বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/চাল এবং পাল্টা চাল
১৭৪
চাল এবং পাল্টা চাল
আগের দুটি চিঠিতে আমি অর্থনীতি আর মুদ্রানীতি নিয়ে আলোচনা করেছি। দুটিই রহস্যময় এবং দুর্বোধ্য বিষয় বলে লোকের ধারণা। খুব সহজ নয় এটা ঠিকই; বুঝতে হলে একটু ভালো করে ভাবতেও হয়। তবু তাই বলে খুব ভয়ংকর ব্যাপারও এরা মোটেই নয়; এই বিষয়গুলির চারদিকে যে রহস্যের আবরণ ঘেরা রয়েছে তার খানিকটা হচ্ছে অর্থনীতিবিদ আর বিশেষজ্ঞদেরই সৃষ্টি। প্রাচীন কালে রহস্যের ব্যবসায়ে একচেটিয়া অধিকার ছিল পুরোহিতদের: নানান রকমের আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদির সাহায্যে এরা অজ্ঞ জনসাধারণকে নিজের ইচ্ছেমতো চালিয়ে নিত; অনেকসময়েই কেউ বোঝে না এমন একটা প্রাচীন ভাষায় মন্ত্রতন্ত্র উচ্চারণ করত, এমন ভাব দেখাত যেন অলক্ষ্য দেবতাদের সঙ্গে তাদের কথাবর্তা কাজকারবার চলছে। এখনকার দিনে পুরোহিতদের আর তেমন প্রতিপত্তি নেই; শিল্পপ্রধান দেশে তো এদের প্রতিপত্তি প্রায় লোপই পেয়ে গেছে। পুরোহিতদের জায়গা দখল করেছে এখন অর্থনীতি-বিশেষজ্ঞ, ব্যাঙ্কার ইত্যাদিরা—এরা রহস্যে-ঢাকা ভাষায় কথা বলে, সে ভাষা প্রধানত কটমট সাঙ্কেতিক কথায় পরিপূর্ণ, সাধারণ মানুষ তার মাথামুণ্ডুও বোঝে না। অতএব এই-সব সমস্যার সমাধানের ভার সাধারণ মানুষেরা বিশেষজ্ঞদের হাতেই ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই বিশেষজ্ঞরা আবার অনেক সময়েই জেনেই হোক অজান্তেই হোক, ভিড়ে যান শাসক শ্রেণীদের দলে; তাদের যাতে লাভ সেই কথাই বলে বেড়ান। বিশেষজ্ঞদেরও আবার পরস্পর মতের মিল থাকে না।
ওদিকে আবার, রাজনীতি বল অন্য যা-কিছু বল, সবই আজকাল চলছে অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে। তাই অর্থনীতির এই তত্ত্বগুলো আমাদের সকলেরই খানিকটা জেনে নিতে চেষ্টা করা ভালো। মানুষের মধ্যে দল এবং শ্রেণী ভাগ করবার নানা উপায় আছে। একটি হচ্ছে মানুষ জাতকে দুটি শ্রেণীতে ফেলা; তার একদল ঠিক তৃণের মতো, নিজের ইচ্ছা বা সংকল্প বলে তাদের কিছু নেই। স্রোতের মুখে তারা ঘাটে ঘাটে ঠেলা খেয়ে ঘুরে বেড়ায়। অন্য দল তা নয়, জীবনযাত্রার গতি নির্ধারণ তারা নিজের ইচ্ছামতোই করতে চায়, চারপাশের পরিবেশকে নিজে ইচ্ছামতো গড়তে চায়। জ্ঞান এবং বুদ্ধি না থাকলে এই দ্বিতীয় শ্রেণীটির একটুও চলে না, কারণ একমাত্র জ্ঞান এবং বুদ্ধি থাকলে তবেই মানুষ নিজের ইচ্ছামতো কাজ ঘটিয়ে তুলতে পারে। শুধু সদিচ্ছা বা উচ্চাশা দিয়েই সব কাজ হয় না। কোথাও যখন একটা প্রাকৃতিক দুর্বিপাক ঘটে বা মহামারী লাগে বা অনাবৃষ্টি হয় বা প্রায় যে-কোনো রকমেরই বিপদ উপস্থিত হয়, তখন শুধু ভারতবর্ষে নয়, ইউরোপে পর্যন্ত দেখা যায়, লোকেরা সে বিপদ থেকে ত্রাণ পাবার জন্য প্রাণপণে প্রার্থনা করতে বসে যায়। প্রার্থনা করে যদি মন শান্ত হয়, মনে যদি বিশ্বাস বা সাহস আসে, তবে সে প্রার্থনা অতি ভালো বস্তু, তাতে কারও আপত্তি করবারও কারণ থাকে না। কিন্তু কেবল প্রার্থনার জোরেই মহামারী বা ব্যাধির আক্রমণ থেমে যাবে, এ ধারণা এখন আর লোকের নেই; এর জায়গাতে আসছে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান; ব্যাধির মূল কারণকে উচ্ছেদ করে ফেলতে হবে স্বাস্থ্য-বিধি পালন এবং অনুরূপ উপায়ের দ্বারা। কারখানার একটা কল হঠাৎ ভেঙে যায়, গাড়ির চাকার টায়ার হঠাৎ ফুটো হয়ে যায়। কিন্তু তাই বলে কে কোথায় শুনেছে, মানুষ তখন শুধু চুপ করে বসে থাকে, বসে বসে খালি আশা করে বা জোর কামনা করে বা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে, সে ভাঙা কল নিজে থেকে আস্ত হয়ে থাক বা সে চাকার ফুটো নিজে থেকেই জুড়ে যাক? তা তো করে না তারা—তারা চট্পট কাজে লেগে যায়, কলকে টায়ারকে মেরামত করে ফেলে; তারপরই আবার সে কল চলতে থাকে, সে গাড়ি রাস্তা বয়ে চমৎকার ছুটে চলে যায়।
মানুষ আর সমাজের এই-যে জীবনযাত্রার কল, এর বেলাও ঠিক তাই—এখানেও শুধু সৎ-সংকল্প দিয়ে কাজ হয় না, তার উপরেও দরকার হয় জ্ঞানের,—সে কল কী করে চলে, তাকে দিয়ে কী হয় সেই সম্বন্ধে জ্ঞান। এই জ্ঞান কখনোই ঠিক নির্ভুল হয় না, তার কারণ এর কারবারই হচ্ছে মানুষের ইচ্ছা, কামনা, সংস্কার প্রয়োজন, ইত্যাদি কতকগুলো অনিশ্চিত বস্তু নিয়ে; এক সঙ্গে বহু লোকের জনতাকে নিয়ে, সমগ্র সমাজকে বা মানুষের বিভিন্ন শ্রেণীকে নিয়ে যেখানে আমরা আলোচনা করতে যাই সেখানে এগুলো আরও অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। তবু অধ্যয়ন অভিজ্ঞতা এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টির ফলে ক্রমে এই অনিশ্চিত তত্ত্বপুঞ্জের মধ্যেও শৃঙ্খলার সন্ধান মেলে; মানুষের জ্ঞান ক্রমে বেড়ে ওঠে; তারই সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলে আমাদের শক্তি—পরিবেশকে নিজেদের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রিত করবার শক্তি।
