বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/চীনের উপর জাপানের জুলুম

উইকিসংকলন থেকে

১৫৩

চীনের উপর জাপানের জুলুম

১৪ই এপ্রিল, ১৯৩৩

 এদিকে যখন মহাযুদ্ধ চলছে, দূর প্রাচ্যে তখন কতকগুলো ব্যাপার ঘটছিল, তাদের কথা আমাদের জানা দরকার। অতএব আমি এবার তোমাকে নিয়ে যাব চীনদেশে। চীন সম্বন্ধে আমার শেষ চিঠিতে আমি তোমাকে বলেছি কী করে সেখানে একটি প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হল এবং তার পরে আবার কীভাবে সব বিঘ্ন-বিপত্তির সৃষ্টি হল। সম্রাটকে পুনরায় সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টাও অনেকবার হয়েছিল। সে চেষ্টা সফল হল না, কিন্তু সমগ্র দেশ জুড়ে প্রজাতন্ত্র তার অধিকার বিস্তৃত করতে পারল না; বা বলা যায় কোনো একটি সরকারই সে কাজ করে উঠতে পারল না। সেই থেকে শুরু করে আজও পর্যন্ত চীনে এমন কোনো কর্তৃপক্ষ দেখা দেয় নি যে চীনের সমস্ত স্থানে একচ্ছত্র শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। কয়েক বছর এই দেশে দুটি প্রধান সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, উত্তর এবং দক্ষিণ চীনের সরকার। দক্ষিণে ডক্টর সুন-ইয়াৎ-সেন আর তাঁর জাতীয়তাবাদী দল কুওমিন্‌টাঙ প্রধান ছিলেন। উত্তরে শাসন করছিলেন রুআন শিহ্-কাই, তাঁর পরেও পর পর কয়েকজন সেনাপতি এবং সামরিক কর্মচারী সে অঞ্চল শাসন করেন। এই দুঃসাহসী রণ-বিশারদদের বলা হত টুচুন, এখনও এরা এই নামেই পরিচিত। সম্প্রতি কয়েক বৎসর যাবৎ এরা চীনদেশের পক্ষে অভিশাপস্বরূপ হয়ে উঠেছে।

 চীনের তখন কাজেই সঙিন অবস্থা; দেশের মধ্যে একটানা বিশৃঙ্খলার রাজত্ব চলেছে; তার উপরে আবার আছে গৃহযুদ্ধ; উত্তর এবং দক্ষিণ অঞ্চলের মধ্যে এবং বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী টুচুনদের মধ্যে প্রায়ই মারামারি লেগে যাচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষে চক্রান্ত-বিস্তারের সে এক পরম সুযোগের মুহূর্ত, একবার এ পক্ষকে বা টুচুনকে, একবার ও পক্ষকে বা অন্য একজন টুচুনকে সাহায্য করে করে দেশের মধ্যেকার কলহকে টিকিয়ে রাখা এবং সেই ফাঁকে নিজেদের কিছু লাভ গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ। তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে, ভারতবর্ষেও ইংরেজরা এইরকম করেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এখানেও ইউরোপের জাতিরা এই সুযোগের সদ্‌ব্যবহার করল, চক্রান্ত বিস্তার করতে এবং একজন টুচুনকে আরেকজনের বিরুদ্ধে উস্‌কে তুলতে শুরু করল। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তারা নিজেদের ঘরোয়া বিপদ আর বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে বিব্রত হয়ে পড়ল, বাধ্য হয়েই দূর প্রাচ্যে এদের এইসব কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে গেল।

 জাপানের বেলায় কিন্তু তা হল না। মহাযুদ্ধের বড়ো বড়ো যুদ্ধবিগ্রহ যা কিছু সে সবই ঘটছে বহু দূর দেশে; জাপান দেখল চীনে তার পুরোনো নীতি আবার সে স্বচ্ছন্দে এবং নির্ভয়ে অনুসরণ করতে পারে। বাস্তবিকপক্ষে তখনই সে কাজ করবার সুযোগ তার পক্ষে আগের চেয়েও বেশি; কারণ অন্যান্য সমস্ত জাতি অন্যত্র ব্যতিব্যস্ত হয়ে রয়েছে, তার কাজে বাধা দিতে তারা আসবে এমন কোনো সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না। জাপান জর্মনির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল সে শুধু চীনে কিয়াওচাও জর্মনদের ইজারা-মহল হস্তগত করবার এবং তার পর চীনদেশের মধ্যে আরও বেশিদূর ঢুকে পড়বার মতলবে।

