বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/কয়েকজন প্রসিদ্ধ লেখক

উইকিসংকলন থেকে

১২৯

কয়েকজন প্রসিদ্ধ লেখক

১লা ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৩

 কাল তোমাকে জর্মানির অভ্যুদয়ের কথা লিখতে লিখতে মনে হল, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে জর্মানির সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি যিনি ছিলেন, তাঁর সম্বন্ধেই তোমাকে কিছু বলা হয় নি। এই লোকটি হচ্ছেন গ্যেটে। অতি বিখ্যাত লেখক ইনি, কয়েক মাস মাত্র আগে জর্মনির সর্বত্র এঁর মৃত্যুতিথির শতবার্ষিকী-উৎসব সম্পন্ন হয়েছে। তার পর আবার ভাবলাম, এই সময়ে ইউরোপের বড়ো বড়ো লেখক যাঁরা ছিলেন তাঁদের সকলের সম্বন্ধেই কিছু কথা তোমাকে বললে হত। কিন্তু আমার পক্ষে এটা একটা বিপজ্জনক ব্যাপার; বিপজ্জনক বললাম তার কারণ, বলতে গেলে খালি আমার এ বিষয়ে অজ্ঞতাই প্রমাণ হয়ে যাবে। শুধু কতকগুলো বিখ্যাত ব্যক্তির নাম আউড়ে যাবার কোনো মানে হয় না; আবার তার চেয়ে বেশি বলতে যাওয়াও আমার পক্ষে কঠিন। ইংরেজি সাহিত্য সম্বন্ধেই আমার জ্ঞান অতি অল্প; ইউরোপের অন্যান্য দেশের সাহিত্য সম্বন্ধে আমার বিদ্যার দৌড় হচ্ছে মাত্র দু-চারখানা অনুবাদ পড়া পর্যন্ত। কী এখন করি, বলো তো।

 এ বিষয়ে খানিকটা তোমাকে বলতেই হবে, দেখলাম এই সংকল্পটা ভূতের মতো আমার ঘাড়ে চেপে বসেছে, কিছুতেই তাকে ঝেড়ে ফেলতে পারছি না। তখন ভাবলাম, অন্তত এ দিকের পথে একটা ইঙ্গিত তোমাকে দিয়ে দেব যদিও সে রূপকথার রাজ্যের পথে সঙ্গে করে তোমাকে বেশিদূর এগিয়ে দিয়ে আসা আমার সাধ্যে কুলোবে না। একটা জাতির ভিতরকার মনটিকে বুঝতে হলে তার জনতার বাইরের কার্যকলাপের চেয়েও বেশি করে দেখতে হয় তার শিল্প আর সাহিত্যকে। মনের সন্ধান এরই মধ্যে মেলে, তার শান্ত গম্ভীর চিন্তাধারার সাক্ষাৎ, কোনো একটি মুহূর্তের সাময়িক উত্তেজনা বা সংস্কার তাকে ব্যাহত করতে পারে না। অথচ এখনকার দিনে কবিকে বা শিল্পীকে আর আমরা ভবিষ্যৎ-দিনের স্বপ্নদ্রষ্টা বলে মনে করি না; সমাজে তাদের মর্যাদাও নেই। মর্যাদা যদি-বা দৈবাৎ কারও ভাগ্যে মিলে যায়, তাও মেলে সাধারণত মৃত্যুর পরে।

 অতএব আমি মাত্র কয়েকজনের নামই তোমাকে শোনাব। এদের অনেকের নাম তুমি নিশ্চয়ই আগে থেকে জান। আর কথাও আমি বলব শুধু এই শতাব্দীটির প্রথম দিকটি নিয়ে। এটা হচ্ছে শুধু তোমার জানবার ইচ্ছাকে শানিয়ে তোলা। মনে রেখো, ইউরোপের বহু দেশেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে বহু চমৎকার সাহিত্য রচিত হয়েছে, তার ভাণ্ডার এখনও পূর্ণ।

