বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/কঠিন সমস্যা-সমাধানে ভারতবর্ষ
৭৫
কঠিন সমস্যা-সমাধানে ভারতবর্ষ
১২ই জুলাই, ১৯৩২
তোমাকে তৈমুর, তাঁর হত্যালীলা এবং নর-কপাল দিয়ে তাঁর পিরামিড নির্মাণের কথা আগেই লিখেছি। মনে হয়, কী ভয়ংকর বর্বরতা! সভ্যসমাজে বুঝি কখনোই এরকম ঘটতে পারত না। কিন্তু অতটা নিশ্চিত হয়ো না। সেদিনও আমরা নিজেদের চোখ দিয়ে দেখেছি, কান দিয়ে শুনেছি, আমাদের নিজেদের যুগেই কী ঘটে থাকে ও ঘটতে পারে। চেঙ্গিস খাঁ ও তৈমুরের সম্পত্তি ও জীবন-নাশের কাহিনীও ১৯১৪-১৮ সালের মহাযুদ্ধের ধ্বংসলীলার পাশে তুচ্ছ হয়ে যায়। এবং বর্তমান যুগের বীভৎসতার কাহিনী যে-কোনো মঙ্গোলীয় নিষ্ঠুরতাকে পিছনে ফেলে যেতে পারে।
তবু নিঃসন্দেহে আমরা চেঙ্গিস অথবা তৈমুরের সময় থেকে সহস্রগুণে উন্নত হয়েছি। আজকের জীবন শুধু যে প্রচণ্ডরকম জটিল তাই নয়, অনেক বেশি সমৃদ্ধও বটে। প্রকৃতির বহু শক্তিকে অনুসন্ধান ও অনুধাবন করে মনুষ্যব্যবহারযোগ্য করা হয়েছে। সত্যই তো, পৃথিবী এখন কত সভ্য ও মার্জিত হয়েছে। তবে কেন যুদ্ধের সময় আমরা পুরোনো বর্বরতার যুগে ফিরে যাই? কারণ সব জিনিষটাই সভ্যতা ও কৃষ্টির অভাব সূচিত করে। শুধু একটি ক্ষেত্রে যুদ্ধ সভ্যতাকে স্বীকার করে এবং তার সুযোগ গ্রহণ করে; সে হচ্ছে, সভ্য মানুষের চিন্তাশক্তিকে আরও শক্তিশালী ও আরও ভয়ংকর মারণাস্ত্রনির্মাণে নিশ্চিত করা। যেসব লোক যুদ্ধসংক্রান্ত কাজ করে তাদের ভিতরে এমন অস্বাভাবিক উত্তেজনার সঞ্চার হয় যে, তারা ভুলে যায় সভ্যতার দেওয়া শিক্ষা, ভুলে যায় সত্য ও সুন্দরকে। তখন হাজার হাজার বছর আগেকার আমাদের বর্বর পূর্বপুরষদের সঙ্গে সামঞ্জসাটাই প্রকট হয়ে ওঠে। তাই যে যুগেই হোক, যুদ্ধ জিনিষটা যে এত ভয়ংকর তাতে অবাক হবার কিছু নেই।
ভাবো তো, আমাদের এই পৃথিবীটায় যদি যুদ্ধের সময় এক অজানা অতিথি এসে হাজির হয়, তার কী মনে হবে? ধরো, সে যদি শান্তির সময় আমাদের না দেখে শুধু যদ্ধের সময়েই দেখে? তখন সে শুধু, আমাদের যুদ্ধের আবহাওয়া দিয়েই বিচার করবে আর ভাববে, আমাদের মতো নিষ্ঠুর আর হৃদয়হীন কেউ নেই, আমরা মাঝে মাঝে সাহস দেখাই আর স্বার্থত্যাগ করি বটে, তবু আমরা বন্য। আর অল্প কিছু ভালো দিক আমাদের থাকলেও, মোটের উপর আমাদের একটিমাত্র চরম লক্ষ্য—পরস্পরকে হত্যা ও নিশ্চিহ্ন করা। আমাদের একটিমাত্র বিশেষ রূপ দেখে এবং তাহাও খুব অনুকূল সময়ে নয়, আমাদের পৃথিবী সম্বন্ধে বিকৃত মত গড়তে তাকে হবেই, আমাদের প্রতি অবিচার করতে সে বাধ্য।
