বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/কর্ডোবা ও গ্রানাডা
৬১
কর্ডোবা ও গ্রানাডা
১৬ই জুন, ১৯৩২
এশিয়া ও ইউরোপ পরিক্রমা করে আমরা এখন যে সময়টাতে পৌঁচেছি সে হল খৃষ্টজন্মের হাজার বছর পরেকার যুগ। গত চিঠিতে আমরা এক পলক পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখেছি। আরবদের অধীনে স্পেনদেশের অবস্থা সে সময় কেমন ছিল সে কথাটা কেমন করে যেন বাদ পড়ে গেছে। আবার একবার পিছনে ফেরা যাক। স্পেনকে সেই সময়কার ইতিহাসে তার নির্দিষ্ট স্থানে বসাতে হবে তো!
আগে আগে যা বলেছি তা যদি তোমার মনে থাকে তবে স্পেনের ইতিহাস কিছুটা তোমার খুব সম্ভব জানাই আছে। খৃষ্টীয় ৭১১ অব্দে আরব-সেনাপতি তারিখ্ সমুদ্র পার হয়ে আফ্রিকা থেকে স্পেনে পদার্পণ করেন, তাঁর জাহাজ জিব্রাল্টার-বন্দরে এসে লাগে। তারিখের পাহাড়—জাবাল-উৎ-তারিখ্—এই কথাগুলি এখনও জিব্রাল্টার-নামের মধ্যে থেকে গেছে। দুই বছরের মধ্যে সমস্ত স্পেন আরবদের পদানত হয়। কিছুকাল পরে তারা পর্তুগালও দখল করে বসে। এখানেই তাদের অভিযান শেষ হল না, তারা দলে দলে ঢুকে পড়ল ফ্রান্সে, ছড়িয়ে পড়ল দক্ষিণ ইউরোপের সর্বত্র। এই আরব-বিভীষিকা ইউরোপের মনে তুমুল ত্রাসের সঞ্চার করে। ফ্রাংক্ ও অন্যান্য ইউরোপীয় জাতিপুঞ্জ চার্ল্স্ মার্টেলের নেতৃত্বে আরবদের বাধা দেবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে। তাদের এই চেষ্টা সফল হয়—পোয়াটিয়ের্সের কাছে টুর্স্ বলে একটি জায়গায় ফ্রাংক্রা আরবদের পরাজিত করে। এই পরাজয়ের পর আরবদের ইউরোপ জয় করার সকল স্বপ্ন ভূমিসাৎ হয়ে যায়। এর পরও অনেকবার ফ্রাঙ্ক্ ও অন্যান্য খৃষ্টান জাতিদের সঙ্গে আরবদের সংঘাত হয়েছে—কখনও তারা ফ্রান্সে ঢুকে পড়েছে, কখনও-বা ফ্রাঙ্ক্রা তাদের হটিয়ে দিয়েছে স্পেনে। শার্লামেন স্পেনে ঢুকে আরবদের আক্রমণ করেছিলেন, পরাজিত হয়ে তাঁকে ফিরে আসতে হয়। মোটামুটিভাবে বলতে গেলে বলা যায়, দু পক্ষের কেউই কারও চেয়ে কম ছিল না। আরবেরা স্পেনদেশের শাসনকর্তা হয়ে বসলেও ইউরোপের অন্যান্য জায়গা অধিকার করার অভিপ্রায় ক্রমে ক্রমে ত্যাগ করে।
স্পেন এইভাবে বিরাট আরব সাম্রাজ্যের অঙ্গীভূত হয়ে যায়। সে সাম্রাজ্য তখনকার দিনে সুদূর মঙ্গোলিয়া থেকে আরম্ভ করে আফ্রিকা অতিক্রম করে স্পেন অবধি বিস্তৃত ছিল। এ সাম্রাজ্য কিন্তু বেশি কাল স্থায়ী হয় নি। তোমার হয়তো মনে আছে, আগেই তোমাকে বলেছি যে, আরবদেশে অনেকদিন ধরে একটা গৃহবিবাদ চলে। আব্বাসি আরবেরা ওমেয়াদ-খলিফার অনুগামী আরবদের হারিয়ে দেয়, খলিফা স্বয়ং দেশত্যাগ করে প্রাণে বাঁচেন। স্পেনে আরবদের যে রাজপ্রতিনিধি ছিলেন তিনি ছিলেন ওমেয়াদ, নূতন আব্বাসি খলিফাকে তিনি মেনে নিতে সম্মত হলেন না। এইভাবে স্পেন