যুদ্ধের যুগের এই সময়টাতে ইউরোপের রাজনৈতিক জীবন কোন্ পথে চলেছে, এবার আমি তোমাকে তার সম্বন্ধে কিছু বলব। প্রথমেই যে জিনিসটা মনে পড়ে সে হচ্ছে, সমগ্র মহাদেশটিকে তিনটি অংশে ভাগ করে ফেলা হয়েছে; যুদ্ধের বিজেতা পক্ষ, বিজিত পক্ষ, এবং সোভিয়েট রাশিয়া। নরওয়ে, সুইডেন, হল্যাণ্ড, সুইজারল্যাণ্ড প্রভৃতি কয়েকটা ছোটো ছোটো দেশ অবশ্য ছিল, যারা এই তিনটি ভাগের কোনোটিতেই পড়ে নি। কিন্তু দেশ হিসাবে এরা ক্ষুদ্র, বৃহত্তর রাজনীতির দিক থেকে এদের তেমন কোনো গুরুত্ব ছিল না। সোভিয়েট রাশিয়া স্বভাবতই তার শ্রমিক-চালিত সরকার নিয়ে নিজস্ব মহিমায় একা দাঁড়িয়ে রইল; তাকে দেখে বিজেতা জাতিরা সারাক্ষণ বিব্রত হয়ে আর গাত্রদাহে জ্বলে পুড়ে মরতে লাগল। এদের সে গাত্রদাহের একটা কারণ হচ্ছে রাশিয়ার অভিনব শাসন-প্রণালী—অন্যান্য দেশের শ্রমিকরাও তার দৃষ্টান্ত দেখে বিপ্লব ঘটাতে উৎসাহী হয়ে উঠেব। তবু সেইটাই গাত্রদাহের একমাত্র কারণ নয়। প্রাচ্য জগতে অনেক কাণ্ড ঘটাবার কুমতলব বিজেতা দেশদের ছিল; রাশিয়ার এই আবির্ভাবে তার অনেকগুলোতে বাধা পড়ে গেছে—গাত্রদাহের সেটাও একটা হেতু। ১৯১৯ এবং ১৯২০ সনে যে-সব যুদ্ধ হল তার কথা আমি তোমাকে আগেই বলেছি; এই বিজেতা দেশগুলির প্রায় সকলেই তখন সোভিয়েটগুলোকে বিচূর্ণ করতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এদের আক্রমণ স’য়েও সোভিয়েট রাশিয়া বেঁচে রইল; ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিকে বাধ্য হয়েই তার অস্তিত্বকে সহ্য করে চলতে হল—কিন্তু সেটা সয়ে নিল তারা যথাসম্ভব অপ্রসন্ন এবং বিদ্বিষ্ট মনে। বিশেষ করে ইংলণ্ড। ইংলণ্ডের সঙ্গে রাশিয়ার রেষারেষি সেই জারদের আমল থেকে চলে এসেছে; সেই রেষারেষি সমানেই টিঁকে রইল; ফাঁক পেলেই এমন সব ঘটনা এবং আতঙ্কের সৃষ্টি হতে লাগল যে লোকে ভাবল এই কি যুদ্ধ বাধে। সোভিয়েটরা ভালো করেই জানত ইংলণ্ড সারাক্ষণ তাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত চালাচ্ছে, ইউরোপে সোভিয়েট-বিরোধী জাতিদের একটা দল পাকিয়ে তুলতে চেষ্টা করছে। কয়েকবারই এই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের আতঙ্ক দেখা দিল।
পশ্চিম এবং মধ্য-ইউরোপে বিজেতা আর বিজিত জাতিদের মধ্যের তফাতটা খুব বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠল; বিজয়ীর মনোভাবটা বিশেষ করে প্রখর হয়ে দেখা দিল ফ্রান্সের মধ্যে। সন্ধিপত্রে যে-সব শর্ত দেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে অনেকগুলো স্বভাবতই বিজিত জাতিদের মনঃপূত হয় নি। প্রতিকার বলে কিছু করবার ক্ষমতা তাদের ছিল না; তবু ভবিষ্যতে একদিন হযতো অবস্থার পরিবর্তন হবে, এ স্বপ্ন তারা দেখছিল। অস্ট্রিয়া এবং হাঙ্গেরি তখন প্রায় মরণাপন্ন, মনে হল তাদের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়ছে। ওদিকে সার্বিয়াকে ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে যুগোশ্লাভিয়া রাজ্য সৃষ্ট করা হয়েছিল; সেটা হল নানারকম ভিন্নপ্রকৃতি মানুষ আর জাতির একটা জগাখিচুড়ি। দু’দিন না যেতেই তার মধ্যেকার বিভিন্ন অংশ পরস্পরের উপরে বিরক্ত হয়ে উঠল; নিজের নিজের মতো আলাদা হয়ে গিয়ে নিজেদের উন্নতি সাধনের জন্য এরা ব্যগ্র হয়ে উঠল। বিশেষ করে ফ্লোয়াটিয়ার (এটা এখন যুগোশ্লাভিয়ার একটা প্রদেশে পরিণত হয়েছে), একটা জোর স্বাধীনতা-আন্দোলন চলেছে; সার্বিয়া-সরকার বেশ জোর-হাতেই সে আন্দোলনকে দমিয়ে রাখছে। পোল্যাণ্ড এখন রীতিমতো একটা বড়ো দেশ; তবু এর সাম্রাজ্যবাদী নেতারা অপূর্ব সব দিগ্বিজয়ের স্বপ্ন দেখছেন। ১৭৭২ সনে প্রাচীন পোল্যাণ্ড
রাজ্যের সীমান্ত দক্ষিণে কৃষ্ণসাগরের তীর অবধি বিস্তৃত ছিল; এখনও সেই সমস্ত এলাকা আবার দখল করে প্রাচীন কালের সেই লুপ্ত গৌরব ফিরিয়ে আনবেন এই তাঁদের স্বপ্ন। এদিকে রাশিয়ার অন্তর্গত ইউক্রেন প্রদেশের একটা অংশকে পোল্যাণ্ডের অন্তর্গত করে দেওয়া হয়েছে; সেখানে প্রজাদের উপরে নির্যাতন, মৃত্যুদণ্ড এবং আরও বহু বর্বরোচিত শাস্তি চালিয়ে একটা ত্রাসের সৃষ্টি করে সে দেশটাকে ‘শান্ত’ বা ‘পোলায়িত’ করবার চেষ্টা করা হয়েছে, এখনও হচ্ছে। পূর্ব-ইউরোপের স্থানে স্থানে বহু ক্ষুদ্র অগ্নিকুণ্ড ধিক-ধিক জ্বলছে, এই হচ্ছে তার কয়েকটির পরিচয়। ক্ষুদ্র হলেও এই কুণ্ডগুলো অবহেলার বস্তু নয়, কারণ এর আগুন বৃহত্তর ক্ষেত্র নিয়ে বিস্তৃত হয়ে পড়বার আশঙ্কা প্রচুরই রয়েছে।
