বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/খৃষ্টানদের ধর্মযুদ্ধ

উইকিসংকলন থেকে

৬২

খৃষ্টানদের ধর্মযুদ্ধ

১৯শে জুন, ১৯৩২

 কিছুকাল আগে লেখা আমার একটি চিঠিতে (৫৭ নম্বর) আমি তোমায় লিখেছিলাম যে, খৃষ্টান-ধর্মগুরু পোপ এবং তাঁর অধীনম্প রোমান ক্যাথলিক ধর্ম সমিতি, খৃস্টানদের তীর্থক্ষেত্র জেরুজালেম শহর পুনরধিকার করবার জন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে একটি ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করেন। সেলজুক তুর্কিদের ক্রমবর্ধমান শক্তি ইউরোপের পক্ষে আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল—সবচেয়ে ভয় পেয়েছিল কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লের লোকেরা, কারণ তুর্কিদের রাজ্য ছিল কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লের পাশেই। তুর্কিদের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় খৃষ্টানদের ক্রুদ্ধ হবার আর-একটি কারণ হল এই যে তখন অনেক খৃষ্টান তীর্থযাত্রীই অনুযোগ করত, জেরুজালেম কিংবা প্যালেস্টাইন-যাত্রীদের প্রতি তুর্কিদের ব্যবহার নাকি ভালো ছিল না। এক দিকে এই ভয়, অন্য দিকে বিজাতীয়ের প্রতি রাগবশত, ‘ক্রুসেড’ বা ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। পোপ ও তাঁর অনুগামী ধর্মপ্রতিষ্ঠান ইউরোপের খৃষ্টধর্মাবলম্বী সমস্ত লোককে ডাক দিয়ে বললেন যে, পবিত্র জেরুজালেম শহর তুর্কিদের কবল থেকে উদ্ধার করতে হবে।

 এইপ্রকার অবস্থায় ১০৯৫ খৃস্টাব্দে ধর্মযুদ্ধের শুরু হয়। প্রায় দেড় শো বছরেরও বেশি কাল ধরে খৃষ্টধর্মের সঙ্গে ইসলামের, ক্রুশের সঙ্গে ঈদের চাঁদের সংঘাত চলতে থাকে। মাঝে মাঝে বিরতি ঘটলেও এই যুদ্ধে প্রায় একটানা ভাবেই চলে এবং কাতারে কাতারে খৃষ্টান ধর্মযোদ্ধারা ইউরোপ থেকে প্যালেস্টাইনে আসেন ও তাঁদের তীর্থক্ষেত্র পুনরুদ্ধার করবার জন্য দলে দলে প্রাণ উৎসর্গ করেন। এই দীর্ঘকাল যুদ্ধের ফলে খৃস্টানদের উল্লেখযোগ্য কোনো লাভ হয় নি। অল্পদিনের জন্য জেরুজালেম তাঁদের দখলে এসেছিল বটে, কিন্তু তুর্কিরা সেই-যে আবার তাদের হৃতরাজ্য অধিকার করল, তার পর থেকে তাদের আর স্থানভ্রষ্ট করা যায় নি। ধর্মযুদ্ধের মোট ফলাফল হল, লক্ষ লক্ষ খৃষ্টান ও মুসলমানদের দুঃখ দুর্গতি ও মৃত্যু। অবিরাম রক্তের স্রোতে ভেসে গিয়েছিল এশিয়া মাইনর ও প্যালেস্টাইন।

