বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/কর্তৃত্বের বিরদ্ধে সংগ্রাম
৭১
কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম
৩০শে জুন, ১৯৩২
ভয় হচ্ছে, ইউরোপের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বিরোধের কাহিনী তোমার কাছে তত সরস লাগবে না। কিন্তু বর্তমান ইউরোপের ক্রমোন্নতিকে জানতে হলে সর্বাগ্রে এদের জানা প্রয়োজন। এদের ভিতর দিয়েই আমরা ইউরোপকে বুঝতে পারব। চতুর্দশ শতাব্দী ও তার পরবর্তীকালে ধর্মমতের স্বাধীনতার সংগ্রামের যে বিস্তার দেখি, আর তার কিছু পরে রাজনৈতিক স্বাধীনতার যে সংগ্রাম, দুটোই আসলে একই সংগ্রামের দুই দিক। এই সংগ্রাম ছিল কর্তৃপক্ষ ও কর্তৃত্বের বিরদ্ধে। ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য’ ও তার ‘পোপ’ উভয়েই সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী হয়ে মানুষের মনুষ্যত্বকে পদদলিত করতে চেয়েছিলেন। মহামান্য সম্রাটের ছিল ‘ঈশ্বরদত্ত ক্ষমতা’, ‘পোপ’ ছিলেন তার চেয়েও উঁচুতে; আর এ সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন তোলা, বা তাঁদের হুকুমকে অবহেলা করবার অধিকার কারও ছিল না। নিছক বাধ্যতা ছিল মানবের শ্রেষ্ঠ গুণ। এমনকি ব্যক্তিগত বিচারশক্তির প্রয়োগও দুষ্কর্ম বলে বিবেচিত হত। এইভাবে অন্য আনুগত্য ও স্বাধীনতার ভিতরে পার্থক্য বেশ পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল। বহু শতাব্দী ধরে ইউরোপে বিবেকের স্বাধীনতা (ধর্মমতের স্বাধীনতা) ও পরে রাজনৈতিক স্বাধীনতার এক বিরাট সংগ্রাম চলছিল। অনেক উত্থান পতন ও অনেক দুঃখভোগের পরে কিছুটা সাফল্য অর্জিত হয়। কিন্তু ঠিক যখন লোকে স্বাধীনতার শিখরে পৌঁছে গেছে ভেবে নিজেদের তারিফ করছিল তখনই তারা নিজেদের ভুল দেখতে পায়। যতক্ষণ দারিদ্র্য আছে, ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বলে কিছু নেই, ততক্ষণ সত্যিকার স্বাধীনতাও আসে না। বুভুক্ষু ব্যক্তিকে স্বাধীন ঘোষণা করা মানে তাকে বিদ্রূপ করা। তাই পরবর্তী কার্যপন্থা হল, অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সংগ্রাম, যে সংগ্রাম আজ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু একটিমাত্র দেশেই প্রধানত জনগণের হাতে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এসেছে—সে হল রাশিয়া, অথবা সোভিয়েট ইউনিয়ন।