 চীন সম্বন্ধে জাপানের কূটনীতি গত কুড়ি বছর যাবৎ আশ্চর্যরকম একপথে চলেছে। সেনাবাহিনীকে আধুনিক শিক্ষা এবং সজ্জায় দীক্ষিত করবার এবং দেশে শিল্প-প্রগতির প্রতিষ্ঠা করবার সঙ্গে সঙ্গেই জাপান স্থির করল, চীনকে তার হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে হবে, তার প্রভাবপ্রতিপত্তি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াবার জন্য জায়গা চাই; কোরিয়া এবং চীন দুটিই তার হাতের কাছে এবং দুটিই দুর্বল দেশ, অতএব সেখানে গিয়ে প্রভুত্ব আর শোষণ চালাবার লোভ জাপানের হওয়াই স্বাভাবিক। প্রথম চেষ্টা সে করল ১৮৯৪-৯৫ সনে চীনের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে। সে যুদ্ধে তার জয়ও হল, কিন্তু যতখানি সে আশা করেছিল ততখানি স্থল দখল করে নিতে সে পারল না, ইউরোপের কয়েকটি জাতি তাকে এসে বাধা দিল। তার পর এল একটি কঠিনতর সংগ্রাম—১৯০৪ সনে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ। এই যুদ্ধেও সে জয়লাভ করল, কোরিয়া এবং মাঞ্চুরিয়ায় দৃঢ় আসন প্রতিষ্ঠিত করে বসল। এর অল্পদিন পরেই কোরিয়াকে সে দখল করে নিল; কোরিয়া জাপান সম্রাজ্যের একটি অংশে পরিণত হল।

 মাঞ্চুরিয়া কিন্তু তখনও চীনেরই অংশ বলে গণ্য রয়ে গেল। চীনের পূর্ব অঞ্চলের তিনটি প্রদেশ নিয়ে মাঞ্চুরিয়া গঠিত; তার নাম উল্লেখও করা হয় তাই বলেই। জাপানিরা শুধু রাশিয়ার সেখানে যে ইজারা-স্বত্ব ছিল সেইটা দখল করে নিল। রাশিয়ানরা যে রেলপথটি তৈরি করেছিল তার নাম এতদিন ছিল চাইনিজ ইস্টার্ন রেলওয়ে। জাপানিরা এটিকেও হস্তগত করল, এর নাম বদলে রাখা হল সাউথ মাঞ্চুরিয়ান রেলওয়ে। এবার জাপান মাঞ্চুরিয়াকে বেশ এঁটেসেটে চেপে ধরবার উদ্যোগ শুরু করল। চীনে লোকসংখ্যা অত্যন্ত বেশি; ইতিমধ্যে এই রেলওয়ের কল্যাণে চীনের অন্যান্য সমস্ত অঞ্চল থেকে বহু লোক এখানে চলে এসেছে, বহু চীনা কৃষকও এসে উপস্থিত হচ্ছে। মাঞ্চুরিয়াতে ‘সয়াবিন্’ বলে একরকম বরবটি খুব ভালো ফলত; এই বরবটির অনেক ভালো গুণ আছে বলে পৃথিবীর সর্বত্রই এর চাহিদা বেড়ে গেল। এই বরবটি থেকে নানারকমের জিনিস তৈরি হতে পারে, তার মধ্যে প্রধান একটি হচ্ছে এক রকমের তেল। এই সয়াবিন চাষের উপলক্ষ্যেও বাইরে থেকে বহু লোক আমদানি হতে লাগল। অতএব জাপানিরা যখন উপরে এসে চেপে বসে মাঞ্চুরিয়ার অর্থনৈতিক জীবনটাকে সম্পূর্ণরূপে নিজের আয়ত্ত করে নিতে চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময়েই এদিকে দক্ষিণ-চীন থেকে চীনারা ঝাঁকে ঝাঁকে এসে দেশটাকে ভর্তি করে ফেলল। এই চীনা কৃষক এবং অন্যান্য আগন্তুকদের সমুদ্রে পুরোনো কালের মাঞ্চু বাসিন্দা ক’জন একেবারে ডুবে তলিয়ে গেল; সংস্কৃতি এবং মনোভাবের দিক দিয়ে তারা নিজেরাই পুরোদস্তুর চীনবাসী বনে গেল।

 চীনে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছে, এটা জাপানের ঠিক পছন্দ হয় নি। চীনের শক্তি যাতে বাড়তে পারে এমন সকল ব্যাপারেই তার আপত্তি। তার সমস্ত কূটনৈতিক চালেরই লক্ষ্য ছিল, চীন যাতে সুসংহত হয়ে একটি শক্তিমান রাষ্ট্র হয়ে উঠতে না পারে, তার পথ বন্ধ করা। অতএব জাপান মহা-উৎসাহে এক টুচুনকে অন্য টুচুনের সঙ্গে লড়তে সাহায্য করতে লাগল, যেন দেশের আভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলাটা বেশ বজায় থাকতে পারে।

