বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/খৃষ্টোত্তর হাজার বছর

উইকিসংকলন থেকে

৫৭

খৃষ্টোত্তর হাজার বছর

১১ই জুন, ১৯৩২

 আমরা এ পর্যন্ত যতদূর এগিয়েছি তাতে এখানটায় একটু থেমে চার দিকটা একবার তাকিয়ে নিলে হয়। আমরা কতদূর এসেছি, এখন কোন্‌খানটায় আছি, পৃথিবীর চেহারাটা এখন কেমন হয়েছে, একবার দেখলে হয়। এসো-না, আমরা আলাদীনের মন্ত্রঃপূত কার্পেটটায় বসে একবার সে যুগের দুনিয়াটা ধাঁ করে দেখে আসি।

 খৃষ্টযুগের প্রথম হাজার বছর আমরা পার হয়ে এসেছি। কোনো কোনো দেশের বেলায় হয়তো আর-একটু বেশিই এগিয়েছি, আবার কোনো দেশের বেলায় পিছিয়ে আছি, অর্থাৎ হাজার বছরের কথা এখনও বলা হয় নি।

 এশিয়ার চীনদেশে দেখছি তখন সুঙ-বংশ রাজত্ব করছে। সুবিখ্যাত তাঙ-বংশের রাজত্ব-কাল শেষ হয়েছে। সুঙদের আমলে দেশের ভিতরে চলছে আত্মকলহ, ওদিকে আবার উত্তর অঞ্চল থেকে খিতান নামে এক অসভ্য জাতি তাদের দেশ আক্রমণ করেছে। দেড় শো বছর পর্যন্ত তারা কোনোরকমে শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ করেছিল, কিন্তু শেষে এত দুর্বল হয়ে পড়ল যে বাধ্য হয়ে দেশরক্ষার জন্য তাতার বা কিন্ নামে অপর এক বর্বর জাতির কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে হল। কিন্‌রা সাহায্য করতে এসে সে দেশেই থেকে গেল, মাঝখান থেকে বেচারি সুঙদের জায়গা ছেড়ে দিয়ে দক্ষিণ-চীনে সরে পড়তে হল। সেখানে কোণঠাসা অবস্থায় আরও শ-দেড়েক বছর তারা রাজত্ব করল। এ সময়টাতে ও দেশে নানারকম শিল্পের খুব উন্নতি হয়। চিত্রবিদ্যা এবং চীনেমাটির দ্রব্যের প্রস্তুতপ্রণালী বিশেষভাবে প্রচলিত হয়েছিল।

 কোরিয়াতে কিছু কাল ভাগ-বাঁটোয়ারা আর দ্বন্দ্বের পর ১৩৫ খৃষ্টাব্দে একটা যুক্ত স্বাধীন রাজ্যের পত্তন হয়, সে রাজা স্থায়ী হল অনেক কাল, প্রায় সাড়ে চার শো বছর। চীনদেশের কাছ থেকে কোরিয়া তার সভ্যতা, শিল্প এবং রাজ্যশাসনপ্রণালীর অনেক উপাদান গ্রহণ করেছিল। তার আর জাপানের ধর্ম এবং আংশিকভাবে শিল্পও চীনদেশের মারফত ভারতবর্ষের থেকে পাওয়া। সুদূর প্রাচ্যে অবস্থিত জাপান, যেন এশিয়ার প্রহরীর মতো। বাকি জগৎটার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করছিল। সেখানে তখন ফুজিআরা-বংশের প্রাধান্য। সম্রাট কিছু দিন আগেও গোষ্ঠীপতির মতোই ছিলেন, ইদানীং তাঁর পদমর্যাদা কিছু বেড়েছিল, তা হলেও তাঁর ক্ষমতা এমন-কিছু ছিল না।

