বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/কোরিয়া ও জাপান

উইকিসংকলন থেকে

৪২

কোরিয়া ও জাপান

৮ই মে, ১৯৩২

 পৃথিবীর ইতিহাস তোমাকে বলছি, সুতরাং অনেক দেশ, অনেক জাতিই আমাদের আলোচনার মধ্যে আসবে। আজ জাপান আর কোরিয়া সম্বন্ধে তোমাকে কিছু বলব। এই দুটি দেশ চীনের নিকট-প্রতিবেশী এবং বলতে গেলে চীনসভ্যতারই বংশধর। এশিয়ার একেবারে শেষ সীমান্তে, পূর্বপ্রান্তে, এই দেশদুটি অবস্থিত; তার পরেই বিরাট প্রশান্ত মহাসাগর। সুদূর সাগরপারে আমেরিকা মহাদেশের সঙ্গে এদের যে সম্পর্ক, সে তো এই সেদিনের! তার আগে একমাত্র সম্পর্ক ছিল চীন মহাদেশের সঙ্গে। ধর্ম বলো, শিল্প-সভ্যতা বলো, সব-কিছুই চীন থেকে কিংবা চীনের সহায়তায় এরা পেয়েছে। চীনের কাছে এই দুটি দেশ অশেষ ঋণী। কতকটা আবার ভারতের কাছেও ঋণী। তবে কিনা, ভারতের কাছ থেকে এরা যা পেয়েছে তা সবই চীনের দৌলতে।

 এশিয়া কিংবা অন্যত্র যেসকল প্রসিদ্ধ ঘটনা ঘটেছে তার সঙ্গে কোরিয়া আর জাপানের বড়ো-একটা সম্পর্ক ছিল না; সবরকমের গোলযোগ, আন্দোলনের কেন্দ্র থেকে এরা অনেকটা দূরে ছিল। এই দিক থেকে দেখতে গেলে এই দুটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাদের পক্ষে মঙ্গলজনক হয়েছে, বিশেষ করে জাপানের পক্ষে। সুতরাং এদের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে মাথা ঘামাবার তেমন প্রয়োজন নেই। আধুনিক কালের ইতিহাস আলোচনা করলেই চলবে এবং তাতে এশিয়ার অন্যান্য দেশের ঘটনাবলীর তাৎপর্য বুঝতেও বেগ পেতে হবে না। তবে বর্তমানের ঘটনাবলীর গতি ও ধারা বোঝবার জন্যে অতীত ইতিহাস কিছুটা জানা মন্দ নয়।

 কোরিয়ার কথা লোকে প্রায় ভুলেই গেছে। ছোট্ট দেশ, তাতে আবার জাপান তাকে গ্রাস করে সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে। তথাপি কোরিয়া আজও স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে, জাপানের কবল থেকে মুক্তিলাভের জন্যে লড়াই করে। অধুনা জাপান অন্যতম প্রধান সাম্রাজ্য বলে গণ্য হয়েছে। খবরের কাগজে দেখে থাকবে, জাপান চীনদেশ আক্রমণ করেছে। সম্প্রতি মাঞ্চুরিয়ায় যুদ্ধ চলছে। তাই বর্তমানের ঘটনাবলীর তাৎপর্য সম্যক্ উপলব্ধি করবার জনো জাপান ও কোরিয়ার অতীত ইতিহাস সংক্ষেপে আলোচনা করা যেতে পারে।

