বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/গণতন্ত্র ও একাধিনায়কতন্ত্র
১৭৬
গণতন্ত্র ও একাধিনায়কতন্ত্র
২২শে জুন, ১৯৩৩
বেনিটো মুসোলিনি নিজেকে ইতালির ডিক্টেটর রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তাঁর দৃষ্টান্ত দেখে ইউরোপে অনেকেই উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। “ইউরোপের প্রত্যেক দেশেই একটি করে সিংহাসন শূন্য পড়ে আছে; একজন যোগ্য ব্যক্তি এসে বসবার প্রতীক্ষা করছে।” ইউরোপের অনেক দেশেই ডিক্টেটরের আবির্ভাব হয়েছে: পার্লামেণ্টগুলোকে হয় ভেঙে দেওয়া হয়েছে, না হয় তো জোর করেই ডিক্টেটরের আজ্ঞা মেনে চলতে বাধ্য করা হচ্ছে। এর একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত হচ্ছে স্পেন।
স্পেন বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেয় নি। সে যুদ্ধে যুদ্ধরত জাতিদের কাছে মালপত্র বেচে সে বেশ দু’পয়সা করে নিয়েছিল। কিন্তু তার নিজম্ব আপদ-বিপদের অভাব ছিল না; শিল্প-প্রচেষ্টার দিক থেকেও সে ছিল অত্যন্ত অনুন্নত দেশ। এককালে ইউরোপের মধ্যে তার প্রবল প্রতিপত্তি ছিল, সেদিন আমেরিকা আর প্রাচ্য জগতের ধনভাণ্ডার তারই ঘরে এসে ঢেলে পড়েছে। কিন্তু সে কাল বহুদিন আগে চলে গেছে, তাকে ইউরোপের মধ্যে কোনোরকম সম্ভ্রান্ত দেশ বলেই কেউ গণ্য করে না। দুর্বল শক্তিহীন একটা পার্লামেণ্ট ছিল তার, তার নাম কর্টেস্। রোমান ক্যাথলিকরা দেশে প্রবল ছিল। ইউরোপের অন্যান্য যেসব দেশ শিল্প-প্রচেষ্টায় বিশেষ অগ্রণী নয় তাদের দশা যা হয়েছে স্পেনেরও তাই হল—সিণ্ডিকালিজ্ম্ আর অ্যানার্কিজ্মই সে দেশে প্রসার লাভ করল, এমনিতে যে নিশ্ছিদ্র মার্ক্স্বাদ বা ইংলণ্ডে যে নরমপন্থী সমাজতন্ত্রবাদের সৃষ্টি হয়েছিল, তার বিশেষ কদর স্পেনে হল না। ১৯১৭ সনে, রাশিয়াতে বলশেভিকরা যখন ক্ষমতা হস্তগত করবার জন্য লড়াই করছিল, তখন স্পেনের শ্রমিকরা এবং প্রগতিবাদীরাও একটা দেশব্যাপী ধর্মঘট শুরু করল—তাদের উদ্দেশ্য, দেশে একটা গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র স্থাপন করবে। রাজকীয় সরকার এবং সেনাবাহিনী সে ধর্মঘটকে এবং সমস্ত আন্দোলনটাকেই ভেঙে তছনছ করে দিল; এবং তার ফলে সেনাবাহিনীই দেশের সর্বময় কর্তা হয়ে উঠল। সেনাবাহিনীর জোরে রাজাও একটু বেশি স্বাধীন এবং স্বৈরতন্ত্রী হয়ে উঠলেন।
ফ্রান্স এবং স্পেন, দু’জনে মিলে মরক্কো দেশটাকে মোটামুটি দুটো ভাগে বিভক্ত করে দুটো প্রভাবাধীন অঞ্চলে পরিণত করে নিয়েছিল। ১৯২১ সনে মরক্কোতে রিফ্দের মধ্যে আবদুল করিম নামে একজন দক্ষ নেতার আবির্ভাব হল; স্পেনের শাসনের বিরুদ্ধে ইনি বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। বিরাট যোগ্যতা এবং পরাক্রম দেখালেন তিনি, বারবার করে স্পেনের সৈন্যকে পরাজিত করলেন। এর ফলে স্পেনের মধ্যে একটা সংকট উপস্থিত হল। রাজা এবং সেনানায়করা, দু’পক্ষই চাইলেন, এই শাসনতন্ত্র এবং পার্লামেণ্টকে খতম করে দেওয়া হোক, দিয়ে একটা ডিক্টেটরি শাসন প্রতিষ্ঠা করা হোক। এ পর্যন্ত এঁদের মতের মিল ছিল। মতের অমিল হল পরের কথাটি নিয়ে সে ডিক্টেটর হবেন কে? রাজার ইচ্ছা তিনিই ডিক্টেটর বা সর্বশক্তিমান রাজা হয়ে যাবেন। সৈন্যদের ইচ্ছা, ডিক্টেটরের আসনটা সেনাবাহিনীর হাতেই থাকে। ১৯২৩ সনের সেপ্টেম্বর মাসে সৈন্যরা বিদ্রোহ করল। সেনাবাহিনীরই জয় হল; জেনারেল প্রাইমো ডি রিভেরা দেশের ডিক্টেটর হয়ে বসলেন। কর্টেস্ অর্থাৎ পার্লামেণ্টকে তিনি বাতিল করে দিলেন, দিয়ে খোলাখুলিই গায়ের জোরে, মানে সেনাবাহিনীর জোরে দেশ শাসন করতে লাগলেন। কিন্তু মরক্কোতে রিফ্দের বিরুদ্ধে যে অভিযান চলছিল সেটা সফল হল না, আবদুল