 মালয়েশিয়াতে ভারতীয় উপনিবেশগুলি সমৃদ্ধ হয়ে উঠছিল। কম্বোডিয়া আর তার রাজধানী আঙ্কোর তখন শক্তি ও উন্নতির শীর্ষে। সুমাত্রাতে শ্রীবিজয়া ছিল একটি বৃহৎ বৌদ্ধ সাম্রাজ্যের রাজধানী, সমস্ত প্রাচা দ্বীপগুলি তারই আয়ত্তাধীনে থেকে নিজেদের মধ্যে প্রচুর ব্যবসাবাণিজ্য চালাত। পূর্ব-যবদ্বীপ ছিল একটি স্বাধীন হিন্দু রাজা; অল্পদিন পরেই এটি প্রবল হয়ে উঠে শ্রীবিজয়ার সঙ্গে বাণিজ্য এবং বাণিজ্যলব্ধ ধনসম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা করে আধুনিক ইউরোপীয় জাতিদের মতো দারুণ যুদ্ধ বাধিয়ে দিল, আর শেষে তাকে জয় করে ধংস করে দিল।

 ভারতবর্ষের উত্তর এবং দক্ষিণদিক কিছুকাল ধরে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই ছিল, এখন ব্যবধান আরও বাড়ল। উত্তর ভারতে গজনির মাহ্‌মুদ বার বার হানা দিয়ে ধ্বংস এবং লুঠতরাজ চালাচ্ছিলেন। প্রচুর ধনরত্ন কেড়ে নিয়ে তিনি পাঞ্জাবকে নিজ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নিলেন। দক্ষিণে দেখতে পাচ্ছি, রাজরাজ আর তাঁর পুত্র রাজেন্দ্রের অধীনে চোলরাজ্য বিস্তৃত ও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। দক্ষিণ-ভারত জুড়ে তাঁদের প্রতিপত্তি, আরবসাগর আর বঙ্গোপসাগরে তাঁদের নৌবহর সদর্পে ঘুরে বেড়াত; সিংহল, দক্ষিণ-ব্রহ্ম এবং বাংলাদেশ আক্রমণ করে তাঁরা বিজয়-অভিযান চালিয়েছিলেন।

 মধ্য আর পশ্চিম-এশিয়ায় দেখতে পাচ্ছি, বোগদাদের আব্বাসি সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ। বোগদাদ কিন্তু তখনও সমৃদ্ধ, আর প্রকৃতপক্ষে নূতন সেলজুক-তুর্কি বাদশাদের আমলে তার ক্ষমতা বেড়েই চলেছে। কিন্তু পুরোনো সাম্রাজ্যটি ভেঙে খণ্ড খণ্ড রাজত্বে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। ‘ইসলাম’ বলতে তখন আর একটি সাম্রাজ্যকে বোঝাত না, ইসলাম হয়ে পড়েছে কেবলমাত্র বহু দেশ ও জাতির ধর্ম। আব্বাসি সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে গড়ে উঠেছে গজনি-রাজ্য, এ রাজ্যের বাদশা মাহ্‌মুদ এখান থেকেই সৈন্যসামন্ত নিয়ে হুড়মুড় করে ভারতবর্ষের উপরে এসে পড়লেন। সাম্রাজ্য ভেঙে গেলেও বোগদাদ কিন্তু বহৎ নগরীর মর্যাদা হারাল না, দূরদূরান্তর থেকে শিল্পী আর জ্ঞানীরা তখনও সেখানে আসতেন। বোখারা, সমরকন্দ, বল্‌খ্ এবং আরও কত বড়ো বড়ো প্রসিদ্ধ শহরও সে সময় মধ্য-এশিয়ায় গড়ে উঠেছিল। নিজেদের মধ্যে তাদের প্রচুর ব্যবসাবাণিজ্য চলত, বড়ো বড়ো ক্যারাভান এক শহর থেকে অন্য শহরে পণ্যদ্রব্য নিয়ে আসত।

 মঙ্গোলিয়াতে ও তার চার পাশে নূতন যাযাবর জাতিরা দলে ভারি আর শক্তিশালী হয়ে উঠল, দু শো বছর পরে তারাই সারা এশিয়ায় অভিযান চালিয়েছিল। মধ্য এবং পশ্চিম-এশিয়ায় তখন যারা শক্তিশালী জাতি তারাও যাযাবরদের জন্মভূমি মধ্য-এশিয়া থেকেই এসেছিল। চীনাদের তাড়া খেয়ে তারা পশ্চিমদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল; কিছু গিয়েছিল ইউরোপে, কিছু এসেছিল ভারতবর্ষে। দেখা গেল, তাড়া খেয়ে পশ্চিমে এসে সেলজুক তুর্কিরা বোগদাদের সাম্রাজ্যকে আবার সমৃদ্ধ করে তুলল এবং কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লে পূর্ব-রোম সাম্রাজ্যের উপর আক্রমণ করে তাকে হারিয়ে দিল।

