বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/চীনের বিখ্যাত মাঞ্চু-অধিপতি

উইকিসংকলন থেকে

৯৩

চীনের বিখ্যাত মাঞ্চু-অধিপতি

১৫ই সেপ্টেম্বর, ১৯৩২

 আমার মন এত বিচলিত যে কী করব বুঝতে পারছি না। একটা ভীষণ দুঃসংবাদ পেয়েছি যে, বাপু আমরণ প্রায়োপবেশনের সিদ্ধান্ত করেছেন। আমার নিজস্ব ছোটো জগত, যেখানে তাঁর স্থান এত বড়ো, কেঁপে ভেঙেচুরে যাচ্ছে। সব জায়গাই যেন শূন্য, সবই যেন অন্ধকার। তাঁর মূর্তি বারেবারে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। যখন শেষবার তাঁকে দেখি, বছরখানেক আগে, পশ্চিম-যাত্রী জাহাজের উপরে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। আমি কি আর তাঁকে দেখতে পাব না? মন যখন সন্দিগ্ধ, যখন উপদেশের প্রয়োজন, যখন মন দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে সান্ত্বনা চায়, তখন কার কাছে যাব? যে প্রিয় নেতা আমাদের উদ্বুদ্ধ করে পরিচালনা করতেন তিনি চলে গেলে আমরা কী করব? যে দেশের মহান্ লোকেরা এমনি করে মরে সে দেশ কী ভয়ানক! এ দেশের লোক জন্ম-ক্রীতদাস, তাদের মনও ক্রীতদাসের মতো, যারা স্বাধীনতার কথা ভুলে গিয়ে তুচ্ছ জিনিষ নিয়ে কলহবিবাদ করে।

 লেখার মতো মানসিক অবস্থা নয়; ভেবেছিলাম এই পত্রধারা শেষ করে দেব। কিন্তু সেটা বোকামি হবে। আমার এই কুঠুরির মধ্যে আমি লেখাপড়া ও চিন্তা করা ছাড়া আর কী করতে পারি? যখন আমি ক্লান্ত, মন যখন বিক্ষিপ্ত, তখন তোমার চিন্তা ও তোমার কাছে চিঠি লেখার চেয়ে বড়ো সান্ত্বনার উপকরণ আর কী আছে? দুঃখ ও অশ্রু এ পৃথিবীতে সঙ্গী করলে চলে না। বুদ্ধ বলেছিলেন, “মহাসাগরে যত জল, তার চেয়ে অধিক পরিমাণে অশ্রুপাত ঘটেছে।” এ হতভাগ্য পৃথিবীর সুখের দিন আসার আগে আরও অনেক চোখের জল পড়বে। আমাদের কর্তব্য এখনও বাকি আছে, বিরাট কর্মসম্ভার এখনও আমাদের আহ্বান করছে। আমাদের নিজেদের ও আমাদের যারা অনুবর্তী তাদের, এ কাজ যতদিন শেষ না হয় ততদিন বিশ্রাম নেই। অতএব আমি আমার কার্যসূচী মেনে চলতে সিদ্ধান্ত করেছি, এবং আগের মতোই লিখে চলব তোমার কাছে।

 আমার শেষ কয়েকটা চিঠি হয়েছে ভারত সম্বন্ধে, এবং কাহিনীর শেষ দিকটা খুব প্রীতিকর নয়। ভূপতিত ভারত ছিল যাবতীয় দস্যু এবং ভাগ্যান্বেষীর লুণ্ঠনের স্থান। প্রাচ্যে ভারতের প্রতিবেশী চীনের অবস্থা অনেক ভালো ছিল। এখন চীন সম্বন্ধে কিছু বলা যাক।

 তোমার মনে আছে, আমি তোমাকে মিঙ-যুগের সমৃদ্ধির কথা বলেছি (পত্র ৮০); আরও বলেছি, কেমন করে দুর্নীতি ও বিভেদ এল এবং চীনের উত্তরের প্রতিবেশী মাঞ্চুরা এসে চীন দখল করল। ১৬৫০ সালের পর থেকে মাঞ্চুরা চীনের সর্বত্র দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই অর্ধবিদেশী মাঞ্চু-রাজবংশের অধীনে চীনের প্রতাপ বৃদ্ধি পেল, এমনকি সংগ্রামলিপ্সা প্রকাশ পেল। মাঞ্চুরা নূতন উদ্যম নিয়ে এল। তারা চীনের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে যতদূর সম্ভব কম হস্তক্ষেপ করত; তার পরিবর্তে তাদের অতিরিক্ত উদ্যম উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণে সাম্রাজ্যবৃদ্ধির কাজে নিযুক্ত করল।