রাজনীতি এবং বাস্তব-তত্ত্বের দিক থেকে, যুদ্ধের পরবর্তী কটি বছর ফ্রান্সই ছিল ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিপত্তিশালী দেশ। তার যা কিছু কাম্য ছিল তার অনেকখানিই সে পেয়ে গিয়েছিল—প্রচুর জায়গা পেয়েছে সে, যুদ্ধ-ক্ষতিপূরণেরও অন্তত আশ্বাস পেয়েছে; কিন্তু তবু তার মন প্রসন্ন হয় নি। প্রকাণ্ড একটা ভয়ে সে জড়োসড়ো হয়ে ছিল—ভয়টা হচ্ছে, জর্মন হয়তো আবার প্রবল হয়ে উঠবে, আবার তার সঙ্গে যুদ্ধ করবে, হয়তো তাকে হারিয়েই দেবে। জর্মনির লোকসংখ্যা ফ্রান্সের চেয়ে অনেক বেশি, এইটাই হচ্ছে ফ্রান্সের ভয় পাবার প্রধান হেতু। আয়তনে ফ্রান্স বস্তুতই জর্মনির চেয়ে বড়ো, তার জমিও বোধ হয় বেশি উর্বর। তবু কিন্তু ফ্রান্সের লোকসংখ্যা চার কোটি দশ লক্ষেরও কম; আর সে সংখ্যা বিশেষ বাড়েও না। জর্মনির লোকসংখ্যা ছয় কোটি দুই লক্ষেরও বেশি; সে সংখ্যাও আবার দিনদিনই বেড়ে চলেছে। তা ছাড়া উগ্র এবং যুদ্ধ-কুশল জাতি বলেও জমনির খ্যাতি আছে; স্মরণীয়কালের মধ্যেই দু’দুবার সে ফ্রান্সকে আক্রমণ করেছে।
অতএব জর্মন পাছে তার উপরে প্রতিশোধ তোলে এই ভয়েই ফ্রান্স বিহ্বল হয়ে পড়ল; তার সমস্ত কূটনীতির ভিত্তি এবং মূল কথাই হয়ে উঠল ‘নিরাপত্তা-বিধান’—মানে ফ্রান্স যা পেয়েছে সেটা দখল এবং ভোগ করবার ব্যবস্থাটা অক্ষুণ্ণ রাখবার ব্যবস্থা। অন্য দেশদের তুলনায় ফ্রান্সের সামরিক শক্তি বেশি; ভার্সাই সন্ধির শর্ত দেখে যে-সব দেশরা ক্ষুণ্ণ হয়েছিল, ফ্রান্সের সামরিক শক্তির চাপেই তাদের তখন সংযত করে রাখা হয়েছে—কারণ ফ্রান্সের ‘নিরাপত্তার’ জন্য সে সন্ধিটিকে টিঁকিয়ে রাখা প্রয়োজন ছিল। তার শক্তিকে আরও দৃঢ় করে তোলবার জন্য ফ্রান্স একটি দলও গড়ে তুলল—ভার্সাই সন্ধি টিঁকিয়ে রাখায় যাদের স্বার্থ রয়েছে, এই রকমের সব দেশদের নিয়ে সে দল গড়া হল। এই দেশগুলি হচ্ছে বেলজিয়ম, পোল্যাণ্ড, চেকোশ্লোভাকিয়া, রুমানিয়া এবং যুগোস্লাভিয়া।
এই ভাবে ফ্রান্স ইউরোপে তার অধ্যক্ষতা বা নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করল। ইংলণ্ডের এটা পছন্দ হল না; সে নিজে ছাড়া অন্য কোনো দেশ ইউরোপে প্রবল হয়ে উঠবে, এটা ইংলণ্ডের ইচ্ছা নয়। মিত্ররাজ্য ফ্রান্সের প্রতি ইংলণ্ডের যে দারুণ প্রীতি ও বন্ধুত্ব ছিল তার অনেকখানিই উবে গেল; ইংলণ্ডের খবরের কাগজে ফ্রান্সকে স্বার্থপর নির্মম বলে অভিহিত করা হতে লাগল; সেই সঙ্গেই পুরোনো শত্রু জর্মনির সম্বন্ধেও বহু প্রীতিপূর্ণ উক্তি করা হতে লাগল। ইংরেজরা তখন বলতে লাগল, অতীত শত্রুতা মনে করে রাখতে নেই, সেটা ভুলে যেতে হয়, ক্ষমা করতে হয়; শান্তির সময়েও অতীত যুদ্ধের দিনের স্মৃতি নিয়ে চলা আমাদের পক্ষে কিছুতেই উচিত হবে না। অতি চমৎকার কথা; ইংরেজদের দিক থেকে একেবারে দ্বিগুণ চমৎকার, কারণ তখন এই কথাগুলো দিয়েই ইংরেজদের কুটনীতি সিদ্ধ হবার ভরসা। রাজনীতির ক্ষেত্রে ইংলণ্ড যেখানেই সুযোগটুকু পায়, বা ব্রিটিশ সরকার কূটনীতির যে চালটিই চালে, ইংলণ্ডের প্রজারা শ্রেণীনির্বিশেষে তৎক্ষণাৎ অতি উচ্চস্তরের নৈতিক যুক্তি দেখিয়ে সেটাকে সমর্থন করে; কাউণ্ট স্ফোর্জা নামক ইতালির একজন রাষ্ট্রনীতিবিদ্ একবার বলেছিলেন, “ঈশ্বর স্বয়ং এই একটি মহামূল্য গুণে ব্রিটিশ জাতিকে ভূষিত করেছেন”।
১৯২২ সনের গোড়ার দিক থেকেই ইংলণ্ড আর ফ্রান্সের বিরোধ শুরু হল: ইউরোপের রাজনীতি ক্ষেত্রে এটি একটি স্থায়ী ব্যাপার হয়ে পড়ল। বাইরে এরা মিষ্টি হেসে কথা কয়, অত্যন্ত ভদ্র ভাষার আলাপ করে; এদের রাষ্ট্রনায়করা এবং প্রধানমন্ত্রীরা প্রায়ই পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, একত্র হয়ে ফটোগ্রাফ তোলেন; অথচ এই দুটি দেশের কর্তৃপক্ষ প্রায় সময়ই পরস্পরের উল্টা দিকে চলতে চেষ্টা করেন। ১৯২২ সনে জর্মন ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে পারল না, সেই অপরাধে মিত্রশক্তি রূঢ়-উপতাকা দখল করে নিল। ইংলণ্ড এই দখল করার পক্ষপাতী ছিল না; কিন্তু ফ্রান্স ইংলণ্ডের আপত্তি অগ্রাহ্য করেই নিজের ইচ্ছা পূরণ করল। ব্রিটেন কিন্তু তার সে দখলদারিতে কোনো অংশ গ্রহণ করল না।
তার পর আবার আরও একটি প্রাচীন মিত্রজাতির সঙ্গে ফ্রান্সের বিরোধ বাধল; দুই দেশের মধ্যে সারাক্ষণই ঠোকাঠুকি চলতে লাগল। এই দেশটি হচ্ছে ইতালি। ইতালিতে ১৯২২ সনে মুসোলিনী শাসন-কর্তৃত্ব হস্তগত করলেন, তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারের কামনা ছিল ফ্রান্স তাতে বাধা দিল—এই থেকেই বিরোধের উদ্ভব। মুসোলিনী আর তাঁর ফ্যাসিজ্মের কথা আমি তোমাকে এর পরের চিঠিতে বলব।