ঠিক তেমনি, আমরাও যদি অতীত যুগটাকে যুদ্ধ এবং হত্যালীলার পটভূমিকাতেই শুধু দেখি তবে তার প্রতি অবিচার করা হবে। দুর্ভাগ্যবশত যুদ্ধ আর হত্যাকাণ্ডের উপর আমাদের দৃটি সহজে আকৃষ্ট হয়। মানুষের সাধারণ দৈনন্দিন জীবনধারায় তেমন কিছু চিত্তাকর্ষক নেই। তাই ঐতিহাসিক আর কী করেন? যুদ্ধবিগ্রহের উপরেই তাঁর যত নজর, তাকেই তুলে ধরেন যতটা পারেন। যদিও এই যুদ্ধগুলোকে আমরা ভুলতেও পারি না, উপেক্ষাও করতে পারি না, তবু যতটা গুরুত্বের প্রয়োজন তার বেশি দেওয়াও উচিত নয়। তাই অতীতকে আমরা দেখব বর্তমানের আলোয়, আর সে যুগের মানুষকে দেখব আমাদের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে। তাদের সম্বন্ধে আমাদের ধারণাগুলো তা হলেই অনেকটা সহজ ও বাস্তব হয়ে আসবে; আমরা এই সত্য উপলব্ধি করব যে, সামরিক যদ্ধবিগ্রহগুলোই বড়ো কথা নয়, তার চেয়ে বড়ো জিনিষ তাদের চিন্তাধারা, তাদের দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি। এ কথাটা মনে রাখা খুবই প্রয়োজন, কারণ, দেখবে, তোমার ইতিহাসের পাতাগুলো শুধু যুদ্ধের কাহিনীতেই ভরা। এমনকি আমার চিঠিগুলোও হয়তো সেই ধরনেরই হয়ে যাবে। এর আসল কারণ অবশ্য এই যে, অতীত যুগের দৈনন্দিন ঘটনা সম্পর্কে লেখা বড়ো কঠিন। ভালো করে আমার জানাও নেই সেসব।
আমরা দেখে এসেছি যে, ভারতবর্ষের ভাগ্যাকাশে তৈমুর ছিলেন অন্যতম প্রধান ঝঞ্ঝা। তাঁর যাত্রাপথের আশেপাশে যে বিভীষিকার তরঙ্গ তিনি তুলে গেছেন সে কথা ভাবতে গেলেও বুকের ভিতরটা শিউরে ওঠে। তবু তো সমগ্র দক্ষিণ ভারতে তাঁর কালো ছায়া পড়ে নি, পূর্ব পশ্চিম ও মধ্য ভারতেও নয়। এমনকি দিল্লি এবং মীরাটের কাছাকাছি উত্তরদিকের খানিকটা অংশ বাদে বর্তমান যুক্তপ্রদেশও প্রায় সর্বতোভাবেই বেঁচে গিয়েছিল। দিল্লি শহরের পরেই তৈমরের হাতে বহু লাঞ্ছিত প্রদেশ হিসেবে নাম করা যায় পাঞ্জাবের। তবে পাঞ্জাবেও, যারা তৈমুরের পথের সামনে পড়েছে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। পাঞ্জাবের বেশির ভাগ অধিবাসী তখনও শান্তিতে জীবনযাত্রা নির্বাহ করছিল। কাজেই এইসব যুদ্ধ ও অত্যাচারের কাহিনীকে আমরা যেন অতিরঞ্জিত না করি।
এবার আমরা চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীর ভারতবর্ষের দিকে চোখ ফেরাই। দিল্লির সুলতানশক্তি (Sultanate) দুর্বল হতে হতে তৈমুরের আগমনের সঙ্গে সম্পূর্ণ লোপ পায়। ভারতবর্ষে বৃহৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের সংখ্যা ছিল বহু—তার মধ্যে মুসলিম-রাষ্ট্রই অধিকসংখ্যক। কিন্তু দক্ষিণে একটি প্রতাপশালী হিন্দু-রাষ্ট্র ছিল, তার নাম বিজয়নগর। ইসলাম তখন ভারতবর্ষে নবাগত নয়, বরং সুপ্রতিষ্ঠিত। তখন