 নূতন রাজবংশে সাধারণত প্রথম দিকে জনকয়েক সক্ষম শাসকের উদ্ভব হয়ে শেষের দিকে অক্ষমতার তলিয়ে যায়। সেইরকম মাঞ্চু-রাজবংশেও কয়েকজন অসামান্য ক্ষমতাশালী শাসক ও রাজনীতিবিদ জন্মেছিলেন। দ্বিতীয় সম্রাট ছিলেন কাঙ্‌হি। সিংহাসন-আরোহণের সময় তাঁর বয়স ছিল মোটে আট। একষট্টি বছর ধরে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ও জনবহুল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর ছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের পাতার তাঁর অধিকারের দাবি শুধু এইজন্যে অথবা তাঁর সামরিক প্রতাপের জন্যে নয়। তাঁকে লোকে মনে রেখেছে তাঁর রাজনীতিজ্ঞতা এবং সাহিত্যবিষয়ে উৎসাহের জন্যে। ১৬৬১ থেকে ১৭২২ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ চুয়ান্ন বছর ধরে তিনি ছিলেন ফ্রান্সের রাজাধিরাজ চতুর্দশ লুইয়ের সমসাময়িক। দুজনেই অতি দীর্ঘকাল ধরে রাজত্ব করেন, কিন্তু রাজত্বকালের দৈর্ঘ্যের প্রতিযোগিতার লুই নূতন রেকর্ড স্থাপন করলেন বাহাত্তর বছর রাজ্যশাসন করে। এই দুজনের তুলনামূলক আলোচনা চলতে পারে, কিন্তু সে তুলনায় লুইয়ের হার হবে। বিলাসিতার আধিক্যে তিনি দেশের সর্বনাশ করলেন, এবং ঋণভারে জর্জরিত করে তাকে ক্লান্তির শেষ সীমায় এনে ফেলেছিলেন। ধর্মমত সম্বন্ধে তিনি ছিলেন অসহিষ্ণু। কাঙ্‌হি নিষ্ঠাবান কন্‌ফুসীয় ছিলেন, কিন্তু অন্যের ধর্মবিশ্বাস সম্বন্ধে ছিলেন উদার। তাঁর অধীনে, শুধু তাঁর একার কেন, প্রথম চারজন মাঞ্চু-সম্রাটের অধীনেই, মিঙ-সংস্কৃতিতে হস্তক্ষেপ করা হয় নি। এই সংস্কৃতির উচ্চ স্তর বর্তমান রইল, এমনকি কোনো কোনো স্থলে তার উন্নতি ঘটল। ব্যবহারিক শিল্প, ললিতকলা, সাহিত্য এবং শিক্ষার বহুল প্রচলন মিঙ-যুগের মতোই রইল। আগের মতোই চমৎকার চীনেমাটির জিনিষ তৈরি হতে লাগল। রঙিন ছবি ছাপার কাজ আবিষ্কৃত হল এবং জেসুইট-পাদ্রীদের কাছে চীনদেশ তাম্রফলকে খোদাই করা ছাপার কাজ শিখল।

 মাঞ্চু শাসকদের রাজনীতিজ্ঞতা ও সাফল্যের মূল হল চীন-সংস্কৃতির সাথে তাঁদের সম্পূর্ণভাবে মিলন। চীনের চিন্তাধারা ও সংস্কৃতি তাঁরা গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম সভ্য মাঞ্চুদের উদ্যম ও কর্মতৎপরতা হারিয়ে ফেলেন নি। ফলে কাঙ্‌হি ছিলেন দুটি বিরুদ্ধ ভাবের অসাধারণ সংমিশ্রণ; তিনি ছিলেন দর্শন ও সাহিত্যের অনুরাগী, সংস্কৃতিমূলক কাজে নিবিষ্ট, সঙ্গে সঙ্গে একজন সমর্থ সামরিক নেতা, দেশজয়ে অনুরাগী। সাহিত্য ও ললিতকলার প্রতি তাঁর অনুরাগ ভাসা-ভাসা ছিল না। তাঁর সাহিত্যবিষয়ে কাজের মধ্যে নিম্নলিখিত তিনটি জিনিষ—যা তাঁর অনুরোধে এবং সময়ে সময়ে তাঁরই সহায়তায় তৈরি হয়েছিল—তোমাকে তাঁর বিদ্যার গভীরত্ব সম্বন্ধে খানিকটা ধারণা দেবে।

