বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ/চীন এবং হান-বংশ
২৬
চীন এবং হান বংশ
৩রা এপ্রিল, ১৯৩২
নাইনি জেল থেকে গত বছর তোমাকে যেসব চিঠি লিখেছি তাতে চীন দেশের প্রাচীন ইতিহাসের কথা কিছু কিছু বলেছি। হোয়াং হো নদীর তীরে তাদের বসবাসের শুরু থেকে তাদের প্রাচীন রাজবংশগুলির কথা—সিয়া-বংশ, সাং বা ঈন্ এবং চাউ-বংশের কথা বলেছি। কেমন করে ক্রমে ক্রমে চীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হল এবং বহু শতাব্দী ধরে ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় শাসনতন্ত্র গড়ে উঠল, সেসব কথার আলোচনা করেছি। এর পরে আবার দেখা দিল বিশৃঙ্খলা, কেন্দ্রীয় শাসনতন্ত্র ভেঙে পড়ল। তখনও চাউ-বংশের রাজত্ব চলছে, কিন্তু সেটা নামে মাত্র। এখানে-সেখানে ছোটো ছোটো রাজারা স্বাধীন হয়ে বসেছে, আর নিজেদের মধ্যে সারাক্ষণ ঝগড়াঝাঁটি চলছে। দেশের এই দুরবস্থা চলল কয়েক শো বছর ধরে—চীন দেশে কিছু একটা ঘটলেই সেটার জের চলতে থাকে হয় কয়েক শো নয় তো একেবারে কয়েক হাজার বছর ধরে। শেষটায় ডিউক অব্ চীন বলে স্থানীয় এক রাজা প্রাচীন চাউ-বংশের দুর্বল রাজাকে দিল তাড়িয়ে। এর বংশধরেরা চীন-বংশ বলে খ্যাতিলাভ করেছিল। এটি লক্ষ্য করবার বিষয় যে, এই চীন-বংশ থেকেই চীন দেশের নামকরণ হয়েছে।
খৃষ্টপূর্ব ২৫৫ অব্দে চীন দেশে এই চীন-বংশের রাজত্ব শুরু হল। এর ঠিক তেরো বছর পূর্বে ভারতবর্ষে অশোক তাঁর রাজত্ব শুরু করেছেন। কাজেই এখন চীন দেশে যাঁদের কথা বলছি তাঁরা অশোকের সমসাময়িক। প্রথম তিনজন চীন-সম্রাট খুব অল্পকাল রাজত্ব করেছিলেন। তার পরে খৃষ্টপূর্ব ২৪৬ অব্দে এই বংশের চতুর্থ রাজা সিংহাসনে বসেন; কোনো কোনো দিক থেকে এঁকে রীতিমতো স্বনামধন্য বলা যেতে পারে। এঁর নাম ছিল ওয়াও চেঙ, কিন্তু পরে তিনি অন্য নাম গ্রহণ করেন—শি হুয়াঙ টি। এই দ্বিতীয় নামেই তিনি সাধারণত পরিচিত। কথাটার মানে হল—প্রথম সম্রাট। বেশ স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে, তাঁর নিজের এবং নিজের কাল সম্বন্ধে তাঁর খুব উচ্চ ধারণা ছিল। কিন্তু অতীতের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল না। বস্তুত তিনি চেয়েছিলেন, লোকেরা অতীতের কথা ভুলে যায় এবং তাঁকে নিয়েই ইতিহাসের শুরু হয়েছে এরকম ভাবতে শেখে। এইজনোই তাঁর নাম হল, সর্বপ্রথম সম্রাট। তাঁর আগেও যে দু হাজার বছর ধরে কত কত সম্রাট চীন দেশে রাজত্ব করে গেছেন, সেসব তিনি উড়িয়েই দিলেন। এমনকি, তিনি দেশ থেকে তাঁদের নাম, স্মৃতি পর্যন্ত লোপ করে দেবার চেষ্টা করলেন। আর কেবল প্রাচীন সম্রাটই নয়, অতীতে দেশে যতসব প্রসিদ্ধ ব্যক্তির জন্ম হয়েছিল তাঁদের কথাও ভুলতে হবে। কাজেই তিনি হুকুম জারি করলেন যে, অতীতের সব গ্রন্থ, বিশেষ করে ইতিহাস-সম্বন্ধীয় এবং কন্ফুসিয়সের ধর্মতত্ত্ব-সম্বন্ধীয় গ্রন্থ সব পুড়িয়ে নষ্ট করে দিতে হবে। কেবলমাত্র চিকিৎসা এবং বিজ্ঞান-বিষয়ক বই ধংস থেকে রক্ষা পেয়েছিল। তাঁর হকুমনামায় তিনি বলেছিলেন, ‘যারা বর্তমানকে ছোটো করবার জন্য অতীতকে বড়ো করে দেখবে তাদের সপরিবারে হত্যা করা হবে।’
