বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/ঐতিহ্যের বোঝা
৯
ঐতিহ্যের বোঝা
জেলে এসে অবধি আমার কতকগুলো নূতন অভ্যাস হয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, খুব ভোরে ওঠা, এমনকি ভোর হবার অনেক আগেই। গত গ্রীষ্মকাল থেকে এ অভ্যাসটি করেছি। ধীরে ধীরে ভোরের আলো দেখা দিচ্ছে আর একটি একটি করে তারার আলো নিব্ছে—বসে বসে তাই দেখতে বেশ লাগত। ঠিক ভোর হবার আগে তুমি চাঁদের আলো কখনও দেখেছ? আকাশের রঙ বদলে আস্তে আস্তে কেমন করে দিনের আলো দেখা দেয়! আমি কতদিন যে বসে বসে এই চাঁদের আলো আর ভোরের আলোর সংঘর্ষ দেখেছি। শেষ পর্যন্ত ভোরের আলোই বরাবর জিতে যায়। আধো-আলো আধো অন্ধকারের মায়ালোকে বেশ কিছুক্ষণ বোঝাই যায় না, সেটা ঠিক চাঁদের আলো, না, নবাগত দিনের আলো। তার পরে অকস্মাৎ কখন অন্ধকারের কুহেলি ভেদ করে স্পষ্ট দিবালোক দেখা দেয়, আর যুদ্ধে পরাজিত হয়ে চাঁদ মলিন মুখে বিদায় নেয়।
অভ্যাসমতো আজও খুব সকালে উঠেছি, আকাশে তখনও তারা দপদপ করছে। কিন্তু আকাশে বাতাসে এমন একটা অস্পষ্ট আভাস ছিল, মনে হচ্ছিল ভোর হতে আর বেশি বিলম্ব নেই। বসে বসে পড়ছিলাম। হঠাৎ ভোরের নিস্তব্ধ প্রশান্তি ভেদ করে দূরে মানুষের কণ্ঠস্বর এবং গাড়ির ঘড়্ঘড়ানি শুনতে পেলাম। শব্দ ক্রমেই বাড়ছে। মনে পড়ল, আজকে সংক্রান্তি, মাঘমেলার প্রথম দিন। হাজার হাজার স্নানার্থী ভোরবেলায় সংগমে স্নান করতে চলেছে, যেখানে গঙ্গা এসে মিশেছে যমুনার সঙ্গে, সরস্বতীও অদৃশ্য ভাবে এসে সেই ধারায় মিলেছে। দলে দলে চলেছে আর গান করছে, আর মাঝে মাঝে চীৎকার করছে ‘গঙ্গা মায়ীকি জয়’। নাইনি জেলের প্রাচীর ভেদ করে তাদের কণ্ঠস্বর আমার কানে এসে পৌঁচচ্ছে। বসে বসে শুনেছি আর ভাবছি, ভক্তি-বিশ্বাসের কী অসীম ক্ষমতা—অসংখ্য মানুষকে টেনে এনেছে এই নদীর ধারে। কিছুক্ষণের জন্য অন্তত এরা এদের দুঃখ দারিদ্র্য ক্লেশ, সব ভুলে গিয়েছে। ভাবছিলাম, বছরের পর বছর, কত সহস্র বছর ধরে তীর্থযাত্রীর দল এই ত্রিবেণী সংগমে এসে জড়ো হয়েছে। যুগ যুগ ধরে মানুষ এসেছে আর গেছে; কত রাজ্য, কত সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে, আবার অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে, কিন্তু সেই পুরাতন ঐতিহ্যের ধারা সমানভাবে চলছে। বংশানুক্রমে মানুষ তার কাছে মাথা নত করেছে। এই-যে কালের ধারা, এর মধ্যে ভালো জিনিষ অনেক আছে, কিন্তু মাঝে মাঝে এটাও একটা নিদারণ বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাতে করে আমাদের অগ্রগতিতে বাধা পড়ে। অবশ্য এটা ভাবতে বেশ লাগে যে, একটা কোনো অদৃশ্য সূত্রে আমরা আমাদের বিস্মৃতপ্রায় অতীতের সঙ্গে বাঁধা রয়েছি। তেরো শো