 তোমার মনে থাকতে পারে, চীনাভাষা শব্দের সমষ্টি নয়, শব্দচিত্রের সাহায্যে গঠিত। কাঙ্‌হি এই ভাষার এক অভিধান প্রণয়ন করালেন। এই বিরাট অভিধানে ছিল চল্লিশ হাজারেরও উপর শব্দচিত্র; বহুসংখ্যক দৃষ্টান্তসহকারে এইসব শব্দচিত্রের অর্থ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

 কাঙ্‌হির উৎসাহের ফলে আর-একটি জিনিষ রচিত হয়েছিল, একটি বিশাল সচিত্র বিশ্বকোষ, বহুশত খণ্ডে বিভক্ত। বইখানি একাই ছিল পুরো একটা লাইব্রেরি। এ বইতে পৃথিবীর যাবতীয় বিষয়ের আলোচনা করা হয়েছিল, কিছু বাদ দেওয়া হয় নি। কাঙ্‌হির মৃত্যুর পরে এই বইখানি তামার পাতের সাহায্যে মুদ্রিত হয়েছিল।

 তৃতীয় জিনিষটি হল, চীনাভাষার সমগ্র সাহিত্যের একটি তুলনামূলক আলোচনা; অর্থাৎ একটি অভিধান, যাতে শব্দ এবং বাক্যসমষ্টি চয়ন করে পাশাপাশি রেখে তুলনা করা আছে। এই বইখানিও ছিল একটা অসাধারণ জিনিষ, কারণ এর রচনার জন্যে সমগ্র সাহিত্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ পাঠ প্রয়োজন। কবি, ঐতিহাসিক এবং প্রবন্ধকারদের রচনা থেকে পূর্ণ রচনা অনেক স্থলে উদ্ধৃত করে দেওয়া ছিল। কাঙ্‌হির আরও অনেক সাহিত্যবিষয়ক কাজের নিদর্শন আছে, কিন্তু লোককে বিস্মিত ও স্তম্ভিত করার পক্ষে এই তিনটিই যথেষ্ট। একমাত্র অক্সফোর্ড ইংরেজী অভিধান (Oxford English Dictionary)—যার রচনা বহু পণ্ডিতের পঞ্চাশবর্ষব্যাপী পরিশ্রমে কয়েক বছর আগে সমাপ্ত হয়েছে—ছাড়া আধনিক যুগে এমন কিছু নেই যা কাঙ্‌হির যুগের এই তিনটি বইয়ের সঙ্গে তুলনীয়।

 কাঙ্‌হির মনোভাব খৃষ্টধর্ম ও খৃষ্টান মিশনারিদের প্রতি অনকূল ছিল। বৈদেশিক বাণিজ্যে তাঁর উৎসাহ ছিল এবং চীনের সমস্ত বন্দর তিনি এই কাজের জন্যে উন্মুক্ত করে দেন। কিন্তু শীগগিরই তিনি আবিষ্কার করলেন যে, ইউরোপীয়রা তাঁর আনুকূল্যের ব্যভিচার করছে, এবং তাদের দাবিয়ে রাখা প্রয়োজন। তিনি সন্দেহ করলেন (নেহাত অকারণে নয়) যে, মিশনারিরা নিজেদের দেশের সাম্রাজ্যবাদীদের দেশজয়ের সুবিধের জন্যে ষড়যন্ত্র করছে। এতে খৃষ্টধর্মের প্রতি তাঁর উদার মনোভাবের অন্তর্ধান ঘটল। ক্যাণ্টনের জনৈক চীনা সেনানীর কাছ থেকে প্রাপ্ত এক সংবাদে তাঁর সন্দেহ দঢ়তর হল। ফিলিপাইন ও জাপানে ইউরোপীয় বণিকসমাজ এবং মিশনারিদের সঙ্গে তাদের স্ব-স্ব রাজসরকারের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ এই পত্র থেকে জানা গেল। এই সেনানী পরামর্শ দিলেন যে, বৈদেশিক ষড়যন্ত্র এবং আক্রমণ থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে হলে বৈদেশিক বাণিজ্য সীমাবদ্ধ রাখতে হবে এবং খৃষ্টধর্মের প্রচলন বন্ধ করতে হবে।