 এশিয়ার সম্বন্ধে এটকুই। লোহিতসাগরের ওপারে ছিল মিশর, সে বোগদাদের অধীন নয়। সেখানকার বাদশা নিজেকে একজন স্বতন্ত্র খলিফা বলে প্রচার করেছিলেন। উত্তর-আফ্রিকাও তখন স্বাধীন মুসলমান রাজাদের অধীনে। জিব্রাল্টার প্রণালী পেরিয়ে স্পেনেও তখন কর্‌টুবা অথবা কর্‌ডোবা নামে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র ছিল, সেই রাষ্ট্রের অধিপতিকে বলা হত আমির। এর সম্বন্ধে পরে তোমাকে কিছু বলতে হবে। কিন্তু আব্বাসি খলিফারা যখন প্রতিপত্তিশালী হয়ে উঠিছিল তখনও যে স্পেন তাদের কাছে নতি স্বীকার করে নি, সে কথা তো তুমি আগেই শুনেছ। সে সময় থেকে স্পেন স্বাধীনই ছিল। অনেকদিন আগে তার ফ্রান্স জয় করার চেষ্টা চার্লস মটেল ব্যর্থ করে দেন। এবার স্পেনের উত্তরের খৃষ্টান রাজাগুলির মুসলমান রাজ্য আক্রমণ করার পালা; যতই সময় যেতে লাগল ততই তারা বেশি সাহসের সঙ্গে আক্রমণ চালাতে লাগল। কিন্তু যে সময়ের কথা বলছি, তখন আমিরের অধীনে কর্‌টুবা একটি বড়ো আর উন্নতিশীল রাষ্ট্র, ইউরোপের দেশগুলি থেকে সভ্যতা আর বিজ্ঞানে সে অনেক এগিয়ে আছে। স্পেন ছাড়া ইউরোপের বাকি অংশটা তখন কতকগুলি খণ্ড খণ্ড খৃস্টান-রাজ্যে বিভক্ত ছিল। খৃষ্টানধর্ম এর মধ্যেই সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে; বীর, দেবতা আর দেবীদের পুরোনো ধর্ম প্রায় লুপ্ত হয়ে এসেছে। ইউরোপের আধুনিক দেশগুলি তখন গড়ে উঠছিল। ১৮৭ অব্দে হিউ ক্যাপেটের অধীনে ফ্রান্সকে দেখতে পাচ্ছি। ইংলণ্ডে রাজত্ব করছিলেন ‘ক্যানিউট দি ডেন’—সে ১০১৬ খৃষ্টাব্দের কথা। সমুদ্রতরঙ্গকে প্রতিহত হবার জন্যে আদেশ করেছিলেন ব’লে এঁর প্রসিদ্ধি আছে। এর পঞ্চাশ বছর পরে নরম্যাণ্ডি থেকে ‘উইলিয়ম দি কঙ্কারার’এর আবির্ভাব হয়। জর্মনি ছিল পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অংশবিশেষ, সমস্ত দেশটা অনেকগুলি ছোটো ছোটো রাজ্যে বিভক্ত ছিল, কিন্তু তবু সবগুলি মিলে যে একটা দেশ হয়ে উঠবে তারও সূচনা দেখা যাচ্ছিল। রাশিয়া পূর্বদিক রাজ্যবিস্তার করে তার রণতরীর সাহায্যে কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্ অধিকার করার তালে ছিল। কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লের প্রতি রাশিয়ার সর্বদাই আশ্চর্য আকর্ষণ দেখা গেছে, এই সময় থেকেই তার সূচনা। এক হাজার বছর ধরে ক্রমাগত সে এই নগরটি লাভ করার চেষ্টা করে এসেছে। শেষ পর্যন্ত চোদ্দ বছর আগেও মহাযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে এটিকে পাবার আশা পোষণ করেছে। কিন্তু হঠাৎ বিপ্লব এসে প্রাচীন রাশিয়ার সমস্ত সংকল্প ভেস্তে দিল।