 চীনের নবীন প্রজাতন্ত্রের সামনে তখন অনেক বিরাট বিরাট সমস্যা। সে শুধু মুমূর্ষু-সাম্রাজ্য সরকারের হাত থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার প্রশ্নই নয়। কেন্দ্রীয় সরকার বলতে তখন প্রায় কিচ্ছু নেই; কাজেই কেড়ে নেবার মতো রাজনৈতিক ক্ষমতাও বিশেষ কিছুই ছিল না। সে ক্ষমতা এদেরই তখন গড়ে নিতে হবে। প্রাচীন চীন নামেই শুধু একটা সাম্রাজ্য, আসলে এটা ছিল বহু সংখ্যক স্বাধীন অঞ্চলের একটা সমন্বয়, তাদের মধ্যে পরস্পর-বন্ধনও অতি শিথিল। প্রদেশগুলি অল্পবিস্তর স্বাধীন, এমন কি শহর এবং গ্রামগুলোও তাই। কেন্দ্রীয় সরকার বা সম্রাটের প্রভুত্ব এরা মুখে স্বীকার করত; কিন্তু স্থানীয় ব্যাপারে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করতে সে সরকার যেত না। ‘এককেন্দ্রিক’ রাষ্ট্র বলতে যা আমরা বুঝি, তাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং বাস্তবিক শাসনকর্তৃত্ব একটি কেন্দ্রে এসে সুসংহত হয়ে থাকে, দেশশাসনের বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যেও একটা ঐক্য থাকে। সেরকমের কিছুই ছিল না এখানে। পাশ্চাত্য জগতের শিল্প-বাণিজ্য আর সাম্রাজ্যবাদীদের লোভের ধাক্কায় এই শিথিল-বন্ধন রাষ্ট্রটাই (রাষ্ট্রনীতির ভাষায়) ভেঙে পড়েছিল। চীন বুঝল, তাকে যদি এই ধাক্কা সামলে আবার বেঁচে উঠতে হয়, তবে তার একমাত্র উপায় হচ্ছে চীনদেশকে একটি শক্তিমান এককেন্দ্রায়ত্ত রাষ্ট্রে পরিণত করা, তার সর্বত্র ঠিক একই প্রকারের শাসন-ব্যবস্থা প্রচলিত থাকবে। অতএব নবজাত প্রজাতন্ত্র ঠিক এই রকমের একটি রাষ্ট্র সৃষ্টি করতে চাইল। এটা সে দেশের পক্ষে একটা নূতন জিনিস, সুতরাং এ কাজ সম্পন্ন করতে প্রজাতন্ত্রকে নানারকম কঠিন সমস্যায় পড়তে হল। দেশে তখন বার্তা চলাচলের ভালো ব্যবস্থা নেই, ভাল রাস্তাঘাট রেলওয়ে নেই—দেশে রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপনের পথে এইগুলোই হয়ে দাঁড়িয়েছে অতি প্রকাণ্ড বাধা।

