বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/চীনে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা

উইকিসংকলন থেকে

১১৮

চীনে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা

৩০শে ডিসেম্বর, ১৯৩২

 আমরা দেখেছি, জাপানের হাতে রাশিয়ার পরাজয়ে এশিয়ার সমস্ত দেশ আনন্দিত এবং গর্বিত হয়ে উঠেছিল। অল্পদিনের মধ্যেই কিন্তু এর ফল দেখা গেল; জগতের যুদ্ধকামী সাম্রাজ্যবাদী জাতিদের ক্ষুদ্র দলে আর-একটি সভ্য বাড়ল। এর প্রথম কোপ পড়ল কোরিয়ার উপর। আপানের অভ্যুত্থান অর্থই হল কোরিয়ার পতন। নূতন করে পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করবার পর থেকেই জাপান জেনে রেখেছিল, কোরিয়া এবং কিছু-পরিমাণে মাঞ্চুরিয়া তারই সম্পত্তি। মুখে অবশ্য সে বারবার ঘোষণা করেছে চীনের অখণ্ডতাকে সে ক্ষুণ্ণ করবে না, কোরিয়ার স্বাধীনতায়ও হস্তক্ষেপ করবে না। এটা সাম্রাজ্যবাদী জাতিদের একটা অপূর্ব কায়দা, অন্যকে যখন লুঠ করে নিতে থাকে তখনও তারা বড়ো গলায় বলে, তাদের প্রতি তার সদভিপ্রায়ের অন্ত নেই; মানুষকে হত্যা করতে করতেই তারা জীবনের জয়গান করে থাকে।

 জাপানও গম্ভীরমুখে বলতে লাগল, কোরিয়ার দিকে সে হাত বাড়াবে না, এবং তার সঙ্গে সঙ্গেই কোরিয়া দখল করবার জন্যে তার পুরোনো চাল চালতে শরু করল। চীন এবং রাশিয়ার সঙ্গে তার যেসমস্ত যুদ্ধ হল তার সমস্তগুলোরই প্রধান লক্ষ্য ছিল কোরিয়া আর মাঞ্চুরিয়া। এক-পা এক-পা করে সে এগিয়ে এসেছে, চীন অকেজো হয়ে পড়েছে, রাশিয়াও হেরে গেল, এবার জাপানের পথ খোলা।

 সাম্রাজ্যবিস্তারের পথে চলতে উচিত-অনুচিতের প্রশ্ন নিয়ে জাপান কখনও মাথা ঘামায় নি। পরের দেশ কেড়ে নেবার কাজটি সে খোলাখুলিই করে চলল, তার উপরে ঈষৎ একটু অবগুণ্ঠন পর্যন্ত রাখল না। অনেককাল আগে, ১৮৯৪ সনে, অর্থাৎ চীন-যুদ্ধের ঠিক পূর্বমূহুর্তে, জাপানিরা জোর করে কোরিয়ার রাজধানী সিওউল-শহরের রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করেছিল, রানীকে ধরে নিয়ে বন্দী করে রেখেছিল। তাঁর অপরাধ, তিনি জাপানিদের আদেশ পালন করতে রাজি হন নি! রুশ-যুদ্ধের পরে ১৯০৫ সনে, জাপান সরকারের জুলুমে কোরিয়ার রাজা বাধ্য হয়ে সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করলেন; তাঁর দেশের স্বাধীনতা লোপ করে দিয়ে জাপানের কর্তৃত্ব মেনে নিলেন। এতেও কিন্তু জাপানের খাঁই মিটল না। পাঁচটি বছরও যেতে না যেতে এই হতভাগ্য রাজাকে একেবারেই সিংহাসনচ্যুত করে কোরিয়াকে জাপান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হল। এটা ১৯১০ সনের কথা। দীর্ঘকাল—তিন হাজার বছরেরও বেশি দিন স্বাধীনভাবে থেকে এসে অবশেষে কোরিয়া রাজ্যের মৃত্যু ঘটল। এই-যে রাজাটিকে এইভাবে সিংহাসনচ্যুত করা হয়েছিল, এঁদেরই বংশ পাঁচ শো বছর আগে যুদ্ধ করে মঙ্গোলদের তাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু চীনের মতো কোরিয়ারও জীবনপ্রবাহ প্রাণহীন পঙ্কিল হয়ে উঠেছিল, তার প্রায়শ্চিত্তও তাকে করতে হল।

