বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/গণতন্ত্রের অগ্রগতি

উইকিসংকলন থেকে

১৩১

গণতন্ত্রের অগ্রগতি

১০ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৩

 ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের কীরকম উন্নতি হয়েছিল তার একটা আভাস আমি গত চিঠিতে দিতে চেষ্টা করেছি। এবার দেখব এই শতাব্দীর আর একটি দিকের ইতিহাস—গণতান্ত্রিক মতবাদের অভ্যুত্থান।

 অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সে নানা মতবাদের মধ্যে একটা জোর লড়াই চলেছিল, এর কথা তোমাকে আমি বলেছি। সে সময়কার সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তাবীর এবং লেখক ভল্‌টেয়ার এবং আরও অনেক ফরাসি মনীষী তখন ধর্ম এবং সমাজের বহু প্রাচীন ধারণার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, কোনো কিছুকে ভয় না করে নূতন নূতন সব মতবাদ প্রচার করছিলেন। সে সময়ে এই ধরনের রাজনৈতিক চিন্তার বিকাশ প্রধানত ফ্রান্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, অন্যত্র এর তেমন চর্চা হয় নি। জর্মানিতে ছিলেন দার্শনিকরা, তাঁরা দর্শনশাস্ত্রের জটিলতর তত্ত্বের আলোচনা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। ইংলণ্ডে বাবসাবাণিজ্য বেড়ে চলছিল, সেখানে লোকেরা চিন্তা করতে ভালোবাসত না, নেহাত যদি অবস্থার ফেরে পড়ে করতে হয় সে আলাদা কথা। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে কিন্তু ইংলণ্ডে একটি খুব উল্লেখযোগ্য বই প্রকাশিত হল। এটি হচ্ছে অ্যাডাম স্মিথের লেখা,—‘ওয়েল্‌থ্ অব্ নেশন্‌স্’। এটা ঠিক রাজনীতির বই নয়, অর্থনীতির বই। তখনকার দিনের অন্য সমস্ত বিষয়ের মতোই এই বিদ্যাটাও ধর্ম আর নীতি শাস্ত্রের সঙ্গে খিচুড়ি পাকিয়ে ছিল, ফলে এর সম্বন্ধে মানুষের মনে রাশিকৃত খট্‌কাও লেগেই থাকত। অ্যাডাম স্মিথ পরোদস্তুর বৈজ্ঞানিকের ঢঙে এর ব্যাখ্যা দিলেন, এবং সমস্ত নীতিশাস্ত্রের অনাবশ্যক বাহুল্যকে বর্জন করে, অর্থনৈতিক জীবন যার জোরে চলে সেই প্রকৃতিসিদ্ধ নিয়মগুলোকে আবিষ্কার করতে চেষ্টা করলেন। অর্থনীতির নাম তুমি বোধ হয় জান, দেশের প্রজার বা সমস্ত দেশটারই আয় আর ব্যয়ের বিলিব্যবস্থা, তার প্রজারা কী কী বস্তু তৈরি করছে, কী কী বস্তু ভোগ করছে, পরস্পরের সঙ্গে এবং অন্যান্য দেশের ও জাতির সঙ্গে তাদের কী রকম সম্পর্ক, এইসব কথা নিয়ে এতে আলোচনা করা হয়। অ্যাডাম স্মিথের ধারণা হল, এইসমস্ত জটিল ব্যাপারই চলছে কতকগুলো ধরাবাঁধা প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসারে; এই কথাই তাঁর বইয়ে তিনি লিখলেন। তাঁর আরও বিশ্বাস ছিল, শিল্পের পূর্ণ পরিণতি যদি চাই তবে মানুষকে কাজকর্মে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে, যেন এইসব নিয়ম কোথাও বাধা না পায়। ‘লেইজে ফেয়ার্’ বা ‘স্বাধীন জীবিকা’ মতবাদের এইখানেই শুরু হল; এর কথা আমি আগেই তোমাকে খানিকটা বলেছি। ফ্রান্সে এই সময়টাতে গণতন্ত্রের নূতন সব মতামত গজিয়ে উঠছে; তার কোনো আলোচনা অ্যাডাম স্মিথের বইয়ে ছিল না। কিন্তু মানুষ এবং জাতির জীবনের একটি অত্যন্ত জরুরি সমস্যাকে নিয়ে তিনি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করলেন, এই থেকেই বোঝা যায়, এর আগে যেমন সমস্ত-কিছুকেই ধর্মতত্ত্বের দিক থেকে বিচার করা হত, সে পথ ছেড়ে দিয়ে মানুষ নূতন পথে চলতে চাইছে। অ্যাডাম স্মিথকে বলা হয় অর্থনীতি-বিজ্ঞানের স্রষ্টা ঊনবিংশ শতাব্দীর বহু ইংরেজ অর্থনীতিবিদ্‌ই তাঁর কাছে প্রথম প্রেরণা পেয়েছিলেন।