আরব-সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বেরিয়ে আসে। বোগদাদের খলিফা তখন ঘরের বিবাদ মেটাতেই ব্যস্ত, হাজার মাইল দূরের এই রাজ্যটিকে রক্ষা করার মতো তাঁর আগ্রহও ছিল না, ক্ষমতাও ছিল না। কিন্তু স্পেনে-বোগদাদে এইভাবে পরস্পরের প্রতি একটা বৈরী ও বিদ্বেষের ভাব জন্মাল, যার ফলে বিপদে-আপদে পরস্পরকে সাহায্য করা তো দূরের কথা, একের বিপদে অন্যে যেন খুশি হয়ে উঠত।
মাতৃভূমি থেকে এইভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্পেনীয় আরবেরা মস্ত একটা ভুল করেছিল। সুদূর বিদেশে বিজাতীয় শত্রুদের মাঝখানে তাদের বাস, সংখ্যায় তারা যৎসামানা, বিপদে-আপদে তাদের সহায়-সম্বল কেউ ছিল না। সুখের বিষয়, সে সময় তাদের মনে আত্মপ্রত্যয়ের অভাব ছিল না, তাই তারা বিঘ্নবিপদকে অনায়াসে তুচ্ছ করতে পারত। বস্তুতপক্ষে, উত্তরদিক থেকে খৃস্টান প্রতিপক্ষের নিরন্তর চাপ সত্ত্বেও, তারা আর কারও সাহায্য ছাড়াই স্পেন দেশের অনেকখানি অংশের উপর পাঁচ শো বছর ধরে তাদের প্রভুত্ব রেখেছিল। তার পরেও আরবেরা দক্ষিণ-স্পেনের একটি অপেক্ষাকৃত স্বল্পায়তন রাজ্য দু শো বছর ধরে নিজেদের অধিকারে রাখে। তা হলেই দেখা যাচ্ছে, বোগদাদ-সাম্রাজ্যের পতনের অনেক কাল পরেও স্পেনের আরবেরা অপ্রতিহত ছিল। বোগদাদ শহর ধুলোয় মিশে ধুলো হয়ে যাবার আরও অনেক যুগ পরে আরবেরা স্পেন থেকে শেষবারের মতো বিদায় নেয়।
একাদিক্রমে বিদেশাগত আরবেরা যে স্পেন শাসন করেছিল সে কথা ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়। আরও আশ্চর্যের বিষয় হল, এই আরব অর্থাৎ মূরদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি। এদিক থেকে তারা খুবই যে উন্নত ছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। মূর-সভ্যতার কথা বলতে গিয়ে একজন ঐতিহাসিক হয়তো একটুখানি উৎসাহের আতিশয্যেই বলে গেছেন: “মূররা কর্ডোবায় যে আশ্চর্য একটি রাজ্য গঠন করেছিল, মধ্যযুগের পক্ষে তা এক অতি বিস্ময়কর ব্যাপার। সমস্ত ইউরোপ যখন অজ্ঞান ও হিংসা-বিদ্বেষের অন্ধকারে ডুবে ছিল তখন পশ্চিম-জগতের দৃষ্টির সম্মুখে একমাত্র কর্ডোবাই জ্ঞান ও সভ্যতার আলোক তুলে ধরেছিল।”
কর্টুবা ছিল পাঁচ শো বছর ধরে এই মূর-রাজ্যের রাজধানী। ইংরেজিতে এই নামটি সচরাচর কর্ডোবা বলে উচ্চারিত হয়। আমি অনেক সময় একই নাম ভিন্ন ভিন্ন বানানে লিখি। আশা করি কর্ডোবার বেলা সে ভুলটা কাটিয়ে উঠতে পারব। কর্ডোবা শহরটি যেমন বড়ো ছিল তেমনি সুদশ্য; উদ্যানের মতো পরিপাটি ও মনোরম ছিল এর ঘরবাড়ি, পথঘাট। এ শহরে দশ লক্ষ লোক বাস করত। কর্ডোবা লম্বায় ছিল দশ মাইল, শহরতলী অঞ্চলের আয়তন ছিল চব্বিশ মাইল। লিখিত আছে যে, এই শহরে প্রাসাদ ও অট্টালিকাদির সংখ্যা ছিল ষাট