বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/চীনে বিপ্লব ও প্রতি-বিপ্লব
১৭৭
চীনে বিপ্লর ও প্রতি-বিপ্লব
২৬শে জুন, ১৯৩৩
ইউরোপ আর তার ঝগড়াঝাঁটির কথা ছেড়ে চলো এবার আরেক দেশে যাই; সেখানে অশান্তি এর চেয়েও বেশি—সে হচ্ছে দূরপ্রাচ্য, চীন এবং জাপান। চীন সম্বন্ধে আমার শেষ চিঠিতে আমি বলেছি, চীনের নবজাত প্রজাতন্ত্রকে কী বিষম অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়েছিল। চীনের সভ্যতা পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম প্রাচীন এবং শ্রেষ্ঠ সভ্যতা; তার কাঁধের উপরে এই আধুনিক প্রজাতন্ত্রকে বসানো হল, যেন এক গাছের উপরে আরেক গাছের কলমের চারা। দেশটার তখন এমন অবস্থা, সে যেন ভেঙে শতখান হয়ে যাবে। টুচুন ও মহা-টুচুন ইত্যাদি নীতিজ্ঞানবর্জিত সেনানায়করা দেশে প্রবল হয়ে উঠছে; বহুক্ষেত্রে তাদের উৎসাহ এবং সাহায্য জোগাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী জাতিরা—চীনকে দুর্বল এবং আত্মকলহে বিভক্ত করে রাখতে পারলেই তাদের লাভ। এই টুচুনদের নীতি বলে কোনো বালাই ছিল না; এদের প্রত্যেকেরই একমাত্র লক্ষ্য ছিল তার নিজের স্বার্থসিদ্ধি। দেশের মধ্যে ছোটোখাটো গৃহযুদ্ধ সারাক্ষণই চলছিল, সে যুদ্ধে এরা ক্রমাগতই একবার এপক্ষ একবার ওপক্ষকে আশ্রয় করত। গরিব চাষিদের উপরে জুলুম করে এরা নিজেদের এবং নিজেদের সেনাবাহিনীর জীবিকার সংস্থান করে নিত। চীনের স্বাধীনতার জন্য সমস্ত জীবন ধরে সংগ্রাম করে গেলেন ডক্টর সুনইয়াৎ-সেন; দক্ষিণ চীনের ক্যাণ্টন শহরে তিনি যে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করলেন তার কথাও তোমাকে বলেছি।
দেশজুড়ে তখন চলেছে বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীদের অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রাধান্য; সাংহাই, হংকঙ প্রভৃতি বড়ো বড়ো বন্দর-শহরে এরা জুড়ে বসেছে, সেখান থেকে চীনের সমস্ত বৈদেশিক বাণিজ্যটাকে নিয়ন্ত্রিত করছে। ডক্টর সুন সত্যই বলেছিলেন, চীন হয়েছে এই বিদেশীদের অর্থনৈতিক উপনিবেশ। একজন মনিবের অধীন হয়ে থাকাই বিশ্রী ব্যাপার; একসঙ্গে বহু মনিব জুটলে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে ওঠে। শিল্পপ্রচেষ্টার দিক দিয়ে দেশটার উন্নতিবিধান এবং দেশে শৃঙ্খলা স্থাপন করবার জন্য ডক্টর সুন বিদেশীর কাছ থেকে সাহায্য পাবার চেষ্টা করলেন। বিশেষ করে তাঁর ভরসা ছিল আমেরিকা আর ব্রিটেনের উপর। কিন্তু এরা কেউই তাঁকে সাহায্য করল না, অন্য কোনো সাম্রাজ্যবাদী দেশও করল না। তাদের সকলেই চাইছে চীনকে শোষণ করতে, তার মঙ্গল-বিধান বা শক্তি বৃদ্ধিতে তাদের স্বার্থ নেই। দেখেশুনে ১৯২৪ সনে ডক্টর সুন সোভিয়েট রাশিয়ার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেন।
চীনের ছাত্রসম্প্রদায় এবং বুদ্ধিজীবী শ্রেণীদের মধ্যে কমিউনিজ্ম্ গোপনে এবং দ্রুতবেগে ছড়িয়ে পড়ছিল। ১৯২০ সনে একটি কমিউনিস্ট দল গঠিত হয়েছিল; কোনো সরকারই তাকে প্রকাশ্যভাবে কাজ করতে দিতে রাজি নয় অতএব গুপ্ত-সমিতি হিসাবেই সে কাজকর্ম চালাচ্ছিল। ডক্টর সুন মোটেই কমিউনিস্ট ছিলেন না; তিনি ছিলেন সমাজতন্ত্রবাদে মৃদু-বিশ্বাসী—তাঁর বিখ্যাত বই “জনগণের তিনটি নীতি” থেকেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু চীন এবং অন্যান্য প্রাচ্য দেশদের প্রতি সোভিয়েট সরকার যে উদার এবং সরল আচরণ করছিলেন তাই দেখে তিনি মুগ্ধ হলেন, এদের সঙ্গে কন্ধুত্ব স্থাপন করলেন। কয়েকজন রুশ পরামর্শদাতা নিযুক্ত করলেন তিনি; এঁদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন একজন অত্যন্ত কর্মদক্ষ বলশেভিক, তাঁর নাম বোরোদিন। বোরোদিনকে পেয়ে ক্যাণ্টনের কুওমিন্টাঙের অনেকখানি শক্তি বাড়ল; তিনি