 কোরিয়ার প্রাচীন নাম ছিল চো-সেন বা প্রভাতশান্তির দেশ; আবার তাকে সেই নাম দেওয়া হল। জাপানিরা দেশে কিছু কিছু আধুনিক সংস্কার ও আমদানি করল, কিন্তু কোরিয়াবাসীদের আত্মচেতনাকে তারা নির্মমভাবে পিষে মেরে ফেলল। বহু বছর ধরে কোরিয়ার লোকেরা স্বাধীনতা ফিরে পাবার চেষ্টা চালাল, বহুবার বিদ্রোহ করল। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়ো বিদ্রোহ হয় ১৯১৯ সনে। জিতবার কোনো আশাই নেই, তবু কোরিয়ার প্রজারা, বিশেষ করে তরুণতরুণীরা, বীরের মতো লড়াই করতে লাগল। একবার কোরিয়ার একটি স্বাধীনতাকামী দল জাপানিদের অগ্রাহ্য করে প্রকাশ্যভাবেই স্বাধীনতা ঘোষণা করে; শোনা যায়, তারা নাকি তৎক্ষণাৎ পুলিশকে টেলিফোন করে তাদের এই কাজের কথা জানিয়ে দিয়েছিল! এইভাবে জেনেশুনেই তারা তাদের আদর্শের জন্যে নিজেদের বলি দিচ্ছিল। এমন ধীরেসুস্থে এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে তারা কাজ করত, দেখে অনেকসময় মনে হয় সে যেন ঠিক বাপুর কর্ম পদ্ধতিরই প্রতিধ্বনি। জাপানিরা যেভাবে এই কোরিয়ানদের দমন করল, ইতিহাসে সেটি একটি অত্যন্ত করুণ এবং মসীলিপ্ত অধ্যায়। শুনে তোমার আনন্দ হবে, এই যুদ্ধে কোরিয়ার তরুণী মেয়েরা খুব বড়ো অংশ গ্রহণ করেছিল, তাদের অনেকে তখন সদ্য কলেজ থেকে বেরিয়ে এসেছে।