বছর পূর্বে এই মেলার যে ইতিহাস লেখা হয়েছিল তাও পড়তে বেশ লাগে। অবশ্য তারও বহু যুগ আগে এই মেলা আরম্ভ হয়েছিল। কিন্তু এই-যে সূত্রটার কথা বলেছি, সেটা কেমন যেন শিকল হয়ে আমাদের চলবার পথে বাধা দেয়। তখন মনে হয় আমরা যেন সেই পুরোনো ঐতিহ্যের কবলে পড়ে বন্দী হয়ে আছি। অতীতের সঙ্গে আমাদের যোগ রক্ষা করতেই হবে, কিন্তু সেই অতীত যদি কারাগার হয়ে আমাদের অগ্রগতিতে বাধা দেয় তবে আবার কারাগার ভেঙে মুক্তির পথ খুঁজতে হবে।
আমার গত তিনটি চিঠিতে তোমাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছি, আড়াই হাজার, তিন হাজার বছর পূর্বে পৃথিবীর অবস্থা কেমন ছিল। কোনো সন-তারিখের উল্লেখ আমি করি নি, ওসব আমার পছন্দ নয়। তুমিও এ নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাও এ আমি চাই না। তা ছাড়া সেই প্রাচীন কালে কখন কী ঘটেছে তার সঠিক তারিখ বার করাও বড়ো সহজ নয়। পরে হয়তো কিছু কিছু সন-তারিখ দেবার দরকার হবে। তাতে কোন্ ঘটনার পর কোন্ ঘটনা ঘটল মনে রাখা সহজ হবে। আপাতত শুধু প্রাচীন কালের পৃথিবী সম্বন্ধে তোমাকে একটা মোটামুটি ধারণা দেবার চেষ্টা করছি।
ইতিমধ্যে গ্রীস, ভূমধ্যসাগর, মিশর, এশিয়া মাইনর ও পারশ্য সম্বন্ধে আমাদের খানিকটা ধারণা হয়েছে। এবার আমাদের নিজের দেশে ফিরে আসা যাক। ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে প্রথমদিকটাতে বড়ো মুশকিলে পড়তে হয়। প্রাচীন যুগের আর্যেরা, যাঁরা ভারতে এসেছিলেন, তাঁরা কোনো ইতিহাস লিখে রেখে যান নি। নানা দিক থেকে তাঁরা যে কত উন্নত ছিলেন, সে কথা গোড়ার দিককার চিঠিগুলোতে আমি কিছু কিছু বলেছি। বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি যেসব বই এঁরা লিখে গিয়েছেন সাধারণ লোকের পক্ষে তা লেখা কখনোই সম্ভব নয়। এসব বই এবং আরও কিছু উপাদান থেকে আমরা আমাদের অতীত ইতিহাস জানতে পারি। আমাদের পূর্বপুরুষদের রীতিনীতি, ভাবনাচিন্তা এবং তাঁদের জীবনপ্রণালী সম্বন্ধে অনেক কথা ঐ বই থেকে জানা যায়, কিন্তু এগুলোকে খাঁটি ইতিহাস বলা চলে না। খাঁটি ইতিহাস বলতে সংস্কৃত ভাষায় যে একখানিমাত্র বই আছে সেটি হল কাশ্মীরের ইতিহাস, তাও অনেক পরবর্তী কালের লেখা। এই গ্রন্থের নাম ‘রাজতরঙ্গিণী’। এটি কাশ্মীরের রাজাদের ইতিবৃত্ত। কহ্লননামক এক পণ্ডিত এই বই লিখেছিলেন। তুমি শনে সুখী হবে যে তোমার রণজিৎ পিসেমশাই[১] এখন কাশ্মীরের সেই সুপ্রসিদ্ধ ইতিহাসখানি সংস্কৃত ভাষা থেকে অনুবাদ করছেন। বিরাট গ্রন্থ, কিন্তু প্রায় অর্ধেক অনুবাদ হয়ে গেছে। সমস্ত অনুবাদ-গ্রন্থখানি যখন প্রকাশিত হবে,[২] তখন আমরা সবাই খুব আগ্রহের সঙ্গে সেই বই পড়ব, কারণ মূল গ্রন্থ পড়বার মতো সংস্কৃত জ্ঞান আমাদের অনেকেরই নেই। একে তো বইখানি চমৎকার, তা ছাড়া কাশ্মীরের প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে এতে অনেক কথা আছে। আর তুমি তো জানো, কাশ্মীরেই ছিল আমাদের আদিনিবাস।
