বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/কুষাণ-সাম্রাজ্য
৩০
কুষাণ-সাম্রাজ্য
১১ই এপ্রিল, ১৯৩২
শক আর তুর্কি জাতি কর্তৃক পুনঃপুনঃ ভারত-আক্রমণের কথা গত চিঠিতে বলেছি। দাক্ষিণাত্যে অন্ধ্রজাতির প্রবল হয়ে ওঠার কথাও উল্লেখ করেছি; এই জাতি এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং সেটা বঙ্গোপসাগর থেকে আরবসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কুষাণদের নিকট তাড়া খেয়েই শকেরা এ দেশে এসেছিল; কিছুকাল পরে আবার কুষাণরা নিজেরাই এসে হাজির হল। খৃষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে কুষাণজাতি ভারতের সীমান্তে এক রাজ্য স্থাপন করে; এই রাজ্যই কালক্রমে বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। দক্ষিণে বারাণসী ও বিন্ধ্যপর্বত, উত্তরে ইয়ারখন্দ ও খোটান, আর পশ্চিমে পারশ্য এবং পার্থিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত, অর্থাৎ মধ্য-এশিয়া থেকে বারাণসী পর্যন্ত এই সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। কুষাণজাতি তিন শো বৎসর কাল রাজত্ব করেছিল। কুষাণ-সাম্রাজ্য আর দাক্ষিণাত্যের অন্ধ্র- সাম্রাজ্য সমসাময়িক। প্রথমে কুষাণ সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল কাবুলে; পরে পুরুষপুরে (বর্তমান পেশোয়ার) স্থানান্তরিত হয়।
কুষাণ-সাম্রাজ্যের ইতিহাস অনেক কারণে চিত্তাকর্ষক। কুষাণ-সম্রাটদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ ছিলেন কনিষ্ক; ইনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। বৌদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্র তক্ষশীলা রাজধানী পেশোয়ারের নিকটে অবস্থিত ছিল। কুষণেরা ছিল মঙ্গোলীয় কিংবা তৎসংশ্লিষ্ট জাত। কুষাণ রাজধানী থেকে নিশ্চয়ই লোকজন সর্বদা মঙ্গোলিয়ায় যাতায়াত করত; সেই কারণেই বৌদ্ধ শিক্ষা ও সংস্কৃতি চীন এবং মঙ্গোলিয়ায় পৌঁচেছিল। পশ্চিম-এশিয়াও নিশ্চয় এইভাবেই বৌদ্ধ
আদর্শ ও চিন্তাধারার সংস্পর্শে এসেছিল। আলেকজাণ্ডারের সময় থেকেই পশ্চিম-এশিয়া ছিল গ্রীক-শাসনাধীনে, কাজে কাজেই গ্রীক সভ্যতারও আমদানি হয়েছিল ওখানে। সেই গ্রীক-এশিয়াটিক সভ্যতা এখন ভারতীয়-বৌদ্ধ সভ্যতার সঙ্গে মিশ খেয়ে গেল।
দেখা যাচ্ছে, চীন আর পশ্চিম-এশিয়ার উপরে ভারতবর্ষ প্রভাব বিস্তার করেছিল। তেমনি আবার ভারতের উপরে এই দেশের ছাপ পড়েছিল। মনে করো, কুষাণ সাম্রাজ্য এক বিরাট মূর্তি, এশিয়ার পিঠের উপরে পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে; পশ্চিমে গ্রীস-রোম সাম্রাজ্য, পূবদিকে চীন, আর দক্ষিণে ভারতবর্ষ। এ যেন ছিল ভারতবর্ষ ও রোম এবং ভারতবর্ষ ও চীনের মধ্যবর্তী একটি বিশ্রামগৃহ।
এইরূপে কেন্দ্রস্থলে অবস্থানের দরুন ভারতবর্ষ আর রোমের মধ্যে একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। ভারতে যখন কুষাণ-রাজত্ব তখন রোমে জুলিয়াস সিজার বেঁচে ছিলেন; প্রজাতন্ত্র যুগ শেষ হয়ে রোমে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে। কথিত আছে, কুষাণ-সম্রাট রোমে অগাস্টাস সিজারের রাজসভায় দূত পাঠিয়েছিলেন। উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য চলত। ভারতবর্ষ থেকে নানা সুগন্ধি, রেশম, মসলিন, বহুমূল্য বস্ত্রাদি রোমে চালান দেওয়া হত। রোম থেকে সোনা আমদানি হত এ দেশে। প্লিনি নামে রোমের এক গ্রন্থকার সোনা-রপ্তানির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তাঁর মতে, ঐ রপ্তানির ফলে রোম বছরে প্রায় দেড় কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হত।