করিম তখনও বেশ সদর্পেই স্পেনের শাসনকে অগ্রাহ্য করে চললেন। স্পেন সরকার তাঁকে খুব লাভজনক শর্তে সন্ধি করতে পর্যন্ত আহ্বান জানালেন, কিন্তু আবদুল করিম তাতে কান দিলেন না—পূর্ণ স্বাধীনতার জন্যই লড়ে যেতে লাগলেন। খুব সম্ভবত একা হাতে তাঁকে দমন করা স্পেন সরকারের সাধ্যে কুলিয়ে উঠত না। কিন্তু মরক্কোতে ফরাসিদেরও অনেকখানি স্বার্থ ছিল; ১৯২৫ সনে তারাও এসে স্পেনের সঙ্গে যোগ দিল; ফ্রান্সের বিরাট রণসজ্জা নিয়ে তারা আবদুল করিমের বিরুদ্ধে অভিযান করল। ১৯২৬ সনে আবদুল করিম পরাজিত হলেন; ফরাসিদের কাছে আত্মসমর্পণের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সে দীর্ঘ এবং বীরোচিত সংগ্রামের অবসান হয়ে গেল।
স্পেনে এই আগাগোড়া সময়টাই প্রাইমো ডি রিভেরা ডিক্টেটর হয়ে শাসন করছিলেন; সামরিক শক্তি, সেন্সর, নিপীড়ন এবং মাঝেমাঝে সামরিক আইনের প্রয়োগ ইত্যাদি যে-সব ব্যাপার ডিক্টেটরি শাসনের অপরিহার্য অঙ্গ, এখানেও তার কোনোটারই অভাব ছিল না। একটি কথা মনে রেখো, স্পেনের এই ডিক্টেটরি শাসন আর মুসোলিনির শাসন এক বস্তু নয়; এটা দাঁড়িয়ে ছিল একমাত্র সেনাবাহিনীর উপর নির্ভর করে, আর ইতালিতে মুসোলিনির শক্তির মূলে ছিল প্রজাদেরই মধ্যে কয়েকটা শ্রেণীর সমর্থন। অতএব সেনাবাহিনী যখন প্রাইমো ডি রিভেরার উপর বিরক্ত হয়ে উঠল, তাঁর আর দাঁড়িয়ে থাকবার দ্বিতীয় অবলম্বন রইল না। ১৯৩০ সনের প্রথম দিকে রাজা তাঁকে পদচ্যুত করলেন। সেই বছরই দেশে একটা বিপ্লব হল। সে বিপ্লব দমন করা হল, কিন্তু প্রজাতন্ত্র এবং বিপ্লবের জন্য যে ব্যাপক উৎসাহ দেশে দেখা দিয়েছিল তাকে দমানো সম্ভব হল না। ১৯৩১ সনে প্রজাতন্ত্রীরা তাদের শক্তির বহর দেখিয়ে দিল, মিউনিসিপ্যালিটির নির্বাচনগুলো তারা অক্লেশে জিতে নিল। “দূরদৃষ্টিই বীরত্বের সবচেয়ে বড়ো অংশ”, রাজা অ্যালফন্সো এই মহাজনবাক্য শিরোধার্য করে নিলেন; সিংহাসন ছেড়ে দিয়ে দেশ থেকে পালিয়ে গেলেন। দেশে একটা অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠিত হল। স্পেন ছিল ইউরোপের মধ্যে স্বৈরতন্ত্রী রাজশাসন এবং ধর্মযাজকদের শাসনের প্রাচীন নিদর্শন; সে এবারে পরিণত হল ইউরোপের সর্বকনিষ্ঠ প্রজাতন্ত্রের। ভূতপূর্ব রাজা অ্যালফন্সোকে আইনের শত্রু বলে ঘোষণা করা হল; ধর্মযাজকদের প্রতিপত্তিও হ্রাস করবার জন্য চেষ্টা চলল।
কিন্তু আমি বলছিলাম ডিক্টেটরদের কথা। ইতালি এবং স্পেন ছাড়া আরও বহু দেশে গণতান্ত্রিক সরকারকে উচ্ছেদ করে দিয়ে ডিক্টেটরি শাসন প্রতিষ্ঠিত করা হল: এদের নাম হচ্ছে, পোল্যাণ্ড, গোলাড, যুগোশ্লাভিয়া, বুলগেরিয়া, পর্তুগাল, হাঙ্গেরি এবং অস্ট্রিয়া। পোল্যাণ্ডে জারের যুগের বৃদ্ধ সমাজতন্ত্রী নেতা পিলসুদ্স্কি ডিক্টেটর হয়ে বসলেন, কারণ সেনাবাহিনী তাঁরই হাতে। পোল্যাণ্ডের পার্লামেণ্টের সভ্যদের প্রতি তিনি অত্যন্ত অপূর্ব রকম বিশ্রী গালাগালিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করতেন; মাঝে মাঝে তাঁদের গ্রেপ্তার করে বোঁচকাবুঁচকিসুদ্ধ তাড়িয়ে দিতেন। যুগোশ্লাভিয়াতে রাজা আলেকজাণ্ডার নিজেই ডিক্টেটর হয়ে বসেছেন; শোনা যায় সে দেশের বহুস্থানে নাকি অবস্থা এত খারাপ, লোকের উপরে এত উৎপীড়ন চলছে, যে তুর্কিরা যখন দেশের প্রভু ছিল সেযুগেও এতটা হয় নি।
