বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/কার্ল্ মার্ক্স্ এবং শ্রমিক সংগঠনের উৎপত্তি
কার্ল্ মার্ক্স্ এবং শ্রমিক সংগঠনের উৎপত্তি
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপে শ্রমিক আন্দোলন এবং সমাজতন্ত্রবাদের ক্ষেত্রে একটি নূতন এবং অপূর্ব মানুষের আবির্ভাব হল। এর নাম কার্ল্ মার্ক্স। এই চিঠিগুলোর মধ্যে আমি বহুবার তাঁর নাম করেছি। মার্ক্স্ ছিলেন একজন জর্মন ইহুদি; ১৮১৮ সনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং আইন ইতিহাস ও দর্শনের ছাত্র হয়ে পড়াশোনা করতে থাকেন। তিনি একটি সংবাদপত্র বার করেছিলেন, তাই নিয়ে জর্মনির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর বিরোধ হল, তিনি দেশ ছেড়ে প্যারিসে চলে গেলেন। প্যারিসে তিনি নূতন নূতন লোকের সংস্পর্শে এলেন, সমাজতন্ত্রবাদ আর অ্যানার্কিজ্ম্ সম্বন্ধে নূতন নূতন সব বই পড়লেন, এবং নিজেও সমাজতন্ত্রবাদে বিশ্বাসী হয়ে উঠলেন। এই প্যারিসেই তাঁর আর-একজন জর্মনের সঙ্গে পরিচয় হয়; এর নাম ফ্রেডরিক এঙ্গেল্স্। ইনিও দেশ ছেড়ে ইংলডে গিয়ে বাস করছিলেন এবং ধনী কাপড়ের কলওয়ালা হয়ে উঠেছিলেন। ইংলণ্ডে তখন কাপড়ের কল নূতন বেড়ে উঠছে। সমাজের বর্তমান অবস্থা দেখে এঙ্গেল্স্ও ব্যাথিত এবং অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন; চার পাশে যে দারিদ্র্য আর শোষণের রাজস্ব চলেছে, তাঁর মন তার প্রতিকার খুঁজে বেড়াচ্ছিল। সংস্কারসাধনের যে পরিকল্পনা আর চেষ্টা রবার্ট ওয়েন করেছেন এঙ্গেলসের সেটা খুব ভালো লাগল; তিনিও একজন ওয়েনাইট হয়ে উঠলেন—ওয়েনের অনুসারীদের এই নামে ডাকা হত। প্যারিসে বেড়াতে গিয়ে কার্ল মার্ক্সের সঙ্গে এঙ্গেল্সের প্রথম দেখা হল, ফলে তাঁরও মতামতের পরিবর্তন হল। তখন থেকেই মার্ক্স্ আর এঙ্গেল্স্ পরস্পরের অতি অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং সহকর্মী হয়ে গেলেন, দু জনে একই মতামত পোষণ করেন, একই লক্ষ্য নিয়ে দু জনে সমস্ত মনপ্রাণ ঢেলে কাজ করে চলেন। এঁদের বয়সও প্রায় এক ছিল। এঁদের সহযোগিতা এত নিবিড় ছিল যে এঁরা যে বইগুলো বার করলেন তারও প্রায় সবগুলোই হল দু জনের একত্রে লেখা।
ফ্রান্সে তখন লুই ফিলিপ্স্ রাজত্ব করছেন। ফরাসি সরকার মার্ক্স্কে প্যারিস থেকে বহিষ্কৃত করে দিলেন। মার্ক্স্ লণ্ডনে চলে গেলেন; বহু বৎসর সেখানে বাস করলেন এবং ব্রিটিশ মিউজিয়ম থেকে বইপত্র নিয়ে খুব পড়াশোনা করে নিলেন। অত্যন্ত কঠিন শ্রম করতেন তিনি; খেটেখুটে তাঁর মতামতগুলোকে তিনি সম্পূর্ণ করে তুললেন এবং সেগুলো লেখার মধ্য দিয়ে প্রচার করতে লাগলেন। নিছক অধ্যাপক বা দার্শনিক যাঁরা হন, মতামত নিয়ে খালি কল্পনার জাল বুনে চলেন, দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ ঘটনার কোনো খোঁজই রাখেন না, মার্ক্স্ কিন্তু মোটেই তাঁদের মতো ছিলেন না। সমাজতন্ত্রী আন্দোলনের আদর্শটা কিছু অস্পষ্ট ছিল, তিনি তাকে সম্পূর্ণ এবং প্রাঞ্জল করে তুললেন, তার সমস্ত মতামত এবং উদ্দেশ্যকে সহজ এবং পরিষ্কার ভাষায় নির্দিষ্ট করে দিলেন; আবার তারই সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনটির এবং শ্রমিক শ্রেণীর সংগঠনের ব্যাপারেও একজন সক্রিয় নেতার