জনসাধারণের সমর্থনের সাহায্যে একটা শক্তিশালী জাতীয় দল সংগঠন করবার চেষ্টা করলেন। আগাগোড়া শুধু কমিউনিস্ট নীতি ধরেই কাজ করতে চেষ্ট করেন নি তিনি। দলের মূলগত জাতীয়তাবাদকে তিনি অক্ষুণ্ণ রাখলেন, তবে এখন কমিউনিস্টরাও কুওমিন্টাঙের সভ্য বলে গণ্য হতে পারল। জাতীয়তাবাদী কুওমিন্টাঙ আর কমিউনিস্ট দলের মধ্যে এইভাবে একটা বেসরকারি মৈত্রী গোছের ব্যাপার দাঁড়িয়ে গেল। কুওমিন্টাঙের রক্ষণপন্থী এবং ধনী সভ্যদের মধ্যে অনেকে, বিশেষ করে ভূস্বামীরা, কমিউনিস্টদের সঙ্গে এই মেলামেশাটা পছন্দ করতেন না। এদিকে আবার কমিউনিস্টদেরও মধ্যে অনেকের এটা পছন্দ নয়, কারণ এতে তাঁদের কর্মসূচীর পাখর্ব কমিয়ে আনা হচ্ছে, অন্যথায় যা তাঁরা করতে চাইতেন এমন অনেক কাজ এর দরুন তাঁরা করতে পারছেন না। অতএব এই মৈত্রীর বাঁধন বিশেষ শক্ত হল না; পরে একটা অত্যন্ত সংকটমুহূর্তের মাঝখানে এই মৈত্রী ভেঙে গেল, এবং তার ফলে চীনের একেবারে সর্বনাশ উপস্থিত হল—সেটা আমরা পরে দেখব। যাদের স্বার্থ পরস্পরবিরোধী এমন দুটি বা আরও বেশি শ্রেণীকে একই দলের মধ্যে একত্র ধরে রাখা সর্বত্রই কঠিন ব্যাপার। তবু এদের এই মৈত্রী যে-কদিন টিঁকে রইল ততদিন এর চমৎকার সমৃদ্ধি দেখা গেল, কুওমিন্টাঙ এবং ক্যাণ্টনসরকারেরও শক্তি অনেক বেড়ে গেল। প্রজাদের সংগঠন গড়তে উৎসাহ দেওয়া হল, দেশে দ্রুতগতিতে বহু সংগঠন গড়ে উঠল; শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নও অনেক তৈরি হল। জনসাধারণের এই সমর্থন পেয়ে ক্যাণ্টিনের কুওমিন্টাঙ সত্যকার শক্তি সঞ্চয় করল, আবার একে দেখেই ভূস্বামী নেতারা ভয় পেয়ে চুপ করে রইলেন, আরও কিছুকাল পরে এই ভয়েই তাঁরা দলটাকে ভেঙে দিলেন।
চীনের অবস্থা অনেক দিক দিয়েই ভারতবর্ষের অনুরূপ; অবশ্য দুই দেশের মধ্যে মূলত বহু প্রভেদও রয়েছে। চীন স্বভাবত কৃষিপ্রধান দেশ, অসংখ্য কৃষকের বাসভূমি। ধনিকতন্ত্রী শিল্প-কারখানা যাও আছে সে প্রধানত গোটা পাঁচ-ছয় বড়ো বড়ো শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তার কর্তৃত্বও রয়েছে বিদেশীদের হাতে। দেশের কোটি কোটি কৃষক আর প্রজা বিপুল পরিমাণ ঋণের চাপে একেবারে পিষে মারা যাচ্ছে। জমির খাজনার হার অত্যন্ত বেশি; এবং ভারতবর্ষেরই মতো চীনেও বছরের একটা দীর্ঘ সময় চাষিদের বাধ্য হয়েই অলস হয়ে বসে থাকতে হয়, কারণ তখন মাঠে তাদের করবার কাজ কিছু থাকে না। অতএব এই সময়টাকে কাজে লাগাবার এবং আয় বাড়াবার জন্য তাদের পক্ষে কুটির শিল্প অত্যন্ত দরকার। এখন অবশ্য বহু কুটির শিল্প দেশে গড়ে উঠেছে। বড়ো মহালের সংখ্যা অতি অল্প। বড়ো মহাল যেখানে-বা কেউ একটা গড়ে তোলে, দুদিন না যেতেই সেটা বহু উত্তরাধিকারীর মধ্যে ভাগ হয়ে টুক্রো টুক্রো হয়ে যায়। কৃষকদের মধ্যে প্রায় আধাআধি লোকের নিজস্ব ক্ষেত-খামার আছে, বাকি অর্ধেক লোক ভূস্বামীদের অধীনে চাকরি করে। চীনদেশ তাই অসংখ্য ছোটো ছোটো ক্ষেত-খামারে ভরা। চীনের কৃষকদের খ্যাতি আছে, তারা জমি থেকে যথাসম্ভব বেশি ফসল আদায় করে নিতে জানে—এই খ্যাতি বহু শত বৎসর ধরে চলে এসেছে। প্রত্যেকের যেটকু জমি আছে তার পরিমাণ অতি সামান্য, কাজেই বাধ্য হয়েই চিরদিন এদের সে জমি থেকে যথাসম্ভব বেশি ফসল তোলবার চেষ্টা করতে হয়েছে; অতএব তারা আশ্চর্য উদ্ভাবনী-বুদ্ধির পরিচয় দিত, খাটতও একেবারে নিদারুণ রকম। আধুনিক যুগে কৃষিকর্মে মানুষের শ্রম লাঘব করবার যে-সব কল-কায়দা ব্যবহার করা হয় সে-সব কিছুই তাদের ছিল না; এই জন্যই তাদের ফলের অনুপাতে যতটুকু খাটা দরকার তার চেয়েও অনেক বেশি খাটতে হত।
