বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/খৃষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক ও ধর্ম

উইকিসংকলন থেকে

১৪

খৃষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক ও ধর্ম

২০শে জানুয়ারি, ১৯৩১

 ইতিহাসের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে চলো আমরা এগিয়ে যাই। দু হাজার পাঁচ শো বছর অর্থাৎ খৃষ্টের জন্মের প্রায় ছশো বছর আগেকার একটা জায়গায় এসে আমরা থেমেছি। তারিখটা একেবারে যে নির্ভুল তা নয়। আন্দাজে মোটামুটি একটা সময় নির্দেশ করেছি মাত্র। এইরকম একটা সময়ে কয়েকজন নামকরা লোক, কেউ-বা তাঁদের মধ্যে জ্ঞানী, কেউ-বা ধর্ম প্রবর্তক, বিভিন্ন দেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কেউ চীনে, কেউ ভারতবর্ষে, কেউ পারশ্যে, কেউ-বা গ্রীসে। তাঁরা ঠিক যে সমসাময়িক সে কথা বলা চলে না। অল্প কয়েক বৎসর আগে-পরে আবির্ভূত হয়ে এঁরা খৃষ্টপূর্ব ছয় শতককে বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন। একটা নূতন চিন্তার ধারা, বর্তমান সম্বন্ধে একটা অসন্তোষের ভাব, অনাগত কালের জন্য একটা আশাআকাঙ্ক্ষা যেন সমস্ত পৃথিবীময় একই সময়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। একটা কথা মনে রেখো, বড়ো বড়ো ধর্মপ্রবর্তক যাঁরা তাঁরা সবাই চেয়েছেন মানবসাধারণের মঙ্গল হয় যাতে, যাতে তারা উন্নত হয় এবং তাদের দুঃখকষ্টের লাঘব ঘটে। বর্তমানের অন্যায় ও অমঙ্গলের বিরুদ্ধে তাঁরা নির্ভয়ে বিদ্রোহ করেছেন। যেখানে পুরাতন সংস্কার মানুষকে অধর্মের পথে নিয়ে গেছে, মানুষের উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেইখানেই তাঁরা তাকে নির্মমভাবে আঘাত করেছেন। তাকে দূর করার জন্য নির্ভীকভাবে দাঁড়িয়েছেন। লক্ষ লক্ষ মানুষের চোখের সামনে তাঁরা তুলে ধরেছেন মহান জীবনের আদর্শ—যুগে যুগে মানুষ এই আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছে, প্রেরণা লাভ করেছে।

 সেই খৃষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ভারতবর্ষে জন্মেছিলেন বৃদ্ধ ও মহাবীর; চীনে কন্‌ফুসিয়স ও লাওৎসে; পারশ্যে জরথুস্ট্র বা জোরোআস্টার;[] এবং গ্রীসের সামোস দ্বীপে জন্মেছিলেন পাইথাগোরাস্। ইতিহাস ছাড়াও অন্য প্রসঙ্গে তুমি হয়তো এঁদের নাম শুনে থাকবে। সচরাচর স্কুলের ছেলেমেয়েদের ধারণা যে পাইথাগোরাস্ লোকটার খেয়েদেয়ে কাজ ছিল না, তাই জ্যামিতির যেন কী একটা সিদ্ধান্ত প্রমাণ করেছিলেন। সেটা আবার বেচারাদের মুখস্থ করতে হয়। সমকোণ বিশিষ্ট ত্রিভুজের তিন বাহুর উপর অঙ্কিত তিনটি চতুর্ভুজ নিয়ে এই সিদ্ধান্তের কারবার। ইউক্লিডের বা অন্য যে-কোনো জ্যামিতির বইয়ে এই সিদ্ধান্তের উল্লেখ আছে। জ্যামিতিক আবিষ্কার ছাড়াও চিন্তাশীল দার্শনিক হিসাবে পাইথাগোরাসের খুবই নাম আছে। ওঁর সম্বন্ধে আমরা খুব অল্পই জানি, এমনকি কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেন পাইথাগোরাস্ নামে কেউ ছিলেন কি না।