পদ অধিকার করে বসলেন। বিপ্লবের বছরে অর্থাৎ ১৮৪৮ সানে, ইউরোপের সর্বত্র যেসব কাণ্ড ঘটল তা দেখে স্বভাবতই মার্ক্সের মনে প্রচণ্ড চাঞ্চল্য দেখা দিল। সেই বছরেই তিনি আর এঙ্গেল্স্ দু জনে মিলে একটি ইস্তাহার বার করলেন, এটি অত্যন্ত বিখ্যাত হয়ে রয়েছে। এইটিই হচ্ছে সেই কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো। ফরাসি বিপ্লব এবং তার পরের ১৮৩০ ও ১৮৪৮ সনের বিদ্রোহগুলির পিছনে কী উদ্দেশ্য নিহিত ছিল, এই ইস্তাহারে তাঁরা তার বিশদ বিশ্লেষণ করলেন, এবং দেখিয়ে দিলেন, বাস্তব অবস্থার প্রতিকার করবার দিক থেকে এই আয়োজন কতখানি অ-যথেষ্ট এবং অপ্রযুক্ত হয়েছিল। তখনকার গণতন্ত্রবাদীরা সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতার হুংকার ছাড়তেন; এঁরা তার সমালোচনা করলেন; যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করে দিলেন যে সাধারণ লোকের পক্ষে এই কথাগুলো একেবারেই অর্থহীন। এগুলো হচ্ছে শুধু বুর্জোয়া-চালিত রাষ্ট্রব্যবস্থার উপরে একটা ভদ্র চেহারার আবরণ। তার পরে তাঁরা তাঁদের নিজেদের অনুসৃত নীতি, সমাজতন্ত্রবাদের কথা সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করলেন; এঁর কথা আমি তোমাকে পরে আবার বলব। ইস্তাহার শেষ করলেন তাঁরা সমস্ত শ্রমিকদের উদ্দেশে একটি আবেদনবাক্য দিয়ে “জগতের সমস্ত শ্রমিক, এক হও! তোমাদের হারাবার কিছুই নেই, শুধু পায়ের শিকল ছাড়া; জয় করে নেবার আছে সমস্ত জগৎ!”
এই আবেদনটি ছিল কাজে নামবার আহ্বান। মার্ক্স্ শুধু আবেদন প্রচার করেই ক্ষান্ত হলেন না, সংবাদপত্রে লিখে, পুস্তিকা প্রকাশ করে অবিরাম প্রচারকার্য চালিয়ে চললেন, শ্রমিকদের সংগঠনগুলোকে একত্র সংঘবদ্ধ করবার চেষ্টা করতে লাগলেন। তিনি যেন মনে মনে বুঝতে পেরেছিলেন, ইউরোপে একটা বিপুল সংকটের দিন আসন্ন হয়ে এসেছে; সেই সংকটের মুহূর্তটিকে ঠিকমতো কাজে লাগিয়ে যাতে তাদের কাজ উদ্ধার করে নিতে পারে এই উদ্দেশ্যে তিনি শ্রমিকদের প্রস্তুত করে রাখতে চাইলেন। তিনি যে সমাজতন্ত্রী মতবাদ খাড়া করেছিলেন তার কথা অনুসারে ধনিকতন্ত্রী ব্যবস্থাতে এই সংকট না এসেই পারে না। ১৮৫৪ সনে নিউইয়র্কের একটি সংবাদপত্রে মার্ক্স্ লিখলেন:
“তবুও এ কথা আমাদের ভুললে চলবে না, ইউরোপে একটি ষষ্ঠ শক্তি বর্তমান রয়েছে। বিশেষ বিশেষ মূহুর্তে সে তথাকথিত ‘পঞ্চ মহাশক্তির’ প্রত্যেকটির উপরেই তার আধিপত্য বিস্তার করে, এবং তাদের ভয়ে কম্পিত করে দেয়। এই শক্তিটির নাম বিপ্লব। দীর্ঘকাল সে নিঃশব্দে বিরাম ভোগ করছিল; এখন আবার অর্থ সংকট এবং অনাহারে বিপর্যস্ত মানুষের আর্তনাদ তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে আহ্বান করছে। ...... এখন মাত্র একটি ইঙ্গিতের অপেক্ষা, তার পরই ইউরোপের সেই ষষ্ঠ এবং সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাশালী শক্তি উজ্জ্বল বর্ম এবং শানিত তরবারিতে সজ্জিত হয়ে রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হবে, অলিম্পাসের রাজার (স্বর্গরাজ্যের) বিদীর্ণ ললাট থেকে মিনার্ভার আবির্ভাবের মতো। সেই ইঙ্গিত তাকে জানাবে ইউরোপের আসন্ন মহাসমর।”