 নয় শো বছর আগেকার ইউরোপের মানচিত্রে মেগায়ারদের বাসস্থান পোল্যাণ্ড এবং হাঙ্গেরিকেও দেখতে পাবে, আর পাবে বুলগেরিয়ান এবং সার্বদের রাজ্য। পূর্ব-রোমান সাম্রাজ্যকে বহুশত্রুপরিবৃত দেখতে পাবে, কিন্তু তবু তখনও তার অস্তিত্ব লুপ্ত হয় নি। রুশরা একে আক্রমণ করছিল, বুলগেরিয়ানরা এর উপর উপদ্রব করছিল, নরম্যানরা একে উত্যক্ত করে তুলছিল; এদের সবার চেয়ে ভীষণ সেলজুক তুর্কিদের হাতে এখন এর অস্তিত্ব পর্যন্ত বিপন্ন হয়ে উঠল। কিন্তু এত শত্রুতা আর অসুবিধা সত্ত্বেও এ রাজ্যের পতন হতে আরও চার শো বছর লেগেছিল। কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লের সুদৃঢ় অবস্থান দেখলেই এই অদ্ভুত ব্যাপারের কিছুটা কারণ বোঝা যাবে। এই সুন্দর অবস্থিতির জন্যই একে অধিকার করা এক দুঃসাধ্য ব্যাপার ছিল। এর আরও একটা কারণ ছিল, গ্রীকদের আবিষ্কৃত আত্মরক্ষার এক অভিনব উপায়। এটা ছিল ‘গ্রীক ফায়ার’ নামে একটা জিনিষ, জলের স্পর্শ পেলেই এটা জ্বলে উঠত। এই গ্রীক ফায়ারের সাহায্যেই কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লের অধিবাসীরা আক্রমণকারী সৈন্যদলকে বিধস্ত করে দিত, ফস্‌ফরাস পেরিয়ে আসতে চাইলেই তাদের জাহাজে আগুন ধরিয়ে দিত।

 খৃষ্টীয় হাজার অব্দের শেষে এই ছিল ইউরোপের মানচিত্র। নর্থম্যান যা নরম্যানরা তাদের জাহাজ নিয়ে ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী স্থানে আর মাঝদরিয়ায় জাহাজগুলির উপর উৎপাত এবং লুঠতরাজ করছে, এও দেখতে পাবে। বার বার সফল হয়ে এদের প্রতিপত্তি ক্রমেই বেড়ে উঠছিল। ফ্রান্সের পশ্চিমে নরম্যাণ্ডিতে তারা অধিষ্ঠিত হয়েছিল, এই ঘাঁটি থেকে তারা ইংলণ্ড জয় করেছিল। মুসলমানদের কাছ থেকে সিসিলি কেড়ে নিয়ে তার সঙ্গে দক্ষিণ-ইতালি যুক্ত করে তারা সিসিলিয়া নামে একটি রাজ্যেরও পত্তন করেছিল।

 মধ্য ইউরোপে উত্তরসাগর থেকে রোম পর্যন্ত নিশ্চিন্ত আরামে বিরাজ করছিল পবিত্র রোমানসাম্রাজা, এর অনেকগুলি ছোটো ছোটো রাজ্যের সার্বভৌম অধিপতি ছিলেন সম্রাট। এই জর্মনসম্রাট আর রোমের পোপের মধ্যে কর্তৃত্ব নিয়ে রেষারেষির আর অন্ত ছিল না। কখনও কখনও সম্রাট প্রাধান্য লাভ করতেন, কখনও আবার পোপই প্রধান হয়ে উঠতেন, কিন্তু ধীরে ধীরে পোপদেরই ক্ষমতা বেড়ে গেল। তাঁদের এক মারাত্মক অস্ত্র ছিল, সমাজচ্যুত করে দেবার ভয় দেখানো, অর্থাৎ তাঁরা যে-কোনো লোককে সমাজ থেকে বের করে তাকে আইনের আশ্রয় থেকে বঞ্চিত করতে পারতেন। একজন সম্রাটকে সত্যিসত্যি এতদূর অপদস্থ করা হয়েছিল যে পোপের কাছে ক্ষমাভিক্ষা করার জন্য তাঁকে খালি পায়ে বরফের উপর দিয়ে হেঁটে ইতালির কেনোসাতে তাঁর বাড়িতে যেতে হয়েছিল, আর যতক্ষণ পোপ তাকে ভিতরে ঢুকবার অনুমতি দেন নি ততক্ষণ বাইরে অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