 পারশ্যের জোরোআস্টারকে জরথুস্ট্রবাদ নামে একটি ধর্মের গুরু বলা হয়। তাঁকে ঠিক নবধর্মপ্রবর্তক বলা চলে কি না জানি না। খুব সম্ভব পারশ্যের পুরাতন ধর্মমতকে একটা নূতন রূপ দিয়ে তিনি নূতন পথে নিয়ে গিয়েছিলেন। আজ বহুদিন অতীত হল পারশ্য থেকে এই ধর্ম প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অনেক দিন আগে ও দেশ থেকে এক দল লোক এসেছিল ভারতবর্ষে, আমরা তাদের পার্শি বলি। এই পার্শি সম্প্রদায় এখনও জরথুস্ট্রের ধর্ম অনুসারে অগ্নির উপাসনা করে।

 আগেই বলেছি, এই একই সময়ে চীন দেশে জন্মেছিলেন কনফুসিয়স ও লাওৎসে কনফুসিয়স নামটার ঠিক বানান হল কং ফু-ৎসে। ধর্ম প্রবর্তক বলতে যা বোঝায় এঁরা সেরকম ছিলেন না। এঁরা কতকগুলি নীতি ও সমাজব্যবস্থা বেঁধে দিয়েছিলেন। এঁদের নীতিশাস্ত্র শিক্ষা দিত কোন্ কাজ করা উচিত, কোন্ কাজ অনুচিত। মৃত্যুর পর কনফুসিয়স ও লাওৎসের স্মৃতিরক্ষার জন্য চীন দেশে অনেক মন্দির নির্মিত হয়। হিন্দুদের কাছে যেমন বেদ ও খৃষ্টানদের কাছে যেমন বাইবেল, তেমনি এঁদের লিখিত গ্রন্থগুলি চীনদেশবাসী খুবই শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখে। চীনের লোকেরা যে এত ভদ্র, এত মার্জিতব্যবহারসম্পন্ন ও শিক্ষাদীক্ষায় এত উন্নত, তা অনেকখানিই কনফুসিয়সের প্রভাবে।

 ভারতবর্ষে ছিলেন মহাবীর ও বুদ্ধ। আজ যাকে আমরা জৈনধর্ম বলি তার প্রবর্তন করেন মহাবীর। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল বর্ধমান, তাঁর মহত্ত্বের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য তাঁকে তাঁর শিষ্যেরা মহাবীর উপাধি দিয়েছিল। বেশির ভাগ জৈন থাকে পশ্চিম-ভারত ও কাথিয়াওয়ার-অঞ্চলে। আজকাল তাদের প্রায়ই হিন্দু বলে ধরা হয়। কাথিয়াওয়ারে ও রাজপুতানার আবুপর্বতে কতকগুলি অতি সুন্দর জৈনমন্দির আছে। জৈনেরা অহিংসাকে পরম ধর্ম বলে মনে করে; কোনো প্রাণীকে আঘাত করা বা কষ্ট দেওয়া তাদের চোখে পাপ। শুনে আশ্চর্য হবে যে মহাবীরের সমসাময়িক গ্রীসের পাইথাগোরাস ছিলেন নিরামিষভোজী, তাঁর শিষ্য ও চেলাদের পক্ষে আমিষভক্ষণ নিষিদ্ধ ছিল।

 এবার গৌতমবুদ্ধের কথায় আসা যাক। তুমি তো জানোই, তিনি ছিলেন ক্ষত্রিয়, একজন রাজকুমার। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল সিদ্ধার্থ। সিদ্ধার্থের জননীর নাম মায়া। বুদ্ধের বংশপরিচয়ে রাজরানী মায়ার যে বর্ণনা আছে সেটা এখানে তুলে দিই: “সর্বলোকপূজিতা, নবচন্দ্রমাসদৃশ রূপবতী, বসুমতীর মতো ধীরা, বিকশিত পদ্মের মতো নির্মলা ছিলেন মহীয়সী মায়াদেবী।”