 এই দুঃসময়ে বোগদাদ-সাম্রাজ্যের দশা কীরূপ ছিল দেখা যাক। আব্বাসি মুসলমানেরা তখনও বোগদাদে আধিপত্য করছেন, তাঁদের নেতাই ছিলেন খলিফা অর্থাৎ মুসলমানদের ধর্মগুরু। কিন্তু খলিফারা তখন নামেই ছিলেন নেতা, আসলে তাঁদের হাতে খুব বেশি শক্তি ছিল না। আগেই আমরা পড়েছি যে, আব্বাসি সাম্রাজ্য ভেঙে খান্‌খান্‌ হয়ে পড়ে, প্রাদেশিক শাসনকর্তারা স্ব স্ব-প্রধান হয়ে পড়েন। বার বার ভারত আক্রমণ করেছিলেন সেই-যে গজনির মাহ্‌মুদ—তিনি ছিলেন একজন অতি পরাক্রান্ত নৃপতি। তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গেলে তিনি খলিফাকে পর্যন্ত শাসাতে দ্বিধা করতেন না। বোগদাদ শহরের মধ্যেও তুর্কিরাই ছিল সত্যকার প্রভুস্থানীয়। ইতিমধ্যে আর-এক দল তুর্কি (তাদের বলা হয় সেলজুক তুর্কি) দ্রুত তাদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে এবং চতুর্দিকে তাদের রাজ্যবিস্তার করতে আরম্ভ করে। বিজয়ী বীরের মতো এরা একেবারে কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লের দুয়ারে গিয়ে হানা দেয়। তবু এখনও পর্যন্ত আব্বাসি খলিফাই মুসলমানদের ধর্মগুরু হয়ে রইলেন—যদিচ সত্যকার রাজনৈতিক ক্ষমতা তাঁর কিছুই ছিল না। সেলজুক-অধিনায়কদের তিনি সুলতান উপাধি দিয়ে খালাস। এই সুলতানরাই ছিলেন দেশের হর্তা-কর্তা-বিধাতা। খৃষ্টান ধর্মযোদ্ধাদের যুদ্ধ করতে হয় এই সেলজুক সুলতান এবং তাঁদের অনুচরদের বিরুদ্ধে।

 ক্রুসেড অর্থাৎ ধর্মযুদ্ধের ফলে ইউরোপের খৃষ্টানরা খৃষ্টীয় জগৎকে অন্য ধর্মীদের জগৎ থেকে যেন পৃথক করে দেখতে শুরু করলেন। সারা ইউরোপ একটি জায়গায় একত্র মিলল—সকলেরই লক্ষ্য ছিল কীভাবে বিধর্মীদের হাত থেকে ‘পুণ্যভূমি’ প্যালেস্টাইন উদ্ধার করা যায়। এই একই ব্রতে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকে গৃহ পরিবার এমনকি দেশ পর্যন্ত ত্যাগ করে, এই মহান উদ্দেশ্য সফল করবার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিল। কেউ কেউ গিয়েছিল একটা বড়ো আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, কেউ গিয়েছিল তাদের পাপ স্খালন করতে। পোপ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ধর্মযোদ্ধাদের পূর্বকৃত অপরাধ সবই ভগবান যিশু মার্জনা করবেন। এ ছাড়া ইউরোপের এই ধর্মযুদ্ধে যোগ দেবার একটি কারণ ছিল এই যে, রোম চেয়েছিল সর্বকালের জন্য কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লের অবিসংবাদিত প্রভু হয়ে বসতে। তোমার হয়তো মনে আছে, কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লে খৃষ্টধর্মের যে সমাজ ছিল তারা ছিল ক্যাথলিক সমাজ থেকে আলাদা। এই কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লের সমাজকে বলা হত সনাতন (orthodox) সমাজ। এদের সঙ্গে ক্যাথলিক সমাজের একবারে যেন জন্মগত বিরোধ-বিদ্বেষ ছিল, পোপকে এরা দু চোখে দেখতে পারত না; মনে করত, ইনি যেন উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন। পোপ ঠিক করেছিলেন, কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লের এই অহমিকা চূর্ণ করবেন; ভেবেছিলেন, কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্ একবার হাতের মুঠোর মধ্যে এলে সেখানকার সমাজের জায়গায় ক্যাথলিক সম্প্রদায় গড়ে তাঁর প্রভুত্ব বজায় রাখা শক্ত হবে না। ধর্মযুদ্ধের অছিলায় তিনি বিধর্মী তুর্কিদের আক্রমণচ্ছলে সত্য সত্য চেয়েছিলেন তাঁর অনেক দিনের স্বপ্ন সফল করে তুলতে। একেই বলে রাজনীতির কুটনৈতিক চাল। রোম ও কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লের এই বিরোধের কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। ধর্মযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে প্রায়ই আমাদের এই ঘটনার উল্লেখ করতে হবে।