 এখন আবার চীনের কথা বলা যাক। বক্সার বিদ্রোহ দমন এবং ১৯০১ সনের পিকিঙ-সন্ধির কথা বলেই, হঠাৎ তার কথা ছেড়ে চলে এসেছিলাম। চীনের তখন অপমানের আর বাকি রইল না, আবার দেশে সংস্কারের কথা উঠল। বৃদ্ধা সম্রাট-মাতা পর্যন্ত বোধ হয় বুঝলেন, এবার ঐরকমের কিছু না করলে আর চলে না। রুশ-জাপান যুদ্ধের সময় চীন নিরপেক্ষ থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে, যদিও যুদ্ধটা হচ্ছিল চীনেরই এলাকার মধ্যে, মাঞ্চুরিয়াতে। জাপানের জয় দেখে চীনের সংস্কারপন্থীদের উৎসাহ বাড়ল। শিক্ষার ব্যবস্থাকে আধুনিক পদ্ধতিতে ঢেলে সাজা হল; আধুনিক বিজ্ঞান শেখবার জন্যে বহু ছাত্রকে ইউরোপ আমেরিকা ও জাপানে পাঠানো হল। এতদিন সরকারি কর্মচারী নিয়োগ করা হত লেখাপড়ার পরীক্ষা নিয়ে; সে প্রথা তুলে দেওয়া হল। এই আশ্চর্য প্রথাটি ঠিক চাঁনের প্রকৃতির অনুযায়ী বস্তু; দু হাজার বছর ধরে, সেই হুন বংশের রাজত্বকাল থেকে এই প্রথা চীনে চলে এসেছে। কবে একদা এর সার্থকতা ছিল সে দিন বহুকাল পার হয়ে গেছে; এখন এটা শুধু চীনের অগ্রগতিকেই বাধা দিচ্ছিল—কাজেই এটা তুলে দেওয়াতে চীনের ভালোই হল। তবু কিন্তু একহিসেবে এটা ছিল দীর্ঘকালের একটা বিস্ময়কর বস্তু। জীবন সম্বন্ধে চীনাদের দৃষ্টিভঙ্গিটাই এর মধ্যে প্রকাশ পেয়েছিল; এশিয়া এবং ইউরোপের অধিকাংশ দেশের মতো তাদের সে দৃষ্টিভঙ্গি সামন্তপন্থীও নয়, পুরোহিতপন্থীও নয়; তার প্রতিষ্ঠা ছিল যুক্তির উপরে। চীনাদের উপরে চিরকালই ধর্মের প্রভাব সমস্ত জাতির চেয়ে কম; অথচ তবুও তারা নীতি ও সংযম-প্রধান এই জীবনযাত্রার রীতিকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে এসেছে। কোনো ধর্ম প্রধান জাতিও তেমন পারে নি। তাদের সংকল্প ছিল সমাজকে যুক্তিবাদী করে গড়ে তুলবে। কিন্তু প্রাচীন পুরাণের চতুঃসীমার মধ্যে তাকে আটকে রাখতে গিয়েই তারা প্রয়োজনমতো পরিবর্তনগুলো ঘটিয়ে উঠতে পারল না, ফলে সমস্ত বস্তুটাই হয়ে উঠল জড়, প্রাণহীন। ভারতে আমাদের, চীনাদের এই যুক্তিবাদ থেকে অনেক শিখে নেবার আছে; আমরা এখনও জাতিভেদ, ধর্মের গোঁড়ামি, পুরোহিতের বুজরুকি আর সামন্তযুগের মতামতের নাগপাশে বন্ধ হয়ে রয়েছি। চীনের প্রসিদ্ধ ঋষি কন্‌ফুসিয়স তাঁর শিষ্যদের প্রতি একটি সতর্কবাণী উচ্চারণ করে গেছেন, সেটি স্মরণ করে রাখবার মতো: “অতীন্দ্রিয়কে নিয়ে যারা কাজ-কারবারের ভান করে তাদের সঙ্গে কখনও সম্পর্ক রেখো না। অতীন্দ্রিয়বাদ যদি দেশে একবার আসন গাড়তে পারে, তার ফল হবে ভয়ংকর সর্বনাশ।” দুর্ভাগ্য আমাদের এ দেশে এখনও অসংখ্য লোক মাথার টিকি, চুলের জটা, লম্বা দাড়ি, কপালে হিজিবিজি-চিহ্ন বা গেরুয়া পোশাকের জোরে অতীন্দ্রিয়ের প্রতিনিধি বলে পরিচয় দিচ্ছে এবং সাধারণ লোককে বোকা বানিয়ে শোষণ করে নিচ্ছে।

 চীনের ছিল প্রাচীনকালের যুক্তিবাদ, ছিল সংস্কৃতি। কিন্তু আধুনিক জগতের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে নি। বিপদে যখন সে পড়ল, তার প্রাচীন প্রতিষ্ঠানগুলি কোনো কাজেই এল না। চতুর্দিকের ঘটনাপ্রবাহ তার বহু সন্তানের মনে কাজের প্রেরণা জাগিয়ে তুলেছিল; আলোর সন্ধানে এরা নিষ্ঠার সঙ্গে অন্য দেশের শিষ্যত্ব গ্রহণ করল। এদের চাপে পড়ে বৃদ্ধা সম্রাট-মাতা পর্যন্ত জেগে উঠলেন; প্রজাদের একটা নূতন শাসনতন্ত্র এবং স্বায়ত্তশাসন দিতে প্রস্তুত হলেন, এবং অন্যান্য দেশের শাসনপ্রণালী জেনে আসবার জন্যে একটি কমিশনকে বাইরের সমস্ত দেশে পাঠিয়ে দিলেন।

