বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/গুপ্তযুগে হিন্দু-সাম্রাজ্যবাদ
৩৭
গুপ্তযুগে হিন্দু-সাম্রাজ্যবাদ
দক্ষিণ-ভারতের অধিবাসীরা যখন মহাসমুদ্র পাড়ি দিয়ে দূরদূরান্তরে উপনিবেশ স্থাপন করছিল, উত্তর ভারতে তখন চলছিল অশান্তি আর গোলযোগ। কুষাণ সাম্রাজ্যের সে পরাক্রম আর নেই, পতন শুরু হয়েছে। সমগ্র উত্তর-অঞ্চল জুড়ে অনেকগুলো ছোটো ছোটো রাষ্ট্র; শক, তুর্কি প্রভৃতি জাতির বংশধরগণের সেখানে আধিপত্য। এইসকল জাতির লোকেরা ছিল বৌদ্ধধর্মাবলম্বী; তারা লুটপাট করতে ভারতে আসে নি, এসেছিল বসবাস করতে। ভারতে এসে তারা এ দেশের তৎকালীন আচার-ব্যবহার ঐতিহ্য ইত্যাদি গ্রহণ করল। তাদের ধর্ম সংস্কৃতি ও সভ্যতার জন্যে তারা ভারতের কাছে ঋণী। কুষাণরাও ইন্দো-আর্য আচার-ব্যবহার ও কৃষ্টি গ্রহণ করেছিল বলেই এতকাল ভারতে রাজত্ব করতে পেরেছিল। তাদের আচার-ব্যবহার ছিল ইন্দো-আর্যদের মতো; এ দেশের অধিবাসীরা যাতে তাদের বিদেশী বলে মনে না করতে পারে, সে চেষ্টা তারা করেছে। কিন্তু ক্ষত্রিয়রা সে কথা ভুলতে পারে নি, বিদেশীদের শাসনাধীনে থেকে তাদের মনে ছিল দারণ ক্ষোভ। শেষ পর্যন্ত এরাই একজন ক্ষমতাশালী নেতার সন্ধান পেল এবং আর্যাবর্তকে স্বাধীন করবার জন্যে শুরু করল ধর্মযুদ্ধ।
এই নেতার নাম চন্দ্রগুপ্ত। অশোকের পিতামহ চন্দ্রগুপ্ত বলে একে ভুল কোরো না যেন। অশোকের বংশধরগণ তখন বিস্মৃতির অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে। মনে রাখবে, আমরা এখন খৃষ্টজন্মের পরবর্তী চতুর্থ শতকের কথা বলছি—৩০৮ খৃষ্টীয় সনের কথা। এর ৫৩৪ বৎসর পূর্বে অশোকের মৃত্যু হয়েছে। এ ব্যক্তি মৌর্য বংশের কেউ নয়।
যে চন্দ্রগুপ্তের কথা বলছি তিনি ছিলেন পাটলিপুত্রের ছোটোখাটো একজন রাজা। লোকটি খুব কর্মদক্ষ ও উচ্চাভিলাষী ছিলেন। উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য সামন্ত রাজাদের নিয়ে তিনি একটি যৌথরাস্ট্র গঠন করতে মনস্থ করলেন। বিখ্যাত লিচ্ছবি-বংশের রাজকন্যা কুমারদেবীকে তিনি বিয়ে করলেন এবং তাতে লিচ্ছবি-রাজ্য তাঁর পক্ষে যোগ দিল। এইভাবে গোড়াঘর বেঁধে চন্দ্রগুপ্ত ভারতে সমস্ত বৈদেশিক রাজশক্তির বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করলেন। ক্ষত্রিয়রা এবং উচ্চবংশোদ্ভব আর্যরা বৈদেশিক শাসনাধীনে সব রকমে খাটো হয়ে ছিল; তারাও সমর্থন করল চন্দ্রগুপ্তকে। প্রায় বছর বারো লড়াই করে তিনি উত্তর-ভারতের এক অংশে আধিপত্য স্থাপন করলেন; এখনকার যুক্তপ্রদেশ ঐ অংশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। চন্দ্রগুপ্ত নিজেকে রাজাধিরাজ বলে ঘোষণা করলেন।
এইভাবেই গুপ্ত-সাম্রাজ্যের সৃষ্টি। এ বংশের রাজত্বকাল দু শো বৎসর। এই সময়ে উৎকট হিন্দুয়ানি আর জাতীয়তাবাদের বিকাশ দেখা গিয়েছিল। তুর্কি পার্থীয় এবং অনার্য বৈদেশিক শাসকদের জোর করে তাড়িয়ে দেওয়া হল, উদ্ভব হল জাতিগত বিরোধ। ইন্দো-আর্যদের ছিল জাতের বড়াই; বর্বর আর ম্লেচ্ছদের তারা ঘৃণা করত। গুপ্ত সাম্রাজ্য এই ইন্দো-আর্যদের যদিও বা কতকটা রেহাই দিল, অনার্যদের মোটেই ক্ষমা করল না।