 ইউরোপের দেশগুলি গড়ে উঠছে দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু তাদের চেহারা এখনকার চেয়ে অনেক আলাদা, অন্তত জাতিগুলির মধ্যে অনেক প্রভেদ রয়েছে। তারা নিজেদের ফরাসি, ইংরেজ বা জর্মন বলে অভিহিত করত না। বেচারি কৃষকদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। তারা দেশ অথবা দেশের প্রাকৃতিক অবস্থা সম্বন্ধে কিছু জানত না, তারা শুধু জানত তারা তাদের প্রভুর দাস আর প্রভুর আদেশ তাদের পালন করতেই হবে। অভিজাতদের পরিচয় জিজ্ঞেস করলে শোনা যেত, তাঁরা হচ্ছেন অমুক জায়গার লর্ড (অর্থাৎ সামন্ত রাজা), তাঁদের উপরেও আছেন আবার কোনো বড়ো লর্ড বা স্বয়ং সম্রাট। সারা ইউরোপ জুড়ে এই ছিল সামন্ততন্ত্রের রাপ।

 জমনি এবং বিশেষভাবে উত্তর-ইতালিতে বড়ো বড়ো শহর গড়ে উঠছে দেখতে পাচ্ছি। প্যারিস-শহরও তখন খুব সমৃদ্ধ। এই শহরগুলি ছিল ব্যবসাবাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল, আর দেশের ধনদৌলত ওগুলিতেই গিয়ে জমা হত। এই শহরগুলি সামন্তরাজাদের আমল দিত না, উভয়ের মধ্যে সর্বদাই রেষারেষি চলত, শেষ পর্যন্ত ধনদৌলতেরই জিত হল। সামন্তরাজাদের কাছে ধারদেওয়া টাকা থেকে তারা নানারকম সুবিধা আর ক্ষমতা আদায় করে নিল। কাজেই ধীরে ধীরে নূতন একটি সম্প্রদায় গড়ে উঠল, সামতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে তার খাপ খেত না।

 এভাবে দেখতে পাই, ইউরোপের সমাজব্যবস্থা সামন্ততন্ত্রের গঠন-ভেদে কতকগুলি স্তরে বিভক্ত হয়ে পড়ল এবং খৃষ্টীয় ধর্মযাজক সম্প্রদায় বা চার্চ পর্যন্ত এই ব্যবস্থাকে অনুমোদন এবং অনুগ্রহ দান করলেন। সারা ইউরোপ জুড়ে কোনো জাতীয়তার অনভূতি ছিল না, কিন্তু বিশেষ করে উচ্চশ্রেণীর মধ্যে খৃষ্টান ধর্ম সম্বন্ধে এমন একটা অনভূতি ছিল যে এরই ফলে সমস্ত খৃষ্টান রাজ্যগুলি একতাবদ্ধ হয়ে গেল। ধর্মযাজক সম্প্রদায় এই ভাবটি প্রচারে সাহায্য করতে লাগলেন, কারণ এর ফলে এই সম্প্রদায়ের ক্ষমতা বেড়ে যাবার আর পশ্চিম-ইউরোপের ধর্মসম্প্রদায়ের একচ্ছত্র অধিপতি পোপেরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল। এ কথা মনে রাখতে হবে যে রোম কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্ এবং পূর্ব-রোমান সাম্রাজ্য থেকে আলাদা হয়ে এসেছিল। কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লে তখন পুরোনো গোঁড়া সম্প্রদায়ের আধিপত্য, আর রুশদেশও আপনার ধর্মব্যাপারে তারই অনুগত ছিল। কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লের গ্রীকরা পোপকে আমল দেয় নি।

