বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/গভর্মেণ্টের নীতি
১০৩
গভর্মেণ্টের নীতি
২৭শে অক্টোবর, ১৯৩২
দু সপ্তাহ ধরে কিছু লিখি নি বলে কুঁড়ে হয়ে যাবার ভয় হচ্ছে। গল্পের শেষে পৌঁছে যাচ্ছি, এ ভাবনাই আমাকে পিছিয়ে রাখছে। এর মধ্যেই তো আমরা অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে এসে পড়েছি। এর পরে উনিশ শতকের একশোটা বছর অতিক্রম করে বিংশ শতাব্দীর এই বত্রিশটা বছর পার হলেই পৌছে যাব একেবারে আজকের যুগে। কিন্তু এই এক শো বত্রিশ বছরেই অনেক কিছু বলতে হবে। এত কাছে বলে তারা প্রকাণ্ড হয়ে আমাদের মনকে চেপে ধরেছে প্রাচীন ঘটনাবলীর চেয়ে অধিকতর উল্লেখযোগ্য সেজে। আজ আমাদের চার দিকে যা দেখি তাদের অধিকাংশেরই মূল ঐ দিনগুলিতে আর সত্যিই, ঘটনার ঘনঘটাচ্ছন এই বিগত শতাধিক বছরের মধ্য দিয়ে তোমাকে নিয়ে যেতে আমার বেশ বেগ পেতে হবে। এইজন্যেই বোধ হয় আমার আলস্য! কিন্তু আবার ভাবছি, মানবেতিহাসকে যখন ১৯৩২-এ টেনে আনব, অতীত যখন বর্তমানরূপে অভ্যুদিত হয়ে ভবিষ্যতের ছায়াতোরণে এসে থেমে দাঁড়াবে, তখন আমি আর কী করব? তখন তোমাকে আর কী লিখব খুকু? কলম হাতে নিয়ে বসে তোমার কথা ভাববার, অথবা আমার পাশে বসে তুমি যেন আমায় প্রশ্ন করছ আর আমি যেন তার উত্তর দেবার চেষ্টা করছি, এ ছবি কল্পনা করার জন্য কীই-বা কৈফিয়ত দেব তখন?
ফরাসি বিপ্লবের বিষয়ে তিনখানা চিঠি তো লিখেছি—ফরাসি দেশের সামান্য পাঁচটি বছর সম্বন্ধে সুদীর্ঘ তিনখানি চিঠি! যুগযাত্রা-পথে আমরা এক-এক লাফে এক-এক শতাব্দী অতিক্রম করেছি, বিপুল মহাদেশ দেখে নিয়েছি এক পলকে। কিন্তু ১৭৮৯ ও ১৭৯৪-এর মাঝখানে এই ফরাসিদেশে বহুক্ষণ ধরে থমকে রয়েছি, যদিও তুমি আশ্চর্য হবে শুনলে যে, আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি সংক্ষেপের; কারণ ঐ বিষয়েই তখন আমার মন ভরপুর, কলম আমার চাইছিল ছুটে চলতে। ইতিহাসের পক্ষ থেকে ফরাসি বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা প্রচুর। এক যুগের অবসান ও নবযুগের সূচনার মধ্যে সেই সন্ধিস্থল। কিন্তু তার নাটকীয় গুণেও সে আকৃষ্ট করে আমাদের, বহু শিক্ষাও দান করে। আজকের জগৎ আবার দোলায়মান, বিপুল পরিবর্তনের প্রত্যুষে দাঁড়িয়ে আমরা। স্বদেশেও চলছে আমাদের এক বিপ্লবের যুগ, যতই হোক-না সে শান্তিময়! সুতরাং অনেক শিক্ষণীয় আছে আমাদের ফরাসি বিপ্লবের ও আর-একটি বিপ্লবের থেকে যা আমাদেরই যুগে, আমাদেরই চোখের সামনে ঘটেছে রুশদেশে। এ দুটির মতো জনগণের প্রকৃত বিপ্লব জীবনের কঠোর বাস্তবতার উপর করে কী তীব্র আলোকপাত। বিদ্যুদ্বহ্নির মতো সমগ্র ভূমিখণ্ডটিকে সে আলোকিত করে তোলে, বিশেষতঃ তার অন্ধকার কোণগুলিকে। মুহূর্তেকের জন্যেও লক্ষ্যকে মনে হয় বড়ো স্পষ্ট, বড়ো কাছে। বিশ্বাস