বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/চীনে ব্রিটেনের আফিম বিক্রয়
১১৪
চীনে ব্রিটেনের আফিম-বিক্রয়
১৪ই ডিসেম্বর, ১৯৩২
শিল্প এবং যন্ত্র-বিপ্লবের ফলাফল ভারতের উপরে কীরকম হল এবং নূতন সাম্রাজ্যবাদ ভারতে কী রূপ ধারণ করল তার বিস্তৃত বর্ণনা আমি তোমাকে দিয়েছি। ভারতবাসী হিসাবে আমিও একটা বিশেষ পক্ষের লোক; সে পক্ষের দিকে না টেনে কথা বলা আমার পক্ষে কঠিন। কিন্তু তবুও আমি বৈজ্ঞানিকের নির্বিকার বিশ্লেষণের দৃষ্টি নিয়েই এই সমস্যাগুলোর আলোচনা করতে চেষ্টা করেছি, এর বিশেষ একটি পক্ষের সমর্থনে অবতীর্ণ জাতীয়তাবাদীর ভঙ্গি নিয়ে কথা বলি নি। আমার ইচ্ছে, তুমিও ঠিক সেইভাবেই একে দেখতে চেষ্টা করো। জাতীয়তার চেতনা বস্তু হিসাবে ভালো, কিন্তু বন্ধু হিসাবে সে নির্ভরযোগ্য নয় এবং ঐতিহাসিক হিসাবে বিশ্বাসযোগ্য নয়। এই চেতনার ফলে অনেক ঘটনা আমাদের চোখে পড়তে চায় না, অনেক সময় সত্য যা তা বিকৃত হয়ে দেখা দেয়—বিশেষ করে যেখানে আমাদের নিজেদের নিয়ে বা আমাদের দেশকে নিয়ে কথা। কাজেই ভারতবর্ষের আধুনিক কালের ইতিহাস আলোচনা করতে হলে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, যেন আমাদের দুঃখদুর্দশার সমস্তখানি অপরাধই ব্রিটিশদের ঘাড়ে এক কথায় চাপিয়ে না দিই।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ শিল্পপতি আর ধনিকরা ভারতবর্ষকে কীভাবে শোষণ করছিল তা আমরা দেখলাম। এবার আলোচনা করব এশিয়াতে আর-একটি যে বৃহৎ দেশ আছে তার কথা; ভারতবর্ষের সে পুরোনোকালের বন্ধু, সমস্ত জাতির মধ্যে অতি প্রাচীন জাতি—চীন। এখানে পাশ্চাত্য জাতিরা আর-একটা নূতন কায়দায় শোষণ চালাচ্ছিল। ভারতবর্ষের মতো চীন কোনো ইউরোপীর দেশের উপনিবেশ বা অধীন হয়ে যায় নি। সমস্ত দেশটাকে একত্র বেঁধে রাখতে পারে এমন একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার ছিল চীনে; তার ফলে এবং বিদেশী আগন্তুকদের সঙ্গে কিছু পরিমাণ লড়াই করে সে প্রায় ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি কাল পর্যন্ত বিদেশীর অধীনতাকে এড়িয়ে চলতে পেরেছিল। এর এক শো বছরেরও বেশি আগে, মোগল-সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গেই ভারতবর্ষ ভেঙে খানখান হয়ে গিয়েছিল, সে আমরা আগেই দেখেছি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে চীনও দুর্বল হয়ে পড়ল, তবু সে শেষ পর্যন্ত অখণ্ডতা বজায় রেখে চলল। ও দিকে বিদেশী জাতি যারা তাকে হাত করতে চাইছিল তাদের মধ্যে ছিল পরস্পর-রেষারেষি, ফলে তাদের কোনো-একজনই চীনের দুর্বলতাটাকে পুরোপুরি নিজের কাজে লাগিয়ে নিতে পারল না।
