বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/গ্রীসের বিগত গৌরব

উইকিসংকলন থেকে

১৬

গ্রীসের বিগত গৌরব

২৩শে জানুয়ারি, ১৯৩১

 গ্রীকরা যে পারশ্যসেনাকে যুদ্ধে পরাজিত করেছিল তার ফল হল প্রধানত দুটি। পারশ্যসাম্রাজ্যে ভাঙন ধরল, ক্রমে তারা দুর্বল হয়ে পড়ল; অপর পক্ষে শুরু হল গ্রীক ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবের যুগ। একটি জাতির দীর্ঘ জীবনের তুলনায় এই গৌরব অবশ্য খুবই স্বল্পস্থায়ী। গ্রীসের গৌরবের যুগ পুরো দু শো বছরও স্থায়ী হয় নি। পারশ্য অথবা অন্যান্য প্রাচীন সাম্রাজ্যের মতো এদের গৌরবের কাহিনী রাজ্যবিস্তারের কাহিনী নয়। পরে অবশ্য আলেকজাণ্ডারের অভ্যুদয় হয়েছিল এবং অল্পকালের জন্য তাঁর বিজয় অভিযান সমস্ত পৃথিবীকে চমকিত করেছিল। যাক, তাঁর সম্বন্ধে পরে আলোচনা করা যাবে। ইতিমধ্যে আমরা পারশ্যযুদ্ধ এবং আলেকজাণ্ডারের অভ্যুদয়ের মধ্যকাল সম্বন্ধে অর্থাৎ থার্মোপোলি এবং স্যালামিসের যুদ্ধের পরবর্তী শ-দেড়েক বছরের ইতিহাস আলোচনা করছি। পারশ্যসম্রাটের আক্রমণের ভয়ে গ্রীকরা একতাবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু সেই আশঙ্কা দূরে হবামাত্রই একতাসূত্রটি ছিন্ন হয়ে গেল, আবার শুরু হল বিবাদ-বিসংবাদ। বিশেষ করে এথেন্স এবং স্পার্টা—এই দুটি নগর-রাষ্ট্রের মধ্যে ঘোরতর বিরোধ ছিল। অবশ্য তাদের বিরোধের কাহিনী এখানে অবান্তর, কারণ, এর কোনো ঐতিহাসিক মূল্য নেই। সে যুগে গ্রীস অত উন্নত হয়েছিল বলেই তাদের বিবাদ-বিসংবাদ আমরা আজও মনে করে রেখেছি।

 প্রাচীন গ্রীসের মুষ্টিমেয় কয়েকখানি গ্রন্থ, কয়েকটি মূর্তি এবং কিছু ধ্বংসাবশেষ মাত্র আমাদের সম্বল। কিন্তু তাই যথেষ্ট; এই কটি নিদর্শন থেকেই আমরা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব উপলদ্ধি করতে পারি। সে যুগের গ্রীকরা সর্ব বিষয়ে কতখানি উন্নতিলাভ করেছিল তা দেখে বিস্মিত হতে হয়। তাদের অপূর্ব ভাস্কর্য এবং স্থাপত্যের নিদর্শনগুলি দেখলে তবেই বোঝা যায়, কতখানি ছিল তাদের ধীশক্তি আর শিল্পচাতুর্য। ফিডিয়াস ছিলেন সে যুগের খ্যাতনামা ভাস্কর—তিনি ছাড়াও আরও অনেকে খ্যাতিলাভ করেছিলেন। এ ছাড়া গ্রীকদের রচিত নাটক— বিয়োগান্ত মিলনান্ত দুই-ই, এখনও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নাটকের মধ্যে স্থান পাবার যোগ্য। সফোক্লিস, এস্‌কাইলাস, ইউরিপিডিস, এরিস্টোফেনিস, পিণ্ডার, মিনাণ্ডার এবং সাফো—এসব নাম বোধকরি তোমার কাছে এখন অর্থহীন মনে হবে। কিন্তু বড়ো হয়ে যখন তুমি এঁদের বই পড়বে তখন নিশ্চয় গ্রীসের গৌরবের কথা তুমি কতকটা বুঝতে পারবে।