তবু এতখানি বুদ্ধি, এতখানি কঠিন পরিশ্রম খাটিয়েও তাদের প্রায় অর্ধেক লোকের ঠিকমতো গ্রাসাচ্ছাদনের সংস্থান হত না। ভারতবর্ষের অসংখ্য কৃষকের মতোই তাদেরও জীবন অনশনে অর্ধাশনে কেটে যেত, সে জীবন হ্রস্ব এবং বিকাশের সুযোগের অভাবে পঙ্গু। চরম দুর্গতিকে একেবারে সামনে নিয়ে এদের দিন কাটত; তার উপরে আবার আসত নানাবিধ দুর্বিপাক—আসত দুর্ভিক্ষ, আসত বন্যা, তার আঘাতে লক্ষ লক্ষ লোক নিশ্চিহ্ন হয়ে মুছে যেত। বোরোদিনের উপদেশক্রমে ডক্টর সুন-এর প্রতিষ্ঠিত সরকার কৃষক এবং শ্রমিকদের রক্ষাকল্পে বহু নির্দেশ জারি করলেন। জমির খাজানা শতকরা পঁচিশ ভাগ কমিয়ে দেওয়া হল; শ্রমিকদের খাটুনির সময় আটঘণ্টার অনধিক বলে স্থির করা হল, বেতনের একটা সর্বনিম্ন হারও বেধে দেওয়া হল, কৃষকদের ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করা হল। জনসাধারণ এই-সব সংস্কার প্রচেষ্টা দেখে স্বভাবতই আনন্দিত এবং উৎসাহিত হয়ে উঠল। দলে দলে তারা এই নূতন ইউনিয়নগুলিতে গিয়ে যোগ দিল, ক্যাণ্টন সরকারের সমর্থন করতে লাগল।
এইভাবে ক্যাণ্টন সরকার নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে নিলেন, তারপর উত্তর-অঞ্চলের টুচুনদের সঙ্গে একটা লড়াই করবার জন্য তৈরি হলেন। একটি সামরিক বিদ্যালয় খোলা হল, দেশে একটি সেনাবাহিনী গড়ে তোলা হল। শুধু ক্যাণ্টনে নয়, চীনের সর্বত্রই, এবং কিছুপরিমাণে সমস্ত প্রাচ্য-জগতেই, তখন একটা নূতন বস্তুর আবির্ভাব হচ্ছিল; সেটি হচ্ছে ধর্মপ্রতিষ্ঠানের গৌরব কমে গিয়ে তার জায়গাতে পার্থিব-প্রতিষ্ঠানের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা। ধর্ম কথাটার যে সংকীর্ণ অর্থ আমরা জানি, সে অর্থে অবশ্য চীন কোনোদিনই খুব ধর্মপ্রাণ দেশ ছল না। এবার সে আরও বেশি করে ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে উঠল। বিদ্যাশিক্ষার ব্যাপারটা ধর্মপ্রধান ছিল, সেটাকে ধর্মনিরপেক্ষ করা হল। প্রাচীনকালের বহু মন্দিরকে এখন যে-সব কাজে লাগানো হচ্ছে, তাই থেকেই এই ব্যাপারটার সবচেয়ে ভালো প্রমাণ পাওয়া যায়। ক্যাণ্টনে প্রাচীনকালের একটি প্রসিদ্ধ দেবমন্দির ছিল, এখন সে মন্দিরকে একটা পুলিশদের শিক্ষায়তন হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আরেক জায়গাতে কতকগুলো মন্দিরকে পরিণত করা হয়েছে শাক-সব্জী বেচবার দোকানে।
১৯২৫ সনের মার্চ মাসে ডক্টর সুন ইয়াৎ-সেন মারা গেলেন। কিন্তু ক্যাণ্টন-সরকার
তখনও শক্তি সঞ্চয় করে চলছেন, বোরোদিন তাঁদের উপদেষ্টা। এর অল্পদিন পরেই এমন কতকগুলো ঘটনা ঘটল, যার ফলে চীনের জনসাধারণ বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীদের উপরে, বিশেষ করে ব্রিটিশদের উপরে, রাগে জ্বলে উঠল। সাংহাইয়ের কাপড়ের কলগুলিতে ধর্মঘট হল; ১৯২৫ সনের মে মাসে একটা শোভাযাত্রা উপলক্ষে একজন শ্রমিক মারা পড়ল। তার নাম করে একটা প্রকাণ্ড স্মৃতি-উৎসবের আয়োজন করা হল; তাকেই উপলক্ষ্য করে ছাত্ররা এবং শ্রমিকরা একটা সাম্রাজ্যবাদী-বিরোধী শোভাযাত্রা বার করল। একজন ব্রিটিশ পুলিশ-কর্মচারী তাঁর অধীনস্থ শিখ পুলিশ-বাহিনীকে এই জনতার উপর গুলি চালাবার হকুম দিলেন—আদেশটা ছিল “প্রাণবধ করবার মতো করে গুলি ছোঁড়ো”। কয়েকজন ছাত্র গুলিতে মারা পড়ল। চীনের সর্বত্র ব্রিটিশের বিরুদ্ধে তীব্র ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠল। এর পর আরেকটা ব্যাপারে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে উঠল, এই ব্যাপারটা ঘটে ১৯২৫ সনের জুন মাসে, ক্যাণ্টনের বিদেশী এলাকাতে (এটা শামীন এলাকা বলে পরিচিত)। সেখানে চীনাদের একটি জনতার উপরে—তার বেশির ভাগই ছিল ছাত্র—মেশিন-গান চালানো হল; বায়ান্ন জন মারা গেল, আরও বহু লোক আহত হল। এই ঘটনাটির নাম দেওয়া হল “শামীনের হত্যাকাণ্ড”—ব্রিটিশদেরই এর জন্য প্রধানত দায়ী করা হল। ক্যাণ্টনে ঘোষণা করা হল, ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করো। বহু মাস ধরে হংকঙ-এর সঙ্গে যত ব্যবসা-বাণিজ্য চলত সমস্ত বন্ধ হয়ে রইল; ব্রিটিশ কারবারগুলির এবং ব্রিটিশ সরকারের নিদারুণ ক্ষতি হল তাতে। বোধ হয় জান, হংকঙ হচ্ছে ব্রিটিশদের অধিকৃত দক্ষিণ-চীনের একটি শহর। জায়গাটা ক্যাণ্টনের খুব কাছেই; এর মারফৎ বিপুল পরিমাণ ব্যবসাবাণিজ্য চলে থাকে।