হাজার, সাধারণ বসতবাটী ছিল দুই লক্ষ, দোকান ছিল আশি হাজার, ও সাধারণের ব্যবহারের জন্য সাত শো হামাম। সংখ্যাগুলি হয়তো একটু বাড়িয়ে বলা হয়েছে, তবু এর থেকেই বোঝা যায় কীরকম প্রকাণ্ড ও জমকালো শহর ছিল কর্ডোবা। শহরে অনেকগুলি গ্রন্থাগার ছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে বড়ো ছিল আমিরের খাস প্রন্থাগার। এ গ্রন্থাগারের পুস্তক সংখ্যা ছিল চার লক্ষ। কর্ডোবার বিশ্ববিদ্যালয় সারা ইউরোপে এমনকি পশ্চিম-এশিয়াতেও বিদ্যার পীঠস্থান হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিল। দরিদ্র প্রজাদের জন্য অনেকগুলি অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। একজন ঐতিহাসিক বলেন: “স্পেনের অধিকাংশ লোকই লিখতে পড়তে জানত। খৃষ্টধর্মাবলম্বী ইউরোপে কিন্তু তা ছিল না। সেখানে একমাত্র যাজক সম্প্রদায় ছাড়া আর সকলে এমনকি উচ্চবংশীয় লোকেরা পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে নিরক্ষর ছিল।”
এই ধরনের শহর ছিল কর্ডোবা। কেবল আর একটিমাত্র শহর ছিল তার সঙ্গে তুলনীয়—সে হল বোগদাদ। কর্ডোবার খ্যাতি পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ে। দশম শতকে একজন জর্মন লেখক কর্ডোবার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, “এ শহর সমস্ত বিশ্বের ভূষণস্বরূপ।” দূর দেশ থেকে ছাত্রেরা আসত কর্ডোবা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যাশিক্ষা করতে। আরব-দর্শনের প্রভাব ইউরোপের নাম করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছড়িয়ে পড়ে—প্যারিসে অক্সফোর্ডে, উত্তর-ইতালির বিখ্যাত বিদ্যাকেন্দ্রগুলিতে এই দর্শনের যথেষ্ট সমাদর হয়। আভের্রোয়েস অর্থাৎ ইবনে রশিদ ছিলেন দ্বাদশ শতাব্দীতে কর্ডোবার একজন উচ্চশ্রেণীর দার্শনিক। তাঁর শেষ বয়সে তাঁর সঙ্গে স্পেনের শাসনকর্তা বা আমিরের মনোমালিন্য হয় ও তার ফলে তিনি নির্বাসিত হন। তিনি তখন প্যারিসে গিয়ে বসবাস স্থাপন করেন।
ইউরোপের অপরাপর দেশের মতো স্পেনেও তখন সামন্ত প্রথার প্রচলন ছিল। শক্তিশালী সামন্তবর্গের সঙ্গে শাসনকর্তা আমিরের যুদ্ধবিগ্রহ প্রায়ই লেগে থাকত। এই গৃহবিবাদের ফলে স্পেনদেশে আরবদের রাজ্য এত দুর্বল হয়ে পড়ে যে বহিঃশত্রুর আক্রমণেও তা সম্ভব হতে পারত না। এই সময়ে উত্তর-স্পেনের কয়েকটি খৃস্টান রাজ্য পরাক্রান্ত হয়ে আরবদের বহিষ্কৃত করে দিতে আরম্ভ করে।