 অর্থনীতির এই নূতন বিজ্ঞানের চর্চা কেবল অধ্যাপকদের আর অতি অল্প দু-চারজন সুশিক্ষিত মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ও দিকে তখন গণতন্ত্রের সব নবীন মতামত ছড়িয়ে পড়ছে; আমেরিকা আর ফ্রান্সের বিপ্লব তার জোর আর খ্যাতি আরও বহুগুণে বাড়িয়ে আমেরিকার ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ এবং ফ্রান্সের ‘প্রজার অধিকারের ঘোষণাপত্র’ যে ভাষায় রচিত হল তার ধ্বনি এবং বাক্যসৌষ্ঠব মানুষের মনের একেবারে তলায় পর্যন্ত গিয়ে নাড়া লাগাল। লক্ষ লক্ষ মানুষে এতদিন শুধু পীড়ন আর শোষণই সয়ে এসেছে; এই ঘোষণাপত্রের ভাষা শুনে তারা রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল, তাদের মুক্তির বার্তা বহন করে এনেছে তারা! এই দুইটি ঘোষণাপত্রেই উচ্চারিত হয়েছিল স্বাধীনতার বাণী, সাম্যের বাণী, এবং সুখভোগের যে অধিকার সমস্ত মানুষেরই রয়েছে তার বাণী। অবশ্য এই মহার্ঘ অধিকারগুলির নাম তখন সদর্পে ঘোষণা করা হয়েছিল ব’লেই সে অধিকার সমস্ত মানুষের করায়ত্ত হয় নি। সে ঘোষণাপত্র প্রচার করবার পর দেড় শো বছর কেটে গেছে, তবু আজও অতি অল্পসংখ্যক মানুষই সে অধিকার অর্জন করেছে, তবু সেই নীতিটা যে স্পষ্টভাষায় ঘোষিত হল এইটেই ছিল একটা আশ্চর্য ব্যাপার, মানষের দেহে নবীন প্রাণের সঞ্চার করল সে ঘোষণা।

 অন্যান্য সমস্ত দেশের মতো ইউরোপেও অন্যান্য সমস্ত ধর্মের মতো খৃষ্টান ধর্মেও, মানষের চিরদিন ধারণা ছিল, পাপ এবং দুঃখ মানুষের স্বাভাবিক এবং অলঙ্ঘ্য ললাটলিপি। ধর্মশাস্ত্রে বরং এই পার্থিব জীবনে দারিদ্রা এবং দুঃখভোগকেই সনাতন এমনকি একটা লোভনীয় বস্তু বলে বর্ণনা করা হত। ধর্মশাস্ত্রে মানুষকে যে শান্তি আর পুরস্কারের আশ্বাস দেওয়া হত তার সমস্তই মিলবে অন্য কোনো পারলৌকিক জগতে। মানুষকে বোঝানো হত, এই জীবনে যে ভাগ্য বা দুর্ভাগ্য দেখা গেল তাকে প্রসন্নমনে শুধু সহ্য করে যাও, বিরাট কোনো পরিবর্তন এতে আনবার চেষ্টা কোরো না। দান-দাক্ষিণ্যকে, দরিদ্রকে দু মঠো খেতে দেওয়াকে, এরা প্রশংসা করত; কিন্তু দারিদ্র্যকে, বা যে সমাজব্যবস্থার ফলে দারিদ্র্যের সৃষ্টি হচ্ছে তাকে, বিলুপ্ত করে দেবার কোনো কথা কেউ বলত না। ধর্মমত এবং সমাজ যে কর্তৃত্বের দৃষ্টি নিয়ে সমাজব্যবস্থা চালাতেন তার কাছে স্বাধীনতা এবং সাম্যের নামটা পর্যন্ত ছিল অপরাধের শামিল।