প্রাচীন আফগান হানাদার আর দাস-রাজাদের নিষ্ঠুর প্রতাপ অনেক কমে এসেছে, এবং মুসলিম-রাজারা হিন্দু-রাজাদের মতোই ভারতীয় বনে গেছে। বহির্জগতের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে যে যুদ্ধবিগ্রহ বাধত সেটা রাজনৈতিক কারণে, ধর্ম সংক্রান্ত নয়। কখনও-বা মুসলিম রাষ্ট্রে হিন্দু সৈন্য নিযুক্ত হত, তেমনি হিন্দু-রাষ্ট্রে মুসলিম সৈন্য। মুসলমান রাজারা কখনও-বা হিন্দু রমণীকে বিবাহ করত, মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ কর্মচারী হিসেবে কত সময় নিয়োগ করত হিন্দুকে। তাদের মধ্যে তখন বিজিত বা বিজেতা, শাসিত বা শাসকের সম্পর্ক খুব কমই ছিল। বাস্তবিকপক্ষে, অধিকাংশ মুসলমান, এমনকি শাসকবর্গের মধ্যেও মুসলমান ধর্মান্তরিত ভারতীয়ের সংখ্যাই ছিল বেশি। বহু লোকেই ধর্মান্তর গ্রহণ করত রাজপ্রসাদ, অথবা আর্থিক সুব্যবস্থার আশায়, এবং ধর্মান্তর গ্রহণ সত্ত্বেও পুরোনো রীতিনীতিই আঁকড়ে থাকত। কোনো কোনো মুসলিম শাসক ধর্মান্তরকরণে বলপ্রয়োগের নীতি অবলম্বন করলেও, প্রধানত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই করতেন। কেননা তাঁরা ভাবতেন, রাজধর্মে ধর্মান্তরিত প্রজাই প্রভুর অনুগত বেশি। কিন্তু ধর্মান্তরকরণে বলপ্রয়োগের চেয়ে অর্থনৈতিক কারণই অধিক ফলপ্রসূ হয়েছিল। তখনকার দিনে অ-মসলমানদের ‘জিজিয়া’ কর দিতে বাধ্য করা হত, অনেকেই এই করের হাত এড়াতে ইসলামধর্ম গ্রহণ করত।
কিন্তু এ সমস্তই শহরের ঘটনা। গ্রামের জীবনযাত্রা থাকত অব্যাহত, লক্ষ লক্ষ গ্রামবাসী পুরোনো নিয়মেই কালাতিপাত করত। রাজকর্মচারীরা অবশ্য পল্লীজীবনেই হস্তক্ষেপ করত বেশি। গ্রাম্য-পঞ্চায়েতের ক্ষমতা আগের চেয়ে কমে গেলেও সেটা পল্লীর মেরূদণ্ড ও প্রাণকেন্দ্র হয়ে বেঁচে রইল। সামাজিক বিষয়ে এবং ধর্ম ও প্রাচীন প্রথায় গ্রামের চেহারা প্রায় অপরিবর্তিতই রইল। তুমি তো জানো, ভারতবর্ষ এখনও হাজার হাজার গ্রাম নিয়েই গঠিত। শহরগুলো হল এর বাইরের রূপ, আসল ভারতবর্ষ এখনও পল্লীগ্রামপ্রধান। এই পল্লীগ্রামপ্রধান ভারতবর্ষকে ইসলাম বদলাতে পারে নি।
ইসলামধর্মের আগমনে হিন্দুধর্মে দুই দিক থেকে নাড়া লেগেছিল। আর মজা এমনি, এই দুটো দিক আবার পরস্পরবিরোধী। এক দিকে সেটা হয়ে উঠল বিষম গোঁড়া, আত্মরক্ষার প্রচেষ্টায় কঠোরভাবে একটি ক্ষুদ্র গণ্ডির ভিতরে করল আত্মগোপন, জাতিবৈষম্য আরও প্রকট ও নিয়মতান্ত্রিক হয়ে উঠল, স্ত্রীলোকের পর্দা ও অবরোধ বেড়ে গেল। অপর পক্ষে, জাতিভেদ ও অত্যধিক পুজো-পার্বণের বিরুদ্ধে একটা প্রচ্ছন্ন আভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ জেগে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে চলল সংস্কারের প্রচেষ্টা।