যতগুলো দেশের আমি নাম করলাম তার সব দেশে হয়তো এখন প্রকাশ্য ডিক্টেটরি শাসন প্রচলিত নেই। এদের শাসন-ব্যবস্থার এত ঘনঘন পরিবর্তন হচ্ছে যে তার সঙ্গে তাল রেখে চলাই মুশকিল। এক-একবার এদের পার্লামেণ্টরা দুদিনের মতো মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, হয়তো কিছুদিনের কাজকর্মও চালিয়ে যায়। এক-একবার আবার সরকার পক্ষ হঠাৎ কমিউনিস্ট ইত্যাদি যে-সব প্রতিনিধিদের তাঁরা পছন্দ করেন না তাদের দলকে-দলসুদ্ধ গ্রেপ্তার করে বসেন, পার্লামেণ্ট থেকে জোর করেই তাদের তাড়িয়ে দেন; অন্য যারা বাকি থাকে, তারাই তখন যেমন পারে কাজকর্ম চালিয়ে যেতে থাকে; বুলগেরিয়াতে সম্প্রতি ঠিক এই ব্যাপার ঘটেছে। এই-সব দেশের প্রজারা সারাক্ষণই বাস করছে ডিক্টেটরি শাসনের অধীনে বা তার ঠিক কাছাকাছি একটা অবস্থায়। বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি বা ক্ষুদ্র দলের পরিচালিত এই সব সরকারপক্ষ নিছক গায়ের জোরের উপরেই টিঁঁকে রয়েছেন; অতএব আত্মরক্ষার খাতিরেই এঁদের সারাক্ষণ বিরোধী পক্ষের লোকদের পীড়ন, হত্যা বা কারারুদ্ধ করতে হচ্ছে, সংবাদ প্রচারের ব্যাপারে কঠোর সেন্সর বসাতে হচ্ছে, বহুবিস্তৃত একটা গুপ্তচর বাহিনী রাখতে হচ্ছে।
ইউরোপের বাইরেও বহু ডিক্টেটরের আবির্ভাব হয়েছিল। তুরস্ক এবং কামাল্ পাশার কথা তোমাকে আগেই বলেছি। দক্ষিণ আমেরিকাতেও অনেক ডিক্টেটর ছিল; তবে সেখানে ওটা পরোনো কাল থেকেই আছে—দক্ষিণ আমেরিকার প্রজাতন্ত্ররা কোনোদিনই গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বিশেষ ভক্ত নয়।
যে-সব দেশে ডিক্টেটরি শাসন আছে বলে বলেছি, তার মধ্যে আমি সোভিয়েট ইউনিয়নের নাম করি নি। তার কারণ সেখানে যে ডিক্টেটরি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার নির্মমতা অন্য যে-কোনো দেশেরই সমান হলেও, তার প্রকৃতি অন্যান্য দেশের তুলনায় অন্যরকম। রাশিয়ার ডিক্টেটরি শাসন কোনো একজন ব্যক্তি বা একটা ছোটো দলের শাসন নয়, একটি সুসংহত রাজনৈতিক দলের শাসন, সে শাসন প্রধানত প্রতিষ্ঠিত রয়েছে শ্রমিক শ্রেণীদের উপর নির্ভর করে। এর নাম তারা দিয়েছে “সর্বহারা শ্রমিকদের একাধিনায়কত্ব”। অতএব আমরা মোট তিনরকমের ডিক্টেটরি শাসন দেখতে পাচ্ছি—কমিউনিস্টদের, ফ্যাসিস্টদের এবং সেনাবাহিনীর শাসন। সেনাবাহিনীর শাসনের মধ্যে অবশ্য বিশেষ অভিনবত্ব কিছুই নেই, ইতিহাসের প্রথম যুগ থেকেই সে বস্তু পৃথিবীতে চলে এসেছে। কমিউনিস্ট এবং ফ্যাসিস্টদের শাসনরীতিটাই হচ্ছে পৃথিবীতে নূতন বস্তু; আমাদের এই যুগের দুটি বিশেষ সৃষ্টি।
একটি জিনিস সকলের আগেই চোখে পড়ে: এই ডিক্টেটরতন্ত্র এবং এর যত নানাবিধ প্রকারভেদ দেখা দিয়েছে, এরা হচ্ছে গণতন্ত্র এবং পার্লামেণ্টী শাসনতন্ত্রের ঠিক বিপরীত বস্তু। তোমাকে বলেছিলাম, ঊনবিংশ শতাব্দীটা ছিল গণতন্ত্রের যুগ—এই শতাব্দীতেই ফরাসি বিপ্লবের প্রচারিত ‘মানুষের অধিকার’ সমস্ত চিন্তাশীল মানুষের মনে প্রভাব বিস্তার করেছিল; ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হয়ে উঠেছিল সমস্ত মানুষের লক্ষ্য। তাই থেকেই ইউরোপের প্রায় সমস্ত দেশে নানারূপে পার্লামেণ্টী শাসন-ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছিল। অর্থনীতির রাজ্যেও এরই থেকে জন্ম হল ‘লেইজে ফেয়ার্’ বা অবাধ বাণিজ্য নীতির। বিংশ শতাব্দীতে, ঠিক তাই নয়, বরং বলা যায় যুদ্ধোত্তর যুগে, ঊনবিংশ শতাব্দীর সেই বিরাট ঐতিহ্যের অবসান হয়ে গেল; নিয়মানুগ গণতন্ত্রের উপরে লোকের শ্রদ্ধা এখন দিন দিনই কমে চলেছে। গণতন্ত্রের পতনের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক দেশেই তথাকথিত উদারপন্থী দলদেরও মর্যাদা লুপ্ত হয়েছে; এখন আর এদের কোনো গুরুত্ব আছে বলেই লোকে মনে করে না।
