বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/চীনদেশে শান্তি ও সমৃদ্ধির যুগ

উইকিসংকলন থেকে

৮০

চীনদেশে শান্তি ও সমৃদ্ধির যুগ

২২শে জুলাই, ১৯৩২
মানিক আমার, জানলাম তোমার অসুখ করেছিল, এবং হয়তো এখনও শয্যাশায়ী আছ। জেলের মধ্যে খবর এসে পৌঁছতে সময় লাগে। তোমার কোনো উপকার করার উপায় আমার নেই, নিজের খবরদারি তোমার নিজেরই করতে হবে। কিন্তু তোমার কথা খুবই চিন্তা করব। কী অদ্ভুত ভাবে সবাই ছড়িয়ে আছি—তুমি সুদূর পুনায়; মা এলাহাবাদে রোগশয্যায়; বাকি সবাই বিভিন্ন কারাগারে!

 কিছুদিন যাবৎ তোমার কাছে চিঠি লিখতে অসুবিধে বোধ করছি। তোমার সঙ্গে কথা বলছি, এমনি একটা কল্পনা চালিয়ে যাওয়া শক্ত। খালি মনে পড়ছে, পুনায় তুমি রোগশয্যায় পড়ে আছ, ভাবছি কবে আবার তোমাকে দেখব, আমাদের দেখা হওয়ার আগে কত মাস, কত বৎসর কাটবে; আর সেই সময়টাতে তুমি কত বড়ো হয়ে যাবে।

 কিন্তু অতিরিক্ত চিন্তা কোনো কাজের কথা নয়, বিশেষ করে জেলখানায়, অতএব কিছুক্ষণের জন্যে বর্তমানকে ভুলে অতীতকে স্মরণ করা যাক।

 মালয়েশিয়ার কথা হচ্ছিল, না? একটা অদৃষ্টপূর্ব ঘটনা দেখলাম আমরা। এশিয়াতে ইউরোপ ক্রমে মারমূর্তি ধরছিল; পর্তুগীজরা এল, তার পরে স্পেনীয়রা; তারও পরে এল ইংরেজ এবং ওলন্দাজরা। কিন্তু এইসব ইউরোপীয় জাতির কর্মতৎপরতা মালয়েশিয়া ও দ্বীপপুঞ্জে সীমাবদ্ধ ছিল। পশ্চিমে মোগলদের অধীনে ছিল প্রবল প্রতাপান্বিত ভারত। উত্তরে চীনদেশ আত্মরক্ষায় সম্পূর্ণ সমর্থ। কাজেই ভারত এবং চীনে ইউরোপীয়েরা বেশি গোলমাল করে নি।

 মালয়েশিয়া থেকে চীন এক-পা রাস্তা। সেখানেই যাওয়া যাক। মঙ্গোল সম্রাট কুব্‌লাই খাঁ প্রতিষ্ঠিত ইউয়ান-বংশ লোপ পেয়েছে। জনবিদ্রোহের ফলে শেষ মঙ্গোল বাহিনী ১৩৬৮ সালে চীনের বিরাট প্রাচীরের বাইরে বিতাড়িত হয়েছে। বিদ্রোহীদের নেতা ছিলেন হুঙ উ, এঁর জীবনের আরম্ভ হয়েছিল দরিদ্র শ্রমজীবীর পুত্ররূপে, এবং লেখাপড়া শেখার সুযোগ এঁর হয় নি। কিন্তু জীবনের বৃহত্তর শিক্ষালয়ে তিনি ছিলেন কৃতী ছাত্র, ফলে তিনি সার্থক নেতা, এবং পরবর্তীকালে বিজ্ঞ শাসক হতে পেরেছিলেন। সম্রাট হয়েছেন বলে অহঙ্কারে, গৌরবে তিনি স্ফীত হয়ে ওঠেন নি; সারা জীবন ধরে তিনি মনে রেখেছিলেন যে তিনি সাধারণ বংশজাত। তিনি রাজত্ব করেছিলেন বিশ বৎসর ধরে, এবং যে জনসাধারণের মধ্য থেকে তাঁর উদ্ভব তাদের কল্যাণের জন্যে তাঁর অবিরত চেষ্টার জন্যে তাঁর রাজত্বকালের কথা লোকে এখনও মনে রেখেছে। জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর প্রথম জীবনের রুচির সাদাসিধে ভাব বজায় রেখেছিলেন।