ও কর্মশক্তিতে পূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষ; সন্দেহ ইতস্তত করার ভাব সব দূরে চলে যায়। মিটমাটের কোনো কথাই ওঠে না। তীরের মতো সোজা বিপ্লবীরা ছুটে চলে লক্ষ্যপানে, অন্য কোনো দিকে তাকায় না। আর যতই সরল, যতই তীক্ষ্ণ তাদের দৃষ্টি, ততই এগিয়ে চলে বিপ্লব। কিন্তু এ ঘটে কেবল বিপ্লবের শীর্ষদেশে, যখন নেতৃবর্গ দাঁড়িয়ে পর্বতশৃঙ্গে আর জনগণ চলে সে পর্বতের সানুদেশ বেয়ে। কিন্তু হায়! এমনও সময় আসে যখন গিরিশিখর থেকে তাদের নেমে আসতে হয় নীচের গভীর গহ্বরে—বিশ্বাস হয়ে আসে নিষ্প্রভ, শক্তি হয়ে আসে ক্ষীণ।
১৭৭৮ অব্দে বৃদ্ধ ভল্টেয়ার—সারাজীবনই তাঁর কেটেছিল নির্বাসনে—ফিরে এলেন প্যারিসে শুধু মরতে। ৮৪ বছর বয়স তখন তাঁর, প্যারিসের যুবাদের উদ্দেশে তিনি বললেন, “তরুণের দল সৌভাগ্যবান, বিরাট জিনিষ দেখবে তারা।” সত্যিই তারা বিরাট জিনিষ দেখল, তাতে অংশ নিল, কারণ তার এগারো বছর পরে শুরু হয়েছিল বিপ্লব। বহুদিন ধরে হয়ে রয়েছিল তার সম্ভাবনা। সপ্তদশ শতাব্দীতে মহাসম্রাট চতুর্দশ দুই বলেছিলেন, “আমিই রাজ্য অর্থাৎ আমার রাজ্যে আমি সর্বেসর্বা।”—"আসুক প্লাবন আমি চলে গেলে” বললেন তাঁর উত্তরাধিকারী পঞ্চদশ লুই, অষ্টাদশ শতাব্দীতে। এ আহ্বানের পর প্লাবন এসে দলবলসুদ্ধ ষোড়শ লুইকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। সাদা পরচুলা আর রেশমের পাজামা পরা সম্ভ্রান্ত লোকদের বদলে এগিয়ে এল সাঁসকুলোৎ—পাজামা-বর্জনকারীদের দল। ফরাসিদেশের সবাই হল নাগরিক ও নাগরিক নবগণতন্ত্র জগৎকে শোনাল তার স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বাণী।
বিপ্লবের দিনে আতঙ্কই বড়ো হয়ে থকে। বিশেষ বিপ্লবী আদালতের প্রতিষ্ঠার পর থেকে রোবেস্পিয়েরের পতন, এই ষোলো মাসেরও অল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় ৪ হাজার লোককে গিলোটিন করা হয়। সংখ্যাটা বেশ বড়ো; আর যখন তারই সঙ্গে মনে পড়ে কত নির্দোষ নিরপরাধ ওর সঙ্গে গিয়ে থাকবে, আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই, ব্যথিত হই। তবু এই ফরাসি বিভীষিকাকে যথার্থ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখতে গেলে কয়েকটি তথ্য স্মরণ রাখা কর্তব্য। শত্রু, গুপ্তচর, বিশ্বাসঘাতকে বেষ্টিত ছিল তখন গণতন্ত্র, এবং দণ্ডিতদের মধ্যে অনেকে ছিল গণতন্ত্রের ঘোর বিরোধী, গণতন্ত্রের উচ্ছেদ-সাধনের জন্যে ছিল তাদের প্রয়াস। আতঙ্কের শেষ দিকে নির্দোষরাও অপরাধীপের সঙ্গে দণ্ডভোগ করত। ভয় এলে আমাদের দৃষ্টিশক্তি আচ্ছন্ন হয়, দোষী-নির্দোষ আমরা আর প্রভেদ বুঝতে পারি না। এক দুঃসময়ে ফরাসি গণতন্ত্রকে লাফায়েৎ-এর মত স্বপক্ষীয় অনেক সমরনায়কের বিরোধ ও বিশ্বাসঘাতকতা সহ্য করতে হয়েছিল। অতএব আশ্চর্য নয় যে, নেতৃবর্গের মাথা আর স্থির ছিল না, এলোমেলোভাবে এদিকে-ওদিকে তাঁরা আঘাত চালাতে আরম্ভ করলেন।