কমিউনিস্ট এবং ফ্যাসিস্ট দুই দলই গণতন্ত্রের সমালোচনা এবং বিরোধিতা করে; কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা কারণে। যে-সব দেশ কমিউনিজ্ম্ বা ফ্যাসিজ্মে বিশ্বাসী নয়, সেখানেও গণতন্ত্রের এখন আর আগের মতো আদর নেই। পার্লামেণ্ট এককালে যা ছিল এখন আর তা নেই, লোকে তাকে আর বিশেষ শ্রদ্ধা করে না। শাসন বিভাগের বড়ো কর্তাদের হাতে বিপুল ক্ষমতা তুলে দিয়ে বলা হচ্ছে, তোমরা যা দরকার মনে কর তাই করে যাও, পার্লামেণ্টের মতামত আর যাচাই করতে হবে না। এর খানিকটা কারণ হচ্ছে যুগমাহাত্ম্য—এমন একটা সংকট মুহূর্তে আমরা বাস করছি যেখানে দ্রুত ব্যবস্থারই প্রয়োজন; নির্বাচিত প্রতিনিধিগুলোর সভা ডেকে সে দ্রুত ব্যবস্থা সর্বদা করা সম্ভব হয় না। জর্মনি সম্প্রতি তার পার্লামেণ্টকে একেবারেই বাতিল করে দিয়েছে, ফাসিস্ট শাসনের এমন একটা রূপ প্রতিষ্ঠিত করেছে যার চেয়ে খারাপ আর হয় না। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র চিরদিনই তার প্রেসিডেণ্টের হাতে অনেকখানি ক্ষমতা তুলে দিয়ে এসেছে; সম্প্রতি তার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ইংলণ্ড আর ফ্রান্স, এই দুটি মাত্র দেশই বোধহয় এখন আছে যেখানে পার্লামেণ্ট আগের দিনের মতোই কাজ করে যাচ্ছে, অন্তত বাইরের দৃষ্টিতে; ফ্যাসিস্টপন্থী কার্যকলাপ যেটুকু এদের আছে সেটা ঘটছে এদের অধীন দেশ এবং উপনিবেশগুলিতে—ভারতবর্ষে আমরা ব্রিটিশ ফ্যাসিজ্মের নমুনা দেখতে পাচ্ছি, ইন্দোচীনে ফ্রান্সের ফ্যাসিজ্ম ‘শান্তিপ্রতিষ্ঠা’ করছে। কিন্তু লণ্ডন এবং প্যারিসেও এখন পার্লামেণ্ট দিন দিন হয়ে উঠছে শুধু একটা শূন্য খোলা। এই তো গত মাসেই ইংলণ্ডের উদারপন্থীদের একজন প্রধান ব্যক্তি বলেছেন:
“আমাদের এই নির্বাচন-সৃষ্ট পার্লামেণ্ট অতি দ্রুতবেগে একটি যন্ত্রমাত্রে পরিণত হয়ে যাচ্ছে; তার কাজ হচ্ছে শাসনকর্তৃত্বাধিকারী একটি ক্ষুদ্র দলের আদেশগুলোকে লিপিবদ্ধ করে রাখা। ত্রুটিবহুল এবং কর্মক্ষম একটি নির্বাচন-ব্যবস্থার দ্বারা সে শাসকমণ্ডলী নির্বাচিত।”
ঊনবিংশ শতাব্দীতে যে গণতন্ত্র এবং পার্লামেণ্টের জন্ম হয়েছিল, এখন সর্বত্রই তার শক্তি ক্ষীণ হয়ে আসছে। অনেক দেশে একে খোলাগুলি এবং বেশ রূঢ়ভাবেই বাতিল করে দেওয়া হয়েছে; অনেক দেশে আবার এর সত্যকার তাৎপর্যটাই শুধু গেছে অন্তর্হিত হয়ে, সেখানে এটা একটা “গম্ভীর এবং শূন্যগর্ভ অনুষ্ঠান” মাত্রে পর্যবসিত হয়েছে। পার্লামেণ্টের এই অবনতি, একজন ঐতিহাসিক একে ঊনবিংশ শতাব্দীতে রাজতন্ত্রের যে অবনতি ঘটেছিল তারই সঙ্গে তুলনা করেছেন। ইনি বলেন, ইংলণ্ডের এবং অন্যান্য দেশের রাজারা প্রকৃত ক্ষমতা হারিয়ে প্রজাধীন রাজায় পরিণত হয়েছেন, শুধু খানিকটা লোক-দেখানো ব্যাপার হিসাবেই এখনও টিঁকে আছেন; ঠিক এঁদেরই মতো পার্লামেণ্টও একদিন শন্তিহীন এবং মর্যাদাশালী প্রতীকমাত্রে পরিণত হবে, সেদিন বাইরে থেকেই তাকে দেখতে প্রকাণ্ড এবং প্রচণ্ড ব্যাপার বলে মনে হবে, কিন্তু তার মধ্যে বস্তু কিছুই থাকবে না। সে অবনতি তার ইতিমধ্যেই আরম্ভ হয়ে গেছে।
কিন্তু এটা হল কেন? পুরো একটা শতাব্দী, বা তার চেয়েও বেশিকাল ধরে গণতন্ত্র অসংখ্য মানুষের জীবনের আদর্শ হয়ে রয়েছে, তাদের প্রেরণা জুগিয়েছে; হাজার হাজার মানুষ এরই জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছে; আজ কেন সে গণতন্ত্র এমন অনাদরের বস্তু হয়ে উঠল? এতবড়ো একটা পরিবর্তন তো বিনা কারণে ঘটে না; শুধু চঞ্চলমতি জনসাধারণের সাময়িক হুজুগ বা খেয়ালের জন্য এটা নিশ্চয়ই হয় নি। এখনকার দিনে আমাদের জীবনযাত্রার মধ্যেই এমন কিছু নিশ্চয়ই আছে, যেটা ঊনবিংশ শতাব্দীর সেই নিয়মানুগ গণতন্ত্রের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না। ব্যাপারটা চিত্তাকর্ষক, কিন্তু জটিল। এর বিশদ আলোচনা করা এখানে সম্ভব নয়; তবু দুটো একটা কথা তোমাকে বলছি।