 এতদিনে বৃদ্ধা সম্রাট মাতা-শাসিত চীন সরকার সচল হয়ে উঠল। কিন্তু প্রজারাও আরও বেশি বেগে এগিয়ে চলেছিল। অনেক দিন আগে, ১৮৯৪ সনেই, ডক্টর সুন-ইয়াৎ-সেন বলে একজন চীনবাসী ‘চীনা নবজাগরণ-সংঘ’ স্থাপন করেছিলেন। বিদেশী জাতিরা চীনের উপরে নানারকমের অন্যায় এবং একপক্ষ-টানা সন্ধি চাপিয়ে দিচ্ছিল, চীনারা এগুলোকে বলত ‘অসমান সন্ধি’। এই সমস্ত সন্ধির প্রতিবাদে বহু লোক তাঁর এই সংঘে এসে যোগ দিল। সংঘটি ক্রমে বেড়ে উঠল, দেশের যুবশক্তি এর দিকে আকৃষ্ট হল। ১৯১১ সনে সংঘের নাম বদলে করা হল কুওমিন্‌টাঙ—প্রজাদের জাতীয়দল: এইটিই হল চীনবিপ্লবের কেন্দ্র ও সংগঠক। এই আন্দোলনের সৃষ্টিকর্তা ডাঃ সুন আদর্শ হিসেবে ধরলেন আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রকে। তাঁর লক্ষ্য ছিল প্রজাতন্ত্র; ইংলণ্ডের মতো প্রজাধীন রাজতন্ত্র নয়, জাপানের মতো সম্রাট-পূজা তো নয়ই। চীনারা কোনো দিনই তাদের সম্রাটকে দেবতা বানিয়ে তোলে নি; আর তখন যে রাজবংশ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিল তারা জাতে মোটে চীনাই নয়, তারা মাঞ্চু। প্রজারাও তখন দারুণরকম মাঞ্চু-বিদ্বেষী। প্রজাদের মধ্যে এই বিদ্রোহের লক্ষণ দেখেই সম্রাট-মাতা শাসন-সংস্কার করতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু আগামী শাসন-সংস্কার সম্বন্ধে ঘোষণা করবার অল্প দিন পরেই তিনি হঠাৎ মারা গেলেন। যে চীন-সম্রাটকে তিনিই সিংহাসনচ্যুত করেছিলেন—আশ্চর্যের কথা—সম্রাজ্ঞীর মৃত্যুর চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই তাঁরও মৃত্যু হল। ১৯০৮ সনের নভেম্বর মাসে এঁদের মৃত্যু হয়। এবার নামে সম্রাট হলেন একটি নবজাত শিশু।

 আবার দেশে তুমল কোলাহল উঠল, ‘ব্যবস্থাপক সভা’ ডাকা হোক। মাঞ্চু-বিদ্বেষ আর রাজ-বিদ্বেষও বেড়ে গেল। বিপ্লবীদের শক্তি বাড়তে লাগল। তখন এদের রুখবার মতো শক্তিমান লোক একজনমাত্র ছিলেন, ইনি একটি প্রদেশের শাসনকর্তা, নাম য়ুআন শিহ্-কাই। অত্যন্ত ধুর্ত ধড়িবাজ লোক, কিন্তু দৈবক্রমে এঁরই হাতে ছিল চীনের একমাত্র আধুনিক ও শক্তিশালী সেনাবাহিনীটি; তার নাম ‘আদর্শ বাহিনী’। মাঞ্চু-শাসকরা একটি অত্যন্ত মূর্খের মতো কাজ করলেন; য়ুআনকে তাঁরা চটিয়ে দিলেন এবং বরখাস্ত করলেন। যে একটিমাত্র মানুষ তাঁদের কিছুকাল অন্তত রক্ষা করতে পারত সেও হাতছাড়া হয়ে গেল। ১৯১১ সনের অক্টোবর মাসে ইয়াংসি নদীর উপতাকার তীরবর্তী অঞ্চলে বিপ্লব শুরু হল; অল্প দিনের মধ্যেই মধ্য এবং দক্ষিণ-চীনের একটা বৃহৎ অংশ বিদ্রোহে যোগ দিল। ১৯১২ সনের নববর্ষের দিনে এই বিদ্রোহী প্রদেশগুলি নিয়ে একটি প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হল, তার রাজধানী হল নানকিঙ। ডাঃ সুন-ইয়াৎ-সেনকে এর প্রেসিডেণ্ট করা হল।