চন্দ্রগুপ্তের পুত্র সমুদ্রগুপ্ত তাঁর পিতার চেয়েও কুশলী যোদ্ধা এবং দক্ষ সেনাপতি ছিলেন। সিংহাসনে আরোহণ করেই তিনি নানা দেশ জয় করতে শুরু করলেন; এমনকি দক্ষিণ-ভারতের অনেক রাজাও তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেছিল। এইরূপে ভারতের অধিকাংশ স্থান জুড়ে বিশাল গুপ্ত-সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হল।
সমুদ্রগুপ্তের পুত্র দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তও একজন বড়ো যোদ্ধা ছিলেন। তিনি শক কিংবা তুর্কি রাজাদের পরাজিত করে কাথিয়াওয়াড় এবং গুজরাট জয় করেন। তাঁর এক উপাধি ছিল ‘বিক্রমাদিত্য’, এবং এই নামেই তিনি সবিশেষ পরিচিত। তবে ‘সিজার’ নামের মতো এই ‘বিক্রমাদিত্য’ নামও অনেক রাজাই গ্রহণ করেছিলেন; সুতরাং এটা একটু গোলমেলে ব্যাপার।
দিল্লিতে কুতবমিনারের নিকটে এক বিরাট লৌহস্তম্ভ দেখে থাকবে। ওটা নাকি বিক্রমাদিত্যের জয়স্তম্ভ, তিনিই তৈরি করিয়েছেন। স্তম্ভের কারুকার্য চমৎকার; চূড়ায় একটি পদ্মফুল, সাম্রাজ্যের প্রতীক।
গুপ্ত-রাজাদের আমলে ভারতবর্ষে হিন্দু-সাম্রাজ্যবাদ প্রবল ছিল। আর্য-সভ্যতা আর সংস্কৃত-বিদ্যানুশীলনের তখন খুব প্রচলন হয়। গ্রীক কুষাণ এবং অন্যান্য বৈদেশিক জাতিগুলি ভারতীয় জীবন এবং সভ্যতায় যে গ্রীক মঙ্গোলীয় প্রভাব আমদানি করেছিল সেটা অপসারণ করে দিয়ে তার পরিবর্তে ইন্দো-আর্য ঐতিহ্যের উপরেই জোর দেওয়া হল বেশি।
সরকারি ভাষা ছিল সংস্কৃত, কিন্তু তা সাধারণের কথ্য ভাষা ছিল না। প্রচলিত ভাষা ছিল প্রাকৃত, সংস্কৃতেরই জ্ঞাতি। তথাপি সংস্কৃত খুব জীবন্ত ভাষা ছিল; সংস্কৃত কাব্য ও নাটক এবং ইন্দো-আর্য শিল্পকলা খুব সমৃদ্ধ ছিল। বেদ এবং মহাকাব্যের যুগের পরে সম্ভবত সংস্কৃতসাহিত্যের ইতিহাসে এই যুগই শ্রেষ্ঠ। কালিদাস এই যুগের কবি। সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, শিল্পী ও জ্ঞানী বাক্তিরা বিক্রমাদিত্যের রাজসভা অলংকৃত করেছিলেন। বিক্রমাদিত্যের রাজসভার নবরত্নের কথা তুমি শোনো নি কি? কথিত আছে, কবি কালিদাস ঐ নবরত্নের এক রত্ন ছিলেন।
সমুদ্রগুপ্ত পাটলিপুত্রে থেকে তাঁর সাম্রাজ্যের রাজধানী অযোধ্যায় স্থানান্তরিত করেছিলেন। দিগ্বিজয়ের পক্ষে তিনি সম্ভবত অযোধ্যাকেই উপযুক্ত স্থান বলে মনে করেছিলেন; আর হয়তো-বা বাল্মীকি-কৃত মহাকাব্যের অমর কাহিনীও তাঁকে ঐ প্রেরণা দিয়ে থাকবে।
গুপ্ত-সম্রাটগণ হিন্দুধর্মের গৌরব বৃদ্ধির চেষ্টা করেছিলেন। বৌদ্ধধর্মের প্রতি তাঁদের তেমন সুনজর ছিল না। ক্ষত্রিয় এবং উচ্চশ্রেণীর লোকেরা ছিল হিন্দুধর্মের পক্ষপাতী, আর বৌদ্ধধর্ম ছিল জনগণের ধর্ম; তা ছাড়া বৌদ্ধধর্মের মহাযান-মতবাদের সঙ্গে উত্তর ভারতের কুষাণ এবং অন্যান্য বিদেশী শাসকদের ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। কিন্তু তথাপি বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে কোনো বিরোধ বাধে নি। তখনও বৌদ্ধাশ্রমগুলোই ছিল প্রধান শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান। সিংহলের বৌদ্ধরাজা মেঘবর্ণ বহুমূল্য উপঢৌকন পাঠিয়ে সমুদ্রগুপ্তকে সম্মান দেখিয়েছিলেন এবং সিংহলী ছাত্রদের জন্যে একটি বৌদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গয়াতে।