ইউরোপের আসন্ন বিপ্লব সম্বন্ধে মার্ক্সের এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয় নি। ইউরোপের খানিক অংশে বিপ্লব এসেছে, কিন্তু সে মার্ক্স্ এই কথা যখন লিখেছিলেন তার ষাট বছর পরে, বিশ্বযুদ্ধকে আশ্রয় করে। ১৮৭১ সনে একবার চেষ্টা হয়েছিল, প্যারিসের কমিউন সৃষ্টি করা হয়েছিল। সে চেষ্টা নির্মম আঘাতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, তার ইতিহাস আমরা দেখেছি।
১৮৬৪ সনে মার্ক্স্ লণ্ডনে একটা সভা আহ্বান করলেন, নানা বিচিত্র প্রকারের লোক সেখানে এসে একত্র হল। বহু দলের লাক এল, তারা সকলেই নিজেকে কিছুটা অস্পষ্টভাবে ‘সমাজতন্ত্রবাদী’ বলে পরিচয় দেয়। এক দিকে এল ইউরোপের কতকগুলো বিদেশী-শাসিত দেশ থেকে গণতন্ত্রী এবং দেশপ্রেমিকের দল, এদের সমাজতন্ত্রবাদে নিষ্ঠা ছিল খুবই দূরের বস্তু, আপাতলক্ষ্য হিসাবে এদের অনেক বেশি গরজ দেখা গেল জাতীয় স্বাধীনতা অর্জন নিয়ে। অন্য দিকে এল অ্যানার্কিস্ট্রা, তারা তখনই যুদ্ধে নামবার জন্যে ব্যাকুল। মার্ক্সের পরেই এই সভায় উপস্থিত লোকদের মধ্যে খুব বিখ্যাত ছিলেন অ্যানার্কিস্ট নেতা বাকুনিন; দীর্ঘ কাল সাইবেরিয়ার নির্বাসনে কাটিয়ে তিনি এর তিন বছর মাত্র আগে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছেন। বাকুনিনের দলবর্তীরা ছিলেন সাধারণত দক্ষিণ-ইউরোপের, ইতালি স্পেন প্রভৃতি ল্যাটিনদেশের লোক। এই দেশগুলি ছিল শিল্পপ্রগতির দিক থেকে পশ্চাদ্বর্তী ও অনুন্নত। এঁরা সকলেই ছিলেন বেকার-বুদ্ধিজীবী বা অন্যান্য পাঁচমিশেলি রকমের বিপ্লবপন্থী, বর্তমান সমাজব্যবস্থার মধ্যে এঁরা আশ্রয় খুজে পান নি। মার্ক্সের দলের লোকেরা ছিলেন সমস্ত শিল্পপ্রধান দেশের, বিশেষ করে জর্মনির লোক; সেখানে শ্রমিকদের অবস্থা অনেক ভালো। কাজেই মার্ক্স্ হলেন, নবজাগ্রত সুসংহত এবং অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন্ন শ্রমিকশ্রেণীর প্রতিভূ; আর বাকুনিন হলেন অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ও অসংহত শ্রমিক, বদ্ধিজীবী আর অসন্তুষ্ট লোকদের প্রতিনিধি। মার্ক্সের মত ছিল, কাজের মুহূর্ত যখন আসবে তার প্রতীক্ষায় শ্রমিকদের ধৈর্যসহকারে সুসংবদ্ধ করে এবং তাঁর সমাজতন্ত্রী মতবাদে সুশিক্ষিত করে তুলতে হবে—সে মুহূর্ত শীঘ্র আসবে বলে তাঁর ভরসা। বাকুনিন এবং তাঁর অনুচররা ছিলেন অবিলম্বে কাজ শুরু করে দেবার পক্ষপাতী। মোটের উপর মার্ক্সেরই মত বজায় রইল। একটি ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক-সংঘ’ স্থাপিত হল। এইটেই হচ্ছে শ্রমিকদের প্রথম আন্তর্জাতিক (সংঘ)।
এর তিন বছর পরে ১৮৬৭ সনে, জর্মন ভাষায় মার্ক্সের বিখ্যাত বই ‘ডাস ক্যাপিটাল’ বা ‘ক্যাপিটাল’ প্রকাশিত হল। লণ্ডনে বসে তিনি বহু বৎসর ধরে যে শ্রম করেছিলেন এই বইখানা তারই ফল। এই বইয়ে তিনি অর্থনীতিশাস্ত্রের প্রচলিত মতামতগুলোর বিশ্লেষণ এবং সমালোচনা করলেন, এবং তাঁর নিজের মত সমাজতন্ত্রবাদের বিশদ ব্যাখ্যা দিলেন। এটি একটি খাঁটি বৈজ্ঞানিক পুঁথি। সমস্ত অস্পষ্টতা এবং সমস্ত আদর্শবাদ বাদ দিয়ে নির্বিকার বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি নিয়ে তিনি ছাঁকা কাজের কথায় ইতিহাস এবং অর্থনীতিশাস্ত্রের ক্রমপরিণতির সূত্র ব্যাখ্যা করলেন। বিশেষ করে আলোচনা করলেন বড়ো বড়ো কল-কারখানার সাহায্যে যে শিল্পপ্রধান