চীন সম্বন্ধে শেষ যে চিঠি তোমাকে লিখেছি (৯৪), তাতে, ব্রিটিশরা চীনের সঙ্গে তাদের বাণিজ্য বাড়াবার যে চেষ্টা করছিল তার কথা বলেছি। ইংলণ্ডের রাজা তৃতীয় জর্জের চিঠির উত্তরে মাঞ্চু-সম্রাট চিয়েন লুঙ অত্যন্ত ভারিক্কি মুরব্বিয়ানা চালে যে চিঠি লিখেছিলেন তার থেকেও অনেকখানি আমি সে চিঠিতে উদ্ধৃত করে দিয়েছিলাম। এটা ১৭৯২ খৃষ্টাব্দের কথা। তারিখটা শুনেই নিশ্চয় তোমার মনে পড়বে, এই সময়ে ইউরোপে প্রচণ্ড একটা ঝড়ঝঞ্ঝা বয়ে যাচ্ছিল—এটা হচ্ছে ফরাসিবিপ্লবের যুগে। আর তার পরেই এলেন নেপোলিয়ন, এল নেপোলিয়নের যত যুদ্ধবিগ্রহ। এই সমস্তটা সময় ধরেই ইংলণ্ডকে অতান্ত ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়েছিল, নেপোলিয়নের সঙ্গে একেবারে মরিয়া হয়ে লড়াই করতে হচ্ছিল তাকে। নেপোলিয়নের পতনের পর তবেই ইংলণ্ড একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচল; তার আগে পর্যন্ত চীনের সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্য বাড়িয়ে তোলার কোনো কথা তোলাই তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু এর অতি অল্পদিন পরেই, ১৮১৬ সনে চীনে আবার একটি ব্রিটিশ দৌত্য পাঠানো হল। কিন্তু সেখানে পালনীয় কায়দাকানুন নিয়ে একটু গোল বাধল। ফলে চীন-সম্রাট ব্রিটিশ দূত লর্ড আমহার্স্টের সঙ্গে দেখা করতেই রাজি হলেন না।
সোজা হুকুম দিলেন—ফিরে চলে যাও। যে অনুষ্ঠানটি তাঁকে করতে বলা হয়েছিল তার নাম ছিল ‘কোটাউ’—এটা একরকমের ভূমিষ্ঠ প্রণাম। তুমিও হয়তো ‘কাউ-টাউ’ কথাটা শুনেছ।
সুতরাং কাজ কিছুই হল না। ইতিমধ্যে নূতন একটা ব্যবসা দ্রুতগতিতে বেড়ে উঠছিল, সে হচ্ছে আফিমের ব্যবসা। একে ঠিক নূতন ব্যবসা বোধ হয় বলা চলে না, কারণ ভারতবর্ষ থেকে চীনে প্রথম আফিম আমদানি হয়েছিল বহুকাল পূর্বে, পঞ্চদশ শতাব্দীতে। আগের দিনে ভারতবর্ষ থেকে বহু ভালো জিনিষই চীনে পাঠানো হয়েছে। সত্যকার মন্দ জিনিষ যে-কটি সে পাঠিয়েছিল আফিম তার মধ্যে একটি। এই ব্যবসার পরিমাণ কিন্তু বেশি ছিল না। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এর আয়তন বেড়ে গেল—বাড়িয়ে তুলল ইউরোপীয়রা, এবং বিশেষ করে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি; ব্রিটিশ তরফ থেকে ব্যবসায়ের একচেটে অধিকার এদেরই ছিল। শোনা যায়, প্রাচ্য অঞ্চলের ওলন্দাজরা প্রথম এর ব্যবহার শুরু করে; তারা তামাকের সঙ্গে আফিম মিশিয়ে তার ধূমপান করত, তাতে নাকি ম্যালেরিয়া হয় না। ওলন্দাজদের মারফত আফিমের ধূমপানের অভ্যাস চীনে গিয়ে পৌঁছল; কিন্তু গেল অনেক বেশি খারাপ রূপে: চীনে লোকেরা খাঁটি আফিমেরই ধূমপান করত। এর ফলে দেশের লোকের স্বাস্থ্য নষ্ট হচ্ছিল এবং আফিমের দরুন দেশ থেকে বহু টাকা বাইরে চলে যাচ্ছিল বলে চীনা সরকার এই অভ্যাস বন্ধ করে দেবার চেষ্টা করলেন।
১৮০০ সনে চীনা সরকার বিজ্ঞপ্তি বা হুকুম জারি করলেন, কোন কারণেই দেশে আফিম আমদানি করা চলবে না। কিন্তু বিদেশীদের কাছে এটা অত্যন্ত লাভের ব্যবসা; তারা লুকিয়ে দেশে আফিম আমদানি করতে লাগল, চীনা রাজকর্মচারীদের ঘুষ খাইয়ে হাত করে নিল যাতে তারা এই চোরাই ব্যবসাকে বাধা না দেয়। চীনা সরকার তখন আইন করলেন, তাঁদের কোনো কর্মচারী কোনো বিদেশী বণিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবে না। কোনো বিদেশীকে চীনা বা মাঞ্চু-ভাষা শেখানোকেও অপরাধ বলে গণ্য করা হবে; সেজন্য অত্যন্ত গুরুতর শাস্তির ব্যবস্থা করা হল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। আফিমের