খৃস্টীয় ১০০০ অব্দের কাছাকাছি আমিরের রাজত্ব প্রায় সমস্ত স্পেন জুড়ে বিস্তৃত ছিল, দক্ষিণ-ফ্রান্সের একটা ছোটো অংশও ছিল এই রাজ্যের অন্তর্গত। অল্পদিনের মধ্যে এ রাজ্যে ভাঙন ধরে দেশের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে। আরবেরা স্পেনে যে চমৎকার সভ্যতার কাঠামো গড়ে তুলেছিল—তাদের শিল্প, বিলাসব্যসনের নানা উপকরণ, তাদের আদবকায়দা, সমস্তই ছিল ধনিকশ্রেণীর উপযোগী। এই ধনিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে অনাহারক্লিষ্ট সর্বহারাদের দল বিদ্রোহ করে; তারা পণ করে বসে যে, বড়োলোকদের জন্য কায়িক পরিশ্রমের কাজ তারা করবে না। গৃহবিবাদ দেশের চারি দিকে ছড়িয়ে পড়ে, বিভিন্ন প্রদেশগুলি মূল রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং স্পেনদেশের আরব-সাম্রাজ্য ভেঙে খান খান হয়ে পড়ে। এরূপ বিপর্যয় সত্ত্বেও আরবরা বহু দিন মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকে, শেষ পর্যন্ত ১২৩৬ খৃষ্টাব্দে কাস্টিলের খৃষ্টান রাজার হাতে কর্ডোবার পতন ঘটে।
আরবদের তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় দক্ষিণদিকে। দক্ষিণ-স্পেনে তারা গ্রানাডা নামে একটি ক্ষুদ্র রাজ্য গঠন করে এবং সেখান থেকে শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে থাকে। আকারে ছোটো হলেও গ্রানাডাকে আরব-সভ্যতার একটি অতি ক্ষুদ্র সংস্করণ বলে অভিহিত করা চলে। গ্রানাডার বিখ্যাত আলহাম্ব্রা প্রাসাদ এখনও আরব স্থাপত্য ও সভ্যতার একটি চমৎকার নিদর্শনস্বরূপ দাঁড়িয়ে আছে। স্তম্ভ তোরণ প্রভৃতির নির্মাণকৌশল ও গঠনবৈচিত্র্যে, প্রাচীরগাত্রে আরবীর অলংকরণের শোভায় এই প্রাসাদটি এখনও মানুষের মনোহরণ করে। আরবিতে এর নাম ছিল ‘আলহাম্রা’ অর্থাৎ রক্তবর্ণ প্রাসাদ। আরবীয় স্থাপত্যে ও শিল্পে অলংকরণের একটি বিশিষ্ট পদ্ধতি দেখা যায়, এই অলংকরণ-শিল্পের নিদর্শন ইসলাম-প্রভাবিত অনেক অট্টালিকা ও মসজিদে নিশ্চয় দেখে থাকবে। মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণীর ছবি আঁকা ইসলামধর্মনীতির বিরুদ্ধে। এইজন্যই আরব-স্থপতিরা নানাবিধ জটিল ও সূক্ষ্ম অলংকরণের সাহায্যে তাদের সৌন্দর্য স্পৃহা চরিতার্থ করবার সুযোগ খুঁজত। কখনও কখনও তারা স্তম্ভ, প্রাচীর কিংবা তোরণগাত্রে কোরাণগ্রন্থ থেকে শ্লোক উৎকীর্ণ করে রাখত। আরবি হরফের আকারে একটি চমৎকার ঢেউ-খেলানো রূপ আছে, এজন্য সহজেই এই হরফের সাহায্যে অলংকার-চিত্র অর্থাৎ ডিজাইনের অবতারণা করা চলে।
গ্রানাডা রাজ্য দুই শত বছর ধরে আরবদের শাসনাধীন ছিল। স্পেনের খৃষ্টীয় রাজ্যগুলি ক্রমেই আরবদের উপর চাপ দিতে থাকে। এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল কাস্টিল। কাস্টিলের খৃষ্টান রাজাকে গ্রানাডা কয়েকবার কর দেবে বলে অঙ্গীকার করেছিল। গ্রানাডা যে এত বছর ধরে টিঁকে ছিল তার একটি কারণ এই যে, খৃষ্টীয় রাজ্যগুলিও পরস্পরের বিরুদ্ধতা করত। অবশেষে ১৪৬৯ অব্দে দুটি প্রধান রাজ্যের মধ্যে বিবাহ-সম্বন্ধ স্থাপিত হয়। ফার্ডিন্যাণ্ড ও ইসাবেলার বিবাহের ফলে