সভ্যতা গড়ে উঠছিল তার জন্মকথা নিয়ে; এবং বিবর্তন ইতিহাস আর মানব সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে যে সংগ্রাম চলছে তার সম্বন্ধে কতকগুলো অতি দূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত খাড়া করলেন। পরিষ্কার ভাষায় উচ্চারিত এবং সুসংবদ্ধ যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত মার্ক্সের এই নূতন সমাজতন্ত্রতাদের নাম দেওয়া হল ‘বিজ্ঞানসম্মত সমাজতন্ত্রবাদ’, এতদিন যে অস্পষ্ট করে বলা ‘ইউটোপিয়ান’ (কল্পনাবহুল) বা ‘আদর্শবাদী’ সমাজতন্ত্রবাদ প্রচলিত ছিল তার থেকে এটা একেবারেই আলাদা জিনিষ। মার্কসের ‘ক্যাপিটাল’ বইটি পড়া অবশ্য সহজ নয়; বস্তুত হাল্কা খুশিতে পড়বার মতো বই আর এই বইয়ের মধ্যে যতদূর সম্ভব তফাত। তা হোক, পৃথিবীর যে দু-চারখান বাছাই করা বই অসংখ্য লোকের চিন্তাধারাকে প্রভাবান্বিত করেছে তাদের জীবনের সমস্ত আদর্শটাকেই বদলে দিয়েছে এবং মানবজাতির অগ্রগতিকেই গড়ে তুলতে চেয়েছে, এই বইটি তার মধ্যে একটি।
১৮৭১ সনে প্যারিস কমিউনের সেই মর্মান্তিক ব্যাপার ঘটল; জগতের ইতিহাসে সমাজতন্ত্রবাদ স্থাপনের বোধ হয় সেই প্রথম সজ্ঞান চেষ্টা। এর ফলে ইউরোপের সমস্ত দেশের শাসনকর্তৃপক্ষ ভয় পেয়ে গেল, শ্রমিক আন্দোলনের উপর আরও কঠোর পীড়ন চালাতে শুরু করল। এর পরের বছর মার্ক্সের প্রতিষ্ঠিত শ্রমিকদের ‘আন্তর্জাতিক’এর একটি সভা হল; মার্ক্সের চেষ্টায় এর প্রধান কেন্দ্র আটলাণ্টিকের ওপারে নিউইয়র্কে স্থানান্তরিত করা হল। বাইরে থেকে দেখে মনে হয়, মার্ক্স এটা করেছিলেন বাকুনিনের অ্যানার্কিষ্ট্ অনুচরদের এড়িয়ে চলবার জন্যে; তা ছাড়া তিনি হয়তো এও ভেবেছিলেন, ইউরোপের তুলনায় নিউইয়র্কেই আপাতত এর পক্ষে নিরাপদ আশ্রয় মিলবে, কারণ প্যারিস কমিউনের পর থেকে ইউরোপের সরকাররা সকলে একেবারে রাগে আগুণ হয়ে রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিকের প্রাণশক্তির সমস্ত বড়ো বড়ো কেন্দ্র ইউরোপে, তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অতদূরে গিয়ে বেঁচে থাকা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তার শক্তি সমস্তটাই সংগ্রহ করছিল যে ইউরোপ সেই ইউরোপেই শ্রমিক আন্দোলনকে প্রাণপণ লড়াই করে বেঁচে থাকতে হচ্ছিল। অতএব ‘প্রথম আন্তর্জাতিক’ ক্রমে মরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।
মার্ক্স্বাদ বা মার্ক্স্-প্রবর্তিত সমাজতন্ত্রবাদ ইউরোপের সমাজতন্ত্রবাদীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল, বিশেষ করে জর্মনি আর অস্ট্রিয়াতে। সেখানে একে লোকে সাধারণত জানত ‘সমাজ-গণতন্ত্রবাদ’ এই নামে। ইংলণ্ড কিন্তু একে তেমন আমল দিল না। তার তখন অনেক ধন-ঐশ্বর্য, সমাজ প্রগতির মতবাদ নিয়ে মাথা ঘামাবার তার অবসর নেই। ব্রিটেনে সমাজতন্ত্রবাদের প্রতীক ছিল ফেবিয়ান সোসাইটি; অতিদূর ভবিষ্যতে অতি নিরীহ রকমের খানিক পরিবর্তন নিয়েই তার কল্পনার শেষ। শ্রমিকদের সঙ্গে ফেবিয়ানদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এঁরা ছিলেন প্রগতিবাদী উদারপন্থী বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর লোক। সেই প্রথম যুগের ফেবিয়ানদের মধ্যে এর জন হচ্ছেন—জর্জ বার্নার্ড শ; আর-এক জন বিখ্যাত ফেবিয়ান—সিড্নি ওয়েব; তাঁর একটি প্রসিদ্ধ বাক্য থেকে এঁদের নীতিটার স্বরপ জানা যায়—“পরিবর্তনের মন্থর গতি অপরিহার্য”।