 সমস্ত মানুষই বস্তুত একেবারে সমান, এমন কথা অবশ্য গণতন্ত্রও বলত না, বলা সম্ভবও নয়। কারণ, এটা সহজেই বোঝা যায় যে, মানুষে মানুষে কিছু তফাত থাকবেই; দৈহিক শক্তির তফাতের ফলে একজন আর-একজনের চেয়ে বেশি বলবান হবে, মানসিক শক্তির তফাতের ফলে একজনের চেয়ে আর-একজন বেশি কর্মক্ষম বা বিচক্ষণ হবে; নৈতিক শক্তির তফাতের ফলে একজন স্বার্থপর হবে, একজন হবে না। এইসমস্ত অসাম্যের অনেকখানিই আসে লালনপালন এবং শিক্ষার তফাতের ফলে, বা শিক্ষার অভাবে—এটা হওয়া খুবই সম্ভব। দুটি ছেলে বা দুটি মেয়ের বুদ্ধিবৃত্তি এক সমান; এক জনকে ভালো করে শিক্ষা দাও, এক জনকে দিয়ো না। কয়েক বছর পরে দেখবে দু জনের মধ্যে অনেকখানি তফাত হয়ে গেছে; কিংবা এদের এক জনকে ভালো স্বাস্থ্যকর খাবার দাও, অন্য জনকে খারাপ এবং অপ্রচুর খাদ্য দিতে থাকো। প্রথম জন ঠিকমতো পরিপুষ্ট হবে, আর দ্বিতীয় জন হবে দুর্বল রুগ্‌ণ এবং অপরিপুষ্ট। এইভাবেই মানুষের পালন পরিবেশ এবং শিক্ষাদীক্ষার ফলে তার অনেকখানি তফাত এসে যায়; সকলকেই যদি ঠিক এক রকমের শিক্ষা আর সুযোগ আমরা দিতে পারতাম তবে হয়তো এখনকার তুলনায় মানুষে-মানুষে পার্থক্যও অনেক কম হত। এটা হওয়া অবশ্য খুবই সম্ভব। কিন্তু গণতন্ত্রের কথা যদি ধর, তাতে স্বীকার করা হল যে, বাস্তবিকই সকল মানুষ পরস্পর সমান নয়, অথচ এও আবার বলা হল যে, প্রত্যেক মানুষেরই রাজনৈতিক এবং সামাজিক জীবনে ঠিক সমান মর্যাদা আছে বলে মেনে নিতে হবে। গণতন্ত্রের এই মতবাদকে যদি আমরা সম্পূর্ণভাবে স্বীকার করে নিতে চাই তবে তার ফলে আমরা নানান রকমের সব বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তে গিয়ে উপনীত হব। এর সমস্ত কথার বিশদ আলোচনা এখানে নিষ্প্রয়োজন, কিন্তু এই মতবাদটির একটি সহজ সিদ্ধান্ত হচ্ছে, শাসক-সভা বা পার্লামেণ্টে প্রতিনিধি নির্বাচন করে পাঠাবার ব্যাপারে প্রত্যেক মানুষেরই একটি করে ভোট দেবার অধিকার থাকবে। এই ভোট দেবার ক্ষমতাটাই হয়েছিল রাজনৈতিক অধিকারের প্রতীক; সুতরাং ধরে নেওয়া হল, প্রত্যেক লোকের যদি একটা করে ভোট দেবার অধিকার থাকে তবে এই লোকেরা প্রত্যেকেই ঠিক সমান পরিমাণ রাজনৈতিক ক্ষমতার মালিক হবে। অতএব সমস্তটা ঊনবিংশ শতাব্দী ধরে গণতন্ত্রের একটি প্রধান দাবি হল, আরও বেশি বেশি লোককে ভোট দেবার অধিকার দিয়ে দেওয়া হোক। ‘সাবালকের ভোটাধিকার’ বলতে বোঝাবে তাকে যখন প্রত্যেক সাবালক বা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ভোট দেবার অধিকার লাভ করেছে। দীর্ঘ কাল যাবৎ এই অধিকার থেকে মেয়েদের বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল; তার পর তারা বিশেষ করে ইংলণ্ডে একটা প্রচণ্ড আন্দোলন শুরু করল—সে খুব বেশি দিনের কথা নয়। এখন প্রায় সমস্ত সভ্য দেশেই পুরুষ এবং মেয়ে দু দলেরই প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা ভোট দেবার অধিকার পেয়েছে।

 কিন্তু এইটেই আশ্চর্য, অধিকাংশ মানুষ যখন ভোট দেবার অধিকার অর্জন করেছে তখন দেখা গেল, এতে করে তাদের অবস্থার বিশেষ কিছুই ইতরবিশেষ হয় নি। ভোটের অধিকার তারা পেয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের ব্যাপারে তাদের কোনো ক্ষমতাই নেই, বা দৈবাৎ থাকলেও সে অতি সামান্য। পেটে যার খাদ্য নেই ভোটের ক্ষমতা তার কোনো কাজেই আসে না। সত্যকার ক্ষমতা থাকল সেই লোকদের হাতে যারা এর এই বুভুক্ষার সুযোগ নিতে পারল, তাদের নিজেদের প্রয়োজনমতো এদের শ্রমিক হিসেবে বা অন্য কোনো রকমে খাটিয়ে নিতে পারল। অতএব দেখা গেল, ভোটের অধিকার পাবার ফলে যে রাজনৈতিক ক্ষমতা মানুষের হাতে আসে বলে লোকের ধারণা ছিল, সে ক্ষমতাটা একেবারেই একটা কায়াহীন ছায়ামাত্র, যদি না তার সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষমতাও যুক্ত থাকে। ভোটের ক্ষমতা সকলের আয়ত্ত হবার সঙ্গে সঙ্গে সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, প্রথম যুগের গণতন্ত্রবাদীরা এই স্বপ্ন দেখতেন; সে স্বপ্ন একেবারেই মিথ্যা হয়ে গেল।