গণতন্ত্রকে আমি ‘নিয়মানুগ’ বলেছি। কমিউনিস্টরা বলেন, এই গণতন্ত্র প্রকৃত গণতন্ত্র নয়; এটা শুধু একটা গণতন্ত্রবেশী খোলস, একটি শ্রেণী অন্যদের উপরে প্রভুত্ব করছে এই তত্ত্বটি এর আবরণে লুকিয়ে রাখা হয়। তাঁরা বলেন, ধনিকশ্রেণীর যে ডিক্টেটরি শাসন সমাজে চলছিল তাকেই এই গণতন্ত্র দিয়ে ঢেকে রাখা হচ্ছিল। বস্তুত এটা ছিল ধনতন্ত্র, বড়ো লোকদের শাসন। জনসাধারণকে যে ভোটের অধিকার দেওয়া হয়েছিল তা নিয়ে ঢাকঢোল অনেক পেটা হয়েছে; আসলে তার দ্বারা জনসাধারণকে চার বা পাঁচবছরে একবার মতপ্রকাশ করবার অনুমতি দেওয়া হত—বলো, ‘ক’ নামক ব্যক্তিটি তোমাদের শাসন এবং শোষণ করবেন, না ‘খ’ নামক ব্যক্তিটি করবেন। কিন্তু নাম যারই উঠুক, শাসক শ্রেণীর হাতে জনসাধারণের শোষণটা ঠিকই চলবে। সত্যকার গণতন্ত্র আসতে পারে শুধু তখনই, যখন এই ধরনের শ্রেণীবিশেষের শাসন এবং শোষণ অন্তর্হিত হয়ে যাবে, একটিমাত্র শ্রেণী পৃথিবীতে থাকবে। কিন্তু সেই সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা যদি করতে চাই, তবে তার আগে কিছুকালের জন্য ‘সর্বহারা জনগণের একাধিনায়কতন্ত্রী’ শাসন চলতেই হবে, যেন প্রজাদের মধ্যে যেসব ধনিকতন্ত্রী ও বুর্জোয়াশ্রেণীর লোক আছে তারা মাথা তুলতে না পারে, শ্রমিকদের শাসিত সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চক্রান্ত বিস্তার করতে না পারে। এই একনায়কতন্ত্রেরই প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে সোভিয়েটগুলিতে—সমস্ত শ্রমিক, কৃষক এবং অন্যান্য ‘কর্মী’ ব্যক্তিদের প্রতিনিধি দিয়েই সে সোভিয়েটগুলি গড়া। তাই এই শাসন হচ্ছে দেশের লোকের শতকরা ৯০ বা ৯৫ জনের ডিক্টেটরি শাসন, বাকি শতকরা ৫ বা ১০ জনের উপরে। এই গেল এদের নীতির কথা। কার্যত দেখা যাচ্ছে, কমিউনিস্ট দল সোভিয়েটগুলোকে চালাচ্ছে, দলটাকে চালাচ্ছে কমিউনিস্টদের মধ্যে কয়েকজন নেতৃস্থানীয় মাতব্বর। আর সেন্সর-ব্যবস্থা, চিন্তা ও কাজের স্বাধীনতা ইত্যাদির কথা যদি বল, সেখানে এদের ডিক্টেটরি শাসন অন্য যে-কোনো ডিক্টেটরির মতোই কঠোর। তবুও এই শাসন শ্রমিকদের সদিচ্ছার উপরেই প্রতিষ্ঠিত, অতএব শ্রমিকদের ভালোর দিকে একে তাকাতেই হচ্ছে। শেষ কথা, এখানে শ্রমিককে, বা এক শ্রেণীর ভালোর জন্য অন্য শ্রেণীকে, শোষণ করার কোনো ব্যাপার নেই, শোষক শ্রেণী বলে কাউকে অবশিষ্টই রাখা হয় নি। শোষণ যদি এর কোথাও থাকেই, তবে সে শোষণ করছে রাষ্ট্র স্বয়ং, সকলেরই ভালোর জন্য। একথা মনে রেখো, রাশিয়াতে কোনোদিনই গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল না। ১৯১৭ সনে সে স্বৈরতন্ত্রী রাজতন্ত্র থেকেই এক লাফে কমিউনিজ্ম্-এর রাজ্যে গিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিল।
ফ্যাসিস্টদের কথা এর একেবারে উল্টো। আগের চিঠিতেই বলেছি, ফ্যাসিস্টদের নীতিটা কী তা বোঝা শক্ত; তার কারণ, নির্দিষ্ট নীতি কিছু তাদের আছে বলেই মনে হয় না। গণতন্ত্রের তারা বিরোধী তাতে সন্দেহ নেই; কিন্তু কমিউনিস্টরা যে কারণে গণতন্ত্রে আপত্তি করে এদের কারণ তা নয়। কমিউনিস্টরা বলে, এই গণতন্ত্র সত্যকার জিনিস নয়, তার একটা ভানমাত্র। গণতন্ত্রের গোড়ায় যে মূল নীতিটা আছে তার সম্বন্ধেই ফ্যাসিস্টদের আপত্তি যেটুকু জোর তাদের গলায় আছে সবখানি দিয়ে তারা গণতন্ত্রকে গালাগালি দেয়। মুসোলিনি একে বলেছেন একটা “গলিত মৃতদেহ”! ব্যক্তিগত স্বাধীনতার নামও ফ্যাসিস্টরা সবাই অপছন্দ করে। তাদের মতে রাষ্ট্রই হচ্ছে সব; বাক্তির কোন দামই নেই। (বাক্তিগত স্বাধীনতাকে কমিউনিস্টরাও বিশেষ মূল্যবান বস্তু বলে মনে করে না)। ঊনবিংশ শতাব্দীতে গণতান্ত্রিক উদারনীতির বার্তা বহন করে এনেছিলেন ঋষি ম্যাট্সিনি; আজ তাঁরই স্বদেশবাসী মুসোলিনিকে দেখলে সে বেচারী কী বলতেন কে জানে!