 হুঙ উ ছিলেন নবগঠিত মিঙ-রাজবংশের প্রথম সম্রাট। তাঁর ছেলে ইউঙ লো’ও সুযোগ্য শাসক ছিলেন। তিনি রাজত্ব করেছিলেন ১৪০২ থেকে ১৪২৪ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত। কিন্তু আর তোমার উপর এই চীনে নামের বহর চাপাব না। পর পর অনেক সুশাসকের পরে সাধারণত যা হয়ে থাকে তাই হল, অর্থাৎ ভাঙন ধরল। কিন্তু সম্রাটদের কথা কিছুক্ষণের জন্যে ভুলে গিয়ে চীনের সমসাময়িক ইতিহাসের কথা নিয়ে আলোচনা করা যাক। ‘মিঙ’ শব্দটির অর্থ উজ্জল। মিঙ-রাজবংশ ২৭৬ বৎসর বর্তমান ছিল, ১৩৬৮ থেকে ১৬৪৪ সাল পর্যন্ত। সমস্ত রাজবংশের মধ্যে এইটিই ছিল খাঁটি চীনা-লক্ষণ-সম্পন্ন, এবং এঁদের রাজত্বকালে চীনের জনসাধারণের প্রতিভা বিকশিত হওয়ার পূর্ণ সুযোগ পায়। আভ্যন্তরিক এবং বৈদেশিক, দুই দিক দিয়েই এটা ছিল শান্তির কাল। রাজ্যজয়ের স্পৃহার কোনো লক্ষণ দেখা যায় নি, সাম্রাজ্যবাদিতার ভাগ্যান্বেষণও ছিল না। প্রতিবেশী দেশসমূহের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় ছিল। শুধু উত্তরে তাতার নামক উপজাতির কাছ থেকে বিপদাশঙ্কা ছিল। প্রাচ্য জগতের আর সকলের কাছে চীন ছিল বড়ো ভাইয়ের মতো, ধীসম্পন্ন এবং সংস্কৃতিপূর্ণ; নিজের শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে পূর্ণরূপে সজাগ, কিন্তু ছোটো ভাইদের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী, এবং নিজের সংস্কৃতি ও সভ্যতা তাদের শেখাতে এবং ভাগ দিতে সর্বদা প্রস্তুত। এবং তারাও চীনকে যথাযোগ্য শ্রদ্ধা করত। কিছু কালের জন্যে জাপান পর্যন্ত চীনের বশ্যতা স্বীকার করেছে এবং জাপানের শাসক শোগান নিজেকে মিঙ-সম্রাটের সামন্ত বলে পরিচয় দিতেন। কোরিয়া এবং যবদ্বীপ, সুমাত্রা প্রভৃতি ইন্দোনেশীয় দ্বীপপুঞ্জে এবং ইন্দোচীন থেকে কর আসত।

 এই ইউঙ লো’র রাজত্বকালেই নৌসেনাপতি চেঙ হো’র অধীনে মালয়েশিয়ায় বিরাট সমুদ্রাভিযান হয়েছিল। প্রায় বিশ বছর ধরে চেঙ হো পূর্ব সমুদ্রগুলির সর্বত্র পারশ্য-উপসাগর পর্যন্ত ভ্রমণ করেছিলেন। মনে হতে পারে, ছোটো দ্বীপরাষ্ট্রগুলিকে ভীত রাখার সাম্রাজ্যবাদী প্রচেষ্টা। কিন্তু রাজ্যজয় অথবা আর্থিক লাভের কোনো চেষ্টাই নাকি ছিল না। শ্যাম এবং মাজপাহিতের ক্রমবর্ধিষ্ণু সামরিক শক্তি দেখে সম্ভবত ইউঙ লো এই অভিযান পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু কারণ যাই হোক-না কেন, এই অভিযানের ফল হয়েছিল বহুতর। এর ফলে মাজপাহিত ও শ্যাম অবদমিত হল, মালাক্কার নবপ্রতিষ্ঠিত মুসলিম-রাষ্ট্র বৃদ্ধির উদ্বোধন পেল, এবং চীনা সংস্কৃতি সারা ইন্দোনেশিয়া ও প্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ল।