 গোড়ায় মনে রাখতে হবে যে, এই দুটি দেশ অনেক কাল বহির্জগৎ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল। বাস্তবিক, জাপানের সঙ্গে কারও কোনো সম্পর্ক ছিল না, এবং বলতে গেলে জাপান বিদেশী আক্রমণ থেকেও ছিল মুক্ত। এই সেদিন পর্যন্ত জাপানের যত হাঙ্গাম আর গোলযোগ, তা সবই ছিল তার ভিতরকার সৃষ্টি। কিছুকাল জাপান বহির্জগৎ থেকে নিজেকে এমনভাবে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল যে, কোনো জাপানি দেশের বাইরে অন্যত্র যেতে পারে নি, কোনো বিদেশীও জাপানে প্রবেশ করতে পারে নি, এমনকি চীনারাও নয়। আসলে তারা চায় নি যে, ইউরোপীয়রা এবং খৃস্টান মিশনারীরা তাদের দেশে এসে উৎপাত শুর করে। কিন্তু এই ব্যবস্থা নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক এবং ফলও খারাপ হতে বাধ্য। কেননা, এতে করে সমগ্র একটা জাতিকে যেন জেলে পুরে রাখা হল, বাইরের জগতের ভালোমন্দ প্রভাব থেকে আলাদা করে। সহসা একসময়ে জাপান খুলে দিল সমস্ত জানলা-দরজা, বেরিয়ে এল তথাকথিত কারাগার থেকে, করায়ত্ত করে নিল ইউরোপের শিক্ষাদীক্ষা। এবং এত ভালো করেই সব কিছু আরম্ভ করল যে, দুই পুরুষের মধ্যেই ইউরোপের যে-কোনো দেশের সমকক্ষ হয়ে উঠল—ভালোর দিকটা তো গ্রহণ করলই, খারাপ দিকটাও বাদ দিল না। এ সবই গত সত্তর বছরের ঘটনা।

 কোরিয়ার ইতিহাস শরু হয় চীনের অনেক পরে; এবং জাপানের ইতিহাসও আবার কোরিয়ার অনেক পরেকার কাহিনী। গত বছর এক চিঠিতে তোমাকে লিখেছিলাম, কিৎসি-নামক চীনের জনৈক নির্বাসিত ব্যক্তি তার পাঁচ হাজার অনুগামী-সহ দেশ ছেড়ে পূর্বদিকে চলে যায় এবং এক স্থানে বসবাস করতে শুরু করে; জায়গাটার নাম দিলে চোজ্‌ন্ বা প্রভাতকালীন শান্তির দেশ। সে খৃষ্টপূর্ব ১১২২ সনের কথা। চীনের শিল্প, কৃষিবিদ্যা, কারিগরিনৈপুণ্য ইত্যাদিও এল এদের সঙ্গে। নয় শো বছর-কাল কিৎসির বংশধরগণ এ স্থানে রাজত্ব করল। সময়ে সময়ে চীনা ঔপনিবেশিকরা এই দেশে এসে বসবাস করেছিল এবং এভাবে চীনের সঙ্গ্যে একটা নিকট-সম্পর্ক গড়ে উঠল।

 শি, হুয়াঙ, টি যখন চীনের সম্রাট তখন চীনের বহু সংখ্যক অধিবাসী চোজ্‌নে গিয়েছিল। এই সম্রাটের কথা হয়তো তোমার মনে আছে। ইনি আমাদের সম্রাট অশোকের সমসাময়িক ছিলেন। ইনি নিজকে ‘প্রথম সম্রাট’ বলে ঘোষণা করেছিলেন। পুরোনো সমস্ত পুঁথি ইনি পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। এর উৎপীড়ন-অত্যাচারের দরুন অনেক চীনা কোরিয়াতে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং কিৎসির বংশধরদের তাড়িয়ে দেয়। এর পরে চোজ্‌ন্ বিভক্ত হল কতকগুলো ছোটো ছোটো রাষ্ট্রে। আট শো বছর কাল এভাবে চলল। এই রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই ঝগড়া বিবাদ করত। এক সময়ে এদের মধ্যে একটি রাষ্ট্র চীনের সাহায্য চেয়ে পাঠাল। সাংঘাতিক অনুরোধ, নয় কি? চীন সাহায্য করতে এল বটে, কিন্তু আর ফিরে গেল না। শক্তিশালী দেশের কাজকারবারই এইরকম। চীন থেকে গেল, অধিকন্তু চোজ্‌নের কতক অংশ নিজ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নিল; বাকিটাও কয়েক শো বছর কাল তাঙ্-বংশের আনুগত্য স্বীকার করেছিল।

 অবশেষে ৯৩৫ খৃষ্টাব্দে চোজ্‌নের বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলো মিলিত হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ওয়াঙ্ কিন্-নামক একটি লোকের চেষ্টায় এটা সম্ভব হয়েছিল; সাড়ে চার শো বছর ওর বংশধরগণ এই রাজ্য শাসন করে।