যুদ্ধের পরবর্তী কালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যেও ভাঙন ধরার কতগুলো লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠল। এর সম্বন্ধে কিছুটা আলোচনা আমি আগের কয়েকটা চিঠিতে করেছি। এখানে শুধু এর একটা দিক সম্বন্ধে কথা বলব। অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডা, এই দুটি দেশই উত্তরোত্তর আমেরিকার সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের কবলে গিয়ে পড়ছিল; জাপানিদের উপরে, বিশেষ করে জাপান থেকে এই সব দেশে যে লোক বসবাস করতে আসছে তার উপরে এরা তিনটি দেশই সমান ক্ষ্যাপা ছিল। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার এই ভয় খুবই বেশি: অস্ট্রেলিয়ার অজস্র জমি পড়ে আছে যেখানে বাস করবার লোক নেই; ওদিকে জাপান তার থেকে বেশি দূর নয়, সেখানে লোক এত বেশি হয়ে গেছে যে দেশে তাদের জায়গা হচ্ছে না। জাপানের সঙ্গে ইংলণ্ড মৈত্রী-স্থাপন করেছে; এই দুটি ডোমিনিয়নের এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেটা পছন্দ নয়। মহাজন হিসাবে, এবং অন্য দিক দিয়েও আমেরিকা ইতিমধ্যে পৃথিবীতে প্রবল হয়ে উঠেছে অতএব ইংলণ্ড তখন তাকে প্রসন্ন রাখতে চায়। সামাজটাকেও যতদিন সম্ভব টিঁকিয়ে রাখাই তার কাম্য। অতএব ১৯২২ সনের ওয়াশিংটন কনফারেন্সে সে ইঙ্গ-জাপানি মৈত্রী বিসর্জন দিল। চীন সম্বন্ধে আমার শেষ চিঠিটিতে আমি তোমাকে এই কনফারেন্সের কথা বলেছি। এইখানেই চতুঃশক্তি-চুক্তি এবং নব-শক্তি সন্ধি করা হয়েছিল। এই সন্ধিগুলো হয়েছিল চীন এবং প্রশাস্ত মহাসাগরের তীরভূমি সম্বন্ধে। সোভিয়েট রাশিয়ার স্বার্থ এর সঙ্গে অনেকখানিই জড়ানো, তবু কিন্তু তাকে এই সম্মেলনে আমন্ত্রণ করা হল না—রাশিয়া এই অবহেলার প্রতিবাদ জানাল, তবুও না।
এই ওয়াশিংটন কনফারেন্সেই, প্রাচ্য জগতে ইংলণ্ড যে কূটনীতি এতদিন চালিয়ে এসেছে তার একটা পরিবর্তন দেখা দিল। এতদিন যাবৎ ইংলণ্ড জাপানকে বন্ধু বলে জানত; তার ভরসা ছিল, দূর প্রাচ্যে, বা ভারতবর্ষেও যদি তার কোনো বিপদ হয়, সে বিপদে জাপান তাকে সাহায্য করবে। কিন্তু এখন দেখা গেল, পৃথিবীর রাজনৈতিক জীবনে দূর প্রাচ্য অঞ্চল ক্রমেই একটা বৃহৎ স্থান অধিকার করছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশদের মধ্যেও স্বার্থের সংঘাত লেগেছে। চীন প্রবল হয়ে উঠছে, অন্তত বাইরে থেকে দেখে তাই মনে হচ্ছে; জাপান আর আমেরিকার মধ্যে বৈরিতাও ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। অনেকের তখন ধারণা ছিল, এর পরের বারে যে মহাযুদ্ধ বাধবে, প্রশান্ত মহাসাগরই হবে তার প্রধান কেন্দ্রস্থল। জাপান আর আমেরিকার মধ্যে তখন একপক্ষকে বেছে নিতে হয়—ইংলণ্ড জাপানকে ছেড়ে আমেরিকার দলে গিয়ে ভিড়ল। কিংবা তাও ঠিক নয়; সত্যি করে বলতে গেলে বলতে হয়, জাপানের পক্ষ সে পরিত্যাগ করল। তার নীতিটা তখন হল, আমেরিকার শক্তি বেশি, টাকা অনেক, অতএব আমেরিকার সঙ্গে সে বন্ধুত্ব বজায় রেখে চলবে, কিন্তু কাগজে-কলমে কোনো কথা কাউকে দেবে না। জাপানের সঙ্গে মৈত্রীকে খতম করে দিয়ে ব্রিটেন এবার দূর প্রাচ্য অঞ্চলে যদি যুদ্ধ বাধে ভেবে সেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হবার আয়োজন শুরু করল। সিঙ্গাপুরে অজস্র টাকা ঢেলে জাহাজ মেরামতের অতি প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ডক তৈরি করল সে, এই স্থানটিকে সে নৌবাহিনীর একটি প্রকাণ্ড ঘাঁটিতে পরিণত করল। এই ঘাঁটি থেকে এখন সে ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে সমস্ত চলাচলের গতি নিয়ন্ত্রিত করতে পারে। একদিকে ভারতবর্ষ ও ব্রহ্মদেশ, অন্যদিকে ফরাসি ও ডাচ উপনিবেশগুলিকে সে এখন আয়ত্তে রাখতে পারছে; সবচেয়ে বড়ো কথা, এখন যদি প্রশান্ত মহাসাগরে যুদ্ধ বাধে সে যুদ্ধে ব্রিটেন বেশ ভালো রকমই লড়াই দিতে পারবে—তা সে যুদ্ধ জাপানের সঙ্গেই হোক বা আর কারও সঙ্গেই হোক।
১৯২২ সনে ওয়াশিংটনে ইঙ্গ-জাপানি মৈত্রী ভেঙে গেল; এর ফলে জাপান একেবারে একা হয়ে পড়ল। বাধ্য হয়েই জাপানিরা তখন চোখ ফেরাল রাশিয়ার দিকে, সোভিয়েটদের সঙ্গে তারা বন্ধুত্ব পাতাবার চেষ্টা করতে লাগল। তিন বছর পরে, ১৯২৫ সনের জানুয়ারি মাসে, জাপান এবং সোভিয়েট ইউনিয়নের মধ্যে একটি সন্ধি স্থাপিত হল।