 এই রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছিল ১৭১৭ সালে। প্রাচ্যদেশসমূহে বৈদেশিক ষড়যন্ত্র, এবং যে উদ্দেশ্যে এইসব দেশসমূহের কোনো-কোনোটিতে বৈদেশিক বাণিজ্য ও খৃষ্টধর্মের প্রচার সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল, সে সম্বন্ধে এতে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। এই ধরনেরই একটা ব্যাপার ঘটেছিল জাপানে, যার ফলে সে দেশে নিষেধাজ্ঞা প্রচারিত হয়। অনেক সময়ে বলা হয়ে থাকে, চীন এবং অপরাপর প্রাচ্যদেশ অনগ্রসর, অজ্ঞ এবং বৈদেশিকদের উপরে বিদ্বেষবশত তারা শুধু বাণিজ্যে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। প্রকৃত প্রস্তাবে ইতিহাসের পর্যালোচনায় এই সত্যই প্রকাশ পেয়েছে যে, ভারত চীন এবং অন্যান্য দেশের মধ্যে অতি প্রাচীন যুগ থেকেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বিদেশী এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রতি বিদ্বেষের প্রশ্নই ওঠে না। এমনকি বহুকাল যাবৎ ভারত বহু বৈদেশিক ব্যবসায়ে নিযুক্ত ছিল। যখন থেকে পরিষ্কার বোঝা গেল যে, বৈদেশিক বণিকসঙ্ঘ হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপের রাজ্যবিস্তারের উপায় তখনই তাদের সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে দেখা হতে লাগল।

 ক্যাণ্টনের সেনাপতির রিপোর্ট আলোচনা করে চীনা রাষ্ট্রপরিষদ তা অনুমোদন করলেন। ফলে কাঙ্‌হি যথোপযুক্ত বিধি অবলম্বন করে বৈদেশিক বাণিজ্য ও মিশনারিদের কর্মতৎপরতা সীমাবদ্ধ করার আদেশ দিলেন।

 এবার চীন ছেড়ে তোমাকে খানিকক্ষণের জন্যে এশিয়ার উত্তরে সাইবেরিয়ায় নিয়ে গিয়ে সেখানে কী হচ্ছিল বলব। বিশাল সাইবেরিয়া পূর্বপ্রান্তে চীনদেশের সঙ্গে পশ্চিমে রাশিয়ার যোগসাধন করে। আমি বলেছি, চীনের মাঞ্চু-সাম্রাজ্য রাজ্যবিস্তারের পক্ষপাতী ছিল। চীন-সাম্রাজ্যে মাঞ্চুরিয়া তো ছিলই, তা ছাড়া এই সাম্রাজ্য মঙ্গোলিয়া ছাড়িয়ে আরও দূরে প্রসারিত হয়েছিল। রাশিয়াও গোল্ডেন হোর্ডের মঙ্গোলদের বিতাড়িত করে প্রবল প্রতাপশালী কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল, এবং সাইবেরিয়ার সমভূমি অতিক্রম করে পূর্বদিকে প্রসারিত হচ্ছিল। এই দুই সাম্রাজ্য এখন এসে সাইবেরিয়ায় মিলিত হল।