তাঁর যে কথা সেই কাজ। বহু পণ্ডিত ব্যক্তি তাঁদের প্রিয় গ্রন্থগুলিকে লুকিয়ে রাখবার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি তাঁদের জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে দিয়েছিলেন। তা হলেই দেখতে পাচ্ছ, আমাদের এই প্রথম-সম্রাটটি কীরকম কোমলচিত্ত এবং অমায়িক প্রকৃতির লোক ছিলেন! ভারতবর্ষে যখন লোকের মুখে অতীতের অতিরিক্ত স্তুতি শুনতে পাই, তখন এঁর কথা আমার মনে পড়ে এবং খানিকটা সহানভূতিও হয়। আমাদের দেশে বহু লোক কেবলই অতীতের দিকে মুখ ফিরিয়ে থাকে, অতীতের স্মৃতিগান করে এবং অতীতের দিকেই সব কিছুর অনুপ্রেরণার জন্য চেয়ে থাকে। অতীত যদি সত্যই বড়ো কাজে অনুপ্রেরণা জোগায়, তবে অতীতকে নিশ্চয় মেনে নেব; কিন্তু কোনো ব্যক্তি কিংবা কোনো জাতি যদি সারাক্ষণ পেছনের দিকে তাকিয়ে থাকে তবে তাকে আমি শুভ লক্ষণ বলে মনে করি না। সেই-যে কে একজন বলেছেন, পিছন দিকে চাওয়া এবং পিছনে যাওয়াই যদি মানুষের উদ্দেশ্য হত তবে তার চোখদুটো মাথার সমুখে না থেকে পিছনেই থাকত। আমাদের অতীতকে জানতে মানা নেই, অতীতে প্রশংসার বস্তু থাকলে প্রশংসা করতেও বাধা নেই, কিন্তু আমাদের চোখের দৃষ্টি রাখতে হবে সামনে এবং পাদুটোও এগিয়ে চলবে সামনের দিকে। শি হুয়াঙ টি প্রাচীন গ্রন্থগুলি ধ্বংস করে এবং তাদের পাঠকদের জ্যান্ত পুঁতে দিয়ে যে অত্যন্ত নৃশংস কাজ করেছিলেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এর ফল হল এই যে, তাঁর সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর সব কীর্তি শেষ হয়ে গেল। তাঁর সাধু ইচ্ছেটা ছিল, তিনি হবেন প্রথম সম্রাট এবং তাঁর পরে দ্বিতীয় তৃতীয় এমন করে অনন্তকাল ধরে তাঁর বংশের রাজারাই রাজত্ব করে যাবেন। কিন্তু অদৃষ্টের এমনি পরিহাস, চীন দেশের সব রাজবংশের মধ্যে এই চীন-রাজাদের রাজত্বকালই সবচেয়ে স্বল্পস্থায়ী। আগেই তো বলেছি, ও দেশের কোনো কোনো রাজবংশ শত শত বৎসর ধরে রাজত্ব করেছে। এই চীনদেরই ঠিক আগে যে বংশ রাজত্ব করেছিল তাদেরও রাজত্ব চলেছে আট শো সাতষট্টি বছর। কিন্তু পরাক্রান্ত চীন-রাজারা হঠাৎ দেখা দিয়ে যুদ্ধ জয় করে শক্তিশালী সাম্রাজ্য স্থাপন করে কেবলমাত্র পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই আবার লোপ পেয়ে গেল। শি হুয়াঙ টি ভেবেছিলেন, তিনি হবেন বিরাট এক রাজবংশের স্থাপয়িতা। কিন্তু খৃষ্টপূর্ব ২০৯ অব্দে তাঁর মৃত্যু হলে পর তিন বছরের মধ্যেই এই রাজবংশের অবসান হল। কন্ফুসিয়স-সম্বন্ধীয় এবং অন্যান্য সব গ্রন্থ, যা মাটির তলায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, অবিলম্বে সেগুলো খুঁড়ে বের করা হল এবং পূর্বের মতোই আবার তাদের সমাদর হল।