যুদ্ধের পর প্রথম ক’বছর বিজয়ী জাতিরা জর্মনিকে আচারে-ব্যবহারে প্রায় একঘরে করেই রাখল। এদের কাছে বিশেষ সদ্ব্যবহার পাচ্ছে না দেখে, এবং এদের একটু খানি ভয় দেখিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে, জর্মনি তখন সোভিয়েট রাশিয়ার দিকে মুখ ফেরাল; ১৯২২ সনের এপ্রিল মাসে রাশিয়ার সঙ্গে সে সন্ধি স্থাপন করল। এই সন্ধির নাম রাপাল্লোর সন্ধি। এই সন্ধির সমস্ত উদ্যোগ-আয়োজন গোপনেই করা হয়েছিল; অতএব সন্ধির কথা যখন বাইরে প্রকাশ করা হল, মিত্রপক্ষের সরকাররা একটা অতর্কিত ধাক্কা খেলেন। বিশেষ করে ইংলণ্ডের শাসকশ্রেণী সোভিয়েট সরকারের উপর নিদারুণ চটা। জর্মনির সঙ্গে সদ্ব্যবহার না করলে, তাকে প্রসন্ন না রাখলে, সে হয়তো রাশিয়ার সঙ্গেই গিয়ে যোগ দেবে—বাস্তবিক পক্ষে এই কথাটা হৃদয়ঙ্গম হবার ফলেই ব্রিটিশরা জর্মনির প্রতি তাদের নীতি বদলে ফেলল। জর্মনিকে যেসব অসুবিধা আর দুর্দশা সইতে হচ্ছিল, সেগুলো অকস্মাৎ তারা অত্যন্তরকম বুঝে ফেলল; তার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনের নানাবিধ চেষ্টা করতে লাগল, অবশ্য বেসরকারি ভাবে। রূঢ় দখল করার ব্যাপার থেকেও তারা দূরে স’রে রইল। এ-সব অবশ্য তারা করছিল, হঠাৎ রাতারাতি তারা জর্মনিকে ভয়ানক ভালোবেসে ফেলেছিল বলে নয়; জর্মনিকে তারা রাশিয়ার কাছ থেকে দূরে টেনে রাখতে, সোভিয়েট-বিদ্বেষী জাতিদের দলেই ভিড়িয়ে রাখতে চাইছিল বলে। কয়েকবছর ধরে এইটাই হয়ে রইল ব্রিটেনের কূটনীতির মূলমন্ত্র; অবশেষে ১৯২৫ সনে লোকার্নোতে তাদের এই চেষ্টা সফল হল। লোকার্নোতে সমস্ত দেশদের মধ্যে একটা কনফারেন্স হল; যুদ্ধের পর সেই প্রথমবার বিজয়ী জাতিদের আর জর্মনির মধ্যে কতকগুলো ব্যাপারে মতের একটা সতাকার মিল দেখা গেল—কথাগুলোকে নিয়ে একটা সন্ধিপত্র রচিত হল। সমস্ত ব্যাপারে সম্পূর্ণ মতৈক্য অবশ্য হয় নি; ক্ষতিপূরণের বিরাট সমস্যাটারই সেখানে মীমাংসা হল না, এছাড়া আরও অনেক প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেল। তবু আরম্ভটা ভালোই হল বলতে হবে; দুই পক্ষের মধ্যে আশ্বাসবাক্য এবং প্রতিশ্রুতিও অনেকগুলো দেওয়া-নেওয়া হল। জর্মনির পশ্চিমে অর্থাৎ ফ্রান্সের দিকে যে সীমান্তরেখা ভার্সাই সন্ধিতে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল, জর্মন সেটা স্বীকার করে নিল। প্রাচ্য সীমান্ত এবং সমুদ্র পর্যন্ত পোলিশ করিডর সম্বন্ধে ভার্সাই সন্ধির নির্দেশকেই চরম বলে মেনে নিতে সে রাজি হল না; তবে এই প্রতিশ্রুতি দিল, সে নির্দেশ বদলে নেবার চেষ্টা যা করবার তা সে কেবলমাত্র শান্তিপূর্ণ উপায়েই করবে। প্রত্যেকেই অঙ্গীকার করল, কোনো পক্ষ যদি এই সন্ধির শর্ত ভাঙে, তবে অন্যরা একত্র হয়ে তার সঙ্গে যুদ্ধঘোষণা করবে।
লোকোর্নো সন্ধি ব্রিটিশ কূটনীতির জয়ের নিদর্শন। এই সন্ধির ফলে ব্রিটেনের মর্যাদা বেড়ে গেল—ফ্রান্স আর জর্মনির মধ্যে বিরোধ বাধলে ব্রিটেন তার বিচার করবে, তারই খানিকটা ব্যবস্থা এতে হয়ে গেল। জর্মনিকেও এতে রাশিয়ার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে আনা হল। লোকার্নো সন্ধির সব চেয়ে বড়ো গুরুত্বই বস্তুত ছিল এই: এর ফলে পশ্চিম-ইউরোপের জাতিগুলো একত্র হয়ে একটি সোভিয়েট বিরোধী দলে পরিণত হল। রাশিয়া ভয় পেয়ে গেল; মাসকয়েকের মধ্যেই সেও এর পাল্টা জবাব দিল তুরস্কের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করে। রাশিয়া এবং তুরস্কের মধ্যে এই সন্ধিপত্র স্বাক্ষর করা হল ১৯২৫ সনের ডিসেম্বর মাসে; লীগ্ অব নেশন্স্ মসুলের বিপক্ষে সিদ্ধান্ত প্রকাশ করবার ঠিক দুই দিন পরে। তোমার মনে আছে, লীগের এই সিদ্ধান্তটি করা হয়েছিল তুরস্কের বিরুদ্ধে। ১৯২৬ সনের সেপ্টেম্বর মাসে জর্মনি লীগ্ অব নেশন্সে প্রবেশ করল; খুব একটা প্রচণ্ডরকম কোলাকুলি আর করমর্দনের হিড়িক লেগে গেল, লীগের মধ্যে যাঁরা ছিলেন প্রত্যেকেই খুব মিষ্টিরকম হাসতে লাগলেন আর অন্য সবাইকে প্রচুর পরিমাণ প্রশংসাবাক্য নিয়ে আপ্যায়িত করতে লাগলেন।
এমনি করেই ইউরোপের জাতিদের মধ্যে কিস্তির চাল এবং পাল্টা-কিস্তির চাল চলতে লাগল; অনেক সময় আবার এদের আভ্যন্তরীণ নীতির ধাক্কাও সে চালের উপর এসে পড়তে লাগল। ১৯২০ সনের ডিসেম্বর মাসে ইংলণ্ডে একটা সাধারণ নির্বাচন হল। নির্বাচনে রক্ষণপন্থী দল হেরে গেল। পার্লামেণ্টে যে শ্রমিকদল ছিল তারা সংখ্যাগৌরবে সকলের চেয়ে বড়ো নয়, তবু তারাই মন্ত্রিসভা গঠন করল—শ্রমিকদলের ইতিহাসে সেই প্রথমবার। প্রধানমন্ত্রী হলেন র্যামজে ম্যাকডোনাল্ড। এই মন্ত্রিসভা মাত্র সাড়ে ন’মাস কাল টিঁকে ছিল। কিন্তু সেই স্বল্প কালের মধ্যেই এরা সোভিয়েট রাশিয়ার সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করে ফেলল; দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হল। রক্ষণশীল দল সোভিয়েটদের কোনো রকমে স্বীকার করে নেবারই বিরোধী ছিলেন। এক বছরের মধ্যেই আবার নূতন নির্বাচন এল; সে নির্বাচনে রাশিয়ার কথাটাই প্রধান হয়ে উঠল। তার কারণ এই নির্বাচনের সময় রক্ষণশীল দল একখানা চিঠি প্রকাশ করে বসলেন, সেইটাই হল তাঁদের টেক্কা তুরুপ। এই চিঠিটির নাম জিনোভিয়েবের চিঠি। এতে বিপ্লব ঘটাবার উদ্দেশ্যে গুপ্ত কার্যকলাপ চালাবার জন্য ইংলণ্ডের কমিউনিস্টদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। জিনোভিয়েব