ডক্টর সুনের মৃত্যুর পর ক্যাণ্টন সরকারের রক্ষণশীল দক্ষিণ-পন্থী আর প্রগতিকামী বামপন্থী দলের মধ্যে ক্রমাগত ঝগড়াঝাঁটি চলতে লাগল। শাসনক্ষমতাও একবার এদের একবার ওদের হাতে যেতে লাগল। ১৯২৬ সনের মাঝামাঝি সময়ে চিয়াং কাই-শেক নামে একজন দক্ষিণপন্থী ব্যক্তি প্রধান সেনাপতি হলেন; কমিউনিস্টদের তিনি সরকার থেকে ঠেলে বার করতে আরম্ভ করলেন। তখনও কিন্তু দুই দল কতকটা একত্রই কাজ করে যাচ্ছে, যদিও পরস্পরকে তারা মোটেই বিশ্বাস করছে না। এর পরে শুরু হল ক্যাণ্টনের সেনাবাহিনীর উত্তর অঞ্চলে অভিযান; সেখানকার সমস্ত টচুনদের তারা যুদ্ধ করে বিতাড়িত করবে, সমগ্র চীনে একটিমাত্র জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত করবে, এই তাদের সংকল্প। উত্তর-অঞ্চলে এদের এই অভিযান একটা আশ্চর্য ব্যাপার; দুদিন না যেতেই সমস্ত পৃথিবীর দৃষ্টি এর দিকে আকৃষ্ট হল। যুদ্ধ বস্তুত বিশেষ হলই না; দক্ষিণী সেনা অতি দ্রুত গতিতে একটার পর একটা জয়লাভ করে এগিয়ে চলল। উত্তর-অঞ্চলে অবশ্য সংহতি বলে কিছু ছিল না। কিন্তু দক্ষিণী-সরকারের শক্তির প্রকৃত উৎস ছিল কৃষক এবং প্রজাদের প্রীতি। সেনাবাহিনীর আগে আগে চলত একটি প্রচারক এবং আন্দোলনকারীর দল, এরা কৃষক এবং শ্রমিকদের ইউনিয়ন গড়তে গড়তে পথ চলত, তাদের বোঝাত, ক্যাণ্টন সরকারের অধীনে এলে তারা কতখানি সুখেস্বচ্ছন্দে বাস করতে পারবে। অতএব যে শহরে বা গ্রামে গিয়ে সেনাবাহিনী উপস্থিত হত সেইখানেই প্রজারা তাদের সাদরে অভ্যর্থনা করে নিত, যতরকমে পারে তাদের সাহায্য করত। ক্যাণ্টনী সেনার সঙ্গে যুদ্ধ করতে যে সৈন্য পাঠানো হত তারা যুদ্ধ প্রায় করতই না, অনেক সময় পোঁটলা-পুঁটলিসুদ্ধ তাদের সঙ্গেই গিয়ে যোগ দিত। ১৯২৬ সন শেষ হবার আগেই জাতীয়তাবাদী বাহিনী অর্ধেক চীন পার হয়ে চলে গেল, ইয়াংসি নদীর তীরে বিশাল শহর হ্যাংকাও দখল করে নিল। ক্যাণ্টন থেকে রাজধানী সরিয়ে তারা হ্যাংকাওয়ে নিয়ে এল, হ্যাংকাও-এর নঁতন নামকরণ হল উহান। উত্তর-অঞ্চলের যুদ্ধে ব্যবসায়ী সেনানীরা পরাজিত এবং বিতাড়িত হয়েছিল; সাম্রাজ্যবাদী জাতিরা অকস্মাৎ আবিষ্কার করলেন, নূতন এবং উগ্র-উৎসাহী একটি জাতীয়তাবাদী চীনদেশ তাঁদের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে; তাঁদের সঙ্গেই সমান সমান মর্যাদা দাবি করছে, তাঁদের চোখ-রাঙানি আর মানতে চাইছে না। জেনে তাঁদের দুঃখ-ক্ষোভের অন্ত রইল না।
১৯২৭ সনের প্রথমদিকে চীনাদের সঙ্গে ব্রিটিশদের বিরোধ বাধল, হ্যাংকাওতে ব্রিটিশদের যে ইজারা জমি ছিল, জাতীয়তাবাদীরা সেটা দখল করে নিতে চাইছিল। সাধারণ অবস্থায় চীনারা এরকমের উগ্রভাব দেখালে, তা নিয়ে যুদ্ধ হত, ব্রিটিশ সরকার তাদের সে ঔদ্ধত্যকে মেরে ঠাণ্ডা করে দিত, ভয় দেখিয়েই তাদের কাছ থেকে আরও কিছু ক্ষতিপূরণ আর ইজারা ইত্যাদি আদায় করে নিত। আমরা দেখেছি, ১৮৪০ সনের সেই আফিম যুদ্ধের পর থেকে এইটাই ছিল সেখানে বাঁধা নিয়ম। কিন্তু দেখা গেল সময় বদলে গেছে, তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এক নূতন চীন। অতএব চীনের ইতিহাসে সেই প্রথমবার ব্রিটিশদের নীতিরও পরিবর্তন ঘটল এবার তারা এই নূতন চীনকে প্রসন্ন রাখবার নীতি গ্রহণ করল। হ্যাংকাও-এর ইজারা নিয়ে যে বিরোধ সেটা ক্ষুদ্র ব্যাপার, তার মীমাংসাও সহজেই করে ফেলা গেল। কিন্তু হ্যাংকাও-এর খুব কাছেই এবং জাতীয়তাবাদী বাহিনী যে পথে এগিয়ে আসছে তার ঠিক পথের উপরেই রয়েছে সাংহাইয়ের