রাজা হিসাবে শি হুয়াঙ টি-কে চীন দেশের অন্যতম পরাক্রান্ত সম্রাট বলা যায়। দেশময় যতসব ছোটোখাটো রাজা ছড়িয়ে ছিল, তিনি তাদের সকলকে দমন করে সামন্ততন্ত্রের উচ্ছেদ করেন এবং একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনতন্ত্র গড়ে তোলেন। তিনি সমগ্র চীন দেশ, এমনকি আন্নাম রাজ্য জয় করেছিলেন। তিনিই চীনের বিখ্যাত প্রাচীর নির্মাণ শুরু করেছিলেন। এটা যদিচ খুব ব্যয়সাধ্য হয়ে উঠেছিল, তবু চীনারা ভাবল, বিদেশী শত্রুর থেকে আত্মরক্ষার জন্য বিরাট সৈনাদল পোষণ করার চেয়ে এই প্রাচীর নির্মাণে টাকা ব্যয় করা শ্রেয়। এই প্রাচীরের দ্বারা নিশ্চয় কোনো বড়ো আক্রমণকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না। ছোটোখাটো আক্রমণ প্রতিরোধ করা চলত: কিন্তু এই থেকে বোঝা যায়, চীনারা শান্তিপ্রিয় ছিল এবং যথেষ্ট শক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা সামরিক গৌরবের প্রয়াসী ছিল না।
শি হুয়াঙ টি অর্থাৎ প্রথম-সম্রাটের মৃত্যুর পরে তাঁর বংশে দ্বিতীয় সম্রাট পাওয়া গেল না কিন্তু তাঁর সময় থেকেই চীন দেশে একটি ঐক্যের ধারা চলে আসছে।
এর পরে আর-একটি রাজবংশের উদয় হল—এটির নাম হান-বংশ। এই বংশটি চার শো বৎসরেরও বেশি রাজত্ব করেছিল। গোড়ার দিকে এই বংশের একটি স্ত্রীলোকেও কিছুদিন রাজত্ব করেছিলেন। এঁদের ষষ্ঠ রাজা উ-টি চীন দেশের খ্যাতনামা এবং পরাক্রমশালী রাজাদের অন্যতম। ইনি পঞ্চাশ বছরের অধিককাল রাজত্ব করেছিলেন। তখন তাতার দস্যুরা ক্রমাগত উত্তর-চীন আক্রমণ করছিল, তিনি তাদের যুদ্ধে পরাজিত করেন। পূর্বদিকে কোরিয়া থেকে শুরু করে পশ্চিমে একেবারে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত চীন সম্রাটের আধিপত্য বিস্তৃত হয়েছিল; মধ্য-এশিয়ার সব জাতিগুলি তাঁকে অধীশ্বর বলে মেনে নিয়েছিল। এশিয়ার মানচিত্রের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবে খৃষ্টপূর্ব প্রথম এবং দ্বিতীয় শতকে চীনের শক্তি এবং প্রভাব কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। ঠিক ঐ সময়ে রোম সাম্রাজ্যও খুব শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, বহু গ্রন্থেই আমরা এসব কথা দেখতে পাই, তাই থেকে অনেকে মনে করেন রোমের শক্তি বুঝি তখন সমগ্র পৃথিবীকে ছেয়ে ফেলেছিল। রোমকে বলা হয়েছে ‘সসাগরা পৃথিবীর অধিশ্বরী’। অবশ্য রোম সে সময়ে বড়ো হয়েছিল, তার শক্তিও ক্রমে বাড়ছিল। কিন্তু এর তুলনায় চীন-সাম্রাজ্য অনেক বড়ো, অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল।