 গ্যেটে বস্তুত ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর লোক; তাঁর জন্ম হয় ১৭৪৯ সনে। কিন্তু তিনি দীর্ঘকাল বেঁচে ছিলেন, তিরাশি বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। কাজেই ঊনবিংশ শতাব্দীরও এক-তৃতীয়াংশ কাল তিনি স্বচক্ষে দেখে গেছেন। গ্যেটের জীবনকালটা ছিল ইউরোপের ইতিহাসে একটা অতি প্রচণ্ড বিপর্যয়ের যুগ; তাঁর নিজের দেশটিকেই তিনি নেপোলিয়নের সেনার হাতে বিজিত হতে দেখেছিলেন। নিজের জীবনেও তিনি অনেক দুঃখ অনেক আঘাত পেয়েছেন; কিন্তু তারই ফলে ক্রমে জীবনের সমস্ত দুঃখ-দৈন্যকে জয় করবার মতো একটা মনের জোর তিনি অর্জন করলেন, অর্জন করলেন একটা আশ্চর্য নির্লিপ্ততা এবং প্রশান্তি; তার ফলে তাঁর মনেও তিনি শান্তি পেলেন। নেপোলিয়ন যখন প্রথম তাঁকে দেখলেন তখন তাঁর বয়স ষাট পেরিয়ে গেছে। দরজার মুখে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁর মুখে এবং সর্বাঙ্গে এমন একটা-কিছু ছিল, এমন একটা অনুদ্‌বিগ্ন দৃষ্টি একটা মর্যদাপূর্ণ ব্যক্তিত্ব যে, দেখে নেপোলিয়ন চেঁচিয়ে উঠলেন, “এই এক জন মানুষ দেখলাম!” গ্যেটে অনেক রকম কাজ করে গেছেন; যাতে তিনি হাত দিতেন সেইটিই চমৎকার ভাবে সম্পন্ন করতেন। তিনি ছিলেন একাধারে দার্শনিক, কবি, ন্যাটাকার এবং বৈজ্ঞানিক—বহু বিভিন্ন বিজ্ঞান সম্বন্ধে তাঁর চর্চা ছিল; এর উপর আবার তাঁর জীবিকা-নির্বাহের উপায় ছিল চাকুরি—জর্মনির একটি ক্ষুদ্র রাজ্যের রাজার তিনি মন্ত্রী ছিলেন! আমরা প্রায় সকলেই তাঁকে চিনি একজন লেখক বলে; তাঁর সবচেয়ে প্রসিদ্ধ বইয়ের নাম হচ্ছে ফাউস্ট। দীর্ঘজীবন পেয়েছিলেন তিনি, তাঁর জীবনকালেই তাঁর খ্যাতি বহুদূর দেশেও ছড়িয়ে পড়েছিল; তাঁর নিজ সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁকে একজন দেবতুল্য ব্যক্তি বলেই তাঁর দেশবাসীরা মনে করত।

 গ্যেটেরই সময়কার অবশ্য তাঁর চেয়ে বয়সে কিছু ছোটো, আর-একজন ছিলেন, তাঁর নাম শিলার। ইনি একজন খুব বড়ো কবি। জর্মনির আর-এক জন কবি—হায়েন্‌রীখ হাইন, তাঁর বয়স এঁদের চেয়ে অনেক কম ছিল। হাইন অনেকগুলো খুব চমৎকার গীতিকবিতা লিখে গেছেন। গ্যেটে শিলার এবং হাইন, এঁরা তিনজনেই গ্রীসের প্রাচীন সংস্কৃতির পরম ভক্ত ছিলেন।