ছিলেন সোভিয়েট সরকারের অন্তর্ভুক্ত একজন নেতৃস্থানীয় বলশেভিক। তিনি এই চিঠি লেখার কথা সাফ অস্বীকার করলেন, বললেন এটা নিশ্চয়ই জাল চিঠি। কিন্তু ইংলণ্ডের রক্ষণশীল দল তবুও চিঠিটাকে নিয়ে যথাসম্ভব হৈ চৈ করতে লাগলেন; খানিকটা এর সাহায্যেই তাঁরা নির্বাচনেও জয়লাভ করলেন। এবার রক্ষণশীল দলই মন্ত্রীসভা গঠন করলেন, তার প্রধানমন্ত্রী হলেন স্ট্যানলি বলডুইন। এই সরকারকে বারবার করে বলা হল, ‘জিনোভিয়েবের চিঠিটা’ আসলে সত্য না মিথ্যা সে সম্বন্ধে তদন্ত করা হোক, কিন্তু সরকার সে তদন্ত করতে অস্বীকার করলেন। এর কিছুকাল পরে বার্লিনে কতকগুলো রহস্য ফাঁস হয়ে পড়ল, তার থেকে জানা গেল চিঠিটা সত্যই জাল; এর মূলে ছিল একজন ‘শ্বেত’ রাশিয়ান—মানে দেশ থেকে পলাতক বলশেভিক-বিরোধী রাশিয়ান। তবু ইংলণ্ডে এই চিঠিটা তার কাজ উদ্ধার করেছিল; একটি সরকারকে উচ্ছেদ করে তার জায়গাতে আরেকটি সরকারকে বসিয়ে দিয়েছিল। এমনিতর সব সামান্য বস্তু দিয়েই আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড়ো বড়ো ব্যাপার চালানো হয়।
সেই বছরেরই শেষের দিকে আবার নূতন একটা ব্যাপার ঘটল, তার ফলে ব্রিটিশ সরকার খুব চটে উঠলেন। এবারের ব্যাপারটা ঘটেছিল দূর প্রাচ্য-অঞ্চলে। চীনে হঠাৎ একটা শক্তিশালী মিলিত জাতীয় সরকারের আবির্ভাব হল; ভাব দেখে মনে হল সোভিয়েটদের সঙ্গে সে সরকারের খুবই অন্তরঙ্গতা। অনেক মাস ধরে চীনে ব্রিটিশদের অত্যন্ত বিপদের মধ্যে কাটাতে হল; বহু অপমান লাঞ্ছনা হজম করতে হল, অনেক কাজই করতে হল যা তাদের পছন্দ নয়। তার পর অল্পদিন মাত্র বেঁচে থেকে চীনাদের সে আন্দোলন হঠাৎ ভেঙে ছত্রখান হয়ে গেল। আন্দোলনে প্রগতিপন্থী যাঁরা ছিলেন, সেনাপতিরা তাঁদের নিঃশেষে নিহত এবং বিতাড়িত করলেন; এদের পরিবর্তে সাংহাইতে যে বিদেশী মহাজনরা ছিল নির্ভরস্থল বলে তাদেরই গিয়ে আশ্রয় করলেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতির খেলায় রাশিয়ার এটা হল একটা বিরাট পরাজয়: চীনের এবং অন্যান্য দেশের চোখে তার মানমর্যাদা অনেক কমে গেল। ইংলণ্ডের পক্ষে এটা একটা রণজয় বিশেষ: সোভিয়েটের পরাজয়টাকে সে আরও বেশি প্রত্যক্ষ করে তুলতে চেষ্টা করল, তাই পারলেই তার আরও বেশি সুবিধা হয়ে যায়। সোভিয়েট বিরোধীদের দলটাকে সে আবার গড়ে তুলল, চারদিক থেকে এরা রাশিয়াকে ঘিরে ফেলবারও চেষ্টা করল।
১৯২৭ সনের মাঝামাঝি সময়ে পৃথিবীর বহু স্থানে সোভিয়েটের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হল। ১৯২৭ সনের এপ্রিল মাসে, একই দিনে পিকিঙ-এর সোভিয়েট দূতাবাসে এবং সাংহাইয়ের সোভিয়েট কন্সালের দপ্তরে খানাতল্লাস করা হল। এই দুটি স্থানে পৃথক দুটি চীনা সরকার প্রতিষ্ঠিত ছিল, কিন্তু এই ব্যাপারে এরা একত্র হয়েই কাজে নামল। দূতাবাস খানাতল্লাস করা বা বিদেশী দূতকে অপমান করা একটা অত্যন্ত অস্বাভাবিক ব্যাপার; এর ফলে প্রায় সর্বত্রই যুদ্ধ বেধে যায়। রাশিয়ার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এই কাজ আসলে চীনা সরকারের নয়, ইংলণ্ড এবং অন্যান্য সোভিয়েটবিরোধীরাই তাদের তাড়া দিয়ে এটা করাচ্ছে— রাশিয়াকে যুদ্ধে নামতে বাধ্য করাই তাদের মতলব। কিন্তু সে মতলব ব্যর্থ হল, রাশিয়া যুদ্ধ করল না। এর একমাস পরে, ১৯২৭ সনের মে মাসে, রাশিয়ার বাণিজ্য-দপ্তরগুলির উপরে অদ্ভুতরকম খানাতল্লাস চালানো হল, এবার হল লণ্ডনে। এর নাম ‘আর্কসের’ খানাতল্লাসী, কারণ ইংলণ্ডে রাশিয়ার যে সরকারি বাণিজ্য-প্রতিষ্ঠান ছিল তার নাম ছিল আর্কস। এই খানাতল্লাসের ফলে সঙ্গে সঙ্গেই রাশিয়া এবং ইংলণ্ডের মধ্যে যত কূটনীতি এবং বাণিজ্য-সংক্রান্ত সম্পর্ক ছিল সমস্ত ছিন্ন হয়ে গেল। এর পরের মাসেই অর্থাৎ জুন মাসে, পোল্যাণ্ডে অবস্থিত সোভিয়েট মন্ত্রীকে ওয়ারস’তে খুন করা হল। (এর চার বছর আগে রোমে অবস্থিত সোভিয়েট মন্ত্রীকে লুজোঁ শহরে হত্যা করা হয়েছিল)। পরপর অত্যন্ত দ্রুতবেগে এই সব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে দেখে রাশিয়ার লোকরা ভয়ে বিহ্বল হয়ে পড়ল, তাদের দৃঢ় বিশ্বাস হল এবার সাম্রাজ্যবাদী জাতিরা সকলে একত্র হয়েই রাশিয়াকে আক্রমণ করবে। রাশিয়াতে প্রবল একটা আতঙ্ক দেখা দিল। পশ্চিম ইউরোপের বহু দেশেই শ্রমিকরা শোভাযাত্রা ইত্যাদি করে রাশিয়ার পক্ষে এবং যে যুদ্ধটা আসন্ন বলে মনে হচ্ছিল তার বিপক্ষে মতপ্রকাশ করল। কিন্তু আতঙ্ক ক্রমে কেটে গেল, যুদ্ধ হল না।
ঠিক সেই বছর, সেই ১৯২৭ সনেই রাশিয়াতে খুব ধূমধাম করে রুশ-বিপ্লবের দশম বার্ষিক স্মৃতি উৎসবের অনুষ্ঠান করা হল। ইংলণ্ড এবং ফ্রান্স তখন রাশিয়ার উপর অত্যন্ত চটা। কিন্তু প্রাচ্য জগতের দেশগুলির সঙ্গে সোভিয়েট রাশিয়ার কতখানি বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল তার চমৎকার প্রমাণ পাওয়া গেল; পারশ্য, তুরস্ক, আফগানিস্তান এবং মঙ্গোলিয়া থেকে সরকারিভাবে প্রতিনিধিদল এসে রাশিয়ার উৎসবে যোগ দিলেন।