 দু-তিনটি অনুচ্ছেদে আমি তোমাকে কোরিয়ার দু হাজার বৎসরের ইতিহাস বলে দিলাম। কোরিয়া যে চীনের কাছে অশেষ ঋণী, এইটেই বড়ো কথা। চীনের লিখন পদ্ধতিই কোরিয়াতে প্রচলিত হয়েছিল। এক হাজার বৎসর পরে কোরিয়ার লোকেরা নিজেদের ভাষার উপযোগী একটা বর্ণমালা উদ্ভাবন করে নিয়েছে।

 কোরিয়াতে বৌদ্ধধর্ম এসেছিল চীনের মধ্য দিয়ে, আর কনফুসীয় দর্শন এল খাস চীন থেকে। ভারতীয় শিল্পকলার আদর্শ কোরিয়া আর জাপানে পৌঁচেছিল চীনের মধ্যস্থতায়। কোরিয়ার শিল্পকলা, বিশেষ করে ভাস্কর্য সবিশেষ উন্নতিলাভ করল। স্থাপত্যশিল্পে কোরিয়া অনুসরণ করল চীনকে। জাহাজশিল্পেরও উন্নতি হল খুব। বাস্তবিক, একসময়ে কোরিয়ার নৌবিভাগ বেজায় শক্তিশালী হয়েছিল, এমনকি জাপানকেও আক্রমণ করেছিল।

 আধুনিক জাপানিদের পূর্বপুরুষ সম্ভবত কোরিয়া কিংবা চোজ্‌ন্ থেকে এসেছিল, এই আমার আন্দাজ। কতক দক্ষিণ থেকে, মালয় থেকেও এসে থাকবে। তুমি তো জানোই, জাপানিরা মঙ্গোলিয়ান-বংশোদ্ভব। অদ্যাপি জাপানের উত্তরাংশে কতক লোক আছে, রোমশ দেহ, ফরশা রঙ, জাপানিদের থেকে ধরনধারন আলাদা। এদের বলা হয় আইনাস; সম্ভবত এরা আদিম অধিবাসী।

 আদিযুগে জাপানের নাম ছিল যামাতো অথবা ইয়ামাতো। ২০০ খৃষ্টাব্দে ইয়ামাতো-রাষ্ট্রের সম্রাজ্ঞী ছিল জিঙ্গো নামে এক নারী। এর নামটা খেয়াল করবে। ইংরেজি ভাষায় জিঙ্গো শব্দের অর্থ দাম্ভিক সাম্রাজ্যবাদী। শুধু সাম্রাজ্যবাদীও বলতে পারি, কেননা, এ তো জানা কথা যে, সাম্রাজ্যবাদীমাত্রেই উৎকট আত্মশ্লাঘী হয়ে থাকে। এই সাম্রাজ্যবাদ-রোগ জাপানেরও আছে এবং সম্প্রতি কোরিয়া আর চীনের প্রতি তার আচরণ নিতান্ত ন্যায়বিগর্হিত হয়েছে। কাজেকাজেই তার প্রথম শাসকের নাম যে জিঙ্গো ছিল, সেটা অদ্ভূত সংঘটন বলতে হবে।

 কোরিয়ার সঙ্গ্যে ইয়ামাতোর একটা সম্পর্ক ছিল; এবং সেকারণেই চীনসভ্যতা প্রবেশ করতে পেরেছিল ইয়ামাতো-রাজ্যে। ৪০০ খৃস্টাব্দে চীনের লেখ্য ভাষাও সেখানে প্রচলিত হয়; বৌদ্ধধর্মের প্রচলনও হয়েছিল কোরিয়ার দৌলতে।

 জাপানে প্রচলিত ধর্মের নাম ছিল সিণ্টোধর্ম। সিটো কথাটা চীনের—মানে, দেবতাদের পথ। সিণ্টোধর্ম ছিল প্রকৃতি-পূজা আর পূর্বপুরুষ-পূজা, এই দুয়ের সংমিশ্রণ। এই ধর্মে ভবিষ্যৎজীবনের প্রশ্ন বা সমস্যার স্থান ছিল না; এ ছিল প্রধানত যোদ্ধৃজাতির ধর্ম। চীন আর জাপান পাশাপাশি অবস্থিত এবং চীনসভ্যতার কাছে জাপান অশেষ ঋণী; তথাপি এই দুই দেশের অধিবাসীদের মধ্যে মূলগত প্রভেদ রয়েছে। চীনারা বরাবরই শান্তিপ্রিয় জাতি; তাদের সমগ্র সভ্যতায় এবং তাদের জীবনদর্শনে আছে শান্তির বাণী। আর জাপানিরা বরাবরই যোদ্ধার জাত। সৈনিকের প্রধান গুণ হল নেতা এবং সঙ্গীদের প্রতি আনুগত্য। এইটেই জাপানিদের প্রধান বৈশিষ্ট্য এবং তাই তো ওরা এত শক্তিশালী। সিণ্টোধর্মের মূল কথা ছিল দেবতাদের পূজা করো এবং তাদের বংশধরদের প্রতি অনুগত থাকো। দেখা যাচ্ছে, বৌদ্ধধর্মের পাশাপাশি সিণ্টোধর্ম আজও জাপানে টিঁকে আছে।