কমিউন-ধ্বংসের পর ফ্রান্সে সমাজতন্ত্রবাদ অতি ধীরে ধীরে পুনর্জীবন লাভ করে আবার সবল হয়ে উঠতে বারোটি বছর লেগে গেল। কিন্তু তখন সে দেখা দিল একটি নূতন রূপে, সেটা হচ্ছে অ্যানার্কিজ্ম্ আর সমাজতন্ত্রবাদের একটা মিশ্রফল। এর নাম দেওয়া হল ‘সিণ্ডিক্যালিজ্ম্’—কথাটা এসেছে ফরাসি শব্দ ‘সিণ্ডিক্যাট’ থেকে, তার মানে হচ্ছে শ্রমিকদের সংগঠন বা ট্রেড ইউনিয়ন। সমাজতন্ত্রবাদের কথা ছিল, সমগ্র সমাজের প্রতিনিধি হিসাবে রাষ্ট্রই জমি, কারখানা প্রভৃতি উৎপাদনের উপকরণগুলির স্বত্ব এবং নিয়ন্ত্রণের অধিকারী হবে। সমস্ত জিনিষ রাষ্ট্রের আয়ত্ত করে দেবার এই কাজটা কতদূর ব্যাপক হবে সে সম্বন্ধে খানিকটা মতদ্বৈধও ছিল। এ কথা সহজেই বোঝা যায়, হাতে চালাবার যন্ত্রপাতি, ঘরোয়া কলকব্জা প্রভৃতি বহু ব্যক্তিগত জিনিষ থাকে যা রাষ্ট্রের হাতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করাই পাগলামি। কিন্তু একটা বিষয়ে সমস্ত সমাজতন্ত্রবাদীই একমত ছিলেন; অন্য মানুষকে খাটিয়ে ব্যক্তিগত লাভ তুলে নেবার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে এমন সমস্ত যন্ত্রপাতি-উপকরণকেই সমাজের আয়ত্ত করে, অর্থাৎ রাষ্ট্রের সম্পত্তিতে পরিণত করে নিতে হবে। অ্যানার্কিস্ট্দের মতোই সিণ্ডিক্যালিস্ট্রাও রাষ্ট্রকে বিশেষ ভালো চোখে দেখত না, তার ক্ষমতা সংকোচ করে দিতে চাইত। এরা বলল, প্রত্যেকটি শিল্প ও কারখানার নিয়ন্ত্রণ ভার থাকবে তারই নিজের শ্রমিকদের হাতে, তার ‘সিণ্ডিক্যাটের’ হাতে। এদের মতটা ছিল: প্রত্যেক সিণ্ডিক্যাট থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে একটা সাধারণ ব্যবস্থাপক সভা তৈরি হবে; সেই সভা সমস্ত দেশের শাসনব্যাপারের তত্ত্বাবধান করবে; রাষ্ট্রের সাধারণ ব্যাপারে এইটেই হবে পার্লামেণ্ট, কিন্তু কোনো শিল্প ও ব্যবসায়ের আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাতে হস্তক্ষেপ করবার ক্ষমতা এর থাকবে না। এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করবার উপায় বলে যে কর্মপন্থাটি সিণ্ডিক্যালিস্ট্রা স্থির করল সে হচ্ছে ‘সাধারণ ধর্মঘট’—তার মানে, সমস্ত শিল্পে কারখানা যানবাহন প্রভৃতি একত্র মিলে হরতাল বা ধর্মঘট করবে, সমস্ত রাষ্ট্রের জীবনযাত্রাকে একেবারে অচল করে তুলবে, এবং এই চাপ দিয়ে তাদের অভীষ্ট ব্যবস্থা আদায় করে নেবে। মার্ক্স্বাদীরা সিণ্ডিক্যালিজম্কে মোটেই সমর্থন করত না। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার, সিণ্ডিক্যালিস্ট্রা মার্ক্স্কে (তাঁর মৃত্যুর পরে) তাদেরই একজন বলে মনে করত।