 সিদ্ধার্থের বাবা আর মা তাঁকে আরাম ও বিলাসিতার মধ্যে লালনপালন করতেন। সর্বদা চেষ্টা করতেন যাতে দুঃখদুর্দশার দৃশ্য তাঁকে কখনও না দেখতে হয়। কিন্তু অসম্ভবকে সম্ভব করা যায় কী করে। কিংবদন্তীতে জানা যায়, সিদ্ধার্থ দারিদ্র্য, দঃখ, কষ্ট এবং মৃত্যু সবই দেখেছিলেন এবং এইসব দৃশ্য দেখে তাঁর মনে গভীর বেদনার সঞ্চার হয়। রাজপ্রাসাদের সুখ তাঁর আর ভালো লাগল না। ভোগবিলাসের আড়ম্বর, সুন্দরী স্ত্রীর ভালোবাসা-সব-কিছুই তাঁর কাছে অকিঞ্চিৎকর মনে হতে লাগল। তিনি মানুষের দুঃখের কথা এবং কী উপায়ে সেই দঃখ দূর করা যায়, সেই কথা ভাবতে লাগলেন। আর তিনি চুপ করে বসে থাকতে পারলেন না; একদিন গভীর রাত্রে রাজপুরী ত্যাগ করে, প্রিয়পরিজন সবাইকে ত্যাগ করে রাজার কুমার বেরিয়ে পড়লেন। যেসব প্রশ্ন তাঁর মনে উদয় হয়েছে তার জবাব খুঁজে বার করতে হবে। কত দিন ধরে শ্রান্তি ক্লান্তি তুচ্ছ করে তিনি সন্ধান করে বেড়ালেন। অবশেষে অনেক বৎসর পর, গয়ার কাছে একটি অশ্বত্থগাছের তলায় দীর্ঘ তপস্যার পর তিনি প্রজ্ঞা লাভ করেন এবং সিদ্ধ হন। সেই থেকে সিদ্ধার্থের নাম হয় ‘বুদ্ধ’, অর্থাৎ জ্ঞানী। যে গাছটির তলায় তিনি সাধনা করেছিলেন তার নাম ‘বোধিবৃক্ষ’। কাশীর কাছে সারনাথের উদ্যানে বুদ্ধ সর্বপ্রথম তাঁর ধর্ম প্রচার করেন। তাঁর ধর্মের মূল কথা হল সৎভাবে জীবনযাপন করার পথনির্দেশ করা। দেবতার উদ্দেশে কোনো জীবকে বলি দেওয়া তিনি অন্যায় মনে করতেন। তিনি বলতেন, যদি বলি দিতে হয় তো রাগ দ্বেষ ঘৃণা প্রভৃতি মোহকেই বলি দেওয়া উচিত।

 বুদ্ধের আবির্ভাব যখন হয় সে সময়ে ভারতের প্রচলিত ধর্ম ছিল বৈদিক ধর্ম। তখন থেকেই এই ধর্মের অবনতি শুরু হয়ে গেছে। ব্রাহ্মণেরা যাগযজ্ঞ, পূজাপার্বণ, অন্ধ কুসংস্কার দ্বারা সত্যধর্মকে কলুষিত করেছে। আর তা তো করবেই, কারণ পূজা যত হয় ততই ব্রাহ্মণদের দক্ষিণা মেলে। ভিন্ন ভিন্ন জাতির মধ্যে ভেদ তীব্রতর হল। জপতপ মন্ত্রতন্ত্র প্রভৃতি কুসংস্কারের ভয় দেখিয়ে স্বার্থান্বেষী পুরোহিতের দল সমাজের নিম্নস্তরের লোকদের মন আচ্ছন্ন করে ফেলল। এইভাবে দেশের জনসাধারণকে নিজেদের বশে এনে ব্রাহ্মণেরা ক্ষত্রিয়দের রাজশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চেষ্টা করল। যখন এই দুই উচ্চ জাতির মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে, বুদ্ধ ঠিক সেই সময় বৈদিক ধর্মের অনাচার ও পুরোহিতদের যথেচ্ছাচারের বিরূদ্ধে দাঁড়ালেন। মানুষ যাতে সৎভাবে জীবনযাপন করে, পূজা বলি প্রভৃতি নিরর্থক কাজ থেকে বিরত হয়ে যাতে তারা ভালো কাজে আত্মনিয়োগ করে, তারই জন্য চেষ্টা করেছিলেন বুদ্ধদেব। তাঁর শিক্ষাকে যারা জীবনের রত হিসাবে গ্রহণ করল তাদের বলা হত ভিক্ষু ও ভিক্ষুণী। এই ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের নিয়ে তিনি তাঁর ‘সংঘ’ গঠন করলেন।