 কোন্ দেশের ইতিহাস ঠিক কীভাবে পড়া উচিত গ্রীক ইতিহাসের এই যুগটির কথা ভাবলেই আমরা তা বুঝতে পারব। সে যুগের গ্রীক রাষ্ট্রগুলির মধ্যে যে যুদ্ধবিগ্রহ এবং ছোটোখাটো বিবাদ-বিসংবাদ চলছিল কেবলমাত্র সেই দিকেই যদি আমরা নজর দিই তবে গ্রীকদের সম্বন্ধে সত্যিকার কতটকু আমরা জানলাম, কতটুকু বুঝলাম? তাদের ভালো করে জানতে হলে তাদের চিন্তা-জগতে প্রবেশ করতে হবে। তারা কী ভেবেছে, কী করেছে তার সম্যক্ উপলদ্ধি চাই। মননের ইতিহাসই হল আসল ইতিহাস। এইজন্য বলা যেতে পারে, বর্তমান ইউরোপের ইতিহাস অনেকাংশে প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার বংশধর মাত্র।

 বিভিন্ন জাতির জীবনে এই ধরনের উন্নত যুগে কীভাবে এসেছে গিয়েছে তার পর্যালোচনা বড়োই চিত্তাকর্ষক। অকস্মাৎ বিদ্যুৎচমকে সমস্ত কিছু উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, নরনারী সকলে নব নব সৌন্দর্য সৃষ্টিতে ব্যাপৃত হয়। দেশবাসী সকলে নূতন অনুপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়। আমাদের দেশেও এরকম যুগে এসেছে। সর্বপ্রথম যে গৌরবের যুগকে আমরা জানি সেটি হচ্ছে বেদ উপনিষদ এবং অন্যান্য গ্রন্থ রচনার যুগ। দুর্ভাগ্যক্রমে সেই প্রাচীন যুগের কোনো গ্রন্থবদ্ধ ইতিহাস আমাদের নেই, সেদিনের কত কত অপূর্ব সৃষ্টি হয়তো একেবারে লোপ পেয়ে গেছে বা হয়তো লোকচক্ষুর অন্তরালে এখনও আবিষ্কারের অপেক্ষায় আছে। কিন্তু সে যুগের যেটকু নিদর্শন আমাদের হাতে আছে তাতেই প্রমাণ হয়, প্রাচীন ভারতে কতবড়ো ধীশক্তিসম্পন্ন চিন্তাবীরদের জন্ম হয়েছিল। পরবর্তী কালের ইতিহাসেও ভারতবর্ষে অনুরূপ গৌরবের যুগ এসেছে। আমাদের এই ইতিহাসপরিক্রমার সূত্রে ক্রমে ক্রমে সেসব যুগের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হবে।

 যে সময়ের কথা বলছি তখন বিশেষ করে এথেন্স নগরী খুব প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। একজন মস্ত বড়ো রাজনীতিজ্ঞ ছিলেন তার অধিনায়ক। তাঁর নাম ছিল পেরিক্লিস। ত্রিশ-বৎসর কাল এথেন্সের শাসনভার তাঁর হাতে ছিল। সে সময়ে এথেন্স নগরীর গরিমার অন্ত ছিল না—একদিকে সুদৃশ্য হর্ম্যে শোভিত, অপরদিকে বড়ো বড়ো শিল্পী এবং সুধীবৃন্দের বাসভূমি। এখনও সেকালের এথেন্সের কথা বলতে হলে আমরা বলি পেরিক্লিসের এথেন্স কিংবা পেরিক্লিসের যুগ।

 প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক হিরোডটাস ছিলেন ঐ যুগের একজন এথেন্সবাসী। এথেন্সের উন্নতির কারণ সম্বন্ধে তিনি আলোচনা করেছেন। তিনি স্বভাবতই একটু নীতিবাগীশ ছিলেন; এই সূত্রেও তিনি একটি নীতির উল্লেখ করেছেন। তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে বলেছেন:

 এথেন্স ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠল—এর থেকেই প্রমাণ হয় এবং সর্বত্রই এর প্রমাণ মেলে যে, স্বাধীনতার ফল কখনও ভালো না হয়ে যায় না। এথেন্সবাসীরা যতদিন স্বৈরাচারী শাসনতন্ত্রের অধীনে ছিল ততদিন তারা সামরিক শক্তিতে অন্যান্য রাষ্ট্রের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিল না। কিন্তু স্বৈরতন্ত্রের অবসান হওয়ামাত্র তারা শক্তিতে আর সকলকে ছাড়িয়ে গেল। এর থেকে দেখা যাচ্ছে, পরাধীন অবস্থায় তারা আপন শক্তির পূর্ণ ব্যবহার করে নি, কেবলমাত্র প্রভুর আজ্ঞা পালন করেছে। কিন্তু স্বাধীনতালাভের পরে প্রত্যেকটি ব্যক্তি বেচ্ছায় আপন শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেছে।

 সে যুগের মহারথীদের মধ্যে কয়েকজনের নাম ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। কিন্তু এদের মধ্যে যিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ, এমনকি যাঁকে সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের অন্যতম বলা চলে, তাঁর নাম এখনও করা হয় নি। তাঁর নাম সক্রেটিস। তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক এবং জ্ঞানযোগী, নিরন্তর সত্যের সন্ধানে রত। প্রকৃত জ্ঞানলাভ করাই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র অভিলাষ। বন্ধুবান্ধব পরিচিতদের সঙ্গে তিনি প্রায়ই কঠিন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। আলোচনা-প্রসঙ্গে প্রকৃত সত্য যাতে উদ্ঘাটিত হতে পারে, এই ছিল উদ্দেশ্য। তাঁর অনেক-সব শিষ্য অথবা চেলা ছিল, তাদের মধ্যে সর্বপ্রধান ছিলেন প্লেটো। প্লেটো অনেক বই লিখে রেখে গেছেন। সেসব বই থেকে আমরা তাঁর গুরু সক্রেটিস সম্বন্ধে অনেক কথা জানতে পারি। প্রায়ই দেখা যায়, যারা নূতন নূতন তত্ত্বানুসন্ধানে লিপ্ত, শাসক সম্প্রদায় তাদের বড়ো একটা সুনজরে দেখে না, সত্যানুসন্ধান তারা পছন্দ করে না। পেরিক্লিসের অব্যবহিত পরেই যাঁরা এথেন্সের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন তাঁরা সক্রেটিসের ভাবভঙ্গি, মতামত পছন্দ করতেন না। এঁদের হুকুমে সক্রেটিসের বিচার হল এবং বিচারের ফলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হল। কর্তারা বললেন, সক্রেটিস যদি লোকজনের সঙ্গে ঐসব আলোচনা বন্ধ করেন এবং তাঁর মতিগতি পরিবর্তন করেন তবে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু সক্রেটিস তাতে রাজি হলেন না; যা কর্তব্য বলে জেনেছেন তা ত্যাগ করার চেয়ে বিষপাত্র গ্রহণ করে মৃত্যুবরণ করাই তিনি শ্রেয় মনে করলেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর বিচারক এবং এথেন্সবাসীদের সম্বোধন করে বলেছিলেন:

 আমি আমার সত্যানুসন্ধানের ব্রত ত্যাগ করব এই শর্তে আপনারা আমাকে মুক্তি দিতে প্রস্তুত আছেন। তার উত্তরে আমি এথেন্সবাসীদের বলব, আপনাদিগকে সহস্র ধন্যবাদ। কিন্তু আপনাদের আদেশ পালনে আমি অক্ষম, কারণ আমি ভগবানের আদেশ শিরোধার্য করে নিয়েছি। তিনিই আমাকে এ কার্যে নিয়োজিত করেছেন। যতদিন আমার দেহে প্রাণ আছে ততদিন এই জ্ঞানান্বেষণের ব্রত থেকে আমি বিরত হব না। আমার অভ্যস্ত প্রথানুযায়ী যে-কোনো ব্যক্তির সঙ্গেই আমার সাক্ষাৎ হবে, সম্বোধন করে বলব, ‘তুমি যে জ্ঞান এবং সত্যানুসন্ধান ছেড়ে, আপন আত্মার কল্যাণচিন্তা ভুলে গিয়ে, কেবলমার অর্থ এবং যশের পিপাসায় মত্ত হয়ে আছ, এ কি ঘোরতর লজ্জার কথা নয়?’ মৃত্যু কী জিনিষ আমি জানি না, কে জানে এর ফল কল্যাণকর হতেও-বা পারে, সুতরাং আমি মৃত্যুকে ভয় করি না। আমি শুধু এইটুকু জানি, কর্তব্য কাজ থেকে বিরত হওয়া অন্যায়। যাকে নিশ্চিত অন্যায় বলে জানি তার চেয়ে যাতে কল্যাণের সম্ভাবনা হয়তো-বা নিহিত আছে সেই মৃত্যুকেই আমি অধিক বরণীয় মনে করি।

 সক্রেটিস যতদিন বেঁচে ছিলেন প্রাণ দিয়ে সত্য এবং জ্ঞানের সাধনা করে গিয়েছেন; সেই সাধনা আরও বেশি সার্থকতা লাভ করেছে তাঁর মৃত্যুতে।

 আজকাল সাম্যবাদ, পুঁজিবাদ এবং আরও কত কত সমস্যা সম্বন্ধে তোমরা নানা আলাপ-আলোচনা শুনছ কিংবা পড়ছ। পৃথিবীতে দুঃখদৈন্য অবিচার অনেক রয়েছে। বর্তমান বিধিব্যবস্থায় অনেকেরই আস্থা নেই, তাঁরা এসব বদলাতে চান। রাষ্ট্রপরিচালনা সম্বন্ধে প্লেটোও অনেক কথা ভেবেছেন, অনেক-কিছু, লিখেও গেছেন। তাতেই দেখা যাচ্ছে, সেই যুগের লোকেরাও দেশের রাষ্ট্র এবং সমাজব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলবার কথা ভেবেছেন যাতে সর্বসাধারণের সুখস্বাচ্ছন্দ্য বাড়ানো যায়।

 প্লেটো যখন প্রায় বৃদ্ধ হয়ে এসেছেন তখন আর-একজন গ্রীক পণ্ডিত ক্রমে খ্যাতি এবং প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। তাঁর নাম এরিস্টটল্। তিনি ছিলেন মহাবীর আলেকজাণ্ডারের গৃহশিক্ষক। পরে আলেকজাণ্ডার তাঁকে বহুপ্রকারে সাহায্য করেছিলেন। সক্রেটিস এবং প্লেটোর ন্যায় এরিস্টটল্ দার্শনিকতত্ত্ব নিয়ে মাথা ঘামান নি। প্রকৃতির কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করার দিকেই তাঁর বিশেষ ঝোঁক ছিল। একে বলা যায় প্রকৃতিদর্শন কিংবা আজকালকার ভাষার যাকে বলে বিজ্ঞান। এই হিসাবে এরিস্টটল্ পৃথিবীর প্রাচীনতম বৈজ্ঞানিকদের অন্যতম।

 এর পরে আমরা এরিস্টটলের শিষ্য আলেকজাণ্ডারের জীবনকাহিনী আলোচনা করব। কিন্তু সেটি হবে কালকে, আজকে ঢের লেখা হয়ে গেছে।

 আজকে বসন্ত পঞ্চমী, আজ থেকে বসন্তঋতুর সূচনা। আমাদের স্বল্পস্থায়ী শীতঋতু শেষ হয়ে গেল, বাতাসে আর সেই কনকনে ভাবটা নেই। ক্রমেই পাখির দল এসে ভিড় করছে আর পাখির গানে চারদিক মুখরিত হয়ে উঠছে। পনেরো বৎসর আগে দিল্লি নগরে ঠিক এই দিনটিতে তোমার মায়ের আর আমার বিয়ে হয়েছিল!