কাস্টিল, আরাগন ও লিওন—এই তিনটি রাজ্য একত্রিত হয়। এরা একযোগে আক্রমণ করার পর গ্রানাডার আরব-রাজত্বের অবসান ঘটে। শত্রু কর্তৃক পরিবেষ্টিত ও অবরুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও আরবরা বেশ কয়েক বছর নিছক সাহসের উপর নির্ভর করে সংগ্রাম চালিয়েছিল। রসদ শূন্য হয়ে যাবার ফলে ১৪১২ অব্দে তারা স্পেনবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
আরবীয় অর্থাৎ সারাসেনদের অনেকেই স্পেন ত্যাগ করে আফ্রিকায় চলে যায়। আধুনিক গ্রানাডার কাছে একটি জায়গা আছে, যেখান থেকে সমস্ত শহর দেখা যায়; এ জায়গাটির নাম—‘এল্ আল্টিমো সোস্পিরো দেল মোরো’—অর্থাৎ মূরের শেষ দীর্ঘ বাস।
কিছু কিছু আরব স্পেন দেশে থেকে যায়। এরা ও দেশের লোকদের কাছে যে ব্যবহার পেয়েছে তা স্পেনের ইতিহাসে একটি লজ্জাকর অধ্যায়। নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের তাণ্ডবলীলায়, পরধর্মসহিষ্ণুতার যে প্রতিশ্রুতি স্পেনবাসী দিয়েছিল, তার কথা তারা সমস্ত ভুলে গেল। এই সময়ে রোমান ক্যাথলিক সম্প্রদায় অন্য মতাবলম্বী লোকদের নির্বিচারে ধ্বংস করার জন্য ‘ইন্কুইজিশান’ নামে একটি হৃদয়হীন অস্ত্র আবিষ্কার করে। ‘ইন্কুইজিশান’ অর্থাৎ ধর্মবিচারের অজুহাতে স্পেনে যে ভয়াবহ কাণ্ড অনুষ্ঠিত হত তার তুলনা বিরল। সারাসেন অথবা আরবদের অধীনে ইহুদিরা ব্যবসাবাণিজ্যে প্রকৃত উন্নতি লাভ করে। ইন্কুইজিশানের ফলে তাদের অনেককে খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়, ধর্মত্যাগ করতে যারা চায় নি তাদের স্পেনবাসী পুড়িয়ে মারে। স্ত্রীলোক ও শিশুদেরও এই অত্যাচার থেকে অব্যাহতি ছিল না। একজন ঐতিহাসিক লিখেছেন: “বিধর্মী অর্থাৎ সারাসেনদের প্রতি আদেশ দেওয়া হয়, তারা যেন আরবদেশের বিচিত্র পোশাক পরিহার করে বিজেতা স্পেনের প্রচলিত লম্বা পাজামা ও টুপি পরতে শুরু করে। নিজেদের ভাষা, আচার-অনুষ্ঠান, এমনকি নাম পর্যন্ত, পরিত্যাগ করে স্পেনের ভাষা, আচার-অনুষ্ঠান ও স্পেনীয় নাম গ্রহণ করতে সারাসেনদের বাধ্য করা হয়।” এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বহু বিদ্রোহ হয়েছিল, কিন্তু সব-কিছু অকরুণভাবে দমন করে স্পেন তার প্রভুত্ব প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে।
স্পেনদেশীয় খৃষ্টানরা স্নান করা, গা-হাত-পা ধোয়া বিশেষ পছন্দ করত না। আরবরা স্নান, অবগাহন, আচমন ইত্যাদি অভ্যাস খুব ভালোবাসত বলেই হয়তো স্পেনের কর্তারা হুকুম জারি করলেন যে, সাধারণের ব্যবহারের জন্য সব হামামগুলি বন্ধ করে দিতে হবে। বলা হল: বিধর্মী মোরিস্কো বা মূরদের পাপের হাত থেকে উদ্ধারের জন্য এমন আইন বানাতে হবে যাতে আরবরা স্ত্রীপুরুষনির্বিশেষে ঘরে অথবা বাইরে, প্রকাশ্যে অথবা গোপনে, স্নান-প্রক্ষালনাদি আর না করতে পারে। আরবদের তৈরি পাপের কুণ্ড এই হামামগুলি ভেঙেচুরে ধ্বংস করে দিতে হবে।”