 ধর্মযুদ্ধ ঘটানোর আর একটা কারণ হল, ব্যবসাবাণিজ্যের উন্নতি। ভেনিস জেনোয়া প্রভৃতি বন্দরের বাসিন্দা বড়ো বড়ো বণিকেরা ভেবেছিল যুদ্ধ বাধিয়ে তাদের মন্দা ব্যবসা আবার ফলাও করে ফাঁপিয়ে তুলতে পারবে। ইউরোপের সঙ্গে পূর্বদেশের বাণিজ্যসভার যেসব রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করত তার অনেকগুলিই সেলজুক তুর্কিরা দিয়েছিল বন্ধ করে।

 জনসাধারণ অবশ্য অন্তর্নিহিত এই কারণগুলি সম্বন্ধে কিছু জানত না। কেউ তাদের বলেন নি ধর্মযুদ্ধের প্রকৃত কারণ কী। রাজনীতি যাদের পেশা তাঁরা সত্যকার কারণ অগোচরে রেখে ধর্ম সত্য ন্যায়বিচার প্রভৃতির বুলি কপচান। ক্রুসেডের বেলা ঠিক তাই হয়েছিল। আজও ঠিক তাই হয়। সেকালে রাজনীতিকেরা এইভাবে প্রজাসাধারণকে ভাঁওতা দিতেন, সেই একই ধরনের বড়ো কথার প্রবঞ্চনা আজও চলছে।

 ধর্মযুদ্ধে যোগ দেবার জন্য দলে দলে লোক এগিয়ে এল। তাদের কেউ কেউ ছিলেন সত্যকার ভালো ও ধর্মপ্রাণ লোক, আবার কেউ কেউ এসেছিল নিছক লুটতরাজের লোভে। পুণ্যাত্মা লোকদের পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল যুদ্ধ করতে এমন-সব চোর গুণ্ডা বদমাইশ যারা কোনোরকম পাপ কাজ করতেই কুণ্ঠা বোধ করত না। ইতিহাস পড়লে দেখি এই ধর্ম (?) যোদ্ধাদের মধ্যে অনেকে এমন সব নীচ ও জঘন্য অপরাধ করেছে যার কথা শুনলেও কানে আঙুলে দিতে হয়। কেউ কেউ এমনভাবে লুটতরাজ ও অন্যানা পাপকর্মে লিপ্ত ছিল যে তারা প্যালেস্টাইনের ধারে কাছেও পৌঁছতে পারে নি। পথে যেতে যেতে কত যে নিরপরাধ ইহুদি এমনকি খৃস্টানদের পর্যন্ত তারা নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল তার ইয়ত্তা নেই। এদের অমানুষিক অত্যাচারে তিক্ত বিরক্ত হয়ে অনেক খৃস্টান-দেশের কৃষাণশ্রেণীর লোক ক্রুসেড-অভিযানকারী সৈন্যদের আক্রমণ করেছে। কাউকে প্রাণে মেরেছে, কাউকে-বা দেশের জমি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।