ভারতবর্ষে বিবেকের স্বাধীনতার জন্যে যে কোনো সংগ্রামের অস্তিত্ব ছিল না তার কারণ এই যে, বহু পুরাকাল থেকেই এখানে এই অধিকার স্বীকৃত হয়ে এসেছে। লোকে যার যা খুশি তাতেই বিশ্বাসস্থাপন করত, কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। মানুষের মনকে প্রভাবান্বিত করতে নিয়োজিত হত মৌখিক তর্কবিতর্ক, লাঠৌষধি নয়। মাঝে মাঝে হয়তো শক্তিপ্রয়োগ বা উৎপীড়ন চলত, তবু নিজ নিজ ধর্মমতের অধিকার প্রাচীন আর্য-মতবাদে মেনে নেওয়া হয়েছিল। হয়তো অদ্ভুত মনে হতে পারে, তবু এর ফলও সব দিক দিয়ে ভালো হয় নি। মতগত স্বাধীনতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে লোকে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করল না, ফলে ক্রমশ অধঃপতিত ধর্মের বাহ্যিক অনুষ্ঠান ও কুসংস্কারের নাগপাশে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। এইভাবে যে ধর্মমতের সৃষ্টি হল তাতে তারা বহুদূর পিছিয়ে পড়ল এবং ধর্মনেতৃত্বের ক্রীতদাসে পরিণত হল। সেই নেতৃত্ব বা কর্তৃত্ব শুধু একজন ‘পোপ’ বা ব্যক্তিবিশেষের দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়, এ ছিল ‘পবিত্র শাস্ত্র’ ও পুরোনো রীতিনীতির শাসন। তাই যখন আমরা ধর্মমতের স্বাধীনতা নিয়ে গর্ববোধ করছিলাম তখনই স্বাধীনতা থেকে অনেক দূরে গিয়ে, পুরোনো বই আর পুরোনো প্রথার শৃঙ্খলে বন্দী হয়েছিলাম। কর্তৃপক্ষ ও কর্তৃত্ব আমাদের উপর প্রভুত্ব করেছিল ও আমাদের মনকে সম্পূর্ণরূপে অধীন করেছিল। ব্যক্তিগতভাবে যে শৃঙ্খল দ্বারা কখনও কখনও আমাদের বন্দী করা হয় সেটাই যথেষ্ট খারাপ জিনিষ। কিন্তু ধারণা আর সংস্কার দিয়ে গড়া যে অদৃশ্য শৃঙ্খল আমাদের মনকে পাকে পাকে জর্জরিত করে সেটা আরও অনেক বেশি খারাপ। এই শৃঙ্খল আমাদের নিজেদেরই সৃষ্টি; কত সময় তাদের সম্পর্কে আমরা সচেতন নই, তাই আরও কঠিনভাবে তারা আমাদের আঁকড়ে ধরে।
আক্রমণকারী হিসেবে ভারতবর্ষে মুসলমানের আগমনের পর ধর্মের ভিতরে প্রথম বাধ্যতামূলক নীতি পরিলক্ষিত হয়। আসলে এটা ছিল বিজেতা ও বিজিতের মধ্যে রাজনৈতিক রেষারেষি, উপরে ছিল ধর্মের আবরণ, এবং সময়ে সময়ে ধর্মের নামে উৎপীড়নও চলত। কিন্তু তাই বলে ইসলামধর্ম এই অত্যাচারকে সমর্থন করত, এ ভাবা ভুল হবে। ১৬১০ সালে এক স্পেনীয় মুসলমান যখন অবশিষ্ট আরবদের সাথে স্পেন থেকে বিতাড়িত হয়, তার সেইসময়কার বক্তৃতার একটি চিত্তাকর্ষক বিবরণী পাওয়া যায়। ইন্কুইজিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে সে বলল:
“আমাদের বিজয়ী পূর্বপূরুষ, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও, কি স্পেন থেকে কখনও খৃষ্টধর্মকে নির্মূল করতে প্রয়াস পেয়েছিলেন? পরাধীনতার অন্তরালে থেকেও তোমাদের পূর্বপুরুষ কি, ধর্ম বিষয়ক সমস্তরকম স্বাধীনতা উপভোগের অনুমতি পায় নি? ......