ব্যবসা ঠিকই চলতে লাগল; ঘুষ এবং দুর্নীতিও পুরোদমে চলল। ১৮৩৪ সনে ব্রিটিশ সরকার চীনের ব্যবসায়ে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির যে একচেটে অধিকার ছিল সেটা তুলে দিয়ে সমস্ত ব্রিটিশ বণিককেই এই ব্যবসা চালাবার স্বাধীনতা দিলেন। এর ফলে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে উঠল। আফিমের চোরাই ব্যবসা হঠাৎ বেড়ে গেল। শেষ পর্যন্ত চীনসরকার স্থির করলেন, একে বন্ধ করবার জনো জোর ব্যবস্থা করবেন। বেশ ভালো একটি লোককেই খুঁজে বার করা হল, তাঁর নাম লিন সে-সি। আফিমের চোরাই ব্যবসা বন্ধ করার জনো এঁকে স্পেশাল কমিশনার নিযুক্ত করা হল। তিনিও খুব দ্রুত এবং কড়া হাতে কাজ শুরু করলেন। দক্ষিণ চীনের ক্যাণ্টন ছিল এই বেআইনি ব্যবসার বড়ো আড্ডা। লিন নিজে ক্যাণ্টনে চলে গেলেন; সেখানকার সমস্ত বিদেশী বণিকদের উপর আদেশ জারি করলেন, যার হাতে যত আফিম আছে সমস্ত তাঁর হাতে জমা দিয়ে দিতে হবে। প্রথমে এরা আদেশ মানতে অস্বীকার করল। লিন জোর করে তাদের আদেশ মানিয়ে ছাড়লেন। এদের তিনি যে-যার কুঠিতে আটকে ফেললেন; এদের চীনা কর্মচারী, মজুর এবং চাকর-বাকরদের সরিয়ে নিয়ে এলেন, বাইরে থেকে এদের কাছে কোনোরকম খাদ্যদ্রব্য পৌছতে না পারে তার ব্যবস্থা করলেন। এই জোরালো এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থার ফলে শেষ পর্যন্ত বিদেশী বণিকরা কথা শুনতে বাধ্য হল; কুড়ি হাজার বাক্স আফিম তারা চীনাদের হাতে সমর্পণ করল। চোরাই ব্যবসার উদ্দেশ্যে সঞ্চিত এইসমস্ত আফিম লিন নষ্ট করে ফেললেন। বিদেশী বণিকদের তিনি জানালেন, কোনো জাহাজকেই ক্যাণ্টনে ভিড়তে দেওয়া হবে না, যদি-না তার ক্যাপ্টেন প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি আফিম আমদানি করবেন না। এই প্রতিশ্রুতি কেউ ভাঙলে চীনা সরকার সে জাহাজ এবং তার সমত মালপত্র বাজেয়াপ্ত করে নেবেন। কমিশনার লিন কাজে ত্রুটি রাখতেন না। যে কাজের ভার তাঁর উপরে দেওয়া হয়েছিল তা সুষ্ঠুভাবেই তিনি সম্পন্ন করলেন। কিন্তু জানতেন না এর ফলে চীনকে বিষম বিপদে পড়তে হবে।
ফল হল—ব্রিটেনের সঙ্গে বাধল যুদ্ধ, চীন হেরে গেল, একটা ঘরে অপমানকর শর্তে সন্ধি মেনে নিতে বাধ্য হল; আফিম-আমদানিকে চীন সরকার বাধা দিতে চেয়েছিলেন, সেই আফিমই জোর করে তার গলায় ঠেসে দেওয়া হল। আফিম বস্তুটা চীনাদের পক্ষে ভালো ছিল কি মন্দ ছিল সে প্রশ্ন অবান্তর; চীন সরকার কী করতে চেয়েছিলেন সে কথারও বিশেষ মূল্য নেই; বড়ো কথা হল, চীনে আফিমের চোরাই ব্যবসাটা ব্রিটিশ বণিকদের পক্ষে প্রকাণ্ড লাভের ব্যাপার; সে আর বন্ধ হয়ে যাবে এটা সহ্য করতে ব্রিটেন রাজি নয়। কমিশনার লিন যে আফিম নষ্ট করে দেন তার অধিকাংশই ছিল ব্রিটিশ বণিকদের সম্পত্তি। সুতরাং তাদের জাতীয় সম্ভ্রমে আঘাত লেগেছে এই দোহাই দিয়ে ব্রিটেন ১৮৪০ সনে চীনের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে দিল। এই যুদ্ধকে বলা হয় ‘আফিমের যুদ্ধ’; নামটা মিথ্যা নয়, কারণ চীনকে জোর করে আফিম কেনাবার উদ্দেশ্য নিয়েই এই যুদ্ধ শুরু এবং জয় করা হয়েছিল।