অবশ্য বহু প্রাচীনকাল থেকেই হিন্দুধর্মকে কদাচারমুক্ত করবার অভিপ্রায় নিয়ে বারবার ইতিহাসে উদয় হয়েছেন কত সংস্কারক। এদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন বুদ্ধ। অষ্টম শতাব্দীর শঙ্করাচার্যের কাহিনী তোমায় আগেই বলেছি। তিন শো বছর পরে, একাদশ শতাব্দীতে, দক্ষিণে চোল-সাম্রাজ্যে শঙ্করের প্রতিদ্বন্দী চিন্তানায়করূপে আর একজন বিখ্যাত সংস্কারক দেখা দিলেন। তাঁর নাম ছিল রামানুজ। শঙ্কর ছিলেন শৈব পণ্ডিত, রামানুজ ছিলেন ভক্ত বৈষ্ণব। রামানুজ সারা ভারতবর্ষকে প্রভাবান্বিত করেছিলেন। তোমাকে তো বলেছি, রাজনীতিগতভাবে বিভিন্ন যুদ্ধরত রাষ্ট্রে ভারতবর্ষ খণ্ডিত ছিল বটে, কিন্তু সংস্কৃতির দিক দিয়ে সে ছিল একীভূত। যখনই কোনো মহামানবের বা বিরাট আন্দোলনের আবির্ভাব হয়েছে, সমস্ত রাজনীতির সীমা উপেক্ষা করে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে সারা ভারতবর্ষে।
ভারতবর্ষে ইসলামধর্ম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের মধ্যেই এক নূতন ধরনের সংস্কারকের আবির্ভাব হয়। তাঁদের কাজ ছিল ক্রিয়াকর্মের বাহুল্য দূরীভূত করে হিন্দু মুসলমান উভয় ধর্মেরই সাধারণ অংশের উপর জোর দিয়ে দুটো ধর্মকে কাছাকাছি আনা। এইভাবে দুটো ধর্মের মধ্যে সামঞ্জস্য গড়ে তুলে, দুটোকে মিলিত করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু উভয় দলই পরস্পরের সম্পর্কে বিরূদ্ধভাবাপন্ন হওয়ায় কাজটা অত্যন্ত কঠিন ছিল। কিন্তু তবু দেখতে পাব যে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই প্রচেষ্টার বিরতি নেই। কয়েকজন মুসলমান শাসক, এমনকি মহামান্য আকবরও, এই ধর্ম সমন্বয়ের প্রচেষ্টা করেছিলেন।
প্রথম এই মিলনের বাণী প্রচার করলেন রামানন্দ; ইনি চতুর্দশ শতাব্দীর দক্ষিণ- ভারত-বাসী এক খ্যাতনামা ধর্মশিক্ষক। ইনি জাতিভেদ মানতেন না, এবং তার বিরুদ্ধে প্রচার করতেন। এঁর শিষ্যদের মধ্যে কবীর নামে এক মুসলমান তাঁতি ছিলেন; কবীর পরে আরও বেশি খ্যাতি অর্জন করেন। কবীরকে সকলেই ভালোবাসত। তুমি বোধহয় জানো, তাঁর হিন্দি গান উত্তরভারতের বহু দূর পল্লী অঞ্চলেও অত্যন্ত সুপরিচিত। কবীর হিন্দু মুসলমান কিছুই ছিলেন না, অথবা তিনি দুইই ছিলেন, অথবা ছিলেন দুই-এরই মাঝামাঝি অন্য-কিছু। তাঁর শিষ্যরা এসেছিল সকল ধর্ম ও সকল সম্প্রদায় থেকে। কথিত আছে, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দেহকে একটি শ্বেত আচ্ছাদনে আবৃত করা হয়। হিন্দু শিষ্যেরা তাঁকে ভস্মীভূত করতে চায়, মুসলমান শিষ্যেরা কবর দিতে চায়। তার পর চাদর তুলে তারা দেখতে পায়, যে দেহ নিয়ে এত কলরব সেটা অদৃশ্য হয়েছে, তার জায়গায় পড়ে আছে কয়েকটা টাটকা ফুল। গল্পটা হয়তো কাল্পনিক, কিন্তু বড়ো সুন্দর।