 অনেক কাল একটি বিশেষ ধর্ম বলে বুদ্ধের ধর্ম ভারতে স্বীকৃত হয় নি। এর পর আমরা দেখতে পাব কেমন করে এই ধর্ম দেশময় ছড়িয়ে পড়ল ও কিছু কাল পরে আবার কেমন সমস্ত দেশ থেকেই যেন বিলুপ্ত হয়ে গেল। একদিকে সিংহল থেকে আরম্ভ করে সুদূর চীন দেশ অবধি বৌদ্ধধর্ম তার প্রভাব বিস্তার করল, তেমনি আবার অন্যদিকে বুদ্ধের জন্মভূমি এই ভারতে বুদ্ধের ধর্ম শেষ পর্যন্ত ব্রাহ্মণ্যধর্ম অথবা হিন্দুধর্মের অঙ্গীভূত হয়ে গেল। তবে এ কথা সত্য যে, এককালে ব্রাহ্মণ্যধর্মের উপর বৌদ্ধধর্ম প্রচুর প্রভাব বিস্তার করেছিল, ক্রিয়াকর্ম যাগযজ্ঞের অনেকগুলি কুসংস্কার দূর করতে পেরেছিল—সেটাও কম কথা নয়।

 বর্তমান জগতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক লোকের ধর্ম হল বৌদ্ধধর্ম। মাথাগুণতির হিসাবে বৌদ্ধধর্মের পরেই স্থান হল খৃষ্টধর্ম, ইসলাম ও হিন্দুধর্মের। ইহুদি, শিখ ও পার্শিদের ধর্মও উল্লেখযোগ্য। ধর্ম ও ধর্মগুরুরা ইতিহাসে একটা বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন, এঁদের বাদ দিয়ে ঐতিহাসিক আলোচনা সম্পূর্ণ হতে পারে না। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, বড়ো বড়ো ধর্মের প্রবর্তক যাঁরা তাঁরা পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় মানুষদের মধ্যে অন্যতম। তাঁদের শিষ্য ও অনুগামীরা অনেক সময় গুরুর মহান আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। ইতিহাসে আমরা প্রায়ই লেখি যে, যে ধর্ম আমাদের উন্নতি ও মঙ্গলের পথে অগ্রসর করে দেবার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই ধর্মই আমাদের পাশবিকতার নিম্নতম স্তরে নামিয়ে নিয়ে গেছে। জ্ঞানের বিশুদ্ধ জ্যোতির জায়গায় এনেছে অজ্ঞানের অন্ধকার, মনকে উদার মুক্তির প্রশস্ত ক্ষেত্রে উপনীত না করে তাকে সংকীর্ণ, অনুদার ও পরধর্মের প্রতি অসহিষ্ণু করেছে। ধর্মের নামে একদিকে অনেক বড়ো বড়ো কাজ হয়েছে। অপরদিকে আবার লক্ষ লক্ষ লোকের প্রাণনাশ প্রভৃতি কত-যে পাপ সাধিত হয়েছে তারও ইয়ত্তা নেই।