ব্রিটিশ রণতরীর বহর ক্যাণ্টন এবং আরও অনেক বন্দর অবরোধ করল; চীনারা তার সঙ্গে পেরে উঠল না। দু বছর লড়াই করে শেষে সে বাধ্য হয়ে হার মানল। ১৮৪২ সনে নানকিঙে সন্ধি হল, তাতে এই শর্ত করা হল যে, চীনের পাঁচটি বন্দরে বিদেশীদের বাণিজ্যের অধিকার থাকবে। এখানে বাণিজ্য মানে বিশেষ করে আফিমের বাণিজ্য। এই পাঁচটি বন্দর হচ্ছে—ক্যাণ্টন সাংহাই অ্যাময় নিংপো এবং ফুচাও। এদের নাম দেওয়া হল ‘সন্ধি-ভুক্ত বন্দর’। এ ছাড়া ক্যাণ্টনের নিকটবর্তী হংকঙ-দ্বীপটি ব্রিটেন দখল করে বসল, এবং যে আফিমগুলো নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল তার মূল্য বাবদ, আর সে নিজেই চীনের সঙ্গে যে যুদ্ধ বাধিয়েছিল তার ক্ষতিপূরণ বাবদ একটা বিরাট পরিমাণ টাকা চীনের কাছ থেকে আদায় করে নিল।
এইভাবে ব্রিটেন আফিমের রণজয় সম্পূর্ণ করল। তখন ইংলণ্ডের রানী ছিলেন ভিক্টোরিয়া; চীন-সম্রাট স্বয়ং তাঁর কাছে একটি ব্যক্তিগত আবেদনপত্র পাঠালেন; অত্যন্ত ভদ্রভাষায় বুঝিয়ে বললেন, আফিমের যে ব্যবসায় জোর করে চীনের উপর চাপিয়ে দেওয়া হল তার কী মারাত্মক ফল হচ্ছে। মহারানী ভিক্টোরিয়া সে চিঠির জবাবই দিলেন না। ঠিক এর পঞ্চাশ বছর আগে এই সম্রাটের পূর্বপুরুষ চিয়েন লুঙ ইংলণ্ডের রাজাকে চিঠি লিখেছিলেন, সে চিঠির ভাষা ছিল একেবারেই অন্যরকম।
পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী জাতিগুলির হাতে চীনের লাঞ্ছনা এই শুরু হল। তার সে নিভৃত একক জীবন আর রইল না। বিদেশী বাণিজ্যকে তার মেনে নিতে হল, আর মেনে নিতে হল খৃষ্টান মিশনারিদের অশুভাগমনকে। সাম্রাজ্যবাদের অগ্রদূত হিসাবে এই মিশনারিরা চীনদেশে অনেক কাণ্ডই করে গেছে। এর পর থেকে চীনকে যতবার যত বিপদে পড়তে হয়েছে তার অনেক ব্যাপারেরই মূলে ছিল মিশনারিরা। এদের আচরণ প্রায়ই ছিল অভদ্র এবং অসহনীয়, অথচ চীনা আদালত এদের বিচার করতে পারত না। নূতন সন্ধিটির শর্ত ছিল, পাশ্চ্যতাদেশ থেকে যে বিদেশীরা চীনে আসবে তারা চীনা আইন বা চীনা বিচারালয়ের অধীন থাকবে না; তাদের বিচার হবে তাদের নিজস্ব আদালতে। এই প্রথার নাম ছিল ‘বহির্দেশীয়-সংক্রান্ত নীতি’। প্রথাটি এখনও টিঁকে রয়েছে, এর সম্বন্ধে অভিযোগেরও অন্ত নেই। মিশনারিরা যে চীনাদের খৃস্টান বানিয়েছে তারাও এই ‘বহির্দেশীয়-সংক্রান্ত নীতি’র দোহাই দিয়ে বিশেষ ব্যবহারের দাবি জানাত। এই বিশেষ ব্যবহার চাইবার অধিকার তাদের কোনো দিক দিয়েই ছিল না, কিন্তু তাতে কী যায় আসে। তাদের পিছনে রয়েছে স্বয়ং মিশনারি প্রভু; শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী জাতির মহামান্য প্রতিনিধি সে! অনেক সময় এরা এক গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রামের লোকের বিবাদ বাধিয়ে দিত। এইসব কাণ্ডের ফলে মরিয়া হয়ে গিয়ে গ্রামবাসী প্রজারা ক্ষেপে উঠত, মিশনারিকে আক্রমণ করত, কখনও-বা মেরেই ফেলত। সঙ্গে সঙ্গে পিছন থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ত এদের পৃষ্ঠরক্ষক সাম্রাজ্যবাদী সেনা; সে অপরাধের একেবারে ভয়ংকর প্রতিশোধ নিয়ে তবে ছাড়ত। ইউরোপীয় জাতিগুলোর পক্ষে চীনে তাদের যে মিশনারিরা থাকত তাদের কেউ নিহত হওয়াটা যেরকম লাভের ব্যাপার ছিল তেমন লাভ বোধ হয় আর কিছুতেই তাদের হয় নি। এইসব হত্যার প্রত্যেকটিকে উপলক্ষ করে তারা আরও কিছু সুযোগ-সুবিধা দাবি করত এবং আদায় করে নিত।
