বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/চীনের সহস্র বৎসর
১১
চীনের সহস্র বৎসর
১৬ই জানুয়ারি, ১৯৩১
কারাপ্রাচীর ভেদ করে বাইরের জগতের খবর এখানেও এসে পৌঁচেছে—সে খবরে একদিকে যেমন মনে দুঃখ পাই অপরদিকে তেমনি গর্বে আনন্দে বুক ভরে ওঠে। শোলাপুরের লাঞ্ছনার কাহিনী আমরা শুনেছি। আবার সে সংবাদ শুনে দেশব্যাপী যে আন্দোলন হয়েছে তারও টুকরাটাকরা খবর আমরা পাচ্ছি। আমাদের ছেলেরা প্রাণ দিচ্ছে, হাজার হাজার লোক স্ত্রীপুরুষ-নির্বিশেষে বেপরোয়া লাঠির আঘাত সইছে—এসব কথা ভাবলে নিশ্চেষ্ট হয়ে এখানে চুপ করে বসে থাকা কঠিন হয়। কিন্তু এরও প্রয়োজন আছে—এতে আমাদের ভালোই হবে। আমার মনে হয়, প্রত্যেকেরই সেই সুযোগ আসছে যখন সকলকে চরম পরীক্ষার মুখে দাঁড়াতে হবে। ইতিমধ্যে দেশবাসীর সাহস দেখে মনে খুব আনন্দ পাচ্ছি। এগিয়ে গিয়ে তারা দুঃখকে বরণ করছে। শত্রু যত আঘাত করছে এদের শক্তি তত বাড়ছে, দ্বিগুণ উৎসাহে শত্রুকে প্রতিরোধ করছে।
প্রতিদিনের খবর এসে মনকে এত দোলা দিচ্ছে যে অন্য কোনো কথা ভাবা কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু মিথ্যে ভেবে ভেবে কিচ্ছু লাভ হয় না। সত্যিকারের কাজ করতে হলে মনকে সংযত করতে হবে। কাজেই এসব দুশ্চিন্তা ভুলে গিয়ে মনটাকে বরং খানিকক্ষণের জন্য চালান দেওয়া যাক পুরাকালের জগতে।
যাওয়া যাক এক্কেবারে চীন দেশে। প্রাচীনকালের ইতিহাসে ভারতবর্ষ আর চীন দেশ যেন দুই ভগিনী। চীন এবং পূর্ব-এশিয়ার অন্যান্য দেশ—এই যেমন জাপান, কোরিয়া, ইন্দোচীন, শ্যাম এবং ব্রহ্মদেশ—আর্যদের বাসস্থান নয়। ওসব দেশে মঙ্গোলীয় জাতির বাস।
প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে কিংবা তারও আগে এক দল লোক চীন দেশ আক্রমণ করেছিল। এরা এসেছিল মধ্য-এশিয়া থেকে। সভ্যতার দিক থেকে এরা অনেক বেশি অগ্রসর ছিল। এরা কৃষিবিদ্যা জানত এবং গোপালন-মেষ পালনেও অভ্যস্ত ছিল। এরা তখন চমৎকার বাড়িঘর তৈরি করতে শিখেছে, এদের সমাজব্যবস্থাটিও ছিল সুশৃঙ্খল। প্রথমটায় এসে এরা হোয়াংহো বা পীত নদীর ধারে বসবাস শুরু করল, আস্তে আস্তে সেখানে একটি ছোটো রাষ্ট্র গড়ে উঠল। তার পরে কয়েক শো বছর ধরে ওরা ক্রমে চীন দেশের চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। ইতিমধ্যে তাদের শিল্পকলারও অনেক উন্নতি হয়েছে। চীন দেশের লোকেরা প্রধানত ছিল কৃষিজীবী। আর তাদের মধ্যে যারা ছিল দলের মোড়ল তারা অনেকটা সেই প্যাট্রিয়ার্ক বা সমাজপতিদের মতো, যাদের কথা আমি আগের কয়েকটি চিঠিতে তোমাকে বলেছি। এর ছ-সাত শো বছর পরে অর্থাৎ এখন থেকে চার হাজার বছরেরও আগে ইয়াও বলে একজন লোকের উল্লেখ পাওয়া যায়—ইনি নিজেকে সম্রাট বলে অভিহিত করতেন। কিন্তু মস্ত বড়ো নাম নিলে কী হবে, আসলে তিনি ছিলেন সেই সমাজপতিরই শামিল। মিশর কিংবা মেসোপটেমিয়ার সম্রাট বলতে আমরা যা দেখেছি ইনি তার