এই সময়ে বৌদ্ধসংঘের অধিবেশনে এবং আশ্রমগুলোতে ধর্মবিষয়ে মতভেদ দেখা দেয়। দক্ষিণ আর পশ্চিম অঞ্চল থেকে নূতন নূতন চিন্তাধারা কিংবা পুরোনো আদর্শই নূতন আকারে আমদানি হচ্ছিল এবং তাতে করে আদর্শের মধ্যে একটু জটিলতা এসে গেল। ক্রমে বৌদ্ধদের মধ্যে মতভেদ ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধগণ দুই শাখায় বিভক্ত হয়; এক শাখা ‘মহাযান’ এবং অপর শাখা ‘হীনযান’ মত অবলম্বন করে। এর ফলে লোকের ধর্ম ও জীবনাদর্শে একটা পরিবর্তন দেখা দিল এবং সেটা পরিস্ফুট হয়ে উঠল শিল্পে স্থাপত্যে। কী করে এই পরিবর্তন ঘটল তা বলা শক্ত; তবে সম্ভবত ব্রাহ্মণ্য আর যাবনিক আদর্শ বৌদ্ধ চিন্তাধারার মোড় ফিরিয়ে দিয়েছিল।
আসলে বৌদ্ধধর্মটা কী? ওটা শ্রেণীবিভাগ, পুরোহিত-প্রথা আর আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদির একটা বিরুদ্ধ মতবাদ মাত্র, এ কথা তোমাকে পূর্বেও বলেছি। গৌতম ছিলেন মূর্তিপূজার বিরোধী। তিনি নিজেকেও দেবতা বলে দাবি করেন নি। তিনি ছিলেন জ্ঞানী, বুদ্ধ। এই মনোভাবের দিক থেকে বুদ্ধ কোনো মূর্তিতে প্রকাশ পান নি; সুতরাং সে যুগের স্থাপত্যশিল্পেও কোনো মূর্তির স্থান ছিল না। কিন্তু ব্রাহ্মণেরা হিন্দু আর বৌদ্ধধর্মের বিভেদ ঘোচাবার জন্যে বরাবর চেষ্টা করেছে এবং সেই উদ্দেশ্যে বৌদ্ধধর্মের মধ্যে হিন্দু আদর্শ প্রবর্তন করতে চেয়েছে। গ্রীস-রোম থেকে যেসকল কারিগর এ দেশে এসেছিল তাদের দিয়ে দেবমূর্তি গড়ানো হত। এভাবেই ক্রমে বৌদ্ধ-মন্দিরে-মন্দিরে মূর্তি গড়ে উঠতে লাগল। প্রথমে বোধিসত্ত্বের বিগ্রহ, কেননা বুদ্ধ পূর্ব-পূর্ব জন্মে বোধিসত্ত্ব ছিলেন বলে লোকে বিশ্বাস করত; তার পরে ক্রমে স্বয়ং বুদ্ধের মূর্তি তৈরি হল, লোকে দেবতাজ্ঞানে তাঁর পূজা করতে লাগল।
মহাযান-শাখা এইসব পরিবর্তনের পক্ষপাতী ছিল। কুষাণ-সম্রাটগণ মহাযান-মত অবলম্বন করেন। কিন্তু তাই বলে ওরা হীনযান কিংবা অন্যান্য ধর্মমতের প্রতি মোটেই অসহিষ্ণু ছিলেন না। কনিষ্ক তো নাকি জরথুস্ট্রের ধর্ম প্রচারেও উৎসাহ দেখাতেন।
মাঝে মাঝে বৌদ্ধসংঘের অধিবেশনে মহাযান আর হীনযান এই দুই মতবাদ সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা হত। কনিষ্ক কাশ্মীরে সংঘের এক সাধারণ অধিবেশন আহ্বান করেছিলেন। কয়েক শো বছর ধরে এই দুটি মতবাদের মধ্যে বিরোধ চলেছিল। উত্তর-ভারতের বোধগণ মহাযান আর দক্ষিণ ভারতের বৌদ্ধগণ হীনযান মত অবলম্বন করে; অবশেষে উভয় মতবাদই হিন্দু ধর্মের সঙ্গে মিশে যায়। বর্তমানে চীন জাপান তিব্বতে মহাযান-পন্থা প্রচলিত। সিংহল এবং ব্রহ্মদেশের বৌদ্ধরা হীনযান মতাবলম্বী।
প্রত্যেক জাতির শিল্পকলার মধ্যে জাতির মানসিক গতির পরিচয় পাওয়া যায়। গোড়ার দিকে বৌদ্ধধর্মের চিন্তা এবং ভাবধারা অত্যন্ত সহজ সরল অনাড়ম্বর ভাবেই প্রকাশ পেয়েছিল। ক্রমে বৌদ্ধ-প্রচারকের দল সহজ পথ ছেড়ে নানারকম রূপকের সাহায্যে মর্মব্যাখ্যা করতে লাগলেন। তার ফলে ভারতীয় শিল্পকলাও ক্রমেই অলংকারবহুল হয়ে উঠতে লাগল। বিশেষ করে উত্তরপশ্চিম সীমান্তে গান্ধার প্রদেশে মহাযান-সম্প্রদায়ের যে স্থাপত্যশিল্প গড়ে উঠেছিল তার মধ্যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কারুকার্য ক্রমেই বেড়ে চলেছিল। এমনকি হীনযানদের স্থাপত্যশিল্পও এর ছোঁয়াচ থেকে সম্পূর্ণ রক্ষা পায় নি। এদের শিল্পের মধ্যে যে অনাড়ম্বর সরলতাটুকু ছিল তা দূর হয়ে ক্রমেই আলংকারিক কারুকলার প্রয়াস দেখা দিতে লাগল।
সে যুগের কিছু কিছু শিল্পনিদর্শন এখনও বর্তমান রয়েছে। এর মধ্যে অজন্তার প্রাচীর-চিত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কুষাণদের কাছ থেকে এবার আমাদের বিদায় নিতে হবে। কিন্তু একটি কথা মনে রেখো; সাধারণত বিদেশীরা এসে বিজিত দেশকে যেভাবে শাসন করে থাকে কুষাণরা ঠিক সেভাবে ভারতবর্ষ শাসন করে নি। একে তো ধর্মের যোগ থাকাতে ভারতীয়দের সঙ্গে তাদের অমনিতেই আত্মীয়তার বন্ধন ছিল, তা ছাড়া কুষাণরা আবার রাজ্যচালনার ব্যাপারে আর্যদেরই রীতিনীতি, শাসনপ্রণালী সব-কিছু অবলম্বন করেছিল। অনেক পরিমাণে আর্যদের চালচলন রীতিনীতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছিল বলেই প্রায় তিন শো বছর ধরে এরা উত্তর-ভারতে রাজত্ব করতে পেরেছিল।