 এশিয়ায় মঙ্গোলদের দ্রুত অধোগতি এবং অবনতি ইতিহাসের একটি বিস্ময়কর ঘটনা। যারা একদিন ঝড়ের মতো এশিয়া ও ইউরোপের উপর দিয়ে বজ্রনাদে চলে গিয়েছিল, চেঙ্গিস ও তাঁর বংশধরদের নেতৃত্বে সেকালের পরিচিত পৃথিবীর অধিকাংশ জয় করেছিল, তারা বিস্মৃতিতে মিলিয়ে গেল। তৈমুরের অধীনে তাবা আবার উঠেছিল, কিন্তু তৈমরের সঙ্গে সঙ্গেই তার সাম্রাজ্য শেষ হয়ে গেল। তার পরে তার বংশের কেউ কেউ, যাদের নাম হল তাইমুরিদ কিছুদিন মধ্য-এশিয়ায় রাজত্ব করেছিল, এবং তাদের রাজসভায় একটি চিত্রাঙ্কনের বিশেষ রীতির অভ্যুদয় হয়েছিল। ভারতজয়ী বাবর ছিলেন একজন তাইমুরিদ। এসব তাইমুরিদ-রাজার অস্তিত্ব সত্ত্বেও সারা এশিয়ায়, রাশিয়া থেকে শুরু করে তাদের দেশ মঙ্গোলিয়া পর্যন্ত, মঙ্গোলজাতির জড়াবস্থা দেখা দিল এবং তাদের সমস্ত প্রাধান্য লোপ পেল। কেন যে এরকম হল তা কেউ জানে না। কেউ কেউ বলেন যে, জলবায়ুর পরিবর্তনই এই অধোগতির কারণ। অন্য কেউ অন্য কথা বলেন। যা হোক, পুরোনো যুগের দিগ্বিজয়ীরা এখন নিজেরাই চার দিক থেকে আক্রান্ত।

 মঙ্গোল সাম্রাজ্যের ধংসের পরে এশিয়া-অতিক্রমের স্থলপথসমূহ প্রায় দু শো বছর ধরে বন্ধ ছিল। ষোড়শ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে কিন্তু রুশরা স্থলপথ দিয়ে চীনে এক দূতসঙ্ঘ প্রেরণ করে। তারা চেয়েছিল মিঙ-সম্রাটদের সাথে কুটনৈতিক সম্বন্ধ-স্থাপন, কিন্তু সফল হয় নি। অল্পকাল পরে ইয়েরমাক নামে এক রুশজাতীয় দস্যু একদল কশাক সঙ্গে নিয়ে উরাল-পর্বত অতিক্রম করে সাইবির-নামক একটি ছোটো দেশ দখল করে। এই রাষ্ট্রের নামেই গোটা দেশের নাম হল সাইবেরিয়া।

 এ হল ১৫৮১ সালের ঘটনা, এবং সেই সময় থেকে রুশরা ক্রমাগত পূর্বদিকে যেতে লাগল এবং অবশেষে প্রায় পঞ্চাশ বছরে প্রশান্ত মহাসাগরে পৌঁছল। অতি শীঘ্রই চীনাদের সাথে আমুর উপতাকার তাদের বিরোধ বাধল এবং যুদ্ধে রুশদের পরাজয় ঘটল। ১৬৮৯ খৃষ্টাব্দে দুই দেশের মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হল, যাকে বলে নার্চিন্‌স্কের সন্ধি। রাজ্যের সীমারেখা স্থিরীকৃত হল এবং উভয়পক্ষের বাণিজ্যের বন্দোবস্ত করা হল। ইউরোপের কোনো দেশের সঙ্গে চীনের এই প্রথম সন্ধি। এই সন্ধির ফলে রাশিয়ার অগ্রগতি প্রতিহত হল, কিন্তু বিপুল পরিমাণে ক্যারাভান-বাণিজ্য গড়ে উঠল। এই সময় রুশ-জার ছিলেন পিটার দি গ্রেট, এবং তিনি চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ স্থাপনে উৎসুক ছিলেন। তিনি কাঙ্‌হির নিকট দুটি দুতসঙ্ঘ প্রেরণ করেন এবং পরে চীন-রাজসভায় স্থায়ীভাবে একটি দূতাবাসের প্রতিষ্ঠা করেন।

 অতি প্রাচীনকাল থেকে চীন বৈদেশিক দূতসঙ্ঘের আগমনে অভ্যস্ত। যতদূর মনে পড়ে আমার একটা চিঠিতে আমি লিখেছিলাম যে, রোমক সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস অ্যাণ্টনিয়াস খৃস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে এক দূতসঙ্ঘ প্রেরণ করেছিলেন। ১৬৫৬ সালে ওলন্দাজ ও রুশ দূতসঙ্ঘ চীন-রাজসভায় গিয়ে মোগল সম্রাটের রাজদূতদের দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁরা নিশ্চয় শাহজাহান কর্তৃক প্রেরিত হয়েছিলেন।