কিছুই ছিলেন না। চীন দেশের লোকেরা প্রধানত কৃষিকাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকত, কাজেই বহুকাল পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো শাসনপ্রণালী ও দেশে গড়ে ওঠে নি।
গোড়ার দিকে লোকেরা নিজেদের মধ্যে একজনকে সমাজপতি নির্বাচিত করে নিত, কিন্তু ক্রমে সমাজপতির পদ হয়ে গেল বংশানুক্রমিক, অর্থাৎ পিতা থেকে পুত্রে বর্তাতে লাগল। চীন দেশেও তাই ঘটেছিল। অবশ্য ইয়াও-এর মৃত্যুর পরে তাঁর ছেলে তাঁর স্থলাভিষিত হয় নি। দেশের মধ্যে যাকে তিনি যোগ্যতম বাক্তি মনে করেছিলেন তাকেই সম্রাট পদে মনোনীত করে গিয়েছিলেন। কিন্তু অল্পকালমধ্যেই রাজপদ বংশানুক্রমিক হয়ে ওঠে এবং গোড়ার দিকে চার শো বছরেরও বেশি কাল কোন্-এক সিয়া-বংশ চীন দেশে রাজত্ব করে। এ বংশের সর্বশেষ রাজা ছিলেন খুব অত্যাচারী। তার ফলে প্রজারা বিদ্রোহী হয়ে তাঁকে রাজ্যচ্যুত করে। এর পরে শাঙ বা ঈন্ নামে আর-একটি বংশ রাজ্যভার গ্রহণ করে। এদের রাজত্ব চলেছিল প্রায় সাড়ে ছশো বছর।
দু-চার কথায় এবং অল্প কটি ছত্রের মধ্যেই আমি চীন দেশের সহস্রাধিক বৎসরের ইতিহাস শেষ করে দিয়েছি। খুব অদ্ভুত লাগছে, না? ইতিহাসের মধ্যে যে বিশাল কালের বিস্তার তাতে এ ছাড়া আর উপায় কী? কিন্তু এ কথা মনে রাখবে যে ইতিহাসটা যতই সংক্ষেপে বলি না কেন, কালের দৈর্ঘ্যটাকে তাই বলে ছেঁটে সংক্ষেপ করি নি; সেটা হাজার বা এগারো শো বছরই আছে। আমাদের কাছে সময়ের পরিমাপ হচ্ছে দিন মাস বছর দিয়ে। কাজেই বেশির কথা ছেড়ে দাও, বোধকরি এক শো বছর সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা করাই তোমার পক্ষে কঠিন। এই-যে তোমার মাত্র তেরো বছর বয়স হয়েছে তা-ই তোমার কাছে রীতিমতো সুদীর্ঘকাল বলে মনে হয়, তাই না? তা ছাড়া, এক-একটি বছর যায় আর তুমি মাথায় কতখানি বড়ো হয়ে ওঠো! তা হলেই দেখো, এমনিতরো ইতিহাসের, হাজারটা বছরের কথা কল্পনা করা কি সহজ ব্যাপার? এ যে দীর্ঘাতিদীর্ঘ কাল! যুগের পর যুগ আসছে যাচ্ছে, ক্ষুদ্র শহর মহানগরী হয়ে উঠছে আবার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে, ঠিক সেই স্থানেই আবার নূতন শহরের পত্তন হচ্ছে। কেবল গত হাজার বছরের ইতিহাসের কথাই ভেবে দেখো-না, তা হলেই কালের দৈর্ঘ্য সম্বন্ধে তোমার একটু ধারণা হবে। গত হাজার বছরে পৃথিবীতে যে পরিবর্তন হয়েছে, ভাবতে গেলে সত্যি অবাক হতে হয়।
এই চীন দেশের ইতিহাস বাস্তবিকই বিস্ময়কর। কত প্রাচীনকাল থেকে সংস্কৃতির ধারা বহন করে চলেছে এই ইতিহাস, আর কত রাজবংশের ইতিবৃত্ত—তার কোনোটি চলেছে পাঁচ শো বছর ধরে, কোনোটি বা আট শো বছরেরও বেশি।