আর্যদের আগমনের পূর্ব থেকেই ভারতবর্ষ সভ্য ছিল। ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে মোহেঞ্জোদারোতে যেসব ভগ্নাবশেষ পাওয়া গেছে তার থেকে স্পষ্ট প্রমাণ হয় যে আর্যদের আগমনের বহু পূর্ব থেকেই একটি অতি উন্নতধরনের সভ্যতা এ দেশে চলে আসছিল। তবে এ বিষয়ে খুব বেশি কিছু আমরা এখনও জানি না। আর ক-বছরের মধ্যেই বোধ করি অনেক কিছু জানা যাবে। আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিকরা, প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ থেকে যাঁরা ইতিহাসের তথ্য উদ্ধার করে থাকেন তাঁরা, মাটি খুঁড়ে যখন সব-কিছু বার করবেন তখন আরও অনেক কথা আমরা জানতে পারব।
এ ছাড়াও বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ ভারতে তখন দ্রাবিড়দের একটি অতি উঁচুদরের সভ্যতা ছিল, এমনকি উত্তর ভারতেও ঐজাতীয় কিছু থাকা অসম্ভব নয়। দ্রাবিড়দের ভাষা আর্যদের সংস্কৃত ভাষা থেকে উদ্ভূত নয়। এদের ভাষা অনেক বেশি প্রাচীন এবং তাদের সাহিত্যও খুব সমৃদ্ধ। তামিল, তেলেগু, কানাড়ি, মালয়ালম্—এসব হচ্ছে দ্রাবিড়দের ভাষা। দক্ষিণ ভারতে—বর্তমান মাদ্রাজ এবং বোম্বাই প্রদেশে—এখনও এইসব ভাষারই চলন। তুমি বোধ হয় জানো, আমাদের জাতীয় কংগ্রেস ভাষাগত পার্থক্য অনুযায়ী প্রদেশ ভাগ করেছে। ইংরেজ সরকার যেভাবে প্রদেশ গঠন করেছে তার চেয়ে এটা অনেক ভালো ব্যবস্থা। কারণ এর ফলে বিশেষ এক জাতের লোক, যারা এক ভাষায় কথা বলে, একই রকমের রীতিনীতি পালন করে, তারা সকলে এক প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হবে। কংগ্রেসের বিভাগ অনুযায়ী দক্ষিণ ভারতে অনেকগুলি প্রদেশ হবার কথা। এই যেমন মাদ্রাজের উত্তরভাগে হবে অন্ধ্র প্রদেশ—ওখানকার লোকের ভাষা হচ্ছে তেলেগু; তামিলভাষী লোকদের জন্য হবে তামিলনাদ প্রদেশ; বোম্বায়ের দক্ষিণে, যেখানকার লোক কানাড়ি ভাষায় কথা বলে, তাদের জন্য আলাদা প্রদেশ হবে কর্ণাটক; আর মালাবার অঞ্চলে, যেখানে মালয়ালম্ ভাষা প্রচলিত, সেখানে হবে কেরল প্রদেশ। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, ভবিষ্যতে যখন ভারতবর্ষের প্রদেশ-বিভাগ হবে তখন প্রত্যেক অঞ্চলের ভাষার উপরেই খুব জোর দেওয়া হবে।