চীনে আজ পর্যন্ত যত বিদ্রোহ হয়েছে তার মধ্যে সর্বাপেক্ষা ভয়ানক এবং নিষ্ঠুর একটি বিদ্রোহেরও শুরু করেছিল একজন খৃষ্টান চীনা। এই বিদ্রোহের নাম ‘তাইপিং বিদ্রোহ’; ১৮৫০ সনের কাছাকাছি সময়ে এর আরম্ভ হয়। এটি আরম্ভ করেছিল একটি অর্ধ-উন্মাদ লোক, তার নাম হুঙ সিন-চুয়ান। এই ধর্মোন্মাদ লোকটি একেবারে অদ্ভূত কাণ্ড বাধিয়ে দিল; ‘পৌত্তলিকদের হত্যা করো’ বলে জিগির দিয়ে সে দেশময় ঘুরে বেড়াত। এর ফলে অসংখ্য মানুষে নিহত হল। এই বিদ্রোহের ফলে চীনের অর্ধেকেরও বেশি স্থান লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। হিসেব করে দেখা গেছে, বারো বছর বা ঐরকম কালের মধ্যে এর ফলে অন্তত দু কোটি লোক মারা গিয়েছিল। এই বিশৃঙ্খলা এবং মৃত্যু-তাণ্ডব, এর জন্যে অবশ্য খৃষ্টান মিশনারি বা বিদেশী জাতিদের দায়ী করতে যাওয়া ঠিক হবে না। প্রথম দিকে বোধ হয় মিশনারিরা এর জয় কামনা করেছিল; পরে তারাও আর হুঙকে নিজেদের লোক বলে স্বীকার করল না। চীন সরকারের কিন্তু বরাবরই বিশ্বাস ছিল, খৃষ্টান মিশনারিরাই এর মূলে রয়েছে। এই ধারণা থেকেই আমরা বুঝতে পারি, সে সময়ে এবং তার পরের যুগেও, মিশনারিদের কাজকর্মকে চীনারা কতখানি বিদ্বেষের চোখে দেখত। ধর্ম এবং কল্যাণ-কামনার দূত হয়ে মিশনারিরা এসেছে, এ কথা তারা মনে করতে পারে নি; তাদের চোখে মিশনারি ছিল সাম্রাজ্যবাদের চর। একজন ইংরেজ লেখক বলেছেন, “প্রথমে মিশনারি, তার পরে রণতরী, তার পরে জমি দখল—চীনাদের মতে এই হচ্ছে ঘটনার পরম্পরা।” কথাটা মনে করে রাখা ভালো; কারণ চীনদেশের অশান্তি-বিগ্রহের মূল খুঁড়তে গেলে মিশনারির সাক্ষাৎ প্রায়ই মিলে যায়।
একটা ধর্মোন্মাদ পাগল যে বিদ্রোহের নেতা, সম্পূর্ণভাবে দমিত হওয়ার পূর্বেই তাতে এত বড়ো একটা কাণ্ড ঘটে গেল, এটা কেমন আশ্চর্য লাগে। এর সাফল্যের প্রকৃত কারণ হচ্ছে, চীনে তখন প্রাচীনকালের রীতিনীতিগুলো ভেঙে পড়ছিল। চীন সম্বন্ধে আমার শেষ চিঠিতে আমি বোধ হয় তোমাকে বলেছি, চীনে তখন করের চাপ অত্যন্ত বেশি হয়ে উঠেছিল, অর্থনীতিক ব্যবস্থাটা বদলে যাচ্ছিল, মানুষেরও মনে অসন্তোষ জমে উঠছিল। দেশের সর্বত্র মাঞ্চু-সরকারের বিরোধী গুপ্তসমিতি গড়ে উঠছিল; দেশের বাতাসেই তখন বিপ্লবের বীজ ভেসে বেড়াচ্ছে। বিদেশীদের বাণিজ্য, অন্য জিনিষের ব্যবসা—এরা অবস্থা আরও খারাপ করে তুলল। বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্য অবশ্য চীন প্রাচীনকাল থেকেই করেছে। কিন্তু এখন অবস্থা অন্যরকম। পাশ্চাত্যদেশের বড়ো বড়ো কলের কারখানায় অতি দ্রুতবেগে রাশি রাশি মাল তৈরি হয়ে যাচ্ছে, তার সমস্ত মাল সে দেশের মধ্যে কাটানো যায় না। কাজেই তাদের অন্যত্র মাল বেচবার বাজার খুঁজে নিতে হবে। এইজন্যেই হল ভারতবর্ষ এবং চীনের বাজার দখল করবার প্রয়োজন। এইসব মাল, বিশেষ করে আফিম আমদানি হয়ে বাণিজ্যের পুরোনো ব্যবস্থা বানচাল হয়ে গেল, তার ফলে আর্থিক বিশৃঙ্খলা আরও বেড়ে গেল। ভারতবর্ষের মতো চীনেও বাজারে পণ্যের বাজার-দর পৃথিবীর বাজারের তালে তালে উঠতে-পড়তে লাগল। এইসমস্তর ফলে লোকের অসন্তোষ আর দুর্দশা ক্রমেই বেড়ে চলল, তাইপিং বিদ্রোহেরও জোর বেশি হয়ে উঠল