কিন্তু তথাপি ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মের অবনতি ঘটল। ক্রমশ হিন্দু ধর্মের প্রাধান্য বেড়ে যাওয়াতেই এটা হল; তৎকালীন রাজশক্তির চাপে কিংবা ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে নয়।
চীনের বিখ্যাত পর্যটক ফাহিয়েন এই সময়ে ভারত-ভ্রমণে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। বৌদ্ধ শাস্ত্রগ্রন্থাদি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তিনি এ দেশে আসেন। ফাহিয়েন ভারতের নানা স্থান পর্যটন করে সেই সময়ের এক বিবরণ লিখে গেছেন। সেই বৃত্তান্ত থেকে জানা যায়, গুপ্ত-রাজাদের আমলে মগধের লোকেরা বেশ সুখেশান্তিতে বাস করত; দণ্ডবিধি কঠোর ছিল না, প্রাণদণ্ডের ব্যবস্থাও ছিল না। কপিলাবস্তু তখন জঙ্গলাকীর্ণ; গয়ার অবস্থাও তথৈবচ, লোকজনের বসতি ছিল না; কিন্তু পাটলিপুত্রের তখন খুব সমৃদ্ধ অবস্থা। দেশের নানা স্থানে বড়ো বড়ো বৌদ্ধ শ্রমণাশ্রম; তা ছাড়া ছিল বিশ্রামগৃহ পান্থশালা হাসপাতাল এবং অন্যান্য দাতব্য প্রতিষ্ঠান।
ভারতবর্ষ পর্যটন করে ফাহিয়েন সিংহলে যান এবং সেখানে দু বছর থাকেন। সিংহল থেকে তিনি সমুদ্রপথে দেশে ফিরেছিলেন। তাঁর সঙ্গী তাও-চিঙ আর নিজের দেশে ফিরলেন না, ভারতেই থেকে গেলেন; এ দেশটা তাঁর খুব পছন্দ হয়েছিল।
সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা বিক্রমাদিত্য তেইশ বৎসর কাল রাজত্ব করেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের পর তাঁর পুত্র কুমারগুপ্ত রাজত্ব করেন চল্লিশ বছর-কাল। তাঁর পরে স্কন্দগুপ্ত ৪৫৩ খৃষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। কিন্তু তাঁকে নূতন এক উপদ্রবের সম্মুখীন হতে হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত ঐ উপদ্রবের ফলেই গুপ্ত-সাম্রাজ্য বিধ্বস্ত হয়েছিল। সে কাহিনী পরের চিঠিতে বলব।
গুপ্তযুগে চিত্রকলা ভাস্কর্য ইত্যাদি শিল্প চরম উৎকর্ষ লাভ করেছিল। কারুকার্যখচিত মন্দির, অজন্তার চিত্রাবলী ইত্যাদিতে অদ্যাপি তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
ভারতে যখন গুপ্ত বংশের রাজত্ব তখন পৃথিবীর অন্যান্য অংশের অবস্থাটা কী ছিল? কন্স্টাণ্টিনোপ্লের স্থাপয়িতা কন্স্টান্টাইন দি গ্রেট প্রথম চন্দ্রগুপ্তের সমসাময়িক ছিলেন। পরবর্তী গুপ্ত রাজাদের যুগেই রোম সাম্রাজ্য দু ভাগ হয়ে যায় এবং পরিশেষে উত্তরাঞ্চলের বর্বর জাতি পাশ্চাত্যের রোম সাম্রাজ্য দখল করে। দেখা যাচ্ছে, যখন রোম সাম্রাজ্যের অধঃপতন ঘটছে ভারতে তখন স্বর্ণযুগ—পরাক্রমশালী সাম্রাজ্য, বড়ো বড়ো যোদ্ধা, বিপুল সেনাবাহিনী। অনেকে সমদ্রগুপ্তকে ‘ভারতীয় নেপোলিয়ন’ নাম দিয়েছেন; কিন্তু যদিও তিনি খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন, ভারতের বাইরে দিগ্বিজয়ের কথা কখনও তিনি মনে স্থান নেন নি।
গুপ্তযুগ উৎকট সাম্রাজ্যবাদ, অধিকার আর যুদ্ধজয়ের যুগ। প্রত্যেক দেশের ইতিহাসেই এরূপ সাম্রাজ্যবাদের যুগের পরিচয় পাওয়া যায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর বিশেষ কোনো মুল্য থাকে না। গুপ্ত-রাজাদের আমলে ভারতে শিল্প, সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়ে নবজাগরণের অপূর্ব সাড়া পড়ে গিয়েছিল। শুধু এইজন্যেই ভারতের ইতিহাসে গুপ্তযুগ এক স্মরণীয় যুগ।