 শেষ পর্যন্ত ধর্মযোদ্ধাদের একটি দল নর্মাণ্ডিদেশের বুইলোঁ-বাসী গড্‌ফ্রে-নামক একজন সেনানায়কের নেতৃত্বে প্যালেস্টাইনে গিয়ে পৌঁছয়। তাদের আক্রমণ তুর্কিরা প্রতিরোধ করতে না পারায় জেরুজালেম খৃষ্টান-কবলিত হয়। তার পর এক সপ্তাহ ধরে চলে এক অতি বীভৎস হত্যাকাণ্ড। একজন ফরাসি প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, “মসজিদের সামনে রক্তের নদী বয়ে গিয়েছিল। রক্তের স্রোতে হাঁটু অবধি ডুবে যেতে লাগল। রক্তের নদী ঘোড়ার লাগাম অবধি উঠেছিল।” গড্‌ফ্রে জেরুজালেমের রাজা হয়ে বসলেন।

 সত্তর বছর পরে মিশরের সুলতান সালাদিন খৃষ্টানদের হাত থেকে জেরুজালেম পুনরধিকার করে নেন। এই পরাজয়ের ফলে ইউরোপবাসী আবার বিচলিত ও উত্তেজিত হয়ে উঠল, পর পর আবার কয়েকটি ধর্মযুদ্ধের অভিযান এল ইউরোপ থেকে। এবার স্বয়ং খৃষ্টান রাজারাজড়ারা যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। কিন্তু যুদ্ধে কৃতকার্য হবেন কী, পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে প্রাধান্য নিয়ে কলহ বিবাদ করতে লাগলেন। ধর্মযুদ্ধের নামে এমন নীচতা নৃশংসতা, এমন হেয় জঘন্য মনোবৃত্তি সচরাচর দেখা যায় না। কখনও-বা এই নিদারুণ বীভৎসতার ঊর্ধ্বে উঠেছে মানুষের উচ্চতর প্রবৃত্তি, শত্রু শত্রুর সঙ্গে ন্যায়সংগত ও শিষ্টাচারসংগতভাবে যুদ্ধ করেছে। ইউরোপীয় রাজাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ইংলণ্ডের রাজা রিচার্ড। শারীরিক শক্তি ও সাহসের জন্য লোকে তাঁর নাম দিয়েছিল করে ‘কূর দ্য লিয়ঁ’ অর্থাৎ পুরুষকেশরী। সালাদিন নিজেও ছিলেন পরাক্রান্ত যোদ্ধা, শত্রুর প্রতি তাঁর আচরণ ছিল সত্যকার বীরের আচরণ। এইজন্য খৃষ্টান যোদ্ধারা পর্যন্ত তাঁকে সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর সম্বন্ধে একটি চমৎকার গল্প আছে: প্যালেস্টাইনের প্রখর গ্রীষ্মে রিচার্ড একবার কাতর হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর অসুস্থতার সংবাদে সালাদিন রিচার্ডের জন্য সদ্য সদ্য পাহাড় থেকে আনীত বরফ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আজকাল আমরা যেমন কলের সাহায্যে কৃত্রিম উপায়ে বরফ তৈরি করে থাকি তখনকার দিনে তা করা যেত না। সুতরাং বুঝতেই পারো, ক্ষিপ্রগতি হরকরা পাঠিয়ে সেই বরফ উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে অতি কষ্টে আহরণ করে আনতে হয়েছিল।

 ক্রুসেড সম্বন্ধে অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে। সার ওয়াল্টার স্কটের ‘স্ট্যালিসম্যান’ বইটিতে তুমি এই ধরনের গল্প কিছু কিছু পড়ে থাকবে।

 খৃষ্টান যোদ্ধাদের একটা দল গিয়ে কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্ অধিকার করে নেয়। গ্রীসের পূর্বসাম্রাজ্যের অধীশ্বরকে কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল থেকে বহিষ্কৃত করে সেখানে তারা রোমান রাজ্য ও রোমের ক্যাথলিক ধর্ম প্রতিষ্ঠা করে। এখানেও তুমুল রক্তপাত হয়, শহরের একটি অংশ আক্রমণকারীরা অগ্নিদগ্ধ করে ধ্বংস করে। এই রোমান রাজ্যও কিন্তু বেশি দিন টেঁকে নি। দুর্বল হলেও পূর্ব-সাম্রাজ্যের গ্রীকরা আবার ফিরে আসে এবং কিঞ্চিদধিক পঞ্চাশ বৎসর রাজত্ব করার পর রোমানদের তারা কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্ থেকে বহিষ্কৃত করে দেয়। কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্‌কে কেন্দ্র করে গ্রীকদের এই পূর্ব-সাম্রাজ্য আরও দু শো বছর, অর্থাৎ ১৪৫৩ অব্দ অবধি, টিঁকে ছিল। ১৪৫৩ অব্দে তুর্কিদের হাতে এই বিখ্যাত শহরটির পতন ঘটে।