এইচ. জি. ওয়েল্স্ যেমন দেখিয়েছেন, এ সময় ইংলণ্ড, আমেরিকা ও অন্যান্য দেশে কী ঘটছিল সেটা সত্যিই স্মরণযোগ্য। ফৌজদারি আইন, বিশেষতঃ সম্পত্তিরক্ষার পক্ষে, ছিল নৃশংসরকমের, সামান্য অপরাধেই ছিল ফাঁসির চলন। শারীরিক নির্যাতনের ব্যবস্থা তখনও কোথাও কোথাও আইনানুসারেই হত। ওয়েল্সের মতে আতঙ্কযুগে ফরাসিদেশে গিলোটিনে যত লোক মরেছে, ঠিক সেই সময়েই ইংলণ্ড-আমেরিকায় ফাঁসিতে মরেছে ঢের বেশি।
সে সময়ের ক্রীতদাসদের উপর নিষ্ঠুর, অমানুষিক অত্যাচারের কথা ভাবো, আর যুদ্ধবিগ্রহ, বিশেষ করে আজকের যুদ্ধের কথাও ভাবো, শতসহস্র যুবকের জীবনকে যে যুদ্ধ বিকাশের সময়ই নষ্ট করে ফেলে। আরও কাছে এসো, আমাদের দেশে, আধুনিক যুগের ঘটনাগুলিই বিচার করে দেখো। তেরো বছর আগে অমৃতসরে এপ্রিল মাসের এক সন্ধ্যাবেলায় বসন্তোৎসবের দিনে জালিয়ানওয়ালাবাগে শত শত লোককে হত্যা ও সহস্রাধিক লোককে জখম করা হয়। আর এই-যে সমস্ত ষড়যন্ত্রের মামলা, বিশেষ বিচারসভা, বিশেষ আইন জারি, এসব জনগণকে আতঙ্কিত করে দাবিয়ে রাখার কায়দা ছাড়া আর কী? এই কণ্ঠরোধ বা ভয় দেখিয়ে শাসন, এরা শাসনকর্তাদের ভয়েরই পরিমাণ নির্দেশ করে। প্রতি শাসনপদ্ধতি, সে স্বদেশীই হোক আর বিদেশীই হোক, নিজের অস্তিত্ব সম্বন্ধে শঙ্কিত হয়ে উঠলেই এই ভয় দেখিয়ে শাসন শুরু করে। প্রতিক্রিয়াশীল শাসকেরা এর সাহায্য নেয় কয়েকটি ক্ষমতাশালী লোকের স্বপক্ষে ও জনসাধারণের বিপক্ষে। বিদ্রোহ করে যারা শাসক হয়েছে তারা আরও স্পষ্টবাদী; প্রায়ই হয় কঠোর, নিষ্ঠুর কিন্তু তাদের মধ্যে শঠতা, শয়তানি অল্পই আছে। প্রতিক্রিয়াশীল শাসকেরা থাকে প্রবঞ্চনারই আবহাওয়ার মধ্যে, তারা জানে ধরা পড়লে তাদের অস্তিত্বই থাকবে না আর। এরা স্বাধীনতার কথা বলে, আর সে অর্থে মনে করে যথেচ্ছাচারের ক্ষমতা। এরা ন্যায়ের কথা বলে, তার অর্থ এরা চিরকালই এমনি অবস্থায় এমনি করে উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে, অন্যে মরুক আর বাঁচুক, কিছু যায় আসে না। সবচেয়ে বড়ো হল, এরা আইনের কথা, নিয়মের কথা বলে, আর সেই শব্দের আবরণের তলে তলে মানুষেকে গুলি করে মারে, গলা টিপে মারে, বাঁধন পরিয়ে রাখে, সকলরকম অন্যায়, বেআইনি কাজ করে। এই ন্যায়বিচারের নামে আমাদের শত শত ভাইকে বিশেষ বিচারসভায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আড়াই বছর আগে এপ্রিল মাসের আর-এক দিনে এই নামেরই দোহাই দিয়ে এদের মেশিনগান পেশোয়ারে আমাদের বীর পাঠানভাইদের নিরস্ত্র অবস্থায় গুলি করে আর এই ন্যায়বিচারের নামে ব্রিটিশ বিমানবাহিনী আমাদের দেশের প্রান্তের গ্রামগুলিতে এবং ইরাকে বোমা ফেলে