পাশ্চাত্যজাতিদের উদ্ধত্য আর হস্তক্ষেপ ক্রমশ বেড়ে চলবার সেই যুগে এই ছিল চীনের অবস্থা। এদের সমস্ত দাবি মেনে নেবার মতো সামর্থ চীনের ছিল না। তাতে আশ্চর্য হবার কিছ নেই। চীনের আভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা আর বিপদ-আপদের সুযোগ নিয়ে এই ইউরোপীয় জাতিরা তার কাছ থেকে যথাসম্ভব সুযোগ-সুবিধা এবং জমি আদায় করে নিচ্ছিল; এর অনেক পরে জাপানও এসে এই বিদ্যা শুরু করল, সে আমরা পরে দেখব। চীনেরও হয়তো ভারতের দশাই হত, সেও খুব সম্ভব কোনো-একটি বা একাধিক পাশ্চাত্যজাতির আর জাপানের অধীন দেশ বা সাম্রাজ্যে পরিণত হয়ে যেত। রক্ষা পেয়ে গেল সে শুধু একটি কারণে, এই জাতিগুলোর মধ্যে পরস্পর রেষারেষি আর বিদ্বেষের কল্যাণে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে চীনদেশের ইতিহাসের এই পশ্চাৎপট। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভাঙন, তাইপিং বিদ্রোহ, মিশনারির দল, বিদেশীর আক্রমণ—এদের কথা বলতে গিয়ে আমি আমার মূল বক্তব্য ছেড়ে চলে এসেছি। কিন্তু এর খানিকটা জানা থাকা দরকার, নইলে ঘটনার ধারাটাকে ঠিকমতো বোঝা যাবে না। ইতিহাসের ঘটনা আকস্মিক বিস্ময়ের মতো হঠাৎ ঘটে না; ঘটে তার কারণ, তার গোড়ায় অনেকগুলো কারণ একত্র হয়ে তাকে ঘটিয়ে তোলে। কিন্তু এই কারণগুলোকে সব সময়ে চোখে স্পষ্ট দেখা যায় না, এরা থাকে বাইরের নানাবিধ ব্যাপারের তলায় লুকিয়ে। চীনের মাঞ্চু-সম্রাটরা এর অতি অল্পদিন আগে পর্যন্ত বিপুল পরাক্রমে রাজত্ব করে এসেছেন; হঠাৎ যে দিন ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেল সে দিন তারা নিশ্চয়ই অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। এটা তাদের নিশ্চয়ই খেয়াল হয় নি যে, তাঁদের পতনের মূল নিহিত ছিল তাঁদেরই অতীত আচরণের মধ্যে; পাশ্চাত্যজগতে যে শিল্প-প্রগতি চলেছিল তার স্বরূপ কী, বা তার ধাক্কায় চীনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাতে কী সর্বনাশা ভাঙন দেখা দেবে, তা তাঁরা বুঝতে পারেন নি। ‘বর্বর’ বিদেশীদের অভ্যাগমনকে তাঁরা অত্যন্ত বিদ্বেষের চোখে দেখতেন। এদের আগমন সম্বন্ধে কথা বলতে গিয়ে এই সময়কার চীন সম্রাট প্রাচীন চীনা ভাষায় একটি ভারি চমৎকার কথা ব্যবহার করেছিলেন: বলেছিলেন, “আমার বিছানায় আমার পাশে শুয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে আমি কাউকেই দেব না!” কিন্তু প্রাচীন সাহিত্যের জ্ঞান আর রসিকতার দ্বারা গভীর আত্মপ্রত্যয় আর দুঃখে পরম সহিষ্ণুতাই লাভ করা যায; বিদেশীর আক্রমণ ঠেকিয়ে রাখবার শক্তি তার নেই।