 রোমান ক্যাথলিক সম্প্রদায় ও পোপের সত্যকার অভিপ্রায় ছিল কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লে তাদের অধিকার বিস্তৃত করা; ধর্মযোদ্ধাদের দ্বারা এই শহর অধিকার করানো থেকেই তাঁদের এই গূঢ় অভিপ্রায় বোঝা যায়। একদিন খুব সংকটের মুহূর্তে এই শহরের গ্রীকরা তুর্কিদের আক্রমণ ঠেকাবার জন্য রোমের সাহায্য ভিক্ষা করেছিল। কিন্তু ধর্মযোদ্ধাদের তারা মনে মনে একটুও পছন্দ করত না, যুদ্ধে অতি অল্পই সাহায্য করেছিল তারা।

 এই ধর্মযুদ্ধের সবচেয়ে মর্মান্তিক ব্যাপার হল, ইতিহাসে যাকে বলা হয় বালকদের ধর্মযুদ্ধ। ইউরোপময় এই উত্তেজনা ও উন্মাদনার ফলে ফ্রান্স ও জর্মন থেকে বহু সংখ্যক কিশোর বয়স্ক বালক তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে প্যালেস্টাইনে যাবার জন্য এগিয়ে আসে। তাদের মধ্যে কেউ গেল রাস্তায় মারা, কেউ গেল পথ হারিয়ে। যা হোক, বেশির ভাগ তো শেষ পর্যন্ত পৌঁছল গিয়ে মার্সাই বন্দরে। সেখানে এই সরলমতি বালকদের উৎসাহের সুযোগ নিয়ে বদমাইশ লোকেরা তাদের নানাভাবে প্রবঞ্চিত করে। এইসব বদমাইশেরা ক্রীতদাসের ব্যবসা করত; পুণ্যভূমি জেরুজালেমে নিয়ে যাবার ছলে এরা এই বালকদের জাহাজে চাপিয়ে নিয়ে গেল মিশরে এবং সেইখানে বিক্রি করল ক্রীতদাস ব’লে।

 প্যালেস্টাইন থেকে ফেরবার পথে ইংলণ্ডের রাজা রিচার্ড পূর্ব ইউরোপে তাঁর শত্রুদের কবলে বন্দী হন; অর্থের বিনিময়ে তিনি মুক্তি লাভ করেন। একবার প্যালেস্টাইনেই একজন ফরাসি-রাজা ধরা পড়েছিলেন, তিনিও বহু অর্থব্যয়ে শত্রুদের হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলেন। পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতি ফ্রেডরিক বার্বারোসা তো প্যালেস্টাইনের একটি নদীতে ডুবে মারাই যান। ধর্মযুদ্ধের নামে লোকের মনে যে কৌতূহল ও উৎসাহ ছিল ক্রমেই তা হ্রাস পেতে লাগল। লোকে ভাবল, যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। জেরুজালেম রয়ে গেল মুসলমানদের হাতে। কিন্তু ইউরোপের রাজারাজড়ারা জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করার জন্য আর ধনপ্রাণ নষ্ট করতে রাজি নন। সেই তখন থেকে প্রায় সাত শো বছর ধরে জেরুজালেম ছিল মুসলমানদের অধিকারে। এই মাত্র সেদিন, ১৯১৮ অব্দে মহাযুদ্ধের পর, তুর্কিদের হাত থেকে একজন ইংরেজ সেনাপতি জেরুজালেমের প্রভুত্ব হস্তগত করেন।