ইউরোপে এবং অন্যত্র যখন এই সব আতঙ্ক আর যুদ্ধের আয়োজন চলেছে, ঠিক তখনই আবার নিরস্ত্রীকরণ নিয়েও প্রচুর জল্পনাকল্পনা চলছিল। লীগ অব নেশন্সের অনুষ্ঠান-পত্রে বলা হয়েছিল “লীগের সভ্যরা স্বীকার করেন, শান্তি রক্ষার জন্য প্রত্যেক জাতির অস্ত্রসজ্জা কমিয়ে জাতির নিরাপত্তা রক্ষার জন্য যেটুকু একান্ত অপরিহার্য তাহার অনতিরিক্ত বলিয়া পরিমিত করা প্রয়োজন, এবং সকলের মিলিত চেষ্টার দ্বারা সকলের আতর্জাতিক কর্তব্য পালনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।” এই সাধু নীতিটি ব্যাক্ত করার বেশি আর কিছুই লীগ তখন করল না; কিন্তু এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কর্তব্য বিধানের জন্য তার কাউন্সিলকে নির্দেশ দিল। জর্মন এবং অন্যান্য বিজিত দেশদের অবশ্য সন্ধিপত্রের দ্বারাই অস্ত্রত্যাগ করানো হয়েছিল। বিজয়ী দেশরাও আশ্বাস দিয়েছিলেন তাঁরাও অস্ত্রত্যাগ করবেন; কিন্তু সে নিয়ে কন্ফারেন্সের পর কন্ফারেন্সই শুধু চলতে লাগল, হাতে কলমে কাজ কিছুই হল না। আশ্চর্য হবার কিছুই এতে নেই, কারণ প্রত্যেক দেশই চাইছিল নিরস্ত্রীকরণের ব্যাপারটা এমনভাবে সম্পন্ন হোক যেন অন্যদের তুলনায় তার নিজের শক্তি কিছু বেশি থেকে যায়, অন্যরা স্বভাবতই তাতে রাজি নয়। ফরাসিরা তো আগাগোড়াই তাদের সেই এক গোঁ ধরে রইল—আগে নিরাপত্তার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ হোক, তার পর অস্ত্রত্যাগের কথা ভাবা যাবে।
বড়ো বড়ো দেশদের মধ্যে আমেরিকা বা সোভিয়েট ইউনিয়ন লীগের সভ্য ছিল না। বস্তুত সোভিয়েটের দৃষ্টিতে লীগ ছিল তার একটা প্রতিদ্বন্দ্বী এবং বিরোধী পক্ষ; একদল ধনিকতন্ত্রী দেশ নিয়ে সেখানে একজোট হয়েছে, সোভিয়েটের বিরুদ্ধে লড়াই তাদের ব্রত। আবার সোভিয়েট ইউনিয়নকেও (ঠিক যেমন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে অনেকে বলে) একটা লীগ অব নেশন্স্ গোছের ব্যাপার বলেই মনে করা হত, কারণ সে ইউনিয়নের মধ্যে অনেকগুলো প্রজাতন্ত্রী অঞ্চল এসে একত্র সংঘবদ্ধ হয়েছে। প্রাচ্য অঞ্চলের দেশরাও লীগ অব নেশন্স্কে সন্দেহের চোখে দেখত, মনে করত সেটা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের কার্য উদ্ধারের একটা যন্ত্র মাত্র। কিন্তু তা সত্ত্বেও নিরস্ত্রীকরণের কথা আলোচনা করবার জন্য আমেরিকা, রাশিয়া এবং অন্য দেশদেরও প্রায় সকলেই লীগ অব নেশন্সের কনফারেন্সগুলোতে গিয়ে যোগ দিলেন। ১৯২৫ সনে লীগ একটি উদ্যোগকারী কমিশন নিয়োগ করলেন; এঁরা প্রকাণ্ড একটি নিখিল-বিশ্ব-নিরস্ত্রীকরণ-সম্মেলনের পথ পরিষ্কার করবেন। এই কমিশন ক্রমাগত সাত বৎসর ধরে কাজ করে চললেন, একটার পর একটা করে অসংখ্য পরিকল্পনা পরীক্ষা করে দেখলেন, কিন্তু ফল কিছুই হল না। ১৯৩২ সনে খোদ্ বিশ্বসম্মেলনের সভা বসলো এবং বহু মাসব্যাপী বৃথা আলোচনার পরে তার অন্তর্ধান হল।
আমেরিকা শুধু-যে এই নিরস্ত্রীকরণের আলোচনাতে যোগ দিল তাই নয়; পৃথিবীর অর্থনীতির বাজারে তার যে নুতন প্রতিপত্তি গড়ে উঠেছে তার খাতিরে ইউরোপ এবং ইউরোপের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার সম্বন্ধেও তার উৎসাহ বেড়ে গেল। সমস্ত ইউরোপই তখন তার খাতক; অতএব তার তখন লক্ষ্য হল, ইউরোপের দেশরা যাতে আবার পরস্পরের গলা কাটতে লেগে না যায় তারই সম্ভাবনাকে ঠেকিয়ে রাখা। শুধু উচ্চতর নীতিবোধের কথা বলে নয়, এরা যদি সত্যই মারামারি করে মরে তবে আমেরিকার পাওনা টাকা আর ব্যবসায়ের কী গতি হবে? নিরস্ত্রীকরণের আলোচনাতে কোনো দ্রুত ফলের সম্ভাবনা নেই দেখে, ১৯২৮ সনে শান্তিরক্ষার ব্যবস্থার একটি নূতন প্রস্তাব উপস্থিত করা হল। এই প্রস্তাবটির সৃষ্টি হয়েছিল ফরাসি আর আমেরিকান সরকারের মধ্যে আলোচনার ফলে। এতে একটা খুব বড়ো কথা বলা হল ব্যাপারটাকেই বে-আইনি বলে ঘোষণা করা হোক'। কথাটা প্রথমে উঠেছিল শত্রু, ফ্রান্স আর আমেরিকার মধ্যে এইরকম একটা চুক্তি-স্থাপনের সংকল্প নিয়ে; কিন্তু ক্রমে কথাটা বড়ো হয়ে উঠল এবং শেষপর্যন্ত পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশকেই এর অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হল। ১৯২৮ সনের আগস্ট মাসে প্যারিস শহরে এই চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করা হল; তাই এর নাম হল ১৯২৮ সনের প্যারিস চুক্তি; বা কেলগ-ব্রীয়াঁ চুক্তি, বা সংক্ষেপে কেলগ-চুক্তি। কেলগ ছিলেন আমেরিকার সেক্রিটারি অব স্টেট্; এই ব্যাপারে তিনিই প্রথম অগ্রণী হন; আর