বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/এশিয়া ও ইউরোপ

উইকিসংকলন থেকে

এশিয়া ও ইউরোপ

৮ই জানুয়ারি, ১৯৩১

 গতবারের চিঠিতে লিখেছি যে, সব জিনিষ অনবরত পরিবর্তনের ভিতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এইসব পরিবর্তনের কাহিনীই হল ইতিহাস। পুরাকালে যদি খুব কম পরিবর্তন ঘটে থাকে তা হলে সেকালের ইতিহাসও সেই অনুপাতে অকিঞ্চিৎকর হতে বাধ্য।

 স্কুল-কলেজে আমরা যে ইতিহাস পড়ি তা যৎসামান্য। অন্যদের কথা ঠিক হয়তো জানি না, তবে আমার নিজের সম্বন্ধে বলতে পারি যে, স্কুলে আমি খুব অল্পই শিখেছি। ইংলণ্ডের ইতিহাস ততোধিক সামান্য। দেশের কথা যতটুকু শিখেছি তার অধিকাংশই হল ভুল, কিছু বা সত্যের অপলাপ। হবে না কেন, যাঁরা এসব বই রচনা করেছেন, তাঁদের সকলেরই ছিল এ দেশের প্রতি গভীর অবজ্ঞা। ইংলণ্ড ও ভারতবর্ষ ছাড়া অন্যান্য দেশের ইতিহাস খুবেই আবছা-রকম শিখেছিলাম। সত্যিকার ইতিহাস আমি পড়তে শুরু করি কলেজ থেকে বেরোবার পরে। বার বার জেলে যাওয়া আমার ইতিহাস অধ্যয়নের পক্ষে খুব অনুকূল হয়েছে।

 আগের কয়েকটা চিঠিতে তোমাকে দ্রাবিড়সভ্যতার কথা, আর্যদের এ দেশে আসবার কথা, মোটকথা প্রাচীনকালের ভারতবর্ষ সম্বন্ধে লিখেছি। প্রাক্-আর্য যুগের ভারত সম্বন্ধে খুব অল্পই জানি বলে সে বিষয়ে বিশেষ কিছু লিখি নি। তোমাকে বলে রাখা ভালো যে, কয়েক বছর আগে একটি বহু প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে ভারতের উত্তর-পশ্চিমে মোহেঞ্জোদারো-নামক একটি জায়গায়। পাঁচ হাজার বছরকার ধ্বংসস্তূপ গড়ে অনেক কিছু বেরিয়েছে—এমনকি মিশরের পিরামিড্-এর মতন মৃতদেহের মমি পর্যন্ত পাওয়া গেছে। একবার ভেবে দেখো কত হাজার বছর আগের, আর্যদের এ দেশে আসবার কত আগেকার সভ্যতার নিদর্শন এই মোহেঞ্জোদারো। ইউরোপে তো তখন বর্বর যুগ।

 আজ ইউরোপ ক্ষমতাশালী ও প্রতাপশালী, আজ পশ্চিমের লোক নিজেদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি নিয়ে নিজেদেরকে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে উন্নত বলে প্রচার করে। এশিয়া ও এশিয়াবাসীদের প্রতি ওদের অসীম অবজ্ঞা। এ দেশে ওরা যা কিছু পায় তাই লুঠতরাজ করে নিয়ে যায়। এশিয়া ও ইউরোপকে পাশাপাশি রাখলেই আমরা দেখতে পাব সময়ের ফেরে কীভাবে ভাগ্যবিপর্যয় ঘটে গেছে। পৃথিবীর মানচিত্র খুলে দেখো—দেখতে পাবে স্বল্পায়তন ইউরোপ এশিয়ার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের সঙ্গে কেমনভাবে জুড়ে রয়েছে, মনে হবে ইউরোপ এই মহাদেশেরই একটা ক্ষুদ্র অংশবিশেষ। তুমি যখন ইতিহাস পড়তে শুরু করবে তখন জানতে পারবে যে, বহুকাল ধরে এশিয়া ইউরোপের উপর প্রভুত্ব করে এসেছে। সমুদ্রের বিরাট ঢেউয়ের মতো এশিয়া থেকে মানষের ঢেউ গিয়ে ইউরোপকে প্লাবিত করেছে, ইউরোপকে সভ্য করে তুলেছে। আর্য, সাইথীয়, হুন, আরব, মঙ্গোল, তুর্কি—এশিয়ার এইসব বিভিন্ন জাতি ইউরোপ ও এশিয়ার বহু দেশের উপর ছড়িয়ে পড়েছিল পঙ্গপালের মতো। বহুকাল পর্যন্ত ইউরোপ ছিল এশিয়ার একটি উপনিবেশের মতো। আধুনিক ইউরোপের অনেক সভ্য জাতি এশিয়ার এই আক্রমণকারীদের বংশসম্ভূত।