 পরবর্তীকালে একটি ধর্মযুদ্ধ হয় সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের সময়। সে এক মজার যুদ্ধ, তেমন যুদ্ধ পূর্বে কখনও হয় নি। আসলে এটাকে যুদ্ধ বলাই হয়তো ভুল। ফ্রেডরিক ছিলেন পবিত্র রোম সাম্রাজ্যের সম্রাট। যুদ্ধ করতে এসে তিনি করলেন মিশরের তদানীন্তন সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাৎকার, সাক্ষাতের ফলে উভয়ে উভয়ের সঙ্গে মিত্রতা পাতালেন। ফ্রেডরিক সাধারণ লোক ছিলেন না। যে কালে রাজাবাদশারা পড়াশুনোর ধার ধারত না সে কালে জন্মেও তিনি ছিলেন বহু ভাষাবিদ এমনকি আরবিভাষাও তিনি আয়ত্ত করেছিলেন। ‘পৃথিবীর আশ্চর্য মানুষ’ বলে তিনি পরিচিত ছিলেন। পোপকে তিনি বড়ো-একটা খাতির করতেন না, এজন্য পোপ তাঁকে একঘরে করে দেন। এতে অবশ্য তাঁর এমন কিছু ক্ষতি হয় নি।

 আখেরে ধর্মযুদ্ধের স্থায়ী ফল কিছুই দাঁড়ায় নি। তবে ক্রমাগত যুদ্ধের ফলে সেলজুক তুর্কিরা দুর্বল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া সেলজুক সাম্রাজ্যের বনিয়াদ দুর্বল হয়ে পড়ে সামন্ত প্রথা থাকার ফলে। বড়ো বড়ো সামন্তরাজারা নিজেদের স্ব-স্ব প্রধান বলে মনে করতেন। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া মারামারি তাঁদের লেগেই থাকত। এক-এক সময় অপর পক্ষকে হারিয়ে দেবার জন্য তাঁরা খৃষ্টানদের সহায়তা নিতেও দ্বিধা করেন নি। এই আভ্যন্তরিক দুর্বলতার জন্য খৃষ্টীয় ধর্মযোদ্ধারা মাঝে মাঝে তুর্কিদের হারিয়ে দিত। সালাদিনের মতো শক্ত শত্রুর পাল্লায় পড়লে খৃষ্টানরা পদে পদে পরাজিত হত।

 ইদানিং ক্রুসেড সবন্ধে ঐতিহাসিকেরা একটি নূতন মতবাদের অবতারণা করেছেন—এঁদের মধ্যে গ্যারিবল্ডির জীবনচরিতকার ইংরেজ লেখক জি. এম. ট্রেভলিন অন্যতম। তিনি যা বলেন তা বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য। ট্রেভলিন বলেছেন, “নূতন করে যখন ইউরোপের শক্তি জেগে উঠছে ঠিক সেই সময় এই ধর্মযুদ্ধগুলি সংঘটিত হয়। ধর্মের দিক থেকে ও শক্তি পরীক্ষার দিক থেকে এ যুদ্ধগুলি প্রাচ্যের দিকে পাশ্চাত্যের সহজাত আকর্ষণের বাহ্য পরিচয়। ইউরোপ পবিত্র দেবস্থান বিধর্মীদের হাত থেকে একেবারে উদ্ধার কোনোদিন করতে পারে নি, খৃষ্টান দেশগুলি একসূত্রে গাঁথবার স্বপ্নও তার সফল হয় নি। এ দিক থেকে ধর্মযুদ্ধের ইতিহাস ইউরোপের পক্ষে একটানা বিফলতার ইতিহাস। ইউরোপ এশিয়া থেকে যা নিয়ে গিয়েছিল তা হল সুকুমার কলা ও শিল্প, বিলাসব্যসনের উপকরণ, বিজ্ঞান, এবং বিবিধ বিষয়ে জানবার ও বোঝবার ইচ্ছা। ধর্মযুদ্ধের উদ্দীপনা জাগিয়েছিলেন যিনি সেই সাধু পিটার এর কোনোটাই অনুমোদন করতেন না।”