 দীর্ঘকাল ধরে জর্মনি দার্শনিকের দেশ বলে প্রসিদ্ধ হয়ে আছে, দু-একজন দার্শনিকের নামও তোমাকে শোনাতে পারি, যদিও এ হয়তো তোমার তেমন ভালো লাগবে না। লেখা বইগুলোতে খুবই জটিল এবং কঠিন তত্ত্বের আলোচনা থাকে, তাই—যাদের এই বিষয়টা বিশেষ ভালো লাগে তারাই শুধু সে বই পড়তে চেষ্টা করে। তবুও এই দার্শনিকদের বইগুলো পড়ে আনন্দ এবং শিক্ষা দুটোই পাওয়া যায়; কারণ, এঁরাই চিরকাল জ্ঞানের আর চিন্তার দীপশিখাকে জ্বালিয়ে রেখেছেন। এঁদের বই পড়েই লোকে জগতের চিন্তাধারার গতির হদিশ পার। অষ্টাদশ শতাব্দীতে জর্মনির বড়ো দার্শনিক ছিলেন ইমানুয়েল কাণ্ট; এই শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত তিনি বেঁচে ছিলেন, তখন তাঁর বয়স আশি বছর। দার্শনিকদের মধ্যে আর-একটি বড়ো পণ্ডিতের নাম হেগেল। হেগেল মতামতের ব্যাপারে কাণ্টের অনুবর্তী ছিলেন; অনেকের মতে কমিউনিজ্‌মের প্রবর্তক কার্ল্‌ মার্ক্‌সের উপরে তাঁর মতামতের খুব বড়ো প্রভাব দেখা যায়। দার্শনিকদের সম্বন্ধে এইটুকু বলেই আমি ক্ষান্ত হব।

 ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বহু সংখ্যক কবির আবির্ভাব হয়েছিল, বিশেষ করে ইংলণ্ডে। রাশিয়ার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ জাতীয় কবি কেনও এই সময়েই জীবিত ছিলেন। ইনি অল্পবয়সেই দ্বন্দ্বযুদ্ধে মারা যান। ফ্রান্সেও অনেক কবি আবির্ভূত হয়েছিলেন, কিন্তু আমি তাঁদের মধ্যে মাত্র দু জনের নাম এখানে করব। এদের এক জন হচ্ছেন ভিক্টর হিউগো, ১৮০২ সনে ইনি জন্মগ্রহণ করেন। গ্যেটের মতো ইনিও তিরাশি বছর পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন, এবং ঠিক গ্যেটের মতোই এঁকেও এঁর দেশবাসীরা সাহিত্যের ক্ষেত্রে একজন দেবতাস্বরূপ বলে মনে করত। লেখক হিসাবে এবং রাজনীতিক হিসাবে, উভয়তই এঁর জীবনটা ছিল ঘটনাবৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। প্রথম-জীবনে ইনি ছিলেন একজন উগ্র রাজতন্ত্রী, এবং প্রায় স্বৈরতন্ত্রেরই সমর্থক। ক্রমে ক্রমে একটু একটু করে তাঁর মত বদলাতে লাগল; ১৮৪৮ সনে তিনি প্রজাতন্ত্রবাদী হয়ে দাঁড়ালেন। লুই নেপোলিয়ন যখন ক্ষণজীবী দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেণ্ট হলেন তখন তিনি হিউগোকে তাঁর প্রজাতন্ত্রী মতামতের অপরাধে নির্বাসিত করে দিলেন। ১৮৭১ সনে ভিক্টর হিউগো প্যারিস-কমিউনের পক্ষ অবলম্বন করলেন। রক্ষণশীলতার চরমপন্থী ছিলেন তিনি; ধীরে ধীরে কিন্তু স্থির গতিতে বদলাতে বদলাতে তিনি হয়ে গেলেন সমাজতন্ত্রবাদেরই চরম উপাসক। বয়স বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে অনেক মানুষই রক্ষণশীল এবং প্রতিক্রিয়াপন্থী হয়ে ওঠে। হিউগোর বেলায় হল ঠিক তার বিপরীত। কিন্তু আমরা এখানে ভিক্টর হিউগোকে দেখছিলাম লেখক হিসাবে। তিনি ছিলেন বড়ো কবি, ঔপন্যাসিক এবং ন্যাটাকার।