বিরাট বন্দর—চীনে বিদেশীদের যত ইজারা আছে তার মধ্যে এইটিই সবচেয়ে বড়ো এবং সবচেয়ে দামী। সাংহাইয়ের ভাগ্যের উপরে বিদেশীদের বিপুল পরিমাণ কায়েমী-স্বার্থের ভাগ্য নির্ভর করছে। খোদ শহরটা, মানে তার ইজারা এলাকাটা ছিল বিদেশীদের অধীন, চীনা সরকারের যেখানে বস্তুত কোনো হাতই নেই। জাতীয়তাবাদী সেনা ক্রমেই কাছে এগিয়ে আসছে দেখে সাংহাইয়ের এই বিদেশীরা এবং তাদের দেশের সরকাররা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল; চারদিক থেকে ছুটোছুটি করে বহু রণতরী আর সৈনা সাংহাই বন্দরে গিয়ে হাজির হল। বিশেষ করে ব্রিটিশ সরকার একটা খুব বড়ো অভিযানকারী বাহিনী পাঠালেন, তার কতক ছিল ভারতীয় সেনা। ১৯২৭ সনের জানুয়ারী মাসের গোড়াতে এরা সাংহাইতে গিয়ে পৌঁছল।
জাতীয়তাবাদী সরকারের এখন রাজধানী হয়েছে হ্যাংকাও বা উহান; তাঁরা একটা কঠিন সমস্যায় পড়ে গেলেন—এখন কী করা যায়, আরও এগিয়ে যাবেন কি যাবেন না, সাংহাই দখল করবেন কি করবেন না। এতদিন এত সহজে দেশ জয় করে এসে এসে তাঁদের সাহস এবং উৎসাহ বেড়ে গেছে; সাংহাই বন্দরটাও দামী জায়গা, দখল করবার লোভ সামলানো কষ্ট। ওদিকে আবার এতদিন ধরে তাঁরা খালি ক্রমাগত সামনেই এগিয়ে চলেছেন, প্রায় পাঁচশ মাইলেরও বেশি জায়গা দখল করে চলে এসেছেন, কিন্তু সে জায়গাতে নিজেদের অধিকার বা শাসন প্রতিষ্ঠিত করবার ব্যবস্থা করেন নি। সাংহাই আক্রমণ করলে হয়তো বিদেশী শক্তিদের সঙ্গে কলহ বেধে যাবে, এবং তার ফলে যেটুকু এপর্যন্ত জয় করে এসেছেন সেটাও হস্তচ্যুত হয়ে যাবে। বোরোদিন পরামর্শ দিলেন খুব সাবধানে এগোও, আগে ঘর সামলে নাও। তাঁর মত ছিল, জাতীয়তাবাদীদের এখন উচিত হবে সাংহাই থেকে দূরে সরে থাকা, চীনদেশের দক্ষিণার্ধ ইতিমধ্যেই তাঁদের দখলে এসে গেছে সেখানে নিজেদের আসন দৃঢ় করে নেওয়া, এবং উত্তর-অঞ্চলে প্রচারকার্য চালিয়ে অভিযানের পথ সহজ করে নেওয়া। তাঁর আশা ছিল, এইভাবে চললে অল্পদিনের মধ্যেই, হয়তো বছর খানেকের মধ্যেই, চীনের সর্বত্র অবস্থা তাঁদের অনকূল হয়ে উঠবে; তার পর যদি জাতীয়তাবাদীরা অভিযান কবে, সর্বত্রই তারা খুব সহজে অভ্যর্থনা লাভ করবে। সেইটাই হবে ঠিক সময়—তখন সাংহাই দখল কর, পিকিঙ পর্যন্ত এগিয়ে যাও, এবং বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীদের সামনাসামনি গিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াও। বোরোদিন বিপ্লবী বোরোদিন, এমনি করে সাবধানে এগোবার পরামর্শ দিলেন; কারণ পরিস্থিতির সকল দিক বিবেচনা করে দেখবার মতো অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল। কিন্তু কুওমিন্টাঙের দক্ষিণপন্থী নেতারা, এবং বিশেষ করে প্রধান সেনাপত্তি চিয়াং কাই-শেক, তাতে রাজি নন—এঁরা জিদ ধরলেন, না, সাংহাই আক্রমণ করতেই হবে। সাংহাই দখল করতে এদের এতখানি অধীর আগ্রহ কেন, তার সত্যকার কারণটা বোঝা গেল আরও পরে, যখন কুওমিন্টাঙ ভেঙে দুই টুকরো হয়ে গেল। কৃষকপ্রজা এবং শ্রমিকদের ইউনিয়নগুলির শক্তি দিন দিন বেড়ে উঠছিল। এই দক্ষিণপন্থী নেতাদের সেটা পছন্দ হচ্ছিল না। সেনাপতিদের মধ্যে অনেকে নিজেরাই ছিলেন ভূস্বামী। অতএব এঁরা স্থির করেছিলেন, এই ইউনিয়নগুলোকে ভেঙেচুরে দিতেই হবে, তাতে যদি দল ভেঙে ভাগ হয়ে যায় থাক, জাতীয়তাবাদীদের সংকল্পসিদ্ধির অন্তরায় ঘটে ঘটুক আপত্তি নেই। সাংহাই ছিল চীনদেশের বড়ো বড়ো বুর্জোয়াদের একটা প্রধান কেন্দ্র। এই দক্ষিণপন্থী সেনাপতিদের আশা ছিল, দলের মধ্যে যারা অধিকতর অগ্রণী বা উগ্রপন্থী তাদের সঙ্গে, বিশেষ করে কমিউনিস্টদের সঙ্গে তাঁদের যুদ্ধ হলে সে যুদ্ধে এরা টাকা দিয়ে এবং অন্যান্য উপায়ে তাঁদের সাহায্য করবে। আর সে রকমের যুদ্ধ যদি বাধেই, তখন সাংহাইয়ে যেসব বিদেশী ব্যাঙ্কার আর শিল্পপতি রয়েছে তারাও তাঁদেরই সাহায্য করবে, এটাও তাঁদের জানা ছিল।