 মানচিত্রের অনেকখানি জায়গা জুড়ে আছে এশিয়া, দেখে মনে হয় যেন একটা অতিকায় দৈত্য হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। ইউরোপ সেই তুলনায় কত ছোটো। তাই বলে মনে কোরো না যেন যে, আয়তনে বড়ো বলেই এশিয়া বড়ো এবং আয়তনে ছোটো বলেই ইউরোপকে উপেক্ষা করা চলে। আকার দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা জাতির বৃহত্ত্ব বিচার করতে যাওয়া চলে না। মহাদেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুদ্রায়তন হলেও আজ ইউরোপ সভ্যজগতে খুব বড়ো একটা জায়গা অধিকার করে আছে, এ কথা আমরা ভালো করেই জানি। ইউরোপের অনেক দেশের ইতিহাস যুগে যুগে নানারকম কীর্তি-কাহিনীতে গৌরবময়। পশ্চিমের বড়ো বড়ো বিজ্ঞানী তাঁদের নানারকম সত্য-আবিষ্কারের দ্বারা সভ্যতাকে এগিয়ে দিয়েছেন, লক্ষ লক্ষ লোকের প্রাণধারণের জন্য সুখ-সুবিধার বিধান করে দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বহু লোক জন্মেছেন যাঁরা সাহিত্যে, দর্শনে, শিল্পকলায়, সঙ্গীতে পৃথিবীজোড়া নাম কিনেছেন। ইউরোপের ইতিহাসে জ্ঞানী ও কর্মী কত রয়েছেন। ইউরোপের প্রাপ্য গৌরব তাকে না দেওয়াটা নির্বুদ্ধিতা।

 এশিয়া যেখানে বড়ো সেখানে তার মহত্ব স্বীকার না করাটাও ঠিক একই প্রকারের বোকামি হবে। ইউরোপের বাইরের জাঁকজমক দেখে আমরা অনেক সময় অতীতের কথা ভুলে যাই। পৃথিবীর প্রধান ধর্ম প্রবর্তকগণ সকলেই জন্মেছেন এই এশিয়ায়। পৃথিবীর প্রাচীনতম যে ধর্মের প্রভাব আজও বর্তমান, সেই হিন্দু ধর্মের উদ্ভব এই ভারতেই। চীন জাপান বর্মা তিব্বত সিংহল প্রভৃতি দেশের ধর্মগুরু বুদ্ধেরও জন্মস্থান এই ভারতে। ইহুদি ও খৃষ্টীয় ধর্মের উদ্ভব হয়েছিল প্যালেস্টাইনে—এশিয়ার পশ্চিম উপকূলে। পার্শিরা যে জরথুস্ট্রের ধর্মে বিশ্বাস করে তার সূচনা হয়েছিল ইরানে, ইসলামের পয়গম্বর মহম্মদ জন্মেছিলেন আরব দেশের মক্কাশরীফে। কৃষ্ণ বুদ্ধ জরথুস্ট্র খৃষ্ট মহম্মদ, চীনের দার্শনিকশ্রেষ্ঠ কনফুসিয়স ও লাওৎসে—কত যে দার্শনিক ও তত্ত্বজ্ঞানী এ দেশে জন্মেছেন তার ইয়ত্তা নেই। পাতার পর পাতা লিখে গেলেও এশিয়ার জ্ঞানবীর ও কর্মবীরদের নামের তালিকা নিঃশেষ হয়ে যাবে না। এ ছাড়া, আরও কতভাবে এশিয়া যে পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে সে কথা বলে শেষ করা যায় না।

 সে দিন আর নেই। আমাদের চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি কালের সঙ্গে সঙ্গে কত অদলবদল-ওলটপালট ঘটে যাচ্ছে। সচরাচর অবশ্য ইতিহাস শতাব্দীর পর শতাব্দীতে মন্থরগতিতে চলে। অপর কোনো হিসাব উল্টে দেবার জন্যই যেন সময় সময় ছোটে ঊর্দ্ধশ্বাসে, বিপর্যয় ঘটে যায়। আজ এই মন্থর এশিয়া মহাদেশ তার বহু দিনের তন্দ্রা ভেঙে আবার জেগে উঠছে। সমস্ত পৃথিবী আজ তাকিয়ে আছে এশিয়ার দিকে। সবাই জানে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর ইতিহাসে অনেকখানি জায়গা জড়ে থাকবে এশিয়া।