নানকিঙের সন্ধির ফলে চীনে ব্রিটেনের প্রবেশদ্বার খুলে গেল। কিন্তু তার সমস্তখানি ক্ষীর ননী একা খাওয়া ব্রিটেনের ভাগ্যে জুটল না। ফ্রান্স আর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রও এসে জুটল; এসে তারাও চীনের সঙ্গে বাণিজ্য-সন্ধি করে নিল। আপত্তি করবার শক্তি চীনের ছিল না; কিন্তু তার উপরে এইসমস্ত জোরজুলমের জন্যে বিদেশীদের উপরে তার ভালোবাসা বা শ্রদ্ধা নিশ্চয়ই জন্মায় নি। এই ‘বর্বর’দের উপস্থিতিটাকেই সে বিষদৃষ্টিতে দেখছিল। এ দিকে সে বিদেশীরাও মোটেই তৃপ্ত হতে পারছিল না। চীনকে শোষণ করবার স্পৃহা তাদের দিন দিন বেড়ে চলল। এবারেও ব্রিটেনই অগ্রণী হল।
বিদেশীদের পক্ষে সেটা অত্যন্ত সুসময়। চীন তাইপিং বিদ্রোহ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত, বিদেশীকে রোখবার তখন তার ক্ষমতাই নেই। কাজেই ব্রিটেন যুদ্ধ বাধাবার একটা ছুতো খুঁজতে লেগে গেল। ১৮৫৬ সনে ক্যাণ্টনের চীনা রাজপ্রতিনিধি বোম্বেটেগিরি করার অপরাধে একটা জাহাজের চীনা খালাসিদের গ্রেপ্তার করলেন। জাহাজটা চীনাদের, কোনো বিদেশীই তার সঙ্গে জড়িত নয়। কিন্তু সে জাহাজে ব্রিটিশ-পতাকা উড়ছিল, কারণ হংকঙের ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে পাওয়া একটি অনুমতি-পত্র তাদের কাছে ছিল; সে অনুমতি-পত্রেরও আবার মেয়াদ পার হযে গেছে। তা হোক, রূপকথার নেকড়ে আর ভেড়ার গল্পের মতো, এই ব্যাপারটারই ছুতো ধরে ব্রিটিশ সরকার যুদ্ধ ঘোষণা করে বসল।
ইংলণ্ড থেকে চীনে সৈন্য পাঠানো হল। ঠিক এই সময়েই আবার ভারতবর্ষে ১৮৫৭ সনের বিদ্রোহ শুরু হল, কাজেই এইসমস্ত সৈন্যকে আবার ঘুরিয়ে ভারতবর্ষে নিয়ে যাওয়া হল। ভারতের বিদ্রোহ দমন না হওয়া পর্যন্ত চীন-যুদ্ধটাকে বাধ্য হয়েই স্থগিত রাখতে হল। এই দ্বিতীয় চীন-যুদ্ধ শুরু হল ১৮৫৮ সালে। ইতিমধ্যে ফ্রান্সও এই যুদ্ধে যোগ দেবার একটু ছুতো আবিষ্কার করে বসেছে। চীনের কোথায় এক জায়গাতে একজন ফরাসি মিশনারিকে লোকেরা মেরে ফেলে। অতএব ইংরেজ আর ফরাসি দুজনে মিলে চীনাদের আক্রমণ করল; সে বেচারিরা তখন তাইপিং বিদ্রোহ সামলাতেই হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে। ব্রিটিশ আর ফরাসি সরকার আবার রাশিয়া আর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রকেও বুঝিয়েসুঝিয়ে নিজেদের সঙ্গে ভেড়াবার চেষ্টা করল, তারা রাজি হল না। অথচ লুটের ভাগ নেবার বেলা দেখা গেল তারা খুব রাজি! যুদ্ধ বাস্তবিকপক্ষে প্রায় হলই না; এই চারটি জাতিই চীনের সঙ্গে নূতন করে সন্ধিপত্র বানিয়ে নিল, সে সন্ধির জোরে অনেক নূতন সুযোগসুবিধাও আদায় করে নিল। আরও অনেক বন্দর বিদেশী বণিকদের জন্যে খুলে দেওয়া হল।