কার্ল্ মার্ক্স্ মারা যান ১৮৮৩ সনে, আজ থেকে ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে। তার মধ্যেই ইংলণ্ড জর্মনি এবং অন্যান্য শিল্পপ্রধান দেশে বড়ো বড়ো শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে উঠেছে। শিল্পসমৃদ্ধির বাজারে ব্রিটেনের চরম সুখের দিন তখন অতিক্রান্ত হয়ে গেছে; প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে জর্মনি আর আমেরিকার শক্তি দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে, ব্রিটেনের প্রতিপত্তি কমে আসছে। আমেরিকার অবশ্য বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য ও সুযোগ ছিল, তার ফলে সে অত্যন্ত দ্রুতবেগে শিল্পবাণিজ্য বাড়িয়ে ফেলল। জর্মনিতে রাজনীতির ক্ষেত্রে স্বৈরতন্ত্র (দুর্বল এবং শক্তিহীন পার্লামেণ্টের ফল) এবং শিল্পবাণিজ্যের ক্ষেত্রে অগ্রগতির একটা অপূর্ব সমন্বয় দেখা গেল। বিস্মার্কের আমলে এবং তার পরবর্তী কালেও, জর্মন সরকার শিল্পবাণিজ্যকে নানা রকমে সাহায্য করছিলেন, এবং সমাজ-সংস্কারের নানাবিধ ব্যবস্থা করে শ্রমিকশ্রেণীকে করায়ত্ত করে রাখবার চেষ্টা করছিলেন; এইসব ব্যবস্থার ফলে তাদের অবস্থার খানিকটা উন্নতিও হয়েছিল। ঠিক সেইভাবে ইংলণ্ডেও উদারপন্থী দল কিছু কিছু সমাজ-সংস্কার-সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করলেন; তার ফলে তাদের খাটুনির সময় কিছু কম হল, অন্য দিক দিয়েও তাদের অবস্থার কিছুটা উন্নতি হল। ব্যবসার সমৃদ্ধি যতদিন বজায় রইল, ততদিন এই ফন্দিটিতে বেশ ভালো ফল পাওয়া গেল, ইংলণ্ডের শ্রমিকরা নরমপন্থী এবং শান্ত হয়ে রইল, নিষ্ঠা সহকারে উদারপন্থী দলকে তাদের ভোট দিয়ে চলল। কিন্তু ১৮৮০ সনের পরে অন্যান্য দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলে ইংলণ্ডের এতকালের সমৃদ্ধির যুগে শেষ হয়ে গেল, ইংলণ্ডে বাণিজ্যের বাজারে মন্দা পড়ল, শ্রমিকদেরও বেতন কমে গেল। কাজেই তখন আবার শ্রমিকশ্রেণীর ঘুম ভাঙল, বাতাসে আবার বিপ্লবের আভাস দেখা দিল। ইংলণ্ডে বহু লোক মার্কসবাদে বিশ্বাসী হয়ে উঠল।
১৮৮৯ সনে আর-একবার একটা শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক তৈরি করবার চেষ্টা করা হল। ট্রেড ইউনিয়ন এবং শ্রমিকদলদের মধ্যে অনেকগুলোই তখন শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, তাদের অসংখ্য বেতনভোগী কর্মচারী নিযুক্ত রয়েছে। মার্ক্স্ এবং বাকুনিনের যুগের তুলনায় তখন এদের মানমর্যাদা অনেক বেশি। ১৮৮৯ সনে এই-যে আন্তর্জাতিকটি তৈরি হল (আমার ধারণা এটার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘শ্রমিক এবং সমাজতন্ত্রবাদীদের আন্তর্জাতিক’) একেই বলা হয় ‘দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক’। এটা বছর পচিশেক টিঁকে রইল তার পর এল বিশ্বযুদ্ধ, তার ধাক্কা এ সামলাতে পারল না। এই আন্তর্জাতিকে বহু লোক যোগ দিয়েছিলেন যাঁরা পরে নিজের নিজের দেশে বড়ো বড়ো চাকরি নিয়ে বসে গেলেন, দেখে মনে হয়, এঁদের ঠেলে তুলে একটা বড়ো জায়গাতে বসিয়ে দেবার জন্যেই শ্রমিকশক্তিকে ব্যবহার করেছিলেন, তার পর নিজের কাজ গুছিয়ে নিয়ে তার ভাগ্যে যা হয় হোক বলে সরে পড়লেন। এঁরা এক-এক জন প্রধানমন্ত্রী প্রেসিডেণ্ট ইত্যাদি হয়ে বসলেন, জীবনযুদ্ধে জয়ীর আসন দখল করলেন; যে লক্ষ লক্ষ লোক সে আসন অধিকার করতে এঁদের সাহায্য করেছিল, এঁদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তাদের এঁরা অকাতরে ত্যাগ করলেন, তারা যেখানকার সেইখানেই পড়ে রইল। এইসব নেতারা, এঁদের অনেকে মার্ক্সের নাম করে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন, অনেকেই ছিলেন প্রচণ্ড উৎসাহী সিণ্ডিক্যালিস্ট, তাঁরা পর্যন্ত