 তা হলেই মনে হয়, ধর্ম নিয়ে কী করা উচিত? কারও কারও কাছে ধর্ম মানেই স্বর্গ কিংবা ওই ধরনের একটা পরলোক। স্বর্গপ্রাপ্তির আশায় তারা ধর্মানুষ্ঠান করে। এ যেন জিলিপির মতো কোনো-একটা মিষ্টি জিনিষের লোভে দুষ্টু ছেলের লক্ষ্মী হয়ে থাকা। সচরাচর ভদ্রবাড়ির সন্তানেরা তো এরকম করে না। সুতরাং ভেবে দেখো, পরিণতবয়স্কেরা যদি এরকম কাজ করতে শুরু করেন তা হলে সেটা কীরকম হাস্যকর হয়। আসলে জিলিপির প্রতি লোভ ও স্বর্গের প্রতি লোভের মধ্যে খুব বেশি তফাত নেই। লোভী অল্পবিস্তর আমরা সকলেই। কিন্তু আমরা ছেলেমেয়েদের এমনভাবে মানুষ করতে চাই যাতে তারা নির্লোভ হয়, নিঃস্বার্থ হয়। আদর্শের ক্ষেত্রে স্বার্থটা বড়ো হয়ে উঠলে চলে না। তা যদি হয় তা হলে জীবনকে বড়ো আদর্শের অনুগামী করে গড়ে তোলা যায় না।

 আমরা সকলেই নিজেদের কীর্তির ফলাফল নিজের চোখে দেখে নিতে চাই। এটা মানুষের স্বভাবসিদ্ধ। কিন্তু দেখতে হবে আমাদের লক্ষ্যটা কোন দিকে? আমরা কি কেবল নিজেদের নিয়ে বিব্রত থাকি—নিজেদের মঙ্গলটুকু চাই? সমাজের, দেশের, সমগ্র মানবজাতির যাতে মঙ্গল হয়—সেটা আমরা চাই কি? দশের মঙ্গলেই তো আমাদেরও মঙ্গল। কিছুদিন আগে আমার একটি চিঠিতে একটি সংস্কৃত শ্লোকের উল্লেখ করেছি। সেই শ্লোকটির তাৎপর্য হল এই যে, ব্যক্তি পরিবারের কাছে, পরিবার সমাজের কাছে ও সমাজ দেশের কাছে নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন করবে। আজ ভাগবত থেকে একটি শ্লোকের অনুবাদ দিচ্ছি: “আমি অষ্টসিদ্ধিসংযুক্ত পরমা শান্তি চাই না; পুনর্জন্মের দুঃখ থেকে নিবৃত্তি—তাও আমার কাম্য নয়। জীবজগতের সমস্ত ক্লেশ আমি বরণ করে নিতে চাই, তাদের দুঃখ নিজের বলে স্বীকার করে আমি তাদের দুঃখ মোচন করতে চাই।”

 এক ধর্মের লোক বলে এই, অন্য ধর্মের লোক বলে আর। পরস্পর পরস্পরকে দোষ দেয়, বলে নির্বোধ, বলে দুষ্ট। এদের মধ্যে সত্য কথা বলে কে? চক্ষুকর্ণের প্রমাণের বাইরের বিষয় নিয়ে যখন কারবার তখন এদের মধ্যে বিবাদভঞ্জন করা সহজসাধ্য নয়। বিজ্ঞজনের মতো এদের এইসমস্ত কথা আলোচনা করাই বেয়াদবি। মতামত নিয়ে যখন মাথা ভাঙাভাঙি হয় তখনই বিপদ। আমরা বেশির ভাগ লোকই সংকীর্ণমনা, জ্ঞানবুদ্ধিও আমাদের সীমাবদ্ধ। সবটুকু সত্য আমরা জেনে ফেলেছি, এ বিশ্বাসটা আস্পর্ধাবিশেষ। সেই সত্য জোর করে যখন অন্য লোককে স্বীকার করাতে চেষ্টা করি তখন সেটা আরও শোচনীয় হয়ে ওঠে। সত্য কারও একচেটিয়া নয়। ফলকে কেউ গাছ বলে ভ্রম করে না। কেউ কেবল যদি ফলটাই দেখে, কারও কাছে যদি পাতা কিংবা কাণ্ডটাই বড়ো হয়ে দেখা দেয়, তা হলে তারা কেবল গাছের অংশবিশেষ দেখেছে। বিশেষ বিশেষ অংশকে সমগ্র গাছ বলে ভুল করা ও তাই নিয়ে পরস্পরের মধ্যে মারামারি করা—এর চাইতে বোকামি আর কিছুই হতে পারে না।