 রাজনৈতিক ক্ষমতা যাকে বলে, অতীত কালের চীনবাসীরা তাকে তেমন একটা দরকারি বস্তু বলেই মনে করত না। তাদের সে বিরাট সভ্যতার সমস্তটাই দাঁড়িয়ে ছিল তার সংস্কৃতিকে আশ্রয় করে; মানুষের প্রতি তার শিক্ষা ছিল সুন্দর সুষ্ঠু জীবন যাপনের উপায়—পৃথিবীতে তার সমকক্ষ শিক্ষা আর কোথাও কোনোদিন দেখা যায় নি। নিজেদের এই প্রাচীন সংস্কৃতি তাদের সমগ্র চেতনাকে এমনই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে দেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামোটা যখন একেবারেই ভেঙে পড়ল তখনও তারা সেই প্রাচীন সংস্কৃতির ধরনধারণকেই আঁকড়ে ধরে বসে রইল। জাপান নিজের ইচ্ছাতেই পাশ্চাত্য শিল্পরীতি এবং পাশ্চাত্য রীতিনীতি গ্রহণ করে নিয়েছিল, অথচ মনেপ্রাণে সে তখনও সামন্ত প্রথারই উপাসক রয়ে গেছে। চীন সামন্তপ্রথায় বিশ্বাসী নয়; তার মন ভরা ছিল যুক্তিবাদ আর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা দিয়ে; বিজ্ঞান আর শিল্পের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য জগৎ যে বিপুল প্রগতি দেখাচ্ছে তার দিকে সে ব্যগ্রনেত্রে তাকিয়ে ছিল। তবু কিন্তু জাপানের মতো সে সভ্যতাকে নিজম্ব করে নিতে চীন ছুটে গেল না। অবশ্য সে করতে যাবার পথে বাধাও তার অনেক, জাপানের সে বালাই নেই। কিন্তু তা ছাড়াও, প্রাচীন সংস্কৃতির সঙ্গে যোগসূত্র ছিন্ন হয়ে যেতে পারে এমন কিছু করতে যেতেই তার মনে দ্বিধা ছিল। চীনের মন ছিল দার্শনিকের মন; দার্শনিকরা তাড়াহুড়ো করে কাজ করেন না। তার মনের মধ্যে অবশ্য তখন তুমুল তোলপাড় চলছিল, আজও চলছে; কারণ—তার সামনে যে সমস্যাগুলো এসে দাঁড়িয়েছিল, তাকে বিব্রত করে তুলছিল, সেগুলো শুধু রাজনৈতিক সমস্যাই নয়, অর্থনীতি সমাজনীতি বুদ্ধিবৃত্তি শিক্ষাদীক্ষা প্রভৃতি সকল ব্যাপারেই তাকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছিল।

 তার পর আবার চীন বা ভারতবর্ষের মতো বিশাল দেশের পক্ষে, তার এই বৃহৎ আয়তন থেকেই বহু সমস্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে। এরা দেশ হয়েও আসলে এক-একটা মহাদেশের শামিল, একটা মহাদেশের মতোই এদের গুরুভার দেহ, সে দেহ সামলে নিয়ে নড়া চড়া সোজা নয়। হাতি যখন আছাড় খায়, আবার উঠে দাঁড়াতে তার সময় লাগে; বিড়াল বা কুকুরের মতো এক লাফে উঠে দাঁড়ানো তার সাধ্যের বাইরে।

 বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতেই জাপান মিত্রপক্ষের সঙ্গে যোগ দিল, জর্মনির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। কিয়াওচাও দখল করে নিল সে, তার পর শানটুং প্রদেশের উপর দিয়ে দেশের মধ্যে বাহু বিস্তার করতে শুরু করল। এই শানটুং প্রদেশেই কিয়াওচাও অবস্থিত। জাপানের এই অগ্রগতির মানেই হল, জাপানিরা খাস চীনদেশের উপর অভিযান করেছে। জর্মনির সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহের কোনো কথাই উঠল না; কারণ এই অঞ্চলের সঙ্গে জর্মনির কোনো সম্পর্ক নেই। চীন সরকার খুব ভদ্রভাবে তাদের অনুরোধ জানাল, ফিরে যাও। জাপানিরা শুনে বলল, এতদূর আস্পর্ধা! তারা তৎক্ষণাৎ একটি সরকারি চিঠি চীনের কাছে দাখিল করল, তাতে তাদের একুশ দফা দাবি জানানো হয়েছে।

 ‘একুশ দফা দাবি’ একটা বিখ্যাত ব্যাপার হয়ে উঠল। এখানে আমি সে দাবিগুলো উল্লেখ করব না। এর সোজা কথাটা ছিল, চীনদেশে সমস্ত রকমের অধিকার এবং সুযোগ-সুবিধা জাপানকে ছেড়ে দিতে হবে, বিশেষ করে মাঞ্চুরিয়ায় মঙ্গোলিয়ায় আর শান্‌টুং প্রদেশে। এই দাবিগুলো সমস্ত মেনে নিলে চীন বস্তুত জাপানের একটা উপনিবেশে পরিণত হয়ে যায়। উত্তর চীনের কর্তৃপক্ষের গায়ে জোর নেই, তাঁরা এই দাবিতে আপত্তি জানালেন, কিন্তু জাপানের সেনা দুর্ধর্ষ, তাদের বিরদ্ধে দাঁড়িয়েই বা তাঁরা কী করবেন। তার পর আবার, উত্তর-দেশের এই চীনা সরকারটিকেও তার নিজের প্রজারাই বিশেষ ভালোবাসত না। যাই হোক, একটি কাজ এঁরা করলেন, তাতে চীনের খুব উপকার হল। জাপানিদের দাবিগুলো এঁরা বাইরে প্রকাশিত করে দিলেন। তার ফলে সঙ্গে সঙ্গেই সমস্ত চীনে তার একটা প্রচণ্ড প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়ে উঠল। অন্যান্য বৃহৎ জাতি তখন যুদ্ধ করতে ব্যতিব্যস্ত, তবু তারা পর্যন্ত এতে অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে উঠল। আমেরিকা তো বিশেষ করেই আপত্তি প্রকাশ করল। এর ফলে জাপান তার কতগুলো দাবি প্রত্যাহার করল, এবং আর কতকগুলোর বহর হ্রাস করল। বাকিগুলোর জন্য অবশ্য চীন সরকারের উপর সে জোর জুলুম চালাতে লাগল; বাধ্য হয়ে ১৯১৫ সনের মে মাসে চীন সরকার সেগুলি মেনে নিলেন। এর ফলে চীনের সর্বত্র প্রবল জাপান-বিদ্বেষী মনোভাব সৃষ্টি হয়ে গেল।