 কিন্তু এইটে কি একটা ধর্ম? একজন সঙ্গী অথবা একটা উদ্দেশ্যের প্রতি আনুগত্য প্রকাশকে গুণ বলা যেতে পারে বটে। তবেই দেখো, সিণ্টো এবং অন্যান্য ধর্মমত আমাদের আনুগত্যের সুযোগ নিয়ে আমাদের শাসকশ্রেণীকে প্রবল করে তুলেছে। জাপান, রোম এবং অন্যত্র এই শক্তি বা কর্তৃত্বের পূজাই চলে এসেছে; এই ধর্মমত আমাদের কত ক্ষতি করেছে, পরে জানতে পারবে।

 জাপানে প্রথম যখন বৌদ্ধধর্মের ঢেউ এসে পৌঁছল, প্রাচীন সিণ্টোধর্মের সঙ্গে তার বাধল বিরোধ। কিন্তু বিরোধ মিটতে দেরি হয় নি এবং তার পর থেকে দুটো ধর্মই আজও পর্যন্ত পাশাপাশি চলছে। কিন্তু সিণ্টোধর্মই বেশি জনপ্রিয়; তা ছাড়া ওতে শাসকশ্রেণীর সমর্থনও আছে। ঐ ধর্ম জনগণকে তাদের প্রতি বাধ্য আর অনুগত থাকতে বলে কিনা? আবার, বৌদ্ধধর্মও একট ভয়াবহ ধর্ম; কেননা, ওর প্রবর্তক ছিলেন একজন বিদ্রোহী।

 জাপানে শিল্পের উন্নতির মূলে বৌদ্ধধর্ম। এই ধর্ম-প্রচলনের পর থেকেই সে দেশে শিল্পের উন্নতি শুরু হয়। তখন থেকে জাপান অথবা ইয়ামাতো চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে; জাপানি দূতের আনাগোনা শুরু হয় বিশেষ করে তাঙ্-বংশের রাজত্বকালে। চীনের রাজধানী সিয়ান-ফু তৎকালে পূর্ব-এশিয়ায় খুব সমৃদ্ধিশালী নগর ছিল। ইয়ামাতোর লোকেরা অবিকল সিয়ান-ফু নগরের মতো এক নূতন রাজধানী স্থাপন করল, নাম দিল নারা। বাস্তবিক, অপরকে অনুকরণ করবার অদ্ভূত ক্ষমতা এই জাপানিদের।

 জাপানে বড়ো বড়ো বংশগুলি ক্ষমতালাভের জন্যে একে অন্যের বিরোধিতা করে থাকে, ইতিহাসে তার সাক্ষ্য আছে। অবশ্য প্রাচীনকালে অন্যান্য দেশেও এরকমটা হয়েছে। জাপানের ইতিহাস প্রধানত পারিবারিক কিংবা বংশগত প্রতিবন্দ্বিতারই ইতিহাস। জাপানিরা তাদের সম্রাট মিকাডোকে সর্বশক্তিমান বলে মনে করে—একেবারে দেবতা, সূর্যের বংশধর। সিণ্টোধর্ম ওদের শিখিয়েছে সম্রাটের একাধিপত্য মেনে নিতে, দেশের ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের প্রতি অনুরাগ প্রকাশ করতে। কিন্তু অনেক সময়ে দেখা গেছে, জাপানে সম্রাটের কোনো ক্ষমতা থাকে না; প্রকৃত ক্ষমতা থাকে প্রভাবশালী বড়ো পরিবার কিংবা বংশের হাতে, সম্রাট তাদের হাতের পুতুল মাত্র।