এই প্রসঙ্গে ভারতবর্ষের প্রচলিত ভাষাগুলির সম্বন্ধে আরও একটা কথা বলে নেওয়া ভালো। ইউরোপে এবং অন্যত্রও কতক লোকের ধারণা, ভারতবর্ষে কয়েক শত বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত। এটা নিতান্তই বাজে কথা, যারা এরকম বলে তারা নিজেদের মূর্খতাই প্রমাণ করে। ভারতবর্ষের মতো বিরাট দেশে অসংখ্য উপভাষা থাকা কিছুই বিচিত্র নয়। কিন্তু সেগুলো আলাদা ভাষা নয়, স্থানবিশেষে একই ভাষার রূপান্তর মাত্র। তা ছাড়া অনেক পাহাড়ি জাত আছে কিংবা এখানে-সেখানে ছোটোখাটো সম্প্রদায় আছে যারা নিজেদের মধ্যে চলতি বিশেষ কোনো ভাষায় কথা বলে। কিন্তু সারা ভারতবর্ষ নিয়ে যখন কথা তখন দেখবে এসব ভাষার কোনো স্থানই নেই, এ সবই অবান্তর। কেবলমাত্র লোকগণনার বেলায় এসব ভাষার উল্লেখ হয়। বোধ করি আগের এক চিঠিতে তোমাকে বলেছিলাম যে, ভারতবর্ষের প্রধান ভাষাগুলি দুই শ্রেণীতে বিভক্ত—দ্রাবিড়ীয়, তার কথা এইমাত্র তোমাকে বলেছি, এবং আর্যভারতীয়। এই আর্য ভাষার মধ্যে প্রধান হচ্ছে সংস্কৃত। এই গোত্রের অন্যান্য ভাষাগুলি সংস্কৃতেরই সন্তান—যেমন: হিন্দি, বাংলা, গুজরাটি, মারাঠি। এদেরই সমগোত্রীয় আরও দু-একটা ভাষা আছে: আসামে অসমিয়া ভাষা, উড়িষ্যা বা উৎকলে ওড়িয়া ভাষা। উর্দু, হিন্দিরই রূপান্তর আর হিন্দুস্থানি বলতে হিন্দি উর্দু, দুইই বোঝায়। তা হলেই দেখতে পাচ্ছ ভারতবর্ষের প্রধান ভাষা হল ঠিক দশটি—হিন্দুস্থানি, বাংলা, গুজরাটি, মারাঠি, তামিল, তেলেগু, কানাড়ি, মালয়ালম, ওড়িয়া এবং অসমিয়া। এর মধ্যে আমাদের মাতৃভাষা যে হিন্দুস্থানি তাই উত্তর ভারতের সর্বত্র প্রচলিত। পাঞ্জাব, যুক্তপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, রাজপুতানা, দিল্লি এবং মধ্যভারতের সর্বত্র লোকে এই ভাষাতেই কথা বলে। এই বিস্তৃত অঞ্চলে প্রায় পনেরো কোটি লোকের বাস। তবেই তো দেখছ, পনেরো কোটি লোক এখনই হিন্দুস্থানি বলছে—স্থানবিশেষে একটু ভাষার অদলবদল আছে, এই যা। তা ছাড়া ভারতবর্ষের প্রায় সর্বত্রই লোকে হিন্দুস্থানি ভাষা বুঝতে পারে। খুব সম্ভব একদিন হিন্দুস্থানিই সর্বভারতের ভাষা হবে। তার মানে অবশ্য এই নয় যে, যেসব প্রধান প্রধান ভাষার নাম এইমাত্র করেছি সেগুলি একেবারে উঠে যাবে। প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে ওগুলো থাকবেই, বিশেষ করে যখন এদের চমৎকার সব সাহিত্য রয়েছে। যে ভাষা রীতিমতো উন্নতি লাভ করেছে সে ভাষা কোনো জাতির হাত থেকে কেড়ে নিতে নেই। কোনো জাতিকে বড়ো হতে হলে, তাদের সন্তানসন্ততিকে সুশিক্ষিত করতে হলে, নিজেদের ভাষার সাহায্যেই করতে হবে। ভারতবর্ষে তো এখন সব-কিছুই বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে চলেছে—আমরা নিজেদের মধ্যেও কথায়বার্তায় বেশির ভাগ বলি ইংরেজি। এই-যে আমি ইংরেজিতে তোমাকে চিঠি লিখছি, জানি এটা নিতান্তই হাস্যকর, তবু লিখছি। যাক গে, আশা করছি এ অভ্যাসটা শীগগিরই ছাড়তে পারব।