 ১৯১৭ সনের আগস্ট মাসে, যুদ্ধ শুরু হবার তিন বছর পরে, চীনও মিত্রপক্ষের সঙ্গে যোগ দিল, জর্মনির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। এটা প্রায় একটা হাসির ব্যাপার; জর্মনিকে কোনো আঘাত হানবার সাধ্য চীনের ছিল না। তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল মিত্রপক্ষের সঙ্গে একটা সদ্ভাব স্থাপন করা এবং জাপানের আরও দৃঢ়তর আলিঙ্গন থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

 এর অল্পদিন পরেই, ১৯১৭ সনের নভেম্বর মাসে, এল বল্‌শেভিক বিপ্লব। এই বিপ্লবের ফলে উত্তর-এশিয়ার সর্বত্রই নিদারুণ বিশৃঙ্খলা দেখা দিল। সোভিয়েট এবং সোভিয়েট-বিরোধীদের সংগ্রামের একটি রণক্ষেত্র হল সাইবেরিয়া। রাশিয়ার শ্বেতদলের সেনাপতি কোলচাক্‌ সাইবেরিয়াতে আশ্রয় নিয়ে সেখান থেকে সোভিয়েটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে লাগলেন। সোভিয়েটের জয়লাভ দেখে জাপানের ভয় ধরল, সে একটি বৃহৎ সেনাবাহিনী সাইবেরিয়াতে পাঠিয়ে দিল। ব্রিটিশ এবং আমেরিকান সেনাও পাঠানো হল সেখানে। কিছুকালের মতো সাইবেরিয়া এবং মধ্য-এশিয়াতে রাশিয়ার প্রভাবপ্রতিপত্তি বলতে কিছুই রইল না। এই-সব অঞ্চলে রাশিয়ার সমস্ত মানমর্যাদা একেবারে নিঃশেষে লুপ্ত করে দিতে ব্রিটিশ সরকার প্রাণপণ চেষ্টা করলেন। মধ্য-এশিয়ার কেন্দ্রস্থলে কাশগড়ে ব্রিটিশরা একটি বেতার ঘাঁটি স্থাপন করল, সেখান থেকে বল্‌শেভিকদের বিরুদ্ধে নানারকমের প্রচারকার্য চালাতে লাগল।

 মঙ্গোলিয়াতেও সোভিয়েটের সমর্থক এবং সোভিয়েটের বিরোধী লোকদের মধ্যে একটা প্রচণ্ড সংগ্রাম হল। অনেক দিন আগে, ১৯১৫ সনে, মহাযুদ্ধ তখন চলছে, মঙ্গোলিয়া একটি কাজও করেছিল; জার শাসিত রাশিয়ার সাহাযো সে চীন সরকারের কাছ থেকে অনেকখানি স্বায়ত্তশাসনের অধিকার আদায় করে নিয়েছিল। তখনও কিন্তু চীনই তার উপরস্থ প্রভু হয়ে রইল; আবার মঙ্গোলিয়ার বৈদেশিক সম্পর্কের দিক থেকে রাশিয়াকেও সেখানে দাঁড়াবার ঠাঁই দেওয়া হল। এ একটা আশ্চর্য ব্যবস্থা। সোভিয়েট বিপ্লবের পরে মঙ্গোলিয়াতেও গৃহযুদ্ধ বাধল, তিন বছর বা তারও বেশিদিন সংগ্রাম চালিয়ে শেষে সেখানকার স্থানীয় সোভিয়েটরাই সে যুদ্ধে জয়লাভ করল।