 এ অবশ্য অনেক দিন পরের কথা। প্রথম যুগে—অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে প্রজাতন্ত্রবাদীদের মনে বিপুল উৎসাহের সঞ্চার হরেছিল। প্রজাতন্ত্র একবার প্রতিষ্ঠিত হোক, তখন দেশের প্রত্যেকটি লোক স্বাধীন এবং সমান মর্যাদার নাগরিক বলে গণ্য হবে; দেশের শাসনব্যবস্থা এমনভাবে চলবে যাতে প্রত্যেক ব্যক্তিরই সুখসমৃদ্ধির ব্যবস্থা হয়ে যাবে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে রাজা এবং শাসনকর্তৃপক্ষের হাতে স্বৈরতন্ত্রী ক্ষমতা ছিল এবং তাঁদের সেই একচ্ছত্র ক্ষমতার তাঁরা অনেক অপব্যবহার করেছিলেন। এবারে তার একটা প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। এরই ফলে লোকেরা তাদের ঘোষণাপত্রগুলোতে প্রজাদের ব্যক্তিগত অধিকারগুলি খুব স্পষ্ট ভাষায় প্রচার করতে লাগল। আমেরিকা আর ফ্রান্সের ঘোষণাপত্রে সন্ধির এইসমস্ত অধিকার সম্বন্ধে যেসব কথা বলা হল তাতে সম্ভবত আবার অন্য দিকে বাড়াবাড়ি করে বলা হয়েছিল। জটিল একটা সমাজ-জীবনের মধ্যে তার প্রত্যেকটি ব্যক্তিকে আলাদা করে নিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে দেওয়া খুব সহজ ব্যাপার নয়। এই রকমের যে-কোনো একজন ব্যক্তির স্বার্থ আর সমাজের স্বার্থ এক না হতে পারে, দুয়ের মধ্যে সংঘাতও বেধে ওঠে। কিন্তু সে যাই হোক, ব্যক্তির পক্ষে অনেকখানি স্বাধীনতার ব্যবস্থা প্রজাতন্ত্রবাদীরা করতে চেয়েছিল।

 অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইংলণ্ড রাজনৈতিক মতামতের দিক দিয়ে অনেক পিছনে পড়ে ছিল। আমেরিকা আর ফ্রান্সের বিপ্লব স্বভাবতই তাকে একটা নাড়া দিয়ে গেল। এর প্রথম প্রতিক্রিয়া হল ভয়—নূতন প্রজাতান্ত্রিক মতামতের সম্বন্ধে, আর তাদেরও দেশে যদি আবার সমাজবিপ্লব ঘটে যায় তার সম্বন্ধে ভয়। এই ভয়ে শাসকশ্রেণীরা আরও বেশি রক্ষণপন্থী এবং প্রগতিবিমুখ হয়ে উঠলেন। তবুও কিন্তু বদ্ধিজীবীদের মধ্যে এইসব নূতন মতামত ক্রমে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এই সময়কার একজন উল্লেখযোগ্য ইংরেজ ছিলেন টমাস পেইন। স্বাধীনতা-সমরের সময়টাতে তিনি আমেরিকাতেই ছিলেন, যুদ্ধে আমেরিকানদের সাহায্যও করেছিলেন। পূর্ণস্বাধীনতা অর্জনের ইচ্ছা আমেরিকানদের মাথায় ঢোকানোর ব্যাপারেও এঁর খানিকটা হাত ছিল বলে মনে হয়। ইংলণ্ডে ফিরে তিনি ‘দি রাইট্‌স্ অব ম্যান’ বা ‘মানুষের অধিকার’ নামে একটি বই লিখলেন; ফ্রান্সে তখন বিপ্লব সদ্য আরম্ভ হয়েছে, এই বইটিতে তিনি সেই বিপ্লবের পক্ষ সমর্থন করলেন। বইয়ে তিনি রাজতন্ত্রের দোষত্রুটি দেখালেন এবং গণতন্ত্র-প্রতিষ্ঠার স্বপক্ষে যুক্তি দিলেন। এই অপরাধে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে আইনের অরক্ষণীয় ‘আউট-ল’ বলে ঘোষণা করলেন; বাধ্য হয়ে তিনি পালিয়ে ফ্রান্সে চলে গেলেন। প্যারিসে গিয়ে তিনি অল্পদিনের মধ্যেই জাতীয় পরিষদের সভ্য বলে গণ্য হলেন; কিন্তু ১৭৯৩ সনে জ্যাকোবিনরা তাঁকে কারারুদ্ধ করল, কারণ তিনি ষোড়শ লুইয়ের প্রাণদণ্ডে আপত্তি করেছিলেন। প্যারিসে জেলে বসে তিনি আর একটি বই লেখেন, তার নাম ‘দি এজ অব রিজ্‌ন’ বা ‘যুক্তির যুগ’; এই বইয়ে তিনি ধর্মধ্বজী দৃষ্টিভঙ্গির ত্রুটি বিশ্লেষণ করে দেখালেন। ইংলণ্ডের আদালত পেইনকে হাতের নাগালে পেল না। (রোবেম্পিয়ের-এর মৃত্যুর পরে প্যারিসের কারাগার থেকে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়); এই বইটি প্রকাশ করবার অপরাধে ইংলণ্ডে তাঁর প্রকাশককে কারাদণ্ড দেওয়া হল। এ ধরনের বইকে তখন সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক বলে মনে করা হত; তখনকার কর্তারা জানতেন, ধর্ম একটা খুবই প্রয়োজনীয় বস্তু, কারণ ধর্মের দোহাই দিয়েই গরিবদের তাদের নিজের জায়গাতে আটকে রাখতে হয়। পেইনের বই যাঁরা প্রকাশ করেছেন এমন অনেক লোককে জেলে যেতে হল, এঁদের মধ্যে কয়েকজন নারীও ছিলেন। কবি শেলি এর প্রতিবাদ করে সেই বিচারকের কাছে একটি চিঠি লিখে পাঠিয়েছিলেন। ঘটনাটি লক্ষ করবার মতো।

 ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে যেসকল গণতান্ত্রিক মতামত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল, ইউরোপে তার জন্ম হয় ফরাসি বিপ্লব থেকে। বস্তুত, পারিপার্শ্বিক সমস্ত অবস্থা অতিদ্রুত বদলে যাচ্ছিল, তবুও বিপ্লবের ধারণাটা অনেক দিন টিঁকে রইল। রাজতন্ত্র এবং স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের মনে যে বিক্ষোভ জমে উঠেছিল, এই গণতান্ত্রিক মতামতগুলো ছিল তারই বহিঃপ্রকাশ; এদের ভিত্তি রচিত হয়েছিল শিল্পতন্ত্র প্রবর্তনের আগের যুগের অবস্থার উপরে। কিন্তু নূতন যুগের শিল্পতন্ত্র, বাষ্প আর কলের কারখানা, সমাজের প্রাচীন ব্যবস্থাকে একেবারেই বদলে ফেলছিল। অথচ এইটেই আশ্চর্য, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের প্রগতিবাদী এবং প্রজাতন্ত্রবাদীরা সেসব পরিবর্তনকে মোটে লক্ষই করলেন না, ‘বিপ্লব’ আর ‘মানুষের অধিকার সম্বন্ধে ঘোষণাবাক্যের’ ভালো ভালো বুক্‌নিগুলোকেই শুধু আউড়ে যেতে লাগলেন। তাঁদের বোধ হয় ধারণা ছিল, এইসব পরিবর্তন নেহাতই পার্থিব ব্যাপার মাত্র; যেসমস্ত উচ্চস্তরের আত্মিক নৈতিক এবং রাজনৈতিক দাবিদাওয়া নিয়ে গণতন্ত্রের কারবার তার সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু পার্থিব কাণ্ডকারখানার একটা বদ অভ্যাস আছে, তাদের গ্রাহ্য করতে না চাইলেও তারা অগ্রাহ্য হয়ে থাকতে চায় না। পুরোনো মতামত ছেড়ে দিয়ে নূতন মতামত গ্রহণ করা মানুষের পক্ষে কী আশ্চর্যরকম শক্ত, সেটাও লক্ষ করবার বস্তু। চোখ বুজে মন বুজে তারা বসে থাকবে ও কিছুই দেখতে চাইবে না; প্রাচীন কালের বস্তু যখন স্পষ্টই তাদের ক্ষতি করছে, তখনও তাকেই আঁকড়ে ধরে থাকবার জন্যে প্রাণপণ লড়াই করবে। যা তাদের করতে বল তাই তারা করবে, শুধু একটি কাজ ছাড়া—নূতন মতামতকে মেনে নেবে না, নূতনতর অবস্থার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবে না। অপরিসীম ক্ষমতা মানুষের এই রক্ষণশীলতার! যারা প্রগতিবাদী, যারা মনে করে অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে চলেছে, তারা পর্যন্ত অনেক সময়ে পুরোনো এবং বাতিল সব মতামতকে কামড়ে পড়ে থাকে, চার ধারের অবস্থা যে বদলে যাচ্ছে কিছুতেই চোখ তুলে তাকিয়ে সেটা দেখতে রাজি হয় না। কাজেই মানুষের অগ্রগতির বেগ তীব্র হয় না, এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই; অনেক সময়েই দেখা যায়, জগতের বাস্তব অবস্থা আর মানুষের মতামত, এই দুয়ের মধ্যে একটা বিরাট ব্যবধান থেকে গেছে, তারই ফলে শেষে বিপ্লব অনিবার্য হয়ে ওঠে।

 এইভাবে বহু বছর ধরে গণতন্ত্র বলতে বোঝাল, শুধু ফরাসি বিপ্লবের সময়কার রীতিনীতি আর মতবাদগুলোর জের টেনে চলা। নূতনতর পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারল না বলেই সে গণতন্ত্র এই শতাব্দীর শেষ দিকে এসে বেশ ক্ষীণপ্রাণ হয়ে পড়ল; পরে বিংশ শতাব্দীতে পৌঁছে অনেকে একে সোজাসুজিই বর্জন করে বসল। আধনিক ভারতবর্ষে আমাদের অগ্রণী রাজনীতিবিদদের মধ্যে অনেকে এখনও কথা বলছেন সেই ফরাসি বিপ্লব আর মানুষের অধিকার এর ভাষায়; তার পরে যে অনেক-কিছু পৃথিবীতে ঘটে গেছে সে খবরটাও তাঁদের জানা নেই।