আরিস্তিদে ব্রীয়াঁ ছিলেন ফ্রান্সের বৈদেশিক-মন্ত্রী। এই চুক্তিপত্রটি বেশ ছোটোখাটো একটি রচিত দলিল বিশেষ। এতে বলা হল, দেশে দেশে মতান্তর হলে তার সমাধানের জন্য যুদ্ধ শুরু করা অতি গর্হিত ব্যাপার; এই প্যাক্টে যাঁরা সই করলেন— তাদের মধ্যে পরস্পর সম্পর্ক নির্ধারণের জন্য যদি কেউ জাতীয় নীতি হিসাবে যুদ্ধের আশ্রয় নিতে চান, সেটা একেবারেই চলবে না। এই কথাগুলো প্রায় চুক্তিপত্রের নিজেরই ভাষায় আমি বললাম। কথাগুলো শুনতে ভারি চমৎকার; সত্যই খোলা মনে যদি একথা বলা হত তবে যুদ্ধের সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যেত। কিন্তু দু দিন না যেতেই দেখা গেল, স্বাক্ষরকারীরা মোটেই খোলামনে এতে সই করেন নি, স্রেফ ধাপ্পাবাজি করেছেন। সই করবার আগে ফ্রান্স এবং ব্রিটেন দুই পক্ষই, বিশেষ করে ব্রিটিশ নিজেদের তরফ থেকে নানা রকমের রেহাই এবং অব্যাহতির ব্যবস্থা রেখে দিলেন; তার ফলে এঁদের পক্ষে চুক্তির শর্তগুলো প্রায় অর্থহীন হয়ে দাঁড়াল। ব্রিটিশ সরকার বললেন, তাঁদের সাম্রাজ্যের জন্য যদি কোনো যুদ্ধবিগ্রহ তাঁদের করতে হয়, সে যুদ্ধ এই চুক্তিপত্রের দ্বারা নিষিদ্ধ হবে না। তার মানেই হচ্ছে, ব্রিটেন যখন চাইবে বস্তুত তখনই অবাধে যুদ্ধ শুরু করতে পারবে। তার নিজের শাসন এবং কর্তৃত্ব পৃথিবীর যত জায়গাতে চালু আছে, সেই সব অঞ্চল সম্বন্ধে ব্রিটেন এর দ্বারা একটা নিজস্ব ‘মন্রো নীতি’র ব্যবস্থা করে নিল।
প্রকাশ্য দরবারে যখন এইভাবে যুদ্ধকে ‘বেআইনি’ বলে ঘোষণা করা হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই—১৯২৮ সনে ইংলণ্ড এবং ফ্রান্সের মধ্যে একটি নৌবাহিনী সংক্রান্ত গোপন চুক্তি হল। এই চুক্তির খবর কী রকম করে প্রকাশ পেয়ে গেল; শুনে ইউরোপ আর আমেরিকা বিস্ময়ে স্তদ্ধ হয়ে গেল। প্রকাশ্য রঙ্গমঞ্চের বাইরে, পর্দার নেপথ্যে আসলে কীসব ব্যাপার ঘটে, এইটাই হল তার যথেষ্ট প্রমাণ।
সোভিয়েট ইউনিয়ন কেলগ চুক্তি মেনে নিল, তাতে সই করল। এরূপ করবার মূলে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল; এই চুক্তির আবরণ নিয়ে সোভিয়েটকে আক্রমণ করে বসবে এমন কোনো সোভিয়েটবিরোধী দল যদি কেউ গড়ে তুলতে চায়, তার সে চেষ্টাকে এইভাবে ব্যর্থ করা, অন্তত খানিক পরিমাণে বাধা দেওয়া। চুক্তির শর্ত থেকে অব্যাহতির যে ব্যবস্থাগুলি ব্রিটেন করে নিয়েছে, অনেকের ধারণা হয়েছিল তার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সোভিয়েট। চুক্তিপত্রে সই করবার সময় রাশিয়া ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের এই সব অব্যাহতির ব্যবস্থা সম্বন্ধে অত্যন্ত তীব্র আপত্তি প্রকাশ করল।
যুদ্ধের সম্ভাবনাকে এড়িয়ে চলতে রাশিয়ার খুব বেশি আগ্রহ ছিল। শুধু এই চুক্তি নিয়েই সে সুস্থ হল না; সাবধানতার বাড়তি ব্যবস্থা হিসাবে তার প্রতিবেশী দেশ পোলাও, রুমানিয়া, এস্তোনিয়া, ল্যাট্ভিয়া, তুরস্ক এবং পারশ্যের সঙ্গেও একটা বিশেষ রকমের শান্তিমূলক চুক্তি নিষ্পন্ন করল। এই চুক্তির নাম লিট্ভিনফ্ চুক্তি। এই চুক্তি স্বাক্ষর করা হয় ১৯২৯ সনের ফেব্রুয়ারি মাসে; কেলগ-চুক্তি যখন আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত হল, তার ছ’মাস আগে।
পৃথিবীর সর্বত্র কলহ বিবাদ এবং ভাঙন শুরু হয়ে গেছে; তাকে স্থির করে টিঁকিয়ে রাখবার প্রবল আগ্রহ নিয়ে এই-সব চুক্তি-মৈত্রী সন্ধি তৈরি করা হতে লাগল; যেন বাইরে থেকে এই-সব চুক্তি বা তালি-তাপ্পি সেঁটেই এতবড়ো একটা গভীর ব্যাধিকে সারিয়ে তোলা সম্ভব। এটা ১৯২০ সনের পরবর্তী কালের কথা; এই সময়ে ইউরোপের বহু দেশেই শাসন-কর্তৃত্ব ছিল সমাজতন্ত্রী বা সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দলের হাতে। কিন্তু সরকারি পদমর্যাদা আর শক্তির স্বাদ এঁরা যত বেশি পেতে লাগলেন, ততই বেশি করে এঁরা ধনিকতন্ত্রী রীতির মধ্যে নিজের সত্তা হারিয়ে মিলিয়ে যেতে লাগলেন। বস্তুত এঁরাই ক্রমে হয়ে উঠলেন ধনিকতন্ত্রকে টিঁকিয়ে রাখবার সবচেয়ে বড়ো পাণ্ডা; অনেক সময়ে এঁরা এতখানি সাম্রাজ্যবাদী হয়ে উঠলেন যে কোনো রক্ষণপন্থী বা অন্য কোনো প্রগতিবিরোধী ব্যক্তিও সে বিদ্যায় এঁদের ছাড়িয়ে যেতে পারেন না। যুদ্ধের পর প্রথম কটা বছর ইউরোপে বিপ্লবের ঢেউ লেগেছিল, সে ঢেউয়ের উচ্ছ্বাস তখন অনেকটা থেমেছে, ইউরোপের জীবনযাত্রা খানিকটা শান্ত নিস্তরঙ্গ হয় এসেছে। অবস্থা দেখে তখন মনে হচ্ছিল, ধনিকতন্ত্র আবার কিছুকালের মতো সেই নূতনতর অবস্থার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে; ইউরোপের কোথাও হঠাৎ তখনই আবার বিপ্লব শুরু হবে, এমন সম্ভাবনা কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
১৯২৯ সনে এই ছিল ইউরোপের অবস্থা।