 বিশ্বযুদ্ধের পরে যে শান্তি-সম্মেলনটা বসল, তার কথা এখন পর্যন্ত তোমাকে কিছু বলি নি। তার সম্বন্ধে আলোচনা আমি আর একটি চিঠিতে করব। কিন্তু একটি কথা এইখানেই বলতে পারি; এই সম্মেলনে যে বৃহৎ জাতিগুলো উপস্থিত ছিল, তার মানেই বিশেষ করে ইংলণ্ড ফ্রান্স আর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র, এরা সাব্যস্ত করল, চীনের শান্‌টুং প্রদেশটি জাপানকেই এরা উপহার দেবে। এভাবে মহাযুদ্ধের ফলে মিত্রশক্তিবর্গের অন্যতম চীন তার দেশের একটি অংশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হল। এর কারণ হল, যুদ্ধের সময় নাকি ইংলণ্ড ফ্রান্স আর জাপানের মধ্যে কী একটা গোপন সন্ধি হয়েছিল। কিন্তু কারণ এর যাই থাক, চীনের উপরে এই যে কদর্য চালাকিটি এরা খেলল, তার ফলে চীনের জনসাধারণ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল; পিকিঙ সরকারকে তারা জানিয়ে দিল, সরকার যদি এটা স্বীকার করে নেন তবে তারা দেশে বিপ্লব ঘটিয়ে ছাড়বে, জাপানের পণ্যও এরা একেবারেই বর্জন করে বসল; বহু জায়গাতে জাপানিদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা-হাঙ্গামাও শুরু হল। চীন সরকার (এই নাম দিয়ে আমি বোঝাচ্ছি উত্তর-অঞ্চলে পিকিঙ-এর সরকার, এইটাই তখন প্রধান) সন্ধিপত্র স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করলেন।

 এর দু’বছর পরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন শহরে একটি সম্মেলন হল; সেখানে এই শানটুং-এর প্রশ্নটি আবার উঠল। এই সম্মেলনটা হচ্ছিল, দূর প্রাচ্যের সমস্যার সঙ্গে পৃথিবীর যত জাতির স্বার্থ জড়িত আছে তাদের সকলকেই নিয়ে; এদের আলোচনার বস্তু ছিল প্রত্যেকের নৌবহরের শক্তির পরিমাণ। ১৯২২ সনের এই ওয়াশিংটন সম্মেলনে চীন এবং জাপান সম্বন্ধে কতকগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা করা হল। জাপান শানটুং প্রদেশ চীনকে ফেরত দিতে রাজি হল; দীর্ঘকাল ধরে এই প্রশ্নটি চীনকে অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ করে রেখেছিল, তার অবসান হল। সমস্ত জাতিগুলির মধ্যে দুটি খুব জরুরি চুক্তিও সম্পন্ন হল।

 এর একটির নাম হচ্ছে ‘চতুঃশক্তি চুক্তি’, এটি হয়েছিল আমেরিকা, গ্রেট ব্রিটেন, জাপান এবং ফ্রান্সের মধ্যে। এই চারটি জাতি পরস্পরকে প্রতিশ্রুতি দিলেন, প্রশান্ত মহাসাগরে এঁদের যার যত সম্পত্তি আছে, পরস্পর তাদের সীমানার মর্যাদা রক্ষা করে চলবেন; অর্থাৎ এঁরা কেউ অপরের অধিকারে হস্তক্ষেপ করবেন না বলে আশ্বাস দিলেন। অন্য চুক্তিটির নাম ছিল ‘নব-শক্তি সন্ধি’; সম্মেলনে যে নয়টি জাতি যোগ দিয়েছিলেন তাঁরা সকলেই এই সন্ধিতে আবদ্ধ হলেন—এঁদের নাম হচ্ছে, আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়ম, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান, হল্যাণ্ড, পর্তুগাল এবং চীন। এই সন্ধিপত্রের একেবারে প্রথম ধারাটিই শুরু হয়েছে এইভাবে:

 “চীনের সার্বভৌম অধিকার, স্বাধীনতা, এবং দেশায়তন ও শাসনব্যাপারে অক্ষুণ্ণ ক্ষমতার মর্যাদা রক্ষা করিয়া চলা......”