দ্বিতীয় চীন-যুদ্ধের কাহিনী কিন্তু এখনও শেষ হয় নি। এই অভিনয়ের আরও একটি অঙ্ক আছে, সেটি আরও অনেক বেশি করুণ। দুই দেশের মধ্যে যখন সন্ধি হয়, নিয়ম হচ্ছে, যারা সন্ধি করল তাদের প্রত্যেক দেশের সরকারই সে সন্ধিপত্র স্বাক্ষর বা অনুমোদন করবে। স্থির হল, এদের এই নূতন সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করা হবে পিকিঙে, এক বছর কালের মধ্যে। সময় যখন হল, রাশিয়ার দূত রাশিয়া থেকে ডাঙা-পথে সোজাসুজি পিকিঙে চলে এলেন। অন্য তিন পক্ষ এলেন সমুদ্রপথে; জানালেন, তাঁরা পিহো নদী দিয়ে জাহাজ একেবারে পিকিঙের ঘাটে নিয়ে যাবেন। ঠিক সেই সময়ে তাইপিং বিদ্রোহীরা এই শহরটি আক্রমণের উদ্যোগ করছে; তাই নদীটিকে সংরক্ষিত করা হয়েছিল। অতএব চীনা সরকার ব্রিটিশ ফরাসি আর আমেরিকার দূতদের অনুরোধ করলেন, তাঁরা যেন সে নদীর পথে না এসে আরও উত্তরের একটা স্থলপথ দিয়ে আসেন। এটা কিছুমাত্র অন্যায় অনুরোধ নয়। আমেরিকার দূত রাজি হলেন। ব্রিটিশ ও ফরাসি দূত কিন্তু রাজি হলেন না; সশস্ত্র প্রতিরোধের ব্যবস্থা সত্ত্বেও সেই নদীর পথেই জোর করে চলতে গেলেন। চীনারা তখন গুলি ছুঁড়ে তাদের বাধা দিল, খানিক মার খেয়েই তাঁরা ফিরে এলেন।
এঁরা হচ্ছেন উদ্ধত আর অতিমাত্রায় গর্বিত সরকারের প্রতিনিধি; চীনা সরকার মাত্র যাওয়ার পথটা বদলাতে অনুরোধ করেছিলেন, সেটুকুও শুনতে এঁরা চান নি; গালের উপর এত বড়ো থাপ্পড় খেয়ে এঁরা হজম করবেন কেন? প্রতিশোধ নেবার জন্যে এঁরা আরও সৈন্য চেয়ে পাঠালেন। ১৮৬০ সনে এরা প্রাচীন নগরী পিকিঙ আক্রমণ করল; প্রতিহিংসা চরিতার্থ করল এরা নগরীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাসাদকে বিধ্বস্ত, লুণ্ঠন এবং অগ্নিদগ্ধ করে। এই প্রাসাদটির নাম ‘ইউয়েন-মিং-ইউয়েন’; এটি ছিল সম্রাটের গ্রীষ্মাবাস, সম্রাট চিয়েন লুঙের রাজত্বকালে এটির নির্মাণ সমাপ্ত করা হয়। এই প্রাসাদে ছিল শিল্প আর সাহিত্যের দুর্লভ সমস্ত সৃষ্টি, এমন মূল্যবান সব রত্ন চীনে আর তৈরি হয় নি। প্রাচীনকালের অপূর্ব সুন্দর সব ব্রোঞ্জের মূর্তি ছিল এখানে; ছিল অপরূপ কারুকার্য খচিত চীনামাটির বাসন, ছিল বহু দুর্লভ পুঁথির পাণ্ডুলিপি, ছিল ছবি, ছিল সর্বপ্রকার আশ্চর্য বস্তু, আর শিল্পকলার চরম সৃষ্টি—যে কলার জন্যে চীন হাজার বছর ধরে বিখ্যাত হয়ে ছিল। ইংরেজ আর ফরাসি সৈনিকেরা, মূর্খ দুর্বৃত্তের দল, এই সমস্ত অমূল্য সম্পদ লুটে নিল, নিয়ে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড আগুন জ্বেলে সেগুলো পুড়িয়ে মজা দেখল; সে আগুন অনেক দিন ধরে জ্বলেছিল। চীনাদের পিছনে ছিল হাজার হাজার বছরের সভ্যতা আর সংস্কৃতি। আশ্চর্য হবার কী আছে যদি এই গুণ্ডামি দেখে তাদের মন বেদনার্ত হয়ে উঠে থাকে, যদি তারা মনে করে থাকে এই ধ্বংসকারীরা নেহাতই অজ্ঞ বর্বরমাত্র, হত্যা আর ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই করতে জানে না এরা? হুন মোগল এবং প্রাচীনকালের আরও বহু ধ্বংপরায়ণ বর্বরের নাম নিশ্চয়ই তাদের মনে পড়েছিল সে দিন।
কিন্তু চীনারা তাদের কী ভাবল তা নিয়ে এই বিদেশী বর্বরদের কিছু মাত্র মাথাব্যথা ছিল না। তাদের আছে রণতরী, আছে কত আধুনিক সমরোপকরণ, তারা ভয় করবে কাকে? কী তাদের যায়-আসে, শতশত বৎসর ধরে যে মহার্ঘ ও দুর্লভ রত্নরাজি আহরিত হয়েছিল তা যদি নষ্ট হয়ে গিয়েই থাকে? চীনাদের শিল্প বা সংস্কৃতির মূল্য তাদের কাছে কতটকু?
“হোক—না সে যা হবার,
আমাদের দেখো এই
কলের কামান আছে—
ওদের তো কিছু নেই!”