কবীরের অল্প-কিছু পরেই উত্তর ভারতে অপর একজন ধর্মনেতা ও সংস্কারকের আবির্ভাব হয়। ইনি হলেন গুরু নানক, শিখধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর পরে পর পর শিখধর্মের আরও দশটি গুরুর আবির্ভাব হয়; এঁদের মধ্যে সর্বশেষ হলেন গুরু গোবিন্দ সিং।
ভারতবর্ষের ধর্ম ও কৃষ্টির ইতিহাসে আর-একটি সুপরিচিত নামের উল্লেখ করতেই হবে। ইনিই চৈতন্য, ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমভাগে হয় বাংলার এই বিখ্যাত পণ্ডিতের আবির্ভাব। ইনি সহসা নিজ পাণ্ডিত্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করে, ভক্তি ও বিশ্বাসের পথ গ্রহণ করেছিলেন। সারা বাংলার ইনি শিষ্যদের সঙ্গে নিয়ে ভজন গেয়ে বেড়ালেন, পরে বৈষ্ণবধর্মের স্থাপনা করেন। বাংলাদেশে এঁর প্রভাব এখনও অসামান্য।
ধর্ম-সংস্কার ও সমম্বয় সম্বন্ধে আজ এই পর্যন্ত। জীবনের অন্যান্য বিভাগেও কখনও সচেতন কখনও অচেতনভাবে এই একই সময় চলছিল। এক নূতন সৃষ্টি, নূতন কারুশিল্প, এক নূতন ভাষা গড়ে উঠছিল। কিন্তু মনে রেখো, গ্রামের চেয়ে এসমস্ত শহরেই বেশি ঘটছিল, বিশেষ করে রাজধানী-শহর দিল্লি ও অন্যান্য রাষ্ট্র ও প্রদেশের বৃহৎ শহরগুলিতে। সবচেয়ে উঁচুতে সর্বেসর্বা রাজা। যথেচ্ছাচারকে দমন করবার নানা রীতি ও অনুশাসন প্রাচীন রাজাদের আমলে ছিল। কিন্তু নূতন মুসলিম শাসকদের সেটা ছিল না। যদিও বিচারতর্কের দিক দিয়ে ইসলামধর্মেই অধিক সাম্য বর্তমান, এমনকি, আমরা তো দেখেছি, একজন ক্রীতদাসও সুলতান হতে পারে; তবু রাজার যথেচ্ছাচার ও অনিয়ন্ত্রিত শক্তি বেড়েই চলেছিল। উন্মাদ তোগলকের কাহিনীই এর সবচেয়ে বড়ো নিদর্শন—যে তোগলক রাজধানী শহরকে দিল্লি থেকে দৌলতাবাদে তুলে এনেছিল।
সুলতানদের ক্রীতদাস রাখার প্রথা ক্রমশই বেড়ে চলল। যুদ্ধের সময় এদের বন্দী করার জন্য বিশেষ-রকম উপায় গ্রহণ করা হত। এদের মধ্যে কারুশিল্পীদের সর্বাপেক্ষা মূল্যবান মনে করা ছাড়া অবশিষ্ট সকলকে নিযুক্ত করা হত সুলতানের রক্ষীর কাজে।
নালন্দা ও তক্ষশীলার মতো বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাগ্যে কী ঘটল দেখা যাক। তাদের অস্তিত্ব বহুদিন আগেই বিলুপ্ত হয়েছিল, তবে আরও অনেক নূতন ধরনের শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। তবে তাদের বলা হত ‘টোল’, সেখানে প্রাচীন সংস্কৃতসাহিত্য শিক্ষা দেওয়া হত। তাদের মধ্যে আধুনিকতা ছিল না, বরং অতীতকে উজ্জীবিত করে প্রতিক্রিয়াশীল ভাবধারাকে বাঁচিয়ে রাখত। বারাণসী বরাবরই এর সবচেয়ে বড়ো কেন্দ্র।