কেবল কমিউনিস্ট আর ফ্যাসিস্টরা নয়, বর্তমান যুগের বিশৃঙ্খলা নিয়ে যাঁরা চিন্তা করে দেখেছেন, এমন আরও অনেকেই এখন ক্ষুব্ধ; আগের দিনের কথা ছিল লোককে একটা ভোট দেবার অধিকার দাও, তাহলেই গণতন্ত্র হয়ে গেল—এটা এঁরা আর মানতে চাইছেন না। গণতন্ত্রের মানেই হচ্ছে সাম্য; সমাজের মধ্যে সকলে সমান হলে তবেই গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হতে পারে। এটা এখন সবাই বুঝেছে, শুধু প্রত্যেকটা লোককে ভোট দেবার অধিকার দিয়ে দিলেই সমাজে সাম্যের সৃষ্টি হয় না। প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যেক ব্যক্তিকে এখন ভোটের অধিকার দেওয়া হয়েছে, আরও কত কি হয়েছে, তবু তো আজও মানুষে মানুষে প্রচণ্ড বৈষম্য দেখা যাচ্ছে! কাজেই গণতন্ত্রকে যদি সত্যই প্রতিষ্ঠিত করতে চাই, তবে সেই সাম্য-প্রধান সমাজ আগে সৃষ্টি করতেই হবে। এই যুক্তি ধ’রে এঁরা অন্য বহু রকমের আদর্শ এবং কর্ম পন্থা স্থির করেছেন। মত অনেক, পথও অনেক—কিন্তু একটি ব্যাপারে এঁরা সকলেই একমত: এখনকার দিনে যে পার্লামেণ্ট আমরা দেখতে পাচ্ছি এগুলো দিয়ে কোনো কাজই হবে না।
ফ্যাসিজ্ম্কে আরও একটু তলিয়ে দেখা যাক, দেখি এই বস্তুটা কী, তার হদিশ মেলে কি না। হিংসাবৃত্তিকে এরা গৌরবের বলে মনে করে, শান্তিকামীদের ঘৃণা করে। ‘এনসাইক্লোপিডিয়া ইটালিয়ানা’তে মুসোলিনি লিখেছেন:
“চিরস্থায়ী শান্তির প্রয়োজন বা উপকারিতা আছে বলে ফ্যাসিজ্ম্ বিশ্বাস করে না। অতএব যুদ্ধবিরোধিতাকে সে অন্যায় বলে মনে করে; কারণ তার মধ্যে লুকিয়ে থাকে সংগ্রাম করতে অস্বীকৃতি এবং একটা মূলগত কাপুরষতা—আত্মবলির যেখানে প্রয়োজন সেইখানে কাপুরুষতা প্রদর্শন। যুদ্ধ, একমাত্র যুদ্ধই, মানুষের কর্ম-প্রচেষ্টাকে তার চরম শিখরে নিয়ে পৌঁছে দিতে পারে; সে যুদ্ধকে স্বীকার করে নেবার সাহস যাদের আছে তাদের কপালে সে গৌরবের টীকা পরিয়ে দেয়। অন্য যে-সব পরীক্ষা মানুষের জীবনে আসে সেগুলো এরই লঘুতর বিকল্প মাত্র; জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে বাছাই করে নেবার অগ্নিপরীক্ষায় তারা মানুষকে ফেলে না।”
ফ্যাসিজ্ম্ জাতীয়তাবাদের উগ্র উপাসক; কমিউনিজ্ম্ আন্তর্জাতিক ঐক্যে বিশ্বাসী। ফ্যাসিজ্ম্ বাস্তবিকই আন্তর্জাতিকতার বিরোধী। রাষ্ট্রকে সে বসিয়েছে দেবতার আসনে, সে দেবতার পূজাবেদীর সামনে ব্যক্তির সমস্ত স্বাধীনতাকে এবং অধিকারকে বলি দিতেই হবে— রাষ্ট্রের বাইরে আর যত দেশ আছে সকলেই তার পক্ষে বিদেশী, প্রায় শত্রুরই শামিল। ইহুদিদের এরা বিদেশী বলেই জানে, অতএব তাদের উপর সাধারণত অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করে। ফ্যাসিস্টরা কতকগুলো ধনিকতন্ত্র-বিরোধী ধ্বনি উচ্চারণ করে, কতকগুলো বিপ্লবী-সুলভ রীতিনীতিও তাদের আছে; তবু মূলত তারা বিত্তশালী মালিকশ্রেণী এবং প্রগতিবিরোধীদেরই মিত্র।