নর-নারী-শিশু-নির্বিচারে কত লোককে হত্যা করেছে অথবা সারাজীবনের মতো করে রেখেছে পঙ্গু। পাছে বিমানের আবির্ভাবে লোকেরা পালিয়ে যায় তাই ‘বিলম্বিত বোমা’ নামে এক শয়তানি মাল আবিষ্কৃত হয়েছে, সেগুলি মাটিতে পড়ে নিষ্ক্রিয় থাকে, কিছুক্ষণ পর্যন্ত ফাটে না। গ্রামের নরনারীরা বিপদ কেটে গেছে ভেবে যেই বাড়ি ফিরে আসে তার কিছুক্ষণ পরেই হয়তো বোমাগুলো ফেটেফুটে করে তাদের ধংসের কাজ।
আবার ভাবো আজকের অনশনের কথা, লক্ষ লক্ষ লোককে যে কবলিত করে ফেলছে। চার দিকের দুঃখকষ্ট দেখতে আমরাও অভ্যস্ত হয়ে আসছি; মনে করছি যে, চাষি-মজুরেরা আমাদের চেয়ে অনেক সহনশীল, দুঃখকষ্ট তাদের অত বাজে না। বিবেকের দংশন থেকে মুক্তি পাবার জন্যে মিথ্যা আমাদের এ যুক্তি। মনে পড়ে, আমি একবার বিহারে ঝরিয়ার কয়লাখনি দেখতে গিয়েছিলাম। সেখানে মাটির নীচে ঘন কালো অন্ধকার খোপের মধ্যে কর্মরত অগণ্য স্ত্রীপুরুষকে দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম। লোকে খনির মজুরদের দিনে আট ঘণ্টা কাজের কথা বলে; অনেকে আবার এতেও সন্তুষ্ট নন, আরও বেশি তাঁরা চান আদায় করতে। এই যুক্তিগুলি পড়তে পড়তে আমার মনে আসে সেই ভূগর্ভের অন্ধকূপের অভিজ্ঞতা, যেখানে আট মিনিটও আমার অসহ্য হয়ে উঠেছিল।
ফরাসি-বিভীষিকার যুগ ছিল সত্যিই ভয়ানক। কিন্তু তবু দারিদ্র্য, বেকার জীবন ইত্যাদির মতো স্থায়ী রোগগুলির তুলনায় তার আঘাত তুচ্ছ। এই সামাজিক বিপ্লবের আঘাত যত বেশিই হোক-না কেন, বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের অন্তস্তল থেকে ক্ষণে ক্ষণে জেগে উঠছে যেসকল পাপ যুদ্ধবিগ্রহ, সামান্য তারা এদের তুলনায়। ফরাসি বিপ্লবের ভীষণতা বিপুল বলে মনে হয়, কারণ অনেক খেতাবধারী অভিজাতসম্প্রদায় পড়েছিলেন তার কবলে, আর এই সম্ভ্রান্তশ্রেণীকে সম্ভ্রম করতে আমরা এতদূর অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, এরা বিপদে আপদে পড়লে আমাদের সমবেদনা সহজেই এদের দিকে ছোটে। অন্যদের সঙ্গে তাঁদের প্রতি সমবেদনা প্রদর্শনও ভালো, কিন্তু এও মনে রাখতে হবে যে, সংখ্যায় তারা অত্যল্প। আমরা শুভেচ্ছা জানাতে পারি তাঁদের, কিন্তু আসল হচ্ছে দেশের জনসাধারণ, আর সংখ্যালঘুদের জন্যে আমরা এই বেশিকে বলি দিতে পারি না। রুশো লিখে গেছেন, “জনসাধারণই সৃষ্টি করেছে সমগ্র মানবজাতি। যারা জনসাধারণ নয় তারা এত নগণ্য যে, তাদের গণনা করবার পরিশ্রমটকু বাদ দিলেও বেশ চলে।”
এ চিঠিতে নেপোলিয়নের কথা তোমাকে বলবার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু মনের সঙ্গে কলম উড়ে চলে গেছে অন্য জায়গায়, কাজেই নেপোলিয়ন এখনও রইলেন পরিদর্শনাধীন। আমাদের আনন্দের জন্যে তাঁকে পরের চিঠিখানি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।