 ১১৯৩ অব্দে সালাদিনের মৃত্যুর পর আরব সাম্রাজ্যের যতটকু অবশিষ্ট ছিল তাও ভেঙেচুরে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। সর্বশেষ ধর্মযুদ্ধের তারিখ হল ১২৪৯ অব্দ। সেই বছর ফ্রান্সের রাজা নবম লুইএর নেতৃত্বে খৃষ্টানরা শেষবারকার মতো একবার লড়তে আসে। লুই পরাজিত হয়ে টুকরো টাকরা হয়ে যায়। পশ্চিম এশিয়ায় স্ব স্ব—প্রধান সামন্তদের বিবাদ-বিসংবাদের ফলে আরবদের হাতে বন্দী হন।

 ইতিমধ্যে পূর্ব ও মধ্য-এশিয়ায় এমন একটি ঘটনা ঘটে যার ফলে আরসব ঘটনা নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে। এই অঞ্চলে মঙ্গোলদের মধ্যে একজন প্রচণ্ড শক্তিশালী নেতার আবির্ভাব হয়—এই নেতাই হলেন চেঙ্গিস খাঁ। চেঙ্গিস খাঁর নেতৃত্বে মঙ্গোলরা সমস্ত পূর্বদেশ অধ্যুষিত করে পঙ্গপালের মতো এগিয়ে যেতে থাকে। খৃষ্টান ধর্মযোদ্ধা ও তার মুসলমান প্রতিপক্ষ সকলের মনে ত্রাসের সঞ্চার করে এই মঙ্গোল অভিযান ঝোড়ো হাওয়ার মতো সমস্ত দিগন্ত আবৃত করে এগিয়ে যেতে থাকে। এর পরের কোনো চিঠিতে তোমায় চেঙ্গিস খাঁ ও মঙ্গোলদের সম্বন্ধে বলব।

 চিঠি শেষ করার আগে একটা কথা বলে রাখি। মধ্য-এশিয়ার বোখারা শহরে তখনকার দিনে একজন খুব নামজাদা চিকিৎসক বাস করতেন। তাঁর খ্যাতি এশিয়া ও ইউরোপের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। এই আরব-চিকিৎসকের আসল নাম ছিল ইব্‌ন্ সিনা, কিন্তু ইউরোপে তিনি আবিসেন্না নামে পরিচিত হয়েছিলেন। তাঁকে সকলে ভিষক-সম্রাট উপাধি দিয়েছিল। ধর্মযুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার অব্যবহিত আগে ১০৩৭ অব্দে তিনি মারা যান।

 এত খ্যাতি ছিল বলেই আমি বেছে ইব্‌ন্ সিনার নাম উল্লেখ করলাম। একটা কথা মনে রেখো, আরব সাম্রাজ্যের যখন পড়তি অবস্থা সেই সময়েও পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার আরবসভ্যতার প্রাধান্য ক্ষুণ্ণ হয় নি। সালাদিনের মতো রাজা, যাঁর বেশির ভাগ সময় কেটেছে খৃষ্টানদের সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহ করে, তিনিও বহু বিদ্যায়তন ও চিকিৎসা-সদন প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন। তখনকার লোক ঠিক বুঝতে পারে নি এ সভ্যতার অকস্মাৎ পতন ঘটবে। এ পতনের পর আরব বহুদিন আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে নি। এই সর্বনাশের কারণ যারা সেই মঙ্গোলরা ইতিমধ্যে পূর্বদিক থেকে এগিয়ে আসছে চেঙ্গিস খাঁর নেতৃত্বে।