 দ্বিতীয় যে ফরাসি লেখকটির নাম তোমাকে বলব তিনি হচ্ছেন অনর দ্য বাল্‌জাক। ইনি ভিক্টর হিউগোর সমসাময়িক, কিন্তু দু জনের মধ্যে অনেক তফাত। উপন্যাস লেখায় বাল্‌জাকের অদ্ভূত শক্তি ছিল; খুব বেশি দিন তিনি বাঁচেন নি অথচ তারই মধ্যে বহু সংখ্যক উপন্যাস লিখে গেছেন। তাঁর গল্পগুলো পরস্পরের সঙ্গে জড়ানো, একই চরিত্রের দেখা তাঁর অনেক গল্পের মধ্যে পাওয়া যায়। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর সময়কার ফ্রান্সের সমগ্র জীবনযাত্রার স্বরূপটি তিনি তাঁর উপন্যাসের মধ্যে ফুটিয়ে তুলবেন; তাঁর সমস্ত রচনাবলীর নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘মানুষের জীবননাট্য’। সংকল্পটা খুবই বড়ো সন্দেহ নেই; দীর্ঘকাল ধরে অতি কঠোর পরিশ্রম করেও তিনি তাঁর এই বিরাট স্বেচ্ছাকৃত কর্তব্যকে সম্পূর্ণ করে যেতে পারেন নি।

 ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ইংলণ্ডের কবিদের মধ্যে তিন জন তরুণ ও গুণী করি প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছেন। এঁরা ছিলেন সমসাময়িক, তিন জনেই মারাও যান অল্প বয়সে, পরস্পর থেকে ঠিক তিনটি বছরের মধ্যে। এই তিনজন হচ্ছেন কীট্‌স্ শেলি আর বাররন। কীট্‌স্‌কে দারিদ্র্য এবং নিরাশার সঙ্গে কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছিল, ১৮২১ সনে ছাব্বিশ বছর বয়সে তিনি রোমে মারা যান, তখনও তাঁর নাম বিশেষ কেউ জানত না। তবু কিন্তু তিনি কতকগুলো খুব চমৎকার কবিতা লিখে গেছেন। কীট্‌স্‌ ছিলেন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোক; পয়সার অভাবে যদি তাঁরই কাব্যচর্চার এত বাধা পড়ে থাকে, তবে দরিদ্রের পক্ষে কবি এবং সাহিত্যিক হওয়া আরও কত কঠিন ব্যাপার, সেটা ভেবে দেখবার মতো। কেম্‌ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন যিনি ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক তিনি এ সম্বন্ধে একটি ভারি যুক্তিপূর্ণ কথা বলেছেন; “এটা নিশ্চিত আমাদের এই সমাজটিরই মধ্যে কোথাও একটা গলদ রয়েছে, যার ফলে দরিদ্র কবির পক্ষে সাফল্যের কোনো আশা থাকে না, গত দু শো বছর ধরেই এমনি চলেছে। আমার কথা বিশ্বাস করুন—দশটি বছর কালের অধিকাংশ সময় আমি প্রায় তিন শো কুড়িটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে বিশেষ লক্ষ্য করে দেখেছি—আমরা গণতন্ত্রের বুলি আওড়াই, কিন্তু কার্যত, বুদ্ধিবৃত্তির যে স্বাধীনতা থাকলে বড়ো উঁচুদরের সাহিত্য রচনা করা সম্ভব হয় সে স্বাধীনতা অর্জনের ভরসা এথেন্সের ক্রীতদাসদের যতটুকু ছিল, ইংলণ্ডের দরিদ্র শিশুদের তার চেয়ে মোটেই বেশি নেই।”

 এঁর কথাটি আমি উদ্ধৃত করলাম তার কারণ, আমরা স্বভাবতই ভুলে যাই যে, কাব্য ও সব-সাহিত্য রচনা এবং সংস্কৃতি, এগুলো সবই সাধারণত রয়েছে অবস্থাপন্ন শ্রেণীদের হাতে একচেটিয়া হয়ে। দরিদ্রের কুটিরে কাব্য আর সংস্কৃতির স্থান হয় না; শূন্য উদরে চর্চা করবার বস্তু এগুলি নয়। তাই আমাদের আধুনিক কালের সংস্কৃতি হয়েছে অবস্থাপন্ন বুর্জোয়া মনেরই প্রতিলিপি মাত্র। হয়তো এর মধ্যেও প্রকাণ্ড একটা পরিবর্তন আসবে, যেদিন শ্রমিকরা নূতনতর সমাজব্যবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে এর ভার হাতে তুলে নেবে; সে ব্যবস্থাতে সংস্কৃতি নিয়ে মাথা ঘামাবার সুযোগ এবং অবসর তারও থাকবে। আজকালকার সোভিয়েট রাশিয়াতে এই রকমেরই একটা পরিবর্তন চলছে, আমরা মুগ্ধ হয়ে তার গতি নিরীক্ষণ করছি।