স্নানরূপ অপরাধ ছাড়া আর যে-একটি দোষের জন্য আরবরা স্পেনের কাছে অপরাধী প্রতিপন্ন হয়েছিল সে হল আরবদের পরধর্মসহিষ্ণুতা। কথাটা শুনে খুব আশ্চর্য মনে হয়, কিন্তু ধর্ম বিষয়ে আরবদের ঔদার্য অপরাধের তালিকায় খুব উঁচু স্থান পেয়েছিল। ভ্যালেন্সিয়ার প্রধান ধর্মযাজক ১৬০২ খৃষ্টাব্দে তাঁর রচিত একটি বইয়ে[১] সারাসেনদের স্পেন থেকে বিতাড়িত করার স্বপক্ষে যতগুলি যুক্তি দিয়েছিলেন তার মধ্যে প্রধান যুক্তি ছিল এই যে, আরবরা তাদের নিজেদের ধর্ম সম্বন্ধেও নাকি যথেষ্ট গোঁড়া ছিল না। এ বিষয়ে বলতে গিয়ে ভ্যালেন্সিয়ার আর্চ্বিশপ লিখেছেন: “এই মোরিস্কো অর্থাৎ আরবরা তুর্কি ও অন্যান্য মুসলমান জাতির মতো ধর্ম বিষয়ে নিজেদের প্রজাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়, প্রজারা এদের অধীনে নিজেদের জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেক অনুযায়ী স্ব স্ব ধর্মমত অনুসরণ করে।” সমালোচনা করতে গিয়ে বিশপঠাকুর স্পেনের আরবদের কতবড়ো প্রশংসা করে গেছেন তা তিনি নিজেও জানতেন না। এই আরবদের তুলনায় কীরকম সংকীর্ণমনা ও ধর্মান্ধ ছিল স্পেনদেশীয় খৃষ্টানরা! রোমান ক্যাথলিক ধর্ম ছাড়া আর অন্য কোনো ধর্ম তাদের কাছে প্রশ্রয় তো পায়ই নি, বরঞ্চ লাঞ্ছিত হয়েছে।
লক্ষ লক্ষ সারাসেনদের জোর করে স্পেন থেকে বহিষ্কৃত করা হয়; এদের বেশির ভাগ যায় আফ্রিকায় এবং একটা অংশ যায় ফ্রান্সে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, বহিষ্কৃত হবার আগে এই আরবরা দীর্ঘ সাত শো বছর ধরে স্পেনে বসবাস করছিল। এই সময়ের মধ্যে তারা অনেক অংশে স্পেনের লোকের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। জাতিতে আরব হলেও এরা ক্রমেই স্পেনবাসী হয়ে যায়। শেষের দিকে খুব সম্ভব স্পেনের আরবদের সঙ্গে বোগদাদের আরবদের খুব অল্পই মিল ছিল। স্পেনে যেসব জাতি বাস করে তাদের মধ্যে এমন বহু লোক আছে যাদের ধমনীতে যথেষ্ট পরিমাণে আরব-রক্ত আজও প্রবাহিত হচ্ছে।
আগেই বলেছি, কিছু কিছু আরব যায় দক্ষিণ-ফ্রান্সে, এমনকি সুইজারল্যাণ্ডেও—স্পেন থেকে বহিষ্কৃত হয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে। তারা এসব জায়গায় বসতি স্থাপন করে। এখনও এইসব অঞ্চলের দু একটি ফরাসি-মুখের মধ্যে আরবীর ছাপ স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়।