ফ্যাসিজ্মের এগুলো অদ্ভুত অঙ্গ। দর্শন বলে কিছু যদি এর মধ্যে থাকেও, তাকে ধরা-ছোঁয়া একটা দুরূহ ব্যাপার। আমরা দেখেছি, ফ্যাসিজ্মের উৎপত্তি হয়েছিল নিছক প্রভুত্বের কামনা থেকে। তারপর সিদ্ধি যখন মিলল, তখন একে অবলম্বন করে একটা নিজ দর্শন খাড়া করবার চেষ্টা হল। সবসুদ্ধ সে দর্শনটা কতখানি প্যাঁচালো তার খানিকটা নমুনা তোমাকে দেখাবার এবং তোমাকে একটু ধাঁধা লাগিয়ে দেবার জন্যই, ফ্যাসিস্টদের একজন বড়ো দার্শনিকের লেখা থেকে খানিকটা জায়গা তোমাকে শোনাব। এঁর নাম গিওভান্নি জেণ্টিলে; এঁকে ফ্যাসিস্ট-দর্শনের সরকারি বিশেষজ্ঞ বলা হয়। ফ্যাসিস্ট সরকারে ইনি মন্ত্রীর পদেও এককালে অধিষ্ঠিত ছিলেন। জেণ্টিলে বলেন, গণতন্ত্রে যেমন হয় সেভাবে নিজস্ব ব্যক্তিত্ব বা ব্যক্তিগত সত্তার মধ্য দিয়ে আত্মোপলব্ধির চেষ্টা মানুষের করা উচিত নয়; ফ্যাসিজ্মের মত হচ্ছে, সেটা তাদের করতে হবে জগতের আত্ম-চেতনাস্বরূপ সেই জ্ঞানাতীত অহং-এর মধ্য দিয়ে (এর মানে যাই হোক না—তার অর্থ বোঝা আমার সাধ্যাতীত)। এই মতবাদের মধ্যে মানুষের নিজস্ব স্বাধীনতা বা ব্যক্তিত্বের কোনোই স্থান নেই; কারণ এদের মতে ব্যক্তির প্রকৃত সত্তা এবং স্বাধীনতা হচ্ছে সেইটাই, যা সে অর্জন করবে অন্য একটা বস্তুর মধ্যে—মানে রাষ্ট্রের মধ্যে—নিজেকে অবলুপ্ত করে দিয়ে।
“পরিবার, রাষ্ট্র এবং আত্মার মধ্যে নিমজ্জিত এবং প্রত্যাহৃত হবার ফলে আমার ব্যক্তিত্ব লুপ্ত হবে না, বরং উন্নীত হবে, শক্তিশালী হবে, বৃহত্তর হবে।”
আরেক জায়গায় জেণ্টিলে বলছেন:
“সকল বলই নৈতিক বল, কারণ ইচ্ছাকে সে নিয়ন্ত্রিত করবার শক্তি রাখে—যুক্তিহিসাবে সে উপদেশ বা ডাণ্ডা, যাই প্রয়োগ করুক না কেন।”
অতএব এবার বুঝতে পারছি, ভারতবর্ষে যখন ব্রিটিশ সরকার একটা লাঠি-চার্জ চালায়, কী বিপুল পরিমাণ নৈতিক বলেরই প্রয়োগ করা হয় সেখানে!
আসলে এর সবটাই হচ্ছে, যে ব্যাপার ঘটে গেছে, পরে ধীরেসুস্থে সে তার একটা ব্যাখা বা সাফাই খাড়া করবার চেষ্টা। অনেকে আবার বলেন, ফ্যাসিজ্মের উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি “সমবায় রাষ্ট্র” প্রতিষ্ঠা করা। সে রাষ্ট্রে বোধহয় সকলেই একত্র হবে সার্বজনীন কল্যাণ সাধনের চেষ্টা করবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ইতালিতে বা আর কোথাও সেরকম রাষ্ট্রের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় নি। ধনিকতন্ত্র অন্যান্য ধনিকতন্ত্রী দেশে যেভাবে চলে থাকে ইতালিতেও প্রায় সেই একই ভাবে চলছে।
ফ্যাসিজ্ম্ অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে, অতএব এটা এখন স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, এটা ইতালিরই কোনো নিজস্ব বিশেষত্ব নয়; বিশেষ কতকগুলো সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা দেশে প্রবল থাকলেই সেখানে এর আবির্ভাব হতে পারে। শ্রমিকরা যখন প্রবল হয়ে ওঠে, ধনিকতন্ত্রী রাষ্ট্রকে বস্তুত ভেঙে দেবার উপক্রম করে, স্বভাবতই তখন ধনিকতন্ত্রী শ্রেণীও নিজেদের রক্ষা করতে চেষ্টা করে। শ্রমিকদের তরফ থেকে এই শাসানি সাধারণত আসে প্রচণ্ড আর্থিক সংকটের সময়ে। মালিক এবং শাসক শ্রেণী সাধারণ গণতান্ত্রিক রীতিতে অর্থাৎ পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর সাহায্যে তাদের সে বিদ্রোহ দমন করতে চেষ্টা করে এদের দিয়েও যখন কাজ হয় না তখনই সে আশ্রয় নেয় ফ্যাসিস্ট রীতির। সে রীতিটি হচ্ছে জনসাধারণের মধ্যে একটা আন্দোলন শুরু করা হয়, এমন কতকগুলো ধ্বনির আমদানি করা হয় যা জনতার পক্ষে শ্রুতিরোচক; কিন্তু এর আসল উদ্দেশ্য থাকে বিত্তশালী ধনিকশ্রেণীকে রক্ষা করা। এই আন্দোলনের শক্তির যোগান প্রধানত আসে নিম্নতর মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে; তাদের অধিকাংশ লোকই