উপরে বলেছি কবীরের হিন্দি গানের কথা। পঞ্চদশ শতাব্দীতে এইভাবে হিন্দিভাষা যে শুধু লোকপ্রিয় হয়েছিল তাই নয়, সাহিত্যেও পরিণত হয়েছিল। সংস্কৃতভাষার মৃত্যু ঘটেছিল বহু আগেই। এমনকি কালিদাস ও গুপ্তরাজাদের সময়ও সংস্কৃত কেবলমাত্র পণ্ডিতদের ভিতরে সীমাবদ্ধ ছিল। সাধারণ লোকে কথা বলত প্রাকৃতভাষায়; সংস্কৃতেরই ঈষৎ পরিবর্তিত রূপ এই প্রাকৃত। ধীরে ধীরে সংস্কৃত থেকে উৎপন্ন অপর ভাষাগুলি কিস্তারলাভ করে, যথা—হিন্দি, বাংলা, মারাঠি এবং গুজরাটি। বহু মুসলমান লেখক ও কবি হিন্দিভাষায় রচনা করলেন। জৌনপুরের এক মুসলমান রাজা পঞ্চদশ শতাব্দীতে মহাভারত ও ভাগবতের সংস্কৃত থেকে বাংলা তর্জমা করান। দক্ষিণ ভারতে অবস্থিত বিজাপুরের মুসলমান রাজস্বের বিবরণ মারাঠি ভাষায় লেখা হয়েছিল। কাজেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যেই সংস্কৃত থেকে উৎপন্ন ভাষাগুলি যথেষ্ট উন্নত হয়েছে। দক্ষিণ ভারতের তামিল, তেলেগু, মালয়ালম এবং ক্যানারিজ প্রভৃতি প্রাবিড় ভাষাগুলি অবশ্য বহু পুরোনো।
মুসলিম রাজভাষা ছিল ফার্শি। শিক্ষিত ব্যক্তিদের রাজসভা অথবা শাসনতন্ত্র-সংক্রান্ত কোনো কাজ করতে হলেই ফার্শি শিখতে হত। এমনি করে বহু হিন্দু ফার্শি ভাষা আয়ত্ত করেন। ক্রমে বাজারে শিবিরে সাধারণের মধ্যে একটি চলিত ভাষার জন্ম হল, এর নাম উর্দু। এই উর্দু শব্দের অর্থ ‘শিবির’। আসলে এটা কোনো নূতন ভাষা নয়। কিছুটা ভিন্ন পোশাকে একে হিন্দিই বলা চলে। ফার্শি কথার বাহুল্য থাকলেও, অন্যান্য বিষয়ে এটা হিন্দিই। এই হিন্দি-উর্দু ভাষা, যাকে বলা হয় হিন্দুস্থানি, সারা উত্তর ও মধ্য ভারতে বিস্তারলাভ করল। আজ অল্পকিছু তফাত সত্ত্বেও, প্রায় পনেরো কোটি লোকে এই ভাষায় কথা বলে, এবং ততোধিক লোকে এই ভাষা বোঝে। কাজেই সংখ্যাধিক্যতার দিক থেকে এটি পৃথিবীর মধ্যে বৃহৎ ভাষাপুঞ্জের একটি।
স্থাপত্যশিল্পে নূতন ধরন এবং নূতন দৃষ্টিভঙ্গির আবির্ভাব ও প্রসার হওয়ায় কত প্রাসাদোপম অট্টালিকা গড়ে ওঠে—দক্ষিণে বিজাপুর ও বিজয়নগরে, গোলকুণ্ডাতে, আমেদাবাদে; (এই আমেদাবাদ তখনকার দিনে একটি বিরাট ও সদর শহর ছিল) এবং এলাহাবাদের সন্নিকটে জৌনপুরে। হায়দ্রাবাদের কাছে আমরা গোলকুণ্ডার ভগ্নাবশেষ দেখতে গিয়েছিলাম, মনে পড়ে? বিরাট দুর্গটার মাথায় চড়ে আমরা নিম্নে বিস্তৃত প্রাচীন শহরটাকে দেখেছিলাম। কত রাজপ্রাসাদ, কত পণ্যশালা—আর আজ সব ধ্বংসস্তূপ!