 চীন ও তার প্রতিবেশীদের মধ্যে শান্তি বিদ্যমান থাকায় ঘরোয়া ব্যাপারে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ ছিল। শাসন ছিল, এবং করভার লঘু থাকায় কৃষকের উপর থেকে বোঝা কমেছিল। রাস্তা, জলপথ, খাল প্রভৃতি উন্নত করা হয়েছিল। দুঃসময়ে খাদ্যশস্যের অভাবের প্রতিকার করার উদ্দেশ্যে সাধারণ শস্যাগার নির্মিত হয়েছিল। সরকার থেকে কাগজের মুদ্রা প্রচলিত করে ক্রয়শক্তি বৃদ্ধি করা হয়েছিল, এবং বাণিজ্য ও বিনিময়ের সহায়তা করা হয়েছিল। কাগজের মুদ্রার বহুল প্রচার ছিল। রাজকরের শতকরা ৭০ অংশ এই মুদ্রায় দেওয়া চলত।

 এর চেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য এই যুগের সাংস্কৃতিক ইতিহাস। বহুযুগ ধরে চীনারা সংস্কৃত কলারসিক বলে খ্যাত। মিঙ-যুগের সুশাসন এবং মিঙদের শিল্পকলায় উৎসাহ-অনুরাগের ফলে লোকের প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেল। সুরম্য অট্টালিকাসমূহ জেগে উঠল, আর তৈরি হল অপরূপ চিত্রপট; মিঙ চীনামাটির বাসন তাদের গঠনসৌকর্যের জন্যে খ্যাত। ইতালিতে সেই রেনেসাঁসের যুগে অঙ্কিত চিত্রাবলীর সঙ্গে মিঙ-যুগের চিত্র তুলনীয়।

 পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে চীনদেশ ঐশ্বর্যে, ব্যবহারিক শিল্পে এবং সংস্কৃতিতে সে যুগের ইউরোপের চেয়ে ঢের বেশি অগ্রসর ছিল। সমগ্র মিঙ-যুগে ইউরোপের কোনো দেশই জনসাধারণের সুখ এবং শিল্পোৎসাহের দিক দিয়ে চীনের সঙ্গে তুলনীয় নয়। এবং মনে রেখো, ইউরোপের বিপুল নবজাগরণের যুগ (রেনেসাঁস) এই যুগেরই এক অংশ।

 শিল্পকলার বিষয়ে মিঙ-যুগের খ্যাতির একটা কারণ হচ্ছে, তখনকার শিল্পের নিদর্শন এখনও বহু আছে। বিশাল স্মৃতিমন্দির, সুন্দর কাঠখোদাই, এবং গজদন্ত ও জেডের খোদাই কাজ, ব্রোঞ্জের পুষ্পাধার এবং চীনামাটির বাসন অনেক আছে। মিঙ-যুগের শেষ ভাগে কারুকার্য একটু অতিরিক্ত হয়ে পড়ায় খোদাই এবং চিত্রগুলি তাদের সৌন্দর্য খানিকটা হারিয়ে ফেলে।