 সর্বপ্রথম সোগা-পরিবার জাপানে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা লাভ করে। তাদের আমলেই বৌদ্ধধর্ম সরকারিধর্মরূপে গণ্য হয়েছিল। এই বংশের শোতুকু তাইশির নাম জাপানের ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। ইনি ছিলেন বৌদ্ধ এবং পবে ক্ষমতাশালী লোক। শাসনতন্ত্রকে ইনি ন্যায়ের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়াসী হলেন। জাপানে তখন কুলনেতাদের খুব প্রতাপ; কারও কর্তৃত্ব কেউ মানে না, সবাই স্বাধীন। সম্রাট ছিল নামেমাত্র সম্রাট। শোতুকু তাইশি কেন্দ্রীয় গবর্মেণ্টকে শক্তিশালী করে গড়ে তুললেন; অধিকন্তু সকল সামন্তকে বাধ্য করলেন সম্রাটের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করতে। সে ৬০০ খৃস্টাব্দের কথা।

 শোতুকু তাইশির মৃত্যুর পরেই সোগা-বংশ বিতাড়িত হল। কিছুদিন কাটল। এর পরে কাকাতোমি নো কামাতোরি নামে এক ব্যক্তির আবির্ভাব। এই ব্যক্তি শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধন করল, আমদানি করল চীনা-পদ্ধতি। সম্রাটের হাতে ক্ষমতা এল, কেন্দ্রীয় গবর্মেণ্ট হল অধিকতর শক্তিশালী।

 এই সময়েই রাজধানী নারা-নগরের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু রাজধানী বেশি দিন সেখানে ছিল না। ৭৯৪ খৃষ্টাব্দে রাজধানী স্থানান্তরিত হল কয়েটো-নগরে এবং এই সেদিন পর্যন্ত, প্রায় এগারো শো বছর-কাল ঐখানেই ছিল। এর পরে টোকিও হল রাজধানী। টোকিও আধুনিক যুগের বড়ো শহর।

 জাপানের প্রসিদ্ধ ফুজিআরা-বংশের প্রতিষ্ঠাতা এই কাকাতোমি নো কামাতোরি। দু শো বছর-কাল এই বংশ জাপানে রাজত্ব করেছে। এদের দারণ প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল।

 চীন-সম্রাট এক সময়ে জাপানের সম্রাটকে এক বাণী প্রেরণ করেছিলেন, নারা নগর তখন রাজধানী। তিনি জাপ-সম্রাটকে সম্বোধন করেছিলেন, ‘তাই-নিহি-পুং-কোক্’এর সম্রাট। এই কথাটার অর্থ, সূর্যোদয়ের রাজ্য। নামটা জাপানিদের খুব পছন্দ হল; তারা তখন থেকে ইয়ামাতো নামের পরিবর্তে ‘দাই নিপ্পন’ অর্থাৎ সূর্যোদয়ের দেশ, এই নাম ব্যবহার করতে শুরু করল। আজও এই নামই প্রচলিত।

 নিপ্পন কথা থেকে জাপান নামের উৎপত্তি। সে এক মজার কাহিনী। প্রায় ছ শো বছর পরের কথা। মার্কোপোলো নামক এক ইতালীয় পরিব্রাজক চীন দেশে গিয়েছিল। সে জাপানে কখনও যায় নি, কিন্তু তার ভ্রমণবৃত্তান্তে জাপানের কথা সে লিখে গেছে। নি-পুং-কোক্ নামটা সে শুনেছিল। এই নামকে মার্কোপোলো তার বইয়ে লিখেছে চিপাংগো এবং তা থেকেই জাপান নামের উদ্ভব।

 আচ্ছা, আমাদের দেশের নাম ইণ্ডিয়া এবং হিন্দুস্থান কেন হল, জান? এই দুটো নামই ইণ্ডাস্ বা সিন্ধু নদের নাম থেকে উৎপন্ন হয়েছে। গ্রীকরা আমাদের দেশের নাম দিয়েছিল ইণ্ডস্; তা থেকেই এসেছে ইণ্ডিয়া। আবার এই সিন্ধুকেই পারশ্যবাসীরা বলত হিন্দু এবং তা থেকেই হিন্দুস্থান কথার উদ্ভব হয়েছে।