চিঠিটা ছোটো। আশা করি তুমি খুশি হবে।