অতএব তাঁরা সাংহাই আক্রমণ করলেন। ১৯২৭ সনের ২২শে মার্চ তারিখে শহরের চীনা-অঞ্চল তাঁদের দখলে চলে এল; বিদেশীদের যে-সব ইজারা অঞ্চল ছিল তা তাঁরা আক্রমণ করলেন না। সাংহাই জয় করতেও এঁদের বিশেষ যুদ্ধটুদ্ধ করতে হল না। বিপক্ষদলের সমস্ত সৈন্য জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গেই এসে যোগ দিল; শহরের সমস্ত শ্রমিক জাতীয়তাবাদীদের পক্ষ হয়ে ব্যাপক ধর্মঘট ঘোষণা করল, অতএব সাংহাইয়ে যে সরকার বর্তমান ছিল তার আর লড়াই করবার শক্তিই রইল না। এর দুদিন পরেই বিশাল শহর নানকিংও জাতীয়তাবাদী বাহিনীর দখলে এসে পড়ল। তার পরেই এল কুওমিন্টাঙের ভাঙন—কুওমিন্টাঙ ভেঙে বামপন্থী এবং দক্ষিণপন্থী এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। জাতীয়তাবাদীদের জয়লাভের সেইখানেই ইতি ঘটল, চীনের সর্বনাশ আসন্ন হয়ে উঠল। বিপ্লবের যুগ শেষ হয়ে গেছে, এবার শুরু হল প্রতিবিপ্লবের পালা।
চিয়াং কাই-শেক সাংহাই আক্রমণ করেছিলেন, হ্যাংকাও সরকারের অনেক সভ্যের মতের বিরুদ্ধে। এই দুই দল পরস্পরের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে লেগে গেল। হ্যাংকাওতে যারা ছিল তারা চেষ্টা করতে লাগল সেনাবাহিনীর উপরে চিয়াঙের যে প্রতিপত্তি আছে তাকে নষ্ট করে দিতে, তা হলেই চিয়াংকে সরিয়ে দেওয়া যায়। চিয়াং এদিকে নানকিংএ একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার স্থাপন করলেন। এই সমস্ত ব্যাপারই ঘটে গেল সাংহাই জয়ের পর অতি অল্প কয়েকটি মাত্র দিনের মধ্যে। যে হ্যাংকাও সরকারের তিনি অন্তর্ভুক্ত ছিলেন তার বিরুদ্ধেই চিয়াং বিদ্রোহ করেছেন; এবার তিনি খোলাখুলিই নিজের স্বরূপ প্রকাশ করলেন—কমিউনিস্ট, বামপন্থী, ইউনিয়ন কর্মী, সকলের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ শুরু করে দিলেন। যে শ্রমিকরা ধর্মঘট করে তাঁর সাংহাই-জয় সহজ করে দিয়েছিল, আনন্দে উচ্ছ্বাসিত হয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা করে নিয়েছিল, তাদেরই এবার তিনি তাড়া করে করে ধ্বংস করতে লাগলেন। অসংখ্য লোককে গুলি করে মারা হল, বহু লোকের মাথা কেটে ফেলা হল; হাজার হাজার লোককে গ্রেপ্তার করে জেলে পোরা হল। সাংহাইয়ের লোকেরা ভেবেছিল জাতীয়তাবাদীরা তাদের জন্য স্বাধীনতার বাণী বহন করে এনেছে; দুদিন না যেতেই সে স্বাধীনতা পরিণত হল একটা রক্তক্ষয়ী বিভীষিকায়।
এটা ১৯২৭ সনের এপ্রিল মাসের কথা। এই এপ্রিল মাসেই একই দিনে পিকিঙের সোভিয়েট দুতাবাসে আর সাংহাইয়ে যে সোভিয়েট কন্সাল ছিলেন তাঁর দপ্তরে চীনারা গিয়ে চড়াও হল। এটা বেশ স্পষ্টই বোঝা গেল, উত্তর-চীনের সমর-নায়ক চ্যাং সো লিনের সঙ্গে চিয়াং কাই-শেক একযোগে কাজ করছেন; অথচ লোকে জানত তাঁর সঙ্গেই চিয়াং-এর যুদ্ধ চলছে। পিকিঙ এবং সাংহাইয়ের কমিউনিস্ট আর প্রগতিপন্থী শ্রমিকদের একেবারে ‘সাফ করে’ দেওয়া হল। সাম্রাজ্যবাদী জাতিরা অবশ্য এই ব্যাপারে খুবই খুশি হয়ে উঠল। তাদের তো খুশি হবারই কথা, কারণ এর ফলে চীনা জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে ভাঙন ধরল, শক্তি হ্রাস পেয়ে গেল। সাংহাইতে এই বিদেশীদের যে-সব প্রতিনিধি ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে চিয়াং কাই-শেক সহযোগিতা করতে চাইলেন। তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে, এরই কাছাকাছি সময়ে, ১৯২৭ সনের মে মাসে, ব্রিটিশ সরকার লণ্ডনস্থ সোভিয়েট প্রতিষ্ঠানদের উপরে ‘আর্ক্সের খানাতল্লাসী’ চালিয়েছিল, এবং তার পরেই রাশিয়ার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল।