 দেখেই বোঝা যায়, এই দুটি চুক্তিরই উদ্দেশ্য ছিল, ভবিষ্যতে চীনের উপরে যাতে আর কেউ জুলুম না করে তার ব্যবস্থা করা। এতদিন ধরে সমস্ত জাতিগুলো চীনে ইজারা আদায় এমনকি তার জমি দখল করে পর্যন্ত নিচ্ছিল, তাদের সেই চিরকেলে খেলাকে বন্ধ করে দেবার জন্যই এই চুক্তি করা হয়েছিল। নানাবিধ যুদ্ধোত্তর সমস্যা নিয়ে তখন পাশ্চাত্য দেশগুলো ব্যতিব্যস্ত, তখন চীনের উপর জুলুম করবার মতো অবসরও তাদের নেই। জাপানও এই প্রতিশ্রুতি স্বীকার করে নিল, যদিও বহু বৎসর ধরে সে চীনের প্রতি যে নীতি অনুসরণ করে এসেছে এটা তার একেবারেই উল্‌টো। কয়েকটা বছর যেতে না যেতেই স্পষ্ট দেখা গেল, এত সমস্ত চুক্তি আর প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও জাপান তার সেই পুরোনো নীতিই সমানে অনুসরণ করে চলেছে এবং জাপান একবার চীন আক্রমণ করল। আন্তর্জাতিক কুটনীতির ব্যাপারে মিথ্যাভাষণ আর ভণ্ডামির এটি একটি চমৎকার নির্লজ্জ উদাহরণ হয়ে রয়েছে। পৃথিবীতে কী ঘটছে তার পশ্চাৎপটটা যাতে তুমি বুঝতে পার, সেইজন্যেই তোমাকে ওয়াশিংটনের সম্মেলনের ইতিহাস বলতে হল।

 ওয়াশিংটনে যখন সম্মেলন হচ্ছিল, তারই কাছাকাছি সময়ে সাইবেরিয়া থেকেও সমস্ত বিদেশী সেনা সরিয়ে নেওয়া শেষ হল। সকলের শেষে গেল জাপান। তারপরই স্থানীয় সোভিয়েটরা সামনে এগিয়ে এল, রাশিয়ার সোভিয়েট প্রজাতন্ত্রদের সঙ্গে যোগ দিল।

 প্রথম থেকেই রাশিয়ায় সোভিয়েট এগিয়ে গিয়ে চীন সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালিয়েছিল; বলেছিল অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর মতো চীনের মধ্যে যে-সব বিশেষ অধিকার জারশাসিত রাশিয়া দখল করে নিয়েছিল, এরা সেগুলো ছেড়ে দিতে চায়। সাম্রাজ্যবাদ আর কমিউনিজ্‌ম কখনোই একসঙ্গে চলতে পারে না; তা ছাড়াও প্রাচ্য জগতের যে দেশগুলি দীর্ঘকাল ধরে পাশ্চাত্য জাতিগুলোর শোষণ এবং শাসানি সয়ে এসেছে, তাদের প্রতি একটা উদার নীতি সোভিয়েট ইচ্ছে করেই গ্রহণ করেছিল। এটা শুধু সুনীতির দিক থেকেই ভালো কাজ নয়, কূটনীতির দিক থেকেও সুবুদ্ধির কাজ; কারণ এর ফলে প্রাচ্য জগতে সোভিয়েট রাশিয়ার অনেক বন্ধু তৈরি হয়ে গেল। বিশেষ অধিকারগুলো সোভিয়েট ছেড়ে দিতে চাইছিল তার সঙ্গে কোনো শর্ত সে আরোপ করেনি, বদলে কিছুই সে দাবি করছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও চীন সরকার তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে ভয় পেল, পাছে পশ্চিম-ইউরোপের জাতিরা তার উপরে চটে যায়। তবু শেষ পর্যন্ত রাশিয়া এবং চীনের প্রতিনিধিদের একত্র সাক্ষাৎ হল, ১৯২৪ সনে এরা কতকগুলি সিদ্ধান্ত স্বীকার করে নিলেন। এই চুক্তির কথা শুনে ফরাসি আমেরিকান এবং জাপানি সরকার পিকিঙ সরকারকে তাদের প্রতিবাদ জ্ঞাপন করল; পিকিঙ সরকার এত ভয় পেয়ে গেল যে চুক্তিপত্রে তার প্রতিনিধি যে স্বাক্ষর করেছিল সেটাকে পর্যন্ত সাফ অস্বীকার করে বসল। এতখানি দুরবস্থাই বেচারি পিকিঙ সরকারের দাঁড়িয়েছিল। রুশ প্রতিনিধি তখন সে চুক্তিপত্রের সমস্ত ভাষাটাই কাগজে বার করে দিলেন। তাই নিয়ে প্রকাণ্ড একটা কোলাহল পড়ে গেল। সবাই দেখল, সে চুক্তিপত্রে চীনের প্রতি অতি সম্ভ্রমপূর্ণ এবং ভদ্র ব্যবহার দেখানো হয়েছে, তার সমস্ত অধিকার স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে—বৃহৎ জাতিগুলোর সঙ্গে তার যতদিনের সংশ্রব তার মধ্যে তার এর আগে কেউ কখনও তা করে নি। বড়ো একটা জাতির সঙ্গে সমান সমান দাঁড়িয়ে এই তার প্রথম সন্ধি। দেখে চীনের প্রজারা উল্লসিত হয়ে উঠল; বাধ্য হয়ে তখন সরকারকেও সে চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করতে হল। সাম্রাজ্যবাদী জাতিগুলো এতে ক্ষুব্ধ হবে সে তো অতি সহজ কথাই; কারণ এতে তারা তুলনায় অনেকখানি খাটো প্রমাণ হয়ে গেল। সোভিয়েট রাশিয়া উদার হস্তে সকলকে দান করেছে, আর তারই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তারা তাদের সমস্ত বিশেষ অধিকারকে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে রেখেছে কিছুতেই একতিল হাতছাড়া করতে চাইছে না।