আমি অতি সংক্ষেপে যে এগারো শো বছরের ইতিহাস বলেছি, মনে রাখবে সে সময়টাতে চীন দেশের সভ্যতার বিকাশ হয়েছে অতিশয় ধীর গতিতে। ক্রমে ক্রমে সমাজপতির শাসন গেল উঠে, দেখা দিল কেন্দ্রীয় শাসন, সৃষ্টি হল সুনিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রের। সেই অতিপ্রাচীন কালেই কিন্তু চীন দেশের লোকেরা লিখনপ্রণালী জানত। কিন্তু তুমি নিশ্চয় জানো, আমাদের ভাষায় কিংবা ইংরেজি বা ফরাসি ভাষায় যে লিখনপ্রণালী—চীনা ভাষার লিখনপ্রণালী তার থেকে স্বতন্ত্র। ও ভাষায় কোনো অক্ষরমালা নেই। ওরা লেখে ছবি কিংবা সাংকেতিক চিহ্নের সাহায্যে।
ছ শো চল্লিশ বছর রাজত্ব করবার পর প্রজারা বিদ্রোহ করে শাঙ-বংশকে সিংহাসনচ্যুত করে। এবারে যাঁরা ক্ষমতা লাভ করলেন তাঁরা চাউ-বংশ বলে খ্যাত। শাঙ-বংশের চাইতে এরা আরও দীর্ঘকাল রাজত্ব করেছিলেন। এই চাউদের রাজত্বকালেই সুনিয়ন্ত্রিত চীন রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। কন্ফুসিয়স এবং লাওসে নামে বিখ্যাত জ্ঞানী দার্শনিকদের আবির্ভাবও এই সময়েই হয়েছিল। পরে এদের কথা আরও বলব।
শাঙ-রাজারা যখন বিতাড়িত হলেন তখন কিৎসি-নামক এ’দের একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী চাউ-রাজাদের বশ্যতা স্বীকার না করে বরং দেশত্যাগী হওয়াই শ্রেয় মনে করলেন। পাঁচ হাজার অনুচর সঙ্গে করে তিনি চীন দেশ ছেড়ে কোরিয়া দেশে চলে গেলেন। তিনি গিয়ে দেশের নামকরণ করলেন ‘চো-শেন’ বা প্রভাত-শান্তির দেশ। কোরিয়া বা চো-শেন চীন দেশের পূর্বদিকে অবস্থিত, এই ভেবেই কিৎসি পূর্বাচলের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বোধহয় ভেবেছিলেন এর পূর্বদিকে আর কোনো দেশ নেই, তাই ঐ নাম দিয়েছিলেন। এই কিৎসির আগমনকাল থেকেই কোরিয়া ইতিহাস শুরু—আর তাও ঘটেছিল খৃষ্টজন্মের এগারো শো বছর আগে। কিৎসি যখন এই নূতন দেশে এলেন তখন তাঁর সঙ্গে আনলেন চীনাদের শিল্পকলা, তাদের গৃহনির্মাণপ্রণালী, কৃষিবিদ্যা এবং রেশমশিল্প। কিৎসির পরে আরও সব চীনা দলে দলে এসে এ দেশে বসবাস শুরু করে দিলে। কিৎসির বংশধরেরা চো-শেনে ন শো বছরেরও বেশি কাল রাজত্ব করেছিল।
অবশ্য চো-শেন পূর্বাঞ্চলের শেষ প্রান্তে অবস্থিত নয়। তারও পূর্বে রয়েছে জাপান। কিন্তু কিৎসি যখন চো-শেনে আগমন করেন তখন জাপানের অবস্থা কী ছিল আমরা জানি নে। জাপানের ইতিহাস চীন দেশের ইতিহাসের মতো অত প্রাচীন নয়, এমনকি কোরিয়া বা চো-শেনের মতোও নয়। জাপানিরা বলে, তাদের প্রথম সম্রাটের নাম জিম্মু টেনো, খৃষ্টজন্মের ছ-সাত শো বছর আগে তিনি রাজত্ব করেছিলেন। জাপানিদের মতে তিনি নাকি সূর্যদেবীর বংশধর। ও দেশে আবার সূর্যকে দেবতা না বলে দেবী বলা হয়। জাপানের বর্তমান সম্রাট নাকি ঐ জিম্মু টেনোরই বংশধর, কাজেই ইনিও সূর্য বংশসম্ভূত।
তুমি বোধহয় জানো আমাদের দেশের রাজপুতেরাও এমনিভাবে চন্দ্রসূর্যের সঙ্গে সম্পর্ক পাতিয়েছে। তাদের মধ্যে প্রধান দুটি বংশের একটি হল সূর্যবংশী আর একটি চন্দ্রবংশী। উদয়পুরের মহারাণা হলেন সূর্যবংশীদের কুলপতি। তিনি বলেন, প্রাচীনতম কাল থেকে তাঁদের এই বংশ চলে আসছে। আমাদের এই রাজপুতরা সত্যি এক আশ্চর্য জাত। এদের শৌর্যবীর্যের কাহিনী বলে শেষ করা যায় না।