 য়ুআন শিহ্-কাই এতদিন চুপচাপ বসে দেখছিলেন; তাঁর মতলব, নিজের সুবিধা বুঝলেই রঙ্গমঞ্চে নেমে পড়বেন। রিজেণ্ট (শিশু সম্রাটের পিতা, ইনিই পুত্রের হয়ে রাজ্যশাসন করছিলেন) যেভাবে য়ুআনকে বরখাস্ত করলেন এবং তার পর আবার ডেকে ফিরিয়ে নিলেন, সে ভারি মজার গল্প। প্রাচীন চীনে সব-কিছুই করা হত যথাসাধ্য বিনয় এবং ভদ্রতা সহকারে। য়ুআনকে যখন বরখাস্ত করতে হবে, ঘোষণা করা হল, য়ুআনের একটা পা খোঁড়া হয়ে গেছে! এ কথাও অবশ্য সকলেই জানত যে, য়ুআনের পা বেশ আস্তই আছে, এটা তাঁকে পদচ্যুত করবার একটা চলিত রীতি মাত্র। য়ুআনও আবার এর পাল্টা শোধ নিলেন। দু বছর পরে, ১৯১১ সনে যখন সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আর যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠল, রিজেণ্ট ভয় পেয়ে য়ুআনকে ডেকে পাঠালেন। য়ুআনের তখনই ছুটে যাবার কোনো মতলবই নেই; আগে তাঁর সব শর্ত মেনে নেওয়া হোক, তার পর দেখা যাবে। আর তখন তো তিনিই বড়োকর্তা। রিজেণ্টকে তিনি জবাব পাঠালেন, অত্যন্ত দুঃখিত, ঠিক তখনই বাড়ি ছেড়ে যাত্রা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়; তাঁর খোঁড়া পা তখনও ভালো করে সারে নি, পথ চলবেন কী করে! এর এক মাস পরে রিজেণ্ট তাঁর সমস্ত শর্ত মেনে নিলেন, খবর পেয়েই য়ুআনের খোঁড়া পা আশ্চর্যরকম চট্‌পট্ সুস্থ হয়ে গেল।

 কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, বিপ্লবকে আর নিরস্ত করা সম্ভব নয়। য়ুআন বিচক্ষণ লোক, তিনি কোনো-এক পক্ষের সঙ্গেই যোগ দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ মাটি করতে চাইলেন না। শেষ পর্যন্ত তিনি মাঞ্চু-রাজাদের পরামর্শ দিলেন, সিংহাসন ছেড়ে দাও। প্রজাতন্ত্র তখন একেবারে সামনে এসে হাজির হয়েছে, ওদিকে আবার তাঁদের সেনাপতিও সরে দাঁড়ালেন, মাঞ্চু-রাজাদের আর গত্যন্তর রইল না। ১৯১২ সনের ১২ই ফেব্রুয়ারি সিংহাসন-ত্যাগের নির্দেশপত্র বার করা হল। এইভাবে চীনের রঙ্গমঞ্চ থেকে মাঞ্চু-রাজবংশ বিদায় গ্রহণ করলেন। আড়াই শো বছরেরও বেশিকাল ধরে এই বংশ চীনে রাজত্ব করেছে; সে রাজত্বের ইতিহাস মনে রাখবার মতো। এরূপ একটি চীনা প্রবাদবাক্য আছে: “তারা এসেছিল বাঘের মতো গর্জন করে, চলে গেল ঠিক সাপের লেজের মতো করে।”

 নবীন প্রজাতন্ত্রের রাজধানী হল নানকিঙ; আবার প্রথম মিঙ-সম্রাটের সমাধিস্তম্ভও ছিল এই নানকিঙ-শহরেই। সেই দিন, সেই ১২ই ফেব্রুয়ারি তারিখেই নানকিঙে একটি অদ্ভুত উৎসবের আয়োজন করা হল। এই উৎসবে প্রাচীন ও নবীনের একত্র মিলন হল, এদের পৃথক রূপও স্পষ্ট হয়ে দেখা দিল।