তাই, যখন রাজন্যবর্গ পরস্পরের সঙ্গে মারামারি করে পরস্পরকে ধ্বংস করছিলেন, এক নীরব শক্তি প্রাণপণ চেষ্টা করছিল সমন্বয় ঘটাতে, যাতে ভারতবাসী নির্বিরোধে পাশাপাশি বাস করে উন্নতি ও অগ্রগতির পথে যৌথ-উদ্যম প্রয়োগ করতে পারে। কয়েক শতাব্দীর পর এই প্রচেষ্টা অনেকটা সাফল্যমণ্ডিত হয়। কিন্তু এই কাজ সম্পূর্ণ হবার আগেই আর-একটা গোলমালে আমরা আবার কিছুটা পথ পিছিয়ে গেলাম। আবার আমাদের যা-কিছু ভালো তাদের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য ও সমন্বয় সাধনের জন্যে পূর্ব-অনুসৃত পথে এগিয়ে যেতে হবে। তবে এইবার অগ্রসর হতে হবে আরও দৃঢ় পদক্ষেপে। এবার এর প্রতিষ্ঠা হওয়া চাই স্বাধীনতা ও সাম্যের উপরে, আরও-ভালো পৃথিবীর উপযুক্ত ও যোগ্য হওয়া চাই। তবেই এটা স্থায়ী হবে।
শত শত বছর ধরে ধর্ম ও কৃষ্টির এই সমন্বয়-সমস্যা চিন্তাশীল ভারতবাসীর মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। এই বিষয়ে অতিরিক্ত চিন্তার ফলে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতার সমস্যার কথা তাঁরা ভুলে গেলেন। তাই ইউরোপ যখন কত বিভিন্ন দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়ে গেল, অনগ্রসর অনুন্নত ভারতবর্ষ রইল পিছনে পড়ে।
তোমায় আগেই বলেছি, এমন এক সময় ছিল যখন রসায়নশাস্ত্রে ভারতবর্ষের উৎকর্ষের জন্যে রঙ-তৈরি, ইস্পাতের কাজ ও অন্যান্য বহু বিষয়ে আমাদের দেশ বৈদেশিক বাজার নিয়ন্ত্রণ করত। এদেশের বাণিজ্য পোতগুলি নানাবিধ পণ্য বহু দূরদূরান্তরে বহন করে নিয়ে যেত। এখন যে সময়ের কথা বলছি তার বহু আগেই ভারতবর্ষ সে নিয়ন্ত্রণাধিকার হারিয়েছে। ষোড়শ শতাব্দীতে নদীর গতি আবার প্রাচ্যের দিকে মোড় ফেরে। প্রথমে সেটা ছিল ক্ষীণ জলধারা। কিন্তু পরে সেটা পরিণত হয় বিরাট শ্রোতস্বিনীতে।