 প্রথম যুগের গণতন্ত্রীরা স্বভাবতই ছিলেন যুক্তিবাদের ভক্ত। এঁদের দাবি ছিল চিন্তা আর বাক্যের স্বাধীনতা; ধর্ম এবং ঈশ্বরবাদের গোঁড়ামির সঙ্গে তার সামঞ্জস্য ঘটানো কঠিন। মানুষের উপরে ধর্মতত্ত্বের গোঁড়ামির যে বিপুল প্রভাব ছিল তাকে খর্ব করবার জন্যে গণতন্ত্র তাই সাহায্য নিল বিজ্ঞানের। মানুষের সাহস তখন বেড়ে গেছে, তারা বাইবেলের উক্তিকে পর্যন্ত যুক্তি দিয়ে যাচাই করে নিতে আরম্ভ করল, যেন সেটা একটা সাধারণ বই মাত্র, যেন তার বচন বিনা তর্কে অন্ধবিশ্বাসের জোরেই মেনে নেবার বস্তু নয়। বাইবেলের এই সমালোচনার নাম দেওয়া হল ‘উচ্চতর সমালোচনা’। সমালোচকরা সিদ্ধান্ত করলেন, বাইবেল হচ্ছে বহু বিভিন্ন যুগে বহু বিভিন্ন ব্যক্তির লেখা পুঁথিপত্রের একটা সংগ্রহপুস্তক। তাঁরা আরও মত প্রকাশ করলেন, একটা ধর্মমত প্রবর্তন করবার কোনো অভিপ্রায়ই মোটে যিশুর ছিল না। এই সমালোচনার ধাক্কায় প্রাচীন কালের অনেক বিশ্বাস আর ধারণার গোড়া আলগা হয়ে গেল।

 বিজ্ঞান আর গণতান্ত্রিক মতামতের পাল্লায় পড়ে প্রাচীন ধর্মমতের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে দেখে সে পুরোনো ধর্মের পরিবর্তে অন্য একটা-কিছুকে প্রতিষ্ঠিত করতে অনেকে চেষ্টা করলেন। এঁদের মধ্যে একজন ছিলেন অগস্তে কোঁৎ নামক একজন ফরাসি দার্শনিক; এঁর জীবনকাল ছিল ১৭৯৮ থেকে ১৮৫৭ সন পর্যন্ত। কোঁৎ দেখলেন, পুরোনো কালের ঈশ্বরবাদ আর গোঁড়ামি-ভরা ধর্মমতের দিন চলে গেছে; অথচ কোনো প্রকারের একটা ধর্ম সমাজের পক্ষে একান্ত প্রয়োজন বলেও তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। অতএব তিনি ‘মানবতার ধর্ম’ বলে একটা নূতন মত খাড়া করলেন, এর নাম দিলেন ‘পজিটিভিজ্‌ম্‌’, অর্থাৎ প্রত্যক্ষবাদ বা নিসর্গবাদ। এই মতবাদের ভিত্তি হবে প্রেম শৃঙ্খলা আর প্রগতি। এর মধ্যে অপার্থিব কোনো বস্তুর স্থান ছিল না; এর সমস্তটাই খাড়া করা হয়েছিল বৈজ্ঞানিক তথ্যের উপরে। ঊনবিংশ শতাব্দীর বস্তুত প্রায় সমস্ত প্রচলিত মতামতের মতো এরও পিছনে ছিল মানবজাতির প্রগতি-সাধনের আকাঙ্ক্ষা। কোঁৎএর এই ধর্ম অবশ্য অতি অল্প কয়েকজন বুদ্ধিজীবীই মাত্র গ্রহণ করলেন; কিন্তু সমস্ত ইউরোপের চিন্তাধারার উপরে তার সাধারণ প্রভাব হল অসামান্য। সমাজবিজ্ঞান বস্তুটার চর্চা বস্তুত তিনিই প্রথম শুরু করেছিলেন; এর আলোচনা-গবেষণার বিষয় হচ্ছে মানুষের সমাজ আর সংস্কৃতি।