 প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেণ্ট সুন-ইয়াৎ-সেন তাঁর মন্ত্রীদের নিয়ে সেই সমাধিস্থলে চলে গেলেন, প্রাচীন পদ্ধতিতে সেখানে পূজা দিলেন। এই উপলক্ষে যে বক্তৃতা তিনি দিলেন তাতে বললেন, “প্রজাতান্ত্রিক শাসনবিধির একটি দৃষ্টান্ত আমরা পূর্ব-এশিয়াতে প্রতিষ্ঠা করছি। যারা সংগ্রাম করতে পারে, আজ হোক কাল হোক, সাফল্য তাদের হবেই। তবে আর আজ আমরা, আমাদের জয়লাভে বিলম্ব ঘটেছে বলে বিলাপ করব কেন?

 স্বদেশে ও নির্বাসনে, বহু বহু বৎসর ধরে ডাঃ সুন চীনের স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধ করে এসেছেন; অবশেষে এত দিনে বুঝি তাঁর সে চেষ্টা সফল হল! কিন্তু স্বাধীনতা বড়ো চঞ্চল বন্ধু। সাফল্য অর্জন করতে হলে আগে তার সম্পূর্ণ মূল্যটি চুকিয়ে দিতে হয়। অনেক সময় বৃথা আশা দেখিয়ে সে আমাদের বঞ্চনা করে; নানারকম দুঃখে কষ্টে ফেলে আমাদের পরীক্ষা করে নেয়; তার পর তবেই সে আমাদের হাতে ধরা দেবে। চীনের এবং ডাঃ সুনের যাত্রাপথ তখনও শেষ হয় নি। তার পরও অনেক বছর ধরে সেই নবীন প্রজাতন্ত্রকে প্রাণপণ লড়াই করে বেঁচে থাকতে হল; আজ একুশ বছর পরে যখন এত দিনে তার সাবালক হয়ে যাবার কথা, এখনও চীনের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে রয়েছে।

 মাঞ্চু-রাজারা সিংহাসন ত্যাগ করলেন, কিন্তু য়ুআন তখনও প্রজাতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি কী করবেন কেউ জানে না। উত্তর-চীন, প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ-চীন, সমস্তই তাঁর ইঙ্গিতে চলছে। ডঃ সুন চান, দেশে শান্তি আসুক, গৃহযুদ্ধে না বাধুক। তিনি নিজেকে একেবারেই মুছে ফেললেন, প্রেসিডেণ্টের পদ ত্যাগ করলেন, য়ুআন শিহ্-কাইকে প্রেসিডেণ্ট-পদে নির্বাচিত করিয়ে দিলেন। কিন্তু য়ুআন মোটেই প্রজাতান্ত্রিক নন। তাঁর মতলব হচ্ছে শক্তি সংগ্রহ করা, নিজেকে বড়ো করে তোলা। তিনি বিদেশী জাতিদের কাছ থেকে টাকা ধার করলেন, তাই দিয়ে যে প্রজাতন্ত্র তাঁকে সম্মান দেখিয়ে প্রেসিডেণ্টের পদে বরণ করেছে তাকেই ভেঙে দিতে চেষ্টা করলেন। ব্যবস্থাপক সভা ভেঙে দিলেন তিনি; কুওমিনটাঙকেও ছত্রভঙ্গ করে দিলেন। এর ফলে বিরোধ বাধল, দক্ষিণ-চীনে য়ুআন-এর বিরোধী একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হল, ডাঃ সুন তার নেতা। ডাঃ সুন তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে যে বিরোধ এড়াতে চেষ্টা করেছিলেন, সেই বিরোধই এসে উপস্থিত হল; বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হল তখনও চীনে পাশাপাশি দুটি রাষ্ট্র রয়েছে। য়ুআন সম্রাট হয়ে বসতে চেষ্টা করলেন; কিন্তু সে চেষ্টা বিফল হল। তার অল্পদিন পরেই তিনি মারা গেলেন।