 কিন্তু যখন কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌লের চারি দিক শত্রুরা ঘিরে ফেলেছে, বিশেষত যখন সেলজুক তুর্কিরা তার আশংকার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেই বিপদের সময় নিজের গর্ব এবং রোমের প্রতি বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে বিধর্মী মুসলমানদের বিরুদ্ধে সে পোপের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছিল। রোমে তখন হিল্‌ডে ব্রাণ্ড নামে একজন শক্তিশালী পোপ ছিলেন, পরে তিনিই পোপ সপ্তম গ্রেগরি বলে খ্যাত হন। বরফের মধ্যে দিয়ে খালি পায়ে গর্বিত জর্মন-সম্রাটকে কেনোসাতে এঁরই কাছে যেতে হয়েছিল।

 আর-একটি ঘটনাতেও তখন খৃষ্ট-ইউরোপের চিন্তাধারা উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিল। অনেক ধর্মপ্রাণ খৃষ্টান বিশ্বাস করতেন যে খৃষ্টের জন্মের এক Millennium (হাজার বছর) পরে পৃথিবীর শেষ হয়ে যাবে। Millennium (মিলেনিয়াম্) কথার মানে হল—হাজার বছর। দুটি লাতিন শব্দ থেকে এর উৎপত্তি। Mille অর্থ হাজার, আর annus মানে বছর। এক Millennium পরে পৃথিবীর শেষ হয়ে যাবে ধারণা ছিল বলেই, কথাটির অর্থ হয়ে দাঁড়াল—ভালোর দিকে পৃথিবীর আকস্মিক পরিবর্তন। তোমাকে বলেছি, ইউরোপের তখন চরম দুরবস্থা, Millenniumএর আশা অনেক দুর্গতদের মনে সান্ত্বনা এনে দিত। পৃথিবীর শেষ সময়ে পবিত্র ভূমিতে থাকবে বলে অনেকে জমিজমা বিক্রি করে প্যালেস্টাইনে পাড়ি দিল।

 কিন্তু পৃথিবীর শেষ দিন আর এল না। যে হাজার হাজার তীর্থযাত্রী জেরুজালেমে গিয়েছিল তুর্কিরা তাদের প্রতি দুর্ব্যবহার আর উৎপীড়ন করতে লাগল। তারা ক্রোধ আর অপমানের বোঝা নিয়ে ইউরোপে ফিরে এল এবং পবিত্র ভূমিতে তাদের দুর্দশার কাহিনী সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল। মুসলমানদের হাত থেকে পবিত্র নগরী জেরুজালেম উদ্ধার করার জন্য বিশেষভাবে প্রচার করে বেড়াতে লাগলেন ওপবী পিটার নামে দণ্ডধারী এক বিখ্যাত তীর্থযাত্রী। খৃষ্টান সমাজের মধ্যে ক্রোধ আর উৎসাহের মাত্রা বেড়েই চলেছে দেখে পোপ ঠিক করলেন, তিনিই এই আন্দোলনের নেতৃত্ব করবেন।

 ঠিক এই সময়েই জেরুজালেম থেকে বিধর্মীদের বিরুদ্ধে সাহায্যের জন্য আবেদন এল। সারা খৃষ্টান সমাজ, রোমান এবং গ্রীক, উভয়েই যেন তুর্কিদের অগ্রগমনে বাধা দেবার জন্য মিলিত হবো দাঁড়াল। ১০৯৫ অব্দে নিখিল খৃস্টীয় ধর্মযাজক-সম্প্রদায় পবিত্র জেরুজালেম-নগরী উদ্ধার করবার জন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ ঘোষণার সংকল্প করল। এমনি করেই ইসলামের বিরুদ্ধে খৃষ্টানদের, বাঁকা চাঁদের বিরুদ্ধে ক্রুশের যুদ্ধ বা ক্রুসেডের সূত্রপাত হল।