এইভাবে স্পেনে কেবল আরবদের রাজ্য নয়, তাদের সভ্যতারও অবসান ঘটে। এশিয়া-খণ্ডে আরব-সভ্যতার পতন আরও আগেই ঘটেছিল। সে সম্বন্ধে কিছু পরেই আমরা আলোচনা করব। অনেক দেশ, অনেক সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ ও প্রভাবাম্বিত করেছিল এই আরব সভ্যতা; বিলুপ্ত হয়ে গেলেও এই সভ্যতার বহু উল্লেখযোগ্য স্মরণচিহ্ন পৃথিবীময় ছড়িয়ে আছে। পরবর্তীকালের ইতিহাসে আরব তার পুরাতন প্রাধান্য আর উদ্ধার করতে পারে নি।
আরবদের চলে যাবার পর, ফার্ডিন্যাণ্ড ও ইসাবেলার অধীনে স্পেন খুব শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কিছুদিন পরেই আমেরিকা আবিষ্কারের ফলে স্পেনের ধনসম্পত্তি প্রভূতপরিমাণে বৃদ্ধি পায় এবং কিছুকালের মতো স্পেন ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজ্য বলে স্বীকৃত হয়। স্পেনের উত্থানপতন দুইই আকস্মিক। অভূতপূর্ব উন্নতির পরই স্পেন আবার এমন একটা জায়গায় গিয়ে নামে যে, রাজশক্তিহিসাবে তার স্থান অতি নগণ্য হয়ে যায়। ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলি যখন উন্নতির পথে এগিয়ে চলেছে তখন স্পেন পচা ডোবার মতো আপনার আবর্তের মধ্যে আপনি ঘুর্পাক খাচ্ছিল। মধ্যযুগের গৌরবময় স্বপ্নের মধ্যে সে ছিল বিভোর হয়ে, নূতন যুগ যে এসেছে তা আর সে খেয়াল করে নি।
ইংরেজ ঐতিহাসিক লেন্ পুল স্পেনবাসী সারাসেনদের সম্বন্ধে বলতে গিয়ে লিখেছেন:
বহু শতাব্দী ধরে স্পেন ছিল সভ্যতার কেন্দ্র। শিল্প, সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও চারুকলার পীঠস্থান ছিল এই স্পেন। মূরদের উন্নত শাসনব্যবস্থার ধারে-কাছেও সেকালকার ইউরোপীয় কোনো রাজশক্তি আসতে পারত না। ফার্ডিন্যাণ্ড ও ইসাবেলার সময়ে এবং সম্রাট চার্ল্সের রাজত্বকালে স্বল্পকালের মতো স্পেনের গৌরব বৃদ্ধি পেয়েছিল বটে, কিন্তু মূরদের মতো দীর্ঘকালস্থায়ী গৌরবের বুনিয়াদ গঠন করতে তাঁরা কেউ পারেন নি। মূরদের নির্বাসিত করা হল। কিছুদিন খৃষ্টান-স্পেন উজ্জ্বলভাবে শোভা পেল চাঁদের মতো ধার-করা আলো নিয়ে। তার পরে এল চন্দ্রগ্রহণের অন্ধকার; সেই তখন থেকে অন্ধকারের মধ্যে স্পেন বৃথা পথ হাতড়ে মরছে। মূরদের সত্যিকার সমাধিস্থান দেখা যায় ঊষর নির্জন বন্ধ্যা প্রান্তরে, এই প্রান্তরেই একদিন মূররা সোনা ফলিয়েছিল। মূরদের আমলে যে দেশ বাক্চাতুরী ও বিদ্যাবুদ্ধিতে শ্রেষ্ঠস্থান অধিকার করেছিল, সে দেশের লোক আজ মূর্খতার পঙ্কে নিমজ্জিত। জাতিহিসাবে, দেশহিসাবে স্পেনের এমন অধঃপতন হয়েছে যে আজ তার ভাগ্যে লাঞ্ছনা ছাড়া আর কিছু নেই।
ঐতিহাসিকের এই মন্তব্যটি খুবই কঠোর। বছরখানেক আগে স্পেনে একটি বিদ্রোহ হয় ও তার ফলে রাজা সিংহাসনচ্যুত হন। এখন সেখানে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চলছে। আশা করা যায় যে, এই গণতন্ত্রের আওতায় স্পেনের অবস্থা উন্নত হবে এবং স্পেন জগৎসভায় আবার তার স্বকীয় স্থান অধিকার করতে সমর্থ হবে।
- ↑ Apostacies and Treasons of the Moriscos.