পার্লামেণ্টের সভা বা মোটা বেতনের ট্রেড ইউনিয়ন কর্মচারী হয়ে বসলেন; হটকারিতা করে তাঁদের সে সখের চাকরিকে বিপন্ন করা তাঁদের পক্ষে ক্রমেই কঠিন ব্যাপার হয়ে উঠল। কাজেই তাঁরা শান্ত শিষ্ট ভদ্রলোক হয়ে গেলেন। সাধারণ শ্রমিকের দল যখন হতাশায় মরীয়া হয়ে বিপ্লবপন্থী হয়ে উঠল এবং কাজ আরও করতে চাইল তখন এঁরাই তাদের দমিয়ে রাখতে চেষ্টা করলেন। জর্মনিতে (মহাযুদ্ধের পরে) সমাজ-গণতন্ত্রী-নেতারা সাধারণতন্ত্রের প্রেসিডেণ্ট এবং চ্যান্সেলর হয়ে বসলেন। ফ্রান্সে ব্রিঁয়া একদা ছিলেন খুব তেজী সিণ্ডিক্যালিস্ট, সাধারণ ধর্মঘটের কথা জোর গলায় প্রচার করতেন। তিনি এগারো বার প্রধানমন্ত্রী হলেন এবং তাঁরই পুরোনো সহকর্মীদের একটি ধর্মঘটকে ভেঙে চূর্ণ করে দিলেন; ইংলণ্ডে হলেন র্যাম্জে ম্যাক্ডোনাল্ড্ প্রধানমন্ত্রী, যদিও তাঁকে যাঁরা বড়ো করে তুলেছিল তাঁর নিজের সেই শ্রমিকদলকে তিনি ত্যাগ করেছেন। সুইডেন, ডেনমার্ক, বেলজিয়ম, অস্ট্রিয়া সর্বত্রই এই ব্যাপার। পশ্চিম-ইউরোপের সর্বত্র ভরে রয়েছেন সব ডিক্টেটর আর শাসনকর্তারা; এঁরা সকলেই প্রথম-বয়সে সমাজতন্ত্রবাদী ছিলেন, তার পর বয়স বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে এঁরা শান্ত হয়ে গেছেন, নিজেদের পুরোনো লক্ষ্যের জন্য একদা যে আগুন মনে জ্বলেছিল তাকে গেছেন ভুলে, এমনকি অনেকসময় তাঁদেরই এককালের সহকর্মীদের সর্বনাশ সাধনে ব্রতী হয়েছেন। ইতালির ডুচে মুসোলিনি একদা সমাজতন্ত্রবাদী ছিলেন; পোল্যাণ্ডের ডিক্টেটর পিল্সুদ্স্কিও তাই।
শ্রমিক আন্দোলন এবং প্রায় সমস্ত দেশেরই স্বাধীনতাকামী জাতীয় আন্দোলন এইভাবে তার নেতা এবং প্রধান কর্মীদের ধর্মচ্যুতির ফলে বার বার বিপর্যস্ত হয়েছে। কিছু দিন পরে এঁরা শ্রান্ত হয়ে পড়েন, অসাফল্যে হন ভগ্নাশ্বাস; শহিদদের শূন্য মুকুট আর তাঁদের আকৃষ্ট করতে পারে না। ক্রমে এঁদের তেজ কমে আসে, উৎসাহের শিখা আসে নিষ্প্রভ হয়ে। এঁদেরই মধ্যে যাঁরা আবার বেশি উচ্চাকাক্ষী বা যাঁরা চক্ষুলজ্জার ধার কম ধারেন, তাঁরা সোজাসুজিই বিপক্ষ দলে গিয়ে যোগ দেন, এতদিন যাঁদের সঙ্গে বিরোধিতা বা সংগ্রাম করে এসেছেন তাঁদের সঙ্গেই ব্যক্তিগতভাবে সন্ধি-স্থাপন করে নেন। মানুষ যে কাজ নিজেই করতে চায় তার সঙ্গে বিবেককে মিলিয়ে নেওয়া শক্ত নয়। এঁদের এই দলত্যাগের ফলে আন্দোলনটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, একটুক্ষণের জন্য পিছিয়ে পড়ে। যারা শ্রমিকদের সঙ্গে লড়াই করে অধীনস্থ জাতিতে পরিণত করে রাখে তারাও একথা ভালো করেই জানে; তাই তারা সমস্তরকম লোভ দেখিয়ে মিষ্টি কথা বলে এ পক্ষের ব্যক্তিদের নিজেদের পক্ষে টেনে নিতে চেষ্টা করে। কিন্তু এরা বেছে বেছে দু-চার জন বাক্তিকে খাতির দেখালে বা কিছু ভালো ভালো কথা বললেও তাতে সাধারণ শ্রমিকের জনতা বা স্বাধীনতাকামী পরাধীন জাতির দুর্দশার প্রতিকার হয় না। কাজেই দু-চার জন হয়তো তাকে ছেড়ে চলে যায়, মাঝে মাঝে হয়তো বিপর্যয় আসে, তবুও সে সংগ্রাম সমানেই চলতে থাকে, যতদিনে না তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়।