বেকারসমস্যার দ্বারা পীড়িত, ক্ষুব্ধ। রাজনৈতিক চেতনা-বিহীন এবং অসংহত শ্রমিক এবং কৃষক যারা আছে তাদেরও মধ্যে অনেকে এর দিকে আকৃষ্ট হয় বড়ো বড়ো ধ্বনি শুনে তারা মুগ্ধ হয়, এবার তাদের ভাগ্য ফিরে যাবে এই আশায় তারা প্রলুব্ধ হয়। বৃহত্তর বুর্জোয়াদের এই আন্দোলনে লাভের আশা আছে, অতএব তারা একে টাকা দিয়ে সাহায্য করে। এই আন্দোলন হিংসাবৃত্তিকে তার নীতি বলে গ্রহণ করে, দৈনন্দিন আচরণে পরিণত করে; তবু দেশের ধনিকতন্ত্রী সরকার একে অনেকখানিই ক্ষমা করে চলে, কারণ এই আন্দোলন উভয়েরই শত্রুপক্ষের সঙ্গে লড়াই করছে,—সে শত্রুপক্ষ হচ্ছে সমাজতন্ত্রী শ্রমিকদল। দল হিসাবেই, এবং দেশের শাসনকর্তৃত্ব যদি এদের অধিকারে আসে তবে আরও বেশি করেই এরা শ্রমিকদের সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে চুরে দেয়, সমস্ত বিপক্ষ দলকে ভয় দেখিয়ে স্তব্ধ করে রাখে।
অতএব ফ্যাসিজ্মের জন্ম হয় তখনই, যখন অগ্রসারী সমাজতন্ত্রবাদ আর শত্রুবেষ্টিত ধনিকতন্ত্রবাদের মধ্যে সংগ্রাম অত্যন্ত তীব্র এবং মারাত্মক হয়ে উঠেছে। সমাজের মধ্যেকার এই সংগ্রামের সৃষ্টি ভ্রান্ত ধারণা থেকে হয় না; আমাদের বর্তমান সমাজের মধ্যেই যে-সব স্বার্থের বিভেদ এবং বিরোধ নিহিত রয়েছে, তাকে ভালো করে বোঝাবার ফলেই এর সৃষ্টি। কেবল অবজ্ঞা করে এই বিরোধ মিটিয়ে ফেলা যায় না। বর্তমান অবস্থা যে লোকদের পক্ষে দুর্দশার কারণ, তারা স্বার্থের বিভেদটাকে যত ভালো করে বুঝতে পারে, যেটা তাদের ন্যায্য প্রাপ্য বলে তাদের ধারণা সেটা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকতে তাদের আপত্তিও ততই বেড়ে ওঠে। মালিক শ্রেণীরও যেটাকে হাতে পেয়ে গেছে তাকে ছেড়ে দেবার কোনো অভিপ্রায় নেই, অতএব সংগ্রামের তীব্রতা ক্রমেই বাড়তে থাকে। ধনিকতন্ত্রীরা যতদিন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানদের সাহায্যে শাসনক্ষমতা নিজেদের আয়ত্ত করে রাখতে এবং শ্রমিকদের দাবিয়ে রাখতে পারছে, ততদিন গণতন্ত্রকেও তারা জীইয়ে রাখে। সেটা যখন আর সম্ভব হয় না, তখন ধনিকতন্ত্রীরা গণতন্ত্রকে অকেজো বলে পরিত্যাগ করে, অনাবৃত ফ্যাসিস্ট নীতির আশ্রয় গ্রহণ করে—তার অস্ত্র পীড়ন এবং ত্রাসসৃষ্টি।
বোধহয় একমাত্র রাশিয়া ছাড়া ইউরোপের আর সমস্ত দেশেই বিভিন্ন পরিমাণে ফ্যাসিজ্ম্ বর্তমান রয়েছে। এর সবচেয়ে শেষ বিজয়-অভিযান দেখা গেল জর্মনিতে। ইংলণ্ডে পর্যন্ত শাসক শ্রেণীদের মধ্যে ফ্যাসিস্ট মতবাদ প্রতিষ্ঠালাভ করছে; ভারতবর্ষে হামেশাই তার প্রয়োগ আমরা দেখতে পাচ্ছি। ধনিকতন্ত্রের শেষ অবলম্বন এই ফ্যাসিজ্ম্; জগতের রঙ্গমঞ্চে সে আজ মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছে কমিউনিজ্মের।
কিন্তু এর অন্য সব কথা যদি ছেড়েই দিই, যে অর্থনৈতিক দুর্গতি আজ পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে, তার অবসান ঘটাবার কোনো আশ্বাসবাক্যও ফ্যাসিজ্মের মধ্যে নেই। জগতের গতি এখন পরস্পর-নির্ভরতার দিকে; ফ্যাসিজ্ম তার নিবিড় জাতীয়তাবাদ নিয়ে ঠিক তার বিপরীত মুখে চলেছে। ধনিকতন্ত্রের ক্রমান্বতি ক্ষয়ের ফলে যে-সব সমস্যার উদ্ভব হয়েছে, ফ্যাসিজ্ম্ তাকে আরও তীব্র করে তুলছে। উগ্র জাতীয়তাবাদের নেশায় সে জাতিতে জাতিতে সংঘর্ষকেই বাড়িয়ে তুলছে, তার থেকেই অনেক সময় সৃষ্টি হচ্ছে যুদ্ধের।