এইভাবে, মাত্র একটি কি দুটি মাসের মধ্যে চীনের অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গেল। কুওমিন্টাঙ ছিল একটি অখণ্ড জয়দৃপ্ত দল, সমস্ত চীনের প্রতিনিধি, যুদ্ধের পর যুদ্ধ সে অবলীলাক্রমে জয় করে চলেছে, বিদেশীরা পর্যন্ত তার ভয়ে সন্ত্রস্ত। সে এখন পরিণত হল কতকগুলো ভাঙা-চোরা উপদলে,—তারা প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে লড়াই করছে; কুওমিন্টাঙের প্রাণ এবং শক্তির উৎস ছিল যে শ্রমিকরা আর কৃষকরা, তাদেরই সে এখন পীড়ন করছে, তাড়া করে করে বধ করছে। সাংহাইতে যে বিদেশীরা ছিল তারা আবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচল, অতি উদারচিত্তে এক দলকে অন্য দলের সঙ্গে লড়তে সাহায্য করতে লাগল—বিশেষ করে শ্রমিকদের পীড়ন এবং নির্যাতন করার এমন চমৎকার এবং লাভজনক ব্যসন চালাতে। সাংহাইয়ের (শুধু তাই নয়, চীনের সর্বত্রই) কারখানাগুলোতে এই-যে শ্রমিকরা কাজ করত, মালিকরা এদের ভয়ানকভাবে শোষণ করত; এরা যেভাবে খেত পরত বাস করত তার চেয়ে শোচনীয় আর কিছু হতে পারে না। ট্রেড ইউনিয়নের কল্যাণে এদের শক্তি বেড়েছিল, ইতিমধ্যেই এরা মালিকের হাত মুচড়ে কিছু বেশি হারে মাইনে আদায় করে নিয়েছিল। অতএব কারখানার মালিকরা কেউই সে ট্রেড ইউনিয়নদের উপরে প্রসন্ন ছিল না—তা সে মালিক জাতে ইউরোপীয় জাপানি বা চীনা যাই হোক।
চীনে অবস্থার গতি যে দিকে চলছে তার দরুন মস্কোতে সকলে বোরোদিনের উপরে অতান্ত অপ্রসন্ন হয়ে উঠলেন; ১৯২৭ সনের জুলাই মাসে বোরোদিন রাশিয়ায় চলে গেলেন। তাঁর যাত্রার সঙ্গে সঙ্গেই হ্যাংকাওতে কুওমিন্টাঙের যে বামপন্থী দল ছিল সেটি ভেঙে টুক্রো টুক্রো হয়ে গেল। নানকিং সরকার এবার সম্পূর্ণরূপেই কুওমিন্টাঙের উপর প্রভুত্ব করতে লাগলেন; বিশেষ করে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে এবং সমস্ত বামপন্থী এবং শ্রমিকনেতাদের বিরুদ্ধে যে অভিযান তাঁরা চালাচ্ছিলেন সেটাও সমানই চলতে লাগল। এই সময়ে যাঁরা চীন ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেন বা চীন থেকে বিতাড়িত হলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন মাদাম সুন, মহাবীর নেতা সুন ইয়াৎ-সেনের শ্রদ্ধেয়া বিধবা। অতি শোকার্ত মনে তিনি বললেন, চীনের স্বাধীনতার জন্য আমার স্বামী যে বিরাট আয়োজন প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছিলেন, এই সমরনায়করা এবং অন্যরা মিলে তাকে নষ্ট করে দিল। অথচ তখনও এই সমরনায়করা ডক্টর সুন-এর বিখ্যাত নীতিগুলোরই দোহাই মুখে উচ্চারণ করছিল—জাতীয়তা, প্রজাতন্ত্র, সামাজিক সুবিচার।
আবার চীন একটা বিষম বিশৃঙ্খলার রাজ্যে পরিণত হল, তার সর্বত্র সমর নায়করা এবং সেনাপতিরা পরস্পরের সঙ্গে লড়াই করে ফিরতে লাগলেন। ক্যাণ্টন নানকিং-সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দক্ষিণ চীনে তার নিজস্ব সরকার প্রতিষ্ঠা করল। ১৯২৮ সনে পিকিঙ শহর নানকিং সরকারের হস্তগত হল। তার নামটাকে বদলে করা হল পিপিং, এর মানে হচ্ছে ‘উত্তর-অঞ্চলের শান্তি’। পিকিঙ নামটার মানে ছিল ‘উত্তর অঞ্চলের রাজধানী’—কিন্তু তখন আর তা রাজধানী নয়।
পিকিঙকে এখন থেকে আমাদের পিপিং বলে ডাকতে হবে— পিপিঙের পতনের পরও কিন্তু দেশের বহু স্থানে গৃহযুদ্ধ চলতে লাগল। ক্যাণ্টন তার নিজস্ব সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল; কিন্তু উত্তর অঞ্চলেও সমরনায়করা সকলেই যার যা খুশি করে বেড়াতে লাগলেন; নিজেদের মধ্যে ব্যক্তিগত ঝগড়াকাঁটি চালাতে লাগলেন, আবার মাঝে মাঝে দুদিনের মতো পরস্পরের সঙ্গে আপোষও করতে লাগলেন। নামে নানকিঙের তথাকথিত ‘জাতীয়’ সরকার সমস্ত চীন শাসন করছিলেন, একমাত্র ক্যাণ্টন বাদে। কিন্তু দেশের বহু অঞ্চল ছিল যেখানে সে সরকারের কিছুমাত্র ক্ষমতা বজায় ছিল না। এর মধ্যে বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য ছিল দেশের অভ্যন্তরস্থ একটা খুব বড়ো অঞ্চল, সেখানে একটি কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। নানকিং সরকার আর্থিক সাহায্যের জন্য প্রধানত সাংহাইয়ের ব্যাঙ্কারদের উপরেই নির্ভর করতেন। বিভিন্ন সেনাপতিদের অধীনস্থ বিরাট সব সেনাবাহিনীর খাঁই মেটাতে মেটাতে কৃষকদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠল। যেসব সেনাদল ভেঙে গিয়েছিল তাদেরও অসংখ্য লোক চাকরির সন্ধানে দেশের সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছিল এবং চাকরি না পেয়ে প্রায়ই ডাকাতি-লুঠতরাজ করে পেট ভরাচ্ছিল।
১৯২৭ সনের ডিসেম্বর মাসে নানকিং সরকার আর সোভিয়েট রাশিয়ার সম্পর্ক ছিন্ন হল; সাম্রাজ্যবাদী জাতিদের সহায়তা নিয়ে নানকিং সরকার একটা উগ্র সোভিয়েট-বিরোধী নীতি অবলম্বন করলেন। এই নিয়ে ১৯২৭ সনেই যুদ্ধ বাধত, শুধু রাশিয়া কিছুতেই যুদ্ধ করতে রাজি হল না বলেই যুদ্ধ হল না। ১৯২৯ সনে চীন সরকার আবার উগ্রমূর্তি ধারণ করলেন, এবার রঙ্গমঞ্চ হল মাঞ্চুরিয়া। মাঞ্চুরিয়াতে সোভিয়েট কনসালের দপ্তর চড়াও করা হল; চাইনীজ ইস্টার্ন রেলওয়েতে যে-সব রুশ কর্মচারী ছিলেন তাঁদের বরখাস্ত করা হল। এই রেলওয়েটার বেশির ভাগ ছিল রাশিয়ারই সম্পত্তি; অতএব সোভিয়েট সরকার অবিলম্বে চীনাদের শাস্তির ব্যবস্থা করলেন। কয়েকমাস ধরে দুই দেশের মধ্যে একটা যুদ্ধ গোছেরই ব্যাপার চলল; তার পর চীনা সরকার সোভিয়েট সরকারের দাবিই মেনে নিতে রাজি হলেন, পুরোনো যে ব্যবস্থা ছিল তাকেই আবার প্রতিষ্ঠিত করলেন।
মাঞ্চুরিয়াকে নিয়ে, এবং মাঞ্চুরিয়ার মধ্য দিয়ে যে রেলপথটি চলে গেছে, তাকে নিয়ে বহু আন্তর্জাতিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে; কারণ অনেকেরই স্বার্থ এখানে এসে একত্র হয়েছে এবং ঠোকাঠুকি করে মরছে—বিশেষ করে চীন জাপান এবং রাশিয়া তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। জাপান এই স্থানটিতে তার পূর্ণ প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে—পৃথিবীসুদ্ধ সকলেই তার এই কাজের প্রতিবাদ করেছে, তবুও। এর কথা আমি তোমাকে এর পরের চিঠিতে বলব।
বলেছি, চীনের খানিকটা জায়গা নিয়ে একটা কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যতদূর মনে হয়, প্রথম কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯২৭ সনের নভেম্বর মাসে, দক্ষিণ-চীনের কোয়ান্টুং প্রদেশের অন্তর্গত হাইফেং জিলাতে। এর নাম ছিল হাইফেং সোভিয়েট প্রজাতন্ত্র; অনেকগুলো কৃষক ইউনিয়নকে একত্র করে এর সৃষ্টি হয়েছিল। চীনের অভ্যন্তরদেশে সোভিয়েট-শাসিত অঞ্চলের আয়তন ক্রমেই বেড়ে চলল; ১৯৩২ সনের মাঝামাঝি এসে দেখা গেল, নিজ চীন দেশের মোট যা আয়তন তার প্রায় ছ’ভাগের একভাগ, মানে ২,৫০,০০০ বর্গ মাইল পরিমিত স্থান, এর অন্তর্গত হয়ে গেছে—এর জনসংখ্যা পাঁচ কোটি। কমিউনিস্টরা এখানে ৪,০০,০০০ সৈন্য নিয়ে একটি লাল বাহিনী গড়ে তুলেছে; এই বাহিনীর সঙ্গে আবার ছেলেদের মেয়েদের নিয়ে গড়া কতকগুলো সাহায্যকারী বাহিনী আছে। চীনদেশের এই সোভিয়েটগুলোকে বিচূর্ণ করতে নানকিং সরকার এবং ক্যাণ্টন সরকার উভয়েই প্রাণপণ চেষ্টা করেছে, এবং চিয়াং কাই-শেক তাদের বিরুদ্ধে বারবার অভিযান চালিয়েও বিশেষ সফল হন নি। এই সোভিয়েট প্রজাতন্ত্রগুলি কখনও কখনও পিছু হটে গিয়ে দেশের অভ্যন্তরে অন্যত্র নিজেদিগকে সুসংহত ও শক্তিমান করে গড়ে তুলেছে।[১]
- ↑ পুস্তকের শেষে যে অংশটুকু পরে যুক্ত হয়েছে তাতে চিয়াং কাই-শেক ও চীনের সোভিয়েট প্রজাতন্ত্রগুলির মধ্যে সংঘর্ষ, এই দুদলের সম্মিলিতভাবে জাপানের সামরিক অভিযানের প্রতিরোধ, জাপানের চীন আক্রমণ ও পরবর্তী যুদ্ধ ইত্যাদির বিবরণ দেওয়া হয়েছে।