বলপূর্বক ধর্মান্তরিতকরণের উদাহরণ যদি থেকেও থাকে, তা এত বিরল যে উল্লেখযোগ্য নয় বললেও চলে। এবং এ ধরনের কাজ যারা করেছে তারা যে শুধু ঈশ্বরভীতিশূন্য পরম অধার্মিক তাই নয়, তারা ইসলামের পবিত্র অনুজ্ঞা ও উপদেশাবলীর সম্পূর্ণ বিরুদ্ধাচারী। সত্যকার মুসলমান নাম-ধারণের উপযুক্ত কোনো ব্যক্তির দ্বারা এই দুরাচরণ সম্ভব নয়। বিভিন্ন ধর্মভাবাপন্নতার তোমাদের ঘৃণিত ইন্কুইজিশনের তুলনা চলে। অবশ্য যারা আমাদের ধর্ম অবলম্বন করতে দরুন আমাদের ভিতরে এমন কোনো বর্বর অনুষ্ঠানের আয়োজন খুঁজে পাওয়া যাবে না যার সঙ্গে ইচ্ছুক তাদের জন্যে আমাদের দ্বার সর্বদাই খোলা। তবে আমাদের পবিত্র কোরাণ কখনও অপরের বিবেকের উপর জুলুম সমর্থন করে না।”
তাই প্রাচীন ভারতীয় জীবনযাত্রার যে দুটি প্রধান বিশেষত্ব, পরধর্মসহিষ্ণুতা ও বিবেকের স্বাধীনতা, দুটোই কিছু কিছু আমাদের জীবন থেকে মুছে গেল। ওদিকে ইউরোপ অগ্রসর হতে হতে আমাদের ছাড়িয়ে গেল ও বহু ঝড়ঝাপটার পর এই দুটি অদর্শকেই প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হল। ভারতবর্ষে কত সময়ে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ হয়, হিন্দু-মুসলমান পরস্পর দ্বন্দ্বে প্রবৃত্ত হয়ে পরস্পরকে হত্যা করে। হয়তো এ ধরনের ব্যাপার অল্প জায়গায় অল্প সময়ের জন্যই ঘটে, বেশির ভাগই আমরা সদ্ভাব ও প্রীতির সঙ্গে বসবাস করি, কারণ আমাদের সতাকার স্বার্থ এক। তবু এটা অত্যন্ত লজ্জা ও দুঃখের বিষয় যে, কোনো হিন্দু অথবা মুসলমান ধর্মের নামে ভাইয়ের সঙ্গে মারামারি করে। এর অবসান ঘটানোই আমাদের কর্তব্য, এবং আমরা তা করবও। কিন্তু সবচেয়ে বড়ো কথা হল, ধর্মের মুখোশ পরে পুরোনো প্রথা, রীতি ও কুসংস্কারের যে জটিল মতবাদ আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে, তার হাত থেকে উদ্ধার পাওয়া।
পরধর্মসহিষ্ণুতার বিষয়ে যেমন, তেমনি রাজনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও ভারতবর্ষ প্রথমে ভালোভাবেই যাত্রা শুরু করেছিল। আমাদের গ্রামের সাধারণতন্ত্রের কথা মনে করে দেখো। সেখানে প্রথমদিকে রাজার অধিকার অত্যন্ত সীমাবদ্ধ বলে ধরা হত। ইউরোপের রাজার মতো সেখানে ঈশ্বরদত্ত ক্ষমতার স্থান ছিল না। যেহেতু গ্রামের স্বাধীনতার উপরেই আমাদের সমগ্র রাষ্ট্রনীতি (polity) প্রতিষ্ঠিত ছিল, লোকের রাজা সম্পর্কে চিন্তার কোনো প্রয়োজন হত না। তাদের কাছে স্থানীয় স্বাধীনতা বজায় থাকলেই যথেষ্ট, উপরে বসে যেই প্রভুত্ব করকে তাতে কারও কিছু এসে যেত না। কিন্তু এই ধরনের ধারণা ছিল নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক ও অভ্যন্ত বিপজ্জনক। ক্রমে সেই ঊর্ধ্বতন প্রভু ক্ষমতা প্রসারিত করতে করতে গ্রামের স্বাধীনতার উপরে চড়াও হলেন। তখন এমন এক সময়ের উদ্ভব হল যখন আমাদের রাজাদের হল সম্পূর্ণ একাধিপত্য, গ্রামের আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকার অদৃশ্য হল, এবং সর্বোচ্চ স্তর থেমে সর্বনিম্ন স্তর পর্যন্ত কোথাও স্বাধীনতার একটু ছায়াও অবশিষ্ট রইল না।