১৮৮৯ সনে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক স্থাপিত হল, তার লোকবল এবং মর্যাদাও ক্রমে বাড়তে লাগল। পার্লামেণ্টে সভ্য নির্বাচন করবার জন্য যে ভোটের অধিকার দেওয়া হয়েছে তার সদ্ব্যবহার করতে তাঁরা স্বীকৃত হন নি, এই যুক্তি দেখিয়ে কয়েক বছর পরে মালাটেস্টা প্রমুখ অ্যানার্কিস্ট্দের এই আন্তর্জাতিক থেকে বহিষ্কৃত করে দেওয়া হল। আন্তর্জাতিকের মধ্যে যে সমাজতন্ত্রবাদীরা রইল তারা স্পষ্টই প্রমাণ করল, একত্র দাঁড়িয়ে সংগ্রাম চালাবার ব্যাপারে তারা তাদের পুরোনো সহকর্মীদের সঙ্গে দল বাঁধার চেরে পার্লামেণ্টে ঢোকাই বেশি পছন্দ করে। ইউরোপে যুদ্ধ বাধলে তখন সমাজতন্ত্রবাদীদের কী কর্তব্য হবে, সে বিষয়ে এরা খুব লম্বাচওড়া ঘোষণা প্রচার করতে লাগল। তাদের কাজের দিক থেকে সমাজতন্ত্রবাদীরা দেশ বা জাতির সীমানাকে স্বীকার করত না। সাধারণ অর্থে জাতীয়তাবাদী বলতে যা বোঝায় তাও তারা ছিল না। তারা জোরগলায় প্রচার করল, তারা যুদ্ধের বিরোধিতা করবে। কিন্তু ১৯১৪ সনে যুদ্ধ যখন সত্যই শুরু হল, দেখা গেল, দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সমস্ত কাঠামোটাই ভেঙে পড়েছে; প্রত্যেক দেশের সমাজতন্ত্রবাদী এবং শ্রমিক দলেরা, এমনকি ক্রোপটকিনের মতো অ্যানার্কিস্ট্রা পর্যন্ত অন্য সকলের মতোই উন্মত্ত জাতীয়তাবাদী এবং অন্য দেশের দারুণ শত্রু হয়ে উঠেছে। দু চার জন মাত্র লোক তখনও সত্যই যুদ্ধের বিরোধী হয়ে রইলেন; তাঁদের নানা রকমে দারুণ নির্যাতন সইতে হল, অনেকে দীর্ঘ কালের জন্য কারাদণ্ডেও দণ্ডিত হলেন
যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পর, ১৯১৯ সনে, মস্কো-শহরে লেনিন নতুন একটি শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক সৃষ্টি করলেন। এটি হল একটি খাঁটি কমিউনিষ্ট প্রতিষ্ঠান; যাঁরা প্রকাশ্যভাবে কমিউনিষ্ট বলে নাম লিখিয়েছেন তাঁরাই মাত্র এর সভ্য হতে পারবেন। এটি এখনও টিঁকে আছে, এর নাম হচ্ছে তৃতীয় আন্তর্জাতিক। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের ধ্বংসাবশেষ যারা ছিল তারাও যুদ্ধের পরে ধীরে ধীরে আবার একত্র গুছিয়ে বসল। এদের কতক মস্কোর নূতন তৃতীয় আন্তর্জাতিকে যোগ দিল; কিন্তু এদের অধিকাংশই মস্কো এবং তার মতবাদকে মনেপ্রাণে অপছন্দ করত। এরা তার ধারে-কাছেও ঘেঁষতে রাজি হল না। এরা দ্বিতীয় আন্তর্জাতিককেই আবার গড়ে তুলল। এটাও এখনও বেঁচে রয়েছে। সুতরাং এখনকার দিনে শ্রমিকদের দুটি আন্তজাতিক সংঘ বর্তমান রয়েছে, এদের সংক্ষেপে বলা হয় দ্বিতীয় ও তৃতীয় আন্তর্জাতিক। আশ্চর্যের বিষয়, এরা উভয়েই নীতি বলে স্বীকার করে মার্ক্সের মতকে; দু পক্ষই সে মতের নিজস্ব ব্যাখ্যা খাড়া করে নিয়েছে।
ও দিকে কিন্তু এরা আবার পরস্পর সম্বন্ধে এতখানি বিদ্বেষ পোষণ করে যে উভয়ের শত্রু ধনিকতন্ত্র সম্বন্ধেও এদের বিদ্বেষ তত নিদারুণ নয়।
পৃথিবীতে যেখানে যত ট্রেড ইউনিয়ন আর শ্রমিক সংঘ আছে তার সবগুলো এই দুটি আন্তর্জাতিকের অন্তর্ভুক্ত নয়; এদের অনেকগুলোই আছে যারা নিরপেক্ষ, স্বাধীন রয়ে গেছে। আমেরিকার ট্রেড ইউনিয়নগুলো দূরে সরে আছে, কারণ তাদের অধিকাংশই হচ্ছে অতিমাত্রায় রক্ষণপথী। ভারতের ট্রেড ইউনিয়নগুলিও এর কোনো আন্তর্জাতিকে যোগ দেয় নি।
‘ইণ্টারন্যাশনাল’ গানটি হয়তো তুমি জান। সমস্ত পৃথিবীতে এইটিই হচ্ছে শ্রমিক আর সমাজতন্ত্রবাদীদের নিজস্ব সংগীত।