 দুঃখের বিষয়, পরলোকের প্রতি আমার তেমন অনুরাগ নেই। ইহলোকে আমার কী করা উচিত এইটেই আমার কাছে সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন। বর্তমানের পথটা আমি যদি ঠিকমতো দেখতে পাই তা হলেই ব্যস—তার বেশি কিছুতে আমার দরকার নেই। এখানকার কাজ ঠিকমতো করে চলতে পারি যদি তা হলে কী হবে আমার পরলোকের কথা ভেবে।

 বড়ো হয়ে নানা ধরনের লোক দেখতে পাবে—কেউ ধর্ম নিয়ে থাকে, কেউ ধর্মের তোয়াক্কা করে না, কেউ আবার দুদিককারই আতিশয্য পরিহার করে চলে। অনেক বড়ো বড়ো ধর্মমন্দির ও ধর্ম প্রতিষ্ঠান আছে, প্রচুর তাদের অর্থসম্পত্তি, প্রচুর ক্ষমতা। কখনও তারা সদুদ্দেশ্যে তাদের অর্থ ও ক্ষমতা প্রয়োগ করে, কখনও-বা মন্দ কাজে। অনেক ধার্মিক লোক আছে যারা ভালো লোক বলে সকলের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে, আবার অনেক ভণ্ড বদমাইশ আছে যারা ধর্মের নাম করে মানুষ ঠকিয়ে খায়। এসমস্ত দেখে-শুনে তোমার নিজের পথটি বেছে নিতে হবে। অন্যদের উদাহরণ থেকে অনেক-কিছু শেখা যায় সত্য, কিন্তু ঠেকে শেখা কিংবা নিজের চেষ্টায় শেখাটাই সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা। কতকগুলি সমস্যা আছে যার সমাধান আমাদের নিজেদেরই করতে হয়, তা ছাড়া গতি নেই।

 চট করে একটা মতামত স্থির করে বোসো না যেন। একটা বড়োরকমের সিদ্ধান্তে পৌঁছবার আগে নিজেকে নানা দিক থেকে তৈরি করে নিতে হয়। নিজের ভাবনা নিজে ভেবেচিন্তে, কর্তব্যাকর্তব্য নিজেই নির্ধারণ করা—একশোবার উচিত। কিন্তু সবাই তা পারে না। নবজাত শিশু তার ভালো-মন্দ বুঝে কাজ করতে পারে কি? এমন অনেকে আছে যারা বয়সে প্রবীণ হলেও বুদ্ধিশুদ্ধিতে প্রায় কচি ছেলের মতো।

 অন্যান্য দিনের চেয়ে এ চিঠি অনেক বড়ো হয়ে গেল। এত লম্বা চিঠি পড়তে তোমার হয়তো ভালো লাগবে না। ধর্ম বিষয়ে আমার বক্তব্যগুলো বলে আমি খালাশ। আজ যদি আমার সব কথা তুমি বুঝতে নাও পারো, তাতে কিছু আসে যায় না। কিছুদিন পর আপনা থেকেই বুঝতে পারবে।

  1. জরথুস্ট্র সম্ভবত খৃষ্টপূর্ব অষ্টম শতকে বর্তমান ছিলেন।