 এই যুগেই চীনে প্রথম পর্তুগীজ জাহাজের আগমন হয়। তারা ক্যাণ্টনে পৌঁছয় ১৫১৫ খৃষ্টাব্দে। আলবুকার্ক যত চীনার সংস্পর্শে এসেছিলেন, তাদের প্রত্যেকেরই সঙ্গে সদ্ব্যবহার করেছিলেন, ফলে পর্তুগীজদের সম্বন্ধে চীনে অনুকূল সংবাদ গিয়েছিল। ফলে তারা সাগরে অভ্যর্থিত হল। কিন্তু অল্প কিছুদিন পরেই পর্তুগীজরা অন্যায় আচরণ আরম্ভ করল, এবং বহু স্থানে দুর্গ নির্মাণ করল। এই অভদ্রতায় প্রথমে চীন সরকার বিস্মিত হল। হঠাৎ কোনো ব্যবস্থা অবলম্বন করল না, কিন্তু শেষটায় সবসুদ্ধ পর্তুগীজদের দেশ থেকে বিতাড়িত করল। তখন পর্তুগীজরা বুঝল যে, তাদের চিরাচরিত প্রথা চীনে চালিয়ে লাভ নেই। তারা একটু শান্ত ও বিনীত ভাব অবলম্বন করল, এবং ১৫৫৭ সালে ক্যাণ্টনের কাছে বসতি করার অনুমতি পেল। তার পরে তারা মাকাও-নগর স্থাপন করে।

 পর্তুগীজদের সঙ্গে এল খৃষ্টান মিশনারিরা। এদের মধ্যে অন্যতম খ্যাতনামা পাদ্রী ছিলেন সেণ্ট্ ফ্রান্সিস্ জেভিয়ার। তিনি বহুকাল ভারতে কাটিয়েছিলেন এবং তাঁর নামে বহু মিশনারি কলেজ আছে। তিনি জাপানেও গিয়েছিলেন। চীনে অবতরণের অনুমতির প্রতীক্ষা করতে করতে তিনি চীনের এক বন্দরেই মারা যান। চীনারা খৃষ্টান মিশনারিদের উৎসাহ দেয় নি। দু জন জেসুইট পাদ্রী কিন্তু বৌদ্ধ ছাত্রের ছদ্মবেশে বহু বৎসর ধরে চীনাভাষা অধ্যয়ন করেছিলেন। তাঁরা বিখ্যাত কন্‌ফুসীয় শাস্ত্রের অধিকারী বলে এবং বৈজ্ঞানিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এঁদের একজনের নাম ছিল মাতেও রিচি। তিনি অত্যন্ত বিদ্বান ছিলেন এবং স্বভাবগুণে সম্রাটের অনুগ্রহ লাভ করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ছদ্মবেশ ত্যাগ করে স্বরূপ প্রকাশিত করেন, এবং তাঁর প্রভাবে চীনে খৃষ্টধর্মের অবস্থার অনেক উন্নতি হয়।

 ওলন্দাজরা মাকাওতে এসেছিল সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে। তারা বাণিজ্য করার অনুমতি চাইল, কিন্তু তাদের সঙ্গে পর্তুগীজদের সম্ভাব ছিল না, এবং ফলে পর্তুগীজরা চীনাদের মনে ওলন্দাজদের সম্বন্ধে বিরুদ্ধভাব সৃষ্টি করার যথেষ্ট চেষ্টা করল। তারা চীনাদের বুঝিয়ে দিল যে, ওলন্দাজরা হিংস্র জলদস্যুর জাত। ফলে চীনারা ওলন্দাজদের প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করল। কয়েক বছর পরে ওলন্দাজরা তাদের বাটাভিয়া নগর থেকে মাকাওতে প্রকাণ্ড এক নৌবহর পাঠাল। নির্বোধের মতো তারা বলপ্রয়োগে মাকাও অধিকার করার চেষ্টায় ছিল, কিন্তু চীনা ও পর্তুগীজদের বিরুদ্ধে কিছু করে উঠতে পারল না।

 ওলন্দাজদের পরে এল ইংরেজরা। তাদেরও বিশেষ সুবিধে হল না। তবে মিঙ-যুগ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে তারা চৈনিক বাণিজ্যে কিছু অংশ পেল।