খুব সম্ভব সম্রাট উ-টির সময় থেকেই চীন এবং রোমের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয়। পার্থিয়ানদের সহযোগিতায় এই দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য-ব্যবহার চলছিল। পার্থিয়ানদের বাস ছিল বর্তমান পারশ্য এবং মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে। পরে যখন রোমের সঙ্গে পার্থিয়ার যুদ্ধ বাধে, তখন কিছুকালের জন্য ঐ বাণিজ্যসূত্র ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। রোম তখন সমুদ্রপথে সরাসরি চীনের সঙ্গে বাণিজ্যসম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করল। একটি রোমান জাহাজ সত্যিসত্যি চীনে এসে পৌঁচেছিল। কিন্তু এসব হল গিয়ে খৃষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর ঘটনা। আমরা এখন যে সময়ের কথা আলোচনা করছি সেটা খৃষ্টপূর্ব যুগের কথা।
হান-বংশের রাজত্বকালেই চীন দেশে বৌদ্ধধর্মের প্রথম আমদানি হয়। খৃষ্টীয় যুগের আগে থেকেই চীনের লোকেরা বৌদ্ধধর্মের কথা শুনে এসেছে, কিন্তু তার প্রচার শুরু হয়েছে পরে। কথিত আছে, তৎকালীন চীন-সম্রাট নাকি একদা স্বপ্নে এক অদ্ভুত মূর্তি দেখেছিলেন—ষোলো ফিট দীর্ঘ তাঁর দেহ, মাথা থেকে অপূর্ব জ্যোতি বিকীর্ণ হচ্ছে। সেই স্বপ্নমূর্তিটিকে তিনি পশ্চিম দিক থেকে আসতে দেখেছিলেন, সুতরাং তিনি সেই দিকে তাঁর দূত প্রেরণ করেন। কিছুকাল পরে দূতেরা ফিরে এল, সঙ্গে তাদের বুদ্ধমূর্তি এবং বৌদ্ধধর্মের গ্রন্থাবলী। বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে সঙ্গে চীন দেশে ভারতীয় শিল্পকলার প্রভাব বিস্তৃত হয়। ক্রমে চীন থেকে কোরিয়া এবং কোরিয়া থেকে জাপান পর্যন্ত এই প্রভাব বিস্তারলাভ করে।
হান বংশের রাজত্বকালে আরও দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল। একটি হচ্ছে কাষ্ঠফলকের সাহায্যে মুদ্রণশিল্পের উদ্ভাবন, যদিচ উদ্ভাবন সত্ত্বেও প্রায় হাজার বছর কাল এর তেমন প্রচলন হয় নি। তা হলেও এ বিষয়ে চীন দেশ ইউরোপের তুলনায় পাঁচ শত বছর অগ্রগামী।
দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য ব্যাপারটি হচ্ছে, রাজকর্মচারী নিয়োগের জন্য পরীক্ষাপ্রণালী-প্রবর্তন। আমি জানি ছেলেমেয়েরা পরীক্ষা-জিনিষটা ভালোবাসে না, এ বিষয়ে তাদের প্রতি আমার সম্পূর্ণ সহানভূতি আছে। কিন্তু সেই যুগেও যে চীন দেশে কর্মচারী-নিয়োগের এরূপ একটি ব্যবস্থা ছিল সেটি আমার কাছে বড়ো আশ্চর্য ঠেকে। অন্যানা দেশে এই সেদিনও কর্মচারী নিযুক্ত হত বেশির ভাগই খোশামুদির জোরে এবং সেসব চাকুরি বিশেষ বিশেষ শ্রেণী কিংবা উচ্চবর্ণের মধ্যেই আবদ্ধ থাকত। চীন দেশে চাকুরি জিনিষটা বিশেষ কোনো শ্রেণীর একচেটিয়া সম্পত্তি ছিল না। যে কেউ পরীক্ষা পাশ করতে পারলে সরকারি চাকুরি পেত। অবশ্য আমি বলছি না যে এটাই একটা আদর্শ ব্যবস্থা, কারণ, কন্ফুসীয় শাস্ত্রে খুব ভালো করে পরীক্ষা পাশ করেও রাজকর্মচারী হিসাবে অপদার্থ হওয়া কিছুই বিচিত্র নয়। কিন্তু খোশামুদি আবদার ইত্যাদির চেয়ে এই নিয়মটা যে ঢের ভালো তা স্বীকার করতেই হবে এবং মনে রাখা উচিত যে, দু হাজার বছর ধরে চীন দেশে এ ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। এই অল্প কিছুদিন হল এ ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়েছে।