 কোঁৎএরই সমসাময়িক ছিলেন ইংরেজ দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ, জন স্টুয়ার্ট (১৮০৬-১৮৭৩); অবশ্য কোঁৎএর মৃত্যুর পরেও ইনি বহু কাল বেঁচে ছিলেন। কোঁৎএর শিক্ষা এবং তাঁর সমাজতান্ত্রিক মতবাদ, এই দুয়েরই প্রভাব মিলের উপর পড়েছিল। অ্যাডাম স্মিথের রচনাবলীকে অবলম্বন করে ইংলণ্ডে যে অর্থনীতির শাস্ত্র গড়ে উঠেছিল, মিল তাকে একটু নূতন পথে চালাবার চেষ্টা করলেন; অর্থনীতির মতামতের মধ্যে কিছু কিছু সমাজতন্ত্রবাদের সূত্র মিশিয়ে দিলেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড়ো পরিচয় ছিল ‘হিতবাদী’দের মধ্যে প্রধান বলে। হিতবাদ একটা নূতন মতবাদ, এর অল্প কিছুকাল পূর্বে ইংলণ্ডে এর সূচনা হয়, এবং জন স্টুয়ার্ট মিলই তাকে বেশ সমৃদ্ধ ও মর্যাদাসম্পন্ন করে তোলেন। নাম শুনেই বোঝা যায়, এর মূল কথাটি হচ্ছে, মানুষের হিত বা প্রয়োজন। ‘সর্বাপেক্ষা বেশি পরিমাণ মানুষের সর্বাপেক্ষা বেশি পরিমাণ সুখশান্তি’র ব্যবস্থা করাই ছিল এই হিতবাদীদের মূল নীতি। কোনো বস্তু ভালো কি মন্দ তা যাচাই করবার এইটেই ছিল একমাত্র কষ্টিপাথর। যে কাজ মানুষের সুখশান্তি যতখানি বাড়িয়ে দেবে তাকে সেই পরিমাণে ভালো কাজ বলব; সুখশান্তির হানি যতখানি ঘটাবে সেই অনুপাতে কাজকে মন্দ কাজ বলতে হবে। সমাজ এবং শাসনব্যবস্থাও গড়তে হবে এই কথাটিকেই লক্ষ্য রেখে—সর্বাপেক্ষা অধিকসংখ্যক মানুষের সর্বাপেক্ষা অধিকপরিমাণ সুখশান্তির সংস্থান। প্রথম যুগের গণতান্ত্রিক মতবাদে বলা হয়েছিল, প্রত্যেক মানুষের সমান অধিকার থাকবে; সেটা আর এই কথাটি ঠিক এক বস্তু নয়। এমনও হওয়া আশ্চর্য নয়, সর্বাপেক্ষা ব্যবস্থা করবার জক্ষা অধিকসংখ্যক মানুষের সর্বাপেক্ষা অধিকপরিমাণ সুখশান্তির ব্যবস্থা করবার জন্যে হয়তো অল্পসংখ্যক একটা মানুষের দলের কিছু স্বার্থ বা শান্তিকে বলি দেওয়াই প্রয়োজন হবে। আমি তোমাকে এদের মধ্যে তফাতটা মাত্র দেখিয়ে দিচ্ছি; এর বিশদ আলোচনা এখানে করবার দরকার নেই। কাজেই গণতন্ত্রের মানে দাঁড়িয়ে গেল, অধিকাংশ লোকের অধিকার।

 ব্যক্তি-স্বাধীনতারূপ গণতান্ত্রিক মতবাদের কথা বলা হচ্ছিল, জন স্টুয়ার্ট মিল খুব জোরগলায় এর কথা প্রচার করলেন। ‘অন-লিবার্টি’ বা ‘স্বাধীনতা সম্বন্ধে’ নামে একটি ছোটো বই তিনি লিখলেন, বইটি খুব বিখ্যাত হয়ে গেল। বাক্যের স্বাধীনতা আর মতামত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে লেখা একটি স্থান এই বই থেকে তোমাকে উদ্ধৃত করে পাঠাচ্ছি:

 “কিন্তু কোনো-একটা মত প্রকাশ করাকেই বাধা দেওয়ার একটা নিজস্ব দোষ আছে; এতে সমগ্র মানবজাতিরই ক্ষতিসাধন করা হয়। বর্তমান কালের মানুষ এবং তার ভবিষ্যৎ যুগের বংশধর, উভয়েরই এতে ক্ষতি; যারা সে মতে বিশ্বাসী তাদের তুলনায় যারা সে মতের বিরোধী তাদেরই এতে ক্ষতি হয় আরও বেশি। মতটা যদি সত্য হয় তবে তারা নিজেদের ভ্রান্তির পরিবর্তে সত্যের সন্ধান পাবার সুযোগ হতে বঞ্চিত হচ্ছে। মতটা যদি ভ্রান্ত হয় তবে সে ক্ষেত্রেও তারা ভ্রান্তির সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে সত্যের যে স্পষ্টতর উপলব্ধি, যে প্রখরতর অনভূতি তারা পেতে পারত তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে—লাভ হিসেবে এটাও ছোটো নয়।...... যে মতটাকে আমরা শ্বাসরোধ করে মারতে চেষ্টা করছি সেটা যে মিথ্যাই, এমন কথা আমরা কখনও একেবারে নিঃসংশয়ে বলতে পারিনে; আর যদি-বা সেটা নিশ্চয় করে জানা থাকত সে ক্ষেত্রেও একে শ্বাসরোধ করে মারাটা একটা অন্যায় কাজই হত।”

 এই কথাকে ধর্মের গোঁড়ামি বা স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে একত্র মিলিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। এ হচ্ছে খাঁটি দার্শনিকের কথা, সত্যের যিনি অনসন্ধান করছেন তাঁর কথা।