 এর থেকেই আরও একটা কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—গত কয়েক পুরুষ ধরে ভারতবর্ষে আমাদের সংস্কৃতির যে দৈন্য দেখা দিয়েছে তারও কারণ হচ্ছে, আমাদের দেশবাসীদের চরম দারিদ্র্য। যে মানুষের ঘরে খাবার সংস্থান নেই তার কাছে সংস্কৃতির কথা বলতে যাওয়া মানেই তাকে নিছক অপমান করা। যে দু-চারজন দৈবাৎ একটু অবস্থাপন্ন থাকে, দারিদ্র্যের এই গ্লানি তাদেরও জীবনকে অবসন্ন করে আনে, সেইজন্যই দেখছি ভারতবর্ষে এখন এই শ্রেণীর লোকেরাও অত্যন্তরকম সংস্কৃতিহীন হয়ে পড়েছে। বিদেশী শাসন আর সামাজিক পশ্চাদ্‌গতির কী অপরিসীম কুফল! তবু এই নিদারুণ দারিদ্র্য এবং বৈচিত্র্যহীনতার মধ্যে থেকেও ভারতবর্ষে আজও গান্ধী এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো এক-এক জন অপূর্ব মানুষ, সংস্কৃতির এক-এক জন বিরাট প্রতীক জন্মগ্রহণ করেছেন, এ কি কম কথা!

 আমার আসল কথাটা ছেড়ে চলে এসেছি।

 শেলি ছিলেন একজন সত্যি করে ভালোবাসবার মতো লোক। অতি অল্প বয়স থেকেই তিনি ছিলেন উৎসাহ-উদ্যমে ভরপরে। প্রত্যেক স্থানে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে প্রস্তুত যোদ্ধা। ‘নাস্তিকতার প্রয়োজন’ সম্বন্ধে একটি প্রবন্ধ লেখার জন্যে তাঁকে অক্সফোর্ডের কলেজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনি (এবং কীট্‌স্‌ও) তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনটি কাটিয়ে গেছেন, ঠিক কবির জীবন যেমনটি হওয়া উচিত বলে লোকের ধারণা তেমনিভাবে—কল্পনার রাজ্যে, হাওয়ায় পাখা মেলে, বাস্তব পৃথিবীর বাধাবিঘ্নকে গ্রাহ্যমাত্র না করে। কীট্‌সের মৃত্যুর এক বছর পরে ইতালির উপকূলে জলে ডুবে শেলির মৃত্যু হয়। তাঁর প্রসিদ্ধ কবিতাগুলোর নাম তোমাকে শোনাবার দরকার নেই, তুমি নিজেই অনায়াসে সে জেনে নিতে পারবে। কিন্তু তাঁর একটি ছোটো কবিতা আমি এখানে উদ্ধৃত করে দিচ্ছি। তাঁর খুব ভালো রচনা যেগুলি তার মধ্যে অবশ্য এটি পড়ে না। কিন্তু আমাদের এই বর্তমান সভ্যতার আমলে দরিদ্র শ্রমিকের কী নিদারুণ দুর্ভাগ্য দেখা দিয়েছে তার একটি সুন্দর বর্ণনা এই কবিতাটিতে আছে। আগের দিনের ক্রীতদাসের চেয়ে তার অবস্থা মোটেই কম খারাপ নয়। কবিতাটি যে দিন লেখা হয়েছিল তার পর এক শো বছরেরও বেশি দিন চলে গেছে; কিন্তু বর্তমান কালের অবস্থার সঙ্গেও এর কথা বেশ মিলে যায়। কবিতাটির নাম হচ্ছে ‘অরাজকতার মুখোশ’:

স্বাধীনতা কাকে বলে? —তোমরা তো শুধু জানো,
দাসত্ব যার নাম, তারেই কেবল মানো।
তার নাম হয়ে গেছে, বহু অভ্যাসে জানি,
তোমারই নামের ছায়া, তাহারই প্রতিধ্বনি।
তার মানে সারাদিন খেটে যাওয়া আর পাওয়া
যেটকু বেতনে চলে পেটেভাতে দুটি খাওয়া,
কোনোমতে দেহ নিয়ে কায়ক্লেশে বেঁচে থাকা
মনিবের প্রয়োজনে প্রাণটকু ধরে রাখা।
তাহাদের প্রয়োজনে তুমি হও সকলই—
তাঁত বা লাঙল হও, তরবারি, কোদালি;
তোমাদের সম্মতি কে পুছে আছে বা নাই—
তাদের রক্ষা আর বিলাস তো যেটা চাই।
তোমাদের শিশুগুলি অনাহারে হীনবল,
তাহাদের মায়েদের পেটে জ্বালা, চোখে জল,

অনাবৃত দেহে যবে শীত আসে নামিয়া,
যায় ক্ষীণ হদয়ের স্পন্দন থামিয়া।
তোমরা ক্ষুধায় মরো, লোভে ভরা চক্ষে
দেখো সেই খাদ্যেরে, বিলাসীর কক্ষে,
ধনী যারে হেলাভরে দেয় নিত্য ছুঁড়ে
তাহার আদরে-পোষা স্ফীতকায় কুকুরে।
তোমাদের অন্তরও দাসত্বে বাঁধা ভাই,
নিজের ইচ্ছা সেও তোমার অধীন নাই,
তোমার জীবনধারা তাই হয়ে রয়েছে
অন্যেরা তোমাদের যেমনটি গড়েছে।
অভিযোগ কোনোদিন কর যদি তার পর
দুর্বল ক্ষীণ দেহ, অশ্রুতে ক্ষীণ স্বর—
অমনি ছুটিয়া আসে মনিবের অনুচর,
পীড়ন তোমার ’পরে, তোমার নারীর পর—
শিশিরের মতো ঘাসে জমে রুধিরের সর!

 বায়্‌রনও স্বাধীনতার স্তুতি গান করে অনেক সুন্দর কবিতা লিখেছেন; কিন্তু তাঁর সে স্বাধীনতা হচ্ছে জাতির স্বাধীনতা, শেলির মতো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নয়। বায়্‌রন মারা বান তুর্কির বিরুদ্ধে গ্রীকদের স্বাধীনতা-সমরে যুদ্ধ করে, শেলির মৃত্যুর দুই বছর পরে। মানুষ হিসাবে বায়্‌রনের উপরে আমার বিশেষ শ্রদ্ধা নেই, কিন্তু তবু তাঁর সম্বন্ধে আমার মনে একটা সহানভূতি আছে। তিনি ছিলেন হ্যারো স্কুল এবং কেম্‌ব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের ছাত্র। আমিও এই স্কুলে আর কলেজে পড়েছি। বায়্‌রন কিন্তু প্রথম বয়স থেকেই কবি বলে খ্যাতি লাভ করেছিলেন, কীট্‌স্‌, আর শেলির সে ভাগ্য হয় নি। লণ্ডনের পাঠকসমাজ তাঁকে একেবারে মাথায় করে তুলেছিল, তার পর আবার ধপাস্ করে ধুলোয় আছড়ে ফেলে দিয়েছিল।

 এই সময় আরও দুজন নাম করা কবির আবির্ভাব হয়, এঁরা দুজনেই এই তিন যুবক-কবির চেয়ে অনেক দীর্ঘ আয়ু পেয়েছিলেন। ওয়ার্ড্‌স্‌ওয়ার্থ ১৭৭০ থেকে ১৮৫০ সন, আশি বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। ইংলণ্ডের শ্রেষ্ঠ কবিদের মধ্যে তাঁকে একজন বলে ধরা হয়। তিনি বিশ্বপ্রকৃতির অত্যন্ত ভক্ত ছিলেন, তাঁর কবিতারও অনেকখানিই প্রকৃতিকে নিয়ে লেখা। এঁদের অন্যজন হচ্ছেন কোল্‌রিজ; তাঁর কয়েকটি কবিতা খুবই ভালো।

 ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে তিনজন প্রসিদ্ধ ঔপন্যাসিকেরও জন্ম হয়। এঁদের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে বড়ো ছিলেন ওয়াল্‌টার স্কট; তাঁর ওয়েভার্লি উপন্যাসগুলো লোকেরা খুব আগ্রহ করে পড়ত। তুমিও বোধ হয় তাঁর কিছু কিছু পড়েছ। আমার মনে আছে, ছোটো ছেলে যখন ছিলাম তখন আমারও সেগুলো পড়তে বেশ লাগত। কিন্তু বয়স বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পছন্দও বদলায়; এখন পড়লে সেগুলো নিশ্চয়ই আমার ভালো লাগবে না। অন্য দুজন ঔপন্যাসিকের নাম হচ্ছে থ্যাকারে আর ডিকেন্স। আমার মতে এঁরা দুজনেই স্কটের চেয়ে অনেক ভালো লিখতেন। তোমারও এঁদের লেখা ভালো লাগে আশা করি। থাকারে ১৮৯১ সনে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন, পাঁচ-ছয় বছর বয়স পর্যন্ত তাঁর সেখানেই কেটেছিল। তাঁর কয়েকখানা বইয়ে ভারতীয় ‘নবাব’দের খুব চমৎকার বর্ণনা আছে—নবাব মানে হচ্ছে, ভারতবর্ষে যে ইংরেজরা এসে বিপুল ধনসম্পত্তি অর্জন করে মোটা আর বদমেজাজি হয়ে উঠত, তার পর ইংলণ্ডে ফিরে গিয়ে বড়োমানুষি করে দিন কাটাত।

 ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে যে লেখকদের আবির্ভাব হয়েছিল তাঁদের সম্বন্ধে এর বেশি কথা আমি বলব না। খুব বড়ো একটা বিষয় সম্বন্ধে এ খুব অল্প একটুখানি বলা, এই বিষয়টি সম্বন্ধে যাঁর জানাশোনা আছে এমন কেউ হলে হয়তো এ নিয়ে বেশ সুন্দর করে গুছিয়ে লিখতে পারতেন; তিনি নিশ্চয়ই তোমাকে এই যুগের সংগীত এবং শিল্পকলার সম্বন্ধেও অনেক কথা বলতেন। কিন্তু সে করতে হলে জানাও চাই বলতে পারাও চাই; সেটা আমার বিদ্যার বাইরে, কাজেই আমি বুদ্ধিমানের মতো চুপ করে গেলাম, অজানা জায়গায় পা বাড়ালাম না।

 গ্যেটের ফাউস্ট্ থেকে একটি কবিতা উদ্‌ধৃত করে দিয়ে আমি এই চিঠি শেষ করছি। এটা অবশ্য তাঁর জর্মন থেকে অনুবাদ করা:

হায়, হায়—
পৃথিবীকে আঘাত হেনেছ তুমি,
তুমি তাকে দিয়েছ ধূলোয় লুটিয়ে,
বিধস্ত, বিপর্যস্ত করে,
অনস্তিত্বের অতলে ফেলেছে তাকে ছুঁড়ে—
দেবকল্পের আঘাতে সে চর্ণীকৃত!
আমরা সেইগুলোকে কুড়িয়ে নিয়ে যাই
পৃথিবী ভাঙা খোলামকুচিগুলোকে,
আমরা গাই তার বিদায়-সংগীত
যে মাধুরী গেল অন্তহিত হয়ে
যে সৌন্দর্য গেল মৃত্যুর মাঝে তলিয়ে!
আবার তুমি গড়ে তোলো তাকে
হে পৃথিবীর বিরাট সন্তান,
আবার গড়ে তোলো পৃথিবীকে,
গড়ো তাকে আরও মহত্তর করে
তোমার নিজের বুকের আশ্রয়ে আরও উচ্চতর পাদপীঠে!
আবার তোমার জীবনযাত্রা শুরু করো,
আবার ছুটে চলো তোমার পথ বেয়ে।
আরও উচ্চ, আরও স্পষ্ট স্বরে
আরও সুন্দরতর সুরে
আবার বাজাও তোমার বাঁশি
যেমনটি কেউ কখনও শোনে নি!