 দক্ষিণ-চীনে সুন-ইয়াৎ-সেন যে সরকার স্থাপন করেছেন তার রাজধানী ছিল ক্যাণ্টন। তাদের সঙ্গেও সোভিয়েট সরকার কথাবার্তা চালাল; এদের মধ্যেও একটা পরস্পর বোঝাপড়া হল। এই সময়টার অধিকাংশ ধরেই উত্তর এবং দক্ষিণ-চীনের মধ্যে, এবং উত্তর-চীনের নানা সামরিক অধিনায়কদের মধ্যে একটা ক্ষীণ রকমের গৃহযুদ্ধ চলছিল। উত্তর-চীনের এই টুচুনরা, বা মহাটুচুনরা (এদের অনেকে এই নামে পরিচিত ছিল) কোনো নীতি বা কর্মসূচীর খাতিরে যুদ্ধ করছিল না, এরা যুদ্ধ করছিল শুধু নিজের ক্ষমতা বাড়াবার জন্য। এরা পরস্পরের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করত তার পর আবার হঠাৎ দল ছেড়ে বিপক্ষ দলে গিয়ে ভিড়ত, সেখানে গিয়ে আবার নূতন দল গড়ত। এই ক্রমাগত দল বদ্‌লাবদ্‌লির ব্যাপারটা বাইরের লোকে ভালো বুঝেই উঠতে পারত না। এই টুচুন বা যুদ্ধব্যবসায়ী গুণ্ডারা তাদের নিজস্ব সেনাবাহিনী গঠন করত, প্রজার উপর নিজস্ব প্রয়োজনে কর বসাত, নিজস্ব কারণেই যুদ্ধ-বিগ্রহ করত; অথচ তার দরুন সমস্ত বোঝা বইতে হত চীনের নিরীহ প্রজাদের। দীর্ঘকাল ধরে এরা খালি উৎপীড়নই সয়ে এসেছে। শোনা যায় এই মহা-টুচুনদের অনেকের পিছনে নাকি আবার ছিল বিদেশী জাতিগুলো, বিশেষ করে জাপান। সাংহাইতে বিদেশীদের যে-সব বড়ো বড়ো ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠান ছিল সেখান থেকেও এদের কাছে সাহায্য এবং টাকা এসে পৌঁছত।

 সমস্ত চীনে একটি মাত্র স্থান মালিন্যমুক্ত স্থান ছিল, সে হচ্ছে দক্ষিণ-চীন, সেখানে ডক্টর সুন-ইয়াৎ-সেনের সরকার প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। এই সরকারের একটা আদর্শ ছিল, একটা স্থির নীতি ছিল; উত্তর-চীনের টুচুনদের অনেকেই শাসনের নামে যে গুণ্ডামি আর ডাকাতির ব্যবসা চালাচ্ছিল, এটা মোটেই তা নয়। ১৯২৪ সনে প্রজাদের দল ‘কুওমিন্‌টাঙ’-এর প্রথম জাতীয় অধিবেশন হল; সে অধিবেশনে ডক্টর সুন একটি ইস্তাহার দাখিল করলেন। এই ইস্তাহারে তিনি যে-সব নীতি অনুসারে এখন জাতির জীবনযাত্রাকে চালিত করা প্রয়োজন, তার একটা ফিরিস্তি দিলেন। সেই থেকে শুরু করে এই ইস্তাহার এবং এই নীতিগুলো কুওমিনটাঙ-এর মূল আদর্শ হয়ে রয়েছে; অনেকের মতে এখনও চীনের জাতীয় সরকারের সাধারণ কর্মনীতি এদের অনুসারেই চালিত হচ্ছে।

 ১৯২৫ সনের মার্চ মাসে ডক্টর সুনের মৃত্যু হয়। চীনের সেবার জন্য তিনি জীবনপাত করে গেছেন, চীনের অধিবাসীরা আজও তাঁকে ভালোবাসে।