 ঊনবিংশ শতাব্দীতে পশ্চিম-ইউরোপে যেসকল বড়ো বড়ো চিন্তাবীর আবির্ভূত হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অল্প কয়েকটা নাম মাত্র তোমাকে বললাম—যেন তখনকার দিনে মানুষের মতামত কীরকম ভাবে গড়ে উঠছিল তার পথের একটু ইঙ্গিত তুমি পেতে পার, যেন মনীষার জগতে এঁদের নাম তোমাকে পথ-চেনার নির্দেশ দিতে পারে। এইসব মনীষীদের প্রভাব, এক কথায় প্রথম যুগের গণতন্ত্রীদের প্রভাব, অল্পবিস্তর সীমাবদ্ধ হয়ে ছিল বুদ্ধিজীবী শ্রেণীদের মধ্যেই। সামান্য পরিমাণে হয়তো বুদ্ধিজীবীদের হাত ঘুরে সে প্রভাব অন্যদের কাছে গিয়ে পৌঁছত। জনসাধারণের উপরে এর প্রতাক্ষ প্রভাব বিশেষ কিছু পড়ে নি; তবু কিন্তু এই গণতান্ত্রিক আদর্শবাদের পরোক্ষ প্রভাব প্রচুরই হয়েছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে, যেমন ভোটের অধিকার দাবি করবার ব্যাপারে, এর প্রত্যক্ষ প্রভাবও ছিল অসামান্য।

 ঊনবিংশ শতাব্দী যতই শেষের দিকে গড়িয়ে চলল ততই আরও নানা রকমের আন্দোলন আর মতামতের সৃষ্টি হতে লাগল—এল শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলন, এল সমাজতন্ত্রবাদ। গণতন্ত্রের প্রচলিত মতামতগুলোর উপরে এদের প্রভাব পড়ল, আবার এদের উপরেও তাদের প্রভাব এসে পড়ল। অনেকে সমাজতন্ত্রবাদকে মনে করলেন গণতন্ত্রবাদের পরিবর্তে আমদানি করবার বস্তু; অন্যেরা একে ধরে নিলেন গণতন্ত্রেরই একটা আবশ্যক অঙ্গ বলে। আমরা দেখেছি, স্বাধীনতা সাম্য আর সুখভোগে সমস্ত মানুষের সমান অধিকার সম্বন্ধে নানা রকমের স্বপ্ন গণতন্ত্রবাদীরা দেখতেন। কিন্তু সুখকে শুধু মানষের একটা মৌলিক অধিকার বলে ঘোষণা করলেই অমনি সুখ এসে হাজির হয় না, এ কথা বুঝতেও তাঁদের দেরি হল না। অন্য কথা ছেড়ে দিলেও নিছক খানিকটা শারীরিক সুস্থতাই তার জন্যে প্রয়োজন হয়। অনাহারে যে লোক মারা যাচ্ছে তার পক্ষে সুখী হওয়া সম্ভব নয়। এই থেকে ক্রমে তাঁদের ধারণা হল, সমস্ত মানুষের মধ্যে ধনসম্পদ আরও ভালো করে বণ্টনের ব্যবস্থা করতে পারলে তবেই সুখ আসা সম্ভব। এর থেকেই সমাজতন্ত্রবাদের কথা এসে পড়ে; তার আলোচনা আমরা এর পরের চিঠিতে করব।

 ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম অর্ধেকে যেখানেই পরাধীন জাতি বা প্রজারা স্বাধীনতালাভের জন্যে যুদ্ধ করেছে সেইখানেই গণতন্ত্রবাদ এসে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। ইতালির ম্যাট্‌সিনি ছিলেন এই ধরনের গণতন্ত্রী দেশপ্রেমিকের চমৎকার নমুনা। এই শতাব্দীর শেষের দিকে গিয়ে জাতীয়তাবাদ ক্রমে এই গণতন্ত্রী প্রকৃতিকে বর্জন করল এবং উত্তরোত্তর উগ্রপন্থী আর কর্তৃত্বাভিলাষী হয়ে বসল। রাষ্ট্র হয়ে উঠল দেবতা, প্রত্যেক লোকেরই তাকে পূজা করতে হবে।

 নূতন শিল্পজগতের নেতা হলেন ইংলণ্ডের ব্যবসাদাররা। উচ্চস্তরের গণতান্ত্রিক নীতি আর প্রজাদের স্বাধীনতার অধিকার, এসব নিয়ে তাঁরা বিশেষ মাথা ঘামাতেন না। কিন্তু একটা তত্ত্ব তাঁরা বুঝে ফেললেন, মানুষকে আরও বেশি স্বাধীনতা দিয়ে দিলে ব্যবসাবাণিজ্যের সুবিধা হবে। এর ফলে শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি হয়, তাদের মনে একটা ভ্রান্ত বিশ্বাস আসে যে, তারা খানিকটা স্বাধীনতা ভোগ করছে, এবং তারা কাজে আরও বেশি নৈপুণ্য অর্জন করে। কাজে নৈপুণ্য আনবার জন্যেই সর্বসাধারণকে শিক্ষিত করে তোলাও প্রয়োজন। এইসমস্ত উপকারিতা হিসাব করেই ব্যবসায়ী আর শিল্পপতিরা খুব একটা মহত্ত্ব দেখিয়ে দিলেন, প্রজাদের এইসমস্ত অধিকার মঞ্জুর করতে রাজি হয়ে গেলেন। এই শতাব্দীর দ্বিতীয়-অর্ধেকে ইংলণ্ডে এবং পশ্চিম-ইউরোপের দেশগুলোতে মোটামটি একরকমের শিক্ষা খুব দ্রুতবেগে জনসাধারণের মধ্যে বিস্তৃত হয়ে পড়ল।