 ভালো মন্দ সব জিনিষেরই একদিন সমাপ্তি হয়, মিঙ-যুগও তেমনি শেষ হল সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে। উত্তরে যে তাতারাতঙ্ক মেঘের মতো ক্ষীণভাবে দেখা দিয়েছিল, তা বড়ো হতে হতে ক্রমে চীনের উপরে ছায়াপাত করল। ‘কিন’ অথবা ‘স্বর্ণ-তাতার’দের কথা তোমার হয়তো মনে আছে। তারা সুঙদের চীনের দক্ষিণে তাড়িয়ে দিয়েছিল এবং পরে নিজেরাও মঙ্গোলদের হাতে বিতাড়িত হয়েছিল। কিন্‌দের স্বজাতীয় এক নূতন উপজাতি চীনের উত্তরে প্রবল হয়ে উঠল, যেখানে এখন মাঞ্চুরিয়া সেইখানে। তারা মাঞ্চু বলে পরিচিত ছিল। এই মাঞ্চুরাই পরে মিঙদের স্থান গ্রহণ করল।

 কিন্তু চীন যদি পরস্পরবিরোধী দলে বহুবিভক্ত না হত, মাঞ্চুদের পক্ষে চীন অধিকার কঠিন হত। প্রায় সব দেশেই যখন বৈদেশিক আক্রমণ সফল হয়েছে, যেমন চীনে অথবা ভারতে, বুঝতে হবে তার কারণ হচ্ছে দেশের আভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং গৃহবিবাদ। সেইরকম চীনের সর্বত্র গৃহকলহে ছেয়ে গিয়েছিল। সম্ভবত শেষের দিকের মিঙ-সম্রাটরা ছিলেন দুর্নীতিপরায়ণ ও অকর্মণ্য, অথবা দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনে সামাজিক বিপ্লব ঘটেছিল। মাঞ্চুদের প্রতিরোধের ব্যয়ও কম হল না, এবং বিশেষ কঠিন হয়ে পড়ল। সর্বত্র দস্যুনেতার উদ্ভব হল, আর এদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো যে সে অল্প কিছুদিনের জন্যে সম্রাট পর্যন্ত হয়েছিল। মাঞ্চুদের বিরুদ্ধে অভিযানে মিঙদের সৈন্যদলের যিনি সর্বাধিনায়ক ছিলেন তাঁর নাম ছিল উ সান-কুই। দস্যুসম্রাট ও মাঞ্চুদল, এদের মধ্যে কর্তব্য নির্ধারণ করতে তাঁর রীতিমতো মুশকিল হয়েছিল। অত্যন্ত নির্বুদ্ধিতা করে, অথবা হয়তো ইচ্ছে করে বিশ্বাসঘাতকতা করে তিনি দস্যুদের বিরুদ্ধে মাঞ্চুদের সাহায্য প্রার্থনা করলেন। মাঞ্চুরা খুশি হয়েই সাহায্য করল এবং পিকিঙেই রয়ে গেল। তার পরে উ সান-কুই বুঝলেন যে, মিঙদের অবস্থা শোচনীয়, ফলে তাদের পরিত্যাগ করে বিদেশী শত্রু মাঞ্চুদের সঙ্গে যোগ দিলেন।

 এই উ সান-কুই আজও পর্যন্ত দেশের একজন বড়ো বিশ্বাসঘাতক শত্রু বলে ঘৃর্ণিত হয়ে থাকেন, এবং তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তাঁর উপরে দেশের রক্ষণভার থাকা সত্ত্বেও তিনি শত্রু পক্ষে যোগ দিয়ে দক্ষিণ-প্রদেশগুলো দমনে বস্তুত তাদের সাহায্য করেছিলেন এবং পুরস্কারস্বরূপ মাঞ্চুরা তাঁকে উক্ত প্রদেশগুলোর রাজপ্রতিনিধি নিযুক্ত করেছিল।

 ১৬৫০ অব্দে ক্যাণ্টন নগর মাঞ্চুদের অধিকারে এল, এবং তাদের চীন বিজয় সম্পূর্ণ হল। তাদের সাফল্যের কারণ সম্ভবত এই যে, তারা যোদ্ধা হিসেবে চীনাদের চেয়ে ভালো ছিল। হতে পারে দীর্ঘকাল স্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধির মধ্যে বাস করে যোদ্ধারূপে চীনাদের দৌর্বল্য এসেছিল; কিন্তু মাঞ্চুদের জয়লাভের দ্রুততার অন্য কারণও ছিল, বিশেষ করে তারা চীনাদের খুশি রাখবার যে চেষ্টা করেছিল সেই চেষ্টাই হয়তো অন্যতম কারণ। পূর্বযুগে তাতার-আক্রমণের পর প্রায়ই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড চলত। এবার কিন্তু চীনা রাজপুরুষদের সন্তুষ্ট রাখার জন্যে বিশেষ চেষ্টা হল, এবং তাঁরাই আবার নূতন করে পূর্বপদে নিযুক্ত হলেন। চীনা রাজপুরুষেরা উচ্চতম পদে প্রতিষ্ঠিত থাকলেন। মিঙ-শাসনবিধিরও কোনো পরিবর্তন হল না। বাইরের থেকে শাসনপ্রথা একই রইল, কিন্তু অন্তরালে যে হাত তার নিয়ন্ত্রণ করছিল তা ভিন্ন হাত।

 কিন্তু দুটো লক্ষ্যণীয় ব্যাপার থেকে বোঝা যেত যে চীন বাইরের শাসকের অধীনে। বিশিষ্ট কেন্দ্রসমূহে মাঞ্চু সৈন্যবাহিনী নিযুক্ত ছিল; এবং বশ্যতার চিহ্নস্বরূপ চীনাদের উপর টিকি রাখার মাঞ্চুরীতি চাপিয়ে দেওয়া হল। আমরা অনেকেই চীনাদের সঙ্গে কল্পনায় টিকি যোগ করে এসেছি। কিন্তু এটা মোটেই চীনা রীতি নয়। এটা ছিল দাসত্বের চিহ্ন, যেমন দাসত্বের চিহ্ন আজও ভারতে অনেকে ধারণ করে থাকে, তার অন্তর্নিহিত লজ্জাকরতাকে উপেক্ষা করে। চীনারা এখন আর টিকি রাখে না।

 এইভাবে উজ্জল মিঙ্‌যুগের পরিসমাপ্তি ঘটল। বিস্ময় জাগে এই ভেবে যে, তিন শো বছরের সুশাসনের পরে এত দ্রুত এ যুগের পতন হল কেন? যদি সত্যিই শাসনব্যবস্থা এত ভালো হয়ে থাকে, তবে বিদ্রোহ, অন্তর্বিপ্লব, এসব এল কেন? মাঞ্চুরিয়া থেকে আগত বিদেশী আক্রমণকারীকে প্রতিরোধ করা গেল না কেন? হতে পারে শেষের দিকে শাসনবিধি অত্যাচারী হয়ে উঠেছিল। এও হতে পারে যে, অতিমাত্রায় অপত্যনির্বিশেষে প্রজাপালনের ফলে জনসাধারণ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। শিশু অথবা জাতি, কারও পক্ষেই ঝিনুকে করে খাওয়ানো কল্যাণকর নয়।

 সে যুগের চীন এত সংস্কৃতিপূর্ণ হয়েও কেন অন্য দিকে অগ্রসর হয় নি—বিজ্ঞান, আবিষ্কার প্রভৃতির দিকে, এ কথা ভেবেও মনে বিস্ময় লাগে। ইউরোপের জাতিরা তার অনেক পিছনে পড়ে ছিল। কিন্তু তবু সেই রেনেসাঁসের যুগে তাদের দেখি, উৎসাহ উদ্যমে পূর্ণ, অনুসন্ধিৎসায় অসহিষ্ণু। এই দু দলের একটির তুলনা চলে মধ্যবয়স্ক মার্জিতরুচি ব্যক্তির সঙ্গে, যে শান্তিতে থাকতে চায়, নূতন নূতন বিপদসংকুল কাজে জড়িত হয়ে দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে চায় না, তার সাহিত্য ও শিল্প নিয়েই সে ব্যস্ত; এবং অপরটির দুরন্ত এক কিশোরের সঙ্গে, যার উৎসাহ উদাম অনুসন্ধিৎসার অন্ত নেই, যে নব নব বিপদসংকুল কাজের জন্যে উৎসুক। চীনে সৌন্দর্যের অভাব নেই, কিন্